বাড়িতে ঢোকার সিঁড়ির ধাপে যখন পা রাখল, তখনো কাদার ওই লাল রঙের তালটা ওর হাতে ধরা। ইচ্ছে করেই পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকেনি। ম্যামির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঠিকই ধরা পড়ে যেত যে সব কিছু স্বাভাবিক নেই। ম্যামি বা আর কারোর সামনে স্কারলেটের পড়বার ইচ্ছে নেই। মনে হল এখনই কোনোরকম হতাশা বা তিক্ততা ও সহ্য করতে পারবে না। হাঁটুতে জোর পাচ্ছে না, মনের ভেতরটা ভীষণ খালি খালি লাগছে। কাদার তালটা এত জোরে চেপে ধরল যে ওর মুঠো করা হাতের ফাঁক গলে বেরিয়ে এল। তোতা পাখির মত আওড়াতে লাগল, “আমার এখনও এটা আছে। হ্যাঁ, আমার এখনও এটা আছে।” আর কিছুই নেই ওর, কিছুই নেই, কেবল লাল জমিটুকু ছাড়া। মাত্র কয়েক মিনিট আগে, ও কিনা, ছেঁড়া কাপড়ের টুকরোর মত এটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে রাজি হয়ে গেছিল! আবার এই মাটিকে ওর ভাল লাগতে শুরু করেছে। কী যে পাগলামি ওকে পেয়ে বসেছিল, এই জমিকে অবহেলা করার! অ্যাশলে রাজি হয়ে গেলেই তো সব ছেড়ে ওর সঙ্গে চলে যেত। সংসার ফেলে, বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে, পেছন ফিরে দেখার অধিকার জলাঞ্জলি দিয়ে চলে যেত। ভেতরটা খালি খালি লাগছে, তবুও বুঝতে পারছে যে এই লাল লাল টিলা, জলাভূমি, পাইনের সারি ছেড়ে যেতে হলে ওর হৃদয় ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যেত। মরার দিন পর্যন্ত এগুলো দেখতে পাওয়ার জন্য ওর প্রাণ কাঁদতে থাকত। টারাকে ওর সত্তা থেকে উপড়ে ফেললে যে শূন্যতা তৈরি হত, সেটা অ্যাশলে পর্যন্ত পূরণ করতে পারত না। অ্যাশলের দূরদর্শিতার তুলনা নেই, আর স্কারলেটকে কত গভীরভাবেই না ও চেনে! কেবল এক তাল কাদামাটি ওর হাতে গুঁজে দিয়ে ওর চোখ খুলে দিয়েছে।
ঘরে ঢুকে যেই দরজা বন্ধ করতে যাবে, ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে এল। গাড়িবারান্দার দিকে তাকাল। এই অসময়ে আতিথেয়তা করতে হলে বড়ই ঝকমারি হবে। তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ঢুকে পড়তে হবে, মাথা ধরার দোহাই দিয়ে।
কিন্তু ঘোড়ার গাড়িটা কাছাকাছি আসতেই, ও এত অবাক হয়ে গেল যে পালানোর ইচ্ছেটাই চলে গেল। একেবারে নতুন গাড়ি, ঝকঝক করছে, এমনকি জিনটাও নতুন, জায়গায় জায়গায় পেতলের কারুকাজ, চকচক করছে। অপরিচিত কেউই হবে। ওর চেনা পরিচিতদের মধ্যে এরকম রাজকীয় আগমন করার মত সামর্থ্য একজনও নেই।
দরজা আগলে দাঁড়িয়ে ও দেখতে লাগল। ভিজে গোড়ালির চারপাশের স্কার্টের ওপর ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝটকা লাগছে। বাড়ির সামনে এসে গাড়িটা থামল। জোনাস উইল্কারসন নেমে এল। ওদের পুরণ ওভারসিয়ার এত ভাল একটা গাড়ি চালিয়ে আসছে, গায়ের ওপর ওভারকোটটাও বেশ জমকালো – এতই আশ্চর্যের ব্যাপার যে স্কারলেট নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। উইল অবশ্য বলেছিল, ফ্রীডম্যান’স ব্যুরোতে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই ওকে খুব সমৃদ্ধশালী দেখায়। অনেক টাকা কামিয়ে নিয়েছে, কথাটা উইল বলেছিল বটে, নিগারদের বা সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে, কিংবা তুলো বাজেয়াপ্ত করে, এই বাহানায় যে এই সব তুলো নাকি কনফেডারেট সরকারের তুলো। এই রকম কঠিন সময়ে এত টাকা যে সদুপায়ে কামায়নি, তাতে আর সন্দেহ কী?
আর সেই মূর্তিমানই কিনা চমৎকার একটা গাড়ি থেকে নেমে, আর একজন মহিলাকে হাত ধরে নামিয়ে, এখানে এসে হাজির – ওর বরবাদ হয়ে যাওয়া থেকে মাত্র কয়েক পা দূরে। এক নজরেই স্কারলেট বুঝে গেল যে পোশাকের রঙটা বেশ চড়া, বেশ গেঁয়ো। তা সত্ত্বেও স্কারলেট হ্যাংলার মত পোশাকটা দেখতে লাগল। বহুদিন হয়ে গেল ফিটফাট নতুন পোশাক দেখার সৌভাগ্য পর্যন্ত হয়নি। আচ্ছা! আজকাল তাহলে পায়ের দিকের ঘেরটা আগের মত চওড়া রাখা হচ্ছে না! কুঁচি দেওয়া লাল রঙের গাউনটা দেখে স্কারলেট ভাবল। ভেলভেটের কালো আঙারাখাটা দেখে ভাবল জ্যাকেটের ঝুল আজকাল কত কম হয়! আরে, টুপিটাও যে বেশ কায়দার! আজকাল বনেট বোধহয় আর চলে না। এই টুপিটা লাল ভেলভেট দিয়ে প্রায় সমতল একটা ব্যাপার। কড়কড়ে একটা প্যানকেকের মত মহিলার মাথায় বসানো। বনেটের ফিতের মত এই টুপির ফিতেটা থুতনির নীচে বাঁধে দেওয়া নয়, টুপির পেছন দিয়ে বেরিয়ে আসা কোঁকড়া চুলের ওপর দিয়ে বাঁধা। মহিলার চুলের সাথে টুপিটার রঙ কিংবা জমিন যে বেমানান লাগছে, সেটাও স্কারলেট লক্ষ্য না করে পারল না।
মহিলা গাড়ির বাইরে পা রেখে বাড়ির দিকে তাকাল। পাউডার ঘসে ফর্সা করা খরগোশের মত ওই মুখটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে।
“আরে, এটা তো এমি স্ল্যাটারি!” এমন অবাক হয়ে গেছিল যে স্কারলেট চেঁচিয়ে বলে ফেলল।
“হ্যাঁ, ম্যা’ম, আমি এমিই বটে,” মাথা ঝাঁকিয়ে এমি বলে উঠল। মুখে কান এঁটো করা হাসি। তারপর সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
এমি স্ল্যাটারি! ওই নোংরা সাদা-চুলো বেশ্যাটা, যার জারজ বাচ্চাকে এলেন ব্যাপটাইজ় করেছিলেন! এই এমিই তো এলেনকে টাইফয়েড দিয়ে ওঁকে মেরে ফেলেছে! আর আজব পোশাক পরে, সেই নোংরা, চালচুলোহীন, বেজন্মা সাদা চামড়ার আবর্জনাটা টারার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাইছে! হাবভাব এমন যেন জায়গাটা ওরই! স্কারলেট এলেনের কথা ভাবল। মুহূর্তের মধ্যে ভাবপ্রবণ হয়ে পড়ে মনের থেকে শূন্যতাবোধটা কেটে গেল। রাগে একেবারে অন্ধ হয়ে গেল।
“সিঁড়ি থেকে নামো – নামো বলছি, নরকের কীট কোথাকার!” চেঁচিয়ে উঠল স্কারলেট। “এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও! দফা হয়ে যাও!”
এমি থতমত খেয়ে গেল। করুণ চোখে জোনাস-এর দিকে তাকাল। জোনাস ভুরু কুঁচকে এগিয়ে এল। ভেতরে ভেতরে রেগে গেলেও যথাসম্ভব সম্ভ্রম বজায় রাখার চেষ্টা করল।
“আমার স্ত্রীর সঙ্গে আপনি এভাবে কথা বলতে পারেন না,” জোনাস বলল।
“স্ত্রী?” বলে স্কারলেট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসিতে ঘেন্না ঝরে পড়ছে। “ভাল লাগল যে শেষমেশ তুমি ওকে বিয়ে করে নিয়েছ। তা তোমার বাকি ছোঁড়াগুলোকে ব্যাপটাইজ় করছে কে? আমার মাকে তো মেরে ফেললে!”
এমি অস্ফূটে “ওহ্” বলে তড়বড়িয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে গেল। কিন্তু জোনাস শক্ত মুঠোয় ওকে ধরে গাড়ির দিকে পালিয়ে যেতে দিল না।
“দেখা করার উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা এখানে এসেছিলাম – বলতে পারেন সৌজন্যমূলক সাক্ষাতের জন্যই,” খেঁকিয়ে উঠে বলল। “আর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে জরুরি কিছু আলোচনা – ”
“বন্ধু?” চাবুকের মত শোনাল স্কারলেটের কণ্ঠস্বর। “তোমার মত লোকের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব কবে হয়েছিল? স্ল্যাটারিরা আমাদেরই দাক্ষিণ্যে জীবন কাটিয়েছে, আর প্রতিদানে মাকে মেরে ফেলেছে – আর – তুমি – তুমি – বাপি তোমাকে জবাব দিয়েছিলেন – এমেরির ওই বেজন্মা বাচ্চাটার জন্য – সেটাও তোমার ভালমতই জানা। বন্ধু? মিস্টার বেন্টীন আর মিস্টার উইল্কসকে আমি ডাকতে বাধ্য হওয়ার আগেই, বেরিয়ে যাও বলছি!”
রাগে জোনাসের মুখ লাল হয়ে উঠল।
এই সব কথাবার্তা শুনে এমি ওর স্বামীর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে ক্যাটক্যাটে লাল ফিতে লাগানো লাল রঙের চামড়ার জুতো পায়ে গাড়ির দিকে ছুটল।
এবার জোনাস রাগে কাঁপতে শুরু করল। ওর আর স্কারলেটের রাগ এখন সমান সমান। ফ্যাকাসে মুখ লাল টকটক করছে।
“এখনও খুব দেমাক, তাই না? তোমাদের ব্যাপারে আমার সব খবর জানা আছে। আমি জানি যে তোমাদের পায়ে গলাবার মত জুতোই নেই। এটাও জানি যে তোমার বাবার মাথার ঠিক – ”
“চলে যাও এখান থেকে!”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, তোমার ওই মেজাজ আর বেশিদিন টিকবে না। তুমি যে সর্বস্বান্ত, সে আমার জানা। এমনকি খাজনা দেওয়ার টাকাও তোমার নেই। তোমার কাছ থেকে জায়গাটা কিনে নেওয়ার জন্য এসেছিলাম – খুব ভাল প্রস্তাবই একটা দিতে চেয়েছিলাম। এখানে থাকার এমি’র খুব শখ। এই দিব্যি কেটে বলছি, এখন আর এক পয়সাও দেব না তোমাকে! চালিয়াত, মাথামোটা আইরিশ কোথাকার! দেনার দায়ে যখন ভিটেমাটি ছাড়তে হবে তখন তুমি টের পাবে কলকাঠি কে নাড়ে! আমি কিনে নেব জায়গাটা, সব কিছু সমেত – আসবাবপত্র – সব কিছু – তারপর আমিই থাকব এখানে!”
তাহলে এই হল ব্যাপার – জোনাস উইল্কারসনই টারার পেছনে পড়েছে – জোনাস আর এমি। পুরনো অপমানের বদলা নিতে চায়। যে বাড়ির মানুষদের জন্য হেনস্থা, ঘুরপথে সেই বাড়িটারই ভোগদখল করা। রাগে, ঘেন্নায় স্কারলেটের শরীর রি রি করে উঠল, ইয়াঙ্কির দাড়ি ভর্তি মুখে পিস্তল চালানোর সময় যেরকম হয়েছিল, ঠিক সেই রকম। পিস্তলটা হাতের কাছে থাকলে হত!
“এই বাড়ি আমি ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলব, আগুন লাগিয়ে দেব, প্রত্যেক বিঘা জমিতে নুন ছিটিয়ে দেব, যদি তোমাদের দুজনকে বাড়ির চৌকাঠ পেরতে দেখি!” চেঁচিয়ে উঠল। “বেরিয়ে যাও, এখনই বেরিয়ে যাও বলছি!”
জোনাস কটমট করে ওর দিকে তাকাল। আরও কিছু বলবার জন্য মুখ খুলেও গাড়ির দিকেই এগিয়ে গেল। ঘ্যানঘ্যান করতে থাকা বউয়ের পাশে বসে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল। স্কারলেটের ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের ওপর থুতু ছিটিয়ে দেয়। থুতু হল ওরা থাকতে থাকতেই এই কাজটা করলে হত।
যতসব জঘন্য নিগার প্রেমিকের দল – কী আস্পর্ধা বাড়ি বয়ে এসে ওকে গরীব বলে গালি দিয়ে যায়! ওই কুকুরের বাচ্চাটা মোটেই ওকে টারার জন্য দাম হাঁকতে আসেনি। একটা ছুতো করে এখানে এসে নিজেকে আর এমিকে জাহির করে ওকে অপদস্থ করার চেষ্টা! নোংরা স্ক্যালাওয়াগ যত, বেজন্মা সাদা চামড়ার নরকের পোকা, টারাতে থাকার শখ!
পরমুহূর্তেই অজানা এক আতঙ্কে রাগ উধাও হয়ে গেল। হায় কপাল! ওরা যদি সত্যি সত্যিই এসে এখানে থাকতে শুরু করে! টারাকে কিনে নিতে ওদের বাধা দেওয়ার মত কোনও উপায়ই যে ওর হাতে নেই। বাড়ির প্রতিটি আয়নায়, টেবিলে, পালঙ্কে, এলেনের ব্যবহার করা মেহগিনি আর রোজ়উডের ঝকঝকে আসবাবপত্রে – অর্থাৎ যা কিছু ওর কাছে অমুল্য, হয়ত ইয়াঙ্কি লুটেরাদের দৌরাত্মে অনেক দাগ লেগে গেছে, সেই সব জিনিস ওদের দখলে চলে যাওয়া থেকে বাঁচানোর কোনও রাস্তাই ওর কাছে নেই। এমনকি রোবিল্যার ঘরানার রুপোর বাসনপত্রও ওদের দখলে চলে যাবে। আমি কিছুতেই এটা হতে দেব না, স্কারলেট আবেগপ্রবণ হয়ে ভাবল। না, কিছুতেই না, এমনকি তার জন্য যদি এই জায়গায় আগুন ধরিয়ে দিতে হয়, তবে সেটাই করব! যে মেঝের ওপর দিয়ে একদিন মা হেঁটেছেন, সেই মেঝেতে এমি স্ল্যাটারির পায়ের ছোঁয়া আমি কিছুতেই পড়তে দেব না!
দরজাটা বন্ধ করে তার ওপরে হেলান দিল। ভীষণ ভয় করছে। শেরম্যানের লোকরা যেদিন চড়াও হয়েছিল বাড়িতে, সেদিনের থেকেও বেশি ভয় করছে। সেদিন ভয় পেয়েছিল এই ভেবে যে ওরা হয়ত ওকে শুদ্ধ টারাকে পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেবে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি তার চেয়েও বেশি গুরুতর – এই আস্তাকুঁড়ের বাসিন্দারা এই বাড়িতে এসে থাকবে, আর ওদের আস্তাকুঁড়বাসী বন্ধুবান্ধবদের কাছে বড়াই করে বলবে কেমন করে দেমাকী ও’হারাদের এখান থেকে বের করে দিয়েছে। কে জানে হয়ত নিগ্রোদের এই বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আনবে, ডিনারের জন্য, রাত কাটানোর জন্য। জোনাস যে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে বেড়ায় নিগ্রোরা সাদা চামড়ার থেকে কোনো অংশে কম নয় সেটা উইল বলেছিল। ও নাকি ওদের বাড়িতে যাতায়াত করে, একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করে, ওদের নিয়ে গাড়িতে করে ঘুরতে বের হয়, কাঁধে হাত রেখে কথা বলে।
টারার ভাগ্যে এই চূড়ান্ত অপমান অপেক্ষা করে আছে ভেবে ওর হৃৎস্পন্দন এত বেড়ে গেল যে মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে। মনে মনে সমস্যাটার গুরুত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করল, সেটার থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা খুঁজতে লাগল। এসব নিয়ে যতই ভাবে ততই নতুন করে ওর রাগ আর আতঙ্ক বেড়ে গিয়ে অস্থির হয়ে পড়ে। উপায় একটা থাকতেই হবে, এমন কাউকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে যার কাছ থেকে ও টাকা ধার করতে পারবে। টাকার তো আর পাখনা গজিয়ে যায়নি যে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে! কারোর না কারোর কাছে টাকা থাকতেই হবে। আর তখনই অ্যাশলের মজা করে বলা কথাটা মনে পড়ে গেল –
“একমাত্র একজন লোকের নামই শুনছি – রেট বাটলার – যার নাকি অনেক টাকাকড়ি আছে,”
হ্যাঁ, রেট বাটলার। তাড়াতাড়ি করে বসার ঘরে চলে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। জানলার পর্দা টেনে দেওয়া, শীতকাল বলে সন্ধ্যেও ঘনিয়ে এসেছে, সব মিলিয়ে এক অস্পষ্ট বিষণ্ণতা ওকে ঘিরে ধরল। এখানে কেউ ওকে খুঁজতে আসবে না, নির্বিঘ্নে কিছুক্ষণ ভাবতে হবে। কথাটা হঠাৎই মাথায় এল – এত সহজ কথাটা – আগে যে কেন মাথায় আসেনি ভেবে অবাক হল।
“টাকাটা রেটের কাছ থেকেই নেব। হীরের ওই দুলজোড়াটা ওঁর কাছে বিক্রি করে দেব। আর না হলে ওঁর কাছ থেকে ধার নেব টাকাটা, শোধ করতে না পারা পর্যন্ত ওটা ওঁর কাছেই জমা রেখে দেব।”
কথাটা ভেবে এতই স্বস্তি পেল যে দুর্বল বোধ করতে লাগল। খাজনার টাকা মিটিয়ে দিয়ে জোনাস উইল্কারসনের বেয়াদবীর উচিত জবাব দেবে। এটা ভেবে মনটা খুশি হয়ে উঠতে না উঠতেই, নিষ্ঠুর একটা সত্যিও উপলব্ধি করল।
“খাজনা মেটানোর টাকাটা যে কেবল এই বছরের জন্যই দরকার তা তো নয়। পরের বছর আছে, তার পরের বছর আছে, যতদিন বেঁচে থাকবে তত বছর এই খাজনা দেওয়ার দায় টেনে চলতে হবে। এবারে টাকাটা মিটিয়ে দিলেও, পরের বছর খাজনা আরও বাড়িয়ে দেবে, বাড়াতেই থাকবে, যতক্ষণ না আমাকে উচ্ছেদ করতে পারে। ভাল তুলোর ফসল তুলতে পারলেও, ওরা হয়ত এত খাজনা লাগাবে যে আমার হাতে আর কিছুই থাকবে না, বা বাজেয়াপ্ত করে সোজাসুজি বলে দেবে সেটা কনফেডারেটের তুলো। ইয়াঙ্কি আর ওদের শয়তান সাগরেদগুলো এমনভাবে ধরেছে যে আমার পালানোর পথটুকুও নেই। যতদিন বাঁচব, ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে, কোনো না কোনো উপায়ে ওরা আমাকে কব্জা করে ফেলবে। সারা জীবন ধরে আমাকে টাকাপয়সার জন্য হাহাকার করতে হবে, মুখের রক্ত তুলে পরিশ্রম করতে হবে, আর তারপরেও হয়ত দেখব আমার সব তুলো ওরা লুঠে নিয়েছে … ধার করে তিনশ ডলার জোগাড় করা তো একটা সাময়িক সুরাহা মাত্র। আমার প্রয়োজন, ওদের এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা – পাকাপাকিভাবে – যাতে রাত্রে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি, কাল কী হবে সেটা নিয়ে দুর্ভাবনা না করে, বা সামনের মাসে, বা সামনের বছর।
স্কারলেট দ্রুতগতিতে ভাবতে শুরু করল। খুব ঠাণ্ডা মাথায় কূটবুদ্ধি লাগিয়ে একটা মতলব বের করল। রেটের কথা মনে পড়ল – শ্যামলা ত্বক, ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি, ব্যঙ্গে ভরা কালো কালো চোখ দিয়ে – ওর শরীর লেহন করে চলেছেন। অ্যাটলান্টার সেই অসম্ভব গুমোট রাতটার কথাও মনে পড়ল – অবরোধের শেষের দিকের কথা – আন্ট পিটির বাড়ির বারান্দার অন্ধকারে প্রায় মিশে গিয়ে বসে আছেন রেট। বাহুর ওপরে রাখা ওঁর হাতের উষ্ণতাটাও আবার অনুভব করতে পারছে। উনি বলছেন, “আর কোনো মেয়েকেই আমি তোমার মত এত তীব্রভাবে কামনা করিনি – তুমি ছাড়া আর কোনো মেয়ের জন্যই আমি এত দীর্ঘদিন প্রতীক্ষা করিনি।”
“ওঁকে আমি বিয়েই করে ফেলব,” ঠাণ্ডা মাথায় ভাবল। “তাহলে আর কখনোই আমাকে টাকাপয়সা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।”
কথাটা ভাবতেই প্রাণটা জুড়িয়ে গেল একেবারে। অর্থচিন্তা নেই, টারার নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই, পরিবারের কারোর খাওয়াপরার ভাবনা নেই, পাথরের দেওয়ালে আর মাথা কুড়ে মরতে হবে না!
মনে হল যেন খুবই বুড়িয়ে গেছে। সারা বিকেল মনের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেল – এক অসীম শূন্যতাবোধ ওকে ঘিরে ফেলল – প্রথমে তো খাজনা নিয়ে চমকে দেওয়ার মত খবরটা, তারপর অ্যাশলে আর সব শেষে জোনাস উইল্কারসনকে খুন করে ফেলার প্রবল ইচ্ছে। নাহ্, মনটা একেবারে আবেগহীন হয়ে পড়েছে। অনুভূতিবোধটা যদি হারিয়ে না ফেলত, তাহলে যে পরিকল্পনাটা মনে দানা বাঁধতে আরম্ভ করেছে, সেটা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে যেত। রেটকে ও ঘৃণা করে, এতটা ঘৃণা বিশ্বসংসারে আর কাউকেই ও করে না। কিন্তু সেই অনুভূতিবোধটাই ওর নেই। ও চিন্তা করতে পারছে, আর ওর চিন্তাগুলো সবই বাস্তবটাকে মাথায় রেখেই।
“সেদিন রাতের অন্ধকারে শুনসান রাস্তার ধারে উনি যখন আমাদের একলা ফেলে রেখে পালিয়ে গেলেন, বেশ কিছু গালমন্দ করেছিলাম বটে ওঁকে, তা সেসব আমি ঠিক ভুলিয়ে দিতে পারব,” অবজ্ঞার সঙ্গেই ভাবল। নিজের আকর্ষণী ক্ষমতার ওপর এখনও যথেষ্ট ভরসা আছে ওর। “ওঁর কাছে যতক্ষণ থাকব, আমার মুখ থেকে মধু ছাড়া আর কিছুই ঝরবে না। বুঝিয়ে দেব, প্রথমদিন থেকেই ওঁর প্রেমে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি, সেদিন রাতে একটু বেশিই ভয় পেয়ে গেছিলাম বলে ভালোমন্দ বলে ফেলেছিলাম। ভাগ্যিস পুরুষমানুষগুলোর এত গুমর হয়, একটু তোষামোদ করলেই গলে একেবারে জল হয়ে যায় … যতক্ষণ না ওঁকে হাতের মুঠোর মধ্যে পাচ্ছি, আমাদের ফ্যাসাদ নিয়ে একটা কথাও ফাঁস করা চলবে না। ঘুণাক্ষরেও উনি যেন টের না পান! একবার যদি আমাদের দারিদ্র্যের কথা জেনে ফেলেন, উনি ঠিক বুঝে যাবেন যে ওঁর প্রতি নয়, ওঁর টাকার প্রতিই আমার নজর। অবশ্য জানাটা সম্ভব নয়, কারণ আন্ট পিটিও জানেন না ওদের হাঁড়ির হাল দশার কথা। একবার ওঁকে বিয়ে করতে পারলেই হল, আমাদের সাহায্য করতে উনি বাধ্য হবেন। বউয়ের পরিবার অনাহারে থাকুক, এটা নিশ্চয়ই উনি চাইবেন না!”
ওঁর বউ। মিসেজ় রেট বাটলার। বিতৃষ্ণার মত কিছু একটা – ঠাণ্ডা মাথায় মতলব ভাজতে ভাজতে মনের গভীরে চাপা পড়ে ছিল – হালকাভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না উঠতেই, তাড়াতাড়ি সেটা দাবিয়ে দিল।
কূট চিন্তাভাবনার তলায় চাপা পড়েছিল, একবার হালকাভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতেই তাড়াতাড়ি দমিয়ে দিল। চার্লসের সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী মধুচন্দ্রিমার কিছু অস্বস্তিকর এবং বিতৃষ্ণাজনক ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল – ওর আনাড়ি হাতের ছোঁয়া, জবুথবুভাব, ওর দুর্বোধ্য আবেগ – আর ওয়েড হ্যাম্পটন।
“এই সব নিয়ে এখন ভাবব না। বিয়েটা আগে হয়ে যাক, তারপর নাহয় এসব নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে …”
বিয়েটা আগে হয়ে যাক। কী একটা স্মৃতি যেন কাঁটার মত বিঁধল। একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল। আন্ট পিটির বারান্দায় সেদিন সন্ধ্যের কথাটা আবার মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল রেটকে জিগ্যেস করেছিল, উনি কী বিবাহের প্রস্তাব দিচ্ছেন। আরও মনে পড়ল, কী বিশ্রী ভাবে হেসে উনি সেদিন জবাব দিয়েছিলেন, “বিয়ে করে ফেলার মত মানুষ আমি নই, প্রিয়ে।”
ধরে নেওয়া যাক, এখনও উনি বিয়ে করার মত মানুষ হয়ে ওঠেননি। ধরা যাক, ওর আকর্ষণী ক্ষমতা, ওর ছলাকলায় উনি ভুললেন না, ওকে বিয়ে করতে রাজি হলেন না, তখন? ধরা যাক – নাহ্, ভাবনাটা খুবই ভীতিপ্রদ – ধর, উনি ওকে পুরোপুরি ভুলেই গেছেন আর অন্য মেয়েদের পেছনে দৌড়চ্ছেন?
“আর কোনো মেয়েকেই আমি তোমার মত এত তীব্রভাবে কামনা করিনি …”
স্কারলেট হাত মুঠো করে ফেলল – নখগুলো তালুতে বসে যেতে লাগল। “যদি আমাকে ভুলে গিয়ে থাকেন, আমি ওঁকে মনে করিয়ে দেব। নতুন করে আমাকে কামনা করতে বাধ্য করব।”
আর যদি বিয়ে করতে নাই চান, কিন্তু তবুও ওকে কামনা করেন, তাহলেও টাকা পাওয়ার উপায় আছে। আর কিছু না হোক, একবার তো উনি ওকে ওঁর রক্ষিতা হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন!
বসার ঘরের আলোআঁধারিতে বসে, একটা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য বিবেকের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল – মন থেকে কম করে তিনটে দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে হবে – এলেনের স্মৃতি, ধর্মীয় উপদেশ আর অ্যাশলের প্রতি প্রেম। যেটা করবে বলে ভাবছে, স্বর্গের মনোরম পরিবেশে – নিশ্চিতভাবে মা সেখানেই আছেন – ওঁর কাছে অত্যন্ত কুৎসিত মনে হবে। ব্যাভিচার করা মারাত্মক পাপ। এটা জানার পরেও, আর অ্যাশলেকে এতখানি ভালবাসার পরেও, ওর এই মতলবের অর্থ হল, ও বেশ্যাবৃত্তির চেয়েও জঘন্য কিছু করতে চলেছে।
কিন্তু নির্দয় শীতল বুদ্ধিবৃত্তি আর পরিস্থিতির চাপে মরিয়া হয়ে স্কারলেটের এই সব ভাবনাচিন্তা তলিয়ে গেল। এলেন বেঁচে নেই, আর হয়ত মৃত্যু মানুষের সব রকম পরিস্থিতি বিবেচনা করার অন্তর্দৃষ্টি জাগিয়ে তোলে। নরকে যাবার ভয় দেখিয়ে ধর্ম ব্যাভিচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে। গির্জা ভাবতেই পারে ও টারাকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা না করেই, পরিবারের মানুষদের অনাহারে রেখেই, ও দ্যু’হাত তুলে দেবে – সে ভাবতে চাইলে ওরা ভাবুক। কিন্তু ও কিছুতেই এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে না। অন্তত, এই মুহূর্তে তো নয়ই। বাকি রইল অ্যাশলে – কিন্তু অ্যাশলে তো ওকে চায়ই না। না, অ্যাশলে ওকে অবশ্যই চায়। ওর উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শের স্মৃতি সেই কথাটাই বলতে চাইছে। কিন্তু ও কিছুতেই স্কারলেটকে কোথাও চলে যাবার কথা মনে আনবে না। অদ্ভুত ব্যাপার, অ্যাশলের সঙ্গে চলে যাওয়াটা ওর কাছে পাপ বলে মনে হয়নি, অথচ রেটের সঙ্গে …
শীতের বিষণ্ণ সন্ধ্যার আলোআঁধারিতে স্কারলেট যেন দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে এসে পৌঁছল, যে যাত্রার শুরু হয়েছিল সেই রাতে, যেদিন অ্যাটলান্টার পতন হল। বখাটে, স্বার্থপর, অনভিজ্ঞ কিন্তু যৌবনের প্রাণচাঞ্চল্য আর আবেগে ভরপুর, বিমূঢ় এক মেয়ে সেদিন পথে নেমে পড়েছিল। দীর্ঘ সেই যাত্রাপথের শেষে, সেই মেয়ের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। অনাহার, কঠোর পরিশ্রম, আতঙ্ক আর অবিরাম আয়াস, যুদ্ধ আর পুনর্গঠনের সন্ত্রাস, ওর সমস্ত উষ্ণতা, সমস্ত যৌবন, সমস্ত কোমলতা কেড়ে নিয়েছে। ওর অস্তিত্বের চারধারে শুষ্ক কাঠিন্যের আবরণ তৈরি হয়ে গেছে, তারপর তিলে তিলে, পলেস্তারার পর পলেস্তারা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে, মাসের পর মাস ধরে।
এই আজ পর্যন্ত, কেবল দুটো আশা সম্বল করেই ও বেঁচে ছিল। আশা করেছিল, লড়াই থেমে গেছে, জীবনটা ধীরে ধীরে পুরনো সমতায় ফিরে আসবে। আশা করেছিল, অ্যাশলের ফিরে আসায় আবার বেঁচে থাকার একটা মানে খুঁজে পাবে। আর এখন এই দুটো আশাই নষ্ট হয়ে গেছে। টারার সামনে জোনাস উইল্কারসনকে দেখা মাত্রই ও বুঝে গেছে যে ওর জন্য, সমগ্র দক্ষিণের জন্য যুদ্ধ কোনোদিনই শেষ হবে না। লড়াই এখন তীব্রতর হবে, নির্মমভাবে বদলা নেওয়ার পাল সবে শুরু হতে চলেছে। আর অ্যাশলে চিরতরে কথার জালে বন্দী, যে কোনো কারাগারের চেয়েও সেই কথার জালের বন্ধন বহুগুণ শক্তিশালী।
শান্তির আকাঙ্ক্ষা ওকে হতাশ করেছে, অ্যাশলেও ওকে হতাশ করেছে, একই দিনে ঘটেছে দুটোই। মনে হচ্ছে প্রাণভরে শ্বাস নেবার শেষ ফাটলটাও পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্র্যান্ডমা ফোনটেন যেটা না হবার জন্য ওকে সাবধান করেছিলেন, সেটাই ও হয়ে গেছে – আতঙ্কের চরম সীমায় পৌঁছে, ভয় পাওয়ার মত আর কিছুই রইল না। জীবন নিয়ে ভয়, মায়ের ভর্ৎসনার ভয়, ভালবাসা হারানোর ভয়, লোকনিন্দার ভয়। অনাহার আর অনাহারের দুঃস্বপ্ন – একমাত্র এটাই ওকে ভয় দেখানোর জন্য রয়ে গেল।
অতীতের সংস্কার থেকে শেষ পর্যন্ত বের হতে পেরে অদ্ভুত হালকা লাগছে নিজেকে, মুক্তির আস্বাদ পাচ্ছে। পুরনো দিন, পুরনো স্কারলেট এখন অতীত। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আর কী আশ্চর্য, একটুও ভয় করছে না। হারিয়ে ফেলার তো কিছুই নেই, মন পুরোপুরি তৈরি এখন।
রেটকে জোরজার করে ওকে বিয়ে করতে রাজি করাতে পারলে, তার চাইতে ভাল আর কিছু হয় না। যদি নাও পারে – তাহলেও টাকাটা আদায় করতেই হবে। উদাসীন কৌতুহলে ভাবতে চেষ্টা করল একজন রক্ষিতার কাছ থেকে কী কী আশা করা যেতে পারে। রেট কী চাইবেন ও অ্যাটলান্টাতেই থেকে যাক, যেমন লোকে বলে থাকে, উনি বেল ওয়াটলিং মহিলাকেও অ্যাটলান্টাতেই রেখেছেন? তা অ্যাটলান্টাতে থাকতে বাধ্য করলে, ওঁকে ভালমত খোরপোশ দিতে হবে – যাতে টারাতে ওর না থাকার লোকসানটা পুরিয়ে যায়। পুরুষদের চরিত্রের অন্ধকার দিকটা নিয়ে স্কারলেটের কোনো ধারণাই নেই, ফলে কী ধরণের বন্দোবস্ত হতে পারে সেটা বুঝে উঠতে পারছে না। এর ফলে বাচ্চা হবার সম্ভাবনা থাকে কি? সেটা হলে তো বড়ই মুশকিল।
“নাহ্, এসব ভেবে এখন মাথা খারাপ করব না। পরে দেখা যাবে,” এই ভেবে মন থেকে অশুভ চিন্তাটা সরিয়ে রাখল। কে জানে যদি দৃঢ়তায় চিড় ধরে! বাড়ি সবাইকে আজ রাত্রেই জানিয়ে দিতে হবে যে টাকা ধার নেওয়ার চেষ্টায় ও অ্যাটলান্টা যাচ্ছে। দরকার পড়লে খামার বন্ধক রাখবে। এখন ওদের এটুকু জানলেই চলবে। কপালে না থাকলে একদিন না একদিন হয়ত সত্যিটা জেনেই যাবে। কী আর করা!
লড়াইয়ে নামার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হতেই মাথা সোজা করে পেছনে হেলান দিয়ে বসল। কাজটা যে খুব সহজ হবে না, জানে। আগে রেটই ওর খোশামোদ করতেন, আর ও ছড়ি ঘোরাতো। এখন নিজেই ভিখারি, ভিখারির ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা থাকে না।
“তবে, ভিখারির মত ওঁর কাছে মোটেই যাব না। যাব রাণীর মতই, ভক্তের আবেদন পূরণ করতে যাচ্ছি যেন। উনি জানতেও পারবেন না।”
লম্বাআয়নাটার সামনে এসে দাঁড়াল। ভাল করে দেখল নিজেকে। মাথা সোজা রেখে। চলটা উঠে যাওয়া আয়নার কাঁচে যাকে দেখতে পেল তাকে যেন চেনাই যায় না। যেন গোটা একটা বছরে এই প্রথমবার নিজেকে দেখছে। রোজ সকালে একবার করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক ঝলক দেখে নেয় চোখমুখ সাফসুৎরো আছে কিনা, আর চুলটা উস্কোখুস্কো দেখাচ্ছে কিনা। কিন্তু কাজের এতই চাপ থাকে যে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখা হয়েই ওঠে না। কিন্তু এ যে নিজেকে চেনাই যাচ্ছে না! গাল তুবড়ে যাওয়া, রুগ্ন মেয়েটা স্কারলেট ও’হারা হতেই পারে না! সেই লাস্যময়ী, চটুল, হাসিখুশি স্কারলেট ও’হারা গেল কোথায়? যে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে, তার মধ্যে লাবণ্যের চিহ্নমাত্র নেই! কোথায় গেল সেই চিরপরিচিত পুরুষ ভোলানো দৃষ্টি? পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত চেহারা, তির্যক সবুজ চোখের ওপরের কালো ভুরু পাণ্ডুর ত্বকের ওপর ভয়াতুর পাখির ডানার মত তটস্থ হয়ে জেগে আছে। কাঠিন্য আর ত্রস্তভাব মুখের কমনীয়তা শুষে নিয়েছে।
“ওকে পটিয়ে ফেলার মত সুন্দরী আমি আর নেই!” ভাবল মনে মনে। আবার হতাশা ঘিরে ধরল ওকে। “কী রোগা হয়ে গেছি আমি – ওহ্, কী ক্ষয়াটে চেহারা আমার!”
গালে হাত বোলালো। কণ্ঠার হাড়ে হাত দিতেই চমকে উঠল। শেমিজ ভেদ করে তাকিয়ে আছে। স্তন দুটোও চুপসে ছোট হয়ে গেছে, প্রায় মেলানির মতই ছোট ছোট। বড় দেখানোর জন্য ওকে ব্রা-এর নীচে কাপড় গুঁজতে হয়। এই ধরণের ছলচাতুরির আশ্রয় যেসব মেয়েরা নেয়, এতদিন তাদের করুণার চোখেই স্কারলেট দেখে এসেছে। কাপড় গোঁজা! চকিতে আরও একটা দুশ্চিন্তার উদয় হল। কী পোশাক পরে যাবে? পরনের পোশাকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। জায়গায় জায়গায় তালি লাগানো পোশাকটা দুই হাতে মেলে ধরল। রেটের পছন্দ সুবেশা মহিলারাই, যারা কেতাদুরস্ত পোশাক পরে। শোকাবাস ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর যে পোশাকটা প্রথম পরেছিল – পাড় লাগানো সবুজ পোশাক আর পাখির পালক লাগানো সবজে বনেট, যেটা রেট ওকে এনে দিয়েছিলেন – সেগুলোর জন্য মন কেমন করতে লাগল। পোশাকটা পরার পর রেট উচ্চৈঃস্বরে তারিফ করেছিলেন ওর, সেকথাও মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে এমি স্ল্যাটারির পাড় দেওয়া লাল রঙের পোশাক, ফিতে বাধা লাল রঙের জুতো আর মাথার ওপর প্যানকেকের মত থ্যাবড়া করে বসানো টুপিটার কথাও মনে পড়ে গেল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অবজ্ঞার হাসি খেলে গেল। দৃষ্টিকটু হলেও পোশাকগুলো নতুন আর কেতাদুরস্ত তো বটেই, সহজেই নজর কাড়ে। নজর কাড়তে পারাটাই যে খুব দরকার! বিশেষ করে রেট বাটলারের নজর! এই ছেঁড়াখোঁড়া পুরনো পোশাকে ওকে দেখলেই উনি বুঝে যাবেন যে টারাতে এখন সবকিছুই গোলমেলে। আর সেটা ওঁকে বুঝতে দেওয়া চলবে না।
কী বোকাই না ও, ভেবেছিল অ্যাটলান্টায় চলে গেলেই ওঁকে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাবে! এই অস্থিচর্মসার গ্রীবা, ক্ষুধার্ত বেড়ালের মত দৃষ্টি আর শতচ্ছিন্ন পোশাকে ওঁর সামনে গিয়ে হাজির হলে! যখন ও খুব সুন্দরী ছিল, অনেক কেতাদুরস্ত পোশাক ছিল ওর, তখনও ওঁর কাছ থেকে কোনো কথা আদায় করতে পারেনি, আর এখন এই বিশ্রী চেহারা নিয়ে, তালি মারা পোশাক পরে কী করে ভাবতে পারল যে ওঁকে পটিয়ে ফেলবে? মিস পিটির কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে অ্যাটলান্টার সবার চাইতে ওঁর টাকাকড়ি অনেক বেশি। চাইলেই হয়ত যে কোনো সুন্দরী মহিলাকে – সে ভালই হোক কী মন্দ – উনি বাগে আনতে পারেন। “ভাল কথা,” গোমড়া মুখে স্কারলেট ভাবল, “আমার এমন একটা জিনিস আছে, যেটা সুন্দরী মহিলাদের নেই – সেটা হল আমার দৃঢ় প্রত্যয় – আর যা সিদ্ধান্ত নেবার আমি নিয়ে নিয়েছি। একটা যদি ভদ্র সমাজে চলার মত পোশাক জোগাড় করতে পারতাম …”
কিন্তু ভদ্র সমাজে চলার মত পোশাক টারায় কারো কাছে নেই, বা এমন পোশাক যাতে অন্তত বারদুয়েক রিফু না করা হয়েছে।
“সেটাই সমস্যা,” ম্রিয়মাণ চোখে মেঝের দিকে তাকাল। এলেনের শ্যাওলা রঙের ভেলভেটের কার্পেটটার ওপর নজর পড়ল। জীর্ণ হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় দুমড়ে গেছে, ছিঁড়ে গেছে, দাগ পড়েছে – অসংখ্য মানুষ এই কার্পেটে শুয়ে রাত কাটানোর ফলে। মনটা খারাপ হয়ে গেল, মনে হল ঠিক ওরই মত টারারও জীর্ণ দশা। অন্ধকার ঘনিয়ে আসা ঘরটা ওকে আরও বিষণ্ণ করে ফেলল। জানলার কাছে গিয়ে পর্দাগুলো উঠিয়ে, জানলার কবাট খুলে শীতের সূর্যাস্তের শেষ রশ্মিটুকু ঘরে আসতে দিল। জানলাগুলো বন্ধ করে দিয়ে ভেলভেটের পর্দার ওপর মাথা রেখে সমাধিক্ষেত্রের সেডারের সারি ভেদ করে আবছা বনভূমির দিকে চেয়ে রইল।
শ্যাওলা সবুজ ভেলভেটের নরম পর্দার ছোঁয়া লেগে গাল কুটকুট করছে। কৃতজ্ঞচিত্তে সেই পর্দার ওপর মুখ ঘষতে থাকল, বেড়ালের মত। তারপর চকিতে পর্দাগুলো ভাল করে দেখল।
মিনিটখানেক পরে শ্বেতপাথর বসানো ভারি টেবিলটা মেঝের ওপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে নিয়ে চলল। মর্চে পড়া চাকাগুলো প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল। টেবিলটা জানলার নিচে দাঁড় করালো। তারপর স্কার্ট সামলে ওটার ওপর উঠে পড়ল। পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে পর্দা টাঙানোর ভারি ছত্রিগুলো ধরে টান মারল। তাড়াহুড়ো করে টান মারায় কাঠের ওপর থেকে পেরেক উপড়ে গিয়ে পর্দাগুলো ছত্রি সমেত ঝপাত করে মেঝেতে পড়ে গেল।
আর তখনই যেন মন্ত্রবলে বসার ঘরে দরজা খুলে গেল আর ম্যামির চওড়া কালো মুখটা দেখা গেল। মুখের প্রতিটা বলিরেখায় অদম্য কৌতুহল আর গভীর সন্দেহ ফেটে বেরোচ্ছে। স্কারলেটের স্কার্ট হাঁটুর ওপরে ওঠা, টেবিল থেকে লাফ মেরে মেঝেতে নামবার জন্য তোড়জোড় করছে। ম্যামি খুব অসন্তুষ্টভাবে ওর দিকে তাকাল। স্কারলেটের চোখেমুখে উত্তেজনা আর বিজয়ীর হাসি – সহসা ম্যামির অবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল।
“মিস এলেনের পর্দাগুলো নিয়ে কী করা হচ্ছে শুনি?” ম্যামি কৈফিয়ত চাইল।
“দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে কী শোনা হচ্ছিল?” স্কারলেট পালটা প্রশ্ন করল, টেবিল থেকে ঝটপট নেমে এসে ধুলো মাখা ভারি ভেলভেটটা গুছিয়ে তুলতে তুলতে।
“আড়ি পাতার দরকার পড়ে না,” ম্যামিও সমান তেজে জবাব দিল। একপ্রস্থ লড়াইয়ের জন্য কোমর বাঁধল। “মিস এলেনের পর্দা নিয়ে যা খুশি তাই করতে পার না তুমি! পেরেক উপড়ে ছত্রিশুদ্ধ মেঝের ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে! পর্দাগুলো কত প্রিয় ছিল ওঁর, আর তুমি কিনা এইভাবে এগুলোর হেলাফেলা করছ!”
স্কারলেট ওর সবুজ চোখদুটো ম্যামির ওপর রাখল, দুষ্টুমিতে ভরা চোখ, কতদিন আগে এই দস্যি বাচ্চা মেয়েটা হারিয়ে গেছে বলে এখনও ম্যামি মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে।
“চিলেকোঠার ঘর থেকে আমার নক্সার বাক্সটা চট করে নিয়ে এস তো, ম্যামি,” ম্যামিকে হালকা করে ঠেলা মেরে চেঁচিয়ে বলে উঠল। “নতুন একটা পোশাক বানাব, নিজের জন্য।”
দুশো মন ওজনের শরীর নিয়ে ছুটোছুটি করা, বিশেষ করে চিলেকোঠার ঘরে যাওয়ার জন্য, আর মনের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকা বিকট এক সন্দেহ, কোনটার জন্য ওর রেগে যাওয়া উচিত, সেটা নিয়ে ম্যামির মনে দ্বন্দ্ব চলতে লাগল। স্কারলেটের হাত থেকে পর্দাটা ছিনিয়ে নিয়ে ঝুলে পড়া বিশাল বুকের ওপর জড়িয়ে ধরল, যেন ওগুলো পবিত্র কোনও স্মৃতি।
“মিস এলেনের পর্দা কেটে কিছুতেই তুমি নতুন পোশাক বানাতে পারবে না, সেটাই যদি তুমি ভেবে থাক। অন্তত আমার দেহে প্রাণ থাকতে নয়।”
‘গোঁয়ারগোবিন্দ’ বলতে ম্যামি যা বোঝে, ওর অল্পবয়সী মালকিনের চোখে পলকের জন্য সেই ভাবটাই লক্ষ্য করল। অবশ্য পরমুহূর্তে সেই ভাবটা কেটেও গেল। স্কারলেট এমনভাবে হাসল যে ম্যামির পক্ষে বাধা দেওয়াটা মুশকিল হয়ে পড়ল। তবে বুড়ি বোকা বনবার পাত্রী নয়। মিস স্কারলেটকে ও হাড়ে হাড়ে চেনে, তাই বুঝতে কষ্ট হল না যে নিজের কার্যসিদ্ধির খাতিরেই স্কারলেট ওই হাসির চাল চেলেছে আর কোনোভাবেই ওকে নিরস্ত করা যাবে না।
“অবুঝ হোয়ো না, ম্যামি। কিছু টাকা ধার করার জন্য আমাকে অ্যাটলান্টা যেতে হবে, তাই একটা নতুন পোশাকের আমার খুব প্রয়োজন।”
“নতুন পোশাকের কোনও দরকার নেই তোমার। একজন মহিলারও নতুন পোশাক নেই। ওরা সবাই পুরনো পোশাকই পরে, আর গর্বের সঙ্গেই পরে। মিস এলেনের মেয়ে কেন ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরতে পারবে না, সেটা আমার মাথাতেই আসছে না। সিল্কের পোশাকের চেয়ে ওই পোশাকেই সবাই তোমাকে বেশি সম্মান দেবে।”
গোঁয়ারগোবিন্দ ভাবটা আবার স্কারলেটের চোখে ফুটে উঠতে লাগল। হে ভগবান, কেন যে স্কারলেট যত বড় হচ্ছে, ওর মধ্যে মিস্টার জেরাল্ডের স্বভাবটা বেশি করে ফুটে উঠছে আর মিস এলেনের সঙ্গে মিলটা কমে যাচ্ছে!
“দেখ, ম্যামি, আন্ট পিটি লিখেছেন যে এই শনিবার মিস ফ্যানি এলসিং-এর বিয়ে হবে, আর সেই বিয়েতে আমাকে তো যেতেই হবে। ফলে বিয়েতে পরবার জন্য নতুন একটা পোশাক তো আমার দরকার।”
“যে পোশাকটা তুমি এখন পরে আছ, মিস ফ্যানির বিয়ের পোশাকের মতই সুন্দর সেটা। মিস পিটি তো লিখেই ছিলেন যে এলসিং-রা ভীষণ গরীব হয়ে গেছেন।”
“কিন্তু নতুন একটা পোশাক আমার লাগবেই! ম্যামি, তুমি বোধহয় জানো না, টাকাটা জোগাড় করা আমাদের কতটা দরকার। খাজনার – ”
“হ্যাঁ ম্যাম, খাজনার ব্যাপারটা আমার জানা আছে, কিন্তু – ”
“সত্যিই জানো তাহলে?”
“হ্যাঁ ম্যাম, ভগবান আমাকে একজোড়া কান দিয়েছেন, শোনবার জন্যই, তাই না? আর কথা বলবার সময় মিস্টার উইল যখন দরজাটা ভেজিয়েও দেয় না।”
এমন কিছুই কি নেই যা ম্যামির কান পর্যন্ত পৌঁছবে না? স্কারলেটের বিশ্বাসই হতে চায় না, ওই বিশাল বপু – চলাফেরার সময় যখন বাড়ি কাঁপিয়ে দেয় – নিয়ে ইচ্ছে করলেই কী ভাবে একটুও শব্দ না করে এসে আড়ি পাততে পারে!
“ভাল কথা। এসব কথা তুমি যদি শুনেই থাক, তাহলে নিশ্চয়ই জোনাস উইল্কারসন আর ওই এমি কী – ”
গনগনে চোখে ম্যামি বলল, “হ্যাঁ, ম্যাম।”
“তাহলে বোকার মত কথা বলছ কেন, ম্যামি? বুঝতে পারছ না, অ্যাটলান্টা আমাকে যেতেই হবে, খাজনার টাকা জোগাড় করার জন্য? কিছু টাকা আমাকে পেতে হবে, পেতেই হবে!” দু’হাত মুঠো পাকিয়ে একটা দিয়ে অন্যটাকে ঘুসি মেরে বলে উঠল। “দিব্যি কেটে বলছি, ম্যামি, ওরা আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াব তখন? এমি স্ল্যাটারির মত একটা জঞ্জাল, মাকে যে মেরে ফেলল আর যে কিনা এই বাড়ি দখল করে মায়ের শোওয়া খাটেই শোওয়ার স্বপ্ন দেখছে, আর তুমি কিনা মায়ের এই পর্দার মত একটা ছোট্ট ব্যাপার নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া করে চলেছ?”
“না, ম্যাম, মিস এলেনের বাড়িতে আমি কোনো আবর্জনা দেখতে চাই না, আর আমরা পথে গিয়ে বসি, সেটাও চাই না, কিন্তু – ” হঠাৎ সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে স্কারলেটকে বিদ্ধ করে ফেলল। “তা টাকা জোগাড় করার জন্য কার কাছে যাওয়া হচ্ছে শুনি? যার জন্য নতুন পোশাক না হলেই চলছে না?”
“সেটা,” চমকে উঠে বলল, “একেবারেই আমার নিজের ব্যাপার।”
মর্মভেদী দৃষ্টিতে ম্যামি ওকে দেখল। স্কারলেট যখন ছোট ছিল আর কোনও অপকর্ম করে বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত দিয়ে সেটা ঢাকার চেষ্টা করত, তখনও ম্যামি ঠিক এইভাবেই ওর দিকে তাকাত। মনে হল ও যেন স্কারলেটের মনের কথা পড়ে নিচ্ছে, তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও ও চোখ নামিয়ে নিতে হল। মতলবটা মাথায় পর প্রথম যে অপরাধবোধের সঞ্চার হয়েছিল, সেটা আবার ফিরে আসছে।
“তাহলে ব্যাপারটা হল, টাকা ধার করার জন্য তোমার একটা আনকোরা নতুন পোশাক লাগবে। কথাটা যেন কেমন কেমন শোনাচ্ছে। আর টাকাটা কোথা থেকে আসবে, সেটা নিয়ে কিছু বলবে না।”
“না, সেটা আমি বলছি না,” বিরক্ত হয়ে স্কারলেট বলল। “ওটা আমার নিজস্ব ব্যাপার। যাই হোক, পর্দাটা আমাকে দেবে কিনা বল, আর পোশাকটা বানাতে আমার সঙ্গে হাত লাগাবে তো?”
“ঠিক আছে,ম্যাম,” ম্যামির সুর নরম। ভাবান্তরটা এমন চকিতে ঘটল যে স্কারলেটের মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। “ওটা বানাতে আমি তোমার সঙ্গে হাত লাগাব। পর্দার সাটিনের লাইনিং দিয়ে একটা পেটিকোটও তৈরি করতে হবে। তাছাড়া লেসের ছাঁট লাগিয়ে একজোড়া পাজামাও বানাতে হবে।”
ভেলভেটের পর্দাটা স্কারলেটের হাতে ফেরত দেওয়ার সময় ওর ঠোঁটের কোণে চতুর হাসি খেলে গেল।
“মিস মেলি তোমার সঙ্গে অ্যাটলান্টা যাচ্ছেন, মিস স্কারলেট?”
“না,” তীক্ষ্ণ গলায় স্কারলেট বলল। ধীরে ধীরে ম্যামির মতলবটা পরিষ্কার হয়ে আসছে ওর কাছে। “আমি একাই যাচ্ছি।”
“সেটা তুমি ভেবে থাকতে পার,” দৃঢ়স্বরে ম্যামি বলল, “তবে আমি তোমার সঙ্গেই যাচ্ছি, আর তোমার ওই নতুন পোশাকটাও। একটা পাও তোমাকে একা ছাড়ছি না।”
পলকের জন্য ওর অ্যাটলান্টার যাত্রার ছবিটা স্কারলেটের কল্পনায় ভেসে উঠল। রেটের সঙ্গে ওর কথোপকথন, আর কালো শিকারি কুকুরের মত ম্যামি পেছনে দাঁড়িয়ে গনগনে চোখে ওর দিকে চেয়ে আছে। ও আবার হেসে ফেলল, তারপর ম্যামির বাহুতে হাত রাখল।
“মিষ্টি সোনা ম্যামি আমার, কী ভাল তুমি, আমার সঙ্গে যেতে চাইছ, আমাকে সাহায্য করবে বলে। কিন্তু তুমিই বল, তুমি না থাকলে এখানে সকলের কত অসুবিধে হবে? টারা কী ভাবে চালাতে হয়, সেটা তোমার চেয়ে ভাল কে জানে?”
“হুঁহ্!” বলল ম্যামি। ওই সব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমাকে ভোলাতে পারবে না, মিস স্কারলেট। প্রথম যেদিন তোমাকে ডায়াপার পরিয়েছিলাম, সেদিন থেকে তোমায় চিনি আমি। বলেছি যখন তোমার সঙ্গে আমি অ্যাটলান্টায় যাব, তখন তোমার সঙ্গে যাবই। একা একা তুমি গেলে, মিস এলেন কবরে শুয়ে থেকেও স্বস্তি পাবেন না – যত রাজ্যের ইয়াঙ্কি, ছাড়া পাওয়া নিগার আর যত সব আজেবাজে লোকে ছেয়ে গেছে শহরটা।”
“কিন্তু আমি তো আন্ট পিটিপ্যাটের ওখানে থাকব,” স্কারলেট মরিয়া হয়ে ম্যামিকে নিরস্ত করার চেষ্টা করল।
“মিস পিটিপ্যাট খুবই ভাল মানুষ। উনি ভাবেন সব দিকেই ওঁর চোখ খোলা থাকে। কিন্তু আসলে থাকে না,” ম্যামি এই ব্যাপারে আলোচনায় দাঁড়ি টেনে দেওয়ার ভঙ্গীতে কর্তৃত্বব্যঞ্জক সুরে বলল। তারপর হলঘরে চলে গেল। শরীরের ভারে তক্তাগুলো মচমচ শব্দ করে উঠল। চেঁচিয়ে ডাকল –
“প্রিসি বাছা! সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে ওপরে গিয়ে চিলেকোঠার ঘর থেকে মিস স্কারলেটের নক্সার বাক্সটা নিয়ে এসো তো! কাঁচিটাও খুঁজে আনবে, খুজতে গিয়ে আবার রাত কাবার করে দিও না যেন!”
“ভারি মুশকিলে পড়া গেল তো,” হাল ছেড়ে দিয়ে স্কারলেট ভাবতে লাগল। “খুব শিগরিরই একটা শিকারি কুকুর আমার পিছু নিল বলে!”
* * *
সাপারের টেবিল সাফ হয়ে যাবার পর, স্কারলেট আর ম্যামি নক্সাগুলো খাবার টেবিলের ওপর ছড়িয়ে নিল। স্যুয়েলেন আর ক্যারিন পর্দা থেকে সাটিনের লাইনিংটা খুলতে লাগল। একটা পরিষ্কার চুলের ব্রাশ দিয়ে মেলানি ভেলভেট থেকে ধুলো ঝাড়তে লাগল। জেরাল্ড, উইল আর অ্যাশলে ঘরের এক দিকে বসে ধুমপান করতে লাগলেন আর মেয়েদের শোরগোল দেখে মিটি মিটি হাসতে লাগলেন। একটা খুশি খুশি ভাব – স্কারলেটের থেকে সঞ্চারিত হয়ে যেন সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল। এমন একটা উত্তেজনা, যেটার কারণ পুরোপুরি কেউই বোঝেনি। স্কারলেটের মুখ থেকে খুশি ঠিকরে পড়ছে, চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, আর খুব হাসছে। ওকে হাসতে দেখে সকলেরই ভাল লাগছে। কত মাস হয়ে গেল, কেউ ওকে প্রাণ খুলে হাসতে দেখেনি। বিশেষ করে জেরাল্ডের হাসি আর ধরে না। ওঁকে অন্যদিনের চেয়ে অনেক কম অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। স্কারলেটের চলাফেরা খুব মন দিয়ে নজর করছিলেন, কাছে এসে পড়লেই ওর পিঠও চাপড়ে দিচ্ছিলেন। মেয়েরাও যেন বলডান্সের প্রস্তুতি নিচ্ছে এইরকম উত্তেজিত লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন যে যার নিজের নিজের বলডান্সের পোশাক সেলাই করতে ব্যস্ত।
টাকা ধার করবার জন্য স্কারলেট অ্যাটলান্টা যাচ্ছে, দরকার পড়লে টারাকে বন্ধক রাখবে। কিন্তু বন্ধক রাখাটা কী আর এমন ব্যাপার? স্কারলেট তো বলছেই সামনের বছর তুলো বিক্রির টাকা দিয়ে খুব সহজেই দেনা মিটিয়ে দেওয়া যাবে, তারপরেও কিছু টাকা বেঁচে যাবে। কথাটা ও এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছে যে এটা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা কারও মনেই আসেনি। যখন ওরা জিগ্যেস করল, টাকাটা কে ধার দেবে, তখন স্কারলেট “অতিরিক্ত কৌতুহল ভাল নয়” কথাটা এমন খেলার ছলে বলল যে সবাই হেসে উঠল আর ওর কোটিপতি বন্ধুকে নিয়ে ওর পেছনে লাগতে লাগল।
“সেটা ক্যাপটেন বাটলার না হয়েই যান না,” মেলানি সেয়ানাভাব দেখিয়ে বলে উঠল, আর ব্যাপারটা এতই হাস্যকর ঠেকল যে সবাই মিলে অট্টহাস্য করে উঠল। স্কারলেট যে ওঁকে কতটা ঘৃণা করে সেটা তো কারও অজানা নয়। “ইতর” এই বিষেষণ না লাগিয়ে স্কারলেট রেট বাটলারের নামটাও মুখে আনে না।
তবে স্কারলেট এই হাসিতে গলা মেলাতে পারল না। আর অ্যাশলে হেসে উঠেও চুপ করে গেল। দেখল ম্যামি ভ্রূকুটি করে আড়চোখে স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে আছে।
হালকা হাসিখুশি পরিবেশ সহসা স্যুয়েলেনের হৃদয়কে দরাজ করে তুলল, নিজের আইরিশ লেসের কলারটা নিয়ে চলে এল। সামান্য জীর্ণ হয়ে গেলেও জিনিসটা এখনও নজর কাড়ে। ক্যারিন আবদার করতে লাগল স্কারলেট যেন ওর স্লিপারটা পায়ে দিয়েই অ্যাটলান্টা যায়। টারার অন্যান্য স্লিপারের তুলনায় ওটাই এখনও কিছুটা ভদ্রস্থ রয়েছে। মেলানি ম্যামিকে অনুরোধ করল যেন ভেলভেটের বেশ কিছুটা ছাঁট ওকে দেওয়া হয় যাতে ক্ষতবিক্ষত বনেটের কাঠামোটা চলনসই করে দিতে পারে। তারপর যখন ও বলল বুড়ো মোরগটা যদি সময় থাকতে জলাভূমিতে পালিয়ে যেতে না পারে, তাহলে বেচারাকে ওর জমকালো তামাটে সবুজ কালো পালকটার মায়া ত্যাগ করতে হবে, তখন সবাই জোরে জোরে হেসে উঠল।
স্কারলেট ওদের পটু হাতের সেলাই-ফোঁড়াই দেখতে দেখতে আর জোরে জোরে হেসে ওঠা শুনতে তিক্ততা আর ক্ষোভ মনের ভেতরেই লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগল।
“ওরা কেউ কল্পনাই করতে পারবে না, ওর সঙ্গে বা ওদের সঙ্গে বা দক্ষিণের সঙ্গে সত্যি সত্যি কী ঘটতে চলেছ। সব কিছু জেনেও ওরা এখনও ভাবছে যে সাংঘাতিক কিছু ওদের ওপর ঘটতেই পারে না, কারণ ওরা যে সবাই ও’হারা কিংবা উইল্কস কিংবা হ্যামিলটন। এমনকি ডার্কিরাও এটাই ভাবছে! মূর্খের দল সব! ওরা কখনও বুঝেও বুঝবে না! আজীবন ওরা এভাবেই ভাববে, এভাবেই দিন কাটাবে, কোনোকিছুই ওদের বদলাতে পারবে না। মেলি হয়ত জীর্ণ পোশাক পরে তুলো ওঠাবে এবং দরকার পড়লে আমাকে মানুষ খুন করার জন্যও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু তাহলেও ওর মধ্যে বদল আসবে না। এত কিছুর পরেও ও সেই লাজুক, সুশিক্ষিত মিসেজ় উইল্কসই থেকে যাবে – একজন নিখুঁত ভদ্রমহিলা! আর অ্যাশলে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখবে, আহত যুদ্ধবন্দি হয়ে কয়েদখানায় পচবে, কপর্দকশূন্য হয়ে বাড়ি ফিরবে, তবুও টুয়েল্ভ ওকসের হারিয়ে যাওয়া বাবুগিরি আঁকড়ে ভদ্রলোক হয়েই থেকে যাবে। উইল অবশ্যই অন্যরকম। কত ধানে কত চাল সেটা ও বোঝে, তবে ওর তো হারিয়ে ফেলার মত কিছু কোনোদিনই ছিল না। স্যুয়েলেন আর ক্যারিন – ওরা তো ভাবছে এটা শুধুই সাময়িক একটা দুঃসময়। বদলে যাওয়া পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য নিজেদেরও যে বদলে নেওয়া দরকার, সেটা ওরা মনেই করে না, ভাবে খুব শিগগিরই সব আবার আগের মত হয়ে যাবে। ভাবে ঈশ্বর ওদের সহায়, জাদুমন্ত্রবলে সব ঠিকঠাক করে দেবেন। উনি মোটেই সেরকম কিছু করবেন না। একটাই জাদু কাজ করবে, আর সেটা আমিই করতে চলেছি। রেট বাটলারকে মানাতে হবে … ওরা বদলাবে না। কে জানে ওরা হয়ত বদলাতে জানেই না। আমিই শুধু বদলে গেছি – আমিও বদলাতাম না – যদি সেই সুযোগ আমার থাকত।”
সব কিছুর শেষে ম্যামি ছেলেদের খাবার ঘর থেকে বের করে দরজা বন্ধ করে দিল, যাতে মাপটা ঠিক মত নেওয়া যায়। পোর্ক ধরে ধরে জেরাল্ডকে ওপরতলায় নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। অ্যাশলে আর উইল বাড়ির সামনের হলঘরে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। তামাক মুখে নিয়ে উইল শান্ত মুখে জাবর কেটে চলল। কিন্তু মনের ভেতর অশান্তি হচ্ছিল।
“এই অ্যাটলান্টা যাওয়ার ব্যাপারটা,” শেষমেশ থেমে থেমে বলেই ফেলল, “আমার কেমন যেন ভাল লাগছে না। একেবারেই ভাল লাগছে না।”
উইলের দিকে চকিত দৃষ্টিক্ষেপ করেই অ্যাশলে অন্য দিকে চোখ ফেরাল। মুখে কিছু বলল না বটে, কিন্তু মনে মনে ভাবতে লাগল, যে অস্বস্তিকর খটকা ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, সেটা কি উইলকেও তাড়া করছে। কিন্তু সেটা কী ভাবে সম্ভব? ফলের বাগানে কী হয়েছিল সেটা তো ওর জানার কথা নয়। স্কারলেট কী মরিয়াই না হয়ে উঠেছিল সেদিন! রেট বাটলারের নামটা যখন করা হল তখন ম্যামির মুখের কী অবস্থা হয়েছিল, সেটা উইল লক্ষ্য করে থাকতেই পারে না। রেটের টাকাকড়ি আর বদনাম নিয়েও উইলের কিছু জানা থাকার কথা নয়। অন্তত অ্যাশলের মনে হল এগুলো উইলের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে টারায় আসার পর থেকে লক্ষ্য করেছে, ঠিক ম্যামির মতই উইলও, ওকে বলতে হয় না, নিজে থেকেই সব কিছু জেনে ফেলে, কী অঘটন ঘটতে পারে তার আন্দাজও করে ফেলে। বাতাসে কী যেন এক বিপদের ইঙ্গিত, ঠিক কী ধরণের, অ্যাশলে জানে না, কিন্তু স্কারলেটকে এই বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা ওর নেই। সারা সন্ধ্যে স্কারলেট একবারও ওর চোখে চোখ রাখেনি। ওর সঙ্গে সারাক্ষণ যে উচ্ছলতার ভিনয় করে গেছে সেটা বেশ ভয় পাইয়ে দেওয়ার মত। যে সন্দেহটা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে, সেটা এতই ভয়ানক যে মুখে উচ্চারণ করাও যাবে না। যদি সত্যিও হয়, স্কারলেটকে অপমান করার কোনও অধিকারই ওর নেই। প্রবল অস্বস্তিতে দু’হাত মুঠো পাকিয়ে ফেলল। স্কারলেটকে কিছু বলার কোনো অধিকারই ওর নেই; আজ বিকেলেই সেই অধিকারটা ও খুইয়ে ফেলেছে। চিরতরে। ওর সাহায্যে লাগতে পারেনি। ওর সাহায্যে লাগার সাধ্য কারোই নেই। তবে ভেলভেট কাটার সময় ম্যামির গম্ভীর মুখে যে দৃঢ় সংকল্পের আভাস পেয়েছিল, সেটা মনে করে একটু স্বস্তি পেল। স্কারলেট পছন্দ করুক চাই না করুক, ম্যামি ঠিকই ওর খেয়াল রাখবে।
“এই সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী,” হতাশ মনে ভাবল। “আমিই এই পরিস্থিতির দিকে ওকে ঠেলে দিয়েছি!”
বিকেলবেলা ওর দিকে পেছন ঘুরে চলে যাবার সময়ে স্কারলেটের ঋজু দৃঢ়বদ্ধ কাঁধ আর উঁচিয়ে রাখা জেদি মাথাটা অ্যাশলের চোখের সামনে ভেসে উঠল। স্কারলেটের জন্য ওর হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যেতে লাগল, শ্রদ্ধায় ওর মাথা নত হয়ে এল, নিজের অসহায়তাকে ধিক্কার দিল। ও ভাল করেই জানে, স্কারলেটের শব্দভাণ্ডারে শৌর্য বলে কোনও কথা নেই, এটাও জানে যে যদি বলে ওর থেকে শৌর্যশালী আর কাউকেই ও দেখেনি, তাহলে স্কারলেট ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে চেয়ে থাকবে কিছু না বলে। স্কারলেটকে শৌর্যশালী বলে মনে মনে ওর মধ্যে কত সুক্ষ্ম গুণের সমাহার দেখতে পায়, সেটাও ও বুঝতে পারবে না জীবন যেভাবে দেখা দেয়, স্কারলেট সেটাকেই স্বীকার করে নেয়, কোনো রকম বাধাবিপত্তি গ্রাহ্য করে না, মনের জোরে লড়াই চালিয়ে যায়, কারণ ও হেরে যেতে শেখেনি। নিশ্চিত হারের মুখোমুখি হয়েও ও লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে।
গত চার বধর ধরে, এমন অনেককেই ও দেখেছে, যার হার মেনে নিতে অস্বীকার করেছে, শৌর্যশালী বলেই ওরা নিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে অকুতোভয়ে এগিয়ে গেছে। তবুও ওদের হারতেই হয়েছে।
ছায়া ছায়া হলঘরে উইলের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হল যে স্কারলেট ও’হারার মত এমন শৌর্যশালী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আগে ওর পরিচয় ঘটেনি যে ওর মায়ের ভেলভেটের পর্দায় সজ্জিত হয়ে আর মোরগের ল্যাজের পালক মাথায় লাগিয়ে বিশ্বজয় করার জন্য বেরিয়ে পড়ার তোড়জোড় করছে।
ঘরে ঢুকে যেই দরজা বন্ধ করতে যাবে, ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে এল। গাড়িবারান্দার দিকে তাকাল। এই অসময়ে আতিথেয়তা করতে হলে বড়ই ঝকমারি হবে। তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ঢুকে পড়তে হবে, মাথা ধরার দোহাই দিয়ে।
কিন্তু ঘোড়ার গাড়িটা কাছাকাছি আসতেই, ও এত অবাক হয়ে গেল যে পালানোর ইচ্ছেটাই চলে গেল। একেবারে নতুন গাড়ি, ঝকঝক করছে, এমনকি জিনটাও নতুন, জায়গায় জায়গায় পেতলের কারুকাজ, চকচক করছে। অপরিচিত কেউই হবে। ওর চেনা পরিচিতদের মধ্যে এরকম রাজকীয় আগমন করার মত সামর্থ্য একজনও নেই।
দরজা আগলে দাঁড়িয়ে ও দেখতে লাগল। ভিজে গোড়ালির চারপাশের স্কার্টের ওপর ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝটকা লাগছে। বাড়ির সামনে এসে গাড়িটা থামল। জোনাস উইল্কারসন নেমে এল। ওদের পুরণ ওভারসিয়ার এত ভাল একটা গাড়ি চালিয়ে আসছে, গায়ের ওপর ওভারকোটটাও বেশ জমকালো – এতই আশ্চর্যের ব্যাপার যে স্কারলেট নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। উইল অবশ্য বলেছিল, ফ্রীডম্যান’স ব্যুরোতে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই ওকে খুব সমৃদ্ধশালী দেখায়। অনেক টাকা কামিয়ে নিয়েছে, কথাটা উইল বলেছিল বটে, নিগারদের বা সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে, কিংবা তুলো বাজেয়াপ্ত করে, এই বাহানায় যে এই সব তুলো নাকি কনফেডারেট সরকারের তুলো। এই রকম কঠিন সময়ে এত টাকা যে সদুপায়ে কামায়নি, তাতে আর সন্দেহ কী?
আর সেই মূর্তিমানই কিনা চমৎকার একটা গাড়ি থেকে নেমে, আর একজন মহিলাকে হাত ধরে নামিয়ে, এখানে এসে হাজির – ওর বরবাদ হয়ে যাওয়া থেকে মাত্র কয়েক পা দূরে। এক নজরেই স্কারলেট বুঝে গেল যে পোশাকের রঙটা বেশ চড়া, বেশ গেঁয়ো। তা সত্ত্বেও স্কারলেট হ্যাংলার মত পোশাকটা দেখতে লাগল। বহুদিন হয়ে গেল ফিটফাট নতুন পোশাক দেখার সৌভাগ্য পর্যন্ত হয়নি। আচ্ছা! আজকাল তাহলে পায়ের দিকের ঘেরটা আগের মত চওড়া রাখা হচ্ছে না! কুঁচি দেওয়া লাল রঙের গাউনটা দেখে স্কারলেট ভাবল। ভেলভেটের কালো আঙারাখাটা দেখে ভাবল জ্যাকেটের ঝুল আজকাল কত কম হয়! আরে, টুপিটাও যে বেশ কায়দার! আজকাল বনেট বোধহয় আর চলে না। এই টুপিটা লাল ভেলভেট দিয়ে প্রায় সমতল একটা ব্যাপার। কড়কড়ে একটা প্যানকেকের মত মহিলার মাথায় বসানো। বনেটের ফিতের মত এই টুপির ফিতেটা থুতনির নীচে বাঁধে দেওয়া নয়, টুপির পেছন দিয়ে বেরিয়ে আসা কোঁকড়া চুলের ওপর দিয়ে বাঁধা। মহিলার চুলের সাথে টুপিটার রঙ কিংবা জমিন যে বেমানান লাগছে, সেটাও স্কারলেট লক্ষ্য না করে পারল না।
মহিলা গাড়ির বাইরে পা রেখে বাড়ির দিকে তাকাল। পাউডার ঘসে ফর্সা করা খরগোশের মত ওই মুখটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে।
“আরে, এটা তো এমি স্ল্যাটারি!” এমন অবাক হয়ে গেছিল যে স্কারলেট চেঁচিয়ে বলে ফেলল।
“হ্যাঁ, ম্যা’ম, আমি এমিই বটে,” মাথা ঝাঁকিয়ে এমি বলে উঠল। মুখে কান এঁটো করা হাসি। তারপর সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
এমি স্ল্যাটারি! ওই নোংরা সাদা-চুলো বেশ্যাটা, যার জারজ বাচ্চাকে এলেন ব্যাপটাইজ় করেছিলেন! এই এমিই তো এলেনকে টাইফয়েড দিয়ে ওঁকে মেরে ফেলেছে! আর আজব পোশাক পরে, সেই নোংরা, চালচুলোহীন, বেজন্মা সাদা চামড়ার আবর্জনাটা টারার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাইছে! হাবভাব এমন যেন জায়গাটা ওরই! স্কারলেট এলেনের কথা ভাবল। মুহূর্তের মধ্যে ভাবপ্রবণ হয়ে পড়ে মনের থেকে শূন্যতাবোধটা কেটে গেল। রাগে একেবারে অন্ধ হয়ে গেল।
“সিঁড়ি থেকে নামো – নামো বলছি, নরকের কীট কোথাকার!” চেঁচিয়ে উঠল স্কারলেট। “এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও! দফা হয়ে যাও!”
এমি থতমত খেয়ে গেল। করুণ চোখে জোনাস-এর দিকে তাকাল। জোনাস ভুরু কুঁচকে এগিয়ে এল। ভেতরে ভেতরে রেগে গেলেও যথাসম্ভব সম্ভ্রম বজায় রাখার চেষ্টা করল।
“আমার স্ত্রীর সঙ্গে আপনি এভাবে কথা বলতে পারেন না,” জোনাস বলল।
“স্ত্রী?” বলে স্কারলেট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসিতে ঘেন্না ঝরে পড়ছে। “ভাল লাগল যে শেষমেশ তুমি ওকে বিয়ে করে নিয়েছ। তা তোমার বাকি ছোঁড়াগুলোকে ব্যাপটাইজ় করছে কে? আমার মাকে তো মেরে ফেললে!”
এমি অস্ফূটে “ওহ্” বলে তড়বড়িয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে গেল। কিন্তু জোনাস শক্ত মুঠোয় ওকে ধরে গাড়ির দিকে পালিয়ে যেতে দিল না।
“দেখা করার উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা এখানে এসেছিলাম – বলতে পারেন সৌজন্যমূলক সাক্ষাতের জন্যই,” খেঁকিয়ে উঠে বলল। “আর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে জরুরি কিছু আলোচনা – ”
“বন্ধু?” চাবুকের মত শোনাল স্কারলেটের কণ্ঠস্বর। “তোমার মত লোকের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব কবে হয়েছিল? স্ল্যাটারিরা আমাদেরই দাক্ষিণ্যে জীবন কাটিয়েছে, আর প্রতিদানে মাকে মেরে ফেলেছে – আর – তুমি – তুমি – বাপি তোমাকে জবাব দিয়েছিলেন – এমেরির ওই বেজন্মা বাচ্চাটার জন্য – সেটাও তোমার ভালমতই জানা। বন্ধু? মিস্টার বেন্টীন আর মিস্টার উইল্কসকে আমি ডাকতে বাধ্য হওয়ার আগেই, বেরিয়ে যাও বলছি!”
রাগে জোনাসের মুখ লাল হয়ে উঠল।
এই সব কথাবার্তা শুনে এমি ওর স্বামীর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে ক্যাটক্যাটে লাল ফিতে লাগানো লাল রঙের চামড়ার জুতো পায়ে গাড়ির দিকে ছুটল।
এবার জোনাস রাগে কাঁপতে শুরু করল। ওর আর স্কারলেটের রাগ এখন সমান সমান। ফ্যাকাসে মুখ লাল টকটক করছে।
“এখনও খুব দেমাক, তাই না? তোমাদের ব্যাপারে আমার সব খবর জানা আছে। আমি জানি যে তোমাদের পায়ে গলাবার মত জুতোই নেই। এটাও জানি যে তোমার বাবার মাথার ঠিক – ”
“চলে যাও এখান থেকে!”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, তোমার ওই মেজাজ আর বেশিদিন টিকবে না। তুমি যে সর্বস্বান্ত, সে আমার জানা। এমনকি খাজনা দেওয়ার টাকাও তোমার নেই। তোমার কাছ থেকে জায়গাটা কিনে নেওয়ার জন্য এসেছিলাম – খুব ভাল প্রস্তাবই একটা দিতে চেয়েছিলাম। এখানে থাকার এমি’র খুব শখ। এই দিব্যি কেটে বলছি, এখন আর এক পয়সাও দেব না তোমাকে! চালিয়াত, মাথামোটা আইরিশ কোথাকার! দেনার দায়ে যখন ভিটেমাটি ছাড়তে হবে তখন তুমি টের পাবে কলকাঠি কে নাড়ে! আমি কিনে নেব জায়গাটা, সব কিছু সমেত – আসবাবপত্র – সব কিছু – তারপর আমিই থাকব এখানে!”
তাহলে এই হল ব্যাপার – জোনাস উইল্কারসনই টারার পেছনে পড়েছে – জোনাস আর এমি। পুরনো অপমানের বদলা নিতে চায়। যে বাড়ির মানুষদের জন্য হেনস্থা, ঘুরপথে সেই বাড়িটারই ভোগদখল করা। রাগে, ঘেন্নায় স্কারলেটের শরীর রি রি করে উঠল, ইয়াঙ্কির দাড়ি ভর্তি মুখে পিস্তল চালানোর সময় যেরকম হয়েছিল, ঠিক সেই রকম। পিস্তলটা হাতের কাছে থাকলে হত!
“এই বাড়ি আমি ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলব, আগুন লাগিয়ে দেব, প্রত্যেক বিঘা জমিতে নুন ছিটিয়ে দেব, যদি তোমাদের দুজনকে বাড়ির চৌকাঠ পেরতে দেখি!” চেঁচিয়ে উঠল। “বেরিয়ে যাও, এখনই বেরিয়ে যাও বলছি!”
জোনাস কটমট করে ওর দিকে তাকাল। আরও কিছু বলবার জন্য মুখ খুলেও গাড়ির দিকেই এগিয়ে গেল। ঘ্যানঘ্যান করতে থাকা বউয়ের পাশে বসে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল। স্কারলেটের ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের ওপর থুতু ছিটিয়ে দেয়। থুতু হল ওরা থাকতে থাকতেই এই কাজটা করলে হত।
যতসব জঘন্য নিগার প্রেমিকের দল – কী আস্পর্ধা বাড়ি বয়ে এসে ওকে গরীব বলে গালি দিয়ে যায়! ওই কুকুরের বাচ্চাটা মোটেই ওকে টারার জন্য দাম হাঁকতে আসেনি। একটা ছুতো করে এখানে এসে নিজেকে আর এমিকে জাহির করে ওকে অপদস্থ করার চেষ্টা! নোংরা স্ক্যালাওয়াগ যত, বেজন্মা সাদা চামড়ার নরকের পোকা, টারাতে থাকার শখ!
পরমুহূর্তেই অজানা এক আতঙ্কে রাগ উধাও হয়ে গেল। হায় কপাল! ওরা যদি সত্যি সত্যিই এসে এখানে থাকতে শুরু করে! টারাকে কিনে নিতে ওদের বাধা দেওয়ার মত কোনও উপায়ই যে ওর হাতে নেই। বাড়ির প্রতিটি আয়নায়, টেবিলে, পালঙ্কে, এলেনের ব্যবহার করা মেহগিনি আর রোজ়উডের ঝকঝকে আসবাবপত্রে – অর্থাৎ যা কিছু ওর কাছে অমুল্য, হয়ত ইয়াঙ্কি লুটেরাদের দৌরাত্মে অনেক দাগ লেগে গেছে, সেই সব জিনিস ওদের দখলে চলে যাওয়া থেকে বাঁচানোর কোনও রাস্তাই ওর কাছে নেই। এমনকি রোবিল্যার ঘরানার রুপোর বাসনপত্রও ওদের দখলে চলে যাবে। আমি কিছুতেই এটা হতে দেব না, স্কারলেট আবেগপ্রবণ হয়ে ভাবল। না, কিছুতেই না, এমনকি তার জন্য যদি এই জায়গায় আগুন ধরিয়ে দিতে হয়, তবে সেটাই করব! যে মেঝের ওপর দিয়ে একদিন মা হেঁটেছেন, সেই মেঝেতে এমি স্ল্যাটারির পায়ের ছোঁয়া আমি কিছুতেই পড়তে দেব না!
দরজাটা বন্ধ করে তার ওপরে হেলান দিল। ভীষণ ভয় করছে। শেরম্যানের লোকরা যেদিন চড়াও হয়েছিল বাড়িতে, সেদিনের থেকেও বেশি ভয় করছে। সেদিন ভয় পেয়েছিল এই ভেবে যে ওরা হয়ত ওকে শুদ্ধ টারাকে পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেবে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি তার চেয়েও বেশি গুরুতর – এই আস্তাকুঁড়ের বাসিন্দারা এই বাড়িতে এসে থাকবে, আর ওদের আস্তাকুঁড়বাসী বন্ধুবান্ধবদের কাছে বড়াই করে বলবে কেমন করে দেমাকী ও’হারাদের এখান থেকে বের করে দিয়েছে। কে জানে হয়ত নিগ্রোদের এই বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আনবে, ডিনারের জন্য, রাত কাটানোর জন্য। জোনাস যে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে বেড়ায় নিগ্রোরা সাদা চামড়ার থেকে কোনো অংশে কম নয় সেটা উইল বলেছিল। ও নাকি ওদের বাড়িতে যাতায়াত করে, একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করে, ওদের নিয়ে গাড়িতে করে ঘুরতে বের হয়, কাঁধে হাত রেখে কথা বলে।
টারার ভাগ্যে এই চূড়ান্ত অপমান অপেক্ষা করে আছে ভেবে ওর হৃৎস্পন্দন এত বেড়ে গেল যে মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে। মনে মনে সমস্যাটার গুরুত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করল, সেটার থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা খুঁজতে লাগল। এসব নিয়ে যতই ভাবে ততই নতুন করে ওর রাগ আর আতঙ্ক বেড়ে গিয়ে অস্থির হয়ে পড়ে। উপায় একটা থাকতেই হবে, এমন কাউকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে যার কাছ থেকে ও টাকা ধার করতে পারবে। টাকার তো আর পাখনা গজিয়ে যায়নি যে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে! কারোর না কারোর কাছে টাকা থাকতেই হবে। আর তখনই অ্যাশলের মজা করে বলা কথাটা মনে পড়ে গেল –
“একমাত্র একজন লোকের নামই শুনছি – রেট বাটলার – যার নাকি অনেক টাকাকড়ি আছে,”
হ্যাঁ, রেট বাটলার। তাড়াতাড়ি করে বসার ঘরে চলে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। জানলার পর্দা টেনে দেওয়া, শীতকাল বলে সন্ধ্যেও ঘনিয়ে এসেছে, সব মিলিয়ে এক অস্পষ্ট বিষণ্ণতা ওকে ঘিরে ধরল। এখানে কেউ ওকে খুঁজতে আসবে না, নির্বিঘ্নে কিছুক্ষণ ভাবতে হবে। কথাটা হঠাৎই মাথায় এল – এত সহজ কথাটা – আগে যে কেন মাথায় আসেনি ভেবে অবাক হল।
“টাকাটা রেটের কাছ থেকেই নেব। হীরের ওই দুলজোড়াটা ওঁর কাছে বিক্রি করে দেব। আর না হলে ওঁর কাছ থেকে ধার নেব টাকাটা, শোধ করতে না পারা পর্যন্ত ওটা ওঁর কাছেই জমা রেখে দেব।”
কথাটা ভেবে এতই স্বস্তি পেল যে দুর্বল বোধ করতে লাগল। খাজনার টাকা মিটিয়ে দিয়ে জোনাস উইল্কারসনের বেয়াদবীর উচিত জবাব দেবে। এটা ভেবে মনটা খুশি হয়ে উঠতে না উঠতেই, নিষ্ঠুর একটা সত্যিও উপলব্ধি করল।
“খাজনা মেটানোর টাকাটা যে কেবল এই বছরের জন্যই দরকার তা তো নয়। পরের বছর আছে, তার পরের বছর আছে, যতদিন বেঁচে থাকবে তত বছর এই খাজনা দেওয়ার দায় টেনে চলতে হবে। এবারে টাকাটা মিটিয়ে দিলেও, পরের বছর খাজনা আরও বাড়িয়ে দেবে, বাড়াতেই থাকবে, যতক্ষণ না আমাকে উচ্ছেদ করতে পারে। ভাল তুলোর ফসল তুলতে পারলেও, ওরা হয়ত এত খাজনা লাগাবে যে আমার হাতে আর কিছুই থাকবে না, বা বাজেয়াপ্ত করে সোজাসুজি বলে দেবে সেটা কনফেডারেটের তুলো। ইয়াঙ্কি আর ওদের শয়তান সাগরেদগুলো এমনভাবে ধরেছে যে আমার পালানোর পথটুকুও নেই। যতদিন বাঁচব, ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে, কোনো না কোনো উপায়ে ওরা আমাকে কব্জা করে ফেলবে। সারা জীবন ধরে আমাকে টাকাপয়সার জন্য হাহাকার করতে হবে, মুখের রক্ত তুলে পরিশ্রম করতে হবে, আর তারপরেও হয়ত দেখব আমার সব তুলো ওরা লুঠে নিয়েছে … ধার করে তিনশ ডলার জোগাড় করা তো একটা সাময়িক সুরাহা মাত্র। আমার প্রয়োজন, ওদের এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা – পাকাপাকিভাবে – যাতে রাত্রে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি, কাল কী হবে সেটা নিয়ে দুর্ভাবনা না করে, বা সামনের মাসে, বা সামনের বছর।
স্কারলেট দ্রুতগতিতে ভাবতে শুরু করল। খুব ঠাণ্ডা মাথায় কূটবুদ্ধি লাগিয়ে একটা মতলব বের করল। রেটের কথা মনে পড়ল – শ্যামলা ত্বক, ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি, ব্যঙ্গে ভরা কালো কালো চোখ দিয়ে – ওর শরীর লেহন করে চলেছেন। অ্যাটলান্টার সেই অসম্ভব গুমোট রাতটার কথাও মনে পড়ল – অবরোধের শেষের দিকের কথা – আন্ট পিটির বাড়ির বারান্দার অন্ধকারে প্রায় মিশে গিয়ে বসে আছেন রেট। বাহুর ওপরে রাখা ওঁর হাতের উষ্ণতাটাও আবার অনুভব করতে পারছে। উনি বলছেন, “আর কোনো মেয়েকেই আমি তোমার মত এত তীব্রভাবে কামনা করিনি – তুমি ছাড়া আর কোনো মেয়ের জন্যই আমি এত দীর্ঘদিন প্রতীক্ষা করিনি।”
“ওঁকে আমি বিয়েই করে ফেলব,” ঠাণ্ডা মাথায় ভাবল। “তাহলে আর কখনোই আমাকে টাকাপয়সা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।”
কথাটা ভাবতেই প্রাণটা জুড়িয়ে গেল একেবারে। অর্থচিন্তা নেই, টারার নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই, পরিবারের কারোর খাওয়াপরার ভাবনা নেই, পাথরের দেওয়ালে আর মাথা কুড়ে মরতে হবে না!
মনে হল যেন খুবই বুড়িয়ে গেছে। সারা বিকেল মনের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেল – এক অসীম শূন্যতাবোধ ওকে ঘিরে ফেলল – প্রথমে তো খাজনা নিয়ে চমকে দেওয়ার মত খবরটা, তারপর অ্যাশলে আর সব শেষে জোনাস উইল্কারসনকে খুন করে ফেলার প্রবল ইচ্ছে। নাহ্, মনটা একেবারে আবেগহীন হয়ে পড়েছে। অনুভূতিবোধটা যদি হারিয়ে না ফেলত, তাহলে যে পরিকল্পনাটা মনে দানা বাঁধতে আরম্ভ করেছে, সেটা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে যেত। রেটকে ও ঘৃণা করে, এতটা ঘৃণা বিশ্বসংসারে আর কাউকেই ও করে না। কিন্তু সেই অনুভূতিবোধটাই ওর নেই। ও চিন্তা করতে পারছে, আর ওর চিন্তাগুলো সবই বাস্তবটাকে মাথায় রেখেই।
“সেদিন রাতের অন্ধকারে শুনসান রাস্তার ধারে উনি যখন আমাদের একলা ফেলে রেখে পালিয়ে গেলেন, বেশ কিছু গালমন্দ করেছিলাম বটে ওঁকে, তা সেসব আমি ঠিক ভুলিয়ে দিতে পারব,” অবজ্ঞার সঙ্গেই ভাবল। নিজের আকর্ষণী ক্ষমতার ওপর এখনও যথেষ্ট ভরসা আছে ওর। “ওঁর কাছে যতক্ষণ থাকব, আমার মুখ থেকে মধু ছাড়া আর কিছুই ঝরবে না। বুঝিয়ে দেব, প্রথমদিন থেকেই ওঁর প্রেমে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি, সেদিন রাতে একটু বেশিই ভয় পেয়ে গেছিলাম বলে ভালোমন্দ বলে ফেলেছিলাম। ভাগ্যিস পুরুষমানুষগুলোর এত গুমর হয়, একটু তোষামোদ করলেই গলে একেবারে জল হয়ে যায় … যতক্ষণ না ওঁকে হাতের মুঠোর মধ্যে পাচ্ছি, আমাদের ফ্যাসাদ নিয়ে একটা কথাও ফাঁস করা চলবে না। ঘুণাক্ষরেও উনি যেন টের না পান! একবার যদি আমাদের দারিদ্র্যের কথা জেনে ফেলেন, উনি ঠিক বুঝে যাবেন যে ওঁর প্রতি নয়, ওঁর টাকার প্রতিই আমার নজর। অবশ্য জানাটা সম্ভব নয়, কারণ আন্ট পিটিও জানেন না ওদের হাঁড়ির হাল দশার কথা। একবার ওঁকে বিয়ে করতে পারলেই হল, আমাদের সাহায্য করতে উনি বাধ্য হবেন। বউয়ের পরিবার অনাহারে থাকুক, এটা নিশ্চয়ই উনি চাইবেন না!”
ওঁর বউ। মিসেজ় রেট বাটলার। বিতৃষ্ণার মত কিছু একটা – ঠাণ্ডা মাথায় মতলব ভাজতে ভাজতে মনের গভীরে চাপা পড়ে ছিল – হালকাভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না উঠতেই, তাড়াতাড়ি সেটা দাবিয়ে দিল।
কূট চিন্তাভাবনার তলায় চাপা পড়েছিল, একবার হালকাভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতেই তাড়াতাড়ি দমিয়ে দিল। চার্লসের সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী মধুচন্দ্রিমার কিছু অস্বস্তিকর এবং বিতৃষ্ণাজনক ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল – ওর আনাড়ি হাতের ছোঁয়া, জবুথবুভাব, ওর দুর্বোধ্য আবেগ – আর ওয়েড হ্যাম্পটন।
“এই সব নিয়ে এখন ভাবব না। বিয়েটা আগে হয়ে যাক, তারপর নাহয় এসব নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে …”
বিয়েটা আগে হয়ে যাক। কী একটা স্মৃতি যেন কাঁটার মত বিঁধল। একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল। আন্ট পিটির বারান্দায় সেদিন সন্ধ্যের কথাটা আবার মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল রেটকে জিগ্যেস করেছিল, উনি কী বিবাহের প্রস্তাব দিচ্ছেন। আরও মনে পড়ল, কী বিশ্রী ভাবে হেসে উনি সেদিন জবাব দিয়েছিলেন, “বিয়ে করে ফেলার মত মানুষ আমি নই, প্রিয়ে।”
ধরে নেওয়া যাক, এখনও উনি বিয়ে করার মত মানুষ হয়ে ওঠেননি। ধরা যাক, ওর আকর্ষণী ক্ষমতা, ওর ছলাকলায় উনি ভুললেন না, ওকে বিয়ে করতে রাজি হলেন না, তখন? ধরা যাক – নাহ্, ভাবনাটা খুবই ভীতিপ্রদ – ধর, উনি ওকে পুরোপুরি ভুলেই গেছেন আর অন্য মেয়েদের পেছনে দৌড়চ্ছেন?
“আর কোনো মেয়েকেই আমি তোমার মত এত তীব্রভাবে কামনা করিনি …”
স্কারলেট হাত মুঠো করে ফেলল – নখগুলো তালুতে বসে যেতে লাগল। “যদি আমাকে ভুলে গিয়ে থাকেন, আমি ওঁকে মনে করিয়ে দেব। নতুন করে আমাকে কামনা করতে বাধ্য করব।”
আর যদি বিয়ে করতে নাই চান, কিন্তু তবুও ওকে কামনা করেন, তাহলেও টাকা পাওয়ার উপায় আছে। আর কিছু না হোক, একবার তো উনি ওকে ওঁর রক্ষিতা হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন!
বসার ঘরের আলোআঁধারিতে বসে, একটা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য বিবেকের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল – মন থেকে কম করে তিনটে দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে হবে – এলেনের স্মৃতি, ধর্মীয় উপদেশ আর অ্যাশলের প্রতি প্রেম। যেটা করবে বলে ভাবছে, স্বর্গের মনোরম পরিবেশে – নিশ্চিতভাবে মা সেখানেই আছেন – ওঁর কাছে অত্যন্ত কুৎসিত মনে হবে। ব্যাভিচার করা মারাত্মক পাপ। এটা জানার পরেও, আর অ্যাশলেকে এতখানি ভালবাসার পরেও, ওর এই মতলবের অর্থ হল, ও বেশ্যাবৃত্তির চেয়েও জঘন্য কিছু করতে চলেছে।
কিন্তু নির্দয় শীতল বুদ্ধিবৃত্তি আর পরিস্থিতির চাপে মরিয়া হয়ে স্কারলেটের এই সব ভাবনাচিন্তা তলিয়ে গেল। এলেন বেঁচে নেই, আর হয়ত মৃত্যু মানুষের সব রকম পরিস্থিতি বিবেচনা করার অন্তর্দৃষ্টি জাগিয়ে তোলে। নরকে যাবার ভয় দেখিয়ে ধর্ম ব্যাভিচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে। গির্জা ভাবতেই পারে ও টারাকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা না করেই, পরিবারের মানুষদের অনাহারে রেখেই, ও দ্যু’হাত তুলে দেবে – সে ভাবতে চাইলে ওরা ভাবুক। কিন্তু ও কিছুতেই এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে না। অন্তত, এই মুহূর্তে তো নয়ই। বাকি রইল অ্যাশলে – কিন্তু অ্যাশলে তো ওকে চায়ই না। না, অ্যাশলে ওকে অবশ্যই চায়। ওর উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শের স্মৃতি সেই কথাটাই বলতে চাইছে। কিন্তু ও কিছুতেই স্কারলেটকে কোথাও চলে যাবার কথা মনে আনবে না। অদ্ভুত ব্যাপার, অ্যাশলের সঙ্গে চলে যাওয়াটা ওর কাছে পাপ বলে মনে হয়নি, অথচ রেটের সঙ্গে …
শীতের বিষণ্ণ সন্ধ্যার আলোআঁধারিতে স্কারলেট যেন দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে এসে পৌঁছল, যে যাত্রার শুরু হয়েছিল সেই রাতে, যেদিন অ্যাটলান্টার পতন হল। বখাটে, স্বার্থপর, অনভিজ্ঞ কিন্তু যৌবনের প্রাণচাঞ্চল্য আর আবেগে ভরপুর, বিমূঢ় এক মেয়ে সেদিন পথে নেমে পড়েছিল। দীর্ঘ সেই যাত্রাপথের শেষে, সেই মেয়ের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। অনাহার, কঠোর পরিশ্রম, আতঙ্ক আর অবিরাম আয়াস, যুদ্ধ আর পুনর্গঠনের সন্ত্রাস, ওর সমস্ত উষ্ণতা, সমস্ত যৌবন, সমস্ত কোমলতা কেড়ে নিয়েছে। ওর অস্তিত্বের চারধারে শুষ্ক কাঠিন্যের আবরণ তৈরি হয়ে গেছে, তারপর তিলে তিলে, পলেস্তারার পর পলেস্তারা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে, মাসের পর মাস ধরে।
এই আজ পর্যন্ত, কেবল দুটো আশা সম্বল করেই ও বেঁচে ছিল। আশা করেছিল, লড়াই থেমে গেছে, জীবনটা ধীরে ধীরে পুরনো সমতায় ফিরে আসবে। আশা করেছিল, অ্যাশলের ফিরে আসায় আবার বেঁচে থাকার একটা মানে খুঁজে পাবে। আর এখন এই দুটো আশাই নষ্ট হয়ে গেছে। টারার সামনে জোনাস উইল্কারসনকে দেখা মাত্রই ও বুঝে গেছে যে ওর জন্য, সমগ্র দক্ষিণের জন্য যুদ্ধ কোনোদিনই শেষ হবে না। লড়াই এখন তীব্রতর হবে, নির্মমভাবে বদলা নেওয়ার পাল সবে শুরু হতে চলেছে। আর অ্যাশলে চিরতরে কথার জালে বন্দী, যে কোনো কারাগারের চেয়েও সেই কথার জালের বন্ধন বহুগুণ শক্তিশালী।
শান্তির আকাঙ্ক্ষা ওকে হতাশ করেছে, অ্যাশলেও ওকে হতাশ করেছে, একই দিনে ঘটেছে দুটোই। মনে হচ্ছে প্রাণভরে শ্বাস নেবার শেষ ফাটলটাও পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্র্যান্ডমা ফোনটেন যেটা না হবার জন্য ওকে সাবধান করেছিলেন, সেটাই ও হয়ে গেছে – আতঙ্কের চরম সীমায় পৌঁছে, ভয় পাওয়ার মত আর কিছুই রইল না। জীবন নিয়ে ভয়, মায়ের ভর্ৎসনার ভয়, ভালবাসা হারানোর ভয়, লোকনিন্দার ভয়। অনাহার আর অনাহারের দুঃস্বপ্ন – একমাত্র এটাই ওকে ভয় দেখানোর জন্য রয়ে গেল।
অতীতের সংস্কার থেকে শেষ পর্যন্ত বের হতে পেরে অদ্ভুত হালকা লাগছে নিজেকে, মুক্তির আস্বাদ পাচ্ছে। পুরনো দিন, পুরনো স্কারলেট এখন অতীত। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আর কী আশ্চর্য, একটুও ভয় করছে না। হারিয়ে ফেলার তো কিছুই নেই, মন পুরোপুরি তৈরি এখন।
রেটকে জোরজার করে ওকে বিয়ে করতে রাজি করাতে পারলে, তার চাইতে ভাল আর কিছু হয় না। যদি নাও পারে – তাহলেও টাকাটা আদায় করতেই হবে। উদাসীন কৌতুহলে ভাবতে চেষ্টা করল একজন রক্ষিতার কাছ থেকে কী কী আশা করা যেতে পারে। রেট কী চাইবেন ও অ্যাটলান্টাতেই থেকে যাক, যেমন লোকে বলে থাকে, উনি বেল ওয়াটলিং মহিলাকেও অ্যাটলান্টাতেই রেখেছেন? তা অ্যাটলান্টাতে থাকতে বাধ্য করলে, ওঁকে ভালমত খোরপোশ দিতে হবে – যাতে টারাতে ওর না থাকার লোকসানটা পুরিয়ে যায়। পুরুষদের চরিত্রের অন্ধকার দিকটা নিয়ে স্কারলেটের কোনো ধারণাই নেই, ফলে কী ধরণের বন্দোবস্ত হতে পারে সেটা বুঝে উঠতে পারছে না। এর ফলে বাচ্চা হবার সম্ভাবনা থাকে কি? সেটা হলে তো বড়ই মুশকিল।
“নাহ্, এসব ভেবে এখন মাথা খারাপ করব না। পরে দেখা যাবে,” এই ভেবে মন থেকে অশুভ চিন্তাটা সরিয়ে রাখল। কে জানে যদি দৃঢ়তায় চিড় ধরে! বাড়ি সবাইকে আজ রাত্রেই জানিয়ে দিতে হবে যে টাকা ধার নেওয়ার চেষ্টায় ও অ্যাটলান্টা যাচ্ছে। দরকার পড়লে খামার বন্ধক রাখবে। এখন ওদের এটুকু জানলেই চলবে। কপালে না থাকলে একদিন না একদিন হয়ত সত্যিটা জেনেই যাবে। কী আর করা!
লড়াইয়ে নামার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হতেই মাথা সোজা করে পেছনে হেলান দিয়ে বসল। কাজটা যে খুব সহজ হবে না, জানে। আগে রেটই ওর খোশামোদ করতেন, আর ও ছড়ি ঘোরাতো। এখন নিজেই ভিখারি, ভিখারির ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা থাকে না।
“তবে, ভিখারির মত ওঁর কাছে মোটেই যাব না। যাব রাণীর মতই, ভক্তের আবেদন পূরণ করতে যাচ্ছি যেন। উনি জানতেও পারবেন না।”
লম্বাআয়নাটার সামনে এসে দাঁড়াল। ভাল করে দেখল নিজেকে। মাথা সোজা রেখে। চলটা উঠে যাওয়া আয়নার কাঁচে যাকে দেখতে পেল তাকে যেন চেনাই যায় না। যেন গোটা একটা বছরে এই প্রথমবার নিজেকে দেখছে। রোজ সকালে একবার করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক ঝলক দেখে নেয় চোখমুখ সাফসুৎরো আছে কিনা, আর চুলটা উস্কোখুস্কো দেখাচ্ছে কিনা। কিন্তু কাজের এতই চাপ থাকে যে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখা হয়েই ওঠে না। কিন্তু এ যে নিজেকে চেনাই যাচ্ছে না! গাল তুবড়ে যাওয়া, রুগ্ন মেয়েটা স্কারলেট ও’হারা হতেই পারে না! সেই লাস্যময়ী, চটুল, হাসিখুশি স্কারলেট ও’হারা গেল কোথায়? যে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে, তার মধ্যে লাবণ্যের চিহ্নমাত্র নেই! কোথায় গেল সেই চিরপরিচিত পুরুষ ভোলানো দৃষ্টি? পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত চেহারা, তির্যক সবুজ চোখের ওপরের কালো ভুরু পাণ্ডুর ত্বকের ওপর ভয়াতুর পাখির ডানার মত তটস্থ হয়ে জেগে আছে। কাঠিন্য আর ত্রস্তভাব মুখের কমনীয়তা শুষে নিয়েছে।
“ওকে পটিয়ে ফেলার মত সুন্দরী আমি আর নেই!” ভাবল মনে মনে। আবার হতাশা ঘিরে ধরল ওকে। “কী রোগা হয়ে গেছি আমি – ওহ্, কী ক্ষয়াটে চেহারা আমার!”
গালে হাত বোলালো। কণ্ঠার হাড়ে হাত দিতেই চমকে উঠল। শেমিজ ভেদ করে তাকিয়ে আছে। স্তন দুটোও চুপসে ছোট হয়ে গেছে, প্রায় মেলানির মতই ছোট ছোট। বড় দেখানোর জন্য ওকে ব্রা-এর নীচে কাপড় গুঁজতে হয়। এই ধরণের ছলচাতুরির আশ্রয় যেসব মেয়েরা নেয়, এতদিন তাদের করুণার চোখেই স্কারলেট দেখে এসেছে। কাপড় গোঁজা! চকিতে আরও একটা দুশ্চিন্তার উদয় হল। কী পোশাক পরে যাবে? পরনের পোশাকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। জায়গায় জায়গায় তালি লাগানো পোশাকটা দুই হাতে মেলে ধরল। রেটের পছন্দ সুবেশা মহিলারাই, যারা কেতাদুরস্ত পোশাক পরে। শোকাবাস ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর যে পোশাকটা প্রথম পরেছিল – পাড় লাগানো সবুজ পোশাক আর পাখির পালক লাগানো সবজে বনেট, যেটা রেট ওকে এনে দিয়েছিলেন – সেগুলোর জন্য মন কেমন করতে লাগল। পোশাকটা পরার পর রেট উচ্চৈঃস্বরে তারিফ করেছিলেন ওর, সেকথাও মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে এমি স্ল্যাটারির পাড় দেওয়া লাল রঙের পোশাক, ফিতে বাধা লাল রঙের জুতো আর মাথার ওপর প্যানকেকের মত থ্যাবড়া করে বসানো টুপিটার কথাও মনে পড়ে গেল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অবজ্ঞার হাসি খেলে গেল। দৃষ্টিকটু হলেও পোশাকগুলো নতুন আর কেতাদুরস্ত তো বটেই, সহজেই নজর কাড়ে। নজর কাড়তে পারাটাই যে খুব দরকার! বিশেষ করে রেট বাটলারের নজর! এই ছেঁড়াখোঁড়া পুরনো পোশাকে ওকে দেখলেই উনি বুঝে যাবেন যে টারাতে এখন সবকিছুই গোলমেলে। আর সেটা ওঁকে বুঝতে দেওয়া চলবে না।
কী বোকাই না ও, ভেবেছিল অ্যাটলান্টায় চলে গেলেই ওঁকে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাবে! এই অস্থিচর্মসার গ্রীবা, ক্ষুধার্ত বেড়ালের মত দৃষ্টি আর শতচ্ছিন্ন পোশাকে ওঁর সামনে গিয়ে হাজির হলে! যখন ও খুব সুন্দরী ছিল, অনেক কেতাদুরস্ত পোশাক ছিল ওর, তখনও ওঁর কাছ থেকে কোনো কথা আদায় করতে পারেনি, আর এখন এই বিশ্রী চেহারা নিয়ে, তালি মারা পোশাক পরে কী করে ভাবতে পারল যে ওঁকে পটিয়ে ফেলবে? মিস পিটির কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে অ্যাটলান্টার সবার চাইতে ওঁর টাকাকড়ি অনেক বেশি। চাইলেই হয়ত যে কোনো সুন্দরী মহিলাকে – সে ভালই হোক কী মন্দ – উনি বাগে আনতে পারেন। “ভাল কথা,” গোমড়া মুখে স্কারলেট ভাবল, “আমার এমন একটা জিনিস আছে, যেটা সুন্দরী মহিলাদের নেই – সেটা হল আমার দৃঢ় প্রত্যয় – আর যা সিদ্ধান্ত নেবার আমি নিয়ে নিয়েছি। একটা যদি ভদ্র সমাজে চলার মত পোশাক জোগাড় করতে পারতাম …”
কিন্তু ভদ্র সমাজে চলার মত পোশাক টারায় কারো কাছে নেই, বা এমন পোশাক যাতে অন্তত বারদুয়েক রিফু না করা হয়েছে।
“সেটাই সমস্যা,” ম্রিয়মাণ চোখে মেঝের দিকে তাকাল। এলেনের শ্যাওলা রঙের ভেলভেটের কার্পেটটার ওপর নজর পড়ল। জীর্ণ হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় দুমড়ে গেছে, ছিঁড়ে গেছে, দাগ পড়েছে – অসংখ্য মানুষ এই কার্পেটে শুয়ে রাত কাটানোর ফলে। মনটা খারাপ হয়ে গেল, মনে হল ঠিক ওরই মত টারারও জীর্ণ দশা। অন্ধকার ঘনিয়ে আসা ঘরটা ওকে আরও বিষণ্ণ করে ফেলল। জানলার কাছে গিয়ে পর্দাগুলো উঠিয়ে, জানলার কবাট খুলে শীতের সূর্যাস্তের শেষ রশ্মিটুকু ঘরে আসতে দিল। জানলাগুলো বন্ধ করে দিয়ে ভেলভেটের পর্দার ওপর মাথা রেখে সমাধিক্ষেত্রের সেডারের সারি ভেদ করে আবছা বনভূমির দিকে চেয়ে রইল।
শ্যাওলা সবুজ ভেলভেটের নরম পর্দার ছোঁয়া লেগে গাল কুটকুট করছে। কৃতজ্ঞচিত্তে সেই পর্দার ওপর মুখ ঘষতে থাকল, বেড়ালের মত। তারপর চকিতে পর্দাগুলো ভাল করে দেখল।
মিনিটখানেক পরে শ্বেতপাথর বসানো ভারি টেবিলটা মেঝের ওপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে নিয়ে চলল। মর্চে পড়া চাকাগুলো প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল। টেবিলটা জানলার নিচে দাঁড় করালো। তারপর স্কার্ট সামলে ওটার ওপর উঠে পড়ল। পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে পর্দা টাঙানোর ভারি ছত্রিগুলো ধরে টান মারল। তাড়াহুড়ো করে টান মারায় কাঠের ওপর থেকে পেরেক উপড়ে গিয়ে পর্দাগুলো ছত্রি সমেত ঝপাত করে মেঝেতে পড়ে গেল।
আর তখনই যেন মন্ত্রবলে বসার ঘরে দরজা খুলে গেল আর ম্যামির চওড়া কালো মুখটা দেখা গেল। মুখের প্রতিটা বলিরেখায় অদম্য কৌতুহল আর গভীর সন্দেহ ফেটে বেরোচ্ছে। স্কারলেটের স্কার্ট হাঁটুর ওপরে ওঠা, টেবিল থেকে লাফ মেরে মেঝেতে নামবার জন্য তোড়জোড় করছে। ম্যামি খুব অসন্তুষ্টভাবে ওর দিকে তাকাল। স্কারলেটের চোখেমুখে উত্তেজনা আর বিজয়ীর হাসি – সহসা ম্যামির অবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল।
“মিস এলেনের পর্দাগুলো নিয়ে কী করা হচ্ছে শুনি?” ম্যামি কৈফিয়ত চাইল।
“দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে কী শোনা হচ্ছিল?” স্কারলেট পালটা প্রশ্ন করল, টেবিল থেকে ঝটপট নেমে এসে ধুলো মাখা ভারি ভেলভেটটা গুছিয়ে তুলতে তুলতে।
“আড়ি পাতার দরকার পড়ে না,” ম্যামিও সমান তেজে জবাব দিল। একপ্রস্থ লড়াইয়ের জন্য কোমর বাঁধল। “মিস এলেনের পর্দা নিয়ে যা খুশি তাই করতে পার না তুমি! পেরেক উপড়ে ছত্রিশুদ্ধ মেঝের ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে! পর্দাগুলো কত প্রিয় ছিল ওঁর, আর তুমি কিনা এইভাবে এগুলোর হেলাফেলা করছ!”
স্কারলেট ওর সবুজ চোখদুটো ম্যামির ওপর রাখল, দুষ্টুমিতে ভরা চোখ, কতদিন আগে এই দস্যি বাচ্চা মেয়েটা হারিয়ে গেছে বলে এখনও ম্যামি মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে।
“চিলেকোঠার ঘর থেকে আমার নক্সার বাক্সটা চট করে নিয়ে এস তো, ম্যামি,” ম্যামিকে হালকা করে ঠেলা মেরে চেঁচিয়ে বলে উঠল। “নতুন একটা পোশাক বানাব, নিজের জন্য।”
দুশো মন ওজনের শরীর নিয়ে ছুটোছুটি করা, বিশেষ করে চিলেকোঠার ঘরে যাওয়ার জন্য, আর মনের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকা বিকট এক সন্দেহ, কোনটার জন্য ওর রেগে যাওয়া উচিত, সেটা নিয়ে ম্যামির মনে দ্বন্দ্ব চলতে লাগল। স্কারলেটের হাত থেকে পর্দাটা ছিনিয়ে নিয়ে ঝুলে পড়া বিশাল বুকের ওপর জড়িয়ে ধরল, যেন ওগুলো পবিত্র কোনও স্মৃতি।
“মিস এলেনের পর্দা কেটে কিছুতেই তুমি নতুন পোশাক বানাতে পারবে না, সেটাই যদি তুমি ভেবে থাক। অন্তত আমার দেহে প্রাণ থাকতে নয়।”
‘গোঁয়ারগোবিন্দ’ বলতে ম্যামি যা বোঝে, ওর অল্পবয়সী মালকিনের চোখে পলকের জন্য সেই ভাবটাই লক্ষ্য করল। অবশ্য পরমুহূর্তে সেই ভাবটা কেটেও গেল। স্কারলেট এমনভাবে হাসল যে ম্যামির পক্ষে বাধা দেওয়াটা মুশকিল হয়ে পড়ল। তবে বুড়ি বোকা বনবার পাত্রী নয়। মিস স্কারলেটকে ও হাড়ে হাড়ে চেনে, তাই বুঝতে কষ্ট হল না যে নিজের কার্যসিদ্ধির খাতিরেই স্কারলেট ওই হাসির চাল চেলেছে আর কোনোভাবেই ওকে নিরস্ত করা যাবে না।
“অবুঝ হোয়ো না, ম্যামি। কিছু টাকা ধার করার জন্য আমাকে অ্যাটলান্টা যেতে হবে, তাই একটা নতুন পোশাকের আমার খুব প্রয়োজন।”
“নতুন পোশাকের কোনও দরকার নেই তোমার। একজন মহিলারও নতুন পোশাক নেই। ওরা সবাই পুরনো পোশাকই পরে, আর গর্বের সঙ্গেই পরে। মিস এলেনের মেয়ে কেন ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরতে পারবে না, সেটা আমার মাথাতেই আসছে না। সিল্কের পোশাকের চেয়ে ওই পোশাকেই সবাই তোমাকে বেশি সম্মান দেবে।”
গোঁয়ারগোবিন্দ ভাবটা আবার স্কারলেটের চোখে ফুটে উঠতে লাগল। হে ভগবান, কেন যে স্কারলেট যত বড় হচ্ছে, ওর মধ্যে মিস্টার জেরাল্ডের স্বভাবটা বেশি করে ফুটে উঠছে আর মিস এলেনের সঙ্গে মিলটা কমে যাচ্ছে!
“দেখ, ম্যামি, আন্ট পিটি লিখেছেন যে এই শনিবার মিস ফ্যানি এলসিং-এর বিয়ে হবে, আর সেই বিয়েতে আমাকে তো যেতেই হবে। ফলে বিয়েতে পরবার জন্য নতুন একটা পোশাক তো আমার দরকার।”
“যে পোশাকটা তুমি এখন পরে আছ, মিস ফ্যানির বিয়ের পোশাকের মতই সুন্দর সেটা। মিস পিটি তো লিখেই ছিলেন যে এলসিং-রা ভীষণ গরীব হয়ে গেছেন।”
“কিন্তু নতুন একটা পোশাক আমার লাগবেই! ম্যামি, তুমি বোধহয় জানো না, টাকাটা জোগাড় করা আমাদের কতটা দরকার। খাজনার – ”
“হ্যাঁ ম্যাম, খাজনার ব্যাপারটা আমার জানা আছে, কিন্তু – ”
“সত্যিই জানো তাহলে?”
“হ্যাঁ ম্যাম, ভগবান আমাকে একজোড়া কান দিয়েছেন, শোনবার জন্যই, তাই না? আর কথা বলবার সময় মিস্টার উইল যখন দরজাটা ভেজিয়েও দেয় না।”
এমন কিছুই কি নেই যা ম্যামির কান পর্যন্ত পৌঁছবে না? স্কারলেটের বিশ্বাসই হতে চায় না, ওই বিশাল বপু – চলাফেরার সময় যখন বাড়ি কাঁপিয়ে দেয় – নিয়ে ইচ্ছে করলেই কী ভাবে একটুও শব্দ না করে এসে আড়ি পাততে পারে!
“ভাল কথা। এসব কথা তুমি যদি শুনেই থাক, তাহলে নিশ্চয়ই জোনাস উইল্কারসন আর ওই এমি কী – ”
গনগনে চোখে ম্যামি বলল, “হ্যাঁ, ম্যাম।”
“তাহলে বোকার মত কথা বলছ কেন, ম্যামি? বুঝতে পারছ না, অ্যাটলান্টা আমাকে যেতেই হবে, খাজনার টাকা জোগাড় করার জন্য? কিছু টাকা আমাকে পেতে হবে, পেতেই হবে!” দু’হাত মুঠো পাকিয়ে একটা দিয়ে অন্যটাকে ঘুসি মেরে বলে উঠল। “দিব্যি কেটে বলছি, ম্যামি, ওরা আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াব তখন? এমি স্ল্যাটারির মত একটা জঞ্জাল, মাকে যে মেরে ফেলল আর যে কিনা এই বাড়ি দখল করে মায়ের শোওয়া খাটেই শোওয়ার স্বপ্ন দেখছে, আর তুমি কিনা মায়ের এই পর্দার মত একটা ছোট্ট ব্যাপার নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া করে চলেছ?”
“না, ম্যাম, মিস এলেনের বাড়িতে আমি কোনো আবর্জনা দেখতে চাই না, আর আমরা পথে গিয়ে বসি, সেটাও চাই না, কিন্তু – ” হঠাৎ সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে স্কারলেটকে বিদ্ধ করে ফেলল। “তা টাকা জোগাড় করার জন্য কার কাছে যাওয়া হচ্ছে শুনি? যার জন্য নতুন পোশাক না হলেই চলছে না?”
“সেটা,” চমকে উঠে বলল, “একেবারেই আমার নিজের ব্যাপার।”
মর্মভেদী দৃষ্টিতে ম্যামি ওকে দেখল। স্কারলেট যখন ছোট ছিল আর কোনও অপকর্ম করে বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত দিয়ে সেটা ঢাকার চেষ্টা করত, তখনও ম্যামি ঠিক এইভাবেই ওর দিকে তাকাত। মনে হল ও যেন স্কারলেটের মনের কথা পড়ে নিচ্ছে, তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও ও চোখ নামিয়ে নিতে হল। মতলবটা মাথায় পর প্রথম যে অপরাধবোধের সঞ্চার হয়েছিল, সেটা আবার ফিরে আসছে।
“তাহলে ব্যাপারটা হল, টাকা ধার করার জন্য তোমার একটা আনকোরা নতুন পোশাক লাগবে। কথাটা যেন কেমন কেমন শোনাচ্ছে। আর টাকাটা কোথা থেকে আসবে, সেটা নিয়ে কিছু বলবে না।”
“না, সেটা আমি বলছি না,” বিরক্ত হয়ে স্কারলেট বলল। “ওটা আমার নিজস্ব ব্যাপার। যাই হোক, পর্দাটা আমাকে দেবে কিনা বল, আর পোশাকটা বানাতে আমার সঙ্গে হাত লাগাবে তো?”
“ঠিক আছে,ম্যাম,” ম্যামির সুর নরম। ভাবান্তরটা এমন চকিতে ঘটল যে স্কারলেটের মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। “ওটা বানাতে আমি তোমার সঙ্গে হাত লাগাব। পর্দার সাটিনের লাইনিং দিয়ে একটা পেটিকোটও তৈরি করতে হবে। তাছাড়া লেসের ছাঁট লাগিয়ে একজোড়া পাজামাও বানাতে হবে।”
ভেলভেটের পর্দাটা স্কারলেটের হাতে ফেরত দেওয়ার সময় ওর ঠোঁটের কোণে চতুর হাসি খেলে গেল।
“মিস মেলি তোমার সঙ্গে অ্যাটলান্টা যাচ্ছেন, মিস স্কারলেট?”
“না,” তীক্ষ্ণ গলায় স্কারলেট বলল। ধীরে ধীরে ম্যামির মতলবটা পরিষ্কার হয়ে আসছে ওর কাছে। “আমি একাই যাচ্ছি।”
“সেটা তুমি ভেবে থাকতে পার,” দৃঢ়স্বরে ম্যামি বলল, “তবে আমি তোমার সঙ্গেই যাচ্ছি, আর তোমার ওই নতুন পোশাকটাও। একটা পাও তোমাকে একা ছাড়ছি না।”
পলকের জন্য ওর অ্যাটলান্টার যাত্রার ছবিটা স্কারলেটের কল্পনায় ভেসে উঠল। রেটের সঙ্গে ওর কথোপকথন, আর কালো শিকারি কুকুরের মত ম্যামি পেছনে দাঁড়িয়ে গনগনে চোখে ওর দিকে চেয়ে আছে। ও আবার হেসে ফেলল, তারপর ম্যামির বাহুতে হাত রাখল।
“মিষ্টি সোনা ম্যামি আমার, কী ভাল তুমি, আমার সঙ্গে যেতে চাইছ, আমাকে সাহায্য করবে বলে। কিন্তু তুমিই বল, তুমি না থাকলে এখানে সকলের কত অসুবিধে হবে? টারা কী ভাবে চালাতে হয়, সেটা তোমার চেয়ে ভাল কে জানে?”
“হুঁহ্!” বলল ম্যামি। ওই সব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমাকে ভোলাতে পারবে না, মিস স্কারলেট। প্রথম যেদিন তোমাকে ডায়াপার পরিয়েছিলাম, সেদিন থেকে তোমায় চিনি আমি। বলেছি যখন তোমার সঙ্গে আমি অ্যাটলান্টায় যাব, তখন তোমার সঙ্গে যাবই। একা একা তুমি গেলে, মিস এলেন কবরে শুয়ে থেকেও স্বস্তি পাবেন না – যত রাজ্যের ইয়াঙ্কি, ছাড়া পাওয়া নিগার আর যত সব আজেবাজে লোকে ছেয়ে গেছে শহরটা।”
“কিন্তু আমি তো আন্ট পিটিপ্যাটের ওখানে থাকব,” স্কারলেট মরিয়া হয়ে ম্যামিকে নিরস্ত করার চেষ্টা করল।
“মিস পিটিপ্যাট খুবই ভাল মানুষ। উনি ভাবেন সব দিকেই ওঁর চোখ খোলা থাকে। কিন্তু আসলে থাকে না,” ম্যামি এই ব্যাপারে আলোচনায় দাঁড়ি টেনে দেওয়ার ভঙ্গীতে কর্তৃত্বব্যঞ্জক সুরে বলল। তারপর হলঘরে চলে গেল। শরীরের ভারে তক্তাগুলো মচমচ শব্দ করে উঠল। চেঁচিয়ে ডাকল –
“প্রিসি বাছা! সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে ওপরে গিয়ে চিলেকোঠার ঘর থেকে মিস স্কারলেটের নক্সার বাক্সটা নিয়ে এসো তো! কাঁচিটাও খুঁজে আনবে, খুজতে গিয়ে আবার রাত কাবার করে দিও না যেন!”
“ভারি মুশকিলে পড়া গেল তো,” হাল ছেড়ে দিয়ে স্কারলেট ভাবতে লাগল। “খুব শিগরিরই একটা শিকারি কুকুর আমার পিছু নিল বলে!”
* * *
সাপারের টেবিল সাফ হয়ে যাবার পর, স্কারলেট আর ম্যামি নক্সাগুলো খাবার টেবিলের ওপর ছড়িয়ে নিল। স্যুয়েলেন আর ক্যারিন পর্দা থেকে সাটিনের লাইনিংটা খুলতে লাগল। একটা পরিষ্কার চুলের ব্রাশ দিয়ে মেলানি ভেলভেট থেকে ধুলো ঝাড়তে লাগল। জেরাল্ড, উইল আর অ্যাশলে ঘরের এক দিকে বসে ধুমপান করতে লাগলেন আর মেয়েদের শোরগোল দেখে মিটি মিটি হাসতে লাগলেন। একটা খুশি খুশি ভাব – স্কারলেটের থেকে সঞ্চারিত হয়ে যেন সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল। এমন একটা উত্তেজনা, যেটার কারণ পুরোপুরি কেউই বোঝেনি। স্কারলেটের মুখ থেকে খুশি ঠিকরে পড়ছে, চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, আর খুব হাসছে। ওকে হাসতে দেখে সকলেরই ভাল লাগছে। কত মাস হয়ে গেল, কেউ ওকে প্রাণ খুলে হাসতে দেখেনি। বিশেষ করে জেরাল্ডের হাসি আর ধরে না। ওঁকে অন্যদিনের চেয়ে অনেক কম অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। স্কারলেটের চলাফেরা খুব মন দিয়ে নজর করছিলেন, কাছে এসে পড়লেই ওর পিঠও চাপড়ে দিচ্ছিলেন। মেয়েরাও যেন বলডান্সের প্রস্তুতি নিচ্ছে এইরকম উত্তেজিত লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন যে যার নিজের নিজের বলডান্সের পোশাক সেলাই করতে ব্যস্ত।
টাকা ধার করবার জন্য স্কারলেট অ্যাটলান্টা যাচ্ছে, দরকার পড়লে টারাকে বন্ধক রাখবে। কিন্তু বন্ধক রাখাটা কী আর এমন ব্যাপার? স্কারলেট তো বলছেই সামনের বছর তুলো বিক্রির টাকা দিয়ে খুব সহজেই দেনা মিটিয়ে দেওয়া যাবে, তারপরেও কিছু টাকা বেঁচে যাবে। কথাটা ও এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছে যে এটা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা কারও মনেই আসেনি। যখন ওরা জিগ্যেস করল, টাকাটা কে ধার দেবে, তখন স্কারলেট “অতিরিক্ত কৌতুহল ভাল নয়” কথাটা এমন খেলার ছলে বলল যে সবাই হেসে উঠল আর ওর কোটিপতি বন্ধুকে নিয়ে ওর পেছনে লাগতে লাগল।
“সেটা ক্যাপটেন বাটলার না হয়েই যান না,” মেলানি সেয়ানাভাব দেখিয়ে বলে উঠল, আর ব্যাপারটা এতই হাস্যকর ঠেকল যে সবাই মিলে অট্টহাস্য করে উঠল। স্কারলেট যে ওঁকে কতটা ঘৃণা করে সেটা তো কারও অজানা নয়। “ইতর” এই বিষেষণ না লাগিয়ে স্কারলেট রেট বাটলারের নামটাও মুখে আনে না।
তবে স্কারলেট এই হাসিতে গলা মেলাতে পারল না। আর অ্যাশলে হেসে উঠেও চুপ করে গেল। দেখল ম্যামি ভ্রূকুটি করে আড়চোখে স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে আছে।
হালকা হাসিখুশি পরিবেশ সহসা স্যুয়েলেনের হৃদয়কে দরাজ করে তুলল, নিজের আইরিশ লেসের কলারটা নিয়ে চলে এল। সামান্য জীর্ণ হয়ে গেলেও জিনিসটা এখনও নজর কাড়ে। ক্যারিন আবদার করতে লাগল স্কারলেট যেন ওর স্লিপারটা পায়ে দিয়েই অ্যাটলান্টা যায়। টারার অন্যান্য স্লিপারের তুলনায় ওটাই এখনও কিছুটা ভদ্রস্থ রয়েছে। মেলানি ম্যামিকে অনুরোধ করল যেন ভেলভেটের বেশ কিছুটা ছাঁট ওকে দেওয়া হয় যাতে ক্ষতবিক্ষত বনেটের কাঠামোটা চলনসই করে দিতে পারে। তারপর যখন ও বলল বুড়ো মোরগটা যদি সময় থাকতে জলাভূমিতে পালিয়ে যেতে না পারে, তাহলে বেচারাকে ওর জমকালো তামাটে সবুজ কালো পালকটার মায়া ত্যাগ করতে হবে, তখন সবাই জোরে জোরে হেসে উঠল।
স্কারলেট ওদের পটু হাতের সেলাই-ফোঁড়াই দেখতে দেখতে আর জোরে জোরে হেসে ওঠা শুনতে তিক্ততা আর ক্ষোভ মনের ভেতরেই লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগল।
“ওরা কেউ কল্পনাই করতে পারবে না, ওর সঙ্গে বা ওদের সঙ্গে বা দক্ষিণের সঙ্গে সত্যি সত্যি কী ঘটতে চলেছ। সব কিছু জেনেও ওরা এখনও ভাবছে যে সাংঘাতিক কিছু ওদের ওপর ঘটতেই পারে না, কারণ ওরা যে সবাই ও’হারা কিংবা উইল্কস কিংবা হ্যামিলটন। এমনকি ডার্কিরাও এটাই ভাবছে! মূর্খের দল সব! ওরা কখনও বুঝেও বুঝবে না! আজীবন ওরা এভাবেই ভাববে, এভাবেই দিন কাটাবে, কোনোকিছুই ওদের বদলাতে পারবে না। মেলি হয়ত জীর্ণ পোশাক পরে তুলো ওঠাবে এবং দরকার পড়লে আমাকে মানুষ খুন করার জন্যও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু তাহলেও ওর মধ্যে বদল আসবে না। এত কিছুর পরেও ও সেই লাজুক, সুশিক্ষিত মিসেজ় উইল্কসই থেকে যাবে – একজন নিখুঁত ভদ্রমহিলা! আর অ্যাশলে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখবে, আহত যুদ্ধবন্দি হয়ে কয়েদখানায় পচবে, কপর্দকশূন্য হয়ে বাড়ি ফিরবে, তবুও টুয়েল্ভ ওকসের হারিয়ে যাওয়া বাবুগিরি আঁকড়ে ভদ্রলোক হয়েই থেকে যাবে। উইল অবশ্যই অন্যরকম। কত ধানে কত চাল সেটা ও বোঝে, তবে ওর তো হারিয়ে ফেলার মত কিছু কোনোদিনই ছিল না। স্যুয়েলেন আর ক্যারিন – ওরা তো ভাবছে এটা শুধুই সাময়িক একটা দুঃসময়। বদলে যাওয়া পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য নিজেদেরও যে বদলে নেওয়া দরকার, সেটা ওরা মনেই করে না, ভাবে খুব শিগগিরই সব আবার আগের মত হয়ে যাবে। ভাবে ঈশ্বর ওদের সহায়, জাদুমন্ত্রবলে সব ঠিকঠাক করে দেবেন। উনি মোটেই সেরকম কিছু করবেন না। একটাই জাদু কাজ করবে, আর সেটা আমিই করতে চলেছি। রেট বাটলারকে মানাতে হবে … ওরা বদলাবে না। কে জানে ওরা হয়ত বদলাতে জানেই না। আমিই শুধু বদলে গেছি – আমিও বদলাতাম না – যদি সেই সুযোগ আমার থাকত।”
সব কিছুর শেষে ম্যামি ছেলেদের খাবার ঘর থেকে বের করে দরজা বন্ধ করে দিল, যাতে মাপটা ঠিক মত নেওয়া যায়। পোর্ক ধরে ধরে জেরাল্ডকে ওপরতলায় নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। অ্যাশলে আর উইল বাড়ির সামনের হলঘরে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। তামাক মুখে নিয়ে উইল শান্ত মুখে জাবর কেটে চলল। কিন্তু মনের ভেতর অশান্তি হচ্ছিল।
“এই অ্যাটলান্টা যাওয়ার ব্যাপারটা,” শেষমেশ থেমে থেমে বলেই ফেলল, “আমার কেমন যেন ভাল লাগছে না। একেবারেই ভাল লাগছে না।”
উইলের দিকে চকিত দৃষ্টিক্ষেপ করেই অ্যাশলে অন্য দিকে চোখ ফেরাল। মুখে কিছু বলল না বটে, কিন্তু মনে মনে ভাবতে লাগল, যে অস্বস্তিকর খটকা ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, সেটা কি উইলকেও তাড়া করছে। কিন্তু সেটা কী ভাবে সম্ভব? ফলের বাগানে কী হয়েছিল সেটা তো ওর জানার কথা নয়। স্কারলেট কী মরিয়াই না হয়ে উঠেছিল সেদিন! রেট বাটলারের নামটা যখন করা হল তখন ম্যামির মুখের কী অবস্থা হয়েছিল, সেটা উইল লক্ষ্য করে থাকতেই পারে না। রেটের টাকাকড়ি আর বদনাম নিয়েও উইলের কিছু জানা থাকার কথা নয়। অন্তত অ্যাশলের মনে হল এগুলো উইলের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে টারায় আসার পর থেকে লক্ষ্য করেছে, ঠিক ম্যামির মতই উইলও, ওকে বলতে হয় না, নিজে থেকেই সব কিছু জেনে ফেলে, কী অঘটন ঘটতে পারে তার আন্দাজও করে ফেলে। বাতাসে কী যেন এক বিপদের ইঙ্গিত, ঠিক কী ধরণের, অ্যাশলে জানে না, কিন্তু স্কারলেটকে এই বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা ওর নেই। সারা সন্ধ্যে স্কারলেট একবারও ওর চোখে চোখ রাখেনি। ওর সঙ্গে সারাক্ষণ যে উচ্ছলতার ভিনয় করে গেছে সেটা বেশ ভয় পাইয়ে দেওয়ার মত। যে সন্দেহটা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে, সেটা এতই ভয়ানক যে মুখে উচ্চারণ করাও যাবে না। যদি সত্যিও হয়, স্কারলেটকে অপমান করার কোনও অধিকারই ওর নেই। প্রবল অস্বস্তিতে দু’হাত মুঠো পাকিয়ে ফেলল। স্কারলেটকে কিছু বলার কোনো অধিকারই ওর নেই; আজ বিকেলেই সেই অধিকারটা ও খুইয়ে ফেলেছে। চিরতরে। ওর সাহায্যে লাগতে পারেনি। ওর সাহায্যে লাগার সাধ্য কারোই নেই। তবে ভেলভেট কাটার সময় ম্যামির গম্ভীর মুখে যে দৃঢ় সংকল্পের আভাস পেয়েছিল, সেটা মনে করে একটু স্বস্তি পেল। স্কারলেট পছন্দ করুক চাই না করুক, ম্যামি ঠিকই ওর খেয়াল রাখবে।
“এই সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী,” হতাশ মনে ভাবল। “আমিই এই পরিস্থিতির দিকে ওকে ঠেলে দিয়েছি!”
বিকেলবেলা ওর দিকে পেছন ঘুরে চলে যাবার সময়ে স্কারলেটের ঋজু দৃঢ়বদ্ধ কাঁধ আর উঁচিয়ে রাখা জেদি মাথাটা অ্যাশলের চোখের সামনে ভেসে উঠল। স্কারলেটের জন্য ওর হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যেতে লাগল, শ্রদ্ধায় ওর মাথা নত হয়ে এল, নিজের অসহায়তাকে ধিক্কার দিল। ও ভাল করেই জানে, স্কারলেটের শব্দভাণ্ডারে শৌর্য বলে কোনও কথা নেই, এটাও জানে যে যদি বলে ওর থেকে শৌর্যশালী আর কাউকেই ও দেখেনি, তাহলে স্কারলেট ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে চেয়ে থাকবে কিছু না বলে। স্কারলেটকে শৌর্যশালী বলে মনে মনে ওর মধ্যে কত সুক্ষ্ম গুণের সমাহার দেখতে পায়, সেটাও ও বুঝতে পারবে না জীবন যেভাবে দেখা দেয়, স্কারলেট সেটাকেই স্বীকার করে নেয়, কোনো রকম বাধাবিপত্তি গ্রাহ্য করে না, মনের জোরে লড়াই চালিয়ে যায়, কারণ ও হেরে যেতে শেখেনি। নিশ্চিত হারের মুখোমুখি হয়েও ও লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে।
গত চার বধর ধরে, এমন অনেককেই ও দেখেছে, যার হার মেনে নিতে অস্বীকার করেছে, শৌর্যশালী বলেই ওরা নিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে অকুতোভয়ে এগিয়ে গেছে। তবুও ওদের হারতেই হয়েছে।
ছায়া ছায়া হলঘরে উইলের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হল যে স্কারলেট ও’হারার মত এমন শৌর্যশালী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আগে ওর পরিচয় ঘটেনি যে ওর মায়ের ভেলভেটের পর্দায় সজ্জিত হয়ে আর মোরগের ল্যাজের পালক মাথায় লাগিয়ে বিশ্বজয় করার জন্য বেরিয়ে পড়ার তোড়জোড় করছে।
চলবে...
---------------
উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক, ফটোগ্রাফার
কলকাতায় থাকেন।



0 মন্তব্যসমূহ