বিছানায় শুয়ে থাকা শরীরটি সোফিয়ার, সুফিয়ারও হতে পারে। শরীরের অধিকারী যেই হোক, সে এখন শরীরটিতে নেই। মিনিটখানেক আগে তার চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। তিতাসের দু’চোখও নিভে এসেছে। অবশ্য চোখ বন্ধ হওয়ায় এই শরীরের স্বত্বাধিকারী, না তিতাস কে মুক্তি পেলো-এই বেমক্কা প্রশ্নটি তিতাসের করোটির ভেতর চক্কর কেটেই যাচ্ছে।
বাইরে বৃষ্টি। শীত নামা বৃষ্টি। চারপাশের গাম্ভীর্য ইশারা করছে প্রকৃতির পালাবদল এবার স্বস্তিকর হবে না। মৃত্যুর হাতছানি দিয়ে জাঁকিয়ে শীত নামবে। তিতাসের অবশ্য ঋতুবদল নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। ও এখন মুক্তির বিষয়টা নিয়ে ভাবছে। অন্ধকার অকৃপণ হাতে ভাবনাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। বিদ্যুৎও নেই। এখন বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন একেবারে ওৎ পেতে থাকে। ঝড়-বৃষ্টির আভাস পেতে না পেতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তিতাস জানে এই বাড়িতে জেনারেটরের লাইন টানা আছে। কিন্তু উঠে ঘরের বাতি জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না ওর।
অন্ধকারেই সিগারেট ধরায় তিতাস। এটা বিশেষ ধরনের সিগারেট। সিগারেটের ভেতরের তামাক ফেলে গাঁজা ভরে বানানো, দামটা একটু বেশি পড়ে। মেসমেট হিসাবে হাসন রাজা ওকে এই জিনিস একটু কম দামেই দেয়।
তিতাসের মেসমেট হাসন রাজা। ওর অবিন্যস্ত জীবনের একমাত্র সঙ্গী হাসন। হাসনের আসল নাম যে হাসন রাজা না, তিতাস তা প্রথমদিনই বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু ও কখনো হাসনের প্রকৃত নাম জিজ্ঞেস করেনি। কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কখনোই উপযাচক হয়ে জানতে চায় না তিতাস। মানুষকে ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করাটা ও ভীষণ অপছন্দ করে। তিতাস বিশ্বাস করে কাউকে কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার অর্থ হলো তার ঘরে অনুমতিবিহীন ঢুকে পড়া।
হাসন রাজা স্বেচ্ছায় তিতাসকে নিজের ব্যক্তিগত কথা বলে, ও জানতে না চাইলেও বলে। গ্রাম থেকে পালিয়েছিল হাসন রাজা। বাল্যবন্ধুর সঙ্গে কবে সমপ্রেমে জড়িয়ে গিয়েছিল হাসন নিজেও টের পায়নি। ধরা পড়ে দুই বন্ধু গ্রামবাসীর কাছে এমন মার খেয়েছিল যে হাসনের বন্ধুটির একটা চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এরপর সালিসের ভয়ে আধমরা হাসন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল।
তিতাসও বাড়ি ছেড়েছিল। পালায়নি। মায়ের চোখের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গিয়েছিল। মা কিছু বলেনি। ওকে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। দরজার কাছে অনড় দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ের পাথর চোখে ছিল কেবল পানি।
তিতাস আরেকবার মায়ের এমন চেহারা দেখেছিল। তখন ও অনেক ছোট ছিল। বাবা মারা যাবার পর তিতাসকে শহরের নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনেছিল মা। তারপর মা ওকে পাড়ার একটা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। নতুন স্কুলের প্রথমদিন মা তিতাসের সঙ্গী হয়েছিল। বাসায় ফেরার পর ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে মা পাথর চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। তিতাস জোরে জোরে মাকে ধাক্কা দিচ্ছিল, কিন্তু মা যেন ওর কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছিল না।
তিতাসের বাড়ি ছাড়ার দিন মা ওকে না আটকালেও সোফিয়া আটকানোর চেষ্টা করেছিল। গোলাপি কামিজ পরা সোফিয়া তিতাসের পায়ে পড়েছিল, হাত ধরে টানাটানি করেছিল খুব। সোফিয়াকে নিজের শরীর থেকে কী করে ছাড়িয়েছিল, ওর মনে নেই।
কলেজে পড়াকালীন বয়সের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানোর কিছু নেই। চাইলে পুরোটাই মনে রাখা যায়। আসলে তিতাস যতটুকু মনে রাখতে চেয়েছে ঠিক ততটুকুই মনে রেখেছে।
সেদিন তারিনের বাবা বাড়ি এসে মাকে খুব শাসিয়েছিল, পুলিশের মেয়ের সঙ্গে ফেসবুকে প্রেম করার মজা বোঝাবে। রিমান্ডে নিয়ে ডিম থেরাপি দেবে। ইয়াবা, হেরোইন, অস্ত্রসহ এমন সব মামলায় জড়াবে যে ছেলের ক্যারিয়ার মাদকসম্রাট হিসাবে গড়ে উঠবে।
তারিনের বাবা চলে যাওয়ার পর পরই সোফিয়া তিতাসের গালে সজোরে চড় মেরেছিল। বাবার মৃত্যুর পর কেউ কখনো ওর গায়ে হাত তোলেনি। রোজ রোজ পাতে ট্যাংরা বা তেলাপিয়ার ঝোল আর ঢ্যালাঢেলা ডাল দেখে ক্ষুব্ধ তিতাস ভাতের প্লেট ছুঁড়ে ফেললেও ওকে মারেনি মা।
সেদিন মায়ের হাতে মার খেয়ে তিতাসের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
আচমকা তিতাস টের পায় শ্বাস নিতে পারছে না ও। ঘরের অক্সিজেন সব হাওয়া হয়ে গেলো নাকি!
তিতাস ডুবুডুবু চোখে সামনে তাকায়, বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে। কখন থেকে এখানে আছে? এই ঘরটি খুব চেনা ওর। বিজন ঘরটির কোথাও কোনো স্মৃতি লুকানো আছে কি? তিতাস তো কিছু দেখতে পাচ্ছে না। পাড় ভাঙা বেদনায় ওর বুকের ভেতরটা মুচড়ে আসে। ঘরটিকে জগতচ্যুৎ এক খণ্ড ভূমি মনে হয়। চারধার নিস্তব্ধ।
কয়টা বাজলো? তিতাস এ বাড়িতে যখন এসেছে তখন আছরের আজান হচ্ছিল। ঐ সময়ে মাকে দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মেয়েটা বাড়িতে ছিল। মেয়েটা হঠাৎ ভীতসন্ত্রস্ত পাখির মতো ছুটে পালাতে চাইছিল। তাড়াহুড়ো করে দরজা দিয়ে বের হতে গিয়ে দরজার হুড়কোর সঙ্গে ওর ওড়না পেঁচিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটার চোখজোড়া এক ঝলক দেখেছিল তিতাস। সেখানে ভয়ের দৃষ্টি গাঁথা ছিল। মৃত্যুদৃশ্যটা হয়তো মেয়েটাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। তিতাস ভয় পায়নি, যেন ও জানতো আজ এখানে মৃত্যুদূত আসবে।
বিদ্যুৎ চলে এসেছে। বৃষ্টিও ধরে গেছে। আলোর খেলা দেখতে দেখতে তিতাসের মাথা হালকা হয়ে আসে। মাথার ওপরে খট করে সিলিং ফ্যান ঘুরতে শুরু করে। হাওয়ার বুদবুদে ওর শরীর-মন জুড়িয়ে যায়। তিতাস খাটের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নেয়। গোলাপি কভারের ভেতরে সিম্ফনি হেলিও এস টুয়েন্টি ফাইভ ফোন। তিতাসের কাছে গোলাপি রঙটা ভীষণ অশ্লীল লাগে।
এই ঘরে গোলাপি রংয়ের ছড়াছড়ি। বিছানার চাদর, জানালার পর্দা, পাপোস, আলনায় ঝোলানো কাপড়। তিতাস চোখ বন্ধ করে, চোখ মেলে ত্রিশ সেকেন্ড পরেই। এই ঘরের দেয়ালও গোলাপি। ঘরটি অনেকদিন মনোযোগ দিয়ে দেখেনি তিতাস। অনেক নতুন জিনিস এসেছে ঘরে। কাঠের আলমারি, ইজিচেয়ার, খাটের পাশে ছোট একটা সুদৃশ্য ক্যাবিনেট। ক্যাবিনেটের ওপরে গোটা তিন ম্যাগাজিন, পত্রিকা আর একটা বেতের ঝুড়ি ঠাসা ওষুধ রাখা।
বিছানায় শোয়া শরীরটির মুখাবয়বে গোলাপি আভা দেখে তিতাস চোখ ফিরিয়ে নেয়। পঞ্চাশ না পেরোনো শরীরটি এখন মানুষহীন। যে মানুষটি পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির এই শরীর জুড়ে থাকতো, সে এখন পৃথিবীতে নেই। মৃত মানুষের মুখ চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়। ঘরের এক কোণে জায়নামাজ বিছিয়ে সুর করে কোরআন শরীফ তেলওয়াত করতে থাকে কেউ কেউ। গ্লাসের ভেতরে রাখা চালে আগরবাতি গাঁথা হয়। আগরবাতির ঘ্রাণের বৈভবে ধীরে ধীরে মৃত্যুঘ্রাণ হারিয়ে যায়। তিতাস দেখেছে, মানুষ মারা গেলে বাড়িতে ছোটখাট একটা মেলা বসে যায়। চেনা, অর্ধচেনা, অচেনা মানুষে বাড়িঘর ভরে যায়। তারা একে-অন্যের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকায়।
তিতাসের ভেতরে এখন কোনো অনুভূতি কাজ করছে না। মাথায় একটা ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছে, ভাবছে মৃত্যুসংবাদটি আত্মীয়-স্বজনকে জানানো দরকার। আঙুলের স্পর্শে ফোন আনলক করার চেষ্টা করে ও। হয় না। বিদ্যুতের একটা ঝলক খেলে যায় ওর মগজে। পাসওয়ার্ডটা কার নামে হতে পারে আন্দাজ করে তিতাস মেঝেতে সিগারেটের জ্বলন্ত মুখ ঘষে দেয়। সিগারেটটা ফুরিয়ে গেলে মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকা প্রশ্নের চক্কর থেমে যাবে। সেটা এই মুহূর্তে হোক তা চায় না ও। তবে এমন কাজ সাধারণত করে না তিতাস। আজ অসাধারণ একটা দিনে ও অসাধারণ কিছু করবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
গোলাপি কাভারের ফোনটা খাটে ছুঁড়ে ফেলে তিতাস। প্যান্টের পকেটের ভেতরে ফোন ভোঁ ভোঁ করছে। হাসনকে আসতে বলে তিতাস মামাকে ফোন দেয়, মামাই সবাইকে খবরটা দেবে। জামিল মামার ফোন নম্বর আছে ওর কাছে। মামা মাঝে মাঝে তিতাসের খোঁজখবর নেয়, ওকে টাকাপয়সা দেয়। তিতাস জানে এ টাকা কার তবুও ও নেয়।
তিতাস বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। মৃত্যুর মতো হিম হাওয়া বইছে। হাওয়ার তোড়ে গ্রিলের ফাঁক গলে ঢুকে পড়া মধুমঞ্জুরির পাতাগুলো গুমরে গুমরে উঠছে। আসার সময় দেখেছিল মধুমঞ্জুরি আর করবী গাছ দুটো ছাড়া বাগানে আর কোনো গাছ নেই। বাবা বেঁচে থাকতে বাগান করতো। মা-ও গাছের যত্ন করতো খুব। সোফিয়া যখন থেকে এ বাড়িতে থাকতে শুরু করলো তখন থেকে বাগানের গাছ কমতে শুরু করলেও ঘৃতকুমারী গাছগুলো তরতাজা হতে শুরু করেছিল।
এদের মা গাছটা যেদিন এই বাড়িতে আসে সেদিন তিতাসের খুব ইচ্ছে করছিল কালো প্লাস্টিকের টব থেকে গাছটাকে উপড়ে ফেলে। পারেনি। ঐ লোকটা সেদিন টবটা বারান্দায় রাখতে রাখতে সোফিয়াকে বলেছিল, এর পাতার জেলি ত্বকের জন্য খুব উপকারি। গাছের গোড়া থেকে চারাগাছ বের হবে তারপর বাসা গাছে ভরে উঠবে।
এখন বারান্দায় পাঁচটি টব, সব কটিতে তরতাজা মোটা মোটা পাতার ঘৃতকুমারী গাছ। সোফিয়া সবসময় গাছের পেছনে পেছনে থাকতো। আর মা থাকতো তিতাসের পেছনে পেছনে। ওর স্কুল, কোচিং, খেলার মাঠ একসময় সব জায়গায় মা ওকে পৌঁছে দিতো। তারপর তিতাস কী করে যেন একাই বড় হয়ে উঠতে শুরু করলো। তখন ও একা একা সব জায়গায় যেতো। বাড়ি ফিরে একদিন হঠাৎ সোফিয়াকে দেখতে পেলো তিতাস। তারপর রোজ দেখতে পেতো।
প্রথম প্রথম সোফিয়াকে অবাক চোখে দেখতো তিতাস। লোকটা এ বাড়িতে এলেই মায়ের ঘর থেকে সোফিয়া বেরিয়ে আসতো। সোফিয়া দেখতে আলাদা। মায়ের মতো নোনতা মুখ, জোড় ভ্রু, চোখের নিচে কালি নেই। অমসৃণ ত্বক, শুষ্ক খসখসে ঠোঁটও নেই সোফিয়ার।
সোফিয়া গোলাপি কামিজ পরতো। গালে ঘৃতকুমারীর জেলি মাখতো। ঠোঁটে গোলাপি লিপিস্টিক দিতো। বিহঙ্গদৃষ্টিতে তাকাতো। তারপর চুলগুলো পনিটেইল বেঁধে সোফিয়া এই বাড়িতে উড়ে উড়ে বেড়াতো। তিতাসকে দেখেও দেখতো না। তিতাস চোখ বড় বড় করে সোফিয়াকে দেখতো।
তিতাসের হাতে একগাদা চকলেট দিয়ে লোকটা সোফিয়াকে নিয়ে মায়ের শোবার ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিতো। দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে দুটো নগ্ন শরীরের ওঠানামা দেখতে দেখতে তিতাস চকলেট খেতো।
দরজায় বেল বাজছে। দরজা খুলে দিতেই কয়েকজন মানুষ বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এদের মধ্যে তিতাস শুধু জামিল মামাকে চেনে। একজন ভদ্রমহিলাও আছে এদের সঙ্গে, মামী মনে হয়। মাথায় হিজাব থাকায় তিতাস তাকে ভালোভাবে চিনতে পারছে না। ভদ্রমহিলা এসে তিতাসের হাত জড়িয়ে ধরতেই তার শরীরের তেল-মসলার গন্ধে তিতাস টের পায় ভদ্রমহিলা ওর মামী। মামার কাছে গিয়ে একদিন টাকা চাইতেই মামী গালে চড় মেরে ওকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিল। বলেছিল, বেশ্যার পোলা।
হাসন রাজা এসেছে। ওর চোখ-মুখ কান্নাভেজা। হাসন শান্ত ভঙ্গিতে তিতাসকে দুমিনিট বুকে জড়িয়ে রাখে। তিতাসের ভেতরে উথালপাথাল কী যেন একটা হয়, হাসনের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ও বারান্দায় চলে আসে।
ঘৃতকুমারী গাছেরা এদের সতেজ তীক্ষ্ম পাতাগুলো তিতাসের দিকে তাক করে রাখে। তিতাস কাছে গিয়ে কোনোপ্রকার বল প্রয়োগ ছাড়াই গাছগুলোকে একটা একটা করে টেনে তোলে, তারপর পায়ে দলে পাতাগুলো চ্যাপ্টা করতে থাকে। সরস পাতা থেকে থকথকে জেলি বেরিয়ে এসে ওর পায়ের পাতায় লাগে। হাসন ছুটে এসে তিতাসকে বারান্দা থেকে সরিয়ে নেয়।
রাত বাড়ছে। বাড়িতে মানুষের কোলাহলও বাড়ছে। এখনো লোকটাকে তিতাসের চোখে পড়েনি। ভিড়ের মাঝে আছে হয়তো। ধীরে ধীরে লতা-পাতার আত্মীয়-স্বজনেরা হাজিরা দিচ্ছে। সবার চোখে-মুখে শোকের কৃত্রিম ছাপ। কেউ কেউ এসেই তিতাসকে জড়িয়ে ধরে বলছে, বাপ-মা মরা ছেলে। মা, বেঁচে থাকতে এরা আসেনি। দূরত্ব কিংবা ব্যস্ততার অজুহাতে এই বাড়ির চৌহদ্দিতে পা দেয়নি কেউ।
আজ একটা মৃত্যু অভিনবভাবে সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিচ্ছে। ওর বাবার মৃত্যুর দিনেও এই বাড়িতে অনেক মানুষ এসেছিল। মা মোজাইক করা মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছিল। তিতাস মায়ের শরীর ঘেঁষে বসেছিল, দশ বছরের তিতাস সেদিন বুঝে গিয়েছিল বাবা আর ফিরবে না। ওর জন্মদিনে ফোর হুইলের আর্মি গাড়িও আর কেনা হবে না।
স্মৃতিগুলো কানের কাছে ঝনঝন শব্দে বাজে। বাজনার তালে তিতাসের ভাবনাগুলো ক্রমশ বিক্ষিপ্ত হতে থাকে। মৃতদের জগতটা কেমন? ঐ জগতে কি সবাই নিজের প্রিয়জনের মুখোমুখি হয়? ওখানে মায়ের সঙ্গে বাবারও কি দেখা হবে?
কে যেন বলে ওঠে, ‘মরলে সব ইয়া নফসি, ইয়া নফসি।’
হঠাৎ জামিল মামা হাত উঁচু করে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে জানায়, ফজরের নামাজের পর পরই মুর্দার জানাজার নামাজ পড়া হবে। শুনে তিতাসের মনে পড়ে যায় মুর্দার নাম সুফিয়া আকতার। ওর মায়ের নামও সুফিয়া আকতার। ঐ লোকটা সুফিয়া নামটা এমনভাবে উচ্চারণ করতো যে সোফিয়া শোনাতো।
তিতাস দুই চোখ বন্ধ করে। বাবার মতো সুফিয়া আকতারও ফিরবে না আর। সোফিয়া কি ফিরবে?
তিতাস বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে এবার একটা আশ্চর্য দৃশ্য দেখে।
গোলাপি ঘরটি মানুষশূন্য হয়ে গেছে। ঘরে শোঁ শোঁ শব্দে হাওয়া বইছে। শীতল সেই হাওয়ায় সিলিংয়ের কাছাকাছি হাড়গোড়হীন একটি নারীর নরম শরীর ভাসছে। নারীটির নোনতা মুখ, জোড় ভ্রু, চোখের নিচে কালি, পরনে তুষার সাদা জামা। এ তো সুফিয়া আকতার! তিতাসের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে সুফিয়া, এরপর বিছানায় শোয়া সোফিয়ার নিস্তরঙ্গ শরীরে ঢুকতে শুরু করে। তিতাসের শরীর শিরশির করে ওঠে। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তিতাস দেখে সোফিয়ার পরনের গোলাপি জামাটা মেঝেতে পড়ে আছে।


11 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ
উত্তরমুছুননামহীন পাঠককে ধন্যবাদ
মুছুনভালো লেগেছে👏
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনঘোমটা টানা একটু রহস্য দিয়ে গল্পের শুরু ও শেষ- পাঠককে যেমন পড়তে আগ্রহী করে তুলে তেমনি মনেও রেখে দেয়। আর রইলো গল্প শব্দ আর উপমার বুনট। ফলশ্রুতিতে জন্ম দিলো আনন্দ পাঠ। সোফিয়া কিংবা সুফিয়া, তিতাস, হাসন রাজা কিংবা মামী চরিত্র কেমন ভালোমন্দের পারদ বেয়ে উঠলো নামলো!
উত্তরমুছুনপ্রজ্ঞার মতামত মানেই ভিন্ন কিছু। যা আচ্ছন্ন করবে, চোখ ভেজাবে ❤️
মুছুনপ্রথম থেকে চমৎকার একটা আবছায়া রেখে শেষটায় দারুণ পরিসমাপ্তি। এককথায় অনবদ্য। সাদিয়া আপা এইভাবে আরো নতুন নতুন গল্প আমাদের উপহার দিন।
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ আপা
মুছুনঅন্যরকম এক ধোঁয়াশা গল্পের শেষ অবধি টেনে নিয়ে গেল অবলীলায়। গল্প পাঠের পরিপূর্ণ আনন্দ একেই বলে হয়ত।
উত্তরমুছুনতোমাকে পেয়ে ভালো লাগছে
মুছুনখুব ভাল লাগল। সমাপ্তিটা খুব ভাল। - অমিতরূপ চক্রবর্তী।
উত্তরমুছুন