ইসাবেল আয়েন্দের গল্প: তোস্কা



ইংরেজি অনুবাদ : মার্গারেট সেয়ার্স পেডেন
বাংলা অনুবাদ : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

প্রথম যেদিন তার বাবা তাকে পিয়ানোর সামনে বসিয়ে দেন তখন তার বয়স মাত্রই পাঁচ বছর। তারপর তার বছর দশেক বয়সে মৌরিজিয়া রুগিয়েরি একদিন গোলাপী অর্গানজা আর পেটেন্ট চামড়ার জুতোয় সেজেগুজে গারিবল্ডি ক্লাবে তার বাজনা শোনাল। শ্রোতারা বেশির ভাগ এককালে ইতালি থেকে আসা ঔপনিবেশিকদের বংশধর, বাজনা শুনে সবাই প্রশংসা করবে, সেটা জানাই ছিল। বাজনা শেষ হতে তারা গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের তোড়া তার পায়ের সামনে নামিয়ে রাখল। ক্লাবের সভাপতি একটি স্মারক ফলক এবং ফিতা আর লেস দিয়ে সাজানো একটি কারুকাজ করা বড় চীনামাটির পুতুল উপহার দিল তাকে।

“অনেক অভিনন্দন তোমায়, মৌরিজিয়া রুগিয়েরি, অসাধারণ প্রতিভা তোমার, একেবারে মোৎসার্ট; সারা দুনিয়ার সেরা সেরা মঞ্চগুলো তোমায় নিয়ে টানাটানি করবে,’’ - বলেছিলেন তিনি।

একদিকে তুমুল হাততালি, অন্যদিকে গর্বে, উচ্ছাসে মায়ের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। মৌরিজিয়া হাততালি শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারপরে, তার মায়ের ফোঁপানি ছাপিয়ে যাতে শোনা যায়, এমন জোর গলায়, অপ্রত্যাশিত তীব্রতায় সে ঘোষণা করল – “এটাই আমার শেষ পিয়ানো বাজানো, আমি গায়ক হতে চাই।” এরপর পুতুলটার কব্জি ধরে সেটার পা ঘস্টাতে ঘস্টাতে টেনে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

বিব্রত অবস্থাটা কাটিয়ে ওঠার পর একদিন তার বাবা তাকে এক অত্যন্ত কড়া মাস্টারমশাইয়ের গান শেখার ক্লাসে ভর্তি করে দিলেন। প্রতিটি ভুল সুর লাগানোর জন্য তার আঙ্গুলের গাঁটে গাঁটে বাড়ি লাগিয়েও সেই লোকটি কিশোরীর অন্তরের অপেরাশিল্পী হয়ে ওঠার উৎসাহকে খুন করে উঠতে পারলনা। কিন্তু কৈশোর পার হওয়ার সাথে সাথে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে মৌরিজিয়ার গলার জোর খুব কম, প্রায় একটি বাচ্চা পাখির মত, খুব বেশি হলে একটি শিশুকে দোলনায় শান্ত করতে পারে, তার বেশি উঠবেনা; মেয়েটি তার সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, অপেরার সোপ্রানো হওয়ার স্বপ্নগুলোকে তুলনায় নিতান্ত মামুলি ভাগ্যের সাথে বিনিময় করে নিতে বাধ্য হল। উনিশ বছর বয়সে, প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী এজিও লঙ্গোর সাথে তার বিয়ে হয়ে গেল। পেশায় স্থপতি এজিওর কোন স্থাপত্যের ডিগ্রী ছিলনা। শুধুমাত্র ব্যবসা বুদ্ধির জোরে একদিন সিমেন্ট আর ইস্পাতের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখত সে আর মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সেই সাফল্যের প্রায় দোরগোড়ায় পৌঁছেও গিয়েছিল।

যে তীব্র একাগ্রতায় এজিও লঙ্গো রাজধানীর এ মাথা থেকে ও মাথা নিজের বানানো অট্টালিকায় ভরে ফেলেছিল সেই একই একাগ্রতায় সে মৌরিজিয়া রুগিয়েরির প্রেমেও পড়েছিল। আকারে মানুষটি ছোট খাটো, গাঁট্টা-গোট্টা হাড়ের কাঠামো, ঘাড়ের দিকে তাকালে মনে হয় ভারী ভারী বোঝা টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এর সৃষ্টি; কালো চোখ আর পুরু ঠোঁটে একটু যেন নির্মমতা মিশে আছে। তার কাজের কারণে তাকে মোটা খসখসে জামা-কাপড় পরতে হত, এবং রোদে রোদে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ত্বক ট্যান করা চামড়ার মত কাটাকুটি বলিরেখায় ভরে গিয়েছিল। ভাল স্বভাবের উদার প্রকৃতির মানুষ ছিল সে, সহজেই হাসত, জনপ্রিয় গান শুনতে পছন্দ করত, এবং নিতান্ত সাধারণ খাবারও প্রচুর পরিমাণে খেতে ভালোবাসত। বাইরের এই সহজ সরল জীবন যাপনের আড়ালে তার অন্তরে যে পরিমার্জিত এবং সংবেদনশীল মনটি লুকিয়ে ছিল এজিও তাকে তার কাজে বা শব্দে প্রকাশ করতে জানতনা। মৌরিজিয়ার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে তার চোখ এমন জলে ভরে উঠত আর বুকের ভিতরটা এমন নরম হয়ে আসত যে, লজ্জা ঢাকতে তাকে কাশি বা গলা-খাঁকারির ছল নিতে হত। মৌরিজিয়াকে নিয়ে তার হৃদয়ের অনুভূতিকে কথায় প্রকাশ করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। সে ভেবেছিল যে স্ত্রীকে নানান উপহারে ভরিয়ে দিয়ে আর অবিচল ধৈর্য্যের সাথে তার সমস্ত কিছু সহ্য করে নিয়ে আস্তে আস্তে তাকে তার অতি মাত্রায় খামখেয়ালি মেজাজ আর কাল্পনিক অসুস্থতাগুলোর থেকে সারিয়ে তুলবে এবং এইভাবেই প্রেমিক হিসাবে নিজের ব্যর্থতাকেও পুষিয়ে দেবে। মেয়েটি এজিওর মনের ভিতরে যে আকুল আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুলত সেটি প্রতিদিনই তাদের প্রথম দেখার তীব্রতায় নুতন করে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত। হতাশ এজিও স্ত্রীকে আদর করে জড়িয়ে ধরত, যদি এতে করে তাদের মধ্যের গভীর ফাটলটি দূর হয়ে যায়, সেই একান্ত আশায়, কিন্তু তার স্ত্রীর কল্পনারা সবসময়ই উদ্বেল হয়ে ঊড়ে বেড়াত ভার্ডি আর পুচিনির রোমান্টিক অপেরা আর রেকর্ডিংয়ের জগতে, ফলে তার প্রেমের ছোঁয়ায় এসে এজিওর আবেগ স্তিমিত হয়ে মিলিয়ে যেত। এজিও ঘুমিয়ে পড়ত, কিন্তু সারা দিনের ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত, ঘোরানো দেয়াল আর সর্পিল সিঁড়ির দুঃস্বপ্নে ক্লান্ত মানুষটি ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, বিছানার ধারে বসে যখন তার ঘুমন্ত স্ত্রীকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখত তার মনে হত তার স্ত্রীর স্বপ্নগুলোর মহত্ত্বকে সে বুঝতে শিখছে। তার স্ত্রীও যদি একই তীব্রতায় তার স্নেহের প্রতিদান দিত, তবে তার জন্য নিজের প্রাণটাও দিয়ে দিতে রাজি ছিল সে। স্ত্রীর জন্য স্তম্ভের পর স্তম্ভ দিয়ে সাজানো যে বিশাল প্রাসাদের মত বাড়িটি সে বানিয়েছিল সেটিতে বিভিন্ন স্থাপত্য-কলার এমন জটিল মিশ্রণ আর অলঙ্কারের এমন প্রাচুর্য ঘটিয়েছিল যে দেখতে থাকলে মাথা ঘুরে যেত। চারজন কাজের লোক একনাগাড়ে সেখানে কাজ করে যাচ্ছে, কেউ ব্রোঞ্জ-এর কারুকাজ ঘষছে ত কেউ মেঝে পালিশ করছে, ঝাড়বাতিগুলোর স্ফটিকের অশ্রুদানা মুছছে, কিংবা আসবাবপত্রের সোনায় মোড়া পায়া আর স্পেন থেকে আমদানি করা নকল পারসিক গালিচার গা থেকে ধুলো ঝাড়ছে। বাড়ির বাগানে লাউডস্পিকার এবং স্টেজ-লাইট লাগানো একটি ছোট রঙ্গমঞ্চ বানিয়ে দিয়েছিল। সেখানে মৌরিজিয়া রুগিয়েরি তাদের অতিথিদের গান গেয়ে শোনাতে ভালোবাসত। এজিওকে ধরে খুন করে ফেললেও তাকে দিয়ে স্বীকার করানো যেতনা যে তার স্ত্রীর ঐ পাখির মত চিঁচিঁ-করা গানের প্রশংসা করতে তার মনে কোন দ্বিধা ছিল। আর সেটা সে করত যতটা না নিজের শিল্প-সংস্কৃতির অভাবকে ঢাকবার জন্য তার থেকেও বেশি করে তার স্ত্রীর শিল্পীসুলভ ঝোঁকের প্রতি শ্রদ্ধার কারণে। এজিও আশাবাদী মানুষ ছিল এবং তার নিজের উপর ভরসাও ছিল প্রবল। কিন্তু মৌরিজিয়া যখন কাঁদতে কাঁদতে জানাল যে সে মা হতে চলেছে, তখন এমন এক উদ্বেগ এজিওকে দিশেহারা করে দিল যার উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলনা; তার মনে হল তার হৃদয়টা বোধ হয় এবার পাকা তরমুজের মত ফেটে যাবে, অথচ, সামনের মানুষটির চোখের জলের দুনিয়াতে এই আনন্দের হয়ত কোনও জায়গা নেই। তার ভয় হচ্ছিল যে কোন প্রচন্ড বিপর্যয় নেমে এসে তার এই অতি অনিশ্চিত সুখের স্বর্গকে তছনছ করে দেবে আর তাই সে যে কোন আক্রমণের হাত থেকে একে বাঁচানোর জন্য তৈরি হল।

বিপর্যয়টি এল এক ডাক্তারি ছাত্রের ছদ্মবেশে যার সাথে মৌরিজিয়ার দেখা হয়েছিল রাস্তায় একটি গাড়িতে করে যাওয়ার সময়। বাচ্চাটি ততদিনে জন্মে গেছে - তার বাবার মতোই প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এক শিশু, যাকে দেখে মনে হত দুনিয়ায় এমন কিছু নেই, এমনকি কারও কুনজরও না, যা তার কোন ক্ষতি করে দিতে পারে। আর এদিকে তার মা, বাচ্চা হওয়ার আগে তার যে সরু মেয়েলি কোমরটি ছিল, ইতিমধ্যেই সেটি সে ফেরৎ পেয়ে গিয়েছে। ঐ দিনটিতে মৌরিজিয়া যখন বাসে চেপে সিটি সেন্টারের দিকে যাচ্ছিল, ছাত্রটি এসে তার পাশে বসেছিল; একটি রোগা-পাতলা, ফ্যাকাশে চেহারার যুবক, রোমান মূর্তির মত দেখতে। বসার পর সে তোস্কা অপেরার স্কোর পড়তে পড়তে খুব মৃদু স্বরে সেটির তৃতীয় অধ্যায় থেকে একটি গান শিস দিয়ে গাইতে শুরু করল। মৌরিজিয়ার মনে হল গোটা দিনটির সমস্ত সূর্যালোক যুবকটির গালের হাড়গুলিতে এসে জমা হয়েছে, আর তার নিজের ভিতর কি এক মধুর প্রত্যাশায় তার কাচুলিটি ভিজে উঠছে। স্থির থাকতে না পেরে সে দুটি কলি গুনগুন করে গেয়ে উঠল – সেই যেখানে মারিওকে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যাওয়ার আগে সে আসন্ন ভোরের জয়গান গাইছে। আর এইভাবে গানের দুটি লাইনের ভিতর দিয়ে একটি রোমান্সের সূচনা হয়ে গেল। তরুণটির নাম লিওনার্দো গোমেজ আর সেও হারিয়ে যাওয়া দিনের গান, বেল ক্যান্টো নিয়ে মৌরিজিয়ার মতই পাগল ছিল।

পরের মাসগুলিতে ছাত্রটি তার ডাক্তারির ডিগ্রি অর্জন করল, আর মৌরিজিয়া ক্রমাগত পুনর্জন্ম নিয়ে চলল, অপেরা আর রোমান্টিক সাহিত্যের যত ট্র্যাজেডি তার জানা ছিল, একটা একটা করে তাদের সব কটির মধ্য দিয়ে নিজেকে পার করতে রইল। একের পর এক ডন হোসে, যক্ষ্মা, মিশরের সমাধি, ছুরি এবং বিষের প্রয়োগে সে খুন হল; প্রেম করে চলল ইতালীয়, ফরাসি এবং জার্মান ভাষায়; হয়ে উঠল আইডা, কারমেন এবং লুসিয়া ডি ল্যামারমুর আর এর প্রতিটি ক্ষেত্রে তার মৃত্যুহীন প্রেমের তীব্র আবেগের কেন্দ্রটিতে থাকল লিওনার্দো গোমেজ। বাস্তবে তারা এক বিশুদ্ধ প্রেমের বন্ধনে জড়িয়ে গিয়েছিল, সেই প্রেম যা মৌরিজিয়া পেতে চেয়েছিল কিন্তু শুরু করার সাহস পায়নি, আর লিওনার্দো যাকে প্রেমিকার বিবাহিত জীবনের সম্মান রাখতে গিয়ে কেবলমাত্র আপন হৃদয়ের গভীরে রেখে দেওয়ার জন্য নিজের সাথে লড়াই করে যাচ্ছিল। তারা দেখা করত অনেক লোকজনের মাঝখানে; খুব বেশি হলে কোন পার্কের অন্ধকার কোণে একে অন্যের হাত ধরেছে। নিজেদের মধ্যে যেসব চিঠি চালাচালি হত, সেখানে তারা নাম সই করত – তোস্কা আর মারিও। খুব স্বাভাবিক ভাবেই খলনায়ক স্কার্পিয়ার ভূমিকায় থাকত এজিও লঙ্গো, যে, তার ছেলের জন্য, তার সুন্দরী স্ত্রীর জন্য এবং স্বর্গ থেকে ঝরে পড়া সমস্ত আশীর্বাদের জন্য এত কৃতজ্ঞ ছিল আর তার পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে, যদি কোনও প্রতিবেশী তার কাছে এই গুজবটি বারেবারে এসে জানিয়ে না যেত যে তার স্ত্রী আজকাল হামেশাই রাস্তার গাড়িতে চড়ে যাতায়াত করছে, তবে সে কখনও জানতেও পারত না যে তার চোখের আড়ালে কী ঘটে চলেছে।

এজিও লঙ্গো ব্যবসায় হঠাৎ করে নেমে আসা কোন বিপর্যয় ঘটার কিংবা মনের ভিতর চরম কু-ডাকা মুহূর্তগুলোয় ছেলের জীবনে কোন ভয়ংকর অসুস্থতা কি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিল। কিন্তু এমন আশঙ্কা সে ঘুণাক্ষরেও করেনি যে কোন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা ছাত্র তার নাকের তলা দিয়ে তার স্ত্রীকে চুরি করে নিয়ে চলে যাবে। গল্পটা শুনে সে ত প্রায় শব্দ করে হেসে উঠেছিল, কারণ যতরকম যা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটতে পারত তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে সহজে মিটিয়ে ফেলা যাবে বলে মনে হয়েছিল তার। প্রথম প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে যাওয়ার পর অবশ্য তার শিরায় শিরায় ক্রোধের আগুন বয়ে গিয়েছিল। মৌরিজিয়াকে অনুসরণ করে সে সেই মামুলি চায়ের দোকানটিতে গিয়ে হাজির হয় আর তারপর তার স্ত্রীকে চমকে দিয়ে তার প্রেমিকের সামনে এক কাপ চকোলেট নিয়ে বসে পড়ে। এজিও কোন ব্যাখ্যা চায়নি। স্রেফ তার প্রতিদ্বন্দীর কলার ধরে তাকে মাটি থেকে তুলে নিয়েছিল আর তারপর চীনামাটির বাসন-পত্র ভাঙ্গার আওয়াজ আর খরিদ্দারদের আর্তনাদের মধ্যে তাকে দেয়ালে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। তারপর সে তার স্ত্রীর বাহু ধরে তাকে নিজের গাড়িতে তুলে নেয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে ঐ গাড়িটিই ছিল দেশে সর্বশেষ আমদানি হওয়া মার্সিডিজ। মৌরিজিয়াকে বাড়িতে ঢোকানোর পর সদর দরজায় তালা ঝুলিয়ে সে তার সামনে দুজন রাজমিস্ত্রীকে পাহারায় দাঁড় করিয়ে দেয়। মৌরিজিয়া একটানা দু'দিন বিছানায় শুয়ে কেঁদে গিয়েছিল, একটা কথাও বলেনি, মুখেও তোলেনি কিছু।

তার নীরবতার সময়, এজিও লঙ্গো সমস্ত ব্যাপারগুলো নিয়ে চিন্তা করার, ফিরে দেখার সময় পেয়েছিল এবং তার ক্রোধ একটা নীরব হতাশায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তার মনে পড়েছিল সেইসব দিনগুলোর কথা - তার শৈশবের অবহেলা, তার যৌবনের দারিদ্র্য, তার অস্তিত্বের একাকীত্ব। তার বিশ্বাস ছিল যে, মৌরিজিয়া রুগিয়েরির সাথে দেখা হওয়ার আগে পর্যন্ত যেই অপরিসীম স্নেহের জন্য সে কাঙ্গাল হয়ে রয়েছিল, মৌরিজিয়ার প্রতি প্রেমে তার নিবৃত্তি ঘটেছে। তৃতীয় দিনে সে আর সহ্য করতে না পেরে স্ত্রীর ঘরে গিয়ে হাজির হল।

"আমাদের ছেলের জন্য, মৌরিজিয়া, তোমাকে অবশ্যই এই উদ্ভট কল্পনাগুলো মাথা থেকে বার করে দিতে হবে। আমি জানি আমি খুব রোমান্টিক নই, কিন্তু তুমি যদি আমার সাথে থাকো তবে আমি নিজেকে পাল্টে নিতে পারি। নিজের স্ত্রীকে ত আমি অন্যলোকের সাথে প্রেম করতে দিতে পারিনা, আর আমি তোমাকে এত ভালবাসি যে তোমাকে ছেড়ে দিতেও পারবনা। কিন্তু তুমি যদি আমাকে সুযোগ দাও, আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমায় সবসময় সুখে রাখব।

মৌরিজিয়ার একমাত্র উত্তর ছিল দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া এবং আরও দু’দিন ধরে তার উপোষ চালিয়ে যাওয়া, যার শেষে তার স্বামী তার কাছে ফিরে আসে।

“চুলোয় যাক সব কিছু, আমি শুধু এইটুকু জানতে চাই যে এই পৃথিবীতে তোমার কী নেই; আমাকে বলো তুমি, আমি তাই এনে দেওয়ার চেষ্টা করব, ” হেরে যাওয়া মানুষের গলায় বলে এজিও।

“আমার লিওনার্দোকে চাই। তাকে ছাড়া আমি মরে যাব।”

“ঠিক আছে। ঐ ভাঁড়টার সাথে চলে যেতে পারো তুমি, কিন্তু আর কখনও আমাদের ছেলেকে দেখতে পাবে না।”

মৌরিজিয়া তার স্যুটকেসগুলি গুছিয়ে নিল, তারপর একটি মসলিনের পোশাক আর বড় ওড়নাওয়ালা টুপি পরে একটি ভাড়া গাড়ি ডেকে নিল। যাওয়ার আগে, ছেলেকে চুমু খেল, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে তার কানে ফিসফিস করে বলল যে খুব তাড়াতাড়িই তার জন্য ফিরে আসবে সে। এজিও লঙ্গো, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে যে বারো পাউন্ড ওজন এবং অর্ধেক চুল হারিয়েছিল, শিশুটিকে তার বাহুতে ধরে তার মায়ের কাছ থেকে প্রায় ছিঁড়ে সরিয়ে এনেছিল।

মৌরিজিয়া রুগিয়েরি তার প্রেমিকের বোর্ডিংহাউসে এসে দেখল যে দু'দিন আগে সেই লোক একটি তেল তোলার জায়গায় ডাক্তারের চাকরি নিয়ে চলে গেছে। প্রবল গরমের দেশ সেটা, নাম শুনলেই ইণ্ডিয়ানদের আর সাপের ছবি মনে ভেসে ওঠে। মৌরিজিয়া বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে লিওনার্ডো তাকে কোনরকম বিদায় না জানিয়ে চলে গেছে, তবে আগের দিন ঐ চায়ের দোকানে যে পরিমাণ মারধোর তার কপালে জুটেছিল সেটাকেই এর কারণ বলে স্থির করল সে। তার মনে হল, লিওনার্ডো আসলে একজন কবি মানুষ, ফলে সে তার স্বামীর ঐ নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে পারেনি, আর সেই জন্যই সে এইরকম অদ্ভুত আচরণ করেছে। সে একটি হোটেলে গিয়ে উঠল এবং দিনের পর দিন যেই যেই জায়গায় লিওনার্ডো গোমেজ থাকতে পারে বলে মনে হল তার, সেই সমস্ত জায়গায় টেলিগ্রাম পাঠাতে লাগল। অবশেষে, তাকে খুঁজে বার করল সে এবং তাকে টেলিগ্রাফ করে জানিয়ে দিল যে লিওনার্ডোর জন্য সে তার একমাত্র পুত্রকে ছেড়ে এসেছে, তার স্বামী, সমাজ, এমনকি তার ঈশ্বরকেও অমান্য করেছে এবং আমৃত্যু তার সাথে থাকার যে সিদ্ধান্ত সে নিয়ে নিয়েছে, তার আর নড়চড় হবেনা।

ট্রেনে চড়ে, বাসে চেপে এবং কোথাও কোথাও নৌকায় নদী পার হয়ে এগিয়ে চলা তার সেই যাত্রাটি ছিল যে কোন মানুষকে একেবারে বিধ্বস্ত করে ফেলা এক মহা অভিযান। এর আগে মৌরিজিয়া তার বাড়ির আশেপাশের প্রায় ত্রিশটি ব্লকের ব্যাসার্ধের যে বৃত্তটি ভাবা যেতে পারে, তার বাইরে কখনো একলা কোথাও যায়নি। কিন্তু না ভূ-প্রকৃতির বিশালতা, না ঐ অকল্পনীয় দূরত্ব, কোন কিছুই মৌরিজিয়ার মনে কোন ভয়ের ছাপ ফেলতে পারেনি। যাত্রাপথে সে দুটি স্যুটকেস হারিয়েছিল এবং তার মসলিনের পোশাকটি ধুলোয় ধুলোয় নরম আর হলদেটে হয়ে গিয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সে সেই নদীর ঘাটে পৌঁছেছিল যেখানে তার সাথে লিওনার্দোর দেখা হওয়ার কথা ছিল। গাড়ি থেকে নেমে এসে দেখে ঘাটে একটি খেয়া নৌকা বাঁধা রয়েছে। ছেঁড়া-ফাটা ওড়না আর আলুথালু কোঁকড়া চুলের রাশি উড়িয়ে মৌরিজিয়া সেই দিকে ছুটে গিয়ে আবিষ্কার করে, মারিও আসেনি, বদলে শোলার টুপি পরা একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এবং দু'জন বিষণ্ণ ইন্ডিয়ান বৈঠাচালক তার জন্য অপেক্ষা করছে। ফিরে যাওয়ার পক্ষে অনেক দেরি হয়ে গেছে তখন। নিজের মনকে সে এই বলে আশ্বস্ত করলে যে জরুরি কাজে ডাক্তার গোমেজের আটকে যাওয়ার কথাটা নিশ্চয় মিথ্যা নয়। ভাঙ্গাচোরা বাক্স-প্যাঁটরার যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাই নিয়ে সে নৌকায় চড়ে বসল আর মনে মনে প্রার্থনা করতে রইল যে সঙ্গের এই লোকেরা যেন ডাকাত বা নরখাদক না হয়। সৌভাগ্যবশত, তারা তা ছিল না, এবং তারা তাকে নিরাপদে বিশাল বিস্তৃত, হিংস্র বনভূমির মধ্য দিয়ে সেই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল যেখানে তার প্রেমিক তার জন্য অপেক্ষা করছিল। দুটি ছোট বসতি ছিল সেখানে, একটায় বড় বড় ডরমিটরিতে শ্রমিকরা থাকত, আর অন্যটি বরাদ্দ ছিল কোম্পানির বিভিন্ন অফিসগুলির কর্মচারীদের জন্য। আগেই বানিয়ে রাখা পঁচিশটি বাড়ি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমানে করে নিয়ে এসে সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ছিল একটি অদ্ভুত গল্ফ কোর্স এবং একটি বদ্ধ জলার সবুজ সুইমিং পুল যা প্রতিদিন সকালে বিশাল বিশাল ব্যাঙ-এ ভরে যেত। গোটা এলাকাটি একটি ধাতব বেড়া দিয়ে ঘেরা যার একমাত্র দরজাটি সব সময় দু’জন সান্ত্রী পাহারা দিত। অল্প কিছুদিনের জন্য থাকতে আসা পুরুষ কর্মী-কর্মচারীদের শিবির হিসেবে এই জায়গাটি ব্যবহার করা হত। পৃথিবীর জঠর থেকে কোন ড্রাগনের বিরামহীন বমির মত একটানা অন্ধকার উগরে আসত আর সেই অন্ধকার স্রোতের চারপাশে জীবন চাকার মত ঘুরে যেত। শ্রমিকদের কারো কারো জীবনে তাদেরই মত যন্ত্রণাক্লিষ্ট কিছু সঙ্গিনীর উপস্থিতি ছাড়া এই নিঃসঙ্গতার মধ্যে কোথাও কোন ভদ্রমহিলার অস্তিত্ব ছিল না; সর্দার-মনিব আর পরদেশিরা সবাই তিনমাস অন্তর শহরে যেত পরিবার-পরিজনের সাথে কটা দিন কাটিয়ে আসার জন্য। যতদিন না তার ওড়না, তার ছোট বাহারি ছাতাটি এবং তার নাচের স্লিপারগুলি নিয়ে ডাক্তার গোমেজের বৌ, ওই নামেই তাকে ডাকত তারা, তাদের প্রতিদিনের অভ্যাসের সাথে মিশে গেল, ততদিন হঠাৎ করে কোন এক গল্প বইয়ের পাতা থেকে এসে পড়া এই চরিত্রটি তাদের জীবনকে খানিকটা এলোমেলো করে রেখেছিল।

পুরুষদের রুক্ষতা বা প্রকৃতির অবিরাম তাপ-প্রবাহ – কোন কিছুর পক্ষেই মৌরিজিয়া রুগিয়েরিকে হার মানানো সম্ভব হয়নি। যা তার ভাগ্যে জুটেছে তাই নিয়েই সে মহা সমারোহে বাঁচতে চেয়েছিল আর সেটা প্রায় করেও ছেড়েছিল। সে লিওনার্দো গোমেজকে তার ব্যক্তিগত অপেরার নায়কে রূপান্তরিত করেছিল। যেই পরিমাণ গুণাবলী তার চরিত্রে সে আরোপ করেছিল সেটা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব, এবং তার প্রেমের মহত্ত্বকে প্রায় বাতিকের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, কখনও দুদণ্ড থেমে দেখেনি যে এই প্রেমে তার প্রেমিকের দিক থেকে কতটা সাড়া আছে বা তাদের এই মহান আবেগের অভিযানে তার প্রেমিক তার সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে কিনা। তার হিসাব মতো, লিওনার্দো গোমেজ যদি পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ দেখিয়ে থাকে, তবে তার জন্য দায়ী তার নরম স্বভাব আর দুর্বল স্বাস্থ্য যা এখানকার অভিশপ্ত জলবায়ুর পাল্লায় পড়ে আরো খারাপ হয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে কি, লিওনার্দোকে তার এতটাই ভঙ্গুর মনে হয়েছিল যে নিজের সমস্ত মনগড়া অসুখ থেকে মৌরিজিয়া নিজেই নিজেকে একেবারে বরাবরের মত সারিয়ে তুলে প্রেমিকের সেবায় লেগে গিয়েছিল। লিওনার্দোর সাথে সাথে সেও তার ঐ মান্ধাতার আমলের হাসপাতালে গিয়ে হাজির হয়েছিল আর তাকে সাহায্য করার জন্য নার্সের কাজ-কর্ম শিখে নিয়েছিল। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তদের সেবা-যত্ন করা এবং তেল তোলার কূয়োয় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়া মানুষদের চিকিৎসা করা তার কাছে সিলিং ফ্যানের নীচে শুয়ে শততমবারের মতো একই পুরানো ম্যাগাজিন আর রোমান্টিক উপন্যাস পড়ার চেয়ে ঢের ভাল বলে মনে হয়েছিল।

চারপাশের সিরিঞ্জ এবং ব্যান্ডেজের মাঝে নিজেকে তার ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মত লাগত, সেই সাহসী নায়িকাদের একজন যাকে সে মাঝে মাঝে শিবিরের ক্লাবহাউসে দেখানো চলচ্চিত্রগুলোয় দেখতে পেত। মৌরিজিয়ার বাস্তব জগৎটি ছিল তার নিজের তৈরি। সেই বাস্তবতার কোন রকম কমতি মেনে নেওয়ার চাইতে সে মরে যেতেও রাজি ছিল। প্রতিটি মুহূর্তকে যাতে শব্দ দিয়ে সাজিয়ে রাখা যায় তার জন্য তার চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা। অবশ্য এই অবস্থায় এছাড়া আর করার-ই বা কি ছিল তার! লিওনার্দো গোমেজকে সে এখনও মারিও বলেই ডাকত। তার সম্পর্কে সে এমনভাবে কথা বলত যে মনে হত যেন, কোন সাধু-সন্ত মানুষের কথা বলছে; এমন একজন মানুষের কথা বলছে যে কিনা লোকজনের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে। সেই সাথে আর একটা দায়িত্ব সে স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল – দুনিয়াকে দেখিয়ে দেওয়া যে তারা দুজন হচ্ছে এক অসামান্য প্রেমকাহিনীর নায়ক-নায়িকা। এতে একটা লাভ হয়েছিল, মহল্লার একমাত্র সাদা মহিলাটির উপস্থিতিতে কোম্পানির যেই সব কর্মচারিদের হৃদয়ে দোলা লেগে যেতে পারত, তাদের আটকানো গিয়েছিল।

মশা, বিষাক্ত পোকামাকড়, ইগুয়ানা, দিনের নারকীয় উত্তাপ, দমবন্ধকরা রাত এবং সে যে একা একা দরজার বাইরে পা রাখতে পারছেনা এই সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে, মৌরিজিয়া শিবিরের সমস্ত গ্রাম্যতাকে ‘প্রকৃতির সাথে যোগাযোগ’ নাম দিয়ে মেনে নিয়েছিল। তার একাকীত্ব, একঘেয়েমি, শহরের প্রতি স্বাভাবিক ভালবাসা, একেবারে হালফ্যাশনের পোশাকে নিজেকে সাজানোর আকাঙ্ক্ষা, বন্ধুদের সাথে দেখা করার ইচ্ছে বা থিয়েটার দেখতে চাওয়া এ সমস্ত কিছুকে সে নিতান্তই একটা আবছা ‘নস্টালজিয়া’ বলে ধরে নিয়েছিল। শুধু একটিমাত্র বিষয়কে সে কোনরকম নামে ডেকেই নিজেকে ভোলাতে পারতনা – সেই জান্তব ব্যথা যা প্রতিটি বার তার ছেলেটির কথা ভাবার সময় তার অন্তরে ধারালো নখ বিঁধিয়ে দিত। তাই সে ঠিক করে নিয়েছিল যে ছেলের কথা সে আর মুখেই আনবেনা।

লিওনার্দো গোমেজ দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিবিরে ডাক্তারি চালিয়ে গেল, যতদিনে না গরমের দেশের জ্বর আর জলবায়ু তার স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি শেষ করে দিল। ‘জাতীয় পেট্রোলিয়াম কোম্পানি’-র বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে চলা জীবনের ঘেরাটোপে সে এত লম্বা সময় কাটিয়ে দিয়েছিল যে আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আবার নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য মনের ভিতরের সেই তাগিদটাই তার হারিয়ে গিয়েছিল। উপরন্তু, সেই যে এজিও লঙ্গো তাকে দেয়ালের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল তার সেই ভয়ঙ্কর ক্রোধকেও সে কখনও ভুলে যায়নি; ফলে আবার কোনদিন রাজধানীতে ফিরে আসতে পারবে এমন চিন্তাও সে মনে ঠাঁই দেয়নি। প্রতিদিনের চলার পথের বাইরে দুনিয়ার একটি নিভৃত কোণে সে এমন একটি চাকরি খুঁজে নিতে চেয়েছিল যেখানে সে আর পাঁচজনের চোখের আড়ালে একান্তে, নিজের অস্তিত্বটিকে নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবে। আর এই করতে করতে একদিন সে তার স্ত্রী, তার চিকিৎসার সরঞ্জাম আর তার অপেরা রেকর্ডিংয়ের সম্ভার নিয়ে এসে ঠেকল আগুয়া সান্তায়। সময়টা ছিল পঞ্চাশের দশক, এবং মৌরিজিয়া রুগিয়েরি নিউ ইয়র্কের একটি ক্যাটালগ থেকে অর্ডার করে আনানো, একেবারে হালের স্টাইলে, একটি টাইট পোলকা-ডটেড পোশাক এবং বিশাল কালো স্ট্র হ্যাট পরে বাস থেকে নেমে এসেছিল; সান্তা আগুয়ারায় এমন দৃশ্য এর আগে কেউ দেখেনি। সে যাই হোক, একটি সাধারণ ছোট শহরে সচরাচর যেমন হয়, সেইভাবে তারাও এখানে সেইরকমই সাদর অভ্যর্থনা পেয়েছিল এবং চব্বিশ ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে সবাই নতুন বাসিন্দাদের ব্যতিক্রমী প্রেমের কিংবদন্তির কথা জেনে গিয়েছিল। তোস্কা বা মারিও কারা সে সম্পর্কে বিন্দু-বিসর্গ না জেনেও তারা এদের তোস্কা এবং মারিও নামে ডাকত, তবে মৌরিজিয়া শীঘ্রই তাদের সব কিছু বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিল। লিওনার্দোর পাশে পাশে থেকে নার্সিং করার কাজটা সে এইবার বাদ দিয়ে দিল। বদলে, লোকজন জুটিয়ে একটা প্যারিশ কয়ারের দল বানিয়ে সেই গ্রামের প্রথম গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফেলল। আগুয়া সান্তার নাগরিকরা অবাক বিস্ময়ে দেখল, স্কুলবাড়িতে উঁচু করে বাঁধা একটি অস্থায়ী মঞ্চে মৌরিজিয়া ম্যাডাম প্রজাপতির বেশে একটি অচেনা অদ্ভুত বাথরোবে সেজে ছোট্ট পাখির গলায় কাঁপা কাঁপা স্বরে গান গাইছে; চুলে তার সেলাইয়ের কাঁটা গোঁজা, দুই কান থেকে প্লাস্টিকের ফুল ঝুলছে, মুখ দেখে মনে হচ্ছে চুন মাখিয়ে সাদা করা হয়েছে। গানটির একটি শব্দও কেউ বুঝতে পারেনি, কিন্তু যখন সে হাঁটু গেড়ে বসে একটি রান্নার ছুরি বের করে, নিজের পেটে ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিল, শ্রোতারা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল এবং একজন দর্শক তাকে থামানোর জন্য মঞ্চে ছুটে গেল, তার হাত থেকে অস্ত্রটি ছিনিয়ে নিয়ে তাকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিল। অভিনয়ের পরপরই জাপানি মহিলার মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল এবং সবাই একমত হয়েছিল যে ঐ মহিলাটিকে ছেড়ে চলে যাওয়া উত্তর আমেরিকান নাবিকটি ছিল একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর লোক যার অন্তর বলে কিছু ছিলনা। এবং এমন লোকের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার কোন অর্থ হয়না কারণ জীবন কখনও থেমে থাকেনা আর দুনিয়ায় আরও অঢেল পুরুষ মানুষ রয়েছে। এরপর কায়দা-কসরৎ করে সদ্য গড়ে তোলা এক ব্যান্ড যখন কুম্বিয়া বাজালো, দর্শক-শ্রোতারা সবাই তার সাথে নাচতে শুরু করে দিল। সব মিলিয়ে সন্ধ্যেটা সেদিন চমৎকার আনন্দের সাথে শেষ হল। সেই অবিস্মরণীয় সন্ধ্যার দেখানো পথ ধরে আরো অনেক রাত এসেছিল এর পর - গান, মৃত্যু, সোপ্রানোর সুরে সুরে অপেরার কাহিনীর উন্মোচন, জনসাধারণের আলোচনা এবং সমাপনী পার্টি।

ডাক্তার মারিও এবং সেনোরা তোস্কা ছিল সমাজের দুই বিশিষ্ট সদস্য; ডাক্তার প্রত্যেকের স্বাস্থ্যের দায়িত্বে ছিল আর তোস্কার কাজ ছিল তাদের সাংস্কৃতিক জীবন ঠিক রাখা এবং কবে কোন ফ্যাশন পাল্টে কি হল সেই খবর নিয়ে আসা। এই দম্পতি যে শীতল, মনোরম বাড়িটিতে থাকত, তার অর্ধেকটা জুড়ে ছিল ডাক্তারের রোগী দেখার ঘর। তাদের আঙ্গিনায় তারা একটি নীল আর হলুদ রং-এর ম্যাকাও পুষত; তারা যখন প্লাজায় হাঁটতে যেত সেও তাদের মাথার উপর উড়ে উড়ে এগিয়ে যেত। ডাক্তার বা তার স্ত্রী কখন কোথায় ঘুরছে সেটা খুব সহজেই বলে দেওয়া যেত কারণ পাখিটি সব সময় তাদের সাথে সাথে থাকত, উজ্জ্বল রঙের বড় বড় ডানাদুটি তাদের মাথা থেকে প্রায় দুই মিটার উপর দিয়ে নিঃশব্দে ভেসে ভেসে এগিয়ে চলেছে। এইভাবে এই যুগল বহু বছর আগুয়া সান্তায় কাটিয়ে দিল। স্থানীয় লোকজনের কাছে তাদের সম্মান ছিল অনেক উঁচুতে কারণ এদের কাছে তারাই ছিল নিখুঁত প্রেমের উদাহরণ।

মাঝেই মাঝেই যেসব রোগের হানাদারি ঘটত তার কোন একটির আক্রমণের সময় জ্বরের নানা গলিঘুঁজির গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলে ডাক্তারের একদিন আর জীবনের আঙ্গিনায় ফিরে আসা হলনা। তার মৃত্যুতে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। তারা ভয় পেয়েছিল যে তার স্ত্রী নিজের ক্ষতি করে বসতে পারে, যেমনটি সে করেছিল মঞ্চে অভিনয়ের সময়, এবং তারা পরের সপ্তাহগুলিতে দিন-রাত কেউ-না-কেউ যাতে তার সাথে থাকে সেই ব্যবস্থা করেছিল। মৌরিজিয়া রুগিয়েরি মাথা থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত শোকের পোশাক পরে নেয়। তার সমস্ত আসবাবপত্র কালো রং করে ফেলে এবং তার দুঃখকে কখনও সরে না যাওয়া একটি ছায়ার মতো নিজের চারপাশে বহন করে চলে যার ফলে তার মুখের দুই কোণে দুটি গভীর খাঁড়ি তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু সে তার জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেনি। হয়ত বা, তার ঘরের একান্ত নিভৃতে যখন সে তার বিছানায় একা শুয়ে থাকত, সে আসলে এক গভীর স্বস্তি অনুভব করত; এখন তাকে আর তার স্বপ্নের ভারী বোঝাটি বহন করতে হবে না; দুনিয়ার সামনে নিজেকে তুলে ধরার জন্য যে চরিত্রটি সে উদ্ভাবন করেছিল তাকে আর তার বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল না, বা যে লোকটি কখনও তার কল্পলোকের উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি এমন প্রেমিকের দুর্বলতা ঢাকতে ক্রমাগত তাকে আর তথ্যের এদিক-ওদিক করতে হবেনা। তবে নাটকের অভ্যাসটি খুব গভীরে তার শিকড় নামিয়ে দিয়েছিল। যে অসীম ধৈর্যের সাথে সে নিজের রোমান্টিক নায়িকার চরিত্রটি সৃষ্টি করেছিল, আজ এই বৈধব্যের দিনে তার হতাশাকেও সে একইভাবে এক কিংবদন্তির জায়গায় নিয়ে গেল। শোকের দিনগুলো অনেক বছর আগে কেটে গেলেও আগুয়া সান্তায় সে বাকি দিনগুলো কালো পোশাক পরেই কাটিয়ে দিল। তার বন্ধুদের বিশ্বাস ছিল যে আবার অপেরা নিয়ে মেতে উঠলে সে অনেকটা সান্ত্বনা খুঁজে পাবে, কিন্তু তাদের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও সে আর কখনও গান গাইতে স্বীকার যায়নি। যেন এক পরম মমতার আলিঙ্গনে শহরটি তাকে বৃত্তের মতো ঘিরে রেখেছিল, যাতে তার নিজের বেঁচে থাকাটা সহনীয় হয় আর তার স্বপ্নগুলোও বেঁচে থাকে। শহরটির প্রশ্রয়ে ডাক্তার গোমেজের স্মৃতি জনপ্রিয় কল্পনায় ক্রমাগত বেড়ে চলল। দুই বছর পরে, লোকেরা চাঁদা তুলে প্লাজার একটি স্তম্ভের উপর মুক্তিদাতার পাথরের মূর্তির মুখোমুখি ডাক্তারের একটি ব্রোঞ্জের আবক্ষমূর্তি স্থাপনের বরাত দিয়ে দিল।

সেই বছরই প্রধান মহাসড়কটি আগুয়া সান্তায় ঢুকে আসে আর তার ফলে চিরতরে শহরের চেহারা এবং চেতনা পাল্টে যায়। প্রথমে, লোকেরা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিল; তাদের বিশ্বাস ছিল যে এই প্রকল্পে গাছ কাটা এবং পাথর ভাঙ্গার কাজ করার জন্য সান্তা মারিয়া কারাগার থেকে বন্দীদের শিকলে বেঁধে নিয়ে আসা হবে; আসলে তাদের দাদা-ঠাকুর্দারা তাদের বলেছিল যে এল বেনিফ্যাক্টরের একনায়কত্বের দিনে এভাবেই রাস্তাটি বানানো হয়েছিল। তবে, খুব তাড়াতাড়িই শহর থেকে আসা প্রকৌশলীদের কাছ থেকে জানা গেল যে বন্দীরা নয়, আধুনিক মেশিনগুলি কাজটি করবে। প্রকৌশলীদের পরে পরে এল জরিপকারীরা, তারপরে এল শ্রমিকের দল যাদের কমলা হেলমেট আর জ্যাকেটগুলো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করত। মেশিনগুলি এলে পর দেখা গেল সেগুলো একেকটা যেন বিশালাকার ইস্পাতের প্রাণী; এলাকার স্কুল শিক্ষক হিসাব নিকাশ করে জানালো যে সেগুলোর আকার মোটামুটি ডাইনোসরের সমান। মেশিনগুলোর পাশের দিকে তাদের মালিকের নাম লেখা রয়েছে - ‘এজিও লঙ্গো এন্ড সন’। সেই শুক্রবারই কাজের অগ্রগতি দেখা এবং শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য বাবা আর ছেলে আগুয়া সান্তায় এল।

মৌরিজিয়া রুগিয়েরি যখন তার প্রাক্তন স্বামীর নাম লেখা দিকনির্দেশ আর মেশিনগুলো দেখতে পেল, তখন সে তার বাড়িতে দরজা-জানালা বন্ধ করে লুকিয়ে পড়েছিল, এই অবাস্তব আশায় যে কোন-না-কোন ভাবে, সে তার অতীত থেকে পালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু এই আঠাশ বছর ধরে তার ছেলের কথা মনে আনাটা তার কাছে তার হৃদয়ের গভীর গোপনে লুকিয়ে রাখা বেদনা হয়ে আছে। এখন যখন সে শুনল যে নির্মাণ সংস্থার মালিকরা আগুয়া সান্তার সরাইখানায় দুপুরের খাওয়া সারছে, তখন সে আর তার প্রবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার না করে থাকতে পারলনা। সে আয়নায় নিজেকে ভালো করে দেখল। এখন তার বয়স একান্ন বছর, গরমের দেশের রোদ আর কাল্পনিক সুখের ভান করার প্রচেষ্টা তার শরীরে বয়সের ছাপ ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু সেসব সত্ত্বেও তার চেহারায় গৌরবের আভিজাত্য এখনো চোখে পড়ে। চুলের ধূসর রঙটি গোপন করার কোন চেষ্টা না করে প্রথমে ব্রাশ করে তারপর চিরুণি চালিয়ে উঁচু চূড়োর আকারে সেগুলোকে বাঁধলো সে; তারপর তার সবচেয়ে ভালো কালো পোশাকটি পড়ল, সেইসাথে পড়ে নিল তার বিয়ের মুক্তাগুলো, তার অনেক অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যেও যেগুলোকে সে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল, ভীরু কৌতুকের ভঙ্গিতে চোখের পাতায় কালো রঙের একটি দাগ টানল এবং গাল আর ঠোঁটে লাল রং-এর ছোঁয়া লাগালো। লিওনার্দো গোমেজের ছাতায় মাথা বাঁচিয়ে সে বাড়ি থেকে বের হল। তার পিঠ দিয়ে দরদর করে ঘামের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল কিন্তু সে কাঁপছিল না।

সেই সময় দুপুরের তাপের থেকে বাঁচতে সরাইখানার শাটারগুলি নামানো ছিল, তাই অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে পারার আগে মৌরিজিয়াকে দু-এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। তারপরে তার নজরে এল দোকানের পিছনের দিকের একটি টেবিলে এজিও লঙ্গো আর তার সামনের যুবকটিকে, এ নিশ্চয় তার নিজের ছেলেটিই হবে। তার স্বামীর চেহারা তার নিজের তুলনায় অনেক কম পাল্টেছিল, যার একটা কারণ হতে পারে যে এজিওর চেহারায় কখনোই বয়সের ছাপ পড়তনা। বরাবর সেই একই রকম সিংহের মতন কাঁধ আর ঘাড়, গাট্টাগোট্টা কাঠামো, আপাতদৃষ্টিতে অমার্জিত হাব-ভাব, আর দুটি গভীর-দৃষ্টির চোখ – বহুকালের খোলা-মেলা হাসির ফলে তৈরি হওয়া, হাত-পাখার মত দেখতে এক সারি করে রেখা এখন সেই দৃষ্টিকে নরম করে এনেছে। প্লেটের ওপর ঝুঁকে উৎসাহের সঙ্গে খাবার চিবোচ্ছিল সে আর ছেলের কথা শুনছিল। মৌরিজিয়া দূর থেকে তাদের যথাসম্ভব ভালো করে দেখল। তার ছেলের বয়স অবশ্যই প্রায় ত্রিশ মত হবে। যদিও সে মায়ের লম্বা হাড়ের গড়ন এবং মসৃণ ত্বকটি পেয়েছে, তার অঙ্গভঙ্গিগুলি ছিল একেবারে বাপের মতন; একই রকম ভাবে আনন্দ করে খাবার খাচ্ছিল, নিজের কথায় জোর দিতে টেবিলে চাপড় দিচ্ছিল, আর মন খুলে হাসছিল। এক প্রাণবন্ত এবং উদ্যমী মানুষ যার নিজের দাম জানা আছে এবং সেটা নিয়ে সে কোনরকম আপোষ করতে রাজি নয়, সবরকম লড়াইয়ের জন্য সে তৈরি আছে। মৌরিজিয়া নতুন চোখে এজিও লঙ্গোর দিকে তাকালো এবং এই প্রথমবারের মতো তার দৃঢ় পৌরুষের প্রতি মুগ্ধতা অনুভব করলো। এগিয়ে গেলো সে, একটা ঘোরের মধ্যে যেন, নিঃশ্বাস পড়ছেনা, এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেকে দেখছে সে, রঙ্গমঞ্চে নিজের দীর্ঘ নাট্যজীবনের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটির অভিনয়ে নেমেছে এখন, ঠোঁটে তার স্বামী আর তার ছেলের নাম নিয়ে, হৃদয়ে উষ্ণ আশা - তার এত বছরের অবহেলাকে হয়ত মার্জনা করে দেওয়া হবে। কিন্তু মুহূর্তের ঐ ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যেও সে সেই ফাঁদের সূক্ষ্ম কল-কব্জাগুলোকে দেখতে পাচ্ছিল যার মধ্যে সে ত্রিশ বছর ধরে নিজেকে আটকে রেখেছে। সে বুঝতে পারছিল যে নাটকের আসল নায়ক ছিল এজিও লঙ্গো, আর সে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল যে এই মানুষটা এই লম্বা সময় ধরে তাকেই চেয়ে এসেছে, দিতে চেয়েছে তাকে সেই অবিচল, উথাল-পাতাল আবেগের প্রেম যা লিওনার্ডো গোমেজ তাকে কোনদিন দিতে পারেনি কারণ সে প্রেম লিওনার্ডোর চরিত্রের মধ্যে ছিলইনা আদৌ।

ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন ছায়ার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে তাদের চোখে ধরা দিতে সে আর মাত্রই ইঞ্চি দুয়েক দূরে, তরুণ মানুষটি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে তার বাবার কব্জি ধরে সহানুভূতির সুরে কিছু একটা বলে চোখ টিপল। দুজনেই হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ল, পরস্পরের কাঁধ চাপড়ে দিল, তারপর যে পুরুষসুলভ কোমলতা আর ভরসা দেওয়া সহমর্মিতায় তারা একে অপরের মাথার চুল ধরে ঘেঁটে দিল সেইখানে মৌরিজিয়া রুগিয়েরি বা দুনিয়ার আর কারও কোনো জায়গা ছিলনা। বাস্তব এবং স্বপ্নের মাঝের সীমারেখাটিতে এক অসীম মুহূর্তের জন্য মৌরিজিয়া দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তারপর পিছিয়ে গিয়ে, সরাইখানা ছেড়ে বের হয়ে, কালো ছাতাটি খুলে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরে চলল, মাথার উপর প্রাচীন যুগের বই থেকে উঠে আসা এক অদ্ভুত অতিকায় ফেরেশতার মত ম্যাকাও পাখিটি উড়তে উড়তে তার সঙ্গ নিল।
---------------

মূলগল্প: Tosca


লেখক পরিচিতি:
ইসাবেলা আয়েন্দের জন্ম চিলিতে ১৯৪২ সালে, বর্তমানে আমেরিকার নাগরিক। বলা হয় স্প্যানিশ ভাষায় লেখা সাহিত্যিকদের মধ্যে তাঁর লেখার পাঠকই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। ২৫টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হওয়া এই লেখকের লেখা জাদুবাস্তবতার প্রয়োগের জন্য বিখ্যাত। তাঁর এই লেখাটিতে গল্প অবশ্য সহজ সরল ভাবে অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছে। ইসাবেলা ২০১০-এ চিলির জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার পান আর ২০১৪-তে বারাক ওবামা তাঁকে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রীডম দিয়ে সম্মানিত করেন। বর্ণময় জীবনের অধিকারী ইসাবেলার লেখার ভাণ্ডার তার অজস্র সম্মান আর পুরস্কারের মতই বৈচিত্র্যে ও সংখ্যায় বিশাল।

অনুবাদক পরিচিতি:
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী। অবসরপ্রাপ্ত আণবিক জীববিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ। অনিয়মিত লেখালেখি, ডিজিটাল মাধ্যমে – কবিতা, গল্প, অনুবাদ ইত্যাদি। ভালো লাগে ফটো তুলতে, রান্না করতে আর ওয়েবসাইট বানাতে। ঠিকানা – ব্রেন্টউড, টেনেসি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ