হামিরুদ্দিন মিদ্যার গল্প : নকশি কাঁথা



বাবা বলে আমরা যেখানে বসবাস করছি,সেই জায়গাটা ছিল একটা মজে যাওয়া বিল,আর তার আশেপাশে ছিল ধানিজমি। ধান পাকতে আরম্ভ করলেই মাঠের জল আল কেটে বিলে নামিয়ে দেওয়া হত। শালুক,পদ্ম,কচুরিপানায় ভরা ছিল বিলটা। শীতকালে বিল শুকিয়ে এলে দাদু পাম্প লাগিয়ে জল সেঁচে পাক থেকে তুলে আনত,জিওল,পাঁকাল,কই,ল্যাটা,চ্যাঙ,গুঁতে। সেইসব মাছ কলাতলার ডোবায় জিঁইয়ে রেখে ধরে ধরে খাওয়া হত।
ট্রলি ট্রলি মাটি ফেলে সেই বিল বুজিয়েই আমাদের বাপ-কাকারা বাড়িঘর তুলেছে। মাঠগুলোও এখন আর মাঠ নেই। সব বসতবাড়ি হয়ে গেছে। দিনকে দিন মানুষ বাড়ছে,গেরস্থবাড়ি ভেঙে ছোট ছোট সংসার গড়ে উঠছে। অথচ দুনিয়ায় মাটির পরিমাণ সেই একই আছে।

পাড়াটাকে দেখলে কে বলবে,এককালে জায়গাটা আউশ ধানের গন্ধে ম-ম করত,শীতকালে বালিহাঁসের দল নেমে আসত! সকাল সন্ধ্যায় ডাউক পাখির দল কুঁয়া-কুঁয়া করে ডাক পাড়ত,শিয়ালের দল হুক্কা হুয়া রবে প্রহর ঘোষণা করত!

বিলের ধার ঘেঁষে একটা খেঁজুরগাছ ছিল। মুনিষরা ধান কাটতে এসে খেঁজুরতলায় বসে ভাত খেত,বিশ্রাম নিত। সেই খেঁজুরতলার উপরেই আমাদের ঘর। নতুন বাড়িতে পেরিয়ে এসেও বাবা নাকি মাসকতক ঘুমতে পারেনি। মাঝরাতে মাঝেমধ্যেই ধড়ফড় করে উঠে পড়ত। জিজ্ঞেস করলে বলত,পিঠে কাঁটা ফুটছে গো। খেঁজুরগাছটা মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

আমাদের বাড়ির সামনে এক ফালি উঠোন। উঠোনের পাশে একটা আঁজির গাছ। দুপুরের রান্না-খাওয়া চুকলে পাড়া-বাখুলের মেয়েরা সব একে একে তালাই,কাঁথা নিয়ে আঁজিরতলায় হাজির হয়। কেউ সুজনি কাঁথায় নকশা তোলে,কেউ উল দিয়ে বোনে কচি ছেলের শোয়েটার,মাথার টুপি,কেউ মেয়ের সাতমাসে সাধ দেওয়ার জন্য খেঁজুর পাতা লাল-সবুজ রঙে চুবিয়ে তালাই-চাটি বুনে রাখে। কোন রঙের পর কোন পাতা খাওয়ালে তালাইয়ে চাঁদ-সিতারা ফুটে উঠবে,ফুটে উঠবে মক্কা-মদিনা-কাবা শরীফ,সেসব মা-চাচীরা জানে। কোনও স্কুল-কলেজেও শিখতে যেতে হয় না তাদের। মুখে মুখেই হিসাব করে পাতা গুনে গুনে এমন নকশা তুলে দেবে,যা হা- করে চেয়ে দেখতে হবে।

সেই মজলিশে উঠে আসে দেশ-গাঁয়ের সাতকাহন। জানিস তো,ওমুক গাঁইয়ের এক কচি ছেলেকে হেঁড়লে খেয়ে নিইচে।

বলিশ কী লো!

হ্যাঁ লো হ্যাঁ,মিছে কথা লয়। ছেলেটা বড্ড বাপ লাগোটা,বাপটা কুথাও গেলেই যাবার লেগে কাঁদে। বাপ মাঠে গিয়েছিল ধান কাঁটতে। কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে গেল কচি ছেলেকে। আলে বসিয়ে দিয়ে ধান কাটতে লেগেছিল,আর মরার হেঁড়ল না গো-বাঘা সুড় সুড় করে এসে গলা চেপে ধরে নিয়ে গেল। খানিক পরে বাপটার মালুম হল,ছেলে কই! খোকা খোকা করে ডাকল। খোকা আর সাড়া দেয় না গো! তখন কাস্তে ফেলে ছুটে গেল বাপ, দেখে তাজা রক্ত। দু-দুটো হেঁড়ল ছেলেকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। ও মা গো মা! এমন দৃশ্য চোখে দেখা যায় না।

সবাই জিভ চুকচুক করল। যার কোলে কচি ছেলে,সে জাপটে ধরল নিজের ছেলেকে।

কার বউ নিজের পুরুষকে ফাঁকি দিয়ে পর পুরুষ নিয়ে ফষ্টিনষ্টি করছে,কে কেরলে কাজে গিয়ে বাপ-মাকে টাকা পাঠায় না,কোলের ছেলে দুধ না ছাড়তেই কার বউ আবার পোঁয়াতি,কার ছাগলের তিনটে ছানা হল-এরকম নানান কথা উঠে আসে। আবার কখনও চলে সিরিয়াল,সিনেমার আলোচনা। অমুক বাবুর বউ বড্ড হিংসুটে। নিজের দেওয়ের ভালো চায় না। এত নাক উঁচু ভালো লয় বাপু। শাশুড়িটার সাথে পিন করে করে এত ভালো সহজ সরল গাঁয়ের মেয়েটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেলেক। মেয়েটা গুণে বলো,কাজে বলো কম কীসে!

এখনই ঝামেলা মিটে গেলে সিরিয়াল চলবেক কী করে লো! আরও কিছুদিন যাক,দেখবি ওই মেয়েই সংসার আলো করে দিবেক। দেখিসনি অমুক সিরিয়ালটাতে কী হল,ওই একই জিনিস তো। এইসব গল্পগুজব সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। নামোপাড়ার মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলেই যে যার জিনিসপত্র নিয়ে উঠে পড়ে।

রাত্রে খেতে বসে বাবা একদিন তিতিবিরক্ত হয়ে মাকে বলল, তুমরা কী শুরু করেছ বলো তো! দুপুরে খেয়ে-দেয়ে একটু শান্তিতে ঘুমতেও পারব না? বারোভূত উঠোন জুড়ে খ্যামটা নাচ নেচে যাচ্ছে,সারাক্ষণ খালি হাঁসের মতো ক্যালব্যাল ক্যালব্যাল!

মা বলল, তুমার এত চোখজ্বালা কেনে! পাড়া-বাখুলে থাকতে গেলে মানুষ মানুষের ঘর আসা-যাওয়া করবে। এত যদি অসটা তাইলে জঙ্গলে বাস করো গা।

বাবা রেগে বোম। বলল,প্রাচীর না দিলে এইসব বন্ধ হবেকনি। কই অন্য বাড়িতে তো কাউকে যেতে দেখি না! খোলা উঠোন পেয়েছে,তাই সবার এখানেই বাথান। এই বাথান আমি ঘুচাচ্ছি।

বাবা যা বলে,তাই করে। কিছুদিনের ভেতরেই আমাদের বাড়ির চারিধারে প্রাচীর উঠল। প্রাচীরের গায়ে একটা দরজাও লাগানো হল। দরজাটা ভেতর থেকে সবসময় বন্ধ থাকে। কেউ কোনও প্রয়োজনে এলে বাইরে থেকে হাঁক পাড়ে। তখন খোলা হয়।

বাবার ফন্দিটা কাজে লাগল। কাউকে বারন করতেও হল না। প্রাচীর দেওয়ার পর আমাদের বাড়ি আসা একে একে বন্ধ করে দিল সবাই। মজলিশটা উঠে গেল।

মজলিশ তো উঠল,কিন্তু তালাই-কাঁথা বোনা বন্ধ হল কি! কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি মা সুজনি কাঁথার ডালাটা নিয়ে দুপুর হলেই ফুড়ুৎ করে কোথায় বেরিয়ে যাচ্ছে। এই খাঁ খাঁ দুপুরবেলা নিজের ঘরদোর থাকতে কোথায় যায় মা? কাঁথা কি ঘরে বসে বোনা যায় না? কৌতূহলবশত পিছু নিলাম একদিন। দেখলাম পাড়ার জাফর চাচাদের উঠোনে এখন মজলিশ বসছে। সেই একই দল,শুধু আমাদের উঠোন থেকে আড্ডাটা সরে চলে গেছে।

রাস্তার ধারেই জাফর চাচাদের বাড়ি। একদিন সকালে ওদিক দিয়েই পেরিয়ে যাচ্ছি,দেখলাম জাফর চাচার বড় ব্যাটা লিয়াকত গাঁইতি দিয়ে বোনেদ কাটছে। নারকেল তলায় ইট-বালিও নামানো হয়েছে। থমকে দাঁড়ালাম।

আমাকে দাঁড়াতে দেখে লিয়াকত নিজেই দাঁত ফেঁড়ে বলল,প্রাচীর দেব ভোম্বল। মাঠের ধান মড়াইয়ে উঠলেই আমার বিহা। নতুন বউ-ঝি আসছে ঘরে,তুই-ই বল,প্রাচীর-আচির না দিলে ঘরে ইমান থাকে?

বললাম, বিয়েঘর কোথায় লাগিয়েছিস?

নদীর পাড়ে বেনাচাপড়ায়,ওই যে আমার মেজ বুন জরিনার বিহা দিয়েছি না,ওদের পাশের গাঁয়েই।

জাফর চাচাদের বাড়ি থেকেও আড্ডাটা উঠে গেল। মাও আর কোথাও বেরয় না। কোথায় আর যাবে! মজলিশ বসানোর মতো আর কারও উঠোনই এখন খোলামেলা পড়ে নেই।

কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের পাড়াটা অনেক বদলে গেছে। অলিগলি,রাস্তাঘাট সব এখন ঢালাই হয়ে গেছে। মাটির বাড়ি আর চোখেই পড়ে না। সবার মোটামোটি পাকা বাড়ি হয়েছে,ছাদ না পেটাতে পারলেও টিন-এডবাস্টেডের ছাউনি দিয়েও ইটের বাড়ি তুলেছে অনেকে। প্রাচীর-আচির দিয়ে যে যার মতো বেঁচেবর্তে আছে। কার বাড়িতে পোলাও রান্না হল,আর কার বাড়ির উঁনুনে ভাত পুড়ল,সেই ঘ্রাণ আর প্রাচীর ডিঙিয়ে আসে না।

আমাদের উঠোনের আঁজিরগাছটাই একগাছ আঁজির ধরে। নিজেরা যা খাই খাই,বাকি পাখিতে কাঠবিড়ালিতে খেয়ে যায়। পেকে পড়ে যায় মাটিতে। নষ্ট হয়। পাড়ার সেই ছোট ছোট ছেলেপুলেরাও আর আঁজির খেতে আসে না। ঢিল ছুঁড়ে জ্বালাতন করে না।

মাকে দেখি এখন নিজেদের উঠোনেই চট পেতে একা বসে থাকে। সূচের ফোঁড়ে সুজনি কাঁথায় নকশা তোলে। আর নিজের মনেই গুই গুই করে কথা বলে।

একদিন মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মা টের পায়নি। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার সাথে কথা বলছিলে মা?

মা চমকে উঠল। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক রেখে জবাব দিল, আমার কি কথা বলার মানুষের অভাব আছে রে খোকা?

আমি বলি, কেউ তো নেই এখানে!

মা হাসল। এই দেখ তবে— বলে সুজনি কাঁথাটা আমার সামনে বিছিয়ে দিল।

দেখলাম,ওটা কাঁথা নয়,একটা আস্ত উঠোন বানিয়েছে মা। সেলাইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে ফুটে ওঠা প্রতিটি নকশা ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠল আমার চোখের সামনে। সেখানে কে নেই! লিয়াকতের মা আনসুরা চাচি,নইমুলের বউ হেনা ভাবি,টেরা সিদ্দিকের বউ দুলেহার,পাড়া বাখুলের আরও মেয়েরা। মায়ের নিজের হাতে বানানো এই উঠোন,আমাদের ঘরের সামনের একচিলতে উঠোনের থেকেও অনেক অনেক বড়,যার চারপাশে কোনও প্রাচীর নেই।




লেখক পরিচিতি:
তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকার হামিরউদ্দিন মিদ্যা বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী থানার অন্তর্গত প্রত্যন্ত রূপপাল গ্রামের বাসিন্দা। প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: আজরাইলের ডাক(সৃষ্টিসুখ),মাঠরাখা(সোপান)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

6 মন্তব্যসমূহ

  1. ব্রতী মুখোপাধ্যায়১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ এ ৯:৫৩ PM

    ভাল লাগল। চোখ না অণুবীক্ষণ! মনে থাকবে এই নকশি কাঁথা। গল্পখানিও নকশি কাঁথার মতো সমস্ত অনাড়ম্বর সৌন্দর্য নিয়ে শেষ প্রান্তে গুটিয়ে আনা হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. ঘুরেফিরে একই সাহিত্যিকের গল্প প্রকাশের মধ্যে আপনাদের মাহাত্ম্য কোথায়? দেশে কি আর ভালো সাহিত্যিক নেই? নাকি আপনারা চোখেই দেখেন না তাদের??

    উত্তরমুছুন
  3. খুব নিন্দুক। তাই বলি, ছেলেটার চন্দ্রবিন্দুর দোষ আছে। নইলে লেখা নয়তো সোনা বাঁধানো গহনা। লেখো হামির, লেখো। বাংলা বলে ছোটো করবো না, হীরে মণি মুক্তো দিয়ে গল্প সুন্দরীকে সাজিয়ে দাও।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মুছতে চেষ্টা করে পারলাম না। যদি কেউ কায়দাটা শেখান, উপকার হয়।

      মুছুন
  4. নেহাত নিন্দুক, তাই বলি, ছেলেটার চন্দ্রবিন্দুর দোষ আছে। নইলে সোনা বাঁধানো গল্প গো। লেখো হামির লেখো। লিখে লিখে বাংলা গল্প সুন্দরীকে হীরে মণি মুক্তো দিয়ে সাজিয়ে দাও।

    উত্তরমুছুন