শাহাব আহমেদের ধারাবাহিক উপন্যাস: পেরেস্ত্রোইকা, মস্কো ও মধু ৫৬-৫৯ পর্ব



 ৫৬ তম পর্ব


নাস্তিয়ার মৃত্যু অভ্রকে ভীষণভাবে বিষণ্ণ করে। বেশ কয়েকমাস সে ব্যাবসার থেকে দূরে থাকে, সিঙ্গাপুরেও যায় না। কিন্তু কাছের বা দূরের কারো মৃত্যুই পৃথিবীর আবর্তন থামায় না। হাওয়া বয়, পাখি ওড়ে, সূর্য উঠে অস্ত যায়, নদীতে ঢেউ উঠে ঢেউ ফেটে পড়ে, আকাশে মুচকি চাঁদ হাসে এবং পুজিঁ ও প্রতারণার জগত উর্ণনাভের জাল বোনে।
অভ্রের বন্ধু ও স্থায়ী ক্রেতা ভিক্টর আসে।

“একটা মেয়ে মারা গেছে, অত বিষণ্ণ হবার কী আছে? বৌও নয়, বান্ধবীও নয়। বাদ দে ওসব। বড় ব্যবসা আছে।”

সে খুলে বলে।

এত বড় সুযোগে কঙ্কালও কফিন ফেলে দৌড়ায়।

অভ্রকে দাওয়াত দেয় ওর বাসায়। ভিক্টরের স্ত্রী উষ্ণ ও প্রাণবন্ত। বহুবার দেখা হয়েছে এবং অভ্রকে সে পছন্দ করে। তার জন্য জন্য ফুল ও উপহার নিয়ে উপস্থিত হয়। পরিচয় হয় ভিক্টরের মামা শ্বশুর মিখাইল আন্দ্রেইভিচের সাথে। তেল কোম্পানির বড় কর্মকর্তা। চমৎকার, টিপটপ, ভদ্রলোক। প্রাক্তন পার্টিসদস্য, কাজানের ক্ষমতার করিডোরে তার পরিচিতি ও যোগাযোগ অনেক। মিখাইল আন্দ্রেইভিচের তেলের কোম্পানি অনেকগুলো কম্পিউটার কিনবে। অভ্র সেই ব্যবসা করতে ইচ্ছুক কি না?

প্রথমে টেস্ট হিসেবে কিনবে ২৫০টি কম্পিউটার, ১.৫ মিলিয়ন ডলারের কন্ট্রাক্ট। যদি সে সময় মত ডেলিভারি দিতে পারে এবং শর্ত রক্ষা করে তাদের খুশি রাখতে পারে তাহলে আরও অর্ডার পাবে।

“গস্ জাকাজ” বা রাষ্ট্রিয় সংস্থার সাথে ব্যাবসা হল অন্য স্তরের ব্যাবসা। সবাই সেই সুযোগ পায় না। কিছুদিনের মধ্যে অভ্র চুক্তি সাইন করে। প্রতি কম্পিউটারের দাম ৬০০০ ডলার, ১০০০ ডলার ক্যাশ ব্যাক, ভিক্টরের জন্য ৫০০, ডেলিভারি সহ খরচ ২০০০ ডলার, লাভ ২৫০০।

বিশাল একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হলেও অভ্রের ভয় কাটে না। অংকটা অনেক বড় ওর জন্য। সে নিজেই প্রস্তাব করে পেমেন্ট ও ডেলিভারি কয়েক কিস্তিতে করার। প্রথম কিস্তির টাকা দিয়ে সে প্রথম পার্টি কম্পিউটার কেনে এবং ডেলিভারি দেয়। ২য় এবং ৩য় কিস্তিও ডেলিভারি হয় সময়মত। ৪র্থ কিস্তি কাস্টমসে আটকে যায়। নতুন কী আইন হয়েছে যার ফলে মাল আটকা পড়েছে। সময় পার হয়ে যায় কিন্তু সে ডেলিভারি দিতে পারে না। প্রতিদিনের দেরির জন্য ভর্তুকির স্টপওয়াচ শুরু হয়। কাস্টমসেও টাকা পে করতে হয়। শেষপর্যন্ত মাল বের হয়ে আসতে আসতে ৬০ হাজার ডলার জড়িমানার হিসাব আসে। অভ্র বিনাবাক্যে জড়িমানা পে করে দেয়। ৬০ হাজার ডলারের প্রফিট কমে গেলেও, লাভ হয় তার বিশাল এবং অন্যপক্ষের বিশ্বাস দৃঢ় হয় তারপ্রতি এবং একের পর এক কন্ট্রাক্ট আসতে থাকে, তার সাথে প্রচুর সবুজ নোট!
 
ভিক্টরও লাভবান হয়। ভিক্টর পোড় খাওয়া মানুষ। সে জীবন দেখেছে অভ্রের চেয়েও বেশি, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ওর জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা কাজান শহরে। রাশিয়ার ইতিহাসের অনেকগুলি ক্রান্তিকাল পার হয়ে আসা শহর। চিঙ্গিজ খানের নাতি বাতঈ প্রতিষ্ঠিত পরাক্রমশালী রাষ্ট্র গোল্ডেন হোর্ডের রাজধানী ছিল কাজান। এখানে বসেই মঙ্গোলরা রাশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এবং ক্রিমিয়া শাসন ও লুণ্ঠন করতো।

এখানেই সারা রাশিয়ার খণ্ড খণ্ড রাজ্যগুলোর শাসকদের আসতে হতো খানদের কুর্নিশ করে রাজত্বের বৈধতার সার্টিফিকেট নিতে। খানের অনুমোদন ছাড়া কোনো রাজাই রাজা ছিলো না। ১৫২৬ সালে ইভান গ্রজনি (আইভান দি টেরিবল) কাজান দখল করে মঙ্গোল শাসনের অবসান ঘটান। ঐক্যবদ্ধ রাশিয়াকে মুক্ত করেন অন্য কাউকে কুর্নিশ করার অপমান থেকে।

বিপ্লব সম্পন্ন হবার পরে ১৯১৮ সালে জেনেরাল কলচাক এই শহরে বসে স্বপ্ন দেখেন এক ধাক্কায় মস্কো দখল করে নেবার। বিপ্লবের সামনে দাঁড়িয়েছিল বিশাল শেক্সপিয়রিয়ান প্রশ্ন, to be or not to be. Not to be ছিল খুবই অদূরবর্তি এবং বাস্তব। বিপ্লব তার, ট্রটস্কি বর্ণিত “নীচুতম বিন্দু”টিতে পৌঁছে গিয়েছিল। লালবাহিনী ছিল ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, শীতার্ত ও ছত্রভঙ্গ। ঠিক তখনই কাজানের অদূরে “স্ভিয়াগা” ও “ভোলগা” নদীর সঙ্গমস্থলে ”স্ভিয়াস্ক” নামের ছোট্ট লোকালয়ে এসে থেমেছিল ট্রটস্কির যাদুকরি ট্রেন।

সেই থেকে ঘটনার মোড় নিয়েছিল অন্যদিকে। এই ট্রেন যেখানেই গিয়েছে কমবেশি সেখানেই নির্ধারিত হয়েছে সাদাদের পরাজয়। বিপ্লবের সময় ট্রটস্কি সাময়িক সরকারের হাত থেকে শুধুমাত্র ক্ষমতাই দখল করেননি, তাঁর ছিল লৌহদৃঢ় ডিসিপ্লিন ও প্রজ্ঞা। বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে কোনো ত্যাগ, যে কোনো নিষ্ঠুরতা ও যে কোনো অন্যায় করার প্রস্তুতি। শত্রু গুলি ছোড়ার আগে গুলি না ছোড়ার মানবকতায় তিনি বিশ্বাস করতেন না। সময়টা ছিল অসম্ভব রক্তারক্তির, একপক্ষের জন্য মৃত্যু ছিল অবধারিত। মস্কোতে বসে ক্ষমতা দখলের জাল না বুনে, ট্রটস্কি ব্যস্ত ছিলেন সেই ক্ষমতাকে সংরক্ষণ করার, পতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার। নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার চেয়ে বিপ্লবের ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন ফ্যানাটিক রকমের বেশি। ক্ষমতার স্থান মস্কো, যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এটুকু বোঝার মত পরিণত ট্রটস্কি ছিলেন, কিন্তু সম্ভবত ধারণা করেননি যে তার বিপ্লবী কমরেডরা তাকে বিপ্লবের ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে উল্টো ইতিহাস রচনা করবে যে, তিনি সুবিধাবাদী, লেনিন ও বিপ্লবের শত্রু এবং সারাবিশ্বের কমরেডরা প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাস করবে। 
 
এ কথা সত্য যে, অসম্ভব রক্তমাখা ছিল তার হাত। এই “স্ভিয়াস্কে”ই লাল বাহিনীর মধ্যে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তিনি প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন নৃশংসতম শাস্তি। লালবাহিনীর মধ্যে যারা নেতৃত্বের প্রতি অনমনীয় ও বিদ্রোহী ছিল, তাদের প্রতি দশজনের ১ জনকে পাঠিয়েছিলেন ফায়ারিং স্কোয়াডে। তার হাত কাঁপেনি। নিজে গুলি চালিয়েছেন হাত বাঁধা নিরস্ত্র মানুষগুলোর দিকে।

“বিপ্লব হচ্ছে মানুষ ও মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় খাদক, সে সবচেয়ে সাহসীদের হত্যা করে, আর কম দৃঢ়দের মনোবল ভেঙ্গে দেয়।” ট্রটস্কি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন।
 
সেই কাজান শহর বর্তমানে তাতারস্থানের রাজধানী। ৭০-৮০ র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্য যে কোনো শহরের মতই সমাজতন্ত্রের জয়-জয়কার ছাড়া অন্য কিছুই শোনা যেতো না এই শহরে। কোনোকিছু শোনা না-যাওয়া কোনো কিছু না-থাকা নয়। সরকারী ভাষ্যমতে অন্য যে কোনো শহরের মতই সেখানেও কোনো অপরাধের জগত ছিল না। আর যেহেতু অপরাধ ছিলো না, তাই অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করার কোনো আইনও ছিল না। শুধু ওখানেই নয়, সারা সোভিয়েত ইউনিয়নে। ক্ষমতার বড় বৈশিষ্ট্য হল, যে সমাজই হোক না কেন, সত্য গোপন করা।

আদর্শ এখানে কোনো ব্যাপার নয়। রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে, ঠাণ্ডা মাথায় মিথ্যা কথা বলে এবং মার্কস-লেনিন যে স্বপ্নই দেখুন না কেন, রাষ্ট্র কোনোদিনই রাষ্ট্রহীন সমাজের দিকে যায় না। ভিক্টর এই জিনিসগুলো তার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই জানে।

যে কোনো শহরের মতই কাজানও বিভক্ত ছিল এলাকা ভিত্তিক ছোট ছোট অপরাধ চক্রে। ৭০ এর দশকে এসে সারা শহরের গরমজল সরবরাহী “তেপ্লো কন্ট্রোল” ফ্যাক্টরির আশেপাশে “তিয়াপ লিয়াপ” নামে একটি চক্র গড়ে ওঠে। এলাকার ২ টি স্কুল থেকে আসে এর সদস্যরা।

প্রতিষ্ঠাতা তিনজন। জাভদাত হান্তিমিরভ বা “ঝাবদা” একজন অসম্ভব শক্তিশালি, ক্ষমতা লোভী, নির্দয় ও ক্ষমাহীন মুষ্ঠিযোদ্ধা। কঠোর শৃংখলা ও অপরাধ জগতের নিয়ম মেনে চলা একজন মানুষ। সের্গেই স্ক্রিয়াবিন বা স্ক্রিয়াবা ঝাবদার স্কুলবন্ধু এবং এই গ্রুপের মগজ। এক ধনী (!) ইহুদি পরিবারের ছেলে, অসম্ভব বুদ্ধিমান, কাজান পেডাগগি ইনস্টিউট শেষ করেছে। সের্গেই আন্টিপভ বা আন্টিপ অন্য এক মুষ্ঠিযোদ্ধা। চুরি এবং গুণ্ডামি করার অপরাধে সে ইতিমধ্যেই জেল খেটে এসেছে। জেলে বসে অপরাধ জগতের বিভিন্ন মানুষের সাথে মিশে তাদের ট্যাকটিস এবং ভ্রান্তিগুলো সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, সোভিয়েত আইন রক্ষাকারী সংস্থাগুলো কিভাবে কাজ করে এবং তাদের সবলতা ও দুর্বলতাগুলো কোথায়, তাও জানতে পেয়েছে সেখানে বসেই। সোভিয়েত জেল ব্যবস্থার মূল শ্লোগান ছিল একজন অপরাধীকে সংশোধিত করে সমাজে ফেরত আনার। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আন্টিপ এই ভিন্ন বাস্তবতায় একজন সামান্য চোর হিসেবে ঢুকে সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সেরা দস্যুতে পরিণত হবার জ্ঞান নিয়ে বের হয়ে আসে। 
 
প্রথমে এরা ফ্যাকটরির বেসমেন্টে একটি ব্যায়ামাগার তৈরি করে। ছেলেরা ব্যায়াম করবে এতে সবার খুশি হবারই কথা। এবং সবাই খুশি হয়। এতদিনে একটা ভালো কাজ হচ্ছে। দলে দলে ছেলেরা ব্যায়াম করে শক্তি অর্জন করতে থাকে। এরপরে এদের পরীক্ষা নেয়া হয়। ঝাপদার হিংস্র ঘুষি খেয়ে যে পড়ে না গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাকে তিয়াপ লিয়াপে গ্রহণ করা হয়। এভাবে গ্রুপে প্রায় ৩০০ জন সদস্য দাঁড়ায়।

শহরে ত্রাস সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে ১৯৭৬ সালে তারা “উরিৎস্কভা” হলে এক বড় কালচারাল অনুষ্ঠানের নাচে অংশগ্রহণকারী নির্দোষ যুবক যুবতীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্দয়ভাবে মারধর করে, জিনিসপত্র ভাংচুর করে মিলিশিয়া আসার আগেই পালিয়ে চলে যায়। এটি ছিল তাদের ক্ষমতার প্রথম প্রকাশ্য প্রদর্শনী। তারা রাস্তাঘাটে নিরীহ লোকজনকে মারপিট করতে শুরু করে। যেই সমাজ নতুন মানুষ তৈরি করার এতবড় দায়িত্ব নিয়েছে বিশ্ববাসিকে উঁচু কন্ঠে ঘোষণা দিয়ে, দেখা গেল, পুরানো পৃথিবীর মত তারাও এই ধরনের মানুষ সৃষ্টি করতে সক্ষম, যারা বিনাকারণে মানুষকে আঘাত ও উৎপীড়ন করে। তারা গৃহে গৃহ চুরি শুরু করে। রাষ্ট্রিয় মালিকানাধীন যে সব সংস্থাগুলোতে ক্যাশ লেন দেন হয়, যেমন দর্জিদোকান, রেস্টুরেন্ট বা অন্যান্য দোকানে কাজ করে এমন লোকজনের কাছ থেকে চাঁদা তুলতে শুরু করে। যেদেশে অফিসিয়ালি পতিতা নেই, সেখানে নিরবয়ব পতিতারাও জবরদস্তিমুলক চাঁদার শিকার হয়। চাঁদা না দিলে তাদের ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে যায়, মারপিট করে, ধর্ষণ বা হত্যায়ও পিছপা হয় না। ভুক্তভোগীরা পুলিশে তথ্য দিতে অস্বীকার করে কারণ, তার শাস্তি ছিল বড় কঠিন।

এদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কোনো আইন না থাকার কারণে প্রথমদিকে মিলিশিয়াও অসহায় বোধ করে। ব্রেজনেভের আপাত শান্তির সময়ে, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিয়াপ লিয়াপের কার্যক্রম একটি নতুন টার্মের জন্ম দেয়ঃ কাজান ফেনোমেনন, যা সারা সোভিয়েত ইউনিয়নে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লেও মিডিয়া নিশ্চুপ থাকে।

ভিক্টর এই তিয়াপ লিয়াপ স্কুলের ছাত্র। ৮০ সালে যখন এই গ্রুপের নেতাকর্মিরা ধরা পড়তে শুরু করে, সেও ধরা পরে, ২ বছর জেল খাটে। ৮২ সালে ঝাবদা ফায়ারিং স্কোয়াডে যায়, বাকিরা বিভিন্ন সময়ের জন্য শ্রীঘরে আসন্ন পেরেস্ত্রইকার নিশানবরদার হবার ট্রেইনিং প্রাপ্ত হয়। জেল থেকে ছাড়া পাবার পরে ভিক্টর, যদিও কাজটি প্রায় অসম্ভব, অপরাধ জগত থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়। পড়াশুনা শেষ করে মেকানিকাল ইন্জিনিয়ারিং নিয়ে, বিয়ে করে তারই এক ক্লাশমেটকে। সেও কাজানের মেয়ে।

চাকরি করে কিছুদিন। ২ টি ছোট বাচ্চা। কিন্তু শিগগিরই পেরেস্ত্রইকার কামড় অনুভব করতে

থাকে পকেটে। বুঝতে পারে শুধু চাকরির অর্থে বাঁচা সম্ভব নয়। আস্তে আস্তে ব্যবসা শুরু করে। বিদেশীদের কাছ থেকে কম্পিউটার কিনে বিক্রি করে, কখনও মস্কোতে, কখনও কাজানে। পরিচয় হয় অভ্রের সাথে। অভ্র ওকে অনেক ব্যবসা দেয়, বিশ্বাস করে। সময় আসে একটু বড় মাপের ব্যবসা করার, কিন্তু সেই ব্যবসার চেইনে বাধ্যতামূলকভাবে একজন বিদেশীকে থাকতে হয় যার মাধ্যমে টাকা বাইরে পাঠিয়ে আবার ফেরত আনা যায়। অভ্র হয় সেই বিদেশী।

তেল কোম্পানির সাথে কাজ করে প্রচুর অর্থ কামাই হচ্ছে তার, সবুজ সবুজ নোটে। ওর গ্রামেও এত সবুজতা নেই, যতটা আছে তার বিদেশের ব্যাংকে। সোভিয়েত ব্যাংকে রাখা নিরাপদ নয়, রাখতে হয় বাইরে। প্রেস্টিজ বেড়েছে, এম্বাসি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। 
 
কিন্তু সে নষ্ট-মাথা নষ্টালজিক গ্যাঁড়া। তার অবস্থানে এসে যে সব চিন্তা তাকে ছেড়ে যাবার কথা, যায়নি। পারিবারিক রাজনৈতিক বাম জিন, যা খুব সহজে পচে, ওর মধ্যে এখনও পিট পিট করে চোখ মেলে। বাবার কথা, মায়ের কথা,দাদুর কথা মনে পড়ে। তারা সারাজীবন উৎসর্গ করেছেন এই দেশের জন্য। পদ্মা যমুনা ধানসিঁড়ি নদীর দেশ। বছর দুয়েক আগে দেশে গিয়ে মাকে পেয়েছিল সম্পূর্ণ একা।মহিলা পরিষদের কাজে আর যেতে পারে না।ছোট বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।

দেখা হয়েছিল স্কুলের মোসাদ্দেক স্যারের সাথে। বাবা যখন এই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন সেই ষাটের দশকে, তখন তার ছাত্র ছিলেন মোসাদ্দেক স্যার। বাবার প্রভাবেই প্রগতিশীল চিন্তাধারার সাথে যুক্ত হন। স্বাধীনতার পরে খুব সক্রিয় রাজনীতি করেন কিন্তু পচাত্তুরের পরে যখন সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়, আস্তে আস্তে সংসারে জড়িয়ে পড়েন। ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। সেই থেকে স্কুলে পড়ান। জনসেবা করেন। সৎ লোক বলে সুনাম যথেষ্ট। বাম রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও, বামপন্থীই।

স্যার, কেমন আছেন?

কে? অভ্র? কবে আইছো?

অনেক কথা হয় স্যারের সাথে। বাবার কথা ফিরে ফিরে আসে। অনেক কিছু করেছেন তিনি মানুষের জন্য। অভ্র কি পারে না পিতার পথে হাঁটতে?

না, পোলাপান যখন দেশ ছেড়ে চলে যায়, মন থেকে টেনে-হিঁচড়ে উপড়ে ফেলে যায় দেশ।

এমন কম দেখেননি তিনি।

অভ্র চুপ করে থাকে। বলার কিছু নেই। পুরনো মানুষগুলোর পুরনো বোধ, ওর মা একই স্বরেই কথা বলে। দেশকে সে মন থেকে উপড়ে ফেলেনি কিন্তু তা প্রমাণ করার জন্য বিদেশে বসে কী সে করতে পারে? টাকা তার আছে কিন্তু টাকার দম্ভ তার নেই।

দেশে চইলা আসো, মানুষের লিগ্যা কাম করো, তোমার পরিবার পারছে, তুমি পারবা না কেন?

আগে রাজনীতিতে নীতি ছিল, এখন কী আছে? প্রশ্নটা ঠোঁটে এসে যায় কিন্তু সে গিলে ফেলে।

নিরস চোখে তাকিয়ে থাকে মাঠের দিকে। একজন কৃষক লাঙল ধরে গরুর পেছনে পেছনে হাঁটছে। একা একটা তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে দিগন্ত বিস্তীর্ণ মাঠে। রোদ খা খা করছে, আকাশে একছটা

মেঘ নেই।

কিচ্ছু নেই। আগের মানুষগুলো ছিল স্বাপ্নিক এবং তারা চলে গেছে মাঠ উন্মুক্ত করে।

স্কুলের জন্য কিছু ট্যাকা দিয়া যাও।

অভ্র দেয়।

দেশে আসবা না বুঝলাম, গ্রামের মানুষের জন্য কিছু কর।

কী করতে পারি বলেন, আমি থাকবো।

মস্কো ফিরে যায়, কিন্তু সে ফিরে আসে উৎসের কাছে। যেই আদর্শের জন্য তার পিতা সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছে, সেই আদর্শের কবরস্থানে বসে সে অর্থ কামাই করে এবং উদারহাতে পাঠায় মোসাদ্দেক স্যারের কাছে। টাকাটা ওর জন্য বড় কিছু নয়, কিন্তু টাকা ওকে পছন্দ করে। ওর দেয়া টাকা স্যার মানুষের জন্যই খরচ করেন। তবে সময়ে তার বাড়িতেও ইট-সুরকির বিল্ডিং ওঠে, সঙ্গী সাগরেদ বাড়ে। অচিরেই এটা পরিস্কার হয় যে, স্যার এতকাল যা করে এসেছেন, তিনি তার চেয়ে বেশি করতে পারেন। আরও বছর খানেক গেলে বুঝতে পারেন, কাজ বেশি করতে গেলে সরকারি দলের নির্বাচিত নেতা হওয়া ছাড়া গতি নেই। এলাকার নেতা ফজল ব্যাপারি ক্ষমতাবান হলেও দুর্নাম অনেক, ঢাকায় বিকল্প প্রার্থীর খোঁজ চলছে। এবং সেখানে তার পথ-ঘাট পরিচিত হয়েছে। স্যার ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

অভ্র অনুধাবন করে যুগ বদলেছে, পিতারা যে রাজনীতি করে গেছেন তা সফল হয় নাই, তাদের কর্মকাণ্ড দেশের মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে নাই বরং ব্যক্তির ইগো আদর্শের দ্বন্দ্বে পরিণত হয়ে ভাঙতে ভাঙতে তাদের রাজনীতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দেশ যে আজ নষ্টদের দখলে চলে গেছে তার দায়-দায়িত্ব থেকে পিতাদের রেহাই দেয়া যায় না। অবাস্তব স্বপ্নচারীতা ও বিদেশের অন্ধ অনুকরণ স্বদেশের মুক্তি আনে না। সৎ রাজনীতি নেই, মন্দের ভালো যারা, তাদের পেছনে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। সে মোসাদ্দেক স্যারের সিদ্ধান্তকে সাপোর্ট করে এবং তার নির্বাচনে টাকা দেয়। সে নিশ্চিত তার এলাকার মানুষের মঙ্গলের জন্য স্যারের বিকল্প নেই।

কিন্তু প্রতিপক্ষ শক্তিশালী। তাদের টাকার শক্তি যেমন, পেশি শক্তিও কম নয়। যতই নির্বাচন এগিয়ে আসতে থাকে, সরকারী দলের প্রার্থী হয়েও স্যার পিছিয়ে পড়তে থাকেন। হাওয়া তার পাল ছেড়ে প্রতিপক্ষের দিকে ধাবিত হয়।

কারণ আছে। ফজল ব্যাপারি নমিনেশন না পেয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। গোপনে সে প্রতিপক্ষকে সমর্থন করছে। তার দল থেকে একজন প্রাক্তন কমিউনিস্টের জিতে আসা মানেই তার রাজনীতি শেষ।

সে কলকাঠি নাড়াচ্ছে। কিন্তু মোসাদ্দেক স্যার অভিজ্ঞ মানুষ, তাকে রাজনীতি শেখাতে হয় না।

সে জানে কী করলে হাওয়া আবার তার পালে ফিরবে। এবং নির্বাচনের ১ সপ্তাহ আগে ঘটনাটি ঘটে। স্যারের ডান হাত শরীফ সারাদিন মিছিল মিটিং ও নির্বাচনী প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে রাতে স্যারের বাড়িতে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খায়, তারপরে বাড়ি ফেরার পথে অজ্ঞাত ঘাতকের হাতে নিহত হয়। এত বড় আঘাত স্যার মেনে নিতে পারেন না। ভেঙে পড়েন, কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রার্থীই যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তিনি অভিজ্ঞ কণ্ঠে খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। সরকারী পার্টির প্রার্থী তিনি, পুলিশ আসে। প্রতিপক্ষের প্রার্থী গ্রেফতার হয়। যদিও সে জামিনে বের হয়ে আসে পরের দিনই, কিন্তু তার জেতা ইলেকশন ভরাডুবিতে শেষ হয়।

স্যার জয়ী হয়ে আসেন।

যোগ্য ব্যক্তি, সৎ, ঢাকায় যোগাযোগ ভালো, তিনি প্রতিমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেন।



৫৭ পর্ব


নাস্তিয়া নেই কিন্তু তার শহর বেঁচে আছে, থেমে যায়নি পেতিয়াদের জীবন নাট্য। রিজানে হত্যাযজ্ঞ তুঙ্গে ওঠে এবং কিছুদিনের জন্য স্তুকানভের গ্রুপ চুপচাপ থাকে। এই সুযোগে শহরের অন্য গ্রুপের নেতা খ্রেনভ, যে এতদিন তেমন কোনো সন্মানজনক অবস্থানে ছিলো না, নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য চিচেন মাফিয়া নিয়ে আসে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই স্তুকানভের লোকজন খ্রেনভের কপালের খোলে ৯টি বুলেটের ছিদ্র করে দেয়। তার গ্রুপ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং চিচেন গ্রুপ, যা রাশিয়ার অন্যান্য শহরগুলোকে নতজানু করে রেখেছে, রিজান শহর ছেড়ে চলে যায়।
 
মস্কোতে শুরু হয় “ট্রিপল এম” পন্জি স্কিম ও ফাইনানসিয়াল পিরামিডের গণপ্রতারণার মহামারি। সের্গেই মাভরোদি নামে মস্কোর এক ব্যবসায়ির এই কোম্পানি। তিনটি “এম” হচ্ছে তার, তার ভাই এবং স্ত্রীর নামের আদ্যক্ষর। টিভির প্রতিটি চ্যানেলে কিছুক্ষণ পর পর “লেওনিয়া গলুবকভ” নামে এক সাধারণ যুবক কিভাবে কোনো কাজ না করে, ঘরে বসে থেকে, শুধু “ট্রিপল এম” কোম্পানিতে টাকা ইনভেস্ট করে, তার স্ত্রীকে দামি ওভারকোট এবং জুতা কিনে দিতে সক্ষম হয়েছে, তার বিজ্ঞাপন চলে। রাশিয়ার বিজ্ঞাপন ব্যবসার জনক এই লেওনিয়া গলুবকভ। রাশিয়ার নব্য লেনিন।

ঘরে ঘরে তার নাম।

পাহাড়ি ধ্বসের মত তীব্র গতিশীল বিজ্ঞাপনের জালে ধরা পড়ে মানুষ। কিছুদিন পর পরই এই কোম্পানির সুদের হার ও প্রফিট মার্জিন বাড়ানো হয় এবং প্রতারণার শীর্ষ সময়টাতে তা মাসে ২০০% পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়। সারা দেশের শহরে শহরে এই কোম্পানির শাখা খোলা হতে থাকে। বলশেভিক পার্টি ও রেড আর্মি রাশিয়া দখল করেছিল যুদ্ধ ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। মাভরোদির পায়ের কাছে রাশিয়া নিজেই লুটিয়ে পড়ে তার বিশাল দেহ নিয়ে।

যেহেতু প্রতিদিনই প্লাবনের মত লোক আসে তাদের টাকা জমা দিতে, কোম্পানি পরের মাসের সংগৃহীত টাকা থেকে আগের মাসের প্রতিশ্রুত সুদ পরিশোধ করে। ফলে লোকজন সত্যিই টাকা অর্জন করতে থাকে এবং তারা আরো বেশি বেশি টাকা জমা দেয়, আরো বেশি লোক ছুটে আসে। ঘটনা ঘটতে থাকে সবার চোখের সামনে। পুকুর চুরি নয়, গণতন্ত্রের আড়ালে মহাসাগর চুরি। ক্ষমতায় তারাই, যারা ৭০ বছর শাসন করেছে, প্রায় প্রতিটি প্রাক্তন কমিউনিস্ট এখন ডেমোক্রাট এবং লাস্যময় নব্য ব্যবসায়ি। মাভরোদিও তাদের একজন।
 
তবে সে রাশিয়ায় এই পিরামিড প্রতারণার জনক নয়। সে শুধু পুরানো একটি ব্যবসাকে পুনরায় আবিস্কার করেছে। জনক হল রিজানের ইভান রিকভ। উনিশ শতকে যখন রুবলের দাম ছিল সোনার দাম, সে ১৫ বছর ধরে রিজানের লোকজনকে প্রতারণা করে সেই সময়েই ১৩ মিলিয়ন রুবল হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়। ১৮৮৪ সালে শেষপর্যন্ত সে ধরা পড়ে এবং তাকে সাইবেরিয়ায় পাঠানো হয় কিন্তু জনগণ টাকা ফিরে পায় না।

মাভরোদি সেই ব্যবসাটিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করে। সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠে আরও অসংখ্য পিরামিড কোম্পানি। এক কোম্পানির বিজ্ঞাপণ অন্য কোম্পানির চেয়ে আরও বেশি রঙ্গিন ও আকর্ষণীয়। এদের রং বেরংয়ের ‘সোনার হরিণ ও রূপার ড্রাগণের’ প্রতিশ্রুতিতে লোকজনের মাথা ঘুরতে থাকে। অবশ্য তাদেরই, যাদের মাথা এবং টাকা রয়েছে।
 
রিজানের স্তুকানভের পিরামিড “পিকো”, জনগণের থেকে ১৭ বিলিয়ন রুবল ধার নেয়। প্রথমে ঘড়ির কাঁটার মত সঠিক সময়ে সুদের টাকা পরিশোধ করলেও, আস্তে আস্তে সুদ পরিশোধে ব্যাত্যয় ঘটতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই “পিকো” সুদ ও আসল ফেরত দিতে অক্ষম হয়। টাকা তখন কোম্পানির একাউন্টে নয়, স্তুকানভের পকেটে।

শুরু হয় গণবিক্ষোভ।

“পিকো”র অফিস ও শাখাগুলো ঘেরাও করে বিক্ষুদ্ধ জনগণ। পিকোর ডাইরেক্টর স্তুকানভের কাছে ছুটে আসে। ওরা ডিনার করে একসাথে। স্তুকানভ পিঠ চাপড়ে আশ্বাস দেয়, চিন্তার কারণ নেই, শিগগিরই টাকা চলে আসবে, সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। স্তুকানভ পরিবেশিত ভদকা ও সুস্বাদু ক্যাভিয়ারের ডিনার সেরে ডাইরেক্টর বাসায় পৌঁছে এলিভেটরের সামনে সমাধানের সাক্ষাত পায়।

স্তুকানভ পাঠিয়েছে।

পেটে খাদ্য তখনও হজম হয় নাই, কয়েকটি বুলেট মগজে …

কমরেড স্তালিন বলতেন, “নিয়েৎ চেলাভিয়েকা, নিয়েৎ প্রবলেম”- মানুষ নাই তো সমস্যাও নাই। এখন ডাইরেক্টর নাই তো, কোম্পানি নাই। আর কোম্পানি না থাকলে টাকা পরিশোধ করবে কে?

বলশেভিকরা একদিন কলকারখানা ব্যাংক জমি ইত্যাদি মালিকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে জনগণকে দিয়েছিল, এখন ইতিহাস তার সংশোধন করছে। জনগণের হাত থেকে তা পুনরুদ্ধার করে স্তুকানভ মাভরোদিদের হাতে ফেরত দিচ্ছে।
 
তবে মাভরোদিকে শেষ পর্যন্ত ধরা হয়। কারণ সে চুরির পবিত্র আইন লংঘন করার দুঃসাহস দেখায়। সে কমরেডদের সাথে লুণ্ঠিত অর্থ ভাগাভাগি করতে অস্বীকার করে। তার বিরুদ্ধে হঠাৎ “আয়কর দুদক” সক্রিয় হয়ে পড়ে। বলে, মাভরোদি ৪৯.৯ বিলিয়ন রুবল কর ফাঁকি দিয়েছে।

সে বাহাস করে বলে, “এটা মিথ্যা কথা।”

কিন্তু রাষ্ট্র কখনই, কোনো কালেও মিথ্যা কথা বলে না। সুতরাং সমস্ত মিডিয়ায় ঢাক ঢোল বাজে।

“ট্রিপল এম” এর স্টকে ধ্বস নামে। মাভরোদি জেলে যায় এবং ভোজবাজির মত মুহূর্তে নি:স্ব হয়ে যাওয়া লাখো লাখো মানুষ তার মুক্তি চেয়ে মিছিল করতে শুরু করে। তাদের ধারণা যে, মাভরোদি নয়, তাদের সরকার দুর্বৃত্ত। মাভরোদি মুক্তি পেলে তারা টাকা ফেরত পাবে। ১ কোটি মানুষকে প্রতারিত ও নিঃস্ব করে জেলে বসেই তার পুনর্জন্ম হয়, সে রাশিয়ান দুমায় গণতান্ত্রিকভাবে(!) এম.পি নির্বাচিত হয়ে আসে। মাত্র কিছুদিন আগেই আইন পাশ করা হয়েছিল যে, এমপিরা শাস্তির আওতাধীন নয়।
 
কিন্তু রিজানে দুঃসময় চলতেই থাকে। স্তুকানভ আস্তে আস্তে পাইপ হাতে গোঁফওয়ালা কমরেড হয়ে বসে। বেজির লেজের মত মোটা গোঁফ তার। তারই আদেশে শহরে বড় বড় হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে। মাগিলনিকভ পালিয়ে যায়। কিন্তু মস্কোতে তাকে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়। অপ্রতিহত ও তর্কাতীত নব্য ডিক্টেটরশিপ শুরু হয় রিজান শহর ও তার আশেপাশে। ওরা বড় বড় সংস্থাগুলো হস্তগত করে। ছোট বড় সব কোম্পানিকে বাধ্য করে প্রতিমাসে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দিতে। এমনকি লোকসানে চলা রাষ্ট্রীয় সংগঠনও রেহাই পায় না। এক ফ্যাক্টরির ডাইরেক্টর বলে, “মালপত্র নেই, বেচা-কেনা নেই, তোমরা টাকার পরিমাণটা একটা কমাও।”

“তাই? আচ্ছা দেখি।”

ওরা ডাইরেক্টরের ১৭ বছরের ছেলেকে ধরে এনে তার সামনেই হত্যা করে। ভয়, ভয় হলো সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ওরা নয়, ওদের পূর্বসুরীরা এই শক্তিশালী হাতিয়ারের স্রষ্টা। ওদের আদেশ অমান্য করা বা অবাধ্য হবার সাহস কারো নেই।

করদাতার সংখ্যা শেষপর্যন্ত এতই বাড়ে যে ঘরে ঘরে গিয়ে টাকা তোলা ওদের সময়ের অপচয় মনে হয়। তাছাড়া ইতিহাসও বলে ”মঙ্গোলরা” কর আদায় করতে যায় না, করদ যারা তারাই কর নিয়ে এসে পদচুম্বন করে যায়। রিজান শহর তো মঙ্গোলদের অধীনেই ছিল। নব্য মঙ্গোলরা ঘোষণা দেয় নির্দিষ্ট দিনে শহরের স্ট্যাডিয়ামে চাঁদা গ্রহণ করা হবে। সময়মত টাকা নিয়ে না এলে রোমহর্ষক সাজার ব্যবস্থা করা হয়। জিপসি এক খুদে ড্রাগ ব্যবসায়ি টাকা দিতে অসামর্থ্য হলে লোকসমক্ষে তাকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে মারধর ও ধর্ষণ করে। এভাবে রিজানে ফিরে আসে বিশাল বিশাল অর্জন ও উল্লম্ফনের রাশিয়ার বিশ ও ত্রিশের দশক।

“পৃথিবীতে সব কিছুই ফিরে ফিরে আসে” - সের্গেই ইয়েসিনিন বলেছিলেন।
 
স্তুকানভের লোকজন ফল্স পোস্টাল অর্ডার দেখিয়ে ৯০০ মিলিয়ন রুবল অপহরণ করে। এরপরে ওদের ১৯ বিলিয়ন রুবল চুরির একটা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সফল হলে সোভিয়েত ইতিহাসে এটা হতো সর্ববৃহৎ চুরি। এরপরে তারা বিভিন্ন শহরের অপরাধ জগতের ভাড়াটে হিসাবে মৃত্যুদূত রপ্তানি করতে শুরু। কন্ট্রাক্ট কিলিংএ তারা অভূতপূর্ব দক্ষতা ও নান্দনিকতা প্রদর্শন করে, কাজ শেষ করে ওরা নীরবে প্রিয় রিজানে চলে আসে। গাড়ি কারখানার “তলিয়াত্তি” শহর তাদের পদচারণে কেঁপে কেঁপে ওঠে।
 
এরপরে ওরা দখল করে রাজনীতির ময়দান। বিভাগ ও শহরের বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হয়। মেয়রও হয় তাদেরই লোক। প্রলেতারিতের একনায়কত্বের মত এখন অ্যাবসল্যুট ক্ষমতা তাদের হাতে। তাদের ওপরে কেউ নাই, আইন নাই, বিচার নাই, প্রতিবাদ নাই। শুধু রক্ত আর রক্ত। রক্ত রাজপথে, রক্ত ঘরে ঢোকার সিঁড়িতে, করিডোরে, এলিভেটরে, অফিসে, বিছানায়!

“এত রক্ত কেন?”

খুব পরিচিত প্রশ্ন।

“শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রেণি উৎখাতের জন্য!”

“কেন শ্রেণি উৎখাত করতে হবে?”

“শোষকদের নির্মূল করে গোঁফওয়ালা স্তুকানভদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য।”


একজন স্তুকানভ, একটিপার্টি ও একটি গুপ্তসংস্থা- শ্রেণিহীন সমাজের সরল সড়ক।





৫৮ পর্ব


গ্রীষ্ম, সবে ছুটি শুরু হয়েছে। তিনদিন ধরে দিদারের প্রচণ্ড জ্বর, ৪০-৪১ ডিগ্রি, নীচে আর নামে না। সোফিয়া সর্বক্ষণ ওর পাশে। কিন্তু ওর পিতা মস্কো এসেছে কোনো কাজে, শেষ করে সোফিয়াকে সাথে নিয়ে ইউক্রেইনে ফ্লাই করবে।

দিদার অসুস্থ, ওকে আমি রেখে যাবো না।

ওকে রেখে যাবো কেন, সেও যাবে।

সত্যি!

সোফিয়া বিশ্বাস করতে পারে না। ছোটকাল থেকেই দেখে এসেছে, ওর পিতা কখনই কোনো পরিস্থিতিতেই তার শান্তভাবটা হারায় না, সমস্যা কখনই সমস্যা নয় তার কাছে।

কিন্তু টিকেট, ওর তো টিকেট নেই।

তোমার তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, আমি দেখবো।

এয়ারপোর্টে তাদের সসন্মানে প্লেনে তোলা হয়। সোভিয়েত প্লেনেও যে প্রথম শ্রেণির সিট আছে দিদার এই প্রথম জানতে পায়। কিন্তু জ্বরে কাবু সে, গায়ে বল নেই। মাথায় যন্ত্রনা। সে ঘুমিয়ে পড়ে, প্লেনের সারাটা সময় ঘুমিয়েই কাটে। পিতা কন্যায় খুব নীচুগলায় টুকটাক কথা হয়।

একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

সোফিয়া জানে কী প্রশ্ন, কিন্তু সে সম্মতি দেয়।

দিদারের সাথে তোমার সম্পর্কটা কতটুকু সিরিয়াস? তুমি কি ওকে নিয়ে কিছু ভাবছো?

আমি ওকে বিয়ে করবো।

সে কি তোমাকে প্রপোজ করেছে?

না

তাহলে?

শোনো, তোমার পছন্দের ওপরে আমার কোনো বাধা নেই, তুমি বড় হয়েছো, একটা বিদেশি ছেলের সাথে জীবনটা জড়িয়ে ফেললে অনেক জটিলতা বাড়বে, তুমি সেটা বিবেচনায় রেখেছো তো?

সোফিয়া মাথা নাড়ে।

দিদার প্রায় সংজ্ঞাহীন। মনে হয় সে স্বপ্ন দেখছে। সোফিয়া। সম্পূর্ণ আবরণহীন, তার অশিথিল

যে স্তনগুলোর স্পর্শ পাবার জন্য সে হা পিত্যেশ করে থাকে, তারাই নিবিড়ভাবে মিশে আছে ওর বুকে। ত্বকে ত্বক, উষ্ণ নয় তপ্ত।

সোফিয়া তুমি?

হ্যা দিদার, আমি তোমার নিরাময়। এতদিন তুমি যা চেয়েছো, আমার সবটুকু তোমাকে দিচ্ছি, তুমি সেড়ে ওঠো।

পরের দিন দিদার ঘুম থেকে ওঠে অনেকটা ফ্রেশ, জ্বরটা ছেড়ে গেছে, দুর্বলতা কম।

ইগর আলেক্সেইভিচ এগিয়ে আসেন।

সুপ্রভাত দিদার, কেমন বোধ করছো? জ্বরটা আছে?

না, সেরে গেছে, ভালো বোধ করছি ইগর আলেক্সেইভিচ! ধন্যবাদ আমাকে নিয়ে আসার জন্য।

আমি একটু হাঁটতে বের হচ্ছি, যাবে নাকি আমার সাথে?

সুন্দর সবুজ পার্ক। মনোরম গ্রীষ্মের সকাল।

ইগর আলেক্সেইভিচ পার্ক, গাছপালা, শহরের গল্প করেন, তারপরে এক সময় বলেন, সোফিয়া মনে হচ্ছে তোমাকে পছন্দ করে। দিদার সায় দেয়।

ও কিন্তু বেশ জেদি।

তা আর বলতে!

ভাবছো কিছু ওকে নিয়ে। তোমাদের কি সিরিয়াস প্ল্যান আছে?

দিদার মাথা নাড়ে, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।

ওকে বলেছো?

না।

তাহলে?

ভয় পাই, যদি আপনার সায় না থাকে।

যাকে বিয়ে করবে, তার মতামতটা তো আগে জানা দরকার, নয় কি? আমার মেয়েটা একটু জেদি, তোমাকে ও নিশ্চয়ই খুব উৎপাত করে। তুমি যদি তার ব্যাপারে সিরিয়াস হও, তোমার তার সাথেই বিষয়টি ফয়সালা করে নেয়া উচিত।
 
বাংলাদেশ সরকার গোপনে কিছু রাশিয়ান মিগ কিনতে ইচ্ছুক এবং দেশে থেকে যে পার্টি এ নিয়ে কাজ করছে ঘটনাক্রমে দিদারের সাথে তাদের সম্পর্ক নিবিড়। তারা মস্কোতে তাকে খুঁজে বের করে। রাশিয়ান পক্ষের কন্টাক্ট খুঁজছে তারা। সে ইগর আলেক্সেইভিচকে ফোন করে।

সে বলে, কন্টাক্ট বের করা যাবে কিন্তু কাজগুলো খুব রিস্কি। তোমার এসবে না জড়ানোই ভালো।

দিদারের চরিত্রবৈশিষ্ট সে যা লক্ষ্য করেছে তাতে সে নিশ্চিত যে দিদার ব্যবসায়ি নয়,

“তুমি আর সোফিয়া বিয়ে করে বরং আমার শহরে চলে আসো, আমি তোমাদের একটা দাচা কিনে দিই সমুদ্রের তীরে, তোমরা সেখানেই থাকবে। নিরাপদ ব্যবসার বন্দোবস্ত করে দেব আমিই, কোনো অভাব হবে না।”

কিন্তু দিদার পীড়াপিড়ি করে।

ঠিক আছে আমি তোমার কাছে লোক পাঠাবো, সে একটি চিঠি দিয়ে যাবে। তাতে কী করতে হবে, তার বিস্তারিত লেখা থাকবে।

পরের দিন চিঠি দিয়ে যায় অপরিচিত এক লোক।

মস্কোর একটা ঠিকানা সেখানে, আর নির্দেশনা, “তুমি এখানে একা যাবে, আমার কথা বলবে, একটা কথাও অতিরিক্ত বলবে না, উত্তর দেবে শুধু যা প্রশ্ন করে তাই।”

দিদার ঠিকানা মত একাই গাড়ি চালিয়ে যায়।

মস্কোর বাইরে বিশাল এক খালি জায়গায় পোড়ো বাড়ির মত একটা বাড়ি। আশেপাশে কোনো লোকজন নেই। কেমন গা ছম ছম করে। বাড়ির সামনে এসে থামতেই কোথা থেকে উপস্থিত হয় সিকিউরিটির পোশাকে কয়েকজন সশস্ত্র লোক।

তুমি কে এবং এখানে কী করছো?

দিদার ইগর আলেক্সেইভিচের নাম বলে, ওরা রেডিও কানেকশনের মাধ্যমে কার সাথে কথা বলে।

আর কেউ জানে, তুমি এখানে এসেছো?

না।

গাড়ির নম্বর লিখে গেইট খুলে ওকে ভিতরে ঢুকতে দেয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে দেখা হয়। ওকে কিছু প্রশ্ন করা হয়, সে উত্তর দেয়। তারপরে বলা হয়, তাকে জানানো হবে। দিদার চলে আসে ভুতুড়ে, থমথমে ও অপরিচ্ছন্ন অনুভূতির সেই স্থান থেকে।

পরেরদিন ইগর আলেক্সেইভিচ তাকে ফোন করে।

বলে, তোমাদের প্রতিবেশি দেশ চায় না বাংলাদেশ রাশিয়ান মিগ কিনুক। যতদিন পর্যন্ত এই বিষয়টির সমাধান না হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো ডিল্ হবে না।দিদার যেন বিষয়টি ভুলে যায় এবং কারো সাথে আর আলাপ না করে।

পাভলোভিচের ক্ষমতা সম্পর্কে দিদারের বিশেষ ধারণা নেই। সোফিয়াও কিছু বলে না। মেয়েকে প্রচন্ড স্নেহ করে বলেই মেয়ের পছন্দ হিসেবে দিদারকে সে মেয়ে জামাই করে নিতে রাজী আছে। ছেলেটাকে তারও পছন্দ। কিন্তু সে যে জগতের মানুষ সেটা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অন্য জগত।

একটি রুদ্ধ মিলিটারি ফ্যাকটরির ডাইরেক্টর সে যার ২য়টি সারা দেশে নেই এবং আর একটি আছে কেবল আমেরিকায়।

এমন কিছু সফিসটিকেটেড কম্পিউটার তৈরি হয় সেখানে, যার এক একটির দাম আকাশচুম্বী। মহাকাশ, মিগ, সাবমেরিন ইত্যাদিতে সেগুলো ব্যবহৃত হয়। এমনসব লেজার মেশিন তৈরি হয় যা সাবমেরিনের বাইরের দেয়ালের মেটালিক পাত ঝালাই করতে ব্যবহৃত হয়। এই ফ্যাক্টরির জিনিস বিক্রি হয় বিদেশে, রাষ্ট্রীয় চুক্তিতে। তাই ইগর আলেক্সেইভিচের যোগাযোগ অত্যন্ত ওপর পর্যন্ত।
 
কিছুদিন আগেই এই চক্রের একটা ব্যবসায়িক অপারেশন সম্পন্ন করতে গিয়ে খুব অল্প বয়স্ক, ব্রাইট একটা ছেলেকে জীবন দিতে হয়েছে। ক্রেতা ছিল জার্মানীতে। ৪ টি মিগ ইন্জিন পাঠাতে হবে রুমানিয়ায়; সেখান থেকে যাবে সার্বিয়ায়, পুরোটাই চোরা পথে। ওই ছেলেটি ছিল লিঙ্ক। কামাজ নামের রাশিয়ার দৈত্যাকৃতির ২টি ট্রাকে ২ টি ৪০ ফিট কন্টেইনার তোলা হয়। প্রতিটিতে ২টি করে মিগ ইন্জিন প্যাক করা। ফ্যাক্টরি যে রিপাবলিকে, সেখান থেকে আসে রাশিয়ায়, তারপরে পোল্যান্ড হয়ে ট্রাক পৌঁছায় রুমানিয়ায়। নির্ধারিত রাঁদেভুর ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে ট্রাক কয়েকবার চক্কর দেয় এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায়।

ফলে পুলিশের চোখে পড়ে যায়। ট্রাক থামানো হয়। কন্টেইনারের ভেতরের পণ্য দেখে তাদের চক্ষু কপালে ওঠে। আটক করা হয়। ঝামেলা হয় কিন্তু পণ্য ঠিকই ফিরে আসে। মস্কোর যে ছেলেটি সব তথ্য জানতো, তাকে বলি দিতে হয়। প্রতিটি খেলারই নিয়ম আছে, পিলফারেজ আছে।

তুমি যেসব ব্যবসা করতে চাও, তা তোমার স্তরের মানুষের জন্য নয় দিদার। তুমি সরল, অনেক উঁচু জায়গায় যোগাযোগ ও শক্ত খুটি না থাকলে, যোগাযোগ করিয়ে দিলেও, তুমি সেখানে টিকে থাকতে পারবে না, আয় যেখানে বেশি, খরচও সেখানে বেশি, জীবন সেখানে মূল্যহীন।
 
সিদ্ধান্ত হয়। ওরা বিয়ে করবে। দিন তারিখ ঠিক হয়, প্রস্তুতি চলতে থাকে, দিন যত ঘনিয়ে আসে, সোফিয়া নার্ভাস বোধ করতে থাকে। তার মনে হয়, বিয়ে নয় কোনো একটা বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে। এবং সে ঘুমাতে পারে না, দুঃস্বপ্ন তারা করে তাকে। এবং তার আশংকা সত্য হয়।

ইগর আলেক্সেইভিচ, তার অতি শক্তিধর পিতা, হঠাৎ রাস্তায় এক্সেডেন্ট করে মারা যায়।

ড্রাইভার তার অতি অভিজ্ঞ। ধারণা করা হয় এটা সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়, কারো না কারো পথের সাথে তার পথ ক্রস করেছিল। তারা নব্য রুশী ইগর আলেক্সেইভিচের চেয়েও নব্যতর, ক্ষমতা, দক্ষতা ও ভবিষ্যত তাদের হাতে, পুরানো যারা তাদের আর প্রয়োজন নেই।

সোফিয়া ভেঙে পড়ে।

দিদারকে এড়িয়ে চলে সে। কিন্তু দিদার পিছু ছাড়ে না।

জীবন তো থেকে থাকতে পারে না সোফিয়া, সময় ঘনিয়ে আসছে, বিয়েটা হয়ে যাক।

তা হয় না, দিদার। তুমি এক দেশের, আমি অন্য দেশের। আমাদের ভাষা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন। আমাদের যখন সন্তান হবে, ওরা তখন বিপদে পড়বে। ওদের ত্বক কালো হবে, স্কুলে যাবে লোকে বলবে, “মা আত ইনাস্ত্রান্তসা নাগুলিয়ালা” ( মা বিদেশিদের সাথে ফষ্টি নষ্ট করে এদের পয়দা করেছে- ভাবতে পারো কী জঘন্য কথা? )। ওদের কটু কথা বলবে, মারধোর করবে। আমরা এটা

কী করে সহ্য করবো?

তা বলে কি আমাদের ভালোবাসার কোনো দাম নেই? আমরা তো এটা আগেও জানতাম। আমি তোমাকে দেশে নিয়ে যাবো।

তোমার দেশ কি আমার দেশের চেয়ে ভিন্ন? ওরা কি আমাকে অকপটে গ্রহণ করবে? আমি যখন ভাঙা বাংলায় কথা বলবো ওরা হাসবে না?

সেক্ষেত্রে তোমাকে নিয়ে আমি ইওরোপে, নয় আমেরিকায় চলে যাবো।

তা হয় না দিদার। সংস্কৃতির বিভাজন দূর হয় না। সেই সব দেশে তুমি হবে বিদেশি, আমি হবো বিদেশি, আমাদের সন্তানেরা ঐ দেশের সংস্কৃতিতে বড় হয়ে ঐদেশী হবে, আমাদের হবে না।আমাদের ওরা বুঝবে না, আমরা ওদের বুঝব না। যৌবন চলে যাবে, প্রেম থিতু হয়ে আসবে, দেহের আকর্ষণ থাকবে না, মনের বিকর্ষণ বেড়ে হবে বিশাল। তুমি হবে নিঃসঙ্গ, আমি হবো নিঃসঙ্গ। তখন মনে হবে দেশ ছেড়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। দুইদেশ, দুই সংস্কৃতি, আমাদের ভালোবাসা সুখী হবার ভালোবাসা নয়, দিদার। প্রাস্তি!


হত বিহ্বল দিদার দেখে সোফিয়া নয়, সামনে বসে আছে সোফিয়ার মূর্তি।



৫৯ পর্ব


নাস্তিয়া ধবল মেঘের মত স্মৃতির আকাশ অতিক্রম করে গেছে। মা বিয়ে করার জন্য পীড়াপিড়ি করা সত্ত্বেও অভ্র সে পথে যায়নি। নারী তার জীবনে আরও একাধিক এসেছে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনো মন দেয়া-নেয়ায় সে জড়ায়নি। “দাদুরা ছিল এই দেশে আদর্শ-অন্ধ বিদেশি উটপাখি, আর পিতারা ছিল ভাঙনের সময়ের কচুরি-পানা” এই কথাটুকু বলার কোনো সন্তানাদিরও জন্ম দেয়নি।

ভিক্টরও এখন আর ছোট নেই, তারও অর্থ বিত্ত প্রচুর হয়েছে। পুরনো স্কিমে ফ্যাকটরির সাথে কম্পিউটারের ব্যবসা এখনও চলছে, তবে তা এখন আর মূল ব্যবসা নয়। একদিন সে আসে অভ্রের কাছে, অভ্র দশ হাজার শ্রমিকসহ একটা মেটাল ফ্যক্টরি কেনা যায়।

অভ্রের চোখ পূর্ণচাঁদ, অত টাকা পাবো কোথায়?

হয়ে যাবে, দাম তত নয়। নির্বাচনে যাবার আগে টাকা তোলার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন “বন্ধকী নিলামের” আইন পাশ করেছেন। নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংকের কাছ থেকে স্বল্প মেয়াদে টাকা ধার নেবে সরকার, বিনিময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত কিছু কল কারখানা বন্ধক রাখবে। সময়মত টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে ব্যাংকগুলো এই কল-কারখানার মালিক হবে।

সরকারের মধ্য থেকে যারা এই নিলামের প্রস্তাবক ও পরিচালক, অর্থাৎ যারা টাকা ধার নেবে, তারাই টাকা ধার দানকারী ব্যাংক সমূহের মালিক। কল-কারখানায়গুলোর মূল্য নির্ধারণ করবে তারাই, তাদের ইচ্ছা মত, ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের তেল কোম্পানি “সিবনেফত” এর দাম ধরা হয়েছে ১০০ মিলিয়ন, ৫ বিলিয়ন ডলারের তেল কোম্পানি “ইউকোস” এর দাম ৩১০ মিলিয়ন। ৫৪ হাজার শ্রমিকের কর্মদাতা চিলিয়াবিন্সক ট্রাক্টর ফ্যাক্টরির দাম ২.২ মিলিয়ন এবং ৩৫ হাজার শ্রমিকের চিলিয়াবিন্সক মেটাল কম্বিনাটের দাম ৩.৭৩ মিলিয়ন ডলার। এ রকম আরও অনেক কোম্পানি এই নিলামে যাবে।

আমার পরিচিত এক ব্যাংক এই নিলামে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আমাদের জন্য মেটাল ফ্যাক্টরিটি তারা কিনবে, তারপরে আমাদের কাছে বিক্রি করে দেবে খুব অল্প দামে।

কিন্তু সময় খুব কম, মিলিয়ন দেড়েক ডলার লাগবে।

সময় অপচয় না করে ওরা পার্টনারশীপে পানির দরে ফ্যাক্টরিটি কিনে ফেলে।

অভ্রের ইতোমধ্যেই আমেরিকায় রেজিস্ট্রি করা কোম্পানি হয় ৪৯% পার্টনার। ঝকঝকে অফিস ওর এখন, চোখ ধাঁধানো যৌবতি সেক্রেটারি এবং ড্রাইভারসহ দামী গাড়ি এবং বডিগার্ড থাকে সব সময়। বড় ব্যবসা করতে হলে এসবের বিকল্প নেই। সে এখন আর হোস্টেলে থাকে না, শহরের কেন্দ্রে বাসা নিয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা খুব কড়া। 
 
ব্যাংকের জন্যও নিলামের ব্যাপারটি ছিল যাদু-কাঠির স্পর্শ। করিতকর্মা লোকগুলোর সৃজনশীলতায় বিহ্বলিত না হয়ে পারা যায় না। কেন্দ্রিয় ব্যাংক থেকে ফ্যাক্টরি কেনার সমমানের অর্থ ব্যাংকের একাউন্টে জমা হয়। পরে এই টাকাই সরকারকে ধার দেয়া হয় বন্ধকের বিপরীতে। পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক সরকার টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় এবং বন্ধক দেয়া কোম্পানিগুলো ব্যাংকের মালিকানায় চলে আসে। কিন্তু যে টাকা তাদের একাউন্টে জমা হয়েছিল কেন্দ্রিয় ব্যাংক থেকে, দুমায় আইন পাশ করে তাদের ঋণ মওকুফ করে দেয়া হয়। এভাবে ব্যাংক কোম্পানিগুলোর মালিকানা পায় বিনা পয়সায় এবং তারা হয় ধরে রাখে

বা ক্যাশের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয় নিজস্ব চ্যানেলে। অভ্ররা ফ্যাক্টরিটি কেনে এভাবে।

তার দাম এখনই বেড়ে হয়েছে কয়েকগুন। প্রোডাকশন চলছে ভালো, মুনাফা হচ্ছে। দেশের ভেতরের বাজার যেমন ইওরোপেও যাচ্ছে তাদের পণ্য।

একটি গিটার হাতে নিয়ে দেশ থেকে এসেছিল যে অভ্র, সে আর নেই। যে আছে, সফল, সুদর্শন, জীবনীশক্তিতে পরিপূর্ণ একজন পুঁজিপতি, সামনে এগিয়ে যাওয়াই যার ভবিতব্য।

কিন্তু মায়ের চিঠি আসে দেশ থেকে।

বৃদ্ধ জরাজীর্ণ।

তিরস্কারে ভরা থাকে চিঠি, তোমাকে ওখানে পাঠিয়েছিলাম মানুষ হয়ে দেশে ফেরার জন্য। মানুষ কি দেশে থাকে না? তোমাকে কেন বিদেশে পড়ে থাকতে হবে? টাকাই কি সব? মোসাদ্দেকের ওপরে এত আশা করেছিলাম, অন্তত এলাকার মানুষের জন্য সে কিছু করবে। কিন্তু ব্যস্ত সে নিজেকে নিয়ে, বদনাম শুধু বদনাম...
 
আজও চিঠি এসেছে, মনটা ভালো নেই, গাড়িতে বসে ছিল চুপ করে। মস্কো নদীর তীর ধরে গাড়ি ছুটছে, দূরে ক্রেমলিনের সুদর্শন টাওয়ারগুলো দেখা যাচ্ছে। বহু পুরাতন এই স্থাপনা, বহু ইতিহাস, দীর্ঘশ্বাস এর দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, সূর্য ডুবছে। পশ্চিমের আকাশটা লাল।

গাড়ি এসে থামে বাসার সামনে।

ড্রাইভার চলে যায়।

লিফটে উঠে দেহরক্ষী দুজনকে বিদায় দিয়ে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢোকে। মিনিট বিশ পরে দরজায় কলিং বেল বাজে। তার দেহরক্ষীদের একজন। দরজা খোলে কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে কোথা থেকে ছুটে আসে তিনজন যুবক। ঘিরে ফেলে ওকে। একজন বন্ধুর মত একহাত কাঁধে রেখে পিস্তলের মুখ ঠেকায় অভ্রের পেটে।

কোনো টু শব্দ করবে না, চল আমাদের সাথে।

কোথায় যেতে হবে? তোমাদের কে পাঠিয়েছে? ভিক্টর?

গাড়িতে বলবো।

অভ্র ধীর পায়ে ওদের সাথে হেঁটে যায়।

পেছনের সিটে বসে চিন্তাগুলো একসাথে জড়ো করে বোঝার চেষ্টা করছে কী তার করনীয়। দুইদিকে দুইজন, পিস্তল হাতে। মায়ের মুখটা চোখে ভাসছে। গাড়ির লাউড মিউজিক মগজে হাতুড়ি পিটাচ্ছে।

কুতুজভস্কি প্রসপেক্ট ধরে তীরের বেগে ছুটে চলেছে গাড়িটি।



সমাপ্ত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ