ইসাবেল আয়েন্দের গল্প : পোল কন্যার কাহিনি



মূলগল্প: ইসাবেল আয়েন্দে 
বাংলা ভাষান্তর: বিপ্লব বিশ্বাস

ইরিনা ও শেথ-এর কৌতূহল মেটাতে আলমা, আমাদের জন্য চরম মুহূর্তকে স্পষ্টভাবে চেপে রেখে, ইছামেই ফুকুদার সঙ্গে তার প্রথম দর্শনের বিবরণ দিতে লাগল। ফুকুদার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল সানফ্রান্সিসকোর উত্তর - পশ্চিমের সি ক্লিফ অট্টালিকার জমকালো বাগানে, ১৯৩৯এর এক বসন্তদিনে। তখন সে ছিল ছোট্ট একটি মেয়ে যার খিদে ছিল খুবই কম, ফিঞ্চ গোত্রের ছোট্ট গায়ক- পাখির চাইতেও কম ; দিনের ভাগে সে নিশ্চুপ ঘুরে বেড়াত আর রাতের বেলায় কান্নাভেজা চোখে তিন - আয়নাওয়ালা এক বড়ো আলমারির গহিনে লুকিয়ে থাকত ; তার ঘরের সেই আলমারিটা তার জন্য বানিয়ে দিয়েছিল তার মাসি - মেসো। ঘরময় নীল রঙের সামঞ্জস্য : বড়ো পর্দাগুলো নীল, চারটি ছত্রিদণ্ড লাগানো খাটের চারদিকের পর্দাও নীল, ফ্ল্যান্ডারদের ব্যবহৃত ফ্লেমিশ গালিচার রংও নীল, ওয়ালপেপারের পাখির ছবি, গিলটিকরা ফ্রেমে রেনোয়া শিল্পকর্মের প্রিন্ট - সবই নীলাভ। আর যখন কুয়াশা কেটে যায় তখন তার ঘরের জানলা ফুঁড়ে যে আদিগন্ত আকাশ আর সমুদ্রকে সে দেখতে পেত, তাও গভীর নীল। চিরকালের জন্য যা কিছু সে হারিয়েছে তার জন্য আলমা মেন্ডেল কেঁদে চলে, এমনকি যদিও তার মাসি-মেসো তাকে খুব করে বোঝাত যে মা- বাবা - ভায়ের কাছ থেকে তার বিচ্ছেদ সাময়িক যা তার চাইতে কম স্বজ্ঞাত যে কোনও মেয়েকে তারা বুঝিয়ে দিতে পারত কিন্তু তাকে নয়। মা-বাবার শেষ ছবিটি যা তার মনে গেঁথে আছে তা হল, বাবার বেশ পরিপক্ব বয়সের ছবি ,মুখে দাড়ি, দেখতে বেশ কড়া প্রকৃতির, পুরো কালো পোশাক গায়ে, তার ওপর ওভারকোট আর মাথায় টুপি ; তার চেয়ে অনেক কম বয়সী এক মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে যে কিনা সান্ত্বনাতীতভাবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তারা ড্যানজিগ বন্দরের জাহাজঘাটার পাটাতনে দাঁড়িয়েছিল, শাদা রুমাল নেড়ে তাকে বিদায় জানাচ্ছিল। লন্ডনের পথে ছেড়ে যাওয়া জাহাজ ফগহর্নের বিষণ্ণ ভোঁ বাজিয়ে যতই এগোচ্ছিল ততই মা- বাবার চেহারা ছোটো থেকে আরও ছোটো, আরও অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল ; আর আলমা তখন জাহাজঘাটার রেলিং আঁকড়ে ধরেও তাদের বিদায় - সংকেতের উত্তর দিতে পারছিল না। ভ্রমণ - পোশাকে কাঁপতে কাঁপতে, জাহাজের পেছনদিকে জড়ো হওয়া যাত্রী যারা দূরে তাদের স্বদেশভূমিকে মিলিয়ে যেতে দেখছিল, তাদের মাঝে হারিয়ে গিয়ে, আলমা সেই স্বস্তিভাব ধরে রাখতে চেষ্টা করছিল যা মা-বাবা জন্মাবধি তার মধ্যে চারিয়ে দিয়েছিল। জাহাজ দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে, সে তাদের হতাশা অনুভব করতে পারল, এবং তা তার পূর্বাশঙ্কাকে পোক্ত করল যে সে আর কখনও তার মা-বাবাকে দেখতে পাবে না। বাবার মধ্যেকার এক দুর্লভ ভঙ্গিমায় সেই মানুষটি মায়ের কাঁধবেড়ে হাত রেখেছিল যেন জলে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে। মা এরমধ্যে এক হাতে টুপিটা খুলে ধরে রেখেছিল যাতে করে বাতাসের ঝাপটায় তা উড়ে না যায় যখন অন্য হাত দিয়ে পাগলের মতো রুমাল নাড়িয়ে যাচ্ছিল। 
 
ঠিক তিন মাস আগে আলমা মা-বাবার সঙ্গে একই জাহাজঘাটার পাটাতনে দাঁড়িয়েছিল, তার থেকে দশ বছরের বড়ো দাদা স্যামুয়েলকে বিদায় জানাতে। যুদ্ধের গুজব যদি সত্যি হয় তারই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তার স্বামী যখন স্যামুয়েলকে ইংল্যান্ডে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় তখন আলমার মা তা মেনে নেবার আগে খুব কান্নাকাটি করেছিল। বাবার যুক্তি ছিল, সেনাবাহিনীতে জোরপূর্বক নিযুক্তির হাত থেকে সে বেঁচে যাবে কিংবা স্বেচ্ছায় যোগদানের প্রলোভন থেকে। মেনডেল পরিবার কখনোই ভাবেনি যে দু বছর পর স্যামুয়েল জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রয়াল এয়ার ফোর্সে যোগ দেবে। সে যখন দাদার প্রথম অভিযান - যাত্রায় জাহাজে ওঠার দেমাকি চেহারাটা দেখল তখনই আলমা সেই হুমকি আঁচ করতে পেরেছিল যা তাদের পরিবারের মাথায় ঝুলছিল। দাদা ছিল তার কাছে বাতিঘরের মতো : চরম অন্ধকার মুহূর্তে তার ওপর আলো ফেলে ভয় তাড়িয়ে দিত, সঙ্গে দিত বিজয়ীর উচ্চহাসি, বন্ধুসুলভ পিছনে লাগা আর পিয়ানোয় বসে একের পর এক গান গাওয়া। আলমা যখন সদ্যোজাত শিশু তাকে কোলে করে দাদার সে কী আনন্দ, একটি গোলাপি পোঁটলা যে ট্যালকম পাউডারের গন্ধ শুঁকত আর বিড়ালছানার মতো মিঁউ মিঁউ করে কাঁদত। বোনের জন্য তার এই আবেগ আর কিছু না হোক, পরবর্তী সাত বছরে বেড়েই চলেছিল যতদিন না তাদের বাধ্যতামূলক ছাড়াছাড়ি হয়। আলমা যখন জানল যে স্যামুয়েল চলে যাচ্ছে,সে রাগে দাপাদাপি করতে লাগল। প্রথমে কান্না ও চিৎকার, পরে মেঝেতে শুয়ে যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে একাকার ; তারপর তা শেষ হয় যখন তার মা ও গভর্নেস তাকে জোর করে বরফজলের গামলায় চুবিয়ে দেয়। স্যামুয়েলের বিদায় আলমাকে বিষণ্ণ ও খিটখিটে করে তুলল যেহেতু তার সন্দেহ হতে লাগল, এটা হল আরও চরম পরিবর্তনের সূচনা। আলমা মা-বাবাকে লিলিয়ান নামে এক মাসির কথা বলতে শুনেছিল যে আমেরিকায় বাস করত এবং যার বিয়ে হয়েছিল আইজ্যাক বেলাসকোর সঙ্গে — একজন বিখ্যাত কেউ যেমনটা তার নাম নেবার সময় মা-বাবা বলতে কখনোই ভুলে যেত না। তার আগে এই দূর সম্পর্কের মাসি ও ওই কেষ্টবিষ্টু মানুষটার অস্তিত্ব বিষয়ে সে কিছুই জানত না তাই সে খুবই অবাক হল যখন তার মা-বাবা তাকে বাধ্য করল সুন্দরতম হস্তাক্ষরে তাদের চিঠি লিখতে। সে একে আরও অশুভ সংকেতবহ মনে করল যখন তার আবাসিক গৃহশিক্ষিকা হঠাৎই তার ইতিহাস ও ভূগোল পাঠ্যক্রমের ভিতর ক্যালিফোর্নিয়ার কমলা রঙের কালির ছোপটা গুঁজে দিল। তার মা-বাবা অপেক্ষা করছিল বর্ষশেষের উৎসবের যার পরেই তারা ঘোষণা করল যে তাকেও কিছুদিনের জন্য বিদেশে পড়তে যেতে হবে। অবশ্য তার দাদার মতো নয়, সে সানফ্রানসিসকোতে লিলিয়ান মাসি, আইজ্যাক মেসো আর তার তিন মাসতুতো ভাই-বোনের সঙ্গেই থাকবে, তাদেরই বাড়িতে।

ড্যানজিগ থেকে লন্ডন এবং তারপর সাদাম্পটন যেখানে তারা আটলান্টিক পেরিয়ে সানফ্রান্সিসকোতে যাবার জন্য যাত্রীবাহী জাহাজে চড়েছিল - এই পুরো যাত্রাপথে সময় লেগেছিল সতেরো দিন। মেনডেল পরিবার আলমাকে নিরাপদে ও সুস্থভাবে বেলাসকোর বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য তার ইংরেজ গভর্নেস মিস হানিকুমকে দায়িত্ব দিয়েছিল। মিস হানিকুম, এক বয়স্কা চিরকুমারী, তার ছিল ভনিতাপূর্ণ বাচনভঙ্গি, রুচিবাগীশ আচরণ আর দেমাকি চালচলন। সামাজিকভাবে তার চেয়ে অধস্তনদের সে ঘৃণার চোখে দেখত, যখন উর্ধতনদের প্রতি তার ছিল আবেগের আতিশয্যে অস্বস্তিকর দাসসুলভ মনোবৃত্তি ; তবুও মেনডেল পরিবারে আঠারো মাসের কর্মসূত্রে সে তাদের আস্থা জিতে নিয়েছিল। কেউ তাকে পছন্দ করত না, আলমা তো একেবারেই না, কিন্তু ছোটোকালে বাড়িতে তার গভর্নেস বা টিউটর বেছে নেবার ক্ষেত্রে তার মতামতের কোনও মূল্যই ছিল না। মধুর ঢঙে তোয়াজ করে মিস হানিকুমকে একটা মোটা রকমের বোনাস দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার নিয়োগকর্তা যদি সে আলমাকে সানফ্রানসিসকোয় তার আত্মীয়ের বাড়ি নিরাপদে পৌঁছে দেয়। তারা দুজন জাহাজের শ্রেষ্ঠ কেবিনের একটিতে চড়ে বসেছিল ; প্রাথমিকভাবে তারা হয়ে পড়েছিল জাহাজের দুলুনি- আক্রান্ত ও পরে চরম একঘেয়েমি তাদের পেয়ে বসেছিল। ওই ইংরেজ মহিলা প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না এবং তার নিজের সামাজিক শ্রেণির যাত্রীদের সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়ার চাইতে জাহাজ থেকে নিজেকে ছুঁড়ে ফেলাই শ্রেয় মনে করছিল। এর ফলে, এক পক্ষকাল পার করেও সে একমাত্র আলমা ছাড়া আর কারও সঙ্গে কোনও বাক্যালাপ করেনি। জাহাজে যদিও তার বয়সী ছেলেমেয়ে আরও ছিল আলমা তাদের পরিকল্পিত ক্রিয়াকলাপে আগ্রহী ছিল না, তাই সেখানে তার কোনও বন্ধুও গড়ে ওঠেনি। তার গভর্নেসের সামনে সে গোমড়ামুখে থাকত আর গোপনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত কেননা এই প্রথম সে মায়ের থেকে দূরে এসেছে। পুরো সমুদ্রযাত্রা সে রূপকথার গল্প পড়ে আর অতিনাটকীয় চিঠি লিখে কাটিয়ে দিল ; চিঠিগুলো সে সরাসরি জাহাজের ক্যাপ্টেনকে দিত, যে কোনও বন্দরে পোস্ট করে দেবার জন্য, মিস হানিকুমকে দিতে ভয় পেত কেননা তার মনে হত তাকে দিলে সে সেসব জলে ফেলে দেবে, মাছের খাবার জন্য। তার একমাত্র স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল যখন জাহাজ ধীরগতিতে পানামা খাল পেরোচ্ছিল আর এক মজার পোশাক পরা পার্টি যেখানে উত্তর আমেরিকার আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের পোশাক পরিহিত একজন তার গভর্নেসকে ধাক্কা মেরে সুইমিং পুলে ফেলে দিয়েছিল ; গভর্নেস এক গ্রিসিয়ো উৎসর্গীকৃত কুমারীর পোশাক পরেছিল।

বেলাসকো মেসো, মাসি আর মাসতুতো ভাই - বোনেরা সানফ্রান্সিসকোর জাহাজঘাটায় আলমার জন্য অপেক্ষায় ছিল যেখানে এশিয়ো মাল- খালাসি শ্রমিকের দল এত বেশি থিকথিক করছিল যে মিস হানিকুমের আশঙ্কা হল তারা হয়তো ভুল করে সাংহাই বন্দরে নেমে পড়েছে। এরমধ্যেই ধূসর রঙের পারস্যের ভেড়ার লোমের কোট গায়ে আর তুরস্কের পাগড়ির মতো টুপি মাথায় লিলিয়ান মাসি তার বোনঝিকে এমন আবেগে চেপে ধরল যে আলমার শ্বাসরোধ হবার জোগাড় আর ওদিকে আইজ্যাক মেসো আর তার গাড়ির শোফার আলমাদের চোদ্দটা ট্রাঙ্ক আর বোচকা এক জায়গায় করার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। দুই মাসতুতো বোন মার্থা আর সারা গালে আলতো শীতল চুমু দিয়ে নতুন অতিথিকে স্বাগত জানাল, তারপর তার উপস্থিতিই ভুলে গেল — না, হিংসা -টিংসা থেকে নয় বরং তা এই কারণে যে তাদের বয়স অনুযায়ী ছেলেবন্ধুর খোঁজ করাই দস্তুর এবং এই আচ্ছন্নতায় তারা জগতের অন্যান্য বস্তুর প্রতি ছিল চরম উদাসীন। বেলাসকো পরিবারের অতুল বৈভব ও মানসম্মান থাকা সত্ত্বেও এই মেয়ে দুটোর জন্য বহু খোঁজাখুঁজি করেও উপযুক্ত পাত্র পাওয়া সহজ হয়নি যেহেতু উত্তরাধিকারসূত্রে এরা বাবার নাক আর মায়ের মোটাসোটা দৈহিক গড়ন পেয়েছিল, কিন্তু অতি সামান্যই পেয়েছিল বাবার বুদ্ধিমত্তা আর মায়ের সহৃদয়তা। তার মাসতুতো ভাই ন্যাথানিয়েল, একমাত্র ছেলে, সারার চাইতে ছ বছরের ছোটো, সবে বয়ঃসন্ধির দোরগোড়ায় আর তার হাবভাবে সারসের লাজুকতা। চেহারায় পাংশু, অস্থিসার, ঢ্যাঙা, শরীরে যেন অনেক কনুই ও হাঁটু যা নিয়ে তার অস্বস্তির একশেষ কিন্তু তার চোখদুটি বিশাল এক কুকুরের চোখের মতো বিষাদময় আর ভাবব্যাকুল। সে সারাক্ষণ মাটিতে চোখ নামিয়ে থাকল এবং মা-বাবা পীড়াপীড়ি করাতে আলমার দিকে হাত বাড়িয়ে বিড়বিড় করে তাকে অভ্যর্থনা জানাল। আলমা লাইফ জ্যাকেটের ঢঙে তার হাত এমনভাবে আঁকড়ে ধরল যে তা থেকে ছাড়ান পাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হল ন্যাথানিয়েলের। 
 
এভাবেই সি ক্লিফের বিশাল বাড়িটায় শুরু হল আলমার অবস্থান যেখানে তাকে সত্তরটা নিরবচ্ছিন্ন বছর কাটাতে হয়েছিল। ১৯৩৯ এর প্রথম কয়েক মাসেই তার জমা চোখের জল প্রায় সবটাই ফুরিয়ে গিয়েছিল এবং তারপর থেকে সে ক্বচিৎ কান্নাকাটি করত। সে তার কষ্টাদি একাই সহ্য করতে শিখেছিল এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজেকে বুঝিয়েছিল, কেউই অন্যের সমস্যায় আগ্রহী নয় বরং নীরবে সহ্য করা যন্ত্রণা ঘটনাচক্রে উবে যায়। সে তার বাবার দর্শনকে অঙ্গীভূত করেছিল : বাবা ছিল এক অনড় ও অবিচল নীতির মানুষ, নিজের জন্য যাবতীয় কৃত্যে গৌরবান্বিত, এবং কারও কাছে কিছুমাত্রায় ঋণী ছিল বলে মনে করত না যা সঠিক ছিল না। সাফল্যের যে সহজ মশলা মেনডেল জন্মাবধি সন্তানদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল তা হল, কখনও কোনও অভিযোগ না করা, কোনও কিছুর জন্য আবদার না করা, যে কাজে লেগে থাকবে সেখানে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য লড়ে যাওয়া আর কাউকে কখনও বিশ্বাস না করা। কয়েক দশক ধরে আলমাকে এই ভারী বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়েছে যতদিন না ভালোবাসা তার কিছু কিছু উপশম ঘটিয়েছে। তার গোপন কিছু লুকিয়ে রাখার অনেক আগেই সুখেদুঃখে নির্বিকার মনোভাব তার চারদিকের রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিল। 
 
বিশ্বময় চরম অর্থনৈতিক মন্দার (১৯২৯-৩৯) কালে আইজ্যাক বেলাসকো শুধু যে সেই সংকটের নিকৃষ্টতম প্রভাব এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল তাই নয়, বরং এই দুরবস্থায় সে তার সম্পদ বেশ বাড়িয়ে নিয়েছিল। অন্যেরা যখন সবক্ষেত্রেই পরাস্ত হচ্ছিল সে তার আইন ব্যবসায় দিনে আঠারো ঘন্টা শ্রম দিয়েছে এবং সেই সময়ের ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে আখেরে চরম বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। সে ছিল নিয়মনিষ্ঠ, অল্প কথার মানুষ, কিন্তু মনটি নরম। সে এই কোমলতাকে চারিত্রিক দুর্বলতা হিসেবে দেখেছে আর তাই চেষ্টা করেছে নিজের আচরণে কঠোর কর্তৃত্বের ছাপ ধরে রাখতে, কিন্তু যে এক দুবার তার সঙ্গে গভীরে মিশেছে সে তার অন্তরের উদারতার পরিচয় পেয়েছে। করুণা প্রদর্শনের জন্য সে খ্যাতি অর্জন করেছিল যা ঘটনাক্রমে তার আইন ব্যবসার ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক হয়েছিল। পরবর্তীকালে, যখন সে ক্যালিফোর্নিয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদের জন্য চেষ্টা করেছিল, সে নির্বাচনে হেরে যায় কেননা তার প্রতিপক্ষ দল তাকে অভিযুক্ত করেছিল অতিরিক্ত দয়াশীল হবার অভিযোগে যা কি না ন্যায়বিরুদ্ধ তথা জন- নিরাপত্তার পরিপন্থী। 
 
যদিও আইজ্যাক আলমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, অচিরেই তার রাত্রিকালীন কান্না তাকে বেশ ঘাবড়ে দিল। আলমার আলমারির খোদাই করা মোটা মেহগনি কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে তার গলায় জড়িয়ে যাওয়া ফোঁপানি শোনাই যায় না প্রায়, তবুও সেই আওয়াজ দূর হলঘরে যাওয়ার পাশে আইজ্যাকের শোবার ঘরে পৌঁছে যায় যেখানে রাতে সে পড়াশোনা করতে চেষ্টা করে। তার ধারণা, প্রাণীদের মতো শিশুদেরও মানিয়ে নেবার স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে আর এই মেয়েটি অচিরেই মা-বাবার কাছ থেকে ছাড়াছাড়িতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, কিংবা তারা আমেরিকায় পাকাপাকি চলে আসবে। তাকে সাহায্য করতে পারছে না বলে আইজ্যাক অক্ষমতা বোধ করে, কেননা মেয়েদের ব্যাপার বলে স্বাভাবিক অস্বস্তিতে তাকে বাধাগ্রস্ত থাকতে হয়। সে তার স্ত্রী আর মেয়েদের প্রচলিত প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারে না, সুতরাং কোন সুযোগে সে এই পোল কন্যার বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে যার বয়স তখনও আট পূর্ণ হয়নি? ক্রমে তার মধ্যে এক কুসংস্কারাচ্ছন্ন বোধ গেঁড়ে বসল যে তার এই শ্যালিকা- কন্যার চোখের জল বড়ো এক পরিণতির বার্তা বয়ে আনবে। ইওরোপব্যাপী মহাযুদ্ধের ক্ষত তখনও মিলিয়ে যায়নি : ট্রেঞ্চ খুঁড়ে খুঁড়ে সমভূমি সব বিকৃত হয়ে গেছে, লক্ষ লক্ষ মৃতদেহ, বিধবা ও অনাথের দল, ছিন্নবিচ্ছিন্ন ঘোড়াদের পচে যাওয়া শব, প্রাণঘাতী গ্যাস, মাছিদের উৎপাত আর চারদিকে ক্ষুধিত মানুষের হাহাকার - সবকিছু স্মৃতিতে অমলিন। কেউই আর একটা এমন মারণ- যুদ্ধ চায় না, কিন্তু হিটলার ইতোমধ্যেই অস্ট্রিয়াকে গিলে নিয়েছে আর চেকোশ্লোভাকিয়ার খানিকটা অংশেও নিজ নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে; শ্রেষ্ঠ জাতির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য তার যে জ্বালাময়ী আহ্বান তাকে কখনোই উন্মাদের প্রলাপ বলে নস্যাৎ করা যায় না। সেই জানুয়ারির শেষে, হিটলার বিশ্বকে ইহুদিদের মতো ভয়ানক আপদ থেকে মুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। কিছু কিছু শিশুর অলৌকিক মানসিক ক্ষমতা থাকে, আইজ্যাক ভাবল, আর তাই এটা মোটেও বেখাপ্পা নয় যদি আলমা তার দুঃস্বপ্নের মাঝে ভয়ংকর কিছু দেখে থাকে আর এক পূর্বাশঙ্কামূলক কষ্টে সিঁটিয়ে থাকে। কেন তার ভায়রাভাই এখনও পোল্যান্ড ছেড়ে আসার অপেক্ষা করছে? বছরখানেক থেকে সে তাদের ইওরোপ থেকে পালানোর জন্য ব্যর্থ চাপ দিচ্ছে, যেমনটি করছে অন্যান্য অনেক ইহুদি। সে তাদের যথাযথ আতিথেয়তার আশ্বাস দিয়েছে যদিও মেনডেলরা যথেষ্ট সচ্ছল এবং তার কাছ থেকে তাদের কোনও আর্থিক সাহায্যের দরকার নেই। বারুজ মেনডেল বলেছিল যে পোল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স দ্বারা নিশ্চিত। তার মনে হয়েছিল, সে নিরাপদ, তার অর্থ আর ব্যবসায়িক যোগসূত্রে সে সুরক্ষিত, সুতরাং যে একমাত্র ছাড় সে দিতে পারে, এই নাৎসি প্রচারের কঠোর আঘাতের ক্ষেত্রে, তা হল, তার সন্তানদের বাইরে পাঠানো, এই ঝড়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য। আইজ্যাক বেলাসকো মেনডেলকে সেভাবে জানত না, কিন্তু তার চিঠিপত্র আর তারবার্তা থেকে সে বুঝেছিল, তার এই ভায়রাভাইটি স্বভাবে উদ্ধত, আর জেদি বলে অপছন্দের মানুষ। 
 
মাসখানেক যাবার আগেই আইজ্যাক শেষ পর্যন্ত স্থির করে যে আলমার এই নাটকীয় ব্যাপারে সে হস্তক্ষেপ করবে কিন্তু তবুও সে ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে জড়াতে পারে না যেহেতু তার মনে হয়েছে, এই সমস্যা তার স্ত্রীর এখতিয়ারে পড়ে। রাতে একমাত্র এক নিয়মিত অর্ধেক খোলা দরজা স্বামী - স্ত্রীকে আলাদা করে রাখে, কিন্তু লিলিয়ান কানে কম শোনে আর ঘুমোনোর জন্য আফিমের আরক সেবন করে আর তাই সে কখনোই আলমারির মধ্যেকার ফোঁপানির বিষয়টা জানতেই পারত না যদি না তার স্বামী ব্যাপারটা তাকে ধরিয়ে দিত। ইতোমধ্যে মিস হানিকুম আর তাদের সঙ্গে থাকে না। সানফ্রান্সিসকোয় আলমাকে পৌঁছে দিয়ে সে তার প্রতিশ্রুত বোনাস পেয়ে যায় আর বারো দিন পর সে তার দেশে ফিরে যায়; তার কথামতো বেলাসকোদের আচরণ অভদ্র, অবোধ্য উচ্চারণে কথা বলে, আর আমেরিকিদের গণতান্ত্রিকতা — এটা ভাবলই না, এইসব মন্তব্য বেলাসকোদের মতো রুচিশীল পরিবারের পক্ষে কতটা অসম্মানজনক যারা কিনা তার সঙ্গে কোনওরূপ অবমাননাকর আচরণ করেনি। লিলিয়ান যখন বেশ দেরিতে তার বোনের একটা সতর্কতামূলক চিঠি পেল তখন আলমার ভ্রমণ কোটের ধারের সেলাই খুলে দেখল, চিঠিতে যে হীরের কথা বলা হয়েছে সে সব উধাও। মেনডেলরা সেগুলিকে মোক্ষম গোপন স্থানে রেখেছিল যতটা না ভাগ্যবিপর্যয়ের হাত থেকে মেয়েকে রক্ষা করার জন্য তার চাইতে বেশি ঐতিহ্যগত ভাবনা থেকে কেননা ওই পাথরগুলো বিশেষভাবে মূল্যবান নয়। যাই হোক, তৎক্ষণাৎ সন্দেহ গিয়ে পড়ল মিস হানিকুমের ওপর আর লিলিয়ান তার স্বামীকে পরামর্শ দিল, তার আইনব্যবসার একজন তদন্তকারীকে পাঠানো হোক সেই ইংরেজ মহিলাকে যেখানে পাবে তার মোকাবিলা করে চুরির দ্রব্যাদি উদ্ধার করতে। আইজ্যাক বদ্ধপরিকর হয়ে বলল, এই ঝামেলায় এখন না জড়ানোই ভালো। গোটা বিশ্ব তৎসহ তার পরিবার যথেষ্ট অস্থিরতার মধ্যে আছে আর এর মাঝে সমুদ্র, মহাদেশ পেরিয়ে গভর্নেসদের তাড়া করে বেড়ানো এখন অসম্ভব ; কমবেশি কয়েকটি হীরের টুকরোর ওজন আলমার জীবনের চেয়ে বেশি হবে না। 
 
'আমার ব্রিজ খেলার সঙ্গীরা বলছিল, সানফ্রান্সিসকোয় এক বিস্ময়কর শিশু - মনোবিজ্ঞানী আছেন ', বোনঝির কষ্টের কথা জানার পর লিলিয়ান তার স্বামীকে বলল।

' সে আবার কেমন হবে?', ক্ষণিকের জন্য খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলে বাড়ির কর্তা জিজ্ঞেস করল।

' নামেই তা বোঝা যাচ্ছে, আইজ্যাক, বুঝতে না পারার ভান কোরো না। '

' তুমি কি তোমার বন্ধুদের এমন কাউকে জানো যার এরকম একটি সমস্যাসংকুল শিশু আছে যাকে তারা মনোবিদদের কাছে নিয়ে গেছে?'

' নিঃসন্দেহে তারা যায়, আইজ্যাক, কিন্তু তারা আজীবন তা স্বীকার করে না। '

' স্বাভাবিকভাবেই শৈশব আমাদের অস্তিত্বের একটা অসুখী পর্যায়, লিলিয়ান। ওয়াল্ট ডিজনি এই ধারণার আবিষ্কর্তা যে অর্থোপার্জনের জন্য সুখী হতে হবে। '

' তুমি বড্ড একগুঁয়ে! আমরা আলমাকে চিরদিনের জন্য এইভাবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে শেষ হয়ে যেতে দিতে পারি না। আমাদের একটা কিছু করতেই হবে। '

' ঠিক আছে, লিলিয়ান। সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলে আমরা চরম ব্যবস্থার আশ্রয় নেব। আপাতত রাতে ওকে তোমার আফিমের আরক কয়েক ফোঁটা দিতে পারো।'

' আমি নিশ্চিত নই আইজ্যাক। এটা এমন এক তরবারি যার দু'দিকেই ধার। জীবনের শুরুতেই মেয়েটিকে আমরা আফিমাসক্ত করে তুলতে চাই না। ' 
 
তারা এভাবেই মনোবিদ আর আফিমের আপেক্ষিক গুণাগুণ নিয়ে তর্ক চালিয়ে যেতে লাগল যখন তারা বুঝতে পারল, তিন রাত ধরে আলমারির ভিতর থেকে আর কোনও আওয়াজ আসছে না। তারা আরও দু রাত কান পেতে রইল এবং নিশ্চিত হল, কোনও অজানা কারণে মেয়েটি চুপ মেরে গেছে আর রাতভর যে ঘুমিয়েছে তাই শুধু নয়, স্বাভাবিক শিশুর মতো খাওয়াদাওয়াও শুরু করেছে। আলমা তার মা-বাবা বা দাদাকে ভুলে যায়নি, এবং এখনও যত তাড়াতাড়ি হয় পরিবারের সঙ্গে মিলতে চায়, কিন্তু তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে আর সে সেই দুজনের সঙ্গে তার মুকুলিত বন্ধুতা উপভোগ করতে চলেছে যারা তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা হয়ে উঠবে : ন্যাথানিয়েল বেলাসকো আর ইছামেই ফুকুদা। ন্যাথানিয়েল তেরোয় পড়বে আর সে বেলাসকোদের কনিষ্ঠ সন্তান। আলমার মতো ইছামেইও প্রায় আট ; সে ছিল মালির কনিষ্ঠ পুত্র। 
 
বেলাসকো পরিবারের দুই কন্যা মার্থা ও সারা আলমার চাইতে এমন এক আলাদা পৃথিবীতে বাস করে যেখানে ফ্যাশন, পার্টি, আর সম্ভাব্য ছেলেবন্ধু নিয়েই তারা ব্যস্ত ; তা এমতাবস্তায় সি ক্লিফ অট্টালিকার কোনও কোণে বা ফাটলে কিংবা ডাইনিং হলের খাবার টেবিলে কদাচিৎ হঠাৎ আলমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে গেলে তারা চমকে উঠত, যেন তারা মনেই করতে পারত না, মেয়েটা কে বা সেখানে সে কী করছে। অপরপক্ষে ন্যাথানিয়েল তাকে উপেক্ষা করতে পারত না কেননা প্রথম দিন থেকেই আলমা তার পেছনে ঘুরঘুর করত, সে বদ্ধপরিকর ছিল, তার প্রিয় দাদা স্যামুয়েলের জায়গায় এই লাজুক তুতো দাদাকে বসাবে। যদিও সে আলমার চাইতে পাঁচ বছরের বড়ো তবুও সে ছিল বেলাসকো পরিবারের অন্যদের চাইতে বয়সের খুব কাছাকাছি এবং তার সুভদ্র ব্যবহারের জন্য মেলামেশার ক্ষেত্রে সহজগম্য। ন্যাথানিয়েলের মধ্যে আকর্ষণশক্তি আর ভয়ের এক মিশেল জাগিয়ে তুলেছিল সে। আর তার কাছে আলমাকে মনে হয়েছিল পুরনো ধাঁচের কোনও ফোটো- অ্যালবাম থেকে বেরিয়ে আসা কেউ, তার গম্ভীর হাবভাব, কথায় ভানপূর্ণ ব্রিটিশ উচ্চারণ যা সে শিখেছিল তার কুটিল গভর্নেসের কাছ থেকে। একটা তক্তার মতো সে অনমনীয়, তির্যক আর ভ্রমণ - ট্রাঙ্কের ভিতরে রাখা ন্যাপথলিনের গন্ধ শোঁকে ; তার উদ্ধত শাদা চুলের গোছা যা তার কপালে ছড়িয়ে পড়ে এবং যা তার বাকি কালো চুল আর জলপাই রঙের দেহ- চামড়া থেকে জোরালোভাবে পৃথক। প্রথম প্রথম ন্যাথানিয়েল পালাতে চেষ্টা করত, কিন্তু যখন কোনওভাবেই আলমার বন্ধুতার বেখাপ্পা প্রচেষ্টা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারছিল না, সে আত্মসমর্পণ করল। সে তার বাবার দয়ালু হৃদয় পেয়েছে এবং তার এই তুতো বোনের গোপন যন্ত্রণার কথা স্বজ্ঞানুভূতি দিয়ে বুঝেছে যা সে অহংকারের সঙ্গে লুকিয়ে রাখত। তবুও সে আলমাকে সাহায্য না করার জন্য নানান অজুহাত খুঁজে বেড়াত। মেয়েটা খানিক দুর্বিনীত, খুব নিকট আত্মীয়ও নয়, কিছুদিনের জন্য সানফ্রানসিসকোয় এসেছে আর তাই তার সঙ্গে বন্ধুতা পাতানো সময়ের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তিন সপ্তাহ পেরিয়ে যাবার পরও এই তুতো বোনটার চলে যাবার কোনও লক্ষণ নেই, তাই তার অজুহাতগুলোও দুর্বল হয়ে আসছিল আর সে কারণে ন্যাথানিয়েল তার মায়ের কাছে জানতে গেল যে তারা মেয়েটাকে দত্তক নেবার কথা ভাবছে কি না। লিলিয়ান কেঁপে উঠে বলল,' আশা করি, বিষয়টা সেই পর্যায়ে যায়নি। ' ইওরোপের খবরাখবর খুবই বিচলিত হবার মতো এবং তার এই বোনঝি যে অনাথ হয়ে যেতে পারে সেই ভাবনা ধীরে ধীরে তার মাথায় বাসা বাঁধছে। মায়ের উত্তরের আঁশ থেকে ন্যাথানিয়েল সিদ্ধান্তে এল যে আলমা সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে, আর তাই মেয়েটির যত্ন নিতে সে তার সহজাত প্রবৃত্তির বশ্যতা শিকার করে নিল। সে তাদের বাড়ির অন্য এক শাখায় ঘুমোত এবং কেউ তাকে বলেনি যে আলমা আলমারির মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত, কিন্তু সে কোনওভাবে তা আবিষ্কার করে ও বেশ কিছু রাতে সে চুপিচুপি তার সঙ্গে দেখা করতেও গেছে। 
 
এই ন্যাথানিয়েলই ফুকুদা পরিবারের সঙ্গে আলমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। সে ঘরের জানলার ফাঁক দিয়ে তাদের দেখেছিল কিন্তু বাইরে বেরিয়ে বাগানটি ঘুরে দেখেনি যতক্ষণ না বসন্তকালে আবহাওয়ার উন্নতি হয়। এক শনিবারে ন্যাথানিয়েল আলমার চোখ বেঁধে বলল যে তার জন্য এক বিস্ময় অপেক্ষা করছে। তারপর সে তাকে রান্নাঘর আর লন্ড্রির মাঝ দিয়ে বাগানে নিয়ে গেল। চোখের বাঁধন খুলে দিলে সে ওপরপানে তাকিয়ে দেখল, একটি ফুল - শোভিত চেরি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে, যেন গোলাপি তুলোর মেঘে ছেয়ে আছে চারদিক। গাছটির কাছেই এক বেঁটে,চওড়া কাঁধের এসিয়ো মানুষ, মোটা কাপড়ের তৈরি শ্রমিকের পোশাক ( ওভারঅল) পরে, মাথায় খড়ের টুপি চাপিয়ে কোদালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো মুখ, থেমে থেমে ইংরেজি বলছে যা বুঝে ওঠা কঠিন এবং সেভাবেই আলমাকে বলল যে এই মুহূর্তটি খুব সুন্দর আর কয়েকটি দিন মাত্র এটি থাকবে, তার পরেই ফুলগুলি বৃষ্টির মতো মাটিতে ঝরে পড়বে ; প্রস্ফুটিত চেরি গাছের স্মৃতি ছিল খুবই মনোরম কারণ পরবর্তী বসন্তকাল অবধি তা স্থায়ী হত। এই জাপানি মালির নাম তাকাও ফুকুদা যে বেশ কিছু বছর যাবৎ সি ক্লিফ বাগানে কাজ করছে আর এই একমাত্র ব্যক্তি যাকে দেখে আইজ্যাক বেলাসকো মাথার টুপি খুলে নত হয়। 
 
তাকাও-এর কাছে আলমাকে ছেড়ে ন্যাথানিয়েল বাড়ির ভিতর গেল ; তাকাও ঘুরে ঘুরে বাগানের বাকি অংশ ওকে দেখাল। সে তাকে পাহাড়ের পাশে গড়ে তোলা উঁচু চত্বর সব দেখাল, সেই চূড়া দেখাল যেখান থেকে খাড়ানো বাড়িটা সমুদ্রতীরের দিকে নেমে গেছে। ঐতিহ্যবাহী মূর্তিগুলির মাঝের সরু পথ ধরে সে আলমাকে নিয়ে চলল, সেই মূর্তিগুলিতে স্যাঁতসেঁতে সবুজ শ্যাওলা পড়েছে, আরও গেল ঝরনা, বিদেশি অপরিচিত গাছের সারি, আর সুস্বাদু ফলের গাছের মাঝ দিয়ে ; কোত্থেকে সব আনা হয়েছে আর তাদের কী ধরনের যত্নের প্রয়োজন, যতদিন না তারা জাফরির মতো আচ্ছাদন পর্যন্ত ওঠে যা লতানো গোলাপে ঢাকা, মহাসমুদ্রের পূর্ণ দৃশ্যসহ, আবার উপসাগরে ঢোকার জন্য বাঁদিকের পথ আর ডানদিকের গোল্ডেন গেট ব্রিজ, কয়েক বছর আগে যার উদ্বোধন হয়েছিল - সবকিছু তাকে দেখাল তাকাও। টিলার মাঝে বিশ্রামরত সিল মাছেদের আখড়াও দেখা গেল, আর দিগন্তরেখা নিরীক্ষা করে সে আলমাকে বলল, ধৈর্য ধরে থাকলে আর কপাল যদি ভালো হয় তবে কখনও কখনও তিমিরও দেখা মিলতে পারে যারা উত্তর দিক থেকে আসে ক্যালিফোর্নিয়ার জলে তাদের সঙ্গিনীদের সঙ্গে মিলতে। এরপর তাকাও তাকে গ্রিনহাউজ দেখাল যা সাবেক ভিক্টোরিয়ো রেলস্টেশনের ছোটোখাটো প্রতিরূপ বলা যায়, পুরোটা যার পেটানো লোহা আর কাচ দিয়ে তৈরি। ফিলটার করা আলোর সুবাদে এর ভিতরে আর্দ্র উষ্ণতা অনুভব করা যাচ্ছিল আর সেখানে ছিল বায়ুকে আর্দ্র করার যন্ত্র, হিউমিডিফায়ার, ট্রের ওপরে কোমল চারাগাছগুলি বেড়ে ওঠা শুরু করেছে, প্রতিটির গায়ে নামের লেবেল সাঁটা আর কবে সেগুলিকে তুলে অন্যত্র লাগানো হবে সেই তারিখও লেখা আছে। দুটো লম্বা খরখরে কাঠের টেবিলের মাঝে আলমা একটি ছেলেকে দেখতে পেল যে কয়েকটি চারাগাছের ওপর ঝুঁকে আছে। সে এদের আসতে দেখে হাতের ডালছাঁটা কাঁচিজোড়া মাটিতে ফেলে সৌজন্যের খাতিরে দৃঢ়ভাবে খাড়িয়ে গেল। তার কাছে গিয়ে তাকাও ফিসফিসিয়ে তাদের ভাষায় কিছু বলল যা আলমা বুঝতে পারল না এবং সে তার মাথার চুলেও বিলি কেটে দিল। ' আমার ছোটো ছেলে ', সে বলল। আলমা চোখ বড়ো করে বাবা আর ছেলের দিকে তাকাল, এমনভাবে যেন মনে হল তারা ভিন্ন প্রজাতির মানুষ। এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় যে সব চীনাদের ছবিটবি সে দেখেছে এরা তাদের মতো নয়। 
 
ছেলেটা মাথা নুইয়ে আলমাকে অভিবাদন জানাল এবং মাথা নিচু রেখেই নিজের পরিচয় দিল।

' আমি ইছামেই, তাকাও আর হেইদেকো ফুকুদার চার নং সন্তান। তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমি সম্মানিত, মিস। '

' আমি আলমা, আইজ্যাক আর লিলিয়ান বেলাসকোর বোনঝি। তোমার

সঙ্গে আলাপ হওয়ায় আমিও সম্মানিত, স্যার ', আলমা উত্তরে বলল, সে হতবাক কিন্তু খুশি।

আলাপের এই প্রাথমিক লৌকিকতা যা সময় চলনের সঙ্গে সঙ্গে হাস্যরসে রেঙে উঠল, তা তাদের জীবনভর সম্পর্কের সুর বেঁধে দিল। ইছামেইয়ের চাইতে লম্বা আর হৃষ্টপুষ্ট আলমাকে ছেলেটির চাইতে বয়স্ক মনে হত। ইছামেইয়ের পাতলাপুতলা গড়ন দেখে ভুল বোঝা স্বাভাবিক ছিল যে সে ভারী ভারী মাটির বস্তা অনায়াসে তুলে নিত আর মালবোঝাই এক জন্তুর ঠেলাগাড়ি উঁচু পাহাড়পথে ঠেলে নিয়ে যেত। দেহের অনুপাতে তার মাথাটি ছিল বড়ো ; গায়ের রং ছিল মধুর মতো, প্রসারিত কালো চোখ আর চুল ছিল মোটা, বেয়াড়া। তখনও তার সাবালকত্বের দাঁত উঠছে ; যখন সে হাসত, মনে হত চোখদুটি বুজে গিয়েছে। 
 
সেই সকালের বাকি সময়টা আলমা ইছামেইয়ের পেছন পেছন ঘুরল আর ছেলেটি তার বাবার খোঁড়া গর্তে চারাগাছ পুঁততে লাগল ; আবার সে আলমাকে বাগানের গুপ্ত কাহিনি বোঝাতে লাগল, মাটির নিচের শেকড়বাকড়, প্রায় অদৃশ্য কীটপতঙ্গ, নবাঙ্কুর যা এক সপ্তাহের মধ্যে কয়েক ইঞ্চি বেড়ে যাবে - সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝাতে লাগল। গ্রিনহাউজ থেকে বের করে আনা উজ্জ্বল ক্রিস্যানথিমাম এবং কীভাবে বসন্তকালে সেগুলো লাগানো হয়, শরতের শুরুতেই ফুল ফুটবে বলে যাতে করে তারা বাগানকে রাঙিয়ে জীবন্ত রাখতে পারে, গ্রীষ্মের সমস্ত ফুল ঝরে যাবার পরেও - এ সবই ব্যাখ্যা করল সে। আলমাকে কিছু গোলাপের ঝাড় দেখাল সে এবং বুঝিয়ে দিল যে ফোটা কুঁড়িগুলোর মাঝ থেকে কীভাবে বেশিরভাগ ছেঁটে ফেলতে হয় যাতে করে বাকি ফুলগুলি বেশ বড়ো আকারের ও সুদৃশ্য হয়। সে বীজ থেকে গজানো চারা আর কন্দ বা গেঁড় থেকে বেড়ে ওঠা গাছের পার্থক্য বুঝিয়ে দিল - যেগুলো হয় রোদ বা ছায়া পছন্দ করে, বীজ থেকে গজানো বা অন্য জায়গা থেকে তুলে আনা। তাকাও ফুকুদা যে কিনা ওদের ওপর নজর রাখছিল, তাদের কাছে এসে গর্বের সঙ্গে বলল, ইছামেই গাছটাছ নিয়ে এই সূক্ষ্ম কাজগুলো করে কেননা সে জন্মে ইস্তক এ সবই দেখে আসছে। এই প্রশংসায় ছেলেটি লজ্জা পেল। 
 
সেইদিন থেকে আলমা এই মালিদের জন্য অস্থির অপেক্ষা করত আর তারা প্রতি সপ্তাহান্তে নিয়ম করে বাগানে আসত। তাকাও ফুকুদা সব সময় ইছামেইকে সঙ্গে আনত আর মধ্যেমাঝে, বাড়তি কাজ থাকলে, সঙ্গে চার্লস ও জেমসকেও আনত, তার বড়ো দুই ছেলে কিংবা তার একমাত্র মেয়ে মেগুমিও আসত। ইছামেইয়ের চাইতে কয়েক বছরের বড়ো দিদির একমাত্র আগ্রহ ছিল বিজ্ঞানে আর ধুলোমাটিতে হাত নোংরা করাকে সে ঘেন্না করত। ধৈর্যশীল ও নিয়মানুবর্তী ইছামেই আলমার উপস্থিতিতে অন্যমনস্ক না হয়ে আপনমনে নিজের কাজ করে যেত, বাবার ওপর এই বিশ্বাসটুকু রেখে যে দিনের শেষে আধ ঘন্টার জন্যও আলমার সঙ্গে সে খেলার অনুমতি পাবে।
-----------
মূলগল্প: THE POLISH GIRL
 
 
অনুবাদক পরিচিতি:
বিপ্লব বিশ্বাস
গল্পকার। অনুবাদক। প্রাবন্ধিক
কলকাতায় থাকেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ