হিলহিল করে ধেয়ে আসছে শীতের বাতাস । ফুরিয়ে গিয়েও যেন ফুরতে চায় না , কেবল দাঁত খিচিয়ে ছুটে আসে ।কামড়ে দিতে পারে না ,ফোকলা দাঁত বুড়োর মতো । কুয়াশাও কমেছে , তাই সূর্য মুখতোলার আগেই খাঁ খাঁ করে জুড়ে বসেছে সকালের আলো । এই সময়ের প্রকৃতি বড্ড মায়াময়ী , কেমন যেন শরীরে আবেশ আনে , তবু কাজের মানুষের তো ঘরে বসে থাকা যায় না । তাই কলিমুদ্দিকে বেরিয়ে পড়তে হয় কাজের তাড়নায়। কচকচ আওয়াজ তুলে সে সাইকেল ঠেলে চলে । গরিবপুরের বড়ো দীঘির পারে তখনও রাজহাঁসের দল বিলে নামেনি, খাঁচাবন্দী হয়ে প্যাকপ্যাক স্বরে সাময়িক মুক্তি পাওয়ার আর্তি জানিয়ে চলেছে । গ্রামের সরু পিচরাস্তা জুড়ে কেউ কেউ গাছাসর্ষে মেলতে শুরু করেছে, পথচলতি মানুষ, গাড়ি, সাইকেলের পিষ্টনে মলনের কাজ হয়ে যায় । সেসব পেরিয়েই গলা আঁকিয়েবাঁকিয়ে কলিমুদ্দির পা’চালিত দু’চাকা ছোটে । ফজরে ঘুম ভাঙ্গেনি , নামায পড়তে উঠতে পারেনি ,তাই কাজে দেরি। শরীরের কল-কবজা নড়বড়ে হয়েছে , আলিস্যি আসে , রোজ সকালে কাথাবালিসের সাথে লড়াই করতে হয় । বিড়বিড় করে কলিমুদ্দি, দেরি হয়ে গেল, এসব কাজ দিনের আলো গভভে থেইকি বের হওয়ার আগেই সারতি হয়; বাড়ির লোক কী ভাবছে কে জানে ! অসংখ্য ভাবনারা মাথা কুটে মরে । মাথা কুটে সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝুলতে থাকা শতছিন্ন নাইলনের একটি ব্যাগ । আজ বাবলু মিয়াঁর একমাত্র নাতীর খৎনা । ইতিমধ্যে রোদ আরও লম্বা জিভ বের করেছে; মুহূর্তে পুরো এলাকাটা চেটে নেওয়ার কামনায় লকলক করে চলেছে ।
গেটের কাছে পৌঁছেই কলিমুদ্দি হাঁক দেয়, বাবলু ভাই, বাবলু ভাই--- । বাড়ির ভিতর থেকে কোনও সদুত্তর আসে না , তবে একটা গুণগুণ আওয়াজ কানে ভেসে আসে । কয়েক মিনিট চুপ থেকে আবার হাঁক পাড়ে । পিছনে শূন্যমাঠের বুক চুমে শুয়ে থাকা বিলের ধারল বাতাস ঘন হয়ে আসে । ফসলের জমিতে গুঁজে রাখা কাকতাড়ুয়ার জামা যেমন আলগা মাঠের বাতাসে ফরফর করে ওড়ে, সকালের খোলা হাওয়ায় কলিমুদ্দির অকাল বার্ধক্যে দখল নেওয়া পাটকাঠির মতো শরীরে ঘেরা জামাটাও খলবলিয়ে কাঁপে । কাঁপে তার শরীরও । আস্তে করে লুঙ্গির বহরটা হাতে মুড়ে রডের পিঠের ওপর দিয়ে পা বাড়িয়ে সাইকেল থেকে বেরিয়ে আসে । পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের সাইকেলটা তার মতোই বুড়িয়ে এসেছে, রোগা হয়নি ঠিকই তবু কালো আস্তরণে ঢাকা হারকিউলেস রুপ-রস হারিয়ে মনিবের সাথে ইহকাল ছাড়ার যোগাড় নিয়েছে । পাশে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জাম গাছের গায়ে সঙ্গীকে ঠেস দিয়ে রাখে, তারপর ব্যাগটার হাতলে আঙ্গুল গলিয়ে গেটে হাত দেয় ।
---বাবলু ভাই ? শুনছেন ভাই ? বেলা বহে গেল যে । শুনশান হয়ে আসা বাড়ির ভিতরে সরু গলার বাক্যালাপ শোনা যায় । কলিমুদ্দিও ঘনঘন ডাক পাড়ে , তবু কেউ উত্তর দেয় না ।
হঠাৎ পিঠের কাছে একদল কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজে চমকে ওঠে সে । গতরাতে খৎনার উদ্দেশ্যে বড়ো খানা হয়েছে , কয়েক হাজার মানুষের উচ্ছিষ্ট খাবার, পাতা ফেলা হয়েছে রাস্তার ক্যানেলে , তার দখলদারি নিয়ে সারমেয়রদল মাস্তানি শুরু করেছে । বিক্ষিপ্তভাবে পাছড়া পাছড়ি করতে থাকে, ওদের মধ্যে কোন একতা নেই, নিজের নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত । দূর থেকে লোম ওঠা কয়েকটি কুকুর নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । কাছে যাওয়ার সাহস পায় না ।
--- বাবলু ভাই ? গেট খুলছেন না ক্যানে ? আজ কাজ করাবেন ন্যা ?
সবুজ করোকেড টিনের গেটের দুই পাল্লার ফাঁকে চোখ বসিয়ে পিটপিট করে দেখতে থাকে , ভিতরে মানুষের আনাগোনা । আত্মীয়স্বজন এখনো বাড়ি ফেরেনি সকলে । বড়লোকের বাড়ি অনুষ্ঠানাদি হলে আগত আত্মীয় সপ্তাহভোর থাকে , হাড়ি হাড়ি ঝলসান মাছ-মাংস দুবেলা পাতে পাতে সাবাড় হয়ে যায় । হঠাৎ ভুরভুর করে মাংসের গন্ধ বেরিয়ে আসে , তার নাকে লাগে । মিঠাল ঝালঝাল বাস্প কলিমুদ্দির চোখমুখ ঝালাফালা করে দেয়, খ্যাকখ্যাক করে কাশি উঠে আসে গলার নালি বেয়ে সাথে পটাপট গোটাকতক হাঁচি , আঁটকে রাখতে পারে না । খাবারের গন্ধ মানুষের খিদে বাড়িয়ে দেয় । কতকিছু মাথায় আসে তার , তবে কাজের কথা ভুলে যায় না ।
--- কে ? গেটের ফাকে চোখ রাইখ্যা ভিতর দেখেন ক্যানে ? উঠানে মেয়ে বউরা আছে । । বুড়্যা হাবড়া হয়ে গেলছেন লাকলজ্জা নাই নাকি ? ওপরের ঘরের ব্যালকোণি থেকে এক বয়স্কা মহিলা খ্যাকানি মেরে ওঠে । বুড়ো কাঠ হয়ে যায় । কাঠ না গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ; লজ্জায়, ভয়ে । তার সাথে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জাম গাছের কোনও ফারাক আছে নাকি ! বয়সের ভারে ঝিমধরা শরীর তো একরকম গাছপাথরেই পরিণত হয়েছে । এক ধাপ পিছনে সরে দাঁড়ায়, কিছু বলতে পারে না । যে কাজের জন্য এতদূর ছুটে আসা তা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে । নিরীহ পশুর মতো কুতকুত করে তাকায় । ঘনঘন চোখের পাতা ওঠবস করে ;তারপর বলে ওঠে—
--- ভাবি, আমাকে ছিনতে পারছেন ন্যা ? আমি সাহেব পাড়ার কলিমুদ্দি হাজাম । বাবলু ভাই আস্তে বুলেছিল , লাতিডার মুসলমানি দিবে বুল্যা ।
--- উ নাই ।
--- বিহ্যান বহে গেল । কুনঠে গেলছে ?
--- বাহেরে গেলছে । এ কথা শুনেই বুকের ভিতর কেমন ঘুরপাক খেলে গেল কলিমুদ্দির ।
--- ক্যানে বহিন ? কাহুরির কিছু হল নাকি ? কলিমুদ্দি কৌতূহলে জানতে চায় ।
--- মহিলা আর কোনও কথা বলে না , সরে পড়ে ।
হাতের ব্যাগটা মাটিতে রাখতে গিয়ে কী মনে হয়, সাইকেলের কেরিয়ারে বসিয়ে দেয় ,তারপর ঘুনসি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় বসে পড়ে মাটিতে । কিছু ভেবে পায় না, এক সপ্তাহ আগে দিন ঠিক করে কি মুসলমানি করাবে না ! বড়লোকের মন বোঝা বড়ো দায়। এদের মতিগতি তার নাগালের বাইরে । লুঙ্গির ট্যাক থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে, বিড়ি ধরায়, বউয়ের হাতের বিড়ি । পঞ্চাশ বছর ধরে এই বিড়ি তার ভরসা, আপদে-বিপদে যখন পড়ে বউয়ের হাতের বিড়ি টানলে মনটা কেমন শীতল হয়ে আসে । ফকফক করে ধোয়া ছাড়তে থাকে , ধোয়ার সাথে নিংড়ে ফেলতে চায় সব দুঃশ্চিন্তা ।
আজ হঠাৎ তার বাবার কথা মনে পড়ে, এইতো সেইদিন বাপের সাথে মুসলমানির কাজে নামল , প্রথম দশবছর বাপের সাথে হেল্পারের কাজ করত । ছোট্ট বেলায় কাজে নামায় খুব ভয় পেত, তবু বাপের হাতে হাত দিলে কাজ সরে কিনা ! তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুরে বেড়াতে হতো । রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে কাজ করে বেড়াতে হতো তাকে । এ কাজ বংশানুক্রমিক, তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য; তার দাদোর হাতে নাকি পয় ছিল , সে যাদের খৎনা দিয়েছে তাদের সংসারে কোনোদিন অশান্তি হয়নি । দাদোর যশখ্যাতি বাপ পেয়েছে । এই কথা শুনে বালক কলিমুদ্দি হেঁসে কুলপাট হত, দাদিকে একবার জানতে চেয়েছিল; দাদি, আমাকে বুলধিনি নুনু কাটার সাথে সংসারে সুখের কী সম্পক্ক ? দাদি হাসতে হাসতে বলেছিল ওরে আমার মিনশেরে, ওই জিনিসটাই তো পৃথিবীর সব সুখের মূল । ওড্যা যার দুব্বল তার সুখ কীসের ? কলিম অতকিছু বোঝে না , তার ওসব করতে ভালো লাগে না । সে স্কুল যেতে চায়, পড়তে চায় । বাপ বলত, শুন কলিম হাভাতের ঘরে জন্মাইছিস, আমাদের লেখাপড়া করে লাভ নাইরে । কাজ কর, কাজ শিখে লে, এসব রাজার কাজ বুঝলি ? বছরে এক দেড় মাস করলেই বছরের আধধেক সময় চলে যাবে । তাছাড়া মুসলমানি হল আল্লার হুকুমে সুন্নতকাজ । তাহালেই ভাব, কাজ করে টাকাও পাবি আবার আল্লার কাছে নেকির কাজও হবে । কলিম সুন্নত কী, সংসারে আয়উন্নতি কী তা বোঝার চেষ্টা করে না , সে কেবল বোঝে পেটের খিদে। তাই বাপের হাঁটা পথের ছায়া আঁকড়ে হাঁটতে থাকে, যেন গড্ডলিকা প্রবাহ । কলিম, চিমটিখানা এগিয়ে দেয় , কাঠি বের করে, সলতে পাকায়, সলতে তেলে ভিজায় । কখনওসখনও বাচ্চার পা চেপে ধরে । এটাও খুব শক্তকাজ । শরীরের মূল অঙ্গের মাথার চামড়া কেটে বাদ দেওয়া সহজ কাজ নয়। একজন বাচ্চা জেনে বুঝে তা কাটতেই বা দেবে কেন ! কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশ , মানতে হয়; তাই হাত-পা চেপে ধরতে হয় , একটু নড়লেই ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে । বাপ বলত, কলিম , কুরমানির দিনে পশু জবাই করার সময় যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া মরণ ঝাকুনি মারে তেমনই ঝাকুনি মারতে পারে , শক্ত করে ধর বাপ । কলিম শক্ত করে ধরতে গিয়ে কখনও পায়ের ওপর বসে পড়ে , তখন বালক গালিপাড়ে ।
--- বাপে বলে তোমার নাম কী ? তোমার বাপের নাম কী ? তোমার দাদোর নাম কী ? তোমাদের কডা মুরগি ? কডা ছাগল ? কে ছাগল চরায় ? বল শ্বশুরবাড়ি যাব, মুরগীর গোস্ত খাব । আরও কত কী বলে ! আর বাচ্চারা ভয়ে, কাঁদ কাঁদ হয়ে তালে তালে আউড়ে যায় হাজামের বলা কথাগুলো । কলিম অবাক হয়ে শোনে আর ভাবে, বাপ কত জাদু জানে এত্ত একটা কঠিন কাজে ছেলেরা তেমন কাঁদে না তো ! কিন্তু ছাগল, মুরগি সবার তো থাকে না ,তবু বাপ ওসব কথা বলায় কেন ! একসময় কলিম জেনে যায় , এসব কথার কথামাত্র । আসলে খৎনায় বসা বালক যেন ভয় না পায়, আনমনে থাকে তাই হাজাম ওসব আবলতাবল বলায় । তবে কলেমা পড়ায় সজ্ঞানে, শুধু শিশ্নর বর্ধিত চামড়া কাটলেই তো হবে না, কলেমা পাঠ করিয়ে মুসলমানি দিয়েই প্রকৃত মুসলমান করাতে হয় । কাটা হলে দড়দড় করে তাজা রক্ত বেরিয়ে আসে । পুরো শরীর সিউরে ওঠে ,কলিম চোখ বন্ধ করে । চোখখুলে দেখে, বাপ সলতে পুড়িয়ে কালো ছায় সদ্য চামড়া ছেটে ফেলা ক্ষতের চারপাশে লাগিয়ে দেয় । তড়পাতে তড়পাতে ক্লান্ত হয়ে আসে বালক, দাদি-নানি ছুটে এসে বালকের সেবা শুরু করে । বেশি করে পেঁয়াজ মিশিয়ে মুড়ি বা চাল ভাজা খেতে দেয় । একসময় নব্য মুসলমান ব্যথার ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে । আর হাজাম পেট পুরে মাংসভাত খেয়ে খচখচে নগদ টাকা নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয় । মুসলমানির বাড়িতে পেটপুরে ভালোমন্দ খাওয়াটা কলিমুদ্দির একমাত্র লাভ । এটার জন্যই কাদা-পাঁক বেয়ে খালি পায়ে গ্রামের পরে গ্রাম চেনা লুঙ্গির ছায়া অনুসরণ করে ফেরে । এভাবেই কতবছর পার হয়ে গেল। একদিন আসতো শরীরটা সত্যি সত্যিই ছায়া হয়ে গেল । যে লুঙ্গির পিছনে পিছনে কলিম ঘুরে ঘুরে বেড়াত তা এখন ঘরের কোণে টাঙ্গানো দড়িতে ঝুলতে থাকে, কেবল ভেতরের মানুষটাকে কলিম আর দেখতে পায় না । বুঝেছে বাপের শরীর দূরস্ত , ছায়াখানিরও কত প্রয়োজন । গভীর রাতে কতদিন বাপের জামা-কাপড় বুকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদেছে , বাপ ফিরে আসেনি ।
তারপর আসে কলিমুদ্দির যুগ । প্রথমে লোকে কাজে ডাকত না , সে নিজেও সাহস পেত না । একদিন বাপ স্বপ্নে দেখা দিল, বলল, কলিম , বংশের কাজ, ঐতিহ্য , অবহেলা করিস ন্যা বাপ । ঐ কাজ আঁকড়ে ধরে থাক , তোর আয়- উন্নতি হবে । কিন্তু উন্নতি হল কই ! তার মাঝে মাঝে মনে হয়, তার ওটা কেটেছিল বাপের এক সাগরেদ, বাপ কাটলে বুঝি ভাগ্য ভালো হত । দাদি বলেছিল , ওটায় বল, ওটায় আয়, ওটাই সংসারের সব কিছু ।
কলিমও বাপ-দাদোর যশ পায় খানিকটা, তারও নামযশ ছড়িয়ে পড়ে । খৎনা দিলেই সবার আগে কলিমুদ্দির নাম মুখে আসে । তারপর কতকাল কেটে গেল । তার কালও শেষ হতে বসেছে। আজকাল হাত কাঁপে, শরীরে শক্তি নেই , চোখে সর্ষের ফুল দেখে; হঠাৎ হুড়হুড় করে একটা আওয়াজ কানে এসে লাগে । একবারে বুক ঠেলে আসা আওয়াজটা কাপিয়ে দেয় সর্বাঙ্গ; তারপর ঘড়ঘড় করতে করতে চুপ মেরে যায় । চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে কলিম , হুঁ ! সে ঘুমিয়ে পড়েছিল নাকি ? বিড়ির সুখটান নিতে নিতে চোখ জড়িয়ে আসে । আঙ্গুলের ডগায় চোখ রগড়াতে রগড়াতে দেখে, বাবলু গাড়ি থেকে নামে, সাথে আরও দুজন লোক । একটি বাচ্চাকে কোলে তুলে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যায় । ধুমমুস করে উঠে দাঁড়ায়, কয়েক পা এগিয়ে যায়,
--- বাবলু ভাই, আমাকে আসতে বুলেছিলেন ।
--- ও, তুমি ! বাবলু মিয়াঁ কিছুটা উপেক্ষার স্বরে বলে ওঠে । তারপর আনমনা হয়ে পড়ে ।
--- ভাই কুনু কথা বুলছেন না ক্যানে ? উদগ্রীব হয়ে জানতে চায়। বাবলু মিয়াঁ কোনও কথা না বলে ড্রাইভারকে খেতে ডাকে , দু’ট্যা ভাত খেয়ে যা হাবু । তারপর বলে, ও, তুমি আস্যাছ ?
--- হ্যাঁ , মেলা বেলা হয়ে গ্যাল । লাতির মুসলমানি কখন করাবেন ? যেন মনে করিয়ে দিতে চায়।
--- শুনো, তুমার কাছে মুসলমানি করাতে পারব ন্যা।
--- তার মানে ? কী বুলছেন ভাই ? কড়মড় করে পাঁজরের হাড়গুলো কুচকে যায় বুকের গুপ্তঘরে । কণ্ঠের গলি চিরে কথা বেরতে চায় না যেন ; আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে আর বাবলু মিয়াঁর উত্তরের আশায় মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে কলিম ।
--- মানে খুব সহজ , কলিম । তুমার হাতের কাজ ভালো লয় । লোকে বদনাম করে । ছেলেপিলেকে তুমি খাম করে দিছ । তুমার খৎনার কাজ আমরা লিব ন্যা । চমকে ওঠে কলিম, শিহরিত হয়ে ওঠে । স্বগতোক্তি করে, আমার কাজ লিবে ন্যা, তাহালে কার কাজ লিবে ! জানতে চায়, আমার ভুল কী ?
--- সেইদিন ওই পাড়ায় তুমি মুসলমানি দিয়েছিল্যা , মুনে পড়ছে ? আক্কাসের বেটার, ছুড়ার তো আর একচিন হলে অকাজ করে দিছেল্যা । মাথা মুড়ে গেলে কী হতো বুলধিনি ? দাঁত খিচিয়ে বলে ওঠে বাবলু ।
--- ওড্যা তো একটা দুর্ঘটনা ভাই । ছুড়া এতো হাত-পা ধাপড়াছিল , কেহু ভালো করে ধরল ন্যা,খুর পিছল্যা গেল । তাতে আমার কী দোষ ?
--- আর মুনসারের ভাগন্যা ? উ বেচারার তো সাতদিন মুতই বন্ধ করে দিয়েছিল্যা ।
--- ভাই, দু’য়েকটা ঘটনার জন্যই এসব বুলছেন ? আপনার সব ব্যাটার, ভাইপোদের খৎনা তো আমিই দিয়েছি । আর সারাজীবন হাজার হাজার কাজ কন্নু, সেসব বুলছেন ন্যা ? আর কেহু তো অভিযোগ কত্তি পারল ন্যা ?
--- কলিম, ওসব কথা ভুল্যা যাও । তুমার বুয়াস হয়েছে, খৎনার কাজ বাদ দ্যাওধিনি। আমরা ঠিক করেছি, তুমাকে আর ডাকব না ; তুমাকে ক্যানে কুনু হাজামকেই ডাকব ন্যা । আগের যুগে যা হয়েছ্যা হয়েছ্যা , এখন থেকে হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে খৎনা করাব । বাবলু আর কোন কথা শোনে না , বলতেও চায় না । হনহন করে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় । ঘটাং করে টিনের গেট খুলে বাড়িতে ঢুকে পড়ে , তারপর মুখের ওপর দড়াম করে লাগিয়ে দেয় ।
এইসব ঘটনাগুলো সত্যি , কিন্তু এতে কলিমের তো কোনও দোষ নেই, ও তো ইচ্ছা করে দুধের শিশুদের ক্ষতি করেনি । এতো বছর ধরে কত আদরে যত্নে সুন্নত কাজ করে আসছে , একাজকে সে আল্লাহর নির্দেশ বলে মেনে এসেছে। বাচ্চাদের নিজের হাতে খৎনা দেওয়ার পরে কতবার এসে দেখা করে যায় । খোজ-খবর রাখে , এলাকার মানুষকে আপন মনে করে , ভালোবাসে , সব শেষ হয়ে গেল ! তাকে তার ভালোবাসার মূল্য দিল না ! বাবলু মিয়াঁর কথা এলাকার লোক মেনে চলে । তাহলে আর কেউ কাজে ডাকবে না ! তাকে এলাকার মানুষের আর প্রয়োজন নেই ! তার বাপ-দাদোর কাজ হারিয়ে শেষ হয়ে যাবে ! কলিম চোখে সর্ষের ফুল দেখতে থাকে , জাম গাছের গায়ে ঠেস দেওয়া সাইকেলটা ভালোভাবে দেখতে পায় না । কাঁপতে কাঁপতে সাইকেলটির হ্যান্ডেল ধরে , অস্পষ্ট রাস্তায় খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে থাকে । কখন সকালের উলঙ্গ বাতাস ঝিম ধরেছে , শুরু হয়েছে হলদে আলোর হুংকার । সামান্য এসেই চোখে পড়ে ,রাস্তার পাশে ক্যানেল , কয়েকটা কুকুর তখনও পিরের সিন্নির মতো পাতগুলো চেটে বেড়াচ্ছে । এতক্ষণে উচ্ছিষ্টগুলো দুর্গন্ধে পরিণত হয়েছে । হঠাৎ অস্ত্রপাতি ভরা ব্যাগটি ঘটাং করে কেরিয়ার থেকে মাটিতে খসে পড়ে । কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে কলিমুদ্দি থলেটি হাতে তোলে, তার মনে হয়, এসব আজ থেকে আর কোন কাজে লাগবে না ; ভিতরে চোখ রাখে , এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে-- বাঁশকাঠি, বাঁশের চিমটি, লোহার খুর, সুতির কাপড় সব নেতিয়ে শুয়ে আছে । এইসময় ঘুমে ঢুলে পড়া মাঠের বাতাস চেতন পায় মনে হয় , শো শো করে সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে যায়। কলিমের মনে হল, একটা লুঙ্গির ছায়া সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে, দূরে, অনেক দূরে , তা কলিমকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ; কলিম পা চালিয়ে আয় বাপ , দাঁড়িয়ে থাকিস ন্যা । শুন্যের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে কলিম । এক সময় অদৃশ্য হয়ে যায় লুঙ্গির ছায়াটা ।
- হোম
- সূচিপত্র
- _লেখক সূচি
- _লেখকভিত্তিক রচনা সূচি
- _গল্পের সূচি
- _বিষয় সূচি
- _রচনার ধরন সূচি
- _বিশেষ সংখ্যা ও ধারাবাহিক
- _দেশ ও ভাষা সূচি
- _নতুন ও জনপ্রিয় লেখা
- _গল্পপাঠে খুঁজুন
- গল্প
- _বাংলা গল্প
- _অনুবাদ গল্প
- _দেশভিত্তিক গল্প
- _রচনার ধরন সূচি
- অনুবাদ
- _বিশ্বগল্প
- _অনুবাদ প্রবন্ধ
- _দেশ ও ভাষা সূচি
- প্রবন্ধ
- _সাহিত্যতত্ত্ব
- _লেখালেখির কৌশল
- _বই আলোচনা
- _আলোচনা
- সাক্ষাৎকার
- _লেখক
- _আর্ট অফ ফিকশন
- _গল্পের কাছে কী চাই
- লেখক
- _বাংলা লেখক
- _বিদেশি লেখক
- _নতুন সংযোজন
- _লেবেল নির্দেশিকা


3 মন্তব্যসমূহ
ভালো গল্প। তবে বানান বড্ড ভুল! এত বানান ভুল পাঠে বিরক্তি আনতে পারে।
উত্তরমুছুনমনে হচ্ছে কনভার্ট করতে গিয়ে হয়েছে। দয়া করে শব্দগুলো উল্লেখ করলে সংশোধন করা যাবে 🙏🙏
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো
উত্তরমুছুন