কায়াহীন ছায়ার গল্প: নাহার তৃণা




নেকক্ষণ হলো দুজনে পা ঝুলিয়ে বসে গার্হস্হ্য জীবনের মজা দেখছে। এই মুহূর্তে হাতে কাজকম্মো না থাকায় অলস সময় খুব মন্দ কাটচ্ছে না। ওদের এসব দেখলে তারা মজা পায়। ওদের কাণ্ডকীর্তি নিয়ে নিজেদের মধ্যে তারা হাসাহাসিও কম করেনা। বাজি ধরেই বলা যায় যে গৃহকলহ তারা বসে দেখছে পরিণতিহীন ভাবেই তার ইতি ঘটবে। এমনটাই হয়; অন্তত অক্কা-ফক্কা এমনটা দেখেই অভ্যস্ত।

-আঁচ্চা ওঁরা নিঁত্যি নিঁত্যি লঁড়ে কীঁ মঁজাটা পাঁয় র‍্যাঁ?

- দূরে গিয়ে মর! তোকে না কত্তবার বলেছি ওভাবে নেকোস্বরে কথা কইবি না!

-পঁরম্পরা বঁন্ধু পঁরম্পরা।

-নিকুচি করছি তোর পরম্পরা! সবই তো ওই ওদের মনগড়া কাহিনি। আমাদের সম্পর্কে ওদের কোনো ফার্স্টহ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স আছে? ভুজুং ভাজুং যা ইচ্ছা ফেনিয়েছে।তুই তাতে বিশ্বাস রাখিস? ওরা নিজেরাই নিজেদের বিশ্বাস করে না। শুনলি না এট্টু আগে বউটা কী কইল? ‘তোমাকে বিশ্বাস করে জীবনে কী ঠকাটাই যে ঠকেছি…’

-হিঁ হিঁ হিঁ। জঁব্বর, জঁব্বর কঁয়েচিস। মঁজার ব্যাঁপার খেঁয়েল কঁরেচিস ফঁক্কা? এঁই এঁক কঁথা ওঁদের প্রঁতিটা ঘঁরে লঁড়াইরত হঁয় স্বাঁমীটো কঁইচে নঁয় স্ত্রীঁটো। ভুঁল কঁয়েচি অ্যাঁ?

- শালাদের বিশ্বাসের কোমর ভাঙা বুঝলি অক্কা। যেমুখে মানুষ কয় ভূত বলে পিথিমিতে কিচ্ছু নাই। সেই মুখের মানুষই আমাদের ডরে আধমরা। হা হা হা…

- তাঁ যাঁ বঁলেচিস। এঁপারে আঁসবার আঁগে কিঁচুদিন এঁক লেঁখকের ঘঁর লাঁগোয়া গাঁচে ঘাঁপটি দিঁয়ে ছিঁলেম। লোঁকটো দিঁনরাত এঁক কঁরে গঁপ্পের বঁই লিঁকতো। বাঁজারে নাঁকি খুঁব কাঁটতি তাঁর গঁপ্পের। কিঁ নিঁয়ে গঁপ্পো ফাঁদতো বঁল দেঁকিনি?

- প্রেম, প্রেম করে হেঁদিয়ে মরা প্রেমহীন মনুষ্য জাত ঘোড়ার ডিমের প্রেমের গল্প ছাড়া আর কী লিখতে পারে?

-হলোঁ নাঁ, হঁলো নাঁ ফঁক্কা। লোঁকটো ভূঁতের গঁপ্পো লিঁকতো। অঁথচ বঁন্ধুদের আঁড্ডায় বাঁকোয়াজি কঁরতো ভূঁতফুঁতে তাঁর বিঁন্দুমাত্রও বিঁশ্বেস নেঁই।

-মানুষের স্বভাবই তাই। যা বিশ্বাস করে তা বলে না।আর যা বলে তা বিশ্বাস করে না। বানোয়াট কথার ডিপো একেকটা।

-আঁরে বাঁপ যেঁ জিঁনিস নেঁই বঁলে মাঁনিস, সেঁই জিঁনিস নিঁয়ে লেঁখালিখির মাঁনেটা কীঁ দাঁড়ায় বঁল দেঁকিনি?

- একদম, একদম…

যে ডালে তারা বসে ছিল সেটা আচ্ছা মতো ঝাঁকিয়ে খ্যাক্ খ্যাক করে ফক্কা হেসে ওঠে। ফক্কাকে সঙ্গ দিতে অক্কাও বেদম হেঁ হেঁ হেঁ করে ওঠায় চুপ মেরে থাকা পাকুড় গাছটায় বেশ একটা আলোড়ন তৈরি হয়।

কয়েক মাস অন্তর অন্তর সড়কবাতি চুরি যাওয়ায় রাত নামলে ঘুটঘুটে অন্ধকার এই পথটার বুকের উপর চেপে বসে। আশপাশের বাড়িঘর থেকে ছিটকে আসা আলো সেই অন্ধকারে খুব সুবিধা করে উঠতে পারেনা। সন্ধ্যার পরপর এই এলাকায় লোকজন চলাফেরা করতে কেমন একটু ভয় ভয় পায়। ইতোমধ্যে অন্ধকারের সুযোগে কম অঘটন হয়নি। তাছাড়া এলাকাবাসীর অনেকের বিশ্বাস পাকুড় গাছটায় ভূত আছে। যথেষ্ট প্রমাণ না থাকলেও অনেকেই নাকি আজগুবি ব্যাপার স্যাপার দেখেছে। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়কবাতি চুরির পরপরই আতঙ্কিত এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে সুপারিশ শুরু করে দেয়।

টানা দুইমাস অন্ধকার থাকার পর গতকাল নতুন সড়কবাতি লাগিয়ে গেছে করপোরেশনের লোক। সেই আলোতে অক্কা ফক্কার হাসির হুল্লোড়ে গাছটাতে যে আলোড়ন ওঠে, সেটা পথ চলতি কারো কারো চোখে পড়ে। দ্রুত পায়ে তারা পথটা পেরিয়ে যায়। তারও আগে গাছে ঝাঁকানির কাণ্ডটা প্রত্যক্ষ করে অ্যাপার্টমেন্টের দারোওয়ান বশির মিঞা। সে হারুর দোকানের বেঞ্চে বসে একমনে সুরুৎ সুরুৎ করে চা পান করছিল। পাকুড় গাছটার প্রায় গা ঘেঁষেই হারুর দোকান। কী একটা মনে হতে চা পানরত বশির মিঞা ঝটতি চোখ তুলে উপরে তাকায় এবং গাছটাতে তীব্র ঝাঁকানি লক্ষ করে। ত্রাসে তার শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভরা গরমেও তার কেমন শীত শীত করে। সে পাশে বসে পাউরুটি কলা ভক্ষণরত অপরিচিত রিকশা চালককে ঠেলা দিয়ে বলে ওঠে: ও মিয়া দেখেন, দেখেন ভূতের কারবার! বলেই সে দোয়া পড়তে শুরু করে ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ্ জালিমীন…’

বেঞ্চে বসে থাকা সকলেই মুখ তুলে উপরে তাকায় এবং অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডটা দেখে কেমন ধেবড়ে যায়।

কিছুক্ষণের ভেতর দোকান বন্ধ করে হারুর বাড়ি যাওয়ার কথা। তার অতদিকে নজর দেবার সময় নেই। ব্যস্ত হাতে ক্রেতাদের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে সে গোছগাছে ব্যস্ত ছিল। বশির মিঞার দোয়া পড়ার ঘটা দেখে সেও ব্যস্ততা ভুলে গাছটার দিতে তাকায়। মুহূর্তে তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে ওঠে। ওদিকে নিচের মানুষগুলোর ভয় খাওয়া ভাবসাব দেখে অক্কা ফক্কার হাসির দমক আরো বেড়ে যায়। ফলে গাছের ঝাঁকানিও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। এই ঘটনা ততক্ষণে বাড়ির জানলা কিংবা ব্যালকনিতে দাঁড়ানো কেউ কেউ দেখে ফেলে। সবে সন্ধ্যা পেরিয়েছে, রাতটা তখনও কৈশোরে। কাজেই হইহই করে কিছু লোকের পাকুড় তলায় জমায়েত হতে সময় লাগে না।

-দেখ্ দেখ্ অক্কা সেই জ্ঞানেল ছোঁড়াটাও এসেছে। জ্ঞান ঝাড়বে এখন। হাতে ওটা কী রে?

- ক্রিঁকেট ব্যাঁট। সৌঁরভ দাঁদা এঁলেন গোঁ। আঁমাদের পেঁদিয়ে ছঁক্কা হাঁকাবেন হেঁ হেঁ হেঁ

অক্কার এই এক দোষ। সুযোগ পেলেই ওপারের ঝোল টানবে। ক্যান রে ব্যাটা সাকিবের নামটা বলতে কী জিভে টান পড়ে? মুসলমান বলে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তো খেদিয়েই দিচ্ছিল। নিজেকে দেশের নাগরিক প্রমাণের কাগজপত্র না থাকায় জ্বালা জুড়াতে শেষ পর্যন্ত গলায় দড়ি দিয়ে ভূত হলি। মানুষ অবস্হায় যে মাটি কামড়ে পড়েছিলি, ভূত হওয়ার পর রাগে ক্ষোভে সেও ত্যাগ করলি। তাও মামুর ব্যাটার পিরিত কমে না। মনে মনে গজগজ করতে করতে অক্কাকে মোক্ষম এক ঠুসা দেয়। ওর করোটির খোঁদলে ঠোসাটা পড়া মাত্র নিজের ভুলটা বুঝতে পারে।

-অঁ! নাঁড়ীর টাঁন বঁড় টাঁন বঁন্ধু। নাঁড়ী পোঁতা মাঁটির দেঁশটো রাঁতারাতি আঁমাদের উঁদ্বাস্তু ঘোঁষণা কঁরে দিঁলে আঁর সঁত্যিটো তাঁতে মিঁছে হঁয়ে গেঁল। অঁমনধারার অঁন্যায্য কুঁখনও হঁয় তুঁই বঁল?

- না হলে তুই মরে ভূত হতিস নাকি বেকুব!

নিচের শোরগোলের মুখে এমন ভাবগম্ভীর বিষয় এসে পড়ায় স্বভাবতই ওদের হাসি থেমে গিয়েছিল। গাছটাও ঝাঁকুনি ভুলে সুবোধের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। লোকজন জড়ো হওয়ায় ভূতেরা ভয় পেয়েছে ভেবে সমবেত জনেরা সবে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে যাবে, সেই মুহূর্তে দুম করে একটা টব সশব্দে আছড়ে নিচে পড়লো।

-মজা দেখ এবার। ফুঁসতে ফুঁসতে ফক্কা নড়েচড়ে বসলো।

- তিঁনতলার বাঁরান্দা থেঁকে টঁবটো ফেঁলা ঠিঁক হঁলো র‍্যাঁ? আঁহা মেঁয়েটো না হ্যাঁপায় পঁড়ে …

অক্কার কথায়, ধাঁ করে তিনতলার শ্যামলাবরণ মেয়েটার মুখটা মনে পড়লো। মেয়েটার নাম পারুলি। ওই তিনতলার বাঁধা কাজের বুয়া। প্রায় সে বারান্দায় এসে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। ওর কান্নার কারণ ওরা জানে। অসহায় মেয়েটার উপর গৃহকর্ত্রীর অকথ্য ব্যবহার ছাড়াও বাপ-ছেলের সুযোগ নেওয়া দেখতে দেখতে দুজনে প্রায় ওদের জব্দ করার ফন্দি আঁটে। একদিন ঝড়ের মুখে বাপের হাতের ছাতাটা উড়িয়ে নেওয়া, আর জগিংরত ছোঁড়াটার পায়ে পা বাধিয়ে হুড়মুড়িয়ে ফেলে দেওয়া ছাড়া সেরকম মোক্ষম কিছু করে উঠতে পারেনি। সারাক্ষণ বিষণ্নতা লেপ্টে থাকা পারুলিকে ওদের দুই বন্ধুর খুব আপন মনে হয়। মেয়েটার ভালো চায় ওরা। উত্তেজিত হয়ে অপকর্মটা করে ফেলেছে। অল্পে উত্তেজিত হওয়াটা তার গত জন্মের ধাত। ভূতজন্মেও এঁটেল মাটির মতো স্বভাবটা লেপ্টে আছে। পারুলিকে বিপদে পড়তে দেওয়া চলবে না। পরে ভেবেচিন্তে তার একটা হিল্লে করা যাবে। আপাতত নিচে কী ঘটছে দেখবার জন্য সেদিকে মনোযোগ দেয় ফক্কা।

নিচে তখন হল্লা চলছে।ওভাবে হঠাৎ উপর থেকে গাছসহ একটা টব আছড়ে পড়ায় আতঙ্কে চেঁচামেচি, হইহই শুরু হয়েছে। খুব বাঁচাটা বাঁচা গেছে ভেবে অনেকে প্রায় দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ টুক করে জটলা ছেড়ে নিজ নিজ খোপে ঢুকে পড়েছে।

- ক্রিকেট ব্যাট হাতে ছোঁড়াটার গুমর দেখ। ভয় খেয়েছে কিন্তু ভাব করছে ভয় পায়নি। বীরত্ব দেখাতে এক্ষুনি দুই এক ঘা গাছটাতে বসালো বলে, মিলিয়ে নিস।

ফক্কার কথা শেষ হতে না হতে চশমাপরা ছেলেটি হাতের ক্রিকেট ব্যাটটা তুলে এগিয়ে এসে গাছটাকে লক্ষ্য করে দমাদম কয়েক ঘা বসিয়ে দেয়। আর চেঁচিয়ে বলতে থাকে,

-ভূতফুত কিচ্ছু না। পুরোটাই কাকতলীয়। হয়তো বাতাস কিংবা কারো হাত লেগে টবটা পড়েছে।

যে ফ্ল্যাট থেকে টবটা পড়েছে সেখানে লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেবার কথা ওঠে। লোকজন ভয় পেলেও অকুস্হলের মজা ছেড়ে তৎক্ষণাৎ কেউ টব বিষয়ে তদন্তে যাওয়ার আগ্রহ দেখায় না।

গাছের গায়ে বাড়ি পড়তেই মজা পেয়ে ফক্কা আর অক্কা আবার আগের মতো খলবলিয়ে হেসে ওঠে। এবার ওরা নিজেরাও ইচ্ছাকৃত ভাবে গাছের ডাল ধরে ঝাঁকুনি দিতে শুরু করে। ফক্কা নিজের স্বভাব মতো কিছু একটা না করে সুস্হির থাকার পাত্র নয়। ব্যাট হাতে বাহাদুরি দেখানো ছেলেটার গালে মোক্ষম এক থাবড়া বসানোর জন্য ওর হাত চুলকায়। কথাটা অক্কাকে জানাতেই সে হাঁ হাঁ করে জাপটে ধরে ওকে।

-ওঁকাজ কঁরিসনে ভাঁই। গঁত বাঁরের মঁতো গাঁচহারা কঁরে ছাঁড়বে তঁবে। হুঁশে থাঁক ভাঁই।

- হুম ওকাজে ওস্তাদ বটে। শালারা বন জঙ্গল সব উজাড় করে দিচ্ছে দুহাতে। ক্ষতিটা কার হচ্ছে শুনি?

গাছ শূন্য পৃথিবীতে কদিন টিকবে ওরা? গাছ ছাড়াও অন্য বসতি খুঁজে নেবার ক্ষমতা আমাদের আছে। আরে বেকুবের দল, তোদের ছেলেপুলেগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা অনন্ত ভাব!

ফক্কার কথায় ফশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস অক্কার নাকহীন গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। খানিক চুপ থেকে বলে ওঠে,

-সঁত্যিই বোঁকা মাঁনুষগুঁলো বঁর্তমানে মঁত্ত থাঁকতে ভাঁলোবাসে। আঁগামি নিঁয়ে ভাঁবনা নেঁইকো। লোঁক দেঁখানো সঁবুজের অঁভিযান যেঁমন চলে, সাঁথে পাঁল্লা দিঁয়ে সঁবুজটো নিঁধন কোঁনো অংঁশে কঁম বঁল দেঁকিনি? আঁজ এঁখানে বঁন উঁজার হঁচে, কাঁল সেঁখানে গাঁচ কাঁটার ফঁন্দিফিকিরের হাঁজারটো বাঁতেলা।

-ধুর, ধুর! মনুষ্য জাতির কিস্যু হবার নয়। মরে ভূত হওয়াটাই এ জাতের ভবিতব্য।

গতজীবনের ছাত্রনেতার কণ্ঠে কথাটা বলে কিছু সময়ের জন্য ফক্কা গুম মেরে যায়। হুট করে বিগত দিনের কথা মনে পড়ে ওর। রাগে গরগর করে ওঠে,

-শালা! জীবনটা বেহুদা খরচের খাতায় চলে গেল রে অক্কা। ওই পাতি নেতাটার কথা মতো চললে এতদিনে মন্ত্রীসন্ত্রী হওয়ার পথ তৈরি হয়ে যেত বুঝলি? কিন্তু স্বভাব থেকে বাবা-মায়ের শিক্ষাটা মুছে ফেলতে পারিনি। দিনের পর দিন ধড়িবাজ নেতার অন্যায্য কর্মকীর্তি দেখে দেখে এক সময় মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেটাই কাল হলো দেখ। আমাকে সন্ত্রাসী আর ইয়াবা ব্যবসায়ী দেগে দিয়ে ক্রসফায়ারে ফেলে দিলো মামুর ব্যাটা! নেতার প্রশ্নহীন এক ইশারায় আমার নিষ্ঠা, কর্তব্যজ্ঞান সমস্ত কিছুকে কী জব্বর কায়দায় মিথ্যা প্রমাণ করা হলো। মানুষগুলো হারামির একশেষ। নিজের স্বার্থে সামান্য আঁচড় লাগলে দানব বনে যায়। ওয়াক থু…

ফক্কাকে অতটা রেগে উঠতে দেখে অক্কা সরে গিয়ে ওর পাশে ঘন হয়ে বসে। সান্ত্বনা দেবার স্বরে বলে,

-পাঁগল, অঁত রাঁগলে চঁলে অ্যাঁ! আঁমাদের পঁবিত্র পুঁস্তক ভূঁতভুতুমে কীঁ লেঁকা আঁচে মনে নেই?

অক্কা নিজেই তারপর একনিশ্বাসে ভূতভুতুমের সারকথা বলতে শুরু করে:

-ভূঁতেদের অঁসাধ্য কিচু নেই। চাঁইলে তাঁরা মেঁলা কিঁচু কঁরে ফেঁলার ক্ষঁমতা রাঁখে। ভুঁলিলে চঁলবে নাঁ মাঁনুষ থেঁকেই ভূঁতের জঁন্ম। মাঁনুষের মঁধ্যেই তাঁর বাঁস। বিঁগত জঁন্মের লোঁভ, হিঁংসা, বিঁদ্বেষ ইঁত্যাদি অঁনুভূতির সঁব সেঁ ভূঁত জঁন্মেও বঁয়ে আঁনে। তঁথাপি কাঁরো বড়ঁসড় ক্ষঁতি কঁরা ভূঁত ধঁর্মে নিঁষেধ। মাঁনুষের সঁহিত এঁখানেই ভূঁতের পাঁর্থক্য। এইবাক্যটি প্রত্যেক ভূতের মর্মে গাঁথিয়া লওয়া বাধ্যতামূলক,‘প্রতিহিংসাপরায়ণতা সর্বক্ষেত্রে পরিত্যাজ্য। কোনোভাবেই মনুষ্য প্রজাতির অনিষ্টে প্রবিষ্ট হওয়া চলিবে না।’

-ফঁক্কা খেঁয়েল কঁরেচিস ভূঁতভুতুমে সাঁধু ও চঁলিত ভাঁষার মিঁশ্রণের ফঁলে কঁতটা গুঁরুচণ্ডালী দোঁষে দুঁষ্ট?

-রাখ তোর সাধু চলিত! কবে কোন স্কুলে মাস্টারি করেছিস সেটা জাহির না করলে চলে না রে ব্যাটা? নিজে যে চ বর্গ ছ বর্গ নিয়ে নয়ছয় করিস তার বেলা?

-অঁ! তোঁর মঁটকা ঠাঁন্ডা হঁয়নি দেঁকচি। নিঁশ্চয়ই থাঁবড়া মেঁরে ওঁই পাঁতি নেঁতার ন্যাঁড়া মাঁথার ঘিঁলু ঘুঁটে শাঁহী লাঁচ্ছি শঁরবত বাঁনাচ্চিস মঁনে মঁনে? সঁত্যিই সেঁরকমটো কঁরা গেঁলে মঁন্দ হঁতো নাঁ। হাঁড়ে বঁজ্জাতটোর এঁকটা শিঁক্ষা হঁতো। কিঁন্তু ভাঁইটু, হাঁত পাঁ বাঁধা যেঁ আঁমাদের। আঁমরা ভূঁত, আঁমাদের এঁই অঁশরীরী পঁরিচয়ের ভীঁতি ছঁড়িয়ে আঁর মাঁঝে মঁধ্যে চঁড়টা চাঁপড়টা মেঁরেই মঁনের ক্ষোঁভ মিঁটাতে হঁবে। বুঁঝলি ভাঁয়া?

অক্কার কথাগুলো চুপচাপ শুনে ফক্কা, কিছু বলে না। সন্তর্পণে একটা হাত সে বন্ধুর কাঁধে রাখে কেবল।

গাছের নিচ থেকে চশমাওয়ালা ছেলেটা হম্বিতম্বি শেষে ঘরে ফিরে যায়। তার সঙ্গে বাকিরাও যে যার পথ ধরে। লোকগুলো যাওয়ার আগে তিনতলায় গিয়ে টবের বিষয়ে একটা বিহিত করা হবে ঘোষণা দিয়ে যায়। হারু দোকানের ঝাঁপ ফেলে বাড়ি ফিরে গেছে। ওর দোকানে সর্বক্ষণ গান বাজে। দোকানটা বন্ধ হওয়ায় পাড়াটার বুকে নরম নৈঃশব্দ্য গা এলিয়ে বসে। মাঝে মধ্যে টিভির নানা অনুষ্ঠানের চিলতে সংলাপ, গানের কলি ছিটকে আসে। একদম শুনশান নীরবতা নামতে এখনও ঢের দেরি।

অক্কা-ফক্কা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। একই চিন্তা দুজনকে আচ্ছন্ন করায় দুজনই হঠাৎ চুপ মেরে যায়। পারুলির কপালে শনি নাচচ্ছে বুঝতে কষ্ট হয় না ওদের। অবশ্য এতিম মেয়েটার পোড়া কপালে কবে সুখ জুটেছে সে খবর তাদের অজানা। থম ধরে বসে থাকে দুজনে।

মাস ছয়েক পরের ঘটনা। এর মধ্যে অক্কা ফক্কা গাছছাড়া, পাড়াহারা হয়েছে। সেদিনের সেই টব ফেলাকে ঘিরে জল অনেকদূর গড়িয়েছিল। অভিযোগকারীদের জানা ছিল না পারুলির বিরুদ্ধে তার মালিক পক্ষের একতরফা নালিশের পাহাড় জমে গেছে। বাস্তব সম্পর্কে যদিও অনেকেই ভিন্ন ধারণা পোষণ করতেন। তাছাড়া পারুলির গৃহকর্ত্রী সদ্যই টের পেয়েছিলেন কাজের মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা। কুকর্মটি ঘরের দুই পুরুষের কোন জনার মাধ্যমে সংঘটিত, সে সম্পর্কে তিনি দ্বিধান্বিত। নিজেদের গাড়ি থাকলে না হয় অকর্মের দায় ড্রাইভারের উপর চালান করা যেত। অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ান বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা দেবার মতো মানুষ। ওটাকে ঘাটাতে গেলে নিজেদের কেচ্ছা কাহিনি চাউর হওয়ার ভয়। এরকম পরিস্হিতিতে এলাকাবাসীর অভিযোগ তাদের জন্য ঝঞ্ঝার্টমুক্তির আর্শীবাদ হিসেবে যেন উপস্হিত হয়েছিল। কাজেই টব সংক্রান্ত অভিযোগে পারুলিকে আচ্ছা মতো ধোলাই দিয়ে ভ্রুণ নষ্টের ছুতো গৃহকর্তা-কর্ত্রী কিংবা তাদের বখাটে সন্তানটির কেউই ছাড়তে রাজি ছিল না।

-মানুষের বিচারটা দেখলি! উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে অপকর্ম থেকে কেমন দিব্যি পার পেয়ে গেল? আমি হলে তিনটেকে নিয়েই ঝাঁপ দিতাম।

- তাঁ তুঁই পাঁরতিস বঁটে। পাঁরুলিটো তোঁর মঁতো ডাঁকাবুকো নঁয়, বঁড্ড সঁরল সিঁধে।

- ঘোড়ার ডিমের ডাকাবুকো। অস্ফুটে বিড়বিড় করে ফক্কা, ‘বালস্য বাল/ “হরিদাস পাল” পৃথিবীর-প্রকৃতির প্রগাঢ় প্রস্রাবের ফেনায় ভেসে গেছে…’

-অ্যাঁ?

ফক্কা কিছু একটা বলে। হঠাৎ দমকা হাওয়া ওঠায় কবরস্হানের গাছগুলোর সম্মিলিত শনশন আলোড়ন, আর একই সঙ্গে ধারেকাছে একজোড়া ঘুঘু ডেকে ওঠায় চাপা পড়ে যায় কথাগুলো। পাকুড় গাছটা কাটা পড়বার পর ওখানকার পাট গুটিয়ে, ওরা ছোট্ট এই উপশহরের ডোবার ধার ঘেঁষে পুরনো কবরস্হানটাতে ডেরা বেঁধেছে। দিব্যি আরামে হাত-পা ছড়িয়ে আছে। গার্হস্হ্য জীবনের ক্যাচাল ওদের আর তেমন টানে না। সেই একই চক্রে নেচেকুঁদে চলেছে মনুষ্য জীবন। অবসরে ওরা বরং নিজেদের জমানো গল্প বলে আনন্দ পায়। কী হলে ভালো হতো, কী না হলে বইয়েই যেত ইত্যাদি গল্পের জাল বিছায় আর মজা পেয়ে ক্ষণে ক্ষণে হেসে ওঠে। অক্কা ফক্কার পাশে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আরো একজন রিনরিনে কণ্ঠে গল্প করে, খলবলিয়ে হেসে ওঠে। কণ্ঠস্বরটা পারুলির।


লেখক পরিচিতি:
নাহার তৃণা
গল্পকার। অনুবাদক। প্রাবন্ধিক
শিকাগোতে থাকেন।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. রূপকের মোড়কে দারুণ এক গল্প। গল্পকারকে অভিনন্দন।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব ভাল গল্প। ধন্যবাদ// কাওসার আহমেদ

    উত্তরমুছুন