ঔরঙ্গজেবের জন্মের পার দাহোদ থেকে কোথায় গেলো মোঘলদের চলমান বাদশাহী তাঁবু ? আচার্য যদুনাথ লিখছেন মালওয়ার রাজধানী উজ্জয়িনীতে। তবে জাহাঙ্গীরনামা অনুসরণ করলে হয়তো বা পৌঁছনো যেতে পারে আরো দেড়শো কিলোমিটারেরও বেশি দূরে মান্ডুর প্রাচীন পাহাড়ি কেল্লায়। নবম দশম শতকে এখনকার গুজরাট, মহারাষ্ট্র আর মধ্যপ্রদেশের শাসক গুর্জ্জর প্রতিহার রাজবংশের অধীনে ছিল ওই অঞ্চল , শিলালিপি তাই বলতে থাকে। সেটাই এই কেল্লা ও মালওয়ার প্রাপ্ত ইতিহাসের শুরুয়াত। এরপর এ অঞ্চল ছিল পরমার রাজবংশের শাসনে। বহু বিদ্যা পারঙ্গম দার্শনিক রাজা ভোজের শাসনে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়েছিল তাঁর রাজধানী এখনকার মধ্যপ্রদেশের ধার শহর, মান্ডুর কাছেই - মাত্র চল্লিশ কিলোমিটারের হাতায়। এরপর আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি আইনুল মুলক মুলতানি তেরশো পাঁচ সালে মালওয়া দখল করেন। এই যুদ্ধে এক চর, ফার্সিতে দিদবানই, কি আসল হিরো ? যে উঁচু কেল্লা টপকাতে অপারগ আক্রমণকারীদের গোপন রাস্তা দেখায় ? আমির খুসরু প্রলুব্ধ হচ্ছেন খাইজাল উল ফুতু গ্রন্থ রচনা করতে যেখানে জয়ের মাহাত্ম্য ছাপিয়ে দুর্ভেদ্য মান্ডুর এই কেল্লা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে দিল্লীর দিকে তাকাচ্ছে ,দিল্লী কেন্দ্রিক ইতিহাসের প্রতিস্পর্ধী হয়ে। কালক্রমে তুঘলকদের হাত ফিরে স্থানীয় সুলতানদের দখলে রইল মালওয়া তথা মান্ডুর কেল্লা যতক্ষণ না আকবরের সেনাপতি আধম খান মান্ডুর প্রতিরোধ চূর্ন করলেন বীভৎস আগ্রাসনে। জাহাঙ্গীর মালওয়ার অপূর্ব নদী , পাহাড়, ঘন জঙ্গলের প্রাকৃতিক শোভা পছন্দ করতেন। এখানের জঙ্গলে হাতির পিঠে চড়ে নূর জাহানের ছ গুলিতে চার চারটে বাঘ শিকারের গল্প তিনি জাহাঙ্গীরনামাতে সবিস্তারে লিখেছেন ।এখানেই বেদান্তবাদী সাধু জাদরুপের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। জাহাঙ্গীর জাদরুপকে বললেন ,' একি !'
----- আশ্চর্য হচ্ছেন জাহাঁপনা।
----- হব না ?
----- থাকেন কি করে এখানে !
----- কোথায় ?
----- এই পাহাড়ে , এই ছোট্ট কোঠরে।
----- এর মাপ করবেন - বড় না ছোট ?
জাহাঙ্গীর মাপ করেছিলেন , লিখে রেখেছেন জাহাঙ্গীরনামায় , নিখুঁত মাপ ছ ফুট বাই তিন বাই দুই। সেখানেই থাকেন জাদরুপ। সর্বত্যাগী সাধুর সঙ্গে পাথুরে মেঝেতে বসে আছেন বাদশাহ, ছবি আছে। 'উনি বেদান্তের মহা পণ্ডিত যেটা কিনা সুফি মতবাদই( তাসাবুউফ ) বটে।' লিখছেন তিনি। মান্ডুর এই কেল্লার ভালো রকম বিবরণও আমরা তার লেখায় পাই। কেল্লা মেরামতে লাখ তিনেক টাকা খরচ করেছিলেন তিনি। কেল্লার ভিতরে বা বাইরের তাঁবুতে বাদশাহ থাকতেন। এতসব থেকে ঔরঙ্গজেবের রাজকীয় জন্মোৎসব হয়তো মান্ডুর ঐতিহাসিক কেল্লাতেই হয়েছিল এমনটা ভাবা যাবে না কি ?
----- আশ্চর্য হচ্ছেন জাহাঁপনা।
----- হব না ?
----- থাকেন কি করে এখানে !
----- কোথায় ?
----- এই পাহাড়ে , এই ছোট্ট কোঠরে।
----- এর মাপ করবেন - বড় না ছোট ?
জাহাঙ্গীর মাপ করেছিলেন , লিখে রেখেছেন জাহাঙ্গীরনামায় , নিখুঁত মাপ ছ ফুট বাই তিন বাই দুই। সেখানেই থাকেন জাদরুপ। সর্বত্যাগী সাধুর সঙ্গে পাথুরে মেঝেতে বসে আছেন বাদশাহ, ছবি আছে। 'উনি বেদান্তের মহা পণ্ডিত যেটা কিনা সুফি মতবাদই( তাসাবুউফ ) বটে।' লিখছেন তিনি। মান্ডুর এই কেল্লার ভালো রকম বিবরণও আমরা তার লেখায় পাই। কেল্লা মেরামতে লাখ তিনেক টাকা খরচ করেছিলেন তিনি। কেল্লার ভিতরে বা বাইরের তাঁবুতে বাদশাহ থাকতেন। এতসব থেকে ঔরঙ্গজেবের রাজকীয় জন্মোৎসব হয়তো মান্ডুর ঐতিহাসিক কেল্লাতেই হয়েছিল এমনটা ভাবা যাবে না কি ?
মালিক অম্বরের বিরুদ্ধে মোঘলদের লড়াইয়ের এক দীর্ঘ ইতিহাস। আহমদনগর সুলতানকে সামনে রেখে বিপুল ও প্রবল মোঘল ফৌজের সঙ্গে আমনেসামনে লড়াই বারবার এড়িয়ে দ্রুতগামী হঠাৎ আক্রমণের এক অজানা রণকৌশল অনুসরণ করছিলেন এই অনন্য আবিসিনিও সিপাহসালার। একদিকে দিল্লির গাজোয়ারির বিরুদ্ধে আহমদনগরের স্থানীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে প্রজাদের আস্থা অর্জন অন্যদিকে দাক্ষিণাত্যের টেরেন উপোযোগী সেনা পরিচালনা এ দুয়ের ফলে তাঁকে হারানো সম্ভব হচ্ছিল না জাহাঙ্গীরের পক্ষে। এই লড়াই করতেই খান আব্দুল রহিম খান ই খানানকে পাঠানো হয়। তিনি কিছুটা সাফল্য পাওয়ায় আরো জোরদার রণকৌশল পরিচালন করতে শাহাজাদা খুররামকে পাঠানো হয় দাক্ষিণাত্যে। অম্বরেকে বেকায়দা করে হারানো এলাকা ফেরাতে সক্ষম হওয়ায় শাহাজাদা, শাজাহান বা জগতের শাসক উপাধি পেলেন। মান্ডুর কেল্লা থেকে প্রশিক্ষিত পায়রারা জাহাঙ্গীরের খত নিয়ে উড়ে যেত খুররামের কাছে বুরহানপুর কেল্লায়। দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ পরিস্থিতির হাল হকিকত জানিয়ে বাদশাহকে উত্তর পাঠাতে হত। দুই খতের মধ্যে একটা অন্তর থাকে আর থাকে চরম অনিশ্চেয়তা। কি ভাবছেন শাজাহান ? শাসকের উপাধি তো উপমাই বটে। পণ্য সমাজের লোগোর মতো প্রাক আধুনিক সপ্তদশ শতকে উপাধির ছড়াছড়ি। উপাধির বাস্তবতা নিয়ে ভাবছেন তিনি ? খুররাম এখনো মির্জাই রয়েছেন, নেহাতই শাহাজাদা । পায়রার বয়ে নিয়ে যাওয়া দুই খতের মধ্যেকার অনিশ্চেয়তার মতো তাঁর ভাগ্যও হাওয়ায় দুলছে। দরবারের ভেতরে আর বাইরে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছেন নূর জাহান। যদিও মুমতাজ নূরের প্রাণাধিক তবু নিজের আগের পক্ষের মেয়ে লাডলি বেগমের শাদী হবে যে শাহজাদার সঙ্গে সেই তো এগিয়ে থাকবে তখ্তের দিকে। তখন উপাধি কোন কাজে আসবে ? সপ্তদশ শতকের বুনিয়াদি মোঘল তরিকায় যেভাবে হোক তখতে পৌঁছতে হবে। সাম্রাজ্যের যত বিস্তার হয়েছে সে রাস্তা ততো আঁকাবাকা সুদূরে মিলিয়ে গিয়ে আবার দিল্লী আগ্রায় ফিরে আসতে চাইছে। তাই শাজাহান ভাবছেন বাবার মনোভাবের কথা , নূর জাহানের সহশাসক হওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে সে কথাও কানে আসছে তাঁর। ক্রমশ সেইসব কথাবার্তা বেশ শোনাও যাচ্ছে একাধিক অলংকৃত দেয়ালে কান পাতলে। কোন কোন সময় সে আওয়াজ আর একটু গমগমে আর স্পষ্ট। কথা বলছেন মহাবত খান, মালওয়ার সুবেদার, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে শাহাজাদা খুসরুর বিদ্রোহে সামিল আপন ভাইয়ের মাথা নিজের হাতে নামিয়ে বাদশাহর বিশেষ আস্থাভাজন সালাহকার। সম্ভবত বেয়াড়া খুসরুকে প্রায় অন্ধ করে দেবার কাজে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত মহবত খান কবেই ভুলে গেছেন তাঁর জন্ম নাম ছিল শুধুই জামানা বেগ, সুদূর আফগানে। ছিল, এখন নেই , এখনকার মহবত খান কথা বলতে চাইছেন বাদশাহের সঙ্গে তার উল্লেখ আছে কবি -লেখক শেখ আবদুল -ওয়াহাবের বয়ানে।
----- জাহাঁপনা।
----- বলো মহবত খান।
----- আপনি নিশ্চয়ই প্রাচীন বাদশাহদের ইতিহাস - তারিখ জানেন।
----- তাতে কী ?
----- কিছুই না তবে কোন শাহেনশাই এ ভাবে .......
----- কী বলতে চাইছ মহবত খান ?
----- ইতিহাসের কথা।
----- ইতিহাস তো অনেক কথার , অনেক কাহানিরও বটে।
----- কোনোটাই নয় জাহাঁপনা। আমি বলতে তাঁদের কেউই এভাবে বেগমের কথা শুনতেন না।
জাহাঙ্গীর সম্পর্কে যতদূর জানা যাচ্ছে এই শুনে তিনি হেসেছিলেন আর তাঁর হাসিতে অন্য কারু প্রতিক্রিয়া হয় কিনা এটা লক্ষ্য করছিলেন। সেই প্রতিক্রিয়া দেখেশুনে বা না শুনেই তিনি আরো হাসতে পারেন বা ভয়ঙ্করও হয়ে উঠতে পারতেন। এই অনিশ্চেয়তার কথা মহবত খানের জানাছিল তাই তিনি একান্তেই কথা বলছিলেন বাদশাহের সঙ্গে।
----- খলবলি মোচে গেছে জাহাঁপনা। সব জায়গায় কথা। .....
----- কোথায় ?
----- দরবারে , বাজারে , ফৌজের তাঁবুতে , এমনকি। ......
----- এমনকি আপনার হারেমে আর শাহাজাদাদের দিলে।
----- না না বাবা খুররাম নূর জাহান বেগমকে খুবই ভালোবাসে আর অন্যরা তো নেহাতই ছোট। বেদৌলত খুসরু তো কবেই কয়েদে। তুমি বড্ড বেশি ভাবছ। এত ভেব না এই চিড়িয়াটাকে দেখ ভেট এসেছে গুজরাটের সুবেদারের কাছ থেকে।
----- গুস্তাকি মাফ , সব জায়গায় কথা হয়।
----- কী কথা ? বল বল।
----- শাহেনশার মতো বুঝদিল , জ্ঞানী শাসক একজন আওরাতকে ....
----- বেগম বল।
----- জি হুজুর। এতো ক্ষমতা দিলেন কী করে।
----- মহবত খান, নূর জাহান বেগম কোনো মামুলি আওরাত নয়।
----- সবাই বলছে এতো ফিতনা জাহাঁপনা।
----- উলেমারা ?
----- মজহবের সবাই ফিতনার কথাই বলছে হুজুর। ভয়ঙ্কর এক প্রলয় উপস্থিত হতে চলেছে।
----- ----- ফিতনা ?
----- খরা , বন্যা , মহামারী অনাবৃষ্টিতে ভরে যাবে সারে জাহান। দিকে দিকে বিদ্রোহ হবে। যুদ্ধ লাখ লাখ প্রজা মারা যাবে।
----- আর সেই আগুন থেকে কী উঠে আসবে জান ?
----- কী জাহাঁপনা ?
----- উঠে আসবে খাঁটি সোনা।
----- কিন্তু জাহাঁপনা। ...
----- কিন্তু নেই মহবত খান। নিজের কথা ভাব।
----- আমি তো মোঘল সালতানাতের বান্দা হুজুর , আমার তো নিজের কথাই নেই।
----- তাহলে ফিতনার কথা বললে কী হিসেবে। প্রত্যেকের জীবনেই ফিতনা - এই অগ্নিপরীক্ষা আসে । মানুষ উতরোয় আবার আসে। তোমার জীবনের কথা ভাব। কোথা থেকে কোথায় এসেছো। আর কোথায়ই বা যাবে। আমাকেও ভাবতে দাও।
জাহাঙ্গীর কদিন যেন নূর জাহানের সঙ্গে একটু আড়োআড়ো ভাব করেন। তারপর মহবত খান সেপাই লস্কর নিয়ে বিদেয় হতে আবার যেকে সেই। শেখ ওয়াহাব লেখেন , '' নূর জাহান বেগমের ঘোরে উনি এতোই আচ্ছন্ন যে দুশোটা মহবত খানের পরামর্শ কানে ঢুকবে না। ''
----- জাহাঁপনা।
----- বলো মহবত খান।
----- আপনি নিশ্চয়ই প্রাচীন বাদশাহদের ইতিহাস - তারিখ জানেন।
----- তাতে কী ?
----- কিছুই না তবে কোন শাহেনশাই এ ভাবে .......
----- কী বলতে চাইছ মহবত খান ?
----- ইতিহাসের কথা।
----- ইতিহাস তো অনেক কথার , অনেক কাহানিরও বটে।
----- কোনোটাই নয় জাহাঁপনা। আমি বলতে তাঁদের কেউই এভাবে বেগমের কথা শুনতেন না।
জাহাঙ্গীর সম্পর্কে যতদূর জানা যাচ্ছে এই শুনে তিনি হেসেছিলেন আর তাঁর হাসিতে অন্য কারু প্রতিক্রিয়া হয় কিনা এটা লক্ষ্য করছিলেন। সেই প্রতিক্রিয়া দেখেশুনে বা না শুনেই তিনি আরো হাসতে পারেন বা ভয়ঙ্করও হয়ে উঠতে পারতেন। এই অনিশ্চেয়তার কথা মহবত খানের জানাছিল তাই তিনি একান্তেই কথা বলছিলেন বাদশাহের সঙ্গে।
----- খলবলি মোচে গেছে জাহাঁপনা। সব জায়গায় কথা। .....
----- কোথায় ?
----- দরবারে , বাজারে , ফৌজের তাঁবুতে , এমনকি। ......
----- এমনকি আপনার হারেমে আর শাহাজাদাদের দিলে।
----- না না বাবা খুররাম নূর জাহান বেগমকে খুবই ভালোবাসে আর অন্যরা তো নেহাতই ছোট। বেদৌলত খুসরু তো কবেই কয়েদে। তুমি বড্ড বেশি ভাবছ। এত ভেব না এই চিড়িয়াটাকে দেখ ভেট এসেছে গুজরাটের সুবেদারের কাছ থেকে।
----- গুস্তাকি মাফ , সব জায়গায় কথা হয়।
----- কী কথা ? বল বল।
----- শাহেনশার মতো বুঝদিল , জ্ঞানী শাসক একজন আওরাতকে ....
----- বেগম বল।
----- জি হুজুর। এতো ক্ষমতা দিলেন কী করে।
----- মহবত খান, নূর জাহান বেগম কোনো মামুলি আওরাত নয়।
----- সবাই বলছে এতো ফিতনা জাহাঁপনা।
----- উলেমারা ?
----- মজহবের সবাই ফিতনার কথাই বলছে হুজুর। ভয়ঙ্কর এক প্রলয় উপস্থিত হতে চলেছে।
----- ----- ফিতনা ?
----- খরা , বন্যা , মহামারী অনাবৃষ্টিতে ভরে যাবে সারে জাহান। দিকে দিকে বিদ্রোহ হবে। যুদ্ধ লাখ লাখ প্রজা মারা যাবে।
----- আর সেই আগুন থেকে কী উঠে আসবে জান ?
----- কী জাহাঁপনা ?
----- উঠে আসবে খাঁটি সোনা।
----- কিন্তু জাহাঁপনা। ...
----- কিন্তু নেই মহবত খান। নিজের কথা ভাব।
----- আমি তো মোঘল সালতানাতের বান্দা হুজুর , আমার তো নিজের কথাই নেই।
----- তাহলে ফিতনার কথা বললে কী হিসেবে। প্রত্যেকের জীবনেই ফিতনা - এই অগ্নিপরীক্ষা আসে । মানুষ উতরোয় আবার আসে। তোমার জীবনের কথা ভাব। কোথা থেকে কোথায় এসেছো। আর কোথায়ই বা যাবে। আমাকেও ভাবতে দাও।
জাহাঙ্গীর কদিন যেন নূর জাহানের সঙ্গে একটু আড়োআড়ো ভাব করেন। তারপর মহবত খান সেপাই লস্কর নিয়ে বিদেয় হতে আবার যেকে সেই। শেখ ওয়াহাব লেখেন , '' নূর জাহান বেগমের ঘোরে উনি এতোই আচ্ছন্ন যে দুশোটা মহবত খানের পরামর্শ কানে ঢুকবে না। ''
শিশু ঔরঙ্গজেবকে নিয়ে মোঘল বাদশাহী তাঁবুর পাল ষোলোশো আঠেরোর ডিসেম্বরে ফতেপুর সিক্রির কিনারে এসে ঘাঁটি গাড়ে, আগ্রা কুড়ি কিলোমিটার। সে জায়গাটা সবে তিন বছর বিউবনিক প্লেগের তাণ্ডব চলে ঠাণ্ডা হয়েছে। জাহাঙ্গীরের মা জয়পুরের এগারো কিলোমিটার দূরে আমের বা অম্বরের কাছওয়া রাজকুমারী মারিয়াম উজ জামানি উরফে হরখা বাই নতুন ছেলের মুখ দেখতে এলেন সঙ্গে হয়ত কলা বেচার কাজও ছিল অত্যন্ত ধনী এই স্বাধীন মহিলা উদ্যোগীর। তাঁর প্রতিপত্তির একটা নমুনা- অন্য অনেক কিছুর মতো জাহাঙ্গীরের সময়ে সবচেয়ে দামি প্রাকৃতিক রঙ নীলের একচেটিয়া ব্যাবসাটা ছিল ওনার হাতেই। জাহাঙ্গীরের আমলে পর্তুগিজরা মক্কার নৌবাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করত। রীতিমত তোলাবাজি করত তারা। রাজমাতা হরখা বাইয়ের জাহাজ রহিমি তারা লুট করে নিয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও তা ফিরিয়ে আনতে পারেননি জাহাঙ্গীর । তাই হয়তো তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দূত উইলিয়াম হকিন্সকে জায়গা দিয়েছিলেন, । উদ্দেশ্য ইংরেজদের দিয়ে পর্তুগিজদের জব্দ করা। পরে তা সফলও হয়। আর একটা কারণ হল হকিন্সের চোস্ত তুর্কিতে বাদশাহের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা। জাহাঙ্গীর হারেমের এক শ্বেতাঙ্গনা আর্মেনীয় মারিয়ামের সঙ্গে হকিন্সের বিয়ে দেন। যাই হোক, রাজস্থানের বায়ানা থেকে নীল কিনতো হরখা বাইয়ের এজেন্টরা। সেখানে একটা বাগানও ছিল তাঁর। জলাভাব দূর করতে কুড়ি হাজার টাকা ব্যয়ে একটা ধাপ কাটা ইঁদারা বানান তিনি। এলাকার সব নীল নিলামে তাঁর এজেন্টরা কিনে নিতো। সেসব মক্কার আন্তর্জাতিক বাজারে যেত আর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ত দুর্মূল্য নীল। বাদশাহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে হকিন্স হয়তো একটু বেড়ে খেলতে গিয়েছিলেন। তাঁর এজেন্ট ইউলিয়াম ফিঞ্চ বায়ানার নীলের নিলামে হরখা বাইয়ের এজেন্টের থেকে বেশি দাম হেঁকে সব মাল তুলে নিলো। আর যায় কোথায়! ক্ষিপ্ত রাজমাতার রাগ থামাতে হকিন্সকে সপরিবারে দূর করে দেওয়া হল ,বলাই বাহুল্য ফিঞ্চকেও। ভগ্নোমনোরথ হকিন্স যাত্রাপথে মারা যান , ফিঞ্চও। বিধবা মারিয়াম হলেন মোঘল যুগের প্রথম মহিলা যিনি বিলেতে পা রেখেছিলেন।এমনই ছিল হরখা বাইয়ের প্রতাপ। কারণটা শুধুই মোঘল সালতানাতের তলোয়ারের দাপট নয় পৃথিবীর সেরা শিল্পোন্নত দেশ ছিল প্রাক আধুনিক মোঘল ভারত। প্রভাবশালী অভিজাতরা অনেকেই ব্যবসা বাণিজ্য করে স্বাধীন ভাবে ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছিলেন , গড়ে তুলেছিলেন সমৃদ্ধ অর্থনীতির বুনিয়াদ। চমকে ওঠার মতো কথা হলো এই ধনীদের তালিকায় অর্ধেক ছিলেন মহিলা। তবে এসব ইতিহাসের সত্যিতে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। হরখা বাইকে কল্পকথার গল্পে যোধা বাই সাজিয়ে সিনেমা বানাতে বা সেলিম উরফে জাহাঙ্গীর বাদশাহর সঙ্গে কল্পিত আনারকলির প্রেমগাঁথায় যেন উৎসাহ প্রবল আর তাতে ফিল্মওলা আর হরেক কিসিমের মিডিয়াওলার মালপানিও আসে মোটা রকমের।
ফতেপুর সিক্রিতে মাস তিনেক ছিলেন বাদশাহরা। ষোলোশো উনিশের এপ্রিলে শাজাহানের মা, ঔরঙ্গজেবের ঠাকুমা যোধপুর রাজকুমারী জগৎ গোসাঁই মারা যান। জাহাঙ্গীর তাঁর প্রৌঢ় বেগমের সম্পর্কে কিছু লিখছেন না শুধু বলছেন মৃত্যুর পর তিনি শাজাহানকে সান্ত্বনা জানাতে গেলেন। পরদিনই জাহাঙ্গীর ও শাজাহান গোটা লোক লস্কর নিয়ে সপরিবারে আগ্রা ঢুকেছিলেন। এরপরের সময়টায় জাহাঙ্গীরকে এক দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় পড়তে দেখা যাচ্ছে যার থেকে মুক্তির কোন লক্ষণও নেই। আকবরের চালু করা প্রথায় জাহাঙ্গীরের বদলে হিন্দু দেবদেবীর মতো ঝরোখায় প্রজাদের দর্শনও দিচ্ছেন নূর জাহান , অভিজাত সভাসদদের নিয়ে সলাপরামর্শও করছেন তিনি , নিজের নামে মুদ্রা বার করছেন , উলেমাদের উপদেশ মোতাবেক ন্যায় বিধান করা চলছে , পশ্চিম সীমান্তে অনবরত বিদ্রোহ দমন, সুবাগুলোর রাজস্ব আদায় তদারক , গুপ্তচর নেটওয়ার্ক আর ফৌজের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দান সমস্ত বিষয়েই তাঁর উপস্থিতি প্রবল হয়ে উঠেছে। জাহাঙ্গীর একরকম সহশাসকের ভূমিকাটা ছেড়েই দিয়েছেন তাঁকে। এসব আরো সন্দিঘ্ন করে তুলছিল শাজাহানকে , আরো সন্দিঘ্ন। অত্যন্ত প্রভাবশালী সেনাপতি মহবত খানও আপাতত চুপ। উলেমারাও স্থায়ী শাসনের স্বার্থে, ফিতনার নৈরাজ্যের আগুন থেকে দূরে থাকতে, নূর জাহানের ক্ষমতায়ন মেনে নেওয়াতে তাঁর বাদশাহী তখ্তের স্বপ্ন আরো দূরে চলে যাচ্ছে। প্রতি শক্রবার শাহী নমাজের সময় যে পবিত্র উচ্চারণ বা খুতবা পাঠ হয় তা অবশ্য জাহাঙ্গীরের নামোল্লেখেই , আর উলামারা তাতেই খুশি। তবে শাজাহানের ভাবনা অন্য। সব কটা বাদশাহী প্রতীকে- সে ঝরোখায় প্রজা দর্শনে হোক বা খুতবার উচ্চারণেই হোক , তিনি নিজের উপস্থিতি চান আর বাবার অসুস্থতার শূন্যতা পূরণ করছেন নূর জাহান এটাই সমস্যার। সে সময় মুমতাজ কী ভাবেন ? কী ভাবতে পারেন তিনি? শাজাহানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় দাম্পত্য আর ভালোবাসাকে যদি জাহাঙ্গীর - নূর জাহানের অটুট সম্পর্কের প্রতিতুলনায় ফেলা যায় তবে আর তবেই অনেক কথা উঠে আসতে থাকে।
------শিক্ষিত , পরিশীলিত , সুন্দরী মুমতাজ শাজাহানের সমস্ত আকর্ষণ অন্য নারীদের থেকে কাড়তে পারলেও সপ্তদশ শতকে চূড়ান্ত পুরুষতন্ত্রের - সময়ের শিকার তিনিও ।
----- একই সময় তো নূর জাহানও রাজ করেন ?
----- একটু আগে বা সমসময়।
----- তিনি ব্যতিক্রম। তাছাড়া তিনি অর্জন করেন।
----- অর্জন ?
----- অবশ্যই, নূর জাহান স্থপতি, শিকারী , যোদ্ধা , সহ শাসক আর মুমতাজ ?
----- ঔরঙ্গজেবের জন্মের তিন মাসের মধ্যে আবার গর্ভবতী হচ্ছেন নূর জাহান। -----আবার? ----- তবে সে বাচ্চা বাঁচে না।
------ এভাবেই চলতে থাকে ?
------ বাচ্চা হওয়া , গর্ভবতী হওয়া , আবার বাচ্চা হওয়া , আবার গর্ভবতী হওয়া। এক নিরন্তর সরল রেখা অথবা এক বৃত্ত অথবা দুটোই।
----- দুটোই ?
----- কোন ভ্রুক্ষেপ ছাড়াই কোন হেল ছাড়া দোল ছাড়া , শুধুই সময়ের সঙ্গে সঙ্গ দেয়া। শুধুই।
----- সময়টার কথা ভাববে তো ?
----- সময়ের কথাই তো বলছি সেখানে মুমতাজের স্বর শুনছি কই ? সে কথাই তো বলছি।
----- শুনছো না দারা শিকোর স্বর, জাহানারার , সুজার , রোশনারার ,ঔরঙ্গজেবের অথবা মুরাদের ?
----- সে সব তো তাঁদের স্বর। তারিখ পে তারিখ , নিখুঁত ভাবে নথিভুক্ত।
----- তারিখ নামক ইতিহাসের গোত্র কিন্তু বিশ্লেষণমূলক ইতিহাস নয়।
-----তাতেও বা মুমতাজের স্বর কই ?
----- শুধুই নূর জাহানের স্বর ?
----- সেটাই প্রমাণিত। ----- তবে ? ----- ঠিকই, মুমতাজের অস্থি মজ্জা রক্তরা ইতিহাসে গান গায় অথবা রক্তপাত করে , নির্মাণ করে স্থাপত্য বা আইডিয়ার কিন্তু তিনি ? নিশ্চুপ।
----- জাহাঙ্গীর ?
----- আগেই বলেছি নূর জাহানকে সহ শাসক করতে বাদশাহের ভূমিকা - ইতিহাসে তুলনা নেই। তবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন জাহাঙ্গীর।
----- তাঁর কথা কিছু বল ।
----- বলব ?
----- বলতেই থাকবে।
----- ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বাদশাহ। ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত মদ আর আফিঙে আসক্ত।
----- আসক্ত ?
----- দৈনিক কুড়ি গেলাস দুবার শোধন করা মদ তাঁর লাগতই।
------ সেকি ?
----- মদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল- ডিপেন্ডেন্ট। তার ওপর একের পর এক মোর্চায়- অভিযানে সামিল হয়ে রক্তাক্ষয়ী হাতাহাতি সব লড়াইয়ের ধকল, নানা রকমের চোট আঘাত। শরীর আর দিচ্ছে না।
----- হাওয়া বদল দরকার। নূর জাহান বা মা হরখা বাইও রোগে ভুগে দুর্বল। হাওয়া বদল দরকার তাঁদেরও।
তবে শাজাহানের কানে কিন্তু শুধুই নূর জাহানের স্বর প্রবল হয়ে বাজছে । নূর জাহানও ভাবছেন কতটা নির্ভর করা যায় শাজাহানের ওপর , বিশেষ করে অসুস্থ জাহাঙ্গীরের অবর্তমানে। দুই উচ্চাকাঙ্ক্ষারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে বিষাক্ত ফণা তুলে। যেকোন সময় ছোবল মারবে এ ওকে আর যে আগে মারবে সেই থাকবে এগিয়ে।
----- একই সময় তো নূর জাহানও রাজ করেন ?
----- একটু আগে বা সমসময়।
----- তিনি ব্যতিক্রম। তাছাড়া তিনি অর্জন করেন।
----- অর্জন ?
----- অবশ্যই, নূর জাহান স্থপতি, শিকারী , যোদ্ধা , সহ শাসক আর মুমতাজ ?
----- ঔরঙ্গজেবের জন্মের তিন মাসের মধ্যে আবার গর্ভবতী হচ্ছেন নূর জাহান। -----আবার? ----- তবে সে বাচ্চা বাঁচে না।
------ এভাবেই চলতে থাকে ?
------ বাচ্চা হওয়া , গর্ভবতী হওয়া , আবার বাচ্চা হওয়া , আবার গর্ভবতী হওয়া। এক নিরন্তর সরল রেখা অথবা এক বৃত্ত অথবা দুটোই।
----- দুটোই ?
----- কোন ভ্রুক্ষেপ ছাড়াই কোন হেল ছাড়া দোল ছাড়া , শুধুই সময়ের সঙ্গে সঙ্গ দেয়া। শুধুই।
----- সময়টার কথা ভাববে তো ?
----- সময়ের কথাই তো বলছি সেখানে মুমতাজের স্বর শুনছি কই ? সে কথাই তো বলছি।
----- শুনছো না দারা শিকোর স্বর, জাহানারার , সুজার , রোশনারার ,ঔরঙ্গজেবের অথবা মুরাদের ?
----- সে সব তো তাঁদের স্বর। তারিখ পে তারিখ , নিখুঁত ভাবে নথিভুক্ত।
----- তারিখ নামক ইতিহাসের গোত্র কিন্তু বিশ্লেষণমূলক ইতিহাস নয়।
-----তাতেও বা মুমতাজের স্বর কই ?
----- শুধুই নূর জাহানের স্বর ?
----- সেটাই প্রমাণিত। ----- তবে ? ----- ঠিকই, মুমতাজের অস্থি মজ্জা রক্তরা ইতিহাসে গান গায় অথবা রক্তপাত করে , নির্মাণ করে স্থাপত্য বা আইডিয়ার কিন্তু তিনি ? নিশ্চুপ।
----- জাহাঙ্গীর ?
----- আগেই বলেছি নূর জাহানকে সহ শাসক করতে বাদশাহের ভূমিকা - ইতিহাসে তুলনা নেই। তবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন জাহাঙ্গীর।
----- তাঁর কথা কিছু বল ।
----- বলব ?
----- বলতেই থাকবে।
----- ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বাদশাহ। ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত মদ আর আফিঙে আসক্ত।
----- আসক্ত ?
----- দৈনিক কুড়ি গেলাস দুবার শোধন করা মদ তাঁর লাগতই।
------ সেকি ?
----- মদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল- ডিপেন্ডেন্ট। তার ওপর একের পর এক মোর্চায়- অভিযানে সামিল হয়ে রক্তাক্ষয়ী হাতাহাতি সব লড়াইয়ের ধকল, নানা রকমের চোট আঘাত। শরীর আর দিচ্ছে না।
----- হাওয়া বদল দরকার। নূর জাহান বা মা হরখা বাইও রোগে ভুগে দুর্বল। হাওয়া বদল দরকার তাঁদেরও।
তবে শাজাহানের কানে কিন্তু শুধুই নূর জাহানের স্বর প্রবল হয়ে বাজছে । নূর জাহানও ভাবছেন কতটা নির্ভর করা যায় শাজাহানের ওপর , বিশেষ করে অসুস্থ জাহাঙ্গীরের অবর্তমানে। দুই উচ্চাকাঙ্ক্ষারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে বিষাক্ত ফণা তুলে। যেকোন সময় ছোবল মারবে এ ওকে আর যে আগে মারবে সেই থাকবে এগিয়ে।
হাওয়া বদল করতে চলমান শাহী তাঁবু কাশ্মীরের পথে রওনা দিচ্ছে।রাজকীয় বহর আগ্রা থেকে কাশ্মীর রওনা দিল ষোলোশো উনিশের অক্টোবরে। প্রায় গোটা মোঘল দরবার তাতে সামিল , গোটা আগ্রা শহরটাই চলছে , চলছে তো চলছেই , আর চললেই তৈমুরের রক্তজাতরা খুশ। কখনো শিকারের নাম করে ক্ষমতার কুচকাওয়াজ , কখনো একের পার এক মোর্চা বা সামরিক অভিযানে , কখনো চলমান প্রতর্কের জন্ম দেওয়া , নেওয়া , বিস্মিত হওয়া , বিস্ময় সৃষ্টি করার , ত্রাস জন্মানোর অধিকার অর্জন আর লুটের বর্বরতাকে ইন্দো পারসিক আদব কায়দায় বিপুল সম্পদ সৃষ্টির কাজে রূপান্তর এসবের কেন্দ্রে রয়েছে চলমানতার আহ্বান - মোঘলরা চলতে ভালোবাসে। তাই সবাই চলেছে কাশ্মীরে। কে নেই এই যাত্রায় : নূর জাহান ও জাহাঙ্গীর , হরখা বাই ও হারেমের, রাজপরিবারের অন্য মহিলারা, শাজাহান অবশ্য মুমতাজ কাশ্মীরে গিয়েছিলেন কিনা পরিষ্কার হচ্ছে না কারণ ষোলোশো উনিশের ডিসেম্বরের তার সপ্তম সন্তান এক ছেলে হয় বলে জানা যাচ্ছে আর শাহজাহান বাবার সঙ্গে কাশ্মীর রওনা দিলেন ষোলোশো কুড়ির ফেব্রুয়ারী মাসে। যাচ্ছেন নূর জাহানের বাবা গিয়াস বেগ ও মা আসমত বেগম , মুমতাজের বাবা আসফ খান ও মা দিয়ানজি বেগম, যার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না , আর তাঁদের সঙ্গে রয়েছে পরিবার। মোঘল শাহী পরিবারে বেগমরা বাচ্চার দেখভাল ছেড়ে দিতেন ধাত্রীমাতাদের ওপর। তাঁরা হতেন অভিজাত পরিবারের সদ্য মায়েরা যাঁদের বুকের দুধ খেয়ে বড় হতো শাহাজাদারা। এই ধাত্রীমাতারা আনগা উপাধি পেতেন , খুবই সম্মানিয়া ছিলেন তাঁরা যার মধ্যে বিখ্যাত হলেন আকবরের ধাত্রীমাতা মহাম আনগা। আকবর দেওয়ানি আম দরবারে ওনাকে পাশেই বসাতেন এই ছবি পাওয়া যাচ্ছে। ঔরঙ্গজেবের ধাত্রীমাতার নাম জানা যাচ্ছে না , তবে কোন এক ধাত্রীমাতার সঙ্গে তিনিও চলেছেন কাশ্মীর। সঙ্গে যাচ্ছে অভিজাতরা , রাজপুরুষরা ,হালুইকার , খানসামা, চাকর বাকর , সৈন্যরা সবাই সপরিবারে। শাহী পরিবারের লোকজন, বিশেষ করে মহিলারা ও বাচ্চারা যাচ্ছেন হাতিতে , কেউ যাচ্ছেন ঘোড়ায় , কেউবা উটের পিঠে চেপে। কিছুটা দূরে বাগি শাহাজাদা খুসরু। তাঁকে প্রায়ান্ধ করে দেওয়া হয়েছে সবাই জানে কিন্তু যতই হোক রাজরক্ত , কখন যে টগবগিয়ে উঠবে বলা মুশকিল । জাহাঙ্গীরের প্রথমা বেগম মান বাইয়ের ছেলে এই খুসরু , রাজা মান সিংহের ভাগ্নে যতক্ষণ জীবিত তখ্তের জবরদস্ত দাবীদার তাই তাঁকে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। মহবত খান সবে কাবুলের সুবেদার নিযুক্ত হলেন , তিনিও সেপাই লস্কর নিয়ে কাশ্মীরের পথে খানিকটা সঙ্গে থাকছেন। আগে আগে এক উজিরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে একদল পাথর কাটিয়ে , ছুতোর অরে গাঁইতি কোদাল কোপানোর হাট্টাকাট্টা মজদুরের সঙ্গে। তাঁর কাজ হলো রাস্তা তৈরি আর মেরামতির কাজ দেখা যাতে হোমরা চোমড়ারা আরামে বেড়াতে যেতে পারেন।
বাদশাহর খুব ইচ্ছে সর্বত্যাগী সাধু জাদরুপের সঙ্গে দেখা করার তাই মথুরার কাছে শাহী বাহিনী তাঁবু গাড়লো। এখানে প্রজারা এসে বললো এক আদমখোর বাঘের উৎপাতের কথা। নূর জাহান সেটাকে শিকার করে সবার আশীর্বাদ কুড়োলেন। সাধুবাবার সঙ্গেও নিশ্চয়ই বাদশাহের মোলাকাত হয়। তারপর চলমান তাঁবু চললো উত্তরে, থামল দিল্লিতে। সেখানে সপরিবারে বাদশাহ গেলেন ঠাকুর্দা হুমায়ুনের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে , গেলেন সুফি মাজারে আর গেলেন হারেমের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান আকা আকায়েনের কাছে। দুর্বল শরীরেও বৃদ্ধা তখন তদারকি করেন এক সরাইখানা , বাগান আর সমাধি সৌধ নির্মাণের। ওনাকে পরিবারের একজন বলে লিখেছিলেন জাহাঙ্গীর, বিশেষ শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন উনি ।আড়াই হপ্তা দিল্লির কাজকম্মো গুছিয়ে আবার যাত্রা শুরু হল।পথে স্থানীয় রাজা রাজড়ারা আথিতেয়তা করতে এগিয়ে আসতে লাগল। ষোলোশো কুড়ির মার্চের প্রথম হপ্তায় শাহী বহর পাখলিতে পৌঁছয় এরপর থেকেই কাশ্মীর শুরু হবে। যেদিকে তাকানো যায় পাহাড় , স্থানীয় ভূস্বামীদের ব্যবস্থাপনায় খানাপিনার লহর লেগে যায় । অগ্রগামী লস্কররা খবর নিতে এসে জানাল কাশ্মীরে সেবার গমের ও অন্য শস্যের ফলন ভালো নয় , বিশাল শাহী হাতি বাহিনীর খাঁই জোগানো অসম্ভব। জাহাঙ্গীর জানাচ্ছেন সাতশোটা রেখে বাকি হাতির দল আগ্রায় ফেরত গেল !
যাত্রাপথেই চলমান খাস দরবারে সালতানাতের সব প্রান্তের আখবারাত নিয়ে আলোচনা হয়। সেরকমই এক সভার এজেন্ডা ছিল দাক্ষিণাত্যে মালিক অম্বরের নতুন হামলা। উপস্থিত জাহাঙ্গীর , নূর জাহান , শাজাহান , গিয়াস বেগ আর আসফ খান। পাঁচ পাঁচবার জবরদস্ত অভিযান চালিয়েও সুবিধে করতে না পেরে শেষমেষ সেরা সিপাহসালার খান আব্দুল রাহিম খান ই খানান নিলেন দাক্ষিণাত্যের ভার। একদিকে প্রচুর টাকাপয়সা দিয়ে বিজাপুর আর আহমদনগরয়ের উজিরদের বাগে আনা অন্য দিকে তীব্র অভিযান চালিয়ে তাপ্তি আর গোদাবরী নদীর মাঝের এলাকা দখল করা হল। শাহাজাদা খুররাম চুক্তিবলে বিজাপুরের সুলতানের অধীনতা নিশ্চিত করে মালিক অম্বরকে বাগে আনেন , ফিরলে তাঁকে শাজাহান উপাধি দেওয়া হয়। সে তিন বছর আগের কথা এখন আবার হামলা শুরু করেছে আহমদনগরের ওই দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। হামলা হচ্ছে বুরহানপুরেও। চিন্তিত বাদশাহ , ইতিমধ্যে নূর জাহানও ঠিক করে ফেলেছেন মেয়ে লাডলি বেগমের বিয়ে দেবেন আরেক শাহাজাদা শাহরিয়ারের সঙ্গে। তাতে দুটোই হবে - অসুস্থ জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসবেন অনভিজ্ঞ শাহরিয়ার আর তাঁর প্রভাব অক্ষুণ্ণ থাকবে। তবে এখনো কোন ঘোষণা হয়নি এ ব্যাপারে। শাজাহানের আশংকা সত্যি হতে চলেছে ? এই ভিতরে বাইরে আপাত শান্ত থমথমে পরিস্থিতিতে সভা শুরু হয়। ------ বাবা খুররাম !
------ জি হুজুর।
------ আখবারাত শুনেছ ?
------ জি হুজুর।
------ আমি বলবো জাঁহাপনা ?
------ বলো বেগম।
------ বলি তাহলে।
------ অবশ্যই বলবে তুমি নূর জাহান বেগম। সবটাই বলবে।
------ সবটা নয় হুজুর তবে বুরহানপুরের কেল্লায় এক্ষুণি যেতে হবে। খান ই খানান তাই চাইছেন জাহাঁপনা।
------ কাকে চাইছেন ?
------ শাহাজাদা খুররামকে হুজুর।
------ খুররাম ?
----- শাহাজাদা শাজাহানকে চাইছেন জাহাঁপনা।
----- তাই বলবে শাহজাহান বলবে। ওই হাবশীটাকে কয়েদ করে নিয়ে আসবে শাহাজাদা শাহজাহান। তবে আমি ঘুমোতে পারবো।
----- জি হুজুর। তবে গুস্তাকি মাফ , একটা কথা ছিল।
------ বল।
----- জাহাঁপনার শরীরের আবস্থায় তাঁকে ছেড়ে আমাকে হুকুম তামিল করতে হবে। ছেড়ে যেতে হবে আমাকে , হাজার মাইল দূর যাব আমি আর জাহাঁপনাও শরাব ছেড়ে দেবেন। নদীর জলে ফেলা হবে সব শরাব।
------ সেকি !
------ হ্যাঁ জাহাঁপনা, হজরতের দোয়া , আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন আর নদীতে ভেসে যাবে শরাবের পিঁপে। আপনার আদেশে সোনার মদ খাবার যত গেলাস আমি ভেঙে ফেলব। তারপর বিলিয়ে দেব গরীবদুঃখীদের , তারা আশীর্বাদ করবে। ওই সব দোয়া নিয়ে আমি বুরহানপুর রওনা হব আর আমার সঙ্গে যাবেন আমার বড় ভাই শাহাজাদা খুসরু।
------ বেদৌলত খুসরু ! ঠিক আছে তাই হবে তবে নজরে রাখবে ওকে।
----- জি হুজুর।
নূর জাহান ভাবেন এবার ভালোয় ভালোয় লাডলির বিয়েটা সেরে ফেলা যাক।শাজাহান ঘোড়া ঘুরিয়ে ফেলেন , হাতিদের মুখ বুরহানপুরের দিকে ফেরানো হয় , কয়েক হাজার সেপাই কুচকাওয়াজ করতে শুরু করল। খবর পাঠানো হল আরো কয়েক হাজার ঘোড়সওয়ার সেনা আর কয়েকশো হাতি তৈরি রাখতে । আরেক মহাযাত্রা শুরু হল দাক্ষিণাত্যের দিকে , অজানার দিকে , অনিশ্চেয়তার সাগরে ঝাঁপাচ্ছেন শাজাহান যার ওপারে তখ্ত। সপরিবারে যাচ্ছেন, সঙ্গে তাঁর বড় ভাই শাহাজাদা খুসরু যাকে কিছুদিনের মধ্যেই খুন করা হবে। যাত্রার সময় দেখা যাচ্ছে মুমতাজ আবার গর্ভবতী।
------ জি হুজুর।
------ আখবারাত শুনেছ ?
------ জি হুজুর।
------ আমি বলবো জাঁহাপনা ?
------ বলো বেগম।
------ বলি তাহলে।
------ অবশ্যই বলবে তুমি নূর জাহান বেগম। সবটাই বলবে।
------ সবটা নয় হুজুর তবে বুরহানপুরের কেল্লায় এক্ষুণি যেতে হবে। খান ই খানান তাই চাইছেন জাহাঁপনা।
------ কাকে চাইছেন ?
------ শাহাজাদা খুররামকে হুজুর।
------ খুররাম ?
----- শাহাজাদা শাজাহানকে চাইছেন জাহাঁপনা।
----- তাই বলবে শাহজাহান বলবে। ওই হাবশীটাকে কয়েদ করে নিয়ে আসবে শাহাজাদা শাহজাহান। তবে আমি ঘুমোতে পারবো।
----- জি হুজুর। তবে গুস্তাকি মাফ , একটা কথা ছিল।
------ বল।
----- জাহাঁপনার শরীরের আবস্থায় তাঁকে ছেড়ে আমাকে হুকুম তামিল করতে হবে। ছেড়ে যেতে হবে আমাকে , হাজার মাইল দূর যাব আমি আর জাহাঁপনাও শরাব ছেড়ে দেবেন। নদীর জলে ফেলা হবে সব শরাব।
------ সেকি !
------ হ্যাঁ জাহাঁপনা, হজরতের দোয়া , আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন আর নদীতে ভেসে যাবে শরাবের পিঁপে। আপনার আদেশে সোনার মদ খাবার যত গেলাস আমি ভেঙে ফেলব। তারপর বিলিয়ে দেব গরীবদুঃখীদের , তারা আশীর্বাদ করবে। ওই সব দোয়া নিয়ে আমি বুরহানপুর রওনা হব আর আমার সঙ্গে যাবেন আমার বড় ভাই শাহাজাদা খুসরু।
------ বেদৌলত খুসরু ! ঠিক আছে তাই হবে তবে নজরে রাখবে ওকে।
----- জি হুজুর।
নূর জাহান ভাবেন এবার ভালোয় ভালোয় লাডলির বিয়েটা সেরে ফেলা যাক।শাজাহান ঘোড়া ঘুরিয়ে ফেলেন , হাতিদের মুখ বুরহানপুরের দিকে ফেরানো হয় , কয়েক হাজার সেপাই কুচকাওয়াজ করতে শুরু করল। খবর পাঠানো হল আরো কয়েক হাজার ঘোড়সওয়ার সেনা আর কয়েকশো হাতি তৈরি রাখতে । আরেক মহাযাত্রা শুরু হল দাক্ষিণাত্যের দিকে , অজানার দিকে , অনিশ্চেয়তার সাগরে ঝাঁপাচ্ছেন শাজাহান যার ওপারে তখ্ত। সপরিবারে যাচ্ছেন, সঙ্গে তাঁর বড় ভাই শাহাজাদা খুসরু যাকে কিছুদিনের মধ্যেই খুন করা হবে। যাত্রার সময় দেখা যাচ্ছে মুমতাজ আবার গর্ভবতী।


2 মন্তব্যসমূহ
চমৎকার এগোচ্ছে। আমরা ইতিহাসে ঢুকে পড়ে চলেছি লোকলস্কর হাতি ঘোড়ার সঙ্গে।
উত্তরমুছুনআগের একটি পর্বে আলোর উৎস সন্ধানে ছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আগুন জ্বলবে- ফিতনা। হাতী ঘোড়া সৈন্যদল যুদ্ধ রক্ত আড়ম্বর ঐশ্বর্য প্রতাপের একটি তল। অপর তলটিতে অন্তরের ঐশ্বর্য, বিদ্যা জ্ঞানচর্চা বিষাদ। দুই বিপরীত তলের ঘর্ষণে আগুন এবং আলো।
উত্তরমুছুন