১২ জুনো , 20210
3243 সোভেতস্কিয়া স্ট্রিট
এই চিলেকোঠায় এক হাজার চুয়াল্লিশ দিন।
বয়স কত হবে এর ? আশি অথবা একশ? কত কিছুর সাক্ষী কে জানে। কত কী মনে রেখেছে তাই বা কে জানে। দেয়ালে কোন দাগ নেই । তবে সিলিঙে আছে। মাঝারি একটা ফাটলও আছে। হা করা বিচ্ছিরি কোন ফাটল নয়। অনেকটা সুডৌল বাহুতে ধারাল ছুরির মিহি আঁচড়, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার মত কিছু নয়। কাঠের মেঝেতে দু'চারটে পেরেক উঁকি ঝুঁকি দিয়েছে। অসাবধান হলে মাঝে মাঝেই তাদের অস্তিত্ব জানান দেয় পায়ের নীচে । সে সময় সুতীক্ষ্ণ ব্যাথায় হাত বুলিয়ে ভাবি, এবার এদের একটা বিহিত করতে হয়। তারপর ভুলে যাই। যেমন ভুলে যাই আর যা ছিল সবকিছু হাজার দিন আগে। আসলে হাজার দিন আগে তেমন কিছু ছিলনা যদি সত্যি করে বলি। বন্দী ছিলাম আরশোলার সাথে এক ঘরে। সে ঘরে ছিল একটি দরজা, একটি জানলা। জানলা দিয়ে আকাশ নয়, শুধু ক্ষয়ে যাওয়া কংক্রিট দেখা যেত। দরজা খুললে শুধুই অন্ধকার সরু প্যাসেজ। সে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে কে জানে। খোঁজ নেয়নি কখনো । ব্যামো টা কি তখন থেকেই শুরু না কি, তারও আগে? যখন বন্দী ছিলাম আকাশ ঘরে, কিংবা কাঠের ঘরে বা হাজার বছর আগে তাল তমালের বনেতে ?
১৬ অগাস্তাস , 20210
3243 সোভেতস্কিয়া স্ট্রিট
আকাশ ঘরের কথা আমার আর তেমন মনে পড়েনা । মাঝে মাঝে মনে হয় আকাশ ঘর আসলে কখনও ছিলই না । সবই আমার মনগড়া স্মৃতি। কিন্তু আমি জানি আকাশ ঘর ছিল । জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই মেঘ ধরা যেত। মাঝে মাঝে মুঠোভর্তি মেঘ ধরতাম । তা জল হয়ে আমার হাত ভেজাত । মাঝে মাঝে মনও ভিজত । আকাশ ঘরে আমি বন্দি ছিলাম এক হাজার সত্তুর দিন । আকাশ ঘরটি খারাপ ছিলনা । শুধু বন্দিদশা মাঝে মাঝে অসহনীয় হয়ে উঠত । আকাশ ঘরে দুটো ঘর ছিল। একটি সব জিনিসপত্র ঠাসা । আরেকটি ঘুমানোর জায়গা । এক কোনায় রান্নার সাজ সরঞ্জাম । জিনিস পত্র সব আছে । শুধু রান্না করে খাও । আমার রান্না করে খেতে ইচ্ছে করেনি কখনও । খিদে সহ্যের চরমে পৌঁছালে কিছু একটা বানিয়ে নিতাম। এই আকাশ ঘরে দুটো পাখিও ছিল বন্দি একটি খাঁচায় । একটির নাম দিয়েছিলাম নীল, আরেকটি নদী । পাখি দুটো আমার প্রিয় ছিল। নীল একসময় মারা যায় । মন খারাপ হয়েছিল কিন্তু পাত্তা দেয়নি। চারপাশে তাকালে মনে হবে আকাশ ঘর মন্দ নয় । প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে । মাঝে মাঝে বেশ অতিরিক্ত জিনিষও আছে । তবুও আমার ভালো লাগে নি যে ! আমার বেশির ভাগ সময় কাটত বিছানায়। হয়ত তখন থেকে অসুস্থ ছিলাম। কে জানে! হঠাৎ হঠাৎ খবর আসত অমুক ডুবে গেছে কানাস্কোয়ান লেকে । কেউ তেমন গা করেনি । কিন্তু রোগটি ছিল ছোঁয়াচে।
২৭ নুভো , 20210
3243 সোভেতস্কিয়া স্ট্রিট
আরশোলার সাথে ঘরটিতে বন্দি ছিলাম তিনশ সত্তুর দিন। কোন এক দুপুর বেলায় আকাশ ঘর থেকে এই একটি ঘরের এপার্টমেন্টে এসে উঠি । আকাশ ঘর অসহনীয় হয়ে উঠছিল। মাঝে মাঝে দম বন্ধ লাগত। সব জানালা খুলে দিতাম । তারপরেও নিশ্বাস নিতে পারতামনা। শেষের দিকে ঘুমাতে পারতামনা । সারারাত এ ঘর আর ও ঘর পায়চারি করতাম । কিন্তু তবু ও যেন ক্লান্তি নেই । অবশেষে একদিন, যা ছিল কিছু অবলম্বন, তাই নিয়ে এ ঘরে উঠি । সারা ঘরে মন খারাপ লেপ্টে আছে। প্রকাণ্ড জানালাটিও ঘরটির মন খারাপ সারাতে পারেনি । জানালায় দুটি বড় ভারী পর্দা । পর্দার রং হালকা খয়েরি । পর্দা সরালে শুধু লাল কংক্রিট। কিছুই তেমন দেখার নেই । তাই খয়েরি রঙের ভারি পর্দা সবসময় নামানোই থাকে। সারা ঘরে সারাক্ষণ এক আলোছায়া। এই আলোছায়াতে প্রায় সময় ঘুমাই কিংবা শুয়ে শুয়ে ভাবি এত যন্ত্রণার উৎসটি কোথায় । ঠিক হৃদয়ের বাম দিকে নাকি সমস্ত মাথা জুড়ে । সারাদিন ঘুমাই অথবা শুয়ে থাকি, তারপরেও ভীষণ ক্লান্ত লাগে। শুয়ে শুয়ে টের পাই একটি আরশোলা উড়ে গেল আমার নাকের উপর দিয়ে। এই একটি মাত্র জ্যান্ত প্রাণীর দেখা পেলাম। নাহ, তা সত্যি নয়। ছোট ইঁদুর দৌড়ে গিয়েছিলে বিছানার সামনে দিয়ে। ওরা পাঠিয়েছিল ইভানভকে। ইভানভ ছোটখাটো ছটফটে লোক । সারাঘরে ছুটে ছুটে ইঁদুর ধরার ফাঁদ পাতছে। অসম্ভব মাথা ধরেছে। তারপরেও ইভানভের বৌয়ের গল্প শুনছি। মানুষের গল্প আছে, গল্প বলার লোক আছে। আমার কিছু নেই । আমি হয়ত ঠিক মানুষ নই। ইভানভ ইঁদুর ধরে আর রুশকা চুল কাটে। দুজনের স্বপ্ন বাড়ি কিনবে । ওঁদের একটি মেয়েও আছে। সে ইভানভের কথা শোনেনা । ইভানভের বউ রুশকাও তার খুব একটা ধারধারেনা। তাই ইভানভের ভীষণ আফসোস । মেয়েমানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি যে কম, ইভানভের এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। ইভানভ ফাঁকে ফাঁকে আমার গল্প জানতে চায়। আসলে জানতে চায় আমি কে। তাঁর বুঝতে খুব বেশি দেরি হয় না যে, আমি কেউ না। আমার কোন গল্প নেই। গল্প বলার লোক নেই। আমি হয়ত মানুষই নই।
১৯ ডুয়োস, 20210
3243 সোভেতস্কিয়া স্ট্রিট
আকাশ ঘরের আগে আরও তিনটি ঘরে ছিলাম আমি। আমার প্রথম ঘরটি ছিল ক্রুযেনেতস্কি বুলেভার্ডে। তিনতলা বাড়ির একটি ঘরে আমি ছিলাম সাতশ তেষট্টি দিন। এই প্রথম ঘর নয় যেখনে আমার লম্বা সময় কাটে। পরের দু' ঘরেও একই রকম লম্বা সময় কেটেছে। এ ঘরটি সামান্য বড় । মেঝেতে পুরানো কার্পেট । আগে যিনি থাকতেন, তিনি সিগারেট খেতেন ঘরেই। সারা ঘরে বোঁটকা গন্ধ। ম্যাট্রেস আছে একটা কিন্তু তাতে অসংখ্য দাগ । বোঝাই যাচ্ছে অনেক পুরানো । ছারপোকা থাকলেও অবাক হবার কথা নয়। এবার না হয় ছারপোকাই সঙ্গী হোক । সাতশ তেষট্টি দিনের বেশির ভাগ দিন আমার সময় কেটেছে শূন্য দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। আমার কোন বই ছিল না যে পড়ব । কাগজ কলম ছিলনা যে লিখব । কেউ ছিলনা যার সাথে কথা বলব । ওরা আমাকে এতোটাই ভয় পায় যে, সব কিছু থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
১ ওকটাস , 20210
3243 সোভেতস্কিয়া স্ট্রিট
আমার দ্বিতীয় ঘরটি একটি দোতলা বাড়িতে ছিল। এ ঘরটিতেও কার্পেট ছিল তবে এবার আগের চেয়ে পরিষ্কার ছিল। এ ঘরে বড় একটা জানালা ছিল। যে জানলা দিয়ে হেমন্তের পাতা ঝরা , নীরব তুষার পড়া যত খুশি দেখা যায় । পার্থক্য একটাই বাইরে স্লেটের মত একটা আকাশ সারাক্ষণ মন কারাপ করে লেপ্টে আছে। যদিও শূন্য দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকার কোন মানে নেই এখন। এই ঘরে আমার থাকা হয় তিনশ তিরিশ দিন। একটা ঘর আপন করে নেয়ার আগেই সেই ঘর ছাড়ার সময় হয়ে যায়। তাই আমি আপন করার চেষ্টা করিনা। তবে যতগুলো ঘরে এখন পর্যন্ত থেকেছি , আমার এই চিলেকোঠা সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে । এর খুব বেশি কিছু নেই , একদমই সাদামাটা কিন্তু তবুও কী জানি এক গল্প আছে এর। এই দোতলা ঘরের জানলা ছাড়া কোন গল্প নেই। আমি সারাদিন জানলার ধারেই থাকি । মানুষ, পাখি , জানলার বাইরের সবকিছু আমার মুখুস্থ হয়ে গিয়েছিল । প্রতিদিন এক কাক এসে বসত আমার জানলায় । প্রথম ভেবেছিলাম খাবারের আশায় । পরে দেখি খাবার না দিলেও আসে । কাক কি বুঝতে পেরেছে আমার অবস্থা? সহমর্মিতা প্রকাশ করতে এসেছে?
এক বুড়ো প্রতিদিন দৌড়াতে বের হয় সকাল দশটায় । বয়স আশি তো হবেই । এই রাস্তা দিয়েই ফিরে আসে আসে দশটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে । দৌঁড়ানোর সময় কেমন দুলে দুলে দৌঁড়ায় । দেখতে বেশ মজা লাগে।
এক তরুণী তার ছোট্ট একটা কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বের হয় বিকাল পাঁচটায় । কুকুরটা মোটেও শান্ত নয় ।অন্য কুকুর দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে। তুরুণীটিকে খুবই লজ্জিত মনে হয়।
১২ নতস্কিস , 20210
3243 সোভেতস্কিয়া স্ট্রিট
এবারে একটা ভাঙ্গা বাড়ির ছোট রুমে গিয়ে উঠেছিলাম । রুমটিতে একটি খাট যেটি কিনা সমস্ত ঘর দখল করে নিয়েছে । আর একটি ড্রেসার আছে এক কোণায়। জানালা আটকানো । খোলার উপায় নেই। সুতরাং আকাশ দেখার উপায় আর নেই । এ ঘরে আমি ছিলাম ৩৬৫ দিন । এর বেশিরভাগ দিনই কেটেছে বিড়ি ফুঁকে কিংবা ঘুমিয়ে। তবে এই প্রথম আমার পাশের ঘরে একজন ছিল। তার সাথে আমার হঠাৎ দেখা হয়েছিল রান্নাঘরে। আমরা দু' জনই থতমত খেয়েছিলাম কারণ আমরা এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না । গ্রুদস্কির এটা প্রথম ঘর ছিল। এখানে ছিল মাত্র একমাস । অপ্রত্যাশিত শ্রোতা পেয়ে সব গড় গড় করে ঢেলে দিচ্ছিল । ওরা তাকে বাড়িতেই খুঁজে পেয়েছিল । লক্ষণ গুলো তখনো প্রকট হয়নি । ওর বাড়িতে মা এবং ভাই বোনেরা আছে। সবকিছু তাকেই সামলাতে হয়।গ্রুদস্কি একজনকে ভালোওবাসে-মিখাইল। সমস্যা হচ্ছে মিএখাইলের বউ আছে। রান্নাঘরের অল্প সাক্ষাতে সমস্ত কিছু আমি জেনে গিয়ছিলাম। এজন্যই বলি আমি বোধ হয় মানুষ নই। মানুষের দুঃখ আছে। দুঃখভরা কথা আছে। সুখ আছে, স্বপ্ন আছে, ভালোবাসার মানুষ আছে। আমার ওসব কিচ্ছু নেই । তাই বলে আফসোস করছি না ।
৬ ডিকাব্রে , 20210
3243 সোভেতস্কিয়া স্ট্রিট
আমার প্রিয় এই চিলেকোঠার ঘর। ওরা যখন আমাকে ধরে নিয়ে আসে তখন আমার লক্ষণ প্রকট। একধরনের ভাইরাস ছড়াচ্ছে চারপাশে যেটি কি না ছোঁয়াচে । এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে, একসময় মানুষ নিজেকে নিজেই মেরে ফেলে। কানাস্কোয়ান লেকে ডুবে গেছে অনেকেই । আমিও ভেবেছি অনেকবার ডুবে যাব পাথরেরে টুকরোর মত । কিন্তু সাহসে কুলোয় নি । ওরা আক্রান্ত লোকদের ধরে ধরে এনে বিভিন্ন ঘরে আলাদাভাবে রাখছে।
চিলেকোঠার জানালার ফাঁকা পাল্লাটি দিয়ে ঝিরঝির বাতাস কিছু বলছে। মা কুপির আগুনে এসময় পাটিসাপটার ভেতরে ক্ষীর পুরছে। ছাদের টবে গাঁদার দুটো কলি এসেছে। দাদা শখ করে লাগিয়েছে। প্রথম পাটিসাপটা দাদা পাবে। এর পরে আমাদের পালা। দাদা ছাড়াও মায়ের আরও ছানাপোনা আছে । বাকী ছানাপোনারাও অপেক্ষায় আছে পাটিসাপটার ।
বাইরে মাইনাস ষোল। ঝিরঝিরে বাতাস আরও কিছু বলছে। সব বুঝতে পারিনা। নিঃশব্দ তুষারে ঝিরঝির কথা সব বোঝা যায়না।
আমিও মানুষ ছিলাম । আমার ঘর ছিল, ঘরের ভেতর মানুষ ছিল। কথা ছিল, কথা শোনার লোক ছিল।
আমি অপেক্ষা করি ওরা কখন আসবে।
রুবিনা খানম
গল্পকার।
বাংলাদেশে বাড়ি। থাকেন কানাডায়।
গল্পকার।
বাংলাদেশে বাড়ি। থাকেন কানাডায়।


2 মন্তব্যসমূহ
আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।
উত্তরমুছুনবাংলাটা অনেকটা অনুবাদের মতো লাগছে। একটু হোঁচট খেতে হচ্ছে।
উত্তরমুছুন