বাঁ-পায়ে বিশাল গোদ নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে বাড়িওলাটা আমাকে চামার বলে গেল। আমি সে কথার প্রতিবাদ করার চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করলাম তাকে এটা বোঝানো যে এ মাসের মাইনে এখনও পাইনি, তাই ভাড়া দিতে একটু দেরি হচ্ছে। সে জানতে চাইল মাত্র একশো সত্তর টাকা ভাড়া দেওয়ার মুরোদও আমার নেই নাকি। আমি শান্তভাবে জানালাম যে নেই, কারণ আমি মাইনেই পাই সাতশো পঁচাত্তর টাকা। সে বলল বাড়িটা আমি ছেড়ে দিলেই পারি। আমি বললাম কথাটা যুক্তিপূর্ণ কিন্তু বোনের কথা ভেবেই তো ছাড়তে পারি না। কারণ বাড়ি ছেড়ে ফুটপাতে বা স্টেশনে উঠলে আমার যুবতী বোনকে মাঝরাতে হায়েনার দল ছিঁড়ে খাবে। গালাগাল দিতে দিতে ভারি পাটা টেনে টেনে বাড়িওলাটা চলে গেলে আমি উনুনের কাছে মাথা নিচু করে বসে থাকা বোনের দিকে তাকালাম। চায়ের জল চাপিয়েছে, বাইরে খুব বৃষ্টি। ধোঁয়া মাখা করুণ সন্ধ্যা ভাসছে চতুর্দিকে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবলাম দিন পনেরো আগে আমার অফিসের মনিবও আমাকে খুব অপমান করেছিল। দিন বারো আগে ভিড়ের বাসে রঙিন জামাকাপড় পরা এক ছোকরা আমাকে খুব অপমান করেছিল। দিন আটেক আগে পাড়ার ওষুধের দোকানদার আমাকে খুব অপমান করেছিল। বোনের দাঁতের ব্যথার জন্য একটা ওষুধ আমি ধারে চাইতে গিয়েছিলাম । তিনদিন আগে পাড়ার এক মাস্তান খুব অপমান করেছিল। সাইকেলে বসে আমাদের জানলার শিক ধরে সে বাড়ির ভেতর উঁকি মারছিল, নিঃসন্দেহে বোনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। আমি উঠে জানলাটা বন্ধ করার চেষ্টা করতেই সে বাঘের মতো চেঁচিয়ে ওঠে, তারপর আমার ভীরু, বেঁটে, কাপুরুষসুলভ চেহারা ও স্বভাবের কথা বলতে বলতে বেজায় হাসিতে গড়িয়ে পড়ে। গতকাল লন্ড্রির মালিকটা খুব অপমান করল, কারণ আমার শার্টের কলার ছিঁড়ে দেওয়ায় আমি ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলাম। আর আজ খুব অপমান করে গেল বাড়িওলাটা।
ধোঁয়ায় উড়তে উড়তে বৃষ্টির ছাট এলোপাথাড়ি শব্দ করছে, বোন মাথা নিচু করে উনুনের কাছে বসে। একবারও মাথা তোলেনি। আমার দুঃখী, রোগা, চাপা, শুষ্ক, আইবুড়ো বোন!
আমি কাছে গিয়ে চিবুক ধরে তার মাথাটা একটু ওপরে তুললাম।
“আমরা খুব দুঃখী, বোন। এবং ভবিষ্যতে যে কখনও সুখী হব তেমন সম্ভাবনাও নেই।'
সে আবার মাথা নিচু করে। বৃষ্টির ছাট জানলা দিয়ে ঘরে আছড়ে পড়ছে।
'কিন্তু জীবনটা নাকি আনন্দে বাঁচার জন্য।' আমি বলে গেলাম। 'আনন্দে বেঁচে থাকাটাই নাকি জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। তুমি এটা বিশ্বাস করো, বোন ? '
সে মাথা দুলিয়ে জানাল যে বিশ্বাস করে না। আমার চোখে জল এল।
“ওরকম হতাশ হতে নেই।' আমি বললাম। 'বাঁচতে বাঁচতে আমরা যে কখনও আনন্দ পাইনি তা তো নয়।'
কবে কবে আনন্দ পেয়েছি আমি মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম। বৃষ্টির ছাট জানলা দিয়ে আরও জোরে আছড়াচ্ছে। অনেকক্ষণ ভাবার পর আমার মনে পড়ল আমাদের শৈশবেই আমরা সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি। তখন আমরা থাকতাম শিকারপুরের বাড়িতে। বাবা-মা বেঁচেছিল। ওখানেই আমরা জন্মেছি। আমি ও আমার বোন।
“শিকারপুরের বাড়ি মনে পড়ে?' আমি তার চিবুক আবার তুলে জিজ্ঞেস করি। 'আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো মনে পড়ে?'
বোনের চোখে যেন হঠাৎ বিদ্যুতের আভাস ছিটকে গেল। দু-চোখে স্বপ্নের গুল্মলতা, যাদের শেকড়ে তার দৃষ্টি জড়িয়ে যাচ্ছে। সে হঠাৎ খুশি হয়ে হেসে ফেলে।
‘মনে পড়ে না?” আমি আশান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
ঘাড় দুলিয়ে সে জানাল যে মনে পড়ে।
“তখন কি আমরা একটুও আনন্দ পাইনি?”
ঘাড় দুলিয়ে সে একমত হল আমার সঙ্গে।
‘চলো আজ শিকারপুরের বাড়িতে যাব।' হঠাৎ বলে ফেলি আমি।
অবাক চোখে বোন তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, কারণ ওরকম প্রস্তাব তো একেবারে অভাবনীয়, তাছাড়া বাড়িটা বিক্রি করার পর ওখানে আর কখনও যাইনি আমরা। বেঁচে থাকতে আমার বাবা-মাও কখনও যায়নি।
খুশিতে সে দু-হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। তারপর আহ্লাদিত পাখির মতো কত কথা বলতে লাগল। তারপর একটা ঝোলায় এবং একটা সাইডব্যাগে জামাকাপড়, টুথব্রাশ, সাবান, আয়না, চিরুনি, একটা মোমবাতি ও দেশলাই, আধপ্যাকেট বিস্কুট ইত্যাদি ঢুকিয়ে নিমেষে তৈরি হয়ে গেল।
বৃষ্টির মধ্যেই আমরা বেরিয়ে স্টেশনে এসে উপস্থিত হলাম। শিকারপুরের শেষ গাড়িটা ছাড়বে সন্ধে সাতটা বিয়াল্লিশে এবং প্রায় দু-ঘন্টার পর চাঁদনি স্টেশনে এসে পৌঁছবে। ওখান থেকে একটা রিকশা করে বা পায়ে হেঁটে শিকারপুর নামক গ্রামটায় যেতে হবে ।
গাড়ি ছুটছে। আমি ও বোন জানলার ধারে সামনাসামনি বসে। বৃষ্টির দিন এবং তার ওপর রাত হয়েছে বলে কামরায় লোকজনের ওঠানামা কম। একবার এমন হল যে গোটা কামরায় শুধু আমি আর বোন। আমার ভয় করতে লাগল এবং মনে মনে চাইলাম কামরাটায় আরও কিছু লোকজন উঠুক। একটু পরে একটা স্টেশনে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দুজন লোক এসে উঠল। তাদের দেখে স্বস্তি হওয়ার বদলে আমার ভয় ও দুশ্চিন্তা বরং আরও বাড়ল, কারণ লোকদুটো আমার বোনের ঠিক উলটোদিকে বসল, আর ভাল করে বসতে না বসতেই হাঁ করে তাকিয়ে থাকল বোনের মুখের দিকে। ইশারায় আমি বোনকে জানালাম ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ আমি তো আছি। তারপর জানালাম সে যেন একমনে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে। বৃষ্টি ও অন্ধকার বলে বাইরে অবশ্য কিছু দেখার উপায় ছিল না। অনেকদিন পর আমি ও বোন রেলভ্রমণ করছি অথচ জানলা দিয়ে দেখা কোনও দৃশ্য নিয়েই তার সঙ্গে আলোচনা করতে পারছি না বলে আমার মন খারাপ করতে লাগল।
আমার কথামতো বোন একমনে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে। আড়চোখে লোকদুটোর দিকে তাকিয়ে দেখি তারা তখনও মাঝেমাঝে বোনের মুখ ও শরীরের দিকে চোখ রাখছে। কিছুক্ষণ পর দেখি তারা বোনের দিকে না তাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। এবং আরও কিছুক্ষণ পর দেখি তারা ঘুমোচ্ছে। আমি একটু নিশ্চিন্ত হলাম ৷ একটানা বৃষ্টির শব্দ কখনও একঘেয়ে, কখনও ভাল লাগছিল বলে এক সময় আমার চোখেও নেমে আসে ঝিমুনি। ঝিমুনির ভেতর অবশ্য ঘুমের চেয়ে নানারকম অস্বস্তিকর ছবিই বেশি আসছিল। একবার একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, হয়ত বেশ কিছুক্ষণের জন্য। স্বপ্নে দেখলাম একটা গভীর কালো রাত্রির জঙ্গলে মশাল হাতে খুব দীর্ঘকায় কিছু লোক চুপি চুপি পা ফেলে হাঁটছে আর গাছেদের গায়ে লেপটে থাকা প্রজাপতিদের পোড়াচ্ছে। ডোবার ধারে দাঁড়িয়ে একটা বাঘও প্রজাপতি ধরে ধরে খাচ্ছে। আমি চোখ খুলে ফেললাম এবং তারপর যা দেখলাম তাতে আমার বুক হিম হয়ে গেল। দেখি যে লোকদুটো কখন উঠে আমার বোনের দুদিকে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে তার সঙ্গে কথা বলছে। বোন বাধা দিচ্ছে না । আমি যে চোখ খুলেছি তাদের কেউ বুঝে ফেলার আগেই আমি চোখ বুজে ফেললাম, তারপর ঘুমের ভান করে বসে থাকলাম। গাড়ি ছুটছে। বাইরে তখনও বৃষ্টি। যা দেখলাম সেটাও স্বপ্নেই দেখেছি কিনা পরীক্ষা করার জন্য আমি একটু চোখ ফাঁক করে আবার সামনের দিকে তাকাই। স্বপ্ন নয়, যা দেখেছি সেটা বাস্তবই। লোকদুটোর একজন বোনের ব্লাউজের ভেতর হাত দেবার চেষ্টা করতেই সে ফিসফিস করে আপত্তি তুলে এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিল। তারপর ফিসফিস করে ধমক দিয়ে তার পাশ থেকে উঠে যেতে বলল। লোকটা জবরদস্তি করতে বোন তাকে জোরে ঠেলে দেয় এবং তাতে মুখ নিচু করে লোকটা বোনের গালে এমন জোরে কামড়ে দেয় যে বোন চাপাস্বরে চিৎকার করে ওঠে। লোকদুটো তাকে ছেড়ে দিয়ে দরজার কাছে ছুটে যায়। তারপর গাড়ি থামতেই নেমে পড়ে।
আমি জেনেশুনেই চোখ খুলিনি, কারণ ঠিক করতে পারিনি চোখ খোলা উচিত কিনা। বোন তো স্বেচ্ছাতেই তাদের জড়িয়ে ধরতে দেয়। আবার এটাও ঠিক যে তারা বাড়াবাড়ি করায় সে আপত্তি তোলে, চাপা চিৎকার করে। আমার বোনের বয়স প্রায় তেত্রিশ। তার যে বিয়ে হওয়া দরকার আমি জানি। কিন্তু কী করে হবে বিয়ে? জানলায় মুখ রেখে সে বাইরে তাকিয়ে আছে, মুখ ভিজে, কান্নায় না বৃষ্টির জলে বুঝতে পারছিলাম না। তবে গালে দাঁতের দাগ তখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, কামরায় ঢিমে আলো থাকা সত্ত্বেও। আমি ঠিক করলাম দাগটা মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত চোখ বুজে ঝিমনোর ভানই করে যাব, নইলে সে হয়ত লজ্জা পাবে। সম্ভব হলে আমি আজই বোনের বিয়ে দিতাম !
অনেকক্ষণ পর চোখ খুলে তার দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকালাম। ঝোলা খুলে সে আধপ্যাকেট বিস্কুট বার করে আমাকে দুটো দিল, নিজে দুটো নিল। তার মুখ গম্ভীর, তবে গালের দাগটা মিলিয়ে গিয়েছে। সমস্ত ঘটনাটা আমি সারাজীবনের মতো ভুলে যেতে চাইলাম। জোর করে। মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা সদ্যোজাত স্মৃতিটার গলা সজোরে টিপে ধরে। যেভাবে লোকে বিষের শেষ বড়িটাও গলা থেকে সজোরে পেটের ভেতর নামিয়ে দেয় ।
চাঁদনি স্টেশনে নেমে একটা রিকশা পাওয়া গেল। এখানে বৃষ্টিই হয়নি। আকাশে, মেঘের আড়াল থেকে, চাঁদ উকি মারছিল। বুক ভরা উত্তেজনা নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা শিকারপুরের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। লাল ইটের ভাঙা দোতলা বাড়ি।
“বাড়িটা চিনতে পারো বোন?' আমি তার হাত ধরে জিজ্ঞেস করলাম ।
'হুঁ,' খুশি হয়ে সে জানাল ।
বোনের দু-চোখে আবার স্বপ্নের গুল্মলতা, যাদের শেকড়ে তার দৃষ্টি জড়িয়ে যাচ্ছে।
সদর দরজা বন্ধ। সদর দরজা অবশ্য আমরাও সন্ধে হতেই বন্ধ করে দিতাম । সন্ধের পর যাতায়াত করা হত পেছনের খিড়কির দরজা দিয়ে। আমাদের ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকে যে ভদ্রলোক বাড়িটা কিনে নিয়েছিলেন তাঁর নামটা আমার মনে পড়ল না।
“শুনছেন?'
কোনও সাড়া না পেয়ে আমরা রাস্তায় নেমে বাড়িাটার ডানদিকে একটু হেঁটে খিড়কির দরজায় গেলাম। আট ফুট উঁচু প্রাচীর তুলে এই দরজাটা বসানো। প্রাচীরের ওপর দিয়ে ভেতরের রান্নাঘরের টিনের চাল ও নারকোল গাছদুটো দেখা যাচ্ছিল। গাছটা লাগিয়েছিলেন আমার ঠাকুর্দার বাবা। দরজাটার গায়ে দুটো পেতলের বালা, যা আমাদের ছোটবেলায় লোহার ছিল।
‘শুনছেন?' বালা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম। দরজা খোলার শব্দ হল। এবং সামনে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ। হয়ত ইনিই বাবার কাছ থেকে বাড়িটা কিনেছিলেন, আমার ঠিক মনে নেই। বৃদ্ধের খালি গা। একটা সাদা ধুতি লুঙ্গির মতো করে কোমরে জড়ানো ।
প্রণাম করে আমি বললাম, 'এক সময় এটা আমাদের বাড়ি ছিল। এই বাড়িতেই আমি জন্মেছি। এ আমার বোন। এ-ও এখানে জন্মেছে। এবং আমরা যে হঠাৎ এখানে এলাম তার কারণ জীবনে এখানেই আমরা সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি। বিশ্বাস করুন, আমাদের শৈশবটাই সবচেয়ে সুখের ছিল। আজ রাতটুকু থেকে ভোরে চলে যাব।'
বৃদ্ধের হয়ত মনে হল আমার সব কথাই বলা হয়ে গিয়েছে, এবং আর কিছু প্রশ্নও নেই। তাই সংক্ষেপে বললেন, ‘ভেতরে এসো।'
এ বাড়িতে এখনও বৈদ্যুতিক আলো আসেনি। লণ্ঠনের আলোয় আমরা রাতের খাওয়াদাওয়া সারলাম। বৃদ্ধ নিজের হাতে রান্না করে আমাদের খাওয়ালেন। তাঁর ছেলে নিজের পরিবার নিয়ে কয়েকদিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে, বৃদ্ধ জানালেন।
‘তোমরা খুবই দুঃখী বুঝি?' দোতলার ঘরে ইজিচেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করেন বৃদ্ধ। এমনিতে খুবই কম কথা বলেন।
'খুব,' কথাটা বলে লজ্জায় হেসে ফেললাম আমি। তারপর বললাম, ‘অবশ্য অনেক মানুষই আমাদের মতো দুঃখী। শুধু আমরাই বললে মিথ্যে বলা হয়।'
‘মানুষ যে একটু দুঃখী হবে এটাই তো স্বাভাবিক,’ বৃদ্ধ বলেন, ঠোঁটে কোমল হাসি ফুটিয়ে।
'কিন্তু আমরা খুবই দুঃখী, বিশ্বাস করুন। তবে এ বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে মন ভাল হয়ে গিয়েছে। অনেকদিন পর মনটা এত হালকা লাগছে আমার। বোন, তোমার মন হালকা লাগছে না ? '
'আমার খুব ভাল লাগছে,' খুশিতে বালিকার ঢঙে বলে ওঠে সে।
'ছোটবেলায় এ ঘরেই আমি পড়াশুনো করতাম,' ঘাড় ঘুরিয়ে আমি বললাম। ‘মেঝেয় মাদুর বিছিয়ে লণ্ঠনের আলোয় দুলে দুলে। আর আপনারা যেখানে লোহার আলমারিগুলো খাড়া করে রেখেছেন সেখানে একটা প্রকাণ্ড
খাট ছিল। আমার যখন সাত-আট মাস বয়স তখন একদিন ওই খাট থেকে ঘুমের ভেতর গড়াতে গড়াতে নিচে পড়ে গিয়েছিলাম। নিচে একটা ধামা ছিল। ওটার ভেতর পড়ি বলেই আজও বেঁচে আছি। আর কাদায় আটকে পড়া গরুর গাড়ির মতো জীবনটাকে টেনে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছি।'
বৃদ্ধ চোখ বুজলেন। কিছুক্ষণ ওভাবে বসে থাকার পর উঠে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন আমাদের। সেখানে একটা বড় খাট, বালিশ ও মশারি। ঠাকুর্দা এ ঘরেই মারা গিয়েছিলেন, আমার মনে পড়ল।
‘এখানে ঘুমোতে তোমাদের অসুবিধে হবে না তো?' লণ্ঠনটা ওপরে তুলে ধরে বৃদ্ধ জানতে চান ।
“না, না,’ বোন বলল।
‘আমরা অবশ্য ভোরে চলে যাব,' আমি বললাম।
'সাড়ে চারটের ট্রেনটা ধরতে চাইছ তো? ঠিক আছে। আমি তার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি,' বৃদ্ধ বললেন।
নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিলেন তিনি। জ্বলন্ত লণ্ঠনটা অবশ্য আমাদের কাছে রেখে গেলেন। সমস্ত বাড়িটা হঠাৎ গম্ভীর, নিস্তব্ধ। ঝিঁঝির ডাক কানে বাজতে লাগল। লণ্ঠনের আলোয় আমি ও বোন পরস্পরের মুখের দিকে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি, তারপর আমি বলে উঠি, 'চলো, ঝিঁঝি ধরবে?'
বোনের হেসে ওঠার কথা, কারণ ছোটবেলায় আমি বোনকে প্রায়ই ওরকম প্রস্তাব দিতাম কিন্তু ঝিঁঝি পোকা কখনওই ধরতে পারিনি।
আমার হাত থেকে গম্ভীরভাবে লণ্ঠন নিয়ে নিল সে, তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে কুয়োর পাড়ে গেল। ঝিঁঝির ডাকগুলো সেখানকার ফাটল ও ফাঁকফোকরগুলো দিয়েই বেশি আসছিল। নিচু হয়ে আলো ফেলে ফেলে বোন ঝিঁঝিদের খুঁজে চলে, আমি পেছনে পেছনে, এবং হঠাৎ নারকোল গাছের পাতার ভেতর থেকে ডানা ও মুখে শব্দ তুলে একটা কিছু উড়ে যেতেই বোন আঁতকে উঠে আমার জামা চেপে ধরে।
‘প্যাচা,” আমি বললাম। এবং বলে জোরে হেসে উঠলাম (কতদিন পর যে এমন প্রাণ খুলে হাসলাম), তারপর এত ভিতু হওয়ার জন্য বোনের পেছনে লাগলাম। লণ্ঠনটা শক্ত করে ধরে সে দৌড়ে সামনের ভাঁড়ার ঘরটায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ভাঁড়ার ঘরের একটা তাকে বোয়ামের ভেতর রাখা আছে নানা জিনিস, আমি জানি। আমি ভাঁড়ার ঘরের দরজা জোরে জোরে ঠেলতে লাগলাম, কড়ায় শব্দ তুলতে লাগলাম, আমার রাগ হচ্ছিল, কান্না পাচ্ছিল। অনেক মিনতি করার পর বোন দরজা খোলে এবং ভেতরে ঢুকে দেখি তার ঠোঁটে পাকা তেঁতুলের কষ আর চিবুকে চিনির দানা। আমি চাইতে বোন আমাকেও একটু দিল।
'করুণা! লালি!' মায়ের ডাক। আমাদের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। ভয় পেয়ে আমরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মা দরজা খোলার নির্দেশ দিচ্ছে। এক-পা এক-পা করে এগিয়ে দরজা খুলে মায়ের সামনে দাঁড়াতেই মা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে, তারপর হেসে ফেলে, কারণ আমাদের দুজনের মুখই নাকি বেড়ালছানার মতো দেখাচ্ছে। আমরা মায়ের কোমরের দুপাশে মুখ লুকোলাম, মায়ের কাপড়ে ঘষে ঘষে মুখ মুছে ফেলতে লাগলাম।
নারকোল গাছের পাতায় বাতাস লেগে শিরশির করে শব্দ উঠছে। পাতার ফাঁকে কাঁপছে চাঁদ। খোলা উঠোন পার হয়ে আমরা দালানে ফিরে এলাম । ডানদিকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি, আর বাঁদিকে একটা আবর্জনার ঘর। আমাদের ছোটবেলায় ওই ঘরে কেউ ঢুকত না। লণ্ঠন বা টর্চের আলোয় দেখতাম ঘরটার দেওয়ালে প্রায় লাখ লাখ আরশোলা তামাটে উজ্জ্বলতায় ঝুলছে। হয়ত এখনও ঝুলছে।
‘ঘরটা খুলব?” বোনকে জিজ্ঞেস করলাম।
'না না!' আগের দিনের মতোই ভয় পেয়ে আমার হাত ধরে বোন বলল।
দালানের সামনের দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে একটা কুলুঙ্গি ছিল, এখনও আছে। ওখানে প্রদীপ জ্বলত। এবং কুলুঙ্গির একটু ওপরে, দেওয়ালের ভেতর, এখনও ঢোকানো আছে পরপর কয়েকটা হুক, যাতে জামাকাপড় ঝোলানো হত । গুগুলোকে বলা হত খুঁটি।
‘লালির জামাটা খুঁটিতে টাঙিয়ে দাও না! নিচে ধুলো লাগছে,' রথের দিনে সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে বাবা মাকে বলল। মখমলে করা তুলতুলে নরম লাল জামাটা মা হাত বাড়িয়ে ওই হুকগুলোর একটায় ঝুলিয়ে দিতেই বোনের খুব কান্না পেল। সে আবার পরবে জামাটা। জামাটা নামানো হল। ওটা পরে বোন বায়না ধরল ওটার ওপর ওর শাড়িটাও পরবে। চার হাত কাপড়ে জরি লাগিয়ে মা বোনের জন্য একটা শাড়ি করে দিয়েছিল। ওই শাড়িটা সে পরতে চায়। ওর কান্না থামাতে মা বাক্স খুলে বার করে আনল শাড়িটা, তারপর শোবার ঘরে ঢুকে বোন নিজে নিজেই লাল ফ্রকটার ওপর শাড়িটা গায়ে জড়াল। বেরিয়ে আসতেই মা ও বাবার খুব হাসি ।
‘দেখো, দেখো লালিকে একেবারে কনে দেখাচ্ছে!”
“ওমা তাই তো!”
যা আশ্চর্যের, বোন একটুও লজ্জা পায়নি। আমাদের সকলের হাসিঠাট্টার ভেতরও সে নির্বিকার মনে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। মায়ের এত ভাল লাগে বোনের সেদিনের রূপ যে বাড়িতে ফটোগ্রাফার ডেকে এনে বোনের একটা ছবি তোলা হয়।
‘বোন, ওই খুঁটিতে তোমার লাল জামাটা টাঙানো হয়েছিল, মনে আছে? এক রথের দিনে?”
'হ্যাঁ, হ্যাঁ!' হাসতে হাসতে সে বলে। হেসে যেন প্রসঙ্গটাকে চাপা দিতে চাইছে।
‘তোমাকে কনের মতো সুন্দর দেখাচ্ছিল।'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ!' বোন জোরে জোরে হাসছে। ‘তোমার একটা ছবিও তোলা হয়।'
'হুঁ।’
“ছবিটা কোথায়?”
‘কে জানে !’
বোনের হাসি থামে। লণ্ঠনের বাতি কয়েকবার দপদপ করেই স্থির হয়ে গেল। ভয় হল, বুঝি নিভে যাবে। বাড়িটায় আবার গম্ভীর নৈঃশব্দ্য। দালানের একটা বড় থামের গায়ে হেলান দিয়ে আমরা পাশাপাশি বসে আছি।
'দাদা?'
'কী?'
‘ঘোড়া ঘোড়া খেলবে?'
‘হ্যাঁ,’ খুশি হয়ে আমি বলে উঠি। ছোটবেলায় এই খেলাটা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। খেলাটা হল বোনকে পিঠে বসিয়ে চারপায়ে হেঁটে দালান ও উঠোনে ঘুরে বেড়ানো ।
আমি হাঁটু মুড়ে চারপেয়ে হলাম। বোন পিঠে উঠে বসে। তারপর আমি আমার রোগা, বেঁটে, পাঁজর বার করা শরীরে আস্তে আস্তে নড়ে বেড়াতে লাগলাম ৷ লণ্ঠনের আলোয় আমাদের অদ্ভুত, কখনও দীর্ঘ, কখনও হ্রস্ব ছায়া পড়ছিল মাটির ওপর।
‘লাগছে না দাদা?' বোন রুদ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে।
‘একটু। কারণ এখন তো তুমি অনেক ভারি,' আমি বললাম রুদ্ধ গলায় ।
কথা না বলে পাশাপাশি বসে থাকলাম । চাঁদ কখন অদৃশ্য হয়ে গেল। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বোন চোখ থেকে জলের ফোঁটা ফেলে গেল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। আমি বাধা দিলাম না। দূরের থানা থেকে ভোর চারটের ঘণ্টা পড়ল এবং ওটার সঙ্গে তাল রেখে সিঁড়িতে বেজে উঠল খড়মের শব্দ।
“তোমরা কি আজই চলে যাবে?' বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
'হ্যাঁ। কারণ অফিস কামাই করলে ওরা আমাকে গালাগাল দিতে পারে।'
'আমরা কিন্তু সারারাত খুব মজা করেছি। একটুও ঘুমোইনি,' বোন বলল হেসে।
‘তোমরা যে ঘুমোতে পারবে না আমি জানতাম।'
ওপরে গিয়ে বোন আমাদের ঝোলা ও সাইডব্যাগ নিয়ে এল। খিড়কির দরজা দিয়ে আমরা বেরোনোর পর বৃদ্ধ আমাদের আবছা মুখদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
'অতীতে ফিরে গিয়ে খুব আনন্দ পেলে?” বৃদ্ধ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন। আমরা দুজনে চুপ ।
‘পেয়েছি, আবার পাইওনি। কষ্ট হচ্ছিল। বোন তো খানিকক্ষণ কাঁদেও।' ‘কিন্তু একেবারে গভীরতম অতীতে যদি যেতে পারত অর্থাৎ একেবারে উৎসে, যেখান থেকে আমরা সবাই যাত্রা শুরু করেছি, তাহলে আর কাঁদত না।’
‘কিন্তু যা মজার, সেখানে যেতে হলেও হাঁটতে হবে সামনের দিকে, পেছনদিকে নয়। তাতেও একদিন পৌঁছবে, কারণ যাত্রাটা যে বৃত্তাকার।”
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই চৌকাঠে দাঁড়ানো বৃদ্ধ এবং গোটা বাড়িটা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল আমাদের চোখের সামনে থেকে। জলরঙের ছবিতে জল পড়লে যেমন হয়, ফিকে হতে হতে এক সময় সব কিছুই সাদা হয়ে গেল।
বোনের হাত ছুঁয়ে আমি জানলায় দাঁড়িয়ে। দুজনের চোখেই গাঢ় অভিমান। বাইরে তুমুল বৃষ্টি হয়ে চলেছে।
লেখক পরিচিতি:
দেবর্ষী সারগী
কথাসাহিত্যিক। শিক্ষক
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।


1 মন্তব্যসমূহ
গল্পে সরাসরি দর্শন গল্পরস নষ্ট করে, আমার ব্যক্তিগত মতামত। ভালো লাগল।
উত্তরমুছুন