অনুবাদ : রুখসানা কাজল
অ্যানালিয়া টরেসকে জন্ম দিয়ে প্রসবজনিত অসুস্থতায় ওর মা মারা যায়। কিন্তু ওর বাবা এই তীব্র মৃত্যুশোক কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। দুই সপ্তাহ পর, নিজের বুকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। প্রিয় স্ত্রীর নাম ঠোঁটে নিয়ে কয়েকদিন ভুগে তিনি মারা যান। তার ভাই, ইউজেনিও টরেস, তার সমস্ত বিষয়সম্পত্তি এবং পরিবারের দায়িত্ব লাভ করে। ছোট্ট এতিম অ্যানালিয়ার ভবিষ্যৎ লালনপালনের ব্যবস্থা তিনি তার মতো করেন। নিজেদের বাড়ির সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে ছয় বছর বয়েস পর্যন্ত, একজন মমতাময়ী আদিবাসী আয়ার কোলেপিঠে অ্যানালিয়া ওর জীবন কাটায়। এরপর যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাজধানীর সেক্রেড হার্ট সিস্টার্সদের একটি বোর্ডিং ইশকুলে। এই বোর্ডিং ইশকুলে জীবনের পরবর্তী বারোটি বছর ও কাটিয়ে দেয়। অ্যানালিয়া ছিল মেধাবী ছাত্রী। ও ভালোবাসত পাথুরে কনভেন্টের সাদামাটা সৌন্দর্য ও সংযম, চ্যাপেলের উঠান জুড়ে থাকা পবিত্র সন্তদের সান্নিধ্য, মোমবাতি আর লিলিফুলের সুগন্ধ, শূন্য টানা বারান্দা এবং ছায়াময় কার্নিসগুলো। এগুলোর সঙ্গে কিছুটা হলেও অ্যানালিয়া পছন্দ করত শিক্ষার্থীদের কোলাহল মুখরতা এবং ক্লাশ রুমের টকঝাল পরিবেশের তীব্র স্বাদ-গন্ধ। তবে মঠবাসিনী নানদের তীক্ষ্ণ নজরদারি থেকে সবসময় পালিয়ে থাকতে চাইত। আর পালাতে পারলে মুন্ডুহীন মূর্তি আর বাতিল ভাঙ্গাচোরা আসবাবপত্রে ঠাসা চিলেকোঠার ঘরে লুকিয়ে থেকে একা একা গল্প করত। আর ওরকম গভীর নির্জন গোপন সময়গুলোতে উত্তেজক কামনার আশ্লেষে নিজের সাথে নিজেই পাপাচারে ডুবে থাকত।
প্রতি ছয় মাস অন্তর ওর চাচা ইউজেনিওর কাছ থেকে একটি সংক্ষিপ্ত নোটের মত চিঠি আসত ওর কাছে। তাতে লেখা থাকত, বাবামায়ের স্মৃতিকে সম্মান এবং মহান করার জন্য, ও যেন বিনয়ের সাথে সবকিছু মেনে চলে। ওর বাবামা যতদিন বেঁচেছিলেন তারা উন্নতমানের খৃষ্টান ছিলেন। পরলোকে থেকে তারা গর্ব করবে যে তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় সদ্গুণ অর্জনের জন্য এবং কঠোর প্রস্তুতি নিচ্ছে একজন নিবেদিত প্রাণ ব্রতী হিসেবে কনভেন্টে প্রবেশ করার। চাচার চিঠিতে থাকা পরিকল্পনার ইঙ্গিত বুঝে অ্যানালিয়া প্রথমেই প্রতিবাদ করার বিশুদ্ধ মানসিকতার সাথে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেয়, তার অবস্থা পরিস্কার। অন্তর থেকে ও ধর্মীয় জীবন উপভোগ করে কিন্তু এসব অনুসরণ করতে ও মোটেও আগ্রহী নয়। যদিও অন্তরের অন্তঃস্থলে আনন্দহীন চরম নির্জনতায় থেকে অ্যানালিয়া ভেবেছিল, এভাবে ত্যাগের মাধ্যমে ও হয়ত সত্যিকারের শান্তি খুঁজে পাবে। কিন্তু অভিভাবকের চাপিয়ে দেওয়া এই উপদেশ সম্পর্কে, ওর সহজাত প্রবৃত্তি ওকে সতর্ক করে দেয়। ও অবশ্য এমনিতেই সবসময় সন্দেহ করত যে, ওর চাচার প্রতিটি কাজকর্ম পারিবারিক আনুগত্যের চাইতে আদতে তার লোভ দ্বারা বেশি পরিচালিত হয়। যে কারণে তার কাছ থেকে আসা যে কোন পরামর্শ বা উপদেশকে সে অবিশ্বাস করত। ওর মনে হচ্ছিল,এগুলোর পেছনে,ওর চাচার পাতা কোন না কোন ফন্দিফিকির অবশ্যই লুকিয়ে আছে।
অ্যানালিয়ার বয়েস ষোল বছর পূর্ণ হলে, প্রথমবার ওর চাচা ওকে ইশকুলে দেখতে আসেন। মাদার সুপিরিয়র তার অফিসে ওকে ডেকে পাঠিয়ে বুঝতে পারেন, এদের দুজনকে একে অন্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। কারণ বাড়ির পেছনে আদিবাসী আয়ার কোয়ার্টারে থাকার দিনগুলো থেকে এখন পর্যন্ত, এই দুজনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাই ওরা একে অন্যকে চিনতে পারছে না।
“বাহ! অ্যানালিয়া, লিটল সিস্টার্সরা তোমাকে ত বেশ ভালোভাবে দেখাশোনা করেছে,” ওকে দেখে চকলেটের কাপ নাড়তে নাড়তে মন্তব্য করে ওর চাচা। “হেলদি মানে খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে দেখতে। আমি শেষ চিঠিতে তোমাকে জানিয়েছিলাম, এবারের জন্মদিনের শুরুতে, প্রতি মাসে হাতখরচ বাবদ তোমার জন্য কিছু টাকা পাঠাব। অবশ্য আমার স্বর্গবাসী ভাই তার অছিয়তনামায় এই নির্দেশ দিয়ে গেছে।
“আচ্ছা চাচা, কত করে পাঠাবেন ?”
“একশ টাকা(পেসো)* করে পাঠাব।”
“ আমার বাবামা কি এটুকুই আমার জন্য রেখে গেছেন ?”
“ না, অবশ্যই না। তুমি ত জানো, আমাদের বসতবাড়িসহ বিশাল জমিজমা সব তোমার। কিন্তু জমি দেখেশুনে চাষাবাদ করা ত মেয়েমানুষদের কাজ নয়। বিশেষ করে এই সময় মানে এই ধর্মঘট আর বিপ্লবের দুঃসময়ে এসব কাজ মেয়েরা পারবে না। এখন থেকে প্রতি মাসে তোমাকে টাকা পাঠাব আর যথেষ্ট বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতি বছর এর পরিমাণ বাড়িয়ে দেব। এরপর দেখা যাবে।”
“এরপর আমরা কি দেখব, চাচা?”
“আমরা দেখব কিসে তোমার সবচে বেশি ভালো হয় তাই।”
“সেক্ষেত্রে আমার কি নিজস্ব কোন পছন্দ থাকতে পারবে?’
“শোন মেয়ে, জমিজমা দেখাশুনা করার জন্য সবসময় তোমার একজন পুরুষের দরকার হবে। এতগুলো বছর ধরে আমিই এসব কাজ করে আসছি। যদিও এগুলো মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু আমার কর্তব্য এটা করা। আমার প্রিয় ভাইয়ের মৃত্যুর শেষ মুহুর্তে আমি তার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। এখন তোমার জন্য এসব কিছু করতে আমি প্রস্তুত আছি।”
“অহো চাচা, আপনাকে আর বেশিদিন কষ্ট করে এসব করতে হবে না। আমি যখন বিয়ে করব তখন আমার সম্পত্তির সব দায়দায়িত্ব আমি নিজেই বুঝে নেব।”
“বলে কী এই বাচ্চা মেয়ে ! ও বিয়ে করলে--- মানে ! আমাকে বলুন ত সিষ্টার, ওর কি কোন প্রেমিক হয়েছে নাকি?”
“মিঃ টরেস, আপনি এসব কি বলছেন! আমরা মেয়েদের খুব কাছাকাছি থেকে ওদের দেখাশুনা করি। এ শুধু কথার পিঠে কথা বলেছে মেয়েটা। একবার ভেবে দেখুন মেয়েটি কি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে !”
অ্যানালিয়া টরেস লজ্জা পায়। ইউনিফর্মের কুঁচিগুলো হাতের টানে মসৃণ করতে করতে কিছুটা ব্যঙ্গের ছলে সালাম জানিয়ে ও চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। মাদার সুপিরিয়র তার সামনে বসা অ্যানালিয়ার চাচাকে আরও এক কাপ চকোলেট পরিবেশন করে মেয়েটার এরকম অভব্য আচরণের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, এর পেছনে কারণ আছে। ওর নিজের পরিবার ওর সাথে সেভাবে কখনও যোগাযোগ রাখেনি। অনেকটা হাল্কাভাবে মাদার সুপিরিয়র অ্যানালিয়ার অভিভাবক চাচাকে রূঢ় সত্যিটা বলে ফেলেন যে,“এই বোর্ডিং ইশকুলে অই একমাত্র শিক্ষার্থী যে কখনো কোন ছুটি উপভোগ করতে বাড়ি যেতে পারে না। এখানে এই মেয়েটিই একমাত্র একজন, যার কাছে পবিত্র ক্রিসমাসেও কখনও কোন উপহার আসে না, স্যার।”
“আদরযত্ন করে কোন শিশুকে বড় করে তোলার মত তেমন লোক নই আমি। কিন্তু আপনাকে নিশ্চিন্ত করছি যে, আমি আমার ভাইঝিকে সর্বোচ্চ সম্মানের সাথে রেখেছি। একজন বাবার মতো করে ওর সুবিধা অসুবিধাগুলো দেখাশুনা করছি। তবে কথাটা আপনি ঠিক বলেছেন। আমার ভাইঝির জন্য আরও বেশি স্নেহআদরের দরকার হয়ে পড়েছে; নারীরা অনেক আবেগপ্রবণ প্রাণী তাই তাদের যত্নও বেশি নিতে হয়।”
মাসখানেক পর অ্যানালিয়ার চাচা নিজেই আবার স্কুলে এসে হাজির হলেন। এবার তিনি তার ভাইঝিকে দেখতে আসেননি। শুধু মাদার সুপিরিয়রকে এটা জানিয়ে দেন যে, তার ছেলে অ্যানালিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। সেজন্য সে নিয়মিত চিঠি লিখবে। দয়া করে, চিঠিগুলো যেন অ্যানালিয়ার কাছে ভালোভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়, সেদিকে একটু নজরদারি করলে ভালো হয়। আশা করছি, চাচাতো ভাইয়ের সাথে এভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে, অ্যানালিয়ার সাথে ওর নিজের পারিবারিক বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সেই থেকে নিয়মিতভাবে চিঠি আসতে শুরু করে: সাদা কাগজের উপর কালো কালিতে গোল অক্ষরে টানা বলিষ্ঠ হাতের লেখা। কিছু কিছু চিঠিতে দেশের জীবন, ঋতু এবং বিভিন্ন প্রাণী এবং যে সমস্ত কবিরা মারা গেছেন, তাদের স্মৃতি এবং লেখালেখি বিষয়ে নানা গল্পগুজব সম্পর্কে লেখা থাকত। মাঝে মাঝে এনভেলাপের ভেতর কোন বই অথবা অই একই হাতের লেখায় কোন বিষয়ের উপর আঁকা ক্যালিগ্রাফি থাকত। অ্যানালিয়া সেগুলো না পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত, সংশ্লিষ্ট সবকিছুর পেছনে ওর চাচার কোন দুরাভিসন্ধি বা কোন না কোন বিপদ বা ক্ষতিকর উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু ইশকুলের একঘেয়েমি কাটাতে চিঠিগুলো হয়ে উঠেছিল ওর একমাত্র মুক্তির উপায়। চিঠিগুলো নিয়ে সে চিলেকোঠার ঘরে লুকিয়ে চলে আসত। এবার আর কল্পনার জগতের অসম্ভব কোন গল্প বানাতে নয় বরং চাচাত ভাইয়ের পাঠানো চিঠিগুলো পড়ে অক্ষরগুলোর গূঢ় অর্থ এবং কাগজের টেক্সচার ওর হৃদয় দিয়ে বোঝার চেষ্টা করত। যতক্ষণ না বুঝত, ততক্ষণ ও বার বার পড়ে যেত। তবে, প্রথমদিকে ও কোন উত্তর লেখেনি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আর রুদ্ধ করে রাখতে পারেনি। মাদার সুপিরিয়র চিঠিগুলো খুলে দেখতেন। তার সেন্সরশিপের হাত থেকে বাঁচতে, ক্রমে অদের চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু অত্যন্ত সূক্ষন এবং দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল। চিঠি লেখালেখির সূত্রে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। দুজনেই একটি গোপন সঙ্কেত দ্রুত আবিস্কার করে ফেলেছিল যার মাধ্যমে ওরা প্রেমের কথা লিখে প্রকাশ করতে শুরু করেছিল।
যদিও অ্যানালিয়া টেরেস চিঠিতে লুইস স্বাক্ষর করা তার চাচাতো ভাইটিকে কিছুতেই মনে করতে পারছিল না। কারণ ও যে সময়ে চাচার বাড়িতে থাকত, তখন বাড়ির তরুণ ছেলেরা পড়াশুনার উদ্দেশ্যে রাজধানী শহরে বসবাস করত। অবশ্য ও কল্পনা করে নিয়েছিল, এ হবে অসুন্দর, কুৎসিত, কিছুটা অসুস্থও হতে পারে কিম্বা হয়ত কুঁজওয়ালা কেউ হবে। কারণ এত চমৎকার গভীর অনুভূতি এবং স্বচ্ছ সচল মস্তিষ্ক সমন্বিত কোন মানুষের সাথে অতিসুন্দর চেহারার কারও মিল হতে পারা অসম্ভব বলে ওর মনে হচ্ছিল। মনে মনে চাচাতো ভাইয়ের একটি ছবি এঁকে নিয়েছিল; হবে হয়ত বাবার মতো মোটু, গুটিবসন্তের দাগে ভরা মুখ, খোঁড়া আর আংশিক টাক পড়া এমন কেউ। অ্যানালিয়া ওর এই কল্পনায় যত বেশি জঘন্য খারাপ খারাপ ত্রুটি যুক্ত করতে পেরেছে, ঠিক তত বেশি তাকে ভালোবেসে ডুবে যেতে চেয়েছে।
আত্মার দৃপ্তশক্তি থাকা সত্যিকারভাবে খুব দরকার। এই শক্তিই একমাত্র শুদ্ধ যা খারাপ সময়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে এবং বছরের পর বছর বাঁচার ইচ্ছাকে জাগিয়ে তোলে। তাই ওর কল্পগল্পে নায়কদের সৌন্দর্যকে গুণ হিসেবে গণ্য না করে বরং তুচ্ছ করে যুক্তি সাজিয়েছে। যদিও এই যুক্তি সম্পর্কে ও শেষপর্যন্ত অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেবল অবাক হয়ে ভেবেছে, প্রেমিকের কতখানি অঙ্গহানি থাকলে ও মেনে নিতে পারবে সে কথা!
অ্যানালিয়া এবং লুইসের চিঠিপত্র লেখালেখির এই পর্ব দুবছর ধরে চলেছিল। ওর একটি হ্যাটবক্স ভরে যায় চিঠিতে। আর অ্যানালিয়া হারিয়ে ফেলে ওর হৃদয়কে। কিন্তু এই সম্পর্কটি আসলে ওর চাচার বানানো পরিকল্পনার একটি অংশ। ওর বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সব সম্পত্তি নিশ্চিতভাবে যেন লুইসের হাতে চলে যায় সেজন্য চাচাই এমন পরিকল্পনা করেছে --- এই ভাবনাটি যখনই ওর মনের ভেতর খেলে যায় ও তখন এরকম হীন এবং নীচ ভাবনাকে সলজ্জ দ্বিধায় বাতিল করে দেয়। ওর আঠারোতম জন্মদিনে মাদার সুপিরিয়র ওকে ডেকে নিয়ে জানান, ওর সাথে দেখা করার জন্য একজন ভিজিটর অপেক্ষা করছে। অ্যানালিয়া টরেস বুঝতে পারে, কে হতে পারে এই ভিজিটর; অই মুহুর্তে আবেগের তাড়নায় ওর মনে হয়েছিল, ছুটে পালিয়ে লুকিয়ে পড়ে বিস্মৃত সন্তদের চিলেকোঠায়। এতদিন যে লোকটিকে কল্পনা করে এসেছে, অবশেষে আজ মুখোমুখি দেখা হওয়ার সেই চূড়ান্ত দিনটি চলে আসায় মোহনীয় এক আতঙ্ক অনুভব করে। এই মোহ কাটতে ওর কয়েক মিনিট লেগে যায়। শেষপর্যন্ত ড্রয়িংরুমে এসে ও লোকটির সামনে এসে দাঁড়ায়।
এতদিন যাকে স্বপ্নকল্পনায় এঁকে ও ভালোবেসে ফেলেছে; লুইস টেরেস সে রকম কোন বিকৃত বামন সদৃশ্য লোক ছিল না। লুইস ছিল সুগঠিত এবং সুন্দর মুখের একজন মানুষ। শক্তপোক্ত, ঘন রঙের নির্মল বালকোচিত মুখের অধিকারী, সুন্দর করে ছাঁটা ছিল তার দাড়ি। চোখের রঙ ছিল হালকা এবং লম্বা পাঁপড়িতে ঘেরা যদিও তা ছিল অভিব্যক্তি প্রকাশে ব্যর্থ। দেখতে কিছুটা চ্যাপালের সন্তদের মতো লাগলেও--- আসলে লুইস ছিল অনেক সুন্দর এবং খানিকটা সরল মনের। অ্যানালিয়া প্রাথমিক অভিঘাতের লজ্জা কাটিয়ে ওঠে এবং অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে সিদ্ধান্ত নেয়, সে যদি মনে মনে একজন কুঁজোকে গ্রহন করতে পারে, তবে এই ভদ্র মার্জিত সুন্দর তরুণটিকে, যে কিনা ল্যাভেন্ডার সুগন্ধির প্রলম্বিত গভীর সুবাস ছড়িয়ে ওর এক গালে চুমু দিয়েছে তাকে ও আরও অনেক বেশি ভালোবাসতে পারবে।
********
কিন্তু অ্যানালিয়ার যেদিন বিয়ে হয়, সেদিন থেকেই ওর স্বমী লুইস টরেসকে ও ঘৃণা করতে শুরু করে। যখন সূচিসুতার কাজ করা শিল্পীত চাদর বিছানো নরম বিছানায় লুইস ওকে আলিঙ্গনআদরে পিষে ফেলছিল,তখনই বুঝে যায়,ও আসলে একটি ভূতের প্রেমে পড়েছিল। ওর কল্পনা, আবেগের সাথে যে মধুরতা ছিল, বিয়ের বাস্তবতার সাথে কখনই মেলানো সম্ভব হবে না।
ও অবশ্য অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এইসব আবেগ অনুভূতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। প্রথমে এসব চিন্তাকে অনৈতিক এবং অসৎ হিসেবে তার মন থেকে বের করে দেয়। তাতেও যখন এই চিন্তাকে কিছুতেই বেশিদিন উপেক্ষা করে থাকতে পারছিল না,তখন নিজের আত্মার অন্তঃস্থলে প্রবেশ করে শিকড়সুদ্ধ টেনে উপড়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করে। লুইস খুবই অমায়িক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল। এমনকি মাঝে মাঝে প্রচুর আমোদপ্রমোদ করা ফুর্তিবাজ পুর্ণপ্রাণের একজন মানুষ ছিল লুইস। কখনও কোন রকমের অন্যায় বা অস্বস্তি রকমের দাবিদাওয়া করে অ্যানালিয়াকে হয়রানি করেনি। এমনকি অ্যানালিয়ার নীরব নিশ্চুপ স্বভাবের পরিবর্তন করারও চেষ্টা করেনি। অ্যানালিয়া নিজেই তার সন্ত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে স্বীকার করে, ও যদি নিজেই সামান্য আগ্রহ প্রকাশ করত তাহলে ওদের দুজনের সম্পর্কটি হয়ত কিছুটা সুখের হতে পারত।
ওদের দেখা হওয়ার আগে, দুবছর ধরে যে মানুষটিকে ও ভালোবাসত এখন তার প্রতি এক অদ্ভুতরকমের বিতৃষ্ণা অনুভব করে। কেন করে তার কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ও জানে না। ও না পারে এই আবেগকে ভাষায় প্রকাশ করতে আবার যদি পারতও তবে বলার কেউ ছিল না। অ্যানালিয়া ওর রক্তমাংসের দেহধারী স্বামীর সাথে প্রেমপত্র লেখার প্রেমিকটিকে কিছুতেই মেলাতে পারে না। একারণে ও বিশ্বাস করে যে, ওর সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। তাছাড়া লুইস বিয়ের আগে লেখা চিঠিগুলোর কথা ঘুণাক্ষরেও মনে করে না। কথা প্রসঙ্গে যদি কখনও চিঠিগুলোর বিষয় ও তুলে আনে, লুইস তখন সাথে সাথে ওর ঠোঁটে দ্রুত চুমু খেয়ে বিষয়টি বন্ধ করে দেয়। তারপর নানা রকমের বিপরীত ভাবপ্রকাশ করে জানায়, বিবাহিত জীবনের জন্য এসব রোমান্টিক প্রেমট্রেম ঠিক নয়। কিশোর প্রেমের প্রেমপত্রের চাইতে বিবাহিত জীবনে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, শেয়ার করার মানসিকতা এবং পরিবারের মঙ্গল বজায় রাখাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আসলে ওদের মধ্যে সত্যিকারের ভালোবাসা গড়ে উঠেনি। দিনের বেলায় যেমন তেমন নিজেদের কাজ নিয়ে ওরা ব্যস্ত থাকলেও রাতে ঘুমাতে গিয়ে পালকের মতো নরম বিছানায় ওদের দেখা হত। তখন কনভেন্ট ইশকুলের খাটে একা ঘুমাতে অভ্যস্ত অ্যানালিয়ার মনে হত, ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে। মাঝে মাঝে তীব্র আশ্লেষে ওদের শারীরিক মিলনের সময় অ্যানালিয়া সাড়াশব্দহীন চরম বিরক্তিতে নিস্তেজ হয়ে থাকত। আর লুইসকে মনে হত, অন্য কোন উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে ওর শারিরীক চাহিদার তৃপ্তি এভাবে মিটিয়ে নিচ্ছে। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যেত লুইস। কিন্তু গলার কাছে এঁটে থাকা রুদ্ধ প্রতিবাদ নিয়ে ক্ষুব্ধ অ্যানালিয়া অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকত। অ্যানালিয়া অবশ্য নানা উপায়ে চেষ্টা করেছিল স্বামীর উপর ওর জমে থাকা ক্ষোভ দূর করার জন্য। শুধুমাত্র ভালোবাসার জন্য অ্যানালিয়া দৃঢ় সংকল্প নিয়ে স্বামীর প্রতিটি বিষয়কে স্মৃতির কোঠায় ছেঁকে নিয়েছিল। যদিও তার মন ছিল শুন্য এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবনকে সে এমন একটি মাত্রায় নিয়ে গেছিল যেখানে লুইস কোনদিনই ওর কাছে পৌঁছাতে পারেনি। অ্যানালিয়া প্রার্থনা করত, স্বামীর উপর ওর এই ঘৃণা বিদ্বেষ যেন কেটে যায়; যেন সাময়িক হয় এই বিতৃষ্ণা; কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেলেও আকাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ও পায়নি। বরং তার আকাঙ্ক্ষিত প্রার্থনা চরম ঘৃণার বিদ্বেষ থেকে পরিণত হয়েছিল তীব্র বিতৃষ্ণায়। এক রাতে ও স্বপ্নে দেখে, আঙ্গুলে কালি মাখা একজন জঘন্য পুরুষ ওকে খুব আদরে পিষ্ট করছে।
অ্যানালিয়ার বাবা যে সম্পত্তি অধিগ্রহন করেছিল টরেস পরিবার সেখানেই বসবাস করত। একসময় এই অঞ্চলটি ছিল ডাকাত-দস্যু এবং সৈন্যদের আধিপত্যে থাকা একটি অর্ধ সভ্য অঞ্চল। বর্তমানে অঞ্চলটি একটি মহাসড়কের কাছাকাছি এবং একটি সমৃদ্ধ শহরের সামান্য দূরে হওয়ায় কৃষিসামগ্রী এবং গবাদিপশু প্রদর্শনীর বার্ষিক নির্দিষ্ট স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই সম্পত্তির আইনত পরিচালক ছিল লুইস। কিন্তু বাস্তবে দেখা যেত অ্যানালিয়ার চাচা ইউজেনিও টরেস এই সম্পত্তির সমস্তরকমের কাজকর্ম করত। কারণ দেশ গাঁয়ের জীবনযাপনের খুঁটিনাটি নানা বিষয় নিয়ে লুইস ছিল চরম বিরক্ত। দুপুরের খাবার খেয়ে যখন বাবা এবং ছেলে লাইব্রেরিতে বসে কগনাক পান করতে করতে ঘুঁটি খেলত, তখন অ্যানালিয়া শুনত তার চাচা বিনিয়োগ, পশুপালন, ফসলফলন এবং শস্যকাটা, গোলাজাত করা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করছে। কখনও সখনও সাহস করে ও যদি কোন মতামত জানায়, তো দুজনেই খুব আগ্রহে ওর কথা শুনে আশ্বাস দিত যে, অ্যানালিয়ার পরামর্শ শুনে এবার থেকে ওরা কাজ করবে। কিন্ত দেখা যেত, আগের মতই তারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। এসব মুহুর্তে অ্যানালিয়ার মনে হত, সে যদি পুরুষ হত, তবে তক্ষুণি পাহাড়ের পায়ের কাছে ছড়ানো চারণভূমিতে ছুটে চলে যেত।
একটি পুত্রসন্তান জন্মের পরেও স্বামীর প্রতি অ্যানালিয়ার মনোভাবের কোন উন্নতি হয়নি। গর্ভ অবস্থায় স্বামিকে দূরে রাখার ছ্যানছ্যান স্বভাব আরও বেশি বেড়ে যায়। কিন্তু ওর এই অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী ভেবে লুইস খুবই সহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। সে জন্য নানাকিছু নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত করে রাখত। শিশুটি জন্মের পর অ্যানালিয়া আলাদা রুমে চলে গেল। সেখানে একটি শক্ত সরু খাট ছাড়া আর কোন আসবাবপত্র ও রাখেনি। এমন কি শিশুটির এক বছর বয়েস হয়ে যাওয়ার পরেও সে রুমের দরোজা বন্ধ করে রাখত এবং স্বামীর সাথে একাকী থাকতে হবে এমন যে কোন অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলত। লুইস ভেবেছিল, স্ত্রীর মানসিক চিকিৎসার জন্য আরও সময় দেওয়া দরকার। তবে স্ত্রীকে সতর্ক করে লুইস বলেছিল গুলি করে তালা ভাঙ্গার আগে অ্যানালিয়ার আচরণ পরিবর্তন করলে ভালো হয়। লুইসকে এতখানি রেগে যেতে কখনও দেখেনি অ্যানালিয়া। ফলে কোনকিছু না বলে সে তার কথা মেনে নেয়। পরের সাতটি বছর তাদের দুজনের মধ্যেকার চাপা উত্তেজনা প্রচুর মাত্রায় বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তারা দেখতে পায় যে, দুজনেই তারা পরস্পর পরস্পরের গোপন শত্রুতে পরিণত হয়ে গেছে। যদিও মানুষ হিসেবে সভ্য ভদ্র হওয়ায় অন্যান্যদের সামনে দুজনেই একে অন্যের সাথে অতিরিক্ত ভালো ব্যবহার করে। শুধু ওদের বাচ্চাছেলেটি তার মাবাবার এই শত্রুতার মাত্রা বুঝতে পেরে মাঝরাতে প্রায়ই কাঁদতে কাঁদতে জেগে ওঠে। কারণ সে পেশাব করে বিছানা ভিজিয়ে ফেলেছে। অ্যানালিয়া একটি পাথুরে আবরণের মধ্যে নিজেকে বদ্ধ করে রেখেছিল; বুঝতে পারছিল ভেতরে ভেতরে সে রসকষহীন অনার্দ্র হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে লুইস আরও বেশি প্রগলভ এবং দায়িত্বহীন হয়ে উঠছিল; নিজের অনেক রকমের প্রবৃত্তি ত্যাগ করলেও প্রচুর মদ খেতে শুরু করে। অসহ্য লাগায় কিছুদিনের জন্য সে কোথাও পালিয়েও গেছিল। লুইস যখন তার মদ্যপ চেহারা আর লুকিয়ে রাখতে পারছিল না, অ্যানালিয়া তখন তার থেকে দূরে থাকার মোক্ষম যুক্তি খুঁজে পেয়েছিল। ক্রমে জমিজমা চাষাবাসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিল লুইস; তাতে খুশি হয়ে তার স্ত্রী অ্যানালিয়া তার জায়গায় চলে এসেছিল। রবিবার দিন ইউজেনিওচাচা রাতের খাওয়া শেষে যখন ওর সাথে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আলোচনায় বসত, লুইস তখন বিকেলের ঘুম থেকে ঘেমেনেয়ে জেগে রাতের জন্য তৈরি হত। ওর পেট ব্যাথায় ফুলে উঠলেও বন্ধুদের সাথে নতুন করে আনন্দ উদযাপনের জন্য ও প্রস্তুত হত।
অ্যানালিয়া ওর ছেলেকে লেখালিখি এবং পাটিগণিতের মূলসূত্র শেখায় এবং বই পড়ার দিকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে। ছেলেটির সাত বছর বয়েসে, লুইস সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সময় হয়েছে মায়ের আঁচল ছাড়িয়ে এবার ছেলেটিকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি করে দেওয়ার। যেন দ্রুত বড় হয়ে উঠতে পারে এই ভেবে সে ছেলেটিকে রাজধানীর ইশকুলে পাঠাতে চাইলে অ্যানালিয়া প্রচন্ডভাবে তার বিরোধিতা করে। ফলে বাধ্য হয়ে লুইসকে নরমনীতি গ্রহন করে কাছের শহরের এক ইশকুলে ছেলেকে ভর্তি করা হয়। সোম থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ছেলেকে থাকতে হয় সেখানে। শনিবার সকালে একটি গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হত ওকে বাড়িতে নিয়ে আসা্র জন্য। প্রথম সপ্তাহ ধরে অ্যানালিয়া খুব উদ্বেগের সাথে ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করছিল। ও আসলে যে কোন একটি অজুহাত খুঁজছিল যাতে ছেলেটিকে ওর কাছে এনে রাখতে পারে। কিন্তু সেরকম কিছুই খুঁজে পায়নি। বরং ছেলেটিকে খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছিল। শিক্ষক এবং ক্লাশের বন্ধুদের সম্পর্কে এমন উৎসাহ এবং আনন্দের সঙ্গে গল্প করছিল যেন সবাই ওর বহুদিনের চেনাজানা। এমনকি বিছানায় পেশাব করার অভ্যাসও বন্ধ হয়ে গেছিল। তিন মাস পর, পড়াশুনায় ভালো করার জন্য শিক্ষকের কাছ থেকে অভিনন্দনসহ প্রথম একটি ক্ষুদ্র রিপোর্ট কার্ড নিয়ে ছেলেটি বাড়ি আসে। অ্যানালিয়া রিপোর্টকার্ড পড়ে চমকে কেঁপে উঠে। বহুদিন বাদে এই প্রথম ওর মুখে হাসি দেখা যায়। উচ্ছ্রসিত আনন্দে ও ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তার ইশকুল সম্পর্কে হাজারটা প্রশ্ন করতে থাকে ; ছাত্রাবাসগুলো কেমন রে, সেখানে কি কি খেতে দেয়, রাতে খাবারগুলো ঠান্ডা থাকে কিনা, ওর কতজন বন্ধু হয়েছে আর সেখানকার শিক্ষকরা সবাই কেমন? এতদিন পর অ্যানালিয়াকে অনেক নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছিল। এরপর ছেলেকে ইশকুল থেকে ছাড়িয়ে আনার কথা মুখেও আনেনি। যত মাস যেতে থাকে ছেলেটি আরও ভালো রেজাল্ট করতে থাকে। অ্যানালিয়া ছেলের রেজাল্ট কার্ডগুলো গুপ্তধনের মতো জমিয়ে রাখে। কৃতজ্ঞতা আর খুশিতে ও ছেলের ক্লাশের সব শিক্ষার্থীদের জন্য জার ভর্তি মোরাব্বা এবং ফল পাঠিয়ে দেয়। এখন আর এটা ভাবতে চায় না যে, এই সমঝোতা কেবলমাত্র ছেলেটির প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত টিকে থাকবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ওর ছেলেকে শহরের ইশকুলে পাঠাতে হবে এবং এটা ও কিছুতেই এড়াতে পারবে না। তখন কেবলমাত্র ছুটির সময় ও ছেলেকে দেখতে পাবে।
একরাতে প্রচুর মদ গিলে মত্ত অবস্থায় অন্যের ঘোড়ার পিঠে চড়ে লুইস তার মাতাল বন্ধুদের ঘোড়া চালনার দক্ষতা দেখাতে বৃত্তাকারে ঘুরছিল। সে সময় ঘোড়াটি তাকে ছুঁড়ে ফেলে লাথি মেরে ওর অন্ডকোষ চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। আহত জায়গায় সংক্রমণ ধরে যাওয়ায় সুস্থ করে তুলতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শহরের বড় হাসপাতালে। সেখানে অসম্ভব ব্যাথায় টানা নয় দিন ধরে তীব্র আর্তনাদ করে শেষপর্যন্ত লুইস মারা যায়। সে সময় ওর পাশে ছিল স্ত্রী অ্যানালিয়া। যে ভালোবাসা স্বামীকে দেওয়া উচিত ছিল, তা কখনও দিতে না পারার অপরাধে এবং প্রতি মুহুর্তে এখন আর স্বামীর মৃত্যু কামনা করতে হবে না-- সেই কুচিন্তা থেকে মুক্তির আনন্দে ও কাঁদছিল। কফিনবন্দী স্বামীকে নিজ মাটিতে কবর দেওয়ার আগে অ্যানালিয়া একটি সাদা পোশাক কিনে ওর স্যুটকেসের একেবারে নীচে প্যাকেট করে রেখেছিল। যদিও বাড়িতে এসেছিল,বিধবার শোক চিহ্নিত কালো পোশাক পরে। লম্বা ঘোমটায় মুখ ঢেকে রেখেছিল। সে জন্য ওর চোখে খেলে যাওয়া অভিব্যক্তি যে কি ধরণের ছিল তা কেউ দেখতে পায়নি। বাবার শবযাত্রার সময়, শোকের কালো পোশাক পরা ছেলের হাত ও শক্ত করে ধরে রেখেছিল। এই সবকিছু মিটে যাওয়ার পর সত্তর বছর বয়েসি, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ইউজেনিও চাচা তার পুত্রবধু অ্যানালিয়ার কাছে প্রস্তাব দেয়, গ্রামের জমিজমা ছেড়ে, সেই আয়ে তার ছেলেকে নিয়ে অ্যানালিয়ার উচিত শহরে গিয়ে বাস করা। শহরে ছেলেটি ভালোভাবে তার পড়াশুনা শেষ করতে পারবে এবং অ্যানালিয়াও ওর জীবনে ঘটে যাওয়া অতীতের দুঃখবেদনাকে ভুলে যেতে পারবে।
তিনি বলেছিলেন, ‘অ্যানালিয়া, আমি কিছুতেই একথা ভুলতে পারিনা যে, আমার গোবেচারা ছেলে লুইস আর তুমি এক সাথে কখনো সুখী জীবন কাটাওনি।’
‘আপনি সত্য কথাই বলেছেন চাচা। লুইস প্রথম দিন থেকেই আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’
‘ঈশ্বরের দোহাই মামণি, ও সবসময় তোমাকে উপর সদয় ছিল এবং তোমাকে অনেক সম্মানের সঙ্গে দেখেছে। সত্যি বলতে কি, লুইস খুব ভালো একজন স্বামী ছিল। আর পুরুষমানুষের ওরকম একটুআধটু বাজে অভ্যাস থাকে সেগুলো ধরতে নেই মা।”
‘আমি যা বলছি আপনি বুঝতে পারেননি। আমি একটি ক্ষমার অযোগ্য শঠতার কথা বলছি।’
“দেখো বাছা, আমি এসবকিছু জানতে চাইছি না। যাই ঘটুকনা কেন, আমার মনে হয় তুমি ছেলেটিকে নিয়ে শহরে অনেক ভালো থাকবে। এর চেয়ে বেশি তুমি আর কি চাও। এখানকার জমিজমাগুলো আমি ভালো করেই দেখাশুনা করতে পারব। আমার বয়েস হয়েছে, বুড়ো মানুষ, কিন্তু এখনও আমার শরীরে অনেক শক্তি আছে। ইচ্ছে করলে যে কোন সময় আমি একটি ছোটখাটো ষাঁড়কে ছুঁড়ে ফেলতে পারি।’
‘আমি এখানেই থাকব। আমার ছেলেও আমার সাথে এখানে থাকবে। কারণ এই জায়গায় কাজ করার জন্য তাকে আমার দরকার আছে। আজকাল আমি ঘরের চাইতে জমিতে বেশি সময়ের জন্য কাজ করছি। এখন থেকে যে ব্যতিক্রম কাজটি হবে তা হলো, অন্যদের তাবেদারি ছাড়া সমস্ত কাজের সব সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নেব। আসলে জমি ত আমার নিজের। ভেবে দেখলাম, এবার আপনাকে আমি চলে যাওয়ার জন্য শুভবিদায় বলতেই পারি, ইউজেনিও চাচা।’
অ্যানালিয়া তার নতুন জীবনকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কয়েক সপ্তাহের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমেই ও যে কাজটি শুরু করে তা হল, স্বামী সাহচর্চে কাটানো বিছানার চাদরগুলো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলে, সেই সরু খাটটিকে মূল বেডরুমে সরিয়ে আনে। এরপর গ্রামের বাড়িসহ জমিজমার হিসেবগুলো খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ওর মোট সম্পত্তির সঠিক পরিমাণ বের করে ফেলে। এবার এগুলো দেখাশুনা করার জন্য এমন একজন তত্ত্বাবধায়ক খুঁজতে শুরু করে, যাকে যখন ও যা করতে আদেশ করবে, সে কোন প্রকার প্রশ্ন না তুলে সেগুলো পালন করে যাবে। এবার যখন ও বুঝতে পারে, সবকিছুই অতিসহজভাবে ওর আয়ত্বে চলে এসেছে, তখন সুটকেসের ভেতরে রাখা সাদা পোশাকটি বের করে নিখুঁতভাবে ইস্তিরি করে, সেটি সুন্দর করে পরে, হাতে একটি হ্যাটবক্স নিয়ে ও ছেলের ইশকুলে রওনা দেয়।
অ্যানালিয়া টরেস ইশকুল ছুটির শেষ ঘন্টা পড়ার জন্য দীর্ঘ পাঁচঘন্টা ইশকুলের প্রাঙ্গণে অপেক্ষা করে বসে থাকে। শেষ ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে বন্যার পানির মত অসংখ্যা শিক্ষার্থী খেলাধুলা করার জন্য বেরিয়ে আসে। তাদের মধ্যে ওর ছেলেও ছিল। মাকে মাকে দেখে ছেলেটি প্রথমে চমকে ওঠে। কারণ এই প্রথম ওর মা এই ইশকুলে এসেছে।
‘তোমার ক্লাশরুম কোথায় আমাকে দেখাও তো। আর, চলো, আমি তোমার শিক্ষকের সঙ্গেও দেখা করতে চাই’’— ছেলেকে জানায় অ্যানালিয়া।
ক্লাশরুমের দরোজার কাছে এসে ও ছেলেকে চলে যেতে ইশারা করে। কারণ এটি ছিল খুব ব্যক্তিগত বিষয়। এবার একা হেঁটে ভেতরে চলে আসে। দেয়াল জুড়ে ম্যাপ এবং জীববিজ্ঞানের চার্ট আঁকা উঁচু সিলিঙের একটি বিশাল রুমের ভেতরে ও নিজেকে দেখতে পায়। ওর নাকে ভেসে আসে সেই ঘামের গন্ধ, সেই গাদাগাদি অবস্থা যা নিজের অতি শৈশবকাল থেকে ও পেয়ে এসেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই বদ্ধ ঘেমো গন্ধে এখন ওর বিরক্ত লাগছে না। বরং খুব আনদের সাথে ও একটি নিঃশ্বাস নেয়। ইশকুল খোলা থাকায় ক্লাশ চলছিল বলে ডেস্কগুলো ছিল এলোমেলো, মেঝেতে কাগজের ছড়াছড়ি, কালির দোয়াতগুলো ছিল ক্যাপ খোলা অবস্থায়। এমনকি ব্লাকবোর্ডে লেখা অঙ্কের কলামগুলো তখনও মুছে ফেলা হয়নি। রুমের সামনের দিকে মেজে থেকে উঁচু একটি ডেস্কে একজন শিক্ষক বসেছিলেন। শিক্ষকটি অবাক হয়ে অ্যানালিয়াকে দেখেও উঠে দাঁড়ালেন না। কারণ তার ক্রাচ দুটো বেশ দূরে রাখা ছিল। সেগুলো নিতে হলে তাকে চেয়ার পেরিয়ে যেতে হবে। অ্যানালিয়া দুই সারি ডেস্কের মাঝখান দিয়ে হেঁটে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
‘আমি টরেসের মা।’ এরচেয়ে ভালো আর কিছু ও ভাবতে পারছিল না।
‘শুভ বিকেল সেনোরা। আপনার পাঠানো জ্যাম এবং ফলের জন্য এবার আপনাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।’
‘ওগুলো আপনি ভুলে যেতে পারেন। আমি এখানে সৌজন্য বদলাবদলি করতে আসিনি।’ অ্যানালিয়া ডেস্কের উপর হ্যাটবক্সটি রেখে বলে, “আমি এখানে এসেছি একটি হিসেবের নিস্পত্তি করতে।”
“সে আবার কী ?”
অ্যানালিয়া বাক্স খুলে বহু বছর ধরে সযত্নে জমিয়ে রাখা প্রেমপত্রগুলো বের করে তাকে দেয়। তিনি অনেকক্ষণ ধরে স্তুপ করে রাখা এনভেলাপগুলো পড়তে থাকে।
অ্যানালিয়া তাকে বলে, ‘আমার জীবনের এগারোটি বছর ধরে আপনি আমাকে ঋণী করে রেখেছেন।’
শিক্ষকটি যখন কথা বলার শক্তি খুঁজে পায়, তখন নার্ভাস হয়ে তুতলে বলেছিল, “ক্কি—কিভাবে বুঝলেন যে এগুলো আমিই লিখেছি।”
“আমার যেদিন বিয়ে হয়, সেদিনই আমি বুঝে গেছিলাম, এই চিঠিগুলো কিছুতেই আমার স্বামী লিখতে পারে না। আর যেদিন আমার ছেলে ইশকুল থেকে প্রথম রিপোর্ট কার্ড নিয়ে বাড়িতে এসেছিল, হাতের লেখা দেখে আমি তখনই চিনে ফেলেছিলাম। আর এখন তোমাকে দেখে আমি একবারেই নিশ্চিত হয়ে গেছি। আমি ত আমার ষোলো বছর বয়েস থেকে তোমাকে স্বপ্নে দেখে আসছি। তুমি কেন এটা করলে?”
“লুইস টেরেস ছিল আমার বন্ধু। ও আমাকে অনুরোধ করে ওর হয়ে ওর চাচাতো বোনের কাছে প্রেমপত্র লিখে দিতে। এ কাজে আমি ক্ষতিকর কোন অসুবিধে দেখিনি। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় চিঠি পর্যন্ত এটা তেমন কিছু আলাদা বৈচিত্র্যেরও ব্যাপার ছিল না। কিন্তু তুমি যখন উত্তর পাঠালে তখন চিঠি না লিখে ফিরে আসা আমার পক্ষে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অই দুটি বছর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল। শুধুমাত্র জীবনের অই একটি সময়, আমি কোন কিছুর জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে গেছি। আমি তোমার চিঠির অপেক্ষায় থাকতাম।’
‘আহ্,
‘তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?’
‘সেটা এখন তোমার উপর নির্ভর করছে’—অ্যানালিয়া তার হাতে ক্রাচদুটি তুলে দিয়ে জানায়।
অ্যানালিয়ার কথা শুনে স্কুলমাস্টারটি তার জ্যাকেট পরে উঠে দাঁড়ায়। এরপর তারা এক সঙ্গে কোলাহল মুখর ইশকুল প্রাঙ্গণে বেরিয়ে আসে। যেখানে একটি অস্তগামী সূর্য তখনও জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল।


0 মন্তব্যসমূহ