মার্গারেট মিচেলের ধারাবাহিক উপন্যাস: আমার যেদিন গেছে ভেসে


পর্ব: ৩৪
ভাষান্তর: উৎপল দাশগুপ্ত

পরের দিন সকালে সূর্য মাঝে মাঝে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারছিল। যে ঝোড়ো হাওয়া সূর্যের ওপর থেকে মেঘ সরিয়ে দিচ্ছিল, সেই হাওয়াই শোঁ শোঁ শব্দ করে জানলার শার্সিতে ধাক্কা মারছিল। বৃষ্টি থামিয়ে দেওয়ার জন্য স্কারলেট প্রকৃতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাড়াতাড়ি একটা প্রার্থনা সেরে নিল। গত রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে দুর্ভাবনায় ঘুম আসতে চাইছিল না। ভয় হচ্ছিল বৃষ্টি না থামলে ওর ভেলভেটের পোশাক আর নতুন বনেটটা একেবারে মাটি হয়ে যাবে। এখন মাঝে মাঝে সূর্যের মুখ দেখতে পাওয়াতে মনটা খুশি খুশি হয়ে উঠল। আন্ট পিটি, ম্যামি আর আঙ্কল পিটার মিসেজ় বনেলের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে কাতরানো আর নিজেকে অবসন্ন দেখানোর ভান করতেই হল। অবশেষে বাইরের গেট বন্ধ হওয়ার শব্দ পেল। বাড়িতে এখন কুকি ছাড়া আর কেউ নেই। স্কারলেট লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে নতুন পোশাকটা আলমারি থেকে বের করে আনল। রাতে ঘুমনোর পর এখন নিজেকে বেশ তরতাজা লাগছে। পাষাণ শীতল হৃদয় থেকে সাহস সঞ্চয় করল। একজন পুরুষের সঙ্গে বুদ্ধির লড়াই করবার সম্ভাবনা – তা সে যে কোনো পুরুষই হোন না কেন – সব রকম ভাবে ওকে তৈরি থাকতে হবে। অনেক হতাশার মোকাবেলা করতে হয়েছে মাসের পর মাস ধরে। এক প্রবল প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করে তাঁকে হয়ত আজ ধরাশায়ী করে ফেলবে নিজেরই ছলায়, কথাটা ভেবে বেশ একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করছে।

প্রসাধন নিজে নিজে সেরে ফেলা বেশ কঠিন ব্যাপার, তবে কাজটা শেষ পর্যন্ত করেই ছাড়ল। তারপর পালক লাগানো বনেটটা মাথায় চাপিয়ে আন্ট পিটির ঘরে ছুটল। তারপর লম্বা আয়নায় নিজেকে দেখে মনে মনে ভাবল, কী সুন্দরই না দেখাচ্ছে ওকে! মোরগের পালকগুলো ওর মধ্যে একটা তেজি ভাব এনে দিয়েছে, আর হালকা সবুজ বনেটটার জন্য ওর চোখদুটো অসম্ভব উজ্জ্বল লাগছে, প্রায় পান্নার মতই তার দ্যুতি। আর পোশাকটা তো অতুলনীয়! যেমন মহার্ঘ, তেমনই তার ঔৎকর্ষ! অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা পোশাক পরতে পেরে কী ভালই না লাগছে! পোশাকটা কেবল চমৎকারই নয়, রীতিমত নজরকাড়াও। আবেগের চোটে নিচু হয়ে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিতেই একটা চুমো খেয়ে ফেলল, তারপর নিজের বোকামিতেই হেসে উঠল। এলেনের নক্সাকাটা সুন্দর শালটা গায়ে জড়িয়ে নিল। কিন্তু বিবর্ণ হয়ে পড়া চৌকো নক্সাটা শ্যাওলা সবুজ পোশাকের ওপর বেমানান লাগছে, একটু মলিন লাগছে নিজেকে। আন্ট পিটির আলমারি খুলে ওঁর কালো রঙের বনাতের ক্লোকটা বের করে আনল। আন্ট পিটি এটা শীতের দিনে কেবল রবিবার করে পরে গায়ে চড়ান। ওটা পরে ফেলল। টারা থেকে নিয়ে আসা হীরের দুলজোড়া কানে ঝুলিয়ে নিল, তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে চেখে নিল কেমন লাগছে। টুং টাং মিষ্টি শব্দ হল। ভারি ভাল লাগল। রেটের কাছে থাকার সময় মাঝে মাঝেই মাথাটা এরকম করে ঝাঁকাতে হবে, মনে মনে ঠিক করে রাখল। কানের দুলে দোলা লাগলে পুরুষের নজর কাড়ে, আর মেয়েদের মুখেও বেশ একটা টগবগে আনে।

থলথলে হাতে পরে থাকা ওই দস্তানাজোড়া ছাড়া আন্ট পিটির আর কোনও দস্তানাই নেই। কী লজ্জার কথা! দস্তানা ছাড়া যে একজন মহিলাকে লেডি বলে মনেই হয় না! কিন্তু স্কারলেটের একজোড়াও নেই, সেই অ্যাটলান্টা ছাড়ার পর থেকেই। আর টারাতে মাসের পর মাস ধরে কঠোর পরিশ্রম করার পর ওর হাত আর একটুও কোমল নেই, সুন্দর হওয়া তো দুরস্ত। কিন্তু কিছুই করার নেই। তার চেয়ে বরং আন্ট পিটির চামড়ার হাত-ঢাকাটা নিতে হবে, যাতে হাতটা ঢাকতে পারে। নাহ্‌, এবার বেশ মার্জিত লাগছে ওকে, স্কারলেটের মনে হল। কতটা দারিদ্র্য আর অভাবের বোঝা ওর কাঁধের ওপর, সেটা এই মুহূর্তে ওকে দেখলে কেউ আন্দাজ করতে পারবে না।

রেট যেন কিছুতেই সন্দেহ করতে না পারেন। উনি যেন টের না পান, ওঁর প্রতি অনুরাগ ছাড়া স্কারলেটের অন্য কোনও উদ্দেশ্যে আছে।

পা টিপে টিপে নিচে এসে কুকির অলক্ষ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। কুকি রান্নাঘরে নিশ্চিন্ত মনে গান গাইতে গাইতে কাজ করছে। দ্রুতপায়ে বেকার স্ট্রীট ধরে চলল, যাতে প্রতিবেশিদের কৌতূহলী চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। আইভি স্ট্রীটে একটা পুড়ে যাওয়া বাড়ির সামনে থেকে একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড় করানোর জায়গায় গিয়ে বসে ঘোড়ার গাড়ি বা ওয়াগনের অপেক্ষা করতে লাগল। ভাসমান মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্য দেখা দিচ্ছে আবার লুকিয়ে পড়ছে। তার ফলে রাস্তায় থেকে থেকে মিথ্যে জলুস দিচ্ছে বটে, কিন্তু উত্তাপ ছড়াতে পারছে না। ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপট ওর প্যান্টালেটের লেস দুলিয়ে দিচ্ছে। যেরকম আশঙ্কা করেছিল, তার চেয়েও বেশি শীত লাগছে। আন্ট পিটির পাতলা ক্লোকের তলায় ঠাণ্ডায় শিউরে উঠছে। ধৈর্য হারিয়ে যখন হেঁটেই ইয়াঙ্কি ছাউনিতে যাওয়ার দীর্ঘ পথটা হেঁটে যাবে বলে মনস্থ করেছে, দেখল একটা নড়বড়ে ওয়াগন আসছে। বৃদ্ধ একজন মহিলা, নস্যি মাখা ঠোঁট, ম্যাটম্যাটে একটা বনেটের তলা থেকে বেরিয়ে আসা ঠাণ্ডায় কুঁচকে যাওয়া মুখ – একটা খচ্চরকে দিয়ে কোনোমতে ওয়াগনটা টানিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সিটি হলের দিকেই যাচ্ছেন, খানিক অনিচ্ছাভরেই স্কারলেটকে তুলে নিতে রাজি হলেন। তবে ওর পোশাক, হাতের ঢাকা বা বনেট – কোনোটাই ওঁর মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল বলে মনে হল না।

“কী ভাবছেন আমাকে – বেহায়া মেয়েছেলে?” স্কারলেট ভাবল। “ঠিকই হয়ত ভাবছেন!”

শহরের চৌরাস্তায় পৌঁছনোর পর সিটি হলের লম্বা সাদা চূড়োটা দেখতে পেল। ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওয়াগন থেকে নেমে পড়ল। ভদ্রমহিলার ওয়াগন এগিয়ে গেল। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি চালিয়ে নিশ্চিত করে নিল যে ওকে কেউ লক্ষ্য করছে না। গালে চিমটি কেটে রঙ ফেরানোর চেষ্টা করল। ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল যাতে লাল হয়ে ওঠে। বনেটটা ঠিক করে বসিয়ে নিল। মাথার চুলগুলোও হাত বুলিয়ে ঠিক করে নিল। তারপর রাস্তার ওপারে তাকাল। লাল ইটের দোতলা সিটি হলটা আগুনে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে মেটে আকাশের নিচে কেমন যেন অসহায় আর আলুথালু ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। অট্টালিকার চারপাশের জমিতে সারি সারি নোংরা কাদা লেপা সেনা ছাউনি। ইয়াঙ্কি জওয়ানরা সর্বত্র ঘোরাঘুরি করছে। স্কারলেট অনিশ্চিত চোখে ওদের দিকে তাকাল। সাহসে ভাটা পড়তে শুরু করেছে ওর। এই শত্রু শিবিরে রেটকে কীভাবে খুঁজে বের করবে?

রাস্তা বরাবর ফায়ারহাউসটার দিকে তাকাল। খিলান দেওয়া চওড়া দরজাগুলো সব নিশ্ছিদ্রভাবে বন্ধ। দুজন সান্ত্রী বাড়িটার চারপাশে টহল দিচ্ছে। রেট ওর ভেতরে আছেন। কী বলবে ইয়াঙ্কি জওয়ানদের? ওরাই বা ওকে কী বলবে? কাঁধ দুটো সোজা করে মনে মনে প্রস্তুত করল নিজেকে। একজন ইয়াঙ্কিকে মারতে গিয়ে যদি ওর হাত না কেঁপে থাকে, তাহলে আরেকজন ইয়াঙ্কির সঙ্গে কেবল কথা বলার জন্য মিছিমিছি এত ভয় পাওয়ার কী আছে?

পা রাখবার পাথরগুলোর ওপর খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে পাঁকে ভরা রাস্তা ধরে এগোতে লাগল। নীল ওভারকোট পরা একজন সান্ত্রী – ঝোড়ো হাওয়ার দাপট থেকে বাঁচার জন্য গলা পর্যন্ত বোতাম লাগানো – এসে ওর পথ আটকে দাঁড়াল।

“কী ব্যাপার ম্যা’ম?” অদ্ভুত এক মধ্য-পশ্চিমী টান কণ্ঠস্বরে, কিন্তু নম্র আর সম্ভ্রমপূর্ণ।

“একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করতে চাই – এখানে কয়েদ রয়েছেন।”

“ভাল কথা, তবে কে জানে,” মাথা চুলকে সান্ত্রী বলল। “দেখা করতে দেওয়ার ব্যাপারে ওঁদের খুব কড়াকড়ি আর – ” বলতে বলতে লোকটা থেমে গিয়ে ওর মুখের দিকে চাইল। “হে ঈশ্বর! আপনি কাঁদবেন না ম্যা’ম! একবার বরং হেডকোয়ার্টারে গিয়ে অফিসারদের সঙ্গে কথা বলুন। ওঁরা নিশ্চয়ই দেখা করবার অনুমতি দেবেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস।”

কেঁদে ফেলার ইচ্ছে স্কারলেটের নেই। লোকটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। লোকটা টহল দিতে থাকা অন্য সান্ত্রীটার দিকে তাকাল। “অ্যাই, বিল। এদিকে একবার আয় তো।”

দ্বিতীয় সান্ত্রীটার বেশ দশাসই চেহারা। নীল ওভারকোট দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে নিজেকে, আর তারই ফাঁক দিয়ে বেশ খলনায়কদের মত কালো জুলপি উঁকি মারছে। পাঁকের মধ্যে দিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে এল।

“এই ভদ্রমহিলাকে হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যা।”

স্কারলেট ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে সান্ত্রীর পিছু পিছু চলল।

“সাবধানে – দেখবেন যেন পাথরে পা রাখতে গিয়ে বেকায়দায় গোড়ালি মচকে না যায়,” জওয়ানটা সন্তর্পণে ওর বাহুতে হাত রেখে বলল। “স্কার্টটা একটু গুটিয়ে নিলে ভাল করবেন, নইলে কাদার ছিটে লাগবে।”

এই জুলপিওয়ালার গলা থেকেও একই রকম অনুনাসিক স্বর বেরোচ্ছে। কিন্তু খুবই কোমল আর মধুর। খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে ওর হাত শক্ত করে ধরে আছে। তার মানে, ইয়াঙ্কিরা মোটেও খারাপ হয় না!”

“আজ দিনটা খুব ঠাণ্ডা, ভদ্রমহিলাদের বেরনোর জন্য মোটেই জুতসই নয়,” সঙ্গী মানুষটা বলল। “অনেক দূর থেকে আসছেন?”

“হ্যাঁ, শহরের একেবারে অন্য প্রান্ত থেকে,” লোকটার কোমল স্বর শুনে ধীরে ধীরে চাঙ্গা হয়ে উঠতে লাগল।

“এরকম আবহাওয়ায় একজন ভদ্রমহিলার বাইরে বেরনো একটুও ঠিক হয়নি,” জওয়ানের গলায় মৃদু ভর্ৎসনার সুর। “এত জ্বরজারির হিড়িক পড়েছে চারদিকে। এটাই কম্যান্ড পোস্ট, ম্যা’ম – আরে কী হয়েছে?”

“এই যে বাড়ি – এই বাড়িটাই আপনাদের হেডকোয়ার্টার? চৌরাস্তার দিকে মুখ করা পুরনো সুন্দর বাসস্থানটার দিকে চোখ তুলে তাকাল। একটুর জন্য কেঁদে ফেলেনি। যুদ্ধ চলার সময় কতবার এই বাড়িতে এসেছে – পার্টি করতে। কী সুন্দর হাসিখুশি পরিবেশ ছিল তখন – আজ যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল একটা পতাকা বাড়িটার ওপরে পতপত করে উড়ছে।

“কিছু হয়েছে?”

“কিছু না – শুধু – শুধুমাত্র – এই বাড়িতে যাঁরা থাকতেন – আমি তাঁদের চিনতাম।”

“সত্যি, খুবই দুঃখের কথা। মনে হয়, ওঁরাও দেখলে আর চিনতে পারবেন না। ওরা ভেতরে ভোল একেবারে পালটে দিয়েছে। ঠিক আছে, ম্যা’ম, ভেতরে যান। বলবেন, ক্যাপটেনের সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। ভাঙাচোরা সাদা রেলিং-এ পরম স্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে। হলঘরটা অন্ধকারীকটা কুঠুরির মত লাগছে, খুব ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডায় জবুথবু একজন সান্ত্রী ভেজানো একটা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যখন সুদিন ছিল, ওটা ছিল খাবার ঘর।

“আমি ক্যাপটেনের সঙ্গে দেখা করতে চাই,” স্কারলেট বলল।

লোকটা দরজা খুলে দাঁড়াল। স্কারলেট ভেতরে ঢুকল। বুকটা ঢিপঢিপ করছে, অস্বস্তি আর উত্তেজনায় মুখ লাল হয়ে উঠেছে। ঘরে গুমোট গন্ধ একটা, তার সঙ্গে ধোঁয়া, আগুন, তামাকের ধোঁয়া, চামড়া, স্যাঁতস্যাঁতে পশমের ইউনিফর্ম আর ঘামের গন্ধ – সব মিলিয়ে বেশ দমবন্ধ করা পরিবেশ। দেওয়ালের ওয়ালপেপার ছেঁড়া, পেরেক পুঁতে সারি সারি নীল রঙের ওভারকোট আর স্লুশ হ্যাট ঝোলানো, গনগন করে আগুন জ্বলছে, লম্বা একটা টেবিলের ওপর অনেক কাগজপত্র ছড়ানো, পেতলের বোতাম দেওয়া নীল ইউনিফর্মধারী একদল অফিসার জটলা করছে।

স্কারলেট একবার ঢোঁক গিলল। গলার আওয়াজটা ফিরে এসেছে মনে হয়। এই ইয়াঙ্কিগুলোকে কিছুতেই বুঝতে দেওয়া চলবে না যে ও ভয় পেয়ে আছে। সুন্দরী আর সপ্রতিভ দেখাতে হবে নিজেকে।

“ক্যাপটেন কে আছেন?”

“আমি একজন ক্যাপটেন,” মোটা মত একজন বললেন। ওঁর শার্টের বোতামগুলো খোলা।

“একজন কয়েদীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। ক্যাপটেন রেট বাটলার।”

“আবার বাটলার? বেশ নামডাক আছে বলতে হবে লোকটার!” ক্যাপটেন হেসে উঠলেন। ঠোটে কামড়ে ধরা চুরুটটা হাতে নিলেন। “আপনি কি ওঁর আত্মীয়, ম্যা’ম?”

“হ্যাঁ – ওঁর – ওঁর বোন।”

উনি আবার হেসে উঠলেন।

“লোকটার যে অগুনতি বোন, সে বলতেই হবে! তাদের একজন কাল দেখা করতে এসেছিলেন।”

স্কারলেট রাঙা হয়ে উঠল। ওই মেয়েমানুষগুলোরই একজন হবে, যাদের সঙ্গে রেট থাকে – হয়ত সেই ওয়াটলিং নামের মেয়েমানুষটাই। আর এই ইয়াঙ্কিগুলো ওকেও সেরকমই কিছু ভেবে নিয়েছে! উফ্‌, অসহ্য! এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপমান কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না – এমনকি টারার জন্যে হলেও নয়। দরজার দিকে গিয়ে ক্রুদ্ধভাবে হাতলে হাত রাখল। কিন্তু অন্য একজন অফিসার দ্রুত ওর পাশে এসে দাঁড়ালেন। দাড়িগোঁপ সুন্দর করে কামানো, বয়সও কম, আর চোখের দৃষ্টিও কোমল।

“এক মিনিট, ম্যাম। আগুনের পাশ বসে শরীরটা একটু গরম করে নেবেন না? দেখি, আমি যদি আপনার জন্য কিছু করতে পারি। কী নাম আপনার? গতকাল যে মহিলা এসেছিলেন – উনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে রাজিই হননি।”

সামনে এগিয়ে দেওয়া চেয়ারটাতে স্কারলেট গা এলিয়ে দিল। মোটা মত সেই ক্যাপটেন, তাঁকে বেশ অপ্রতিভ দেখাচ্ছিল, তাঁর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি ফেলে স্কারলেট নিজের নাম বলল। অল্পবয়সী ভদ্র অফিসারটা ওভারকোট গলিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। অন্য অফিসাররা টেবিলের অন্যপ্রান্তে গিয়ে কাগজপত্র নাড়াচাড়া করতে করতে চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলেন। স্কারলেট আরাম করে পা দুটো আগুনের দিকে ছড়িয়ে দিল। এতক্ষণে বুঝতে পারল ঠাণ্ডায় ও কতটা জবুথবু হয়ে পড়েছিল। আফসোস হচ্ছিল স্লিপারের শুকতলার গর্তে একটা কার্ডবোর্ডের টুকরো লাগানোর কথা কেন মনে আসেনি। একটু পরে দরজার বাইরে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। রেটের হাসির আওয়াজ চিনতে পারল। দরজা খুলতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকে পড়ল। রেট ঢুকলেন, মাথায় টুপি নেই। কাঁধের ওপর একটা চাদর হেলাফেলা করে ফেলা। নোংরা দেখাচ্ছিল ওঁকে, দাড়ি কামাননি, টাইও পরেননি। কেমন একটা আলুথালু ভাব, কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে বেশ খোশমেজাজেই আছেন। ওকে দেখতে পেয়ে পুলকিত হয়ে হেসে উঠলেন।

“স্কারলেট!”

এগিয়ে এসে স্কারলেটের দু’হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন। ঠিক আগের মতই ওঁর মুঠো প্রাণশক্তি আর রোমাঞ্চে ভরপুর। বুঝে ওঠার আগেই উনি নিচু হয়ে ওর গালে চুমো খেলেন। ওঁর গোঁপের খোচায় ওর সুড়সুড়ি লাগছে। চমকে উঠে স্কারলেট নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছে বুঝতে পেরেই উনি ওঁর কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন, “সোনার টুকরো বোন আমার!” তারপর ওর অসহায় অবস্থা আর অস্বস্তি দেখে হেসে ফেললেন, যেন ব্যাপারটা উনি খুব উপভোগ করছেন। হাসিটা ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া ওর কোনও উপায়ান্তর ছিল না। কী শয়তান দেখ! ঠিক ওর অসহায়তা বুঝে তার ভরপুর সুযোগ নিচ্ছেন। কয়েদখানাও মানুষটাকে একটুও বদলাতে পারেনি!

মোটা ক্যাপটেন চুরুটের ফাঁক দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে কোমল চোখের অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন –

“নিয়মের কোনও বালাই নেই দেখছি। ওঁর ফায়ারহাউসে থাকার কথা। হুকুমটা তো তোমার ভালো করেই জানা আছে।”

“ঈশ্বরের দোহাই, হেনরি! ওই চালাঘরে ভদ্রমহিলা একেবারে জমে যাবেন।”

“ঠিক আছে, যা ভাল বোঝো কর! দায়িত্বটা তোমাকেই নিতে হবে।”

“ভদ্রমহোদয়গণ, আমি আপনাদের নিশ্চিন্ত করতে পারি,” রেট ওঁদের দিকে ফিরে বললেন। তবে স্কারলেটের কাঁধের ওপর থেকে বজ্রমুষ্টি শিথিল করলেন না। “করাত বা উকো জাতীয় কোনো কিছুই বোন নিয়ে আসেনি যাতে আমি জেল ভেঙে পালাতে পারি।”

ওঁরা সবাই হেসে উঠলেন, আর এই সুযোগে স্কারলেট একবার চারপাশটা দেখে নিল। এই ছয় ছয়টা ইয়াঙ্কি অফিসারের সামনে রেটের সঙ্গে কথা বলতে হবে! উনি কী এতই বিপজ্জনক যে ওঁরা ওকে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের আড়াল করতে চান না? স্কারলেটের উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করে সহৃদয় অফিসারটি ঠেলা দিয়ে একটা দরজা খুললেন। দু’জন নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে মৃদু কণ্ঠে কিছু বলতেই ওরা তৎপরতার সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। হাতে রাইফেল তুলে নিয়ে ওরা হলঘরের দিকে চলে গেল। যেতে যেতে দরজাটাও বন্ধ করে দিল।

“ইচ্ছে করলে আপনারা এই আর্দালি কক্ষে বসে কথা বলতে পারেন,” তরুণ ক্যাপটেন বললেন। “আর হ্যাঁ, দরজা ভেঙে পালানোর চেষ্টা করতে যাবেন না। ঠিক বাইরেই পাহারা দেবার লোক রয়েছে।”

“তাহলে বুঝতে পারছ তো, স্কারলেট, কী বিপজ্জনক চরিত্র আমি,” রেট বললেন। “অনেক ধন্যবাদ ক্যাপটেন। আপনার মহানুভবতা অতুলনীয়।”

ঢিলেঢালা ভাবে একটা ‘বাও’ ছুঁড়ে স্কারলেটকে হাত ধরে টেনে চেয়ার থেকে ওঠালেন আর তারপর ওকে অপরিচ্ছন্ন আর্দালি কক্ষে নিয়ে চললেন। কক্ষটা ঠিক কেমন ছিল সেটা এখন আর মনে করতে পারে না। তবে এটুকু খেয়াল আছে ওটা যে খুবই ঘিঞ্জি আর অন্ধকার ছিল আর তেমন উষ্ণও ছিল না। হাতে লেখা অনেক চিরকুট দেওয়ালে সাঁটানো ছিল। কয়েকটা চেয়ার ছিল, সীটটা গরুর চামড়া দিয়ে মোড়া, দু’চারটে লোম তখনও লেগে ছিল।

দরজাটা বন্ধ করেই দ্রুত এসে স্কারলেটের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। ওঁর ইচ্ছেটা আন্দাজ করে স্কারলেট সঙ্গে সঙ্গে মাথা সরিয়ে নিল, কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে প্রশ্রয়ের হাসি হাসল।

“এবার তোমায় সত্যি সত্যি একটা চুমো দিতে পারি, তাই না?”

“হ্যাঁ, কপালের ওপরে। দাদারা যেমন দিয়ে থাকেন,” ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে স্কারলেট বলল।

“বহুত খুব। দরকার নেই। এর চাইতে ভাল কিছুর প্রতীক্ষায় থাকাটাই বরং ভাল।” কিছুক্ষণ তৃষিত চোখে ওর ঠোঁটের দিকে চেয়ে রইলেন। “কী ভালই যে লাগছে, স্কারলেট, তুমি আমাকে দেখতে এলে! কয়েদ হওয়ার পর তুমিই প্রথম একজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক যে আমাকে দেখতে এল। প্রকৃত বন্ধু কারা যেটা জেলে না কাটালে বোঝাই যায় না। শহরে কবে এলে?”

“গতকাল বিকেলে।”

“আর আজ ভোর হতে না হতেই এসে হাজির? প্রিয়তমে, এটা তো আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।” ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এতক্ষণে স্কারলেট ওঁর হাবেভাবে আন্তরিক খুশির আভাস দেখতে পেল। স্কারলেট মনে মনে হাসল, শিকার টোপ গিলেছে। ভাবটা করল এমন যেন খুব লজ্জা পেয়েছে।

“সত্যি কথাই, আমার আর তর সইছিল না। আন্ট পিটি কাল সন্ধ্যেবেলা আপনার কথা বলছিলেন … আমি – আমি – সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারিনি। কী সাংঘাতিক সব ব্যাপার, রেট! মনটা এত খারাপ হয়ে গেল!”

“কেন, স্কারলেট?”

কথাটা বললেন খুবই আলগোছে, কিন্তু তার মধ্যে একটা উষ্ণতার ছোঁয়া। স্কারলেট চোখ তুলে তাকাল। ওঁর স্বভাবসিদ্ধ সন্দেহপ্রবণতা বা কৌতুকপ্রিয়তার চিহ্নমাত্র নেই ওঁর চোখে। ওঁর স্থির দৃষ্টিতে বিভ্রান্ত হয়ে চোখ আবার নামিয়ে নিল। এত সহজেই ওঁকে বাগে আনা যাবে, ভাবতেও পারেনি।

“তোমাকে আবার দেখতে পেয়ে, তোমার এই সব কথা শুনতে পেয়ে, কয়েদ হয়ে থাকার কষ্টটা আর কষ্ট বলেই মনে হচ্ছে না। বিশ্বাস কর, ওরা যখন তোমার নাম বলল, আমি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। রাফ অ্যান্ড রেডির কাছে নির্জন রাস্তার ধারে সেই রাতে হঠাৎ আমার আদর্শবোধ জেগে ওঠার অপরা্ধে, ভেবেছিলাম, তুমি হয়ত কোনোদিনই আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না। তারপরেও তুমি এসেছ, তাহলে ধরে নিতে পারি কি যে তুমি আমায় ক্ষমা করে দিয়েছ?”

এতদিন পরেও সেই রাতটার কথা শুনেই রাগে ওর শরীর রি রি করে উঠল। তবে সেটা মনেই চেপে রেখে মাথাটা জোরে ঝাঁকাল, যাতে দুলজোড়া দুলে ওঠে।

“আপনাকে আমি মোটেও ক্ষমা করিনি,” ঠোঁট ফুলিয়ে বলল।

“হায়, আরও একটা আশা চুরমার হয়ে গেল। ওখান থেকে গিয়ে আমি দেশসেবার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দিলাম। ফ্র্যাঙ্কলিনের তুষার ঝড়ের মধ্যে খালি পায়ে লড়াই করতে লেগে গেলাম আর সঙ্গে সঙ্গেই আমাশায় ধরে একেবারে কাবু হয়ে গেলাম। সে যে কী কষ্টের তুমি কল্পনাও করতে পারবে না!”

“আপনার – ওই কষ্টের ফিরিস্তি আমি একটুও শুনতে চাই না,” ঠোঁট ফুলিয়েই বলল, কিন্তু আড়চোখে হেসে ওঁর দিকে তাকিয়ে। “সেদিন রাতে যা করেছিলেন তার জন্য আমি আপনাকে এখনও ঘৃণা করি, আর কোনোদিন আপনাকে ক্ষমা করতে পারব বলে মনে হয় না। আমাকে ঐভাবে একলা ছেড়ে চলে গেলেন! কত কিই না হতে পারত আমার!”

“ঘটেনি তো বিপদ। তাহলেই বোঝ, তোমার ওপর আমার বিশ্বাসটা ঠিকই ছিল। তুমি যে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে যাবে, সেই ব্যাপারে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। আর যদি কোনও ইয়াঙ্কি তোমার সামনে পড়ে যেত, তাকে স্বয়ং ঈশ্বর এসেও বাঁচাতে পারতেন না!”

“আচ্ছা রেট, এরকম বোকার মত কাজ করলেন কেমন করে – শেষ পর্যায়ে গিয়ে নাম লেখানো, যখন জানাই ছিল যে আমরা গোহারান হারতে চলেছি? তাছাড়া আপনিই তো বলতেন বোকারাই গুলি খেয়ে মরার জন্য লড়াইতে যায়!”

“স্কারলেট, দয়া করে আর ওই সব কথা তুলো না। যখনই ওসব নিয়ে ভাবি, লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে।”

“যাক, জেনে খুশি হলাম আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছিলেন তার জন্য আপনার অনুতাপ হয়েছে।”

“এই তো, ভুল বুঝলে আমাকে। বলতে খারাপই লাগছে, তবে সেদিন তোমাকে ছেড়ে চলে আসার জন্য আমি মোটেও বিবেকদংশনে পীড়িত নই। কিন্তু ওই নাম লেখানোর ব্যাপারটা – যখন ওই সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি – চকচকে জুতো পায়ে, সাদা লিনেনের স্যুট পরে, দুহাতে কেবলমাত্র দুটো ড্যুয়েলিং-এর পিস্তল নিয়ে – আর মাইলের পর মাইল ধরে হিমশিতল তুষারের মধ্যে দিয়ে পাড়ি লাগাতে লাগাতে জুতোজোড়া গেল ক্ষয়ে, ওভারকোটটাও আর পরবার মত রইল না, আর দিনের পর দিন অনাহারে … এখনও বুঝতে পারি না, পালিয়ে এলাম না কেন। নিখাদ পাগলামিই বলতে পারো। কিন্তু সেটা আমার রক্তেই আছে। দক্ষিণের মানুষদের সমস্যা কোথায় জানো? হেরে যাব নিশ্চিত জেনেও আমরা লড়ে যাবার লোভ সামলাতে পারি না। যাক গে, কারণ নিয়ে অত মাথা ঘামিয়ে কী লাভ? আমাকে মাফ করে দিয়েছ, এটাই সবচাইতে বড় ব্যাপার।”

“মাফ করে দিয়েছি, কে বলল? আপনি আসলে – আসলে – ঠিক এক শিকারি কুকুরের মত।” শেষের কথাটা বলার সময় কণ্ঠে মধু ঝরিয়ে দিল যেন কথাটা খুব আদর করে বলল।

“বাজে কথা রাখো তো! জানি তুমি মাফ করে দিয়েছ। ইয়াঙ্কি সান্ত্রীদের পরোয়া না করে একজন তরুণী এক কয়েদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, শুধুমাত্র মনের টানে, ভেলভেটের পোশাক, পালক আর চামড়ার হাত-ঢাকা পরে সেজেগুজে – আর কোন অল্পবয়সি মেয়ে সাহস করে করবে বল? কী অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে, স্কারলেট! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তুমি ছিন্নবসনে বা শোকাবাসে নেই! ছেঁড়াখোঁড়া পুরনো পোশাকে কিংবা গতানুগতিক কালো শোকাবাসে মহিলাদের দেখে দেখে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি! তোমাকে একেবারে রাজরাণীর মত লাগছে! একটু ঘুরে দাঁড়াও তো, সোনা, তোমাকে ভাল করে দেখতে দাও।”

পোশাকটা ঠিক নজর করেছেন তাহলে। তবে উনি রেট কিনা, এসব কখনোই ওঁর নজর এড়ায় না। স্মিত হেসে বুড়ো আঙ্গুলে ভর দিয়ে একটা পাক দিল। দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে দিল। ফ্রকের পায়ের দিকের ঘেরটা সামান্য উঠে গিয়ে লেস দেওয়া প্যান্টলেটটা দেখা গেল। ওঁর কালো চোখ স্কারলেটের বনেট থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত নজর চালালো। কিছুই ওঁর নজর এড়ালো না। সেই আগেকার মত পোশাক ভেদ করা চাউনি। স্কারলেটের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

“খুব সমৃদ্ধ লাগছে তোমাকে আর খুব – খুব পরিপাটি। বোঝা যাচ্ছে খাওয়াপরার অভাব তোমার নেই। বাইরের ওই ইয়াঙ্কি আপদগুলোর কথা বাদ দিলে – তুমি বেশ বহালতবিয়তেই আছ, প্রিয়ে। নাও, বসে পড়। ভয় নেই, আগের বারের মত কোনো সুযোগ নেবার চেষ্টা আমি করব না।” ছদ্ম আক্ষেপ দেখিয়ে উনি নিজের গালে হাত ঘষতে লাগলেন। “একটা সত্যি কথা বলবে, স্কারলেট – সেদিন রাত্রে তুমি একটু বেশিই স্বার্থপর হয়ে পড়নি কি? তোমার জন্য কী কী করেছিলাম সেটা একটু মনে কর – জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি – ঘোড়া চুরি করেছি – আহ্‌ কী অসাধারণ একটা ঘোড়া! আমাদের মহান আদর্শের স্বার্থে তড়িঘড়ি ছুটে গেছি! আর এত কষ্ট করার বদলে কী পেলাম? কড়া কড়া কিছু কথা, আর গালে সপাটে একটা চড়!”

স্কারলেট বসে পড়ল। কথাবার্তাগুলো কেমন যেন বেলাইনে চলছে, ঠিক রাধমকে ভেবে এসেছিল সেরকম হচ্ছে না। ওকে দেখে বেশ খুশিই হয়েছিলেন, ওঁকে দেখতে আসার জন্য আনন্দের প্রকাশটাও আন্তরিকই মনে হয়েছিল। বেশ ভদ্রলোক ভদ্রলোক বলেই মনে হচ্ছিল, যে বিকৃতমনস্ক মানুষটাকে ও চেনে সেরকম নয়।

“কষ্ট সহ্য করার বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশাও করতেই হবে নাকি আপনাকে?”

“অবশ্যই! তুমি তো জানোই, আমি হলাম একজন স্বার্থপর দৈত্য। এমনি এমনি আমি কিছুই দিই না, সর্বদা মূল্য বুঝে নিই।”

কথাটা শুনে ওর শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। তবু সাহসে বুক বেঁধে দুলগুলো আবার নাচিয়ে দিল।

“সত্যি সত্যিই তো এতটা খারাপ আপনি নন, রেট। নিজেকে নিয়ে একটু বাড়িয়ে বলতে আপনি ভালবাসেন।”

“বিশ্বাস কর, তুমি একদম বদলে গেছ!” বলে রেট হেসে উঠলেন। “তোমার মনে কোমল বৃত্তিগুলো হঠাৎ জেগে ওঠার কারণ কী? মিস পিটিপ্যাটের কাছ থেকে তোমার খবরাখবর পেয়ে থাকি, কিন্তু তোমার মধ্যে যে নারীসুলভ কমনীয়তা জেগে উঠেছে, সেই ব্যাপারে তো কোনও আঁচ পাইনি। নিজের সম্বন্ধে সব কিছু বল, স্কারলেট। তোমার সঙ্গে শেষ যেবার দেখা হল, তারপর থেকে দিন কাটাচ্ছ কীভাবে?”

পুরনো রাগ আর শত্রুতা ভেতরে ভেতরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল, ইচ্ছে হচ্ছিল ওঁকে মন খুলে কটু কথা শুনিয়ে দেয়। তার বদলে ও মিষ্টি করে হাসল, গালে টোল পড়ল। উনি চেয়ারটা ওর পাশে টেনে নিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন। ও ঝুঁকে পড়ল। তারপর যেন বেখেয়ালে ওঁর কাঁধে হাত রাখল।

“ভালোই কেটে যাচ্ছে দিন, ধন্যবাদ। টারাতেও সব কিছুই কুশল মঙ্গল। হ্যাঁ, শেরম্যানের লোকরা যখন ওখান দিয়ে যাচ্ছিল, তখন খুবই ভয়ে দিন কেটেছে। ভাগ্যই বলতে হবে, বাড়িটা পুড়িয়ে দেয়নি। গৃহপালিত পশুগুলোও ডার্কিরা জলার ধারে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিল, তাই সেগুলোও রক্ষা পেয়েছে। গতবার শীতে আমরা মোটামুটি কুড়ি বেল তুলো তুলেছি। টারার পক্ষে সেটা অবশ্য কিছুই নয়, কিন্তু খুব বেশি খেতমজুর এখন আর আমাদের নেই। বাপি বলেছেন, পরের বছর আমরা নিশ্চয়ই এর থেকে ভাল করব। কিন্তু কী বলব রেট, সারা দেশজুড়ে এমন ঢিলেঢালা একটা ব্যাপার চলছে না! বলড্যান্স নেই, বারবেকিউ নেই, সবাই কেবল দুঃসময়, দুর্দিন ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে বলারই পায় না! পাগল পাগল লাগছিল! গত সপ্তাহে যখন সব কিছু সহ্যের বাইরে চলে গেল, বড় একঘেয়ে লাগছিল, বাপি বললেন যে বাইরে কোথাও গিয়ে একটু আনন্দ করলে মন ভাল হবে। তাই চলে এলাম এখানে, কিছু ফ্রক কিনব নিজের জন্য, তারপর চার্লসটনে গিয়ে আন্টির সঙ্গেও দেখা করার ইচ্ছে। অনেকদিন পর বলড্যান্সের আসরে যেতে পারলে মন ভাল হয়ে যাবে।”

চালটা বেশ ঠিকঠাকই মারতে পেরেছি! স্কারলেটের নিজেকে নিয়ে খুব গর্ব হল। খুব বেশি ধনী নয় তবে তেমন দরিদ্রও নয়।

“বলড্যান্সের পোশাকে তোমাকে খুব সুন্দর লাগে, সোনা। সেটা তুমিও জানো। কপাল মন্দ আমার! মনে হচ্ছে, মেঠো লোকদের মুখ দেখতে দেখতে তুমি বিরক্ত হয়ে পড়েছ, তাই তরতাজা মুখের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছ।”

রেট যে বেশ কিছু মাস ধরে দেশের বাইরে ছিলেন, খুব সম্প্রতিই অ্যাটলান্টায় ফিরেছেন, এটা ভেবে স্কারলেট মনে মনে একটু আশ্বস্ত হল। তা না হলে উনি এই ধরণের হাস্যকর কথা বলতেই পারতেন না। মেঠো লোকদের মুখগুলো ভেসে উঠল – বিধ্বস্ত ফোনটেনদের বিরক্ত মুখভঙ্গী, অভাব অনটনের ভারে নুয়ে পড়া মুনরো ভাইয়েরা, জোন্সবোরো আর ফ্যেয়্যাটভিলের প্রেমিকরা, যারা এখন জমিতে জোয়াল টানছে, কিংবা জ্বালানি কাঠ কাটছে, কিংবা বুড়িয়ে যাওয়া পীড়িত পশুর দেখভাল করছে। বলড্যান্স, মেয়েদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করা – সেসব কখনও করেছে বলে ওদের মনেই পড়ে না। কিন্তু সেই সব স্মৃতি সরিয়ে ফেলে, এখুনি বলা কথাগুলোই যে আসলে সত্যি সেটা বোঝাতেই যেন কিছুটা আত্মসচেতনভাবে হেসে উঠল।

“তাই মনে হচ্ছে বুঝি?” নির্দয়ভাবে মন্তব্য করল।

“তোমার হৃদয়হীনতার কোনও সীমা পরিসীমা নেই, স্কারলেট। কে জানে হয়ত সেটাই তোমার সবচাইতে বড় আকর্ষণ।” ঠিক পুরনো দিনের মত করে বললেন, ঠোঁটের এক কোণে তির্যক হাসি। অবশ্য স্কারলেট বুঝতে পারল, উনি আসলে প্রশস্তিই করছেন। “মানুষকে বশ করবার ক্ষমতা তোমার যে বিপজ্জনকভাবে বেশি, সে তোমার থেকে আর বেশি কে জানে! এই যে আমি, মানুষ চরাতে চরাতে ঝানু হয়ে গেলাম, আমিও নিস্তার পাইনি। বুঝে উঠতেই পারি না, কী এমন আছে তোমার মধ্যে, যে সব সময় তোমার কথা মনে পড়ে! আমি অনেক মহিলাকেই জানি, যারা তোমার চাইতেও বেশি সুন্দরী, বেশি বুদ্ধিমতী, এবং দ্বিধার সঙ্গেই বলতে বাধ্য হচ্ছি, তাদের নৈতিক চরিত্র তোমার চাইতে ভাল এবং ওদের মনে মায়ামমতাও বেশি! অথচ সর্বদা তোমার কথাই আমার মনে পড়ে! আমাদের আত্মসমর্পণের পর – আমি মাসের পর মাসে ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডে কাটিয়েছি – তোমার সঙ্গে দেখাও হয়নি, বা কারো মুখে তোমার কথাও শুনিনি। বহু সুন্দরী মহিলাদের সান্নিধ্যে সময় কেটে গেছে। তবুও তোমার কথাই মনে পড়েছে, তুমি কী করছ জানতে ইচ্ছে করেছে।”

অন্যান্য মহিলারা ওর চাইতে বেশি সুন্দরী, বুদ্ধিমতী আর মমতাময়ী, এই কথাগুলো বলতে ওঁর বাধল না দেখে স্কারলেট তো প্রথমে মনে মনে খুব চটে গেল। তবে এই তাৎক্ষণিক উষ্মা মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল এই আনন্দে যে ওকে আর ওর বশ করার ক্ষমতার কথা উনি মনে রেখেছেন! তার মানে উনি ওকে ভুলে যাননি! কাজটা অনেক সোজা হয়ে গেল। আর এই রকম একটা পরিস্থিতিতেও উনি ভদ্রলোকের মতই আচরণ করছেন। ওর করণীয় হল কথাটা এমনভাবে তুলতে হবে যাতে ওঁকে বোঝানো যায় যে ও নিজেও ওঁকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে যায়নি আর তারপর –

ওঁর হাতে হালকা করে চাপ দিল। আবার গালে টোল ফেলে হাসল।

“ও রেট, আমার মত দেহাতি একটা মেয়েকে পেয়ে আপনি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ভোলাতে চাইছেন! সেই রাত্তিরের পর আপনি যে মোটেই আমার কথা আর ভাবেননি, সেটা কি আমি জানি না? ওই সব ফরাসি আর ইংরেজ সুন্দরীদের সঙ্গে দিন কাটিয়েও আপনি আমার কথা ভেবেছেন – এই কথাটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলেন? নিজের সম্বন্ধে আপনার এই সব মনভোলানো বোকা বোকা কথা শোনার জন্য আমি আসিনি। আমি এলাম – আমি এসেছি – কারণ – ”

“কারণ?”

“কী বলি রেট, আপনাকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তায় আছি! আপনার জন্য খুব ভয় করছে! এই জঘন্য জায়গা থেকে ওরা আপনাকে ছাড়বে কবে?”

রেট দ্রুত ওর হাতদুটো নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাহুর কাছে শক্ত করে ধরে রাখলেন।

“আমি অভিভূত হয়ে পড়েছি। জানি না কবে ছাড়া পাব। মনে হয় ওরা দড়িটা বেশ লম্বা করে পাকাচ্ছে।”

“দড়ি?”

“হ্যাঁ, আশা করছি এখান থেকে আমাকে দড়ির একটা প্রান্ত ধরেই বের হতে হবে।”

“সত্যি সত্যি তো ওরা আপনাকে ফাঁসি দিতে যাচ্ছে না?”

“দেবেই, যদি আমার বিরুদ্ধে সামান্য কিছু প্রমাণও জোগাড় করতে পারে।”

“ওহো, রেট!” স্কারলেট আর্তনাদ করে উঠল, হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে।

“তুমি দুঃখ পাবে? যদি সত্যিই দুঃখ পাও, উইলে তোমার কথা উল্লেখ করে যাব।”

বেপরোয়া হাসিতে ওঁর কালো চোখদুটো নেচে উঠল। স্কারলেটের হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন।

ওঁর উইল! স্কারলেট তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল, পাছে ওর মনের ভাবটা উনি টের পেয়ে যান। কিন্তু একটু দেরি করে ফেলল। সহসা ওঁর চোখ কৌতুহলে চকচক করে উঠল।

“ইয়াঙ্কিরা মনে করে, আমার উইলটা নাকি খুব চমৎকার হবে। আমার আর্থিক সংস্থান নিয়ে আজকাল সবার মনেই অসীম কৌতুহল। প্রতিদিনই ওরা আমাকে তদন্ত বোর্ডের সামনে দাঁড় করাচ্ছে আর যত রাজ্যের বোকা বোকা প্রশ্ন করছে। গুজব রটে গেছে আমি নাকি কনফেডারেসির অলীক স্বর্ণভাণ্ডার সরিয়ে ফেলেছি!”

“সত্যি সত্যিই – সরিয়ে ফেলেছেন?”

“বাপ রে! একেবারে সরাসরি জেরা! তুমিও জানো, আর আমিও জানি, কনফেডারেসি টাকা ছাপাত, ট্যাঁকশাল চালাতো না!”

“তাহলে এত টাকা আপনি পেলেন কীভাবে? ফাটকা খেলে? কিন্তু আন্ট পিটি যে বলছিলেন – ”

“তুমি যে একেবারে জেরা করতে শুরু করে দিলে!”

একনম্বরের চালু মাল! টাকা ওঁর আছে, সন্দেহের অবকাশই নেই। কথাটা ভেবে ওর উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে মিষ্টি মিষ্টি করে ওঁর সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল।

“রেট, এখানে আপনার পড়ে থাকাটা আমার কাছে খুবই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। কী মনে হয়, তোমার এখান থেকে বেরনোর সম্ভান কি একেবারেই নেই?”

“আমার নীতি হল ‘নিহিল ডেস্পারেন্ডুম’১।”

“সেটা আবার কী?”

“এর মানে হল, ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ’, বুঝলে হে অর্বাচীন নারী?”

চোখের ঘন পালক তুলে একবার ওঁর দিকে তাকিয়েই দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

“আপনার মত চতুর লোককে ওরা অত সহজে ফাঁসি দিতে পারবে না। একটা না একটা মতলব আপনি ঠিকই বের করে ফেলবেন, ওদের ফাঁকি দিয়ে এখান থেকে বেরনোর। আর তারপর আপনি – ”

“তারপর আমি?” আরও এখটু ঘনিয়ে এসে কোমল স্বরে জিগ্যেস করলেন।

“আমি, মানে – ” খুব সফলতার সঙ্গে বিচলিত আর লাজুক ভাব করল। গাল রাঙিয়ে ওঠাতে বিশেষ কাটখড় পোহাতে হল না। এমনিতেই ওর দমবন্ধ হয়ে আসছে আর বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। “রেট, সেদিন রাত্রে আমি আপনাকে যা বলেছিলাম – আমি – আমি সেজন্য খুব দুঃখিত – সেই রাফ অ্যান্ড রেডির কথা বলছি। আমি – আমি আসলে এত ভয় পেয়ে গেছিলাম, আর আপনি এত – এত – ” স্কারলেট চোখ নামিয়ে নিল। দেখল ওঁর বাদামি হাতদুটো শক্ত করে ওর হাত ধরে আছে। তখন ভেবেছিলাম – আমি – আমি হয়ত জীবনে আপনাকে ক্ষমা করতে পারব না! কিন্ত কাল রাত্রে আন্ট পিটি যখন বললেন ওরা আপনাকে – আপনাকে ফাঁসি দিতে পারে – কথাটা সহসা আমার মনে পড়ে গেল আর আমি – আমি – ” দ্রুত মিনতিপূর্ণ চোখে ওঁর দিকে একবার তাকাল, যতটা সম্ভব বেদনাতুর করে তুলল সেই চাউনি। “ওহ্‌ রেট! আপনাকে ওরা ফাঁসি দিলে আমি মরেই যাব! আমি সহ্য করতে পারব না! আপনি বুঝতেই পারছেন – ” কিন্তু ওঁর চোখের তীব্র দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে আবার চোখ নামিয়ে ফেলল।

আরেকটু সময় পেলেই আমি কেঁদে ফেলতে পারব, উত্তেজিত হয়ে ভাবল। সত্যিই কি কেঁদে ফেলা উচিত? সেটাই কি স্বাভাবিক দেখাবে না?

উনি তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, “হে ঈশ্বর, নিশ্চয়ই তুমি বলতে চাইছ না যে তুমি – ” হাত দুটো এমন বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরেছেন যে স্কারলেটের ব্যথা লাগছিল।

চোখ নিংড়ে জল বের করার জন্য ওদুটো চেপে বন্ধ করে রাখল। মুখটা সামান্য বাড়িয়েই রাখল উনি যাতে সহজেই চুম্বন করতে পারেন। একটু পরেই ওঁর ঠোঁট ওর ঠোঁট স্পর্শ করবে। সহসা ওঁর ঠোঁটের সনির্বন্ধ স্পর্শের কথা মনে পড়ে যেতেই দুর্বল বোধ করতে লাগল। কিন্তু ওকে চুম্বন উনি করলেন না। অদ্ভুত এক নিরাশা ভেতরে ভেতরে কাজ করতে শুরু করল। চোখ অল্প খুলে ওঁর দিকে তাকাল। ওঁর কালো মাথা ওর হাতের ওপর ঝুঁকে আছে। উনি হাতটা তুলে নিয়ে চুম্বন করলেন। অন্য হাতটা তুলে নিয়ে নিজের গালের ওপর একটুক্ষণ রাখলেন। স্কারলেট পীড়াপীড়ির আশঙ্কা করছিল, ওঁর এই প্রেমিকসুলভ হাবেভাবে সচকিত হয়ে উঠল। ওঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু ওঁর মাথা নোয়ানো, ফলে সেটা দেখে উঠতে পারল না।

তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল, যাতে মাথা তুলেই ওর মনের ভাবটা ধরে না ফেলেন। ওর দৃষ্টিতে বশ করে ফেলবার যে আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে সেটা উনি সহজেই বুঝে নেবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উনি ওকে বিবাহের প্রস্তাব দেবেন – অন্তত বলবেন যে উনি ওকে ভালবাসেন আর তারপরে … চোখের পাতার ফাঁক দিয়ে দেখল উনি ওর হাতটা ঘুরিয়ে নিয়ে তালুর ওপর চুম্বন করলেন। দীর্ঘশ্বাস পড়ল ওঁর। চোখ নামিয়ে নিজের তালুর দিকে চেয়ে দেখল, মনে হলে অনেক বছর পরে নিজের হাতের দিকে চেয়ে দেখছে, অজানা এক আশঙ্কায় স্কারলেট আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কদাকার এক তালু, অচেনা কারও হবে, স্কারলেট ও’হারার শ্বেত নরম ঢেউ খেলানো অসহায় হাত নয়। নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে হাত শক্ত হয়ে গেছে, রোদ লেগে বাদামি রঙ ধরেছে, ছোট ছোট দাগে ভরা। নখগুলো ভাঙা, অসমতল, তালুতে বড় বড় ফোস্কা, বুড়ো আঙ্গুলের ফোস্কাটা এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি। ফুটন্ত তেল পড়ে গত মাসে যে ঘা হয়েছিল, সেটা দগদগে লাল হয়ে আছে। এসব দেখে রীতিমত ভয়ে স্কারলেট হাত মূঠো করে ফেলল।

মাথা নামিয়েই রাখলেন। স্কারলেট ওঁর মুখটা দেখতে পাচ্ছে না। জোর করে ওর মুঠি খুলে ফেলে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। অন্য হাতটাও তুলে পাশাপাশি রেখে নীরবে দেখতে লাগলেন।

“আমার দিকে তাকাও,” বেশ অনেকটা পরে মাথা তুলে বললেন। গলাটা খুব শান্ত। “আর মুখ থেকে ওই শালীনতার মুখোশটা খুলে ফেল।”

অনিচ্ছাভরে ওঁর চোখে চোখ রেখে তাকাল। বেপরোয়া দৃষ্টিতে বিরক্তির ছোঁয়া লেগেছে। ওঁর ঘন কৃষ্ণ ভ্রূযুগল কপালে ওঠা, চোখের কোণে রহস্যময় দীপ্তি।

“তা টারায় তোমরা ভালোই আছ, তাই না? তুলো বিক্রি করে এত টাকা কামিয়ে ফেলেছ যে একেবারে দেশ সফরে বেরিয়ে পড়েছ! হাত দুটো দিয়ে কী করছিলে বল তো – লাঙল চালাচ্ছিলে?”

স্কারলেট জোর করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। খুব শক্ত করে ধরে আছেন আর বুড়ো আঙ্গুলটা কড়াগুলোর ওপর ঘোরাফেরা করছে।

“ওগুলো কোনও ভদ্রমহিলার হাতই নয়,” বলে হাতদুটো ওর কোলের ওপর ছুঁড়ে দিলেন।

“চুপ করুন বলছি!” স্কারলেট গর্জে উঠল। মুহূর্তের জন্য স্বস্তিবোধ করল এই ভেবে যে এবার নির্দ্বিধায় মন খুলে কথা বলতে পারবে। “আমার হাত দিয়ে আমি কী করি না করি, তা নিয়ে কথা বলার হক কে দিয়েছে?”

“কী বুদ্ধু আমি,” তীব্র হতাশায় স্কারলেট ভাবল। “আন্ট পিটির দস্তানাজোড়া ধার বা চুরি করতেই পারতাম। অবশ্য আমি বুঝতেই পারিনি, আমার হাতদুটো এতটা কুৎসিত দেখাচ্ছে। লক্ষ্য তো উনি করবেনই। আর এখন মেজাজ হারিয়ে বোধহয় সবকিছুই মাটি হয়ে গেল। আর ঘটল কখন – না যখন উনি প্রায় বলেই ফেলেছিলেন যে উনি আমাকে ভালবাসেন!”

“একথা ঠিক যে তোমার হাত নিয়ে বলার আমার কোনও অধিকারই নেই,” অলসভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে কথাটা শান্ত শীতল কণ্ঠে বললেন। অভিব্যক্তিহীন মুখ।

তাহলে সোজাপথে কিছুই হবার নয়। ব্যাপারটা অসম্মানজনক, কিন্তু জয় হাসিল করার জন্য মেনে নেওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। মিষ্টি মিষ্টি করে যদি কথা বলে – ”

“হাতদুটো ওরকম করে ছুঁড়ে ফেলে আমার সঙ্গে খুবই রূঢ় আচরণ করলেন আপনি। এই গত সপ্তাহেই দস্তানা না পরেই ঘোড়া চালাতে গিয়ে হাতের ওরকম দশা – ”

“ঘোড়ায় চড়ে, হাসালে যাহোক!” একই রকম নিস্পৃহ গলায় রেট বললেন। “ওই দুটো হাত দিয়ে তুমি পরিশ্রম করেছ, নিগারদের মত কাজ করতে হয়েছে তোমাকে। জবাব দাও? কেন মিথ্যে বললে আমায় যে টারায় সব কিছু ভালই চলছে?”

“রেট, দেখুন – ”

“ধর আমরা যদি বাহানা না করে আসল কথাতে চলে আসি। আমাকে দেখতে আসার উদ্দেশ্যটা কী? তোমার ছলাকলায় আমি তো প্রায় ধরা দিয়েই বসেছিলাম! কী না, তুমি আমাকে নিয়ে ভাব, আমার জন্য তোমার কষ্ট হচ্ছে!”

“কষ্ট সত্যিই হচ্ছে! সত্যি বলতে কি – ”

“উহুঁ, কষ্ট তোমার হয়নি। হামানের২ চেয়েও উঁচু ফাঁসিকাঠে ওরা আমাকে লটকে দিলেও তোমার কিছু এসে যাবে না। তোমার মুখেই সেকথা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, ঠিক যেমন তোমার দুহাতে অক্লান্ত পরিশ্রমটা দেখতে পাচ্ছি। আমার কাছে তুমি কিছু চাইতে এসেছিলে, আর সেটা তোমার এতটাই প্রয়োজন যে তোমাকে নাটক করতে হল। সোজাসুজি এসে বললে না কেন, কী তোমার চাই? সেটা পাওয়ার সম্ভাবনা তাহলে আরও একটু বেড়ে যেত, কারণ মহিলাদের যে গুণের আমি সব চেয়ে বেশি কদর করি সেটা হল অকপট আচরণ। তা না করে তুমি বাজারের মেয়েদের মত কানের দুল নাচিয়ে, ঠোঁট ফুলিয়ে, ন্যাকামি করতে করতে খদ্দের ধরার আশায় আমার কাছে এলে।”

শেষের কথাগুলো বলার সময় ওঁর কণ্ঠস্বর ওপরে ওঠেনি, বা কোনোভাবেই গুরুত্ব আরোপ করার চেষ্টা করেননি, কিন্তু স্কারলেটের মুখের ওপর কেউ যেন সপাটে চাবুক কষিয়ে দিল। হতাশ মনে বুঝল বিবাহের প্রস্তাব পাওয়ার আশা আর রইল না। যদি উনি রাগে বা অভিমানে ফেটে পড়তেন বা ওকে গালাগালি করতেন – অন্য পুরুষরা স্বাভাবিকভাবে যা করে থাকে – তাহলে অন্তত ওর সামলে নেওয়ার একটা পথ খোলা থাকত। কিন্তু ওঁর হিমশীতল কণ্ঠস্বর ওকে রীতিমত ভয় পাইয়ে দিয়েছে, পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেওয়া উচিত বুঝেই উঠতে পারছে না। যদিও ইয়াঙ্কিরা পাশের ঘরেই রয়েছে, তবুও সহসা ওর মনে হল রেট বাটলার ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক একজন মানুষ, ওঁর বিরাগভাজন হয়ে পড়লে বিপদ হতে পারে।

“মনে হয় আমারই স্মৃতিবিভ্রম ঘটেছিল। আমার বোঝা উচিত ছিল, তুমি আর আমি একই ধাতু দিয়ে গড়া দুজন মানুষ। গূঢ় অভিপ্রায় ছাড়া তুমি তো এক পাও এগোও না। দাঁড়াও, আমাকে ভাবতে দাও। মনে মনে কোন মতলব ভেঁজে আমার দ্বারস্থ হয়েছেন, মিসেজ় হ্যামিলটন? আশা করি, আমি আপনাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে ফেলব এই রকম দুরাশা বুকে নিয়ে আপনার আগমন ঘটেনি?”

স্কারলেটের মুখচোখ লাল হয়ে উঠল। কোনও জবাব দিল না।

“আমার বহুকথিত সংলাপটাও ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ার বান্দা আমি নই?”

স্কারলেট যখন কোনো কথাই বলল না, উনি কিছুটা হিংস্রভাবে বলে উঠলেন, “ভোলোনি, তাই না? কই জবাব দাও!”

“না, ভুলে যাইনি,” স্কারলেট মিনিমিন করে বলল।

“বাহ্‌! তুমি তো পাকা জুয়াড়ি, স্কারলেট!” ব্যঙ্গ করে বলে উঠলেন উনি। “বেশ একটা সুযোগ নিয়ে ফেললে। ভেবে নিলে বন্দীদশায় আমি তো নারীসঙ্গ বঞ্চিত, তাই তোমাকে দেখেই আমি হামলে পড়ব, যেমন রুই মাছ পোকা দেখলেই হামলে পড়ে!”

মনে মনে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে স্কারলেট ভাবল, “সেটাই তো আপনি করলেন, হাতদুটো খেয়াল না করলে হয়ত – ”

“তাহলে আমরা সত্যে প্রায় উপনীত হতে পেরেছি, প্রায় সবটুকুই, কেবল তোমার মতলবটা ছাড়া। চেষ্টা করে দেখ, আমাকে বিয়ের ফাঁদে ফেলার পেছনে তোমার আসল উদ্দেশ্যটা কী ছিল সেটা যদি আমাকে বলতে পার।”

ওঁর কণ্ঠস্বরে মমতার ছোঁয়া, একটু যেন খুনসুটি করার চেষ্টা। বুকে কিছুটা বল পেল। সব আশা হয়ত এখনও নির্মূল হয়ে যায়নি। অবশ্য ওঁকে বিবাহ করবার আশা ছারখার হয়ে গেছে। হতাশা বোধ করার পাশাপাশি খানিক স্বস্তিও অনুভব করল। বন্দী এই মানুষটার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যা ওকে সন্ত্রস্ত করে, ফলে ওঁকে বিবাহ করার ভাবনাটাই ভয়াবহ। তবে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে, পুরনো স্মৃতি উস্কে দিয়ে ওঁর সহানুভূতি আদায় করতে পারলে হয়ত কিছু ঋণ হয়ত পাওয়া যেতে পারে। এই সব ভেবে স্কারলেট মুখের মধ্যে মানিয়ে নেওয়ার আর শিশুসদৃশ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলল।

“রেট –সাহায্য তো আপনি আমাকে করতেই পারেন – একটু মিষ্টি করে কথা বলুন না!”

“মিষ্টি করে – কথা বলার চাইতে বেশি আর কোনো কিছুতেই আমি এত আনন্দ পাই না।”

“রেট, আমাদের পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরেই নাহয় – একটা সাহায্য পেতে পারি আপনার?”

“তাহলে শেষ পর্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ হস্তদ্বয়ের মালকিন এখানে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে চলেছেন। কেমন যেন মনে হচ্ছিল, এই ‘অসুস্থ একজন কয়েদীর’ সঙ্গে দেখা করতে আসার ভূমিকায় তোমাকে ঠিক মানায় না। কী চাই তোমার? টাকা?”

প্রশ্নটা এমন অতর্কিতে ছুঁড়ে দেওয়া হল যে প্রসঙ্গটা ঘুরপথে, আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে তোলার সুযোগটাই নষ্ট হয়ে গেল।

“এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না, রেট,” খোশামুদে গলায় বলল। “হ্যাঁ, কিছু টাকার আমার দরকার। আমাকে তিনশ ডলার ঋণ হিসেবে দিন।”

“শেষ পর্যন্ত সত্যিটা জানা গেল! মুখে ভালবাসার কথা আরে মনে মনে টাকার চিন্তা! মেয়েলি ছলাকলা, গূঢ়ার্থেই! খুবই জরুরি দরকার?”

“হ্যাঁ – মানে – ঠিক জরুরি নয় তেমন – টাকাটা পেলে কাজে লাগবে।”

“তিনশ ডলার! সে তো অনেক টাকা! কী জন্য প্রয়োজন?

“টারার খাজনা মেটানোর জন্য।”

“তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই রকম – তুমি কিছু টাকা ধার হিসেবে নিতে চাও। তা তুমি যখন এতটাই পেশাদারের মত কথাবার্তা বলছ, আমাকেও পেশাদারের মতই কথা বলতে হবে। এর বদলে তুমি আমার কাছে কী জমানত রাখবে?”

“কী – কী রাখব?”

“জমানত – মানে আমার লগ্নির নিরাপত্তা। অতগুলো টাকা আমি তো আর খুইয়ে বসতে পারি না।” ওঁর কণ্ঠস্বর প্রায় রেশমের মত মসৃণ, তবে স্কারলেট সেটা লক্ষ্য করল না। সব কিছু ভালোয় ভালোয় মিটে যাবে বলেই মনে হচ্ছে।

“আমার এই দুলজোড়া।”

“দুলজোড়ায় আমার কোনও আগ্রহ নেই।”

“আপনার কাছে টারা বন্ধক রেখে দেব।”

“খামার নিয়ে আমি করবটা কী?”

“কী করবেন – কী করবেন – আসলে জানেন, এটা কিন্তু খুব ভাল খামার। আপনি ঠকবেন না। সামনের বছরের তুলো থেকে আপনার ঋণ শোধ করে দেব।”

“ঠিক অতটা নিশ্চিন্ত হতে পারছি না,” চেয়ারে হেলান দিয়ে দুই হাত পকেটে গুঁজে দিলেন। “তুলোর দাম পড়েই চলেছে। সময়টা খুবই খারাপ, টাকাকড়িরও বড়ই টানাটানি।”

“না রেট, আপনি আমার সঙ্গে মজা করছেন! আপনার যে কোটি কোটি টাকা আছে, সেটা তো অস্বীকার করতে পারেন না!”

উনি স্কারলেটকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। অসূয়ায় ভরা চাউনি।

“সব কিছুই তো ভালই চলছে আর তোমার টাকাকড়ির তেমন একটা দরকারও নেই। কথাটা শুনে ভাল লাগছে। পুরনো বন্ধবান্ধবরা সবাই ভাল আছেন জানলে বেশ আনন্দ হয়।”

“ঈশ্বরের দোহাই, রেট …” মরিয়া হয়ে স্কারলেট আরম্ভ করল, ওর সংযম আর সাহসের বাঁধ ভাঙ্গতে লাগল।

“গলাটা নামিয়ে কথা বল। ইয়াঙ্কিরা তোমার কথা শুনে ফেলুক, সেটা নিশ্চয়ই তোমার কাম্য নয়। কেউ কি তোমাকে কখনো বলেছে তোমার চোখগুলো ঠিক বেড়ালের চোখের মত – অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে?”

“দোহাই, রেট! সব কিছু খুলে বলছি আপনাকে। টাকাটা সত্যিই আমার ভীষণ প্রয়োজন। আ – আমি সব কিছু ঠিকঠাক চলছে – কথাটা মিথ্যে বলেছিলাম আপনাকে। যতটা বেঠিক হতে পারে, সব কিছুই ততটাই বেঠিক। বাপি – উনি – উনি আর নিজের মধ্যে নেই। মা চলে যাওয়ার পর থেকেই উনি অদ্ভুত আচরণ করছেন। উনি আর আমাকে সাহায্য করবার অবস্থায় নেই। একেবারে শিশুদের মত হয়ে গেছেন। তুলোর চাষ করার মত একজনও খেতমজুর নেই। এদিকে অনেকগুলো মানুষকে খাওয়াতে পরাতে হচ্ছে – আমাকে নিয়ে তেরোজন। তারপর খাজনার টাকা – এত বাড়িয়ে দিয়েছে! আপনাকে সব বলছি, রেট। এক বছরের ওপর হতে চলল, আমরা প্রায় অনাহারে রয়েছি। আপনি জানেনই না! আপনার জানা সম্ভবই নয়! যথেষ্ট খাবার নেই আমাদের, আর খিদে নিয়ে ঘুম থেকে ওঠা আর খিদে নিয়ে ঘুমোতে যাওয়া – কী ভয়ানক ব্যাপার! ্ররম পোশাকও নেই আমাদের, বাচ্চারা ঠাণ্ডায় কাঁপছে – অসুস্থ হয়ে পড়ছে – ”

“এত সুন্দর পোশাকটা কোথা থেকে পেলে?”

“মায়ের একটা পর্দা কেটে বানানো হয়েছে,” মরিয়া হয়ে জবাব দিল, মিথ্যে বলে লজ্জা ঢাকার সাহস পেল না। “অনাহার, শীতের প্রকোপ সহ্য করতে পারছিলাম না – আর এখন কার্পেটব্যাগাররা আমাদের খাজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। টাকাটা এখুনি মিটিয়ে দিতে হবে। আমার হাতে কিচ্ছু নেই, কেবল পাঁচ ডলারের একটা স্বর্ণমূদ্রা ছাড়া। খাজনা দেবার জন্য টাকাটা আমাকে জোগাড় করতেই হবে! বুঝতে পারছেন? যদি না দিতে পারি, টারা আমার – আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে – আর সেটা কিছুতেই হতে দিতে পারি না! টারাকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারব না!”

“কথাগুলো প্রথমেই ভণিতা না করেই আমাকে বললে না কেন? তার বদলে আমার হৃদয়ের দুর্বলতাকে – বিশেষ করে সুন্দরী মহিলাদের দুঃখকষ্টে আমার হৃদয় অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে – কাজে লাগাতে চাইলে? না, স্কারলেট, কেঁদে কোনো লাভ হবে না। ওটা ছাড়া আর সব রকম ছলাকলা কাজে লাগিয়ে ফেলেছ, কান্নাকাটি করলে বোধহয় আমি আর নিজেকে সামলাতে পারব না। ইতিমধ্যেই আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেছে, আমাকে নয়, আসলে আমার টাকাকেই তুমি কামনা করেছ।”

স্কারলেটের মনে পড়ে গেল, রসিকতা করতে করতেই নিজের সম্বন্ধে গূঢ় সত্যগুলো বলে দেওয়া ওঁর স্বভাব। অন্যদের নিয়ে রসিকতা করার পাশাপাশি নিজেকে নিয়ে রসিকতা করতেও ছাড়েন না। দ্রুত একবার ওঁর চোখের দিকে তাকাল। চোখে কি সত্যিই বেদনার ছোঁয়া? উনি কি সত্যিই ওর জন্য ভাবেন? বিবাহের প্রস্তাব দিতে গিয়েই কি ওর হাতের তালুর ওপর ওঁর চোখ পড়ে গেল? নাকি উনি অন্য কোনও ঘৃণ্য প্রস্তাব দিতে যাচ্ছিলেন, এর আগেও দুবার যেমন দিয়েছিলেন? সত্যিই যদি উনি ওর কথা ভাবেন, তাহলে ওঁকে হয়ত মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু ওঁর কালো চোখদুটোতে প্রেমিকসুলভ দৃষ্টির ছায়ামাত্র নেই। নিঃশব্দে হেসে চলেছেন।

“তোমার জমানত আমার পছন্দ হল না। চাষবাস করা আমার পেশা নয়। অন্য কী দিতে পারবে?”

যাক পথে আনা গেছে! এবার ঘায়েল করতে হবে। জোরে একবার শ্বাস নিল। চোখে চোখ রেখে তাকাল। ছলাকলা করার চেষ্টা, ভণিতা সব সরিয়ে দিল। যে ব্যাপারের জন্য মনে মনে এত দ্বিধা, এত সংশয় ছিল, এবার সেটাই করবার সময় এসেছে।

“আমি – আমি নিজেকে দিতে পারি।”

“কী বলতে চাইছ?”

স্কারলেটের চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল। চোখ পান্নার মত সবুজ হয়ে জ্বলতে লাগল।

“আন্ট পিটির বারান্দায় – অবরোধের সময়, সন্ধেবেলা – সেই দিনটা আপনার মনে আছে? আপনি বলেছিলেন – বলেছিলেন, আপনি আমাকে কামনা করেন।”

অলসভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে স্কারলেটের উত্তেজনায় টানটান মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওঁর চেহারা ভাবলেশহীন। পলকের জন্য চোখের মণিদুটো নেচে উঠল। তবে কোনো কথা বললেন না।

“আপনি বলেছিলেন – বলেছিলেন অন্য কোনো মহিলাকেই আপনি এমন তীব্রভাবে কামনা করেননি, যতটা আমাকে করেছেন। এখনও যদি কামনা করেন, আমাকে আপনি পেতে পারেন। আপনি যেমন চাইবেন, আমি করতে রাজি আছি, রেট, দোহাই আপনার, একটা চেক-এ সই করে টাকাটা আমাকে লিখে দিন! আমার কথার দাম আছে। দিব্যি করে বলছি! আমি কথার খেলাপ করব না! যদি বলেন, আমি লিখে দিতে রাজি আছি।”

অদ্ভুত দৃষ্টিতে উনি ওর দিকে চাইলেন। ওঁর মনের ভেতরে কী চলছে, সেটা এখনও বোঝা গেল না। স্কারলেটের তাড়া ছিল, তাই সেই দৃষ্টিতে কৌতুক ছিল না ঘৃণা সেটাও বুঝে উঠতে পারল না। হ্যাঁ বা না, কিছু একটা বলুন অন্তত! গালদুটো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ওর।

“টাকাটা আমার খুব তাড়াতাড়ি দরকার, রেট। নইলে ওরা আমাদের ঘাড় ধরে বের করে দেবে, আর বাপির ওই শয়তান ওভারসিয়ারটা জায়গাটা কিনে নেবে আর – ”

“এক মিনিট, এক মিনিট! তোমাকে আমি এখনও কামনা করি, এই ধারণাটা কীভাবে এল? তোমার মূল্য আমার কাছে তিনশ ডলার, এরকম কথা ভাবলে কী করে? বেশিরভাগ মহিলাকেই এর চাইতে কম দামেই পাওয়া যায়!”

চুলের গোড়া পর্যন্ত অপমানে রাঙা হয়ে উঠল ওর, বেইজ্জতির আর কিছুই বাকি রইল না।

“কেন এসব ঝামেলায় যাচ্ছ? যেতে দাও না ওই খামারটা। মিস পিটিপ্যাটের ওখানে থাক। ওই বাড়ির অর্ধেকটা তো তোমার নামেই।”

“হায় কপাল!” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। “আপনি কি বোকা নাকি? টারাকে আমি হাতছাড়া হতে দিতে পারি না। ওটা আমার ঘর। কিছুতেই ওটা আমি যেতে দিতে পারি না! অন্তত যতক্ষণ আমার দেহে শ্বাস আছে!”

“আইরিশদের দোষ কী জানো?” চেয়ারটাকে আরও একটু হেলিয়ে নিয়ে, পকেট থেকে হাতদুটো বের করে নিয়ে বললেন, “জাতটা বড়ই একগুঁয়ে। ভুলভাল জিনিসকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে ফেলে! জমিজমার কথাই ধর না কেন! এক টুকরো জমির থেকে আরেক টুকরো জমির কী এমন তফাৎ? যাই হোক, একটা ব্যাপারে স্পষ্টাস্পষ্টি কথা বলে নেওয়াই বোধহয় ভাল। একটা ব্যবসায়িক প্রস্তাব নিয়ে তুমি আমার কাছে এসেছ। আমি তোমাকে তিনশ ডলার দেব, তার বদলে তুমি আমার রক্ষিতা হতে রাজি আছ।”

“হ্যাঁ।”

ওই গা গুলিয়ে ওঠা শব্দটা যখন উচ্চারিত হয়েই গেল, স্কারলেট কিছুটা স্বচ্ছন্দ বোধ করল, নতুন করে আবার আশার আলো দেখতে পেল। উনি বললেন, “আমি তোমাকে তিনশ ডলার দেব।” চোখে পৈশাচিক এক দীপ্তি, যেন কোনও একটা ব্যাপারে উনি খুব আমোদিত হয়েছেন।

“অথচ, যখন তোমাকে এই প্রস্তাবটা দেবার স্পর্ধা দেখিয়েছিলাম, তুমি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলে। তাছাড়া তুমি আমাকে বাছা বাছা গালি দিয়েছিলে আর বলেছিলে ‘এক গুষ্টি বাচ্চাকাচ্চা’ তুমি চাও না। না, না, কাটা ঘায়ে নুনের ছিঁটে দেবার জন্য কথাটা বলিনি, প্রিয়ে। তোমার মনের বিচিত্র গতি দেখে অবাক হচ্ছি মাত্র। আনন্দলাভের জন্য তুমি রাজি হতে পারনি, অথচ বাড়ির দোরগোড়া থেকে নেকড়েদের দূরে রাখার জন্য রাজি হয়ে গেলে! তাহলে যে কথাটা আমি হামেশা বলে থাকি, পাপ-পুণ্যের ভেদাভেদটা স্রেফ মূল্যের ওপর নির্ভর করে!”

“কী যে আবোলতাবোল সব বকে চলেছেন, রেট! যদি আমাকে অপমান করার হয়, মন খুলে করুন না, কিন্তু দয়া করে টাকাটা দিয়ে দিন।”

এখন ও স্বাভাবিকভাবেই নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রেটের স্বভাব তো জানা, ওকে যত খুশি জ্বালাতন করার যে সুযোগ পেয়েছেন, সেটা কিছুতেই হাতছাড়া করবেন না। কত তুচ্ছতাচ্ছিল্যই না করেছে একসময়, তার ওপর আজকের এই ছলাকলায় ভোলানোর চেষ্টা – জ্বালাতন করে কড়ায় গণ্ডায় উশুল না করে ছেড়ে দেবেন? ঠিক আছে, সহ্য করতে হবে। সব সহ্য করতে রাজি আছে। টারার জন্য সব সহ্য করা যায়। এক মুহূর্তের জন্য কল্পনায় গ্রীষ্মের একটা দিন ভেসে উঠল, মধ্যাহ্নের নীল আকাশ, টারার লনের ঘন সবুজের চাদরের ওপর তন্দ্রাচ্ছন্নভাবে শুয়ে আছে, মাথার ওপরে ভেসে থাকা সঞ্চরমান মেঘের মিনারগুলোর পানে অপলকে চেয়ে আছে, সদ্য ফোঁটা সাদা সাদা ফুলের সুরভি অনুভব করছে, মৌমাছিদের মধুর গুঞ্জরণ শুনতে পাচ্ছে। ধূপছায়া, নিস্তবধতা আর দূর থেকে ভেসে আসা লাল খেতে ওয়াগনের পাক খাওয়ার শব্দ। অমূল্য! তার চেয়েও বেশি কিছু!

স্কারলেট মাথা তুলল।

“টাকাটা আমায় দিচ্ছেন তো?”

এমনভাবে ওর দিকে তাকালেন যেন অত্যন্ত আমোদ লাভ করছেন। কথা যখন বললেন, তখন কণ্ঠস্বর কোমল অথচ নির্মম।

“নাহ্‌, দিচ্ছি না,” কাটা কাটা জবার ওঁর।

এক মুহূর্তের জন্য স্কারলেট নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

“ইচ্ছে থাকলেও টাকাটা দেওয়া সম্ভব নয় আমার। আমার কাছে এক কানাকড়িও নেই। এক ডলারও অ্যাটলান্টায় নেই। কিছু টাকা সত্যিই আছে আমার, তবে এখানে নেই। সেটা কোথায় আছে, কত টাকা আছে, তা আমি বলব না। তোমাকে একটা চেক কেটে দেবার চেষ্টা করলেই ইয়াঙ্কিরা একেবারে কুকুরের মত আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন টাকাটা না তুমি পাবে, না আমি। তাহলে কী মনে হয় তোমার?”

স্কারলেটের চোখ থেকে সবুজের হলকা বেরোতে লাগল। নাসিকা সহসা স্ফুরিত হয়ে উঠল। রাগে অন্ধ হয়ে গেলে জেরাল্ডকে চোখমুখ কুঁচকে যেরকম দেখায়, ওকেও সেই রকম লাগছিল। অস্ফুট আর্তনাদ করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। পাশের ঘর থেকে যে গুঞ্জন ভেসে আসছিল, সেটা হঠাৎ থেমে গেল। শ্বাপদ দ্রুততায় রেট ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। শক্ত হাতে ওর মুখ চেপে ধরলেন। ওর কটিদেশ শক্ত করে বেষ্টন করে ফেললেন অন্য বাহু দিয়ে। স্কারলেট উন্মত্তের মত নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। হাত কামড়ে দেবার চেষ্টা করতে লাগল, ওঁর পায়ে লাথি মারার চেষ্টা করতে লাগল, রাগে, ঘৃণায়, হতাশায়, অপমানে আর্তনাদ করে উঠতে চাইল। ওঁর বজ্র আঁটুনির মধ্যেই শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে অস্থির হয়ে উঠল। দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। এত শক্ত করে ওকে ধরে ছিলেন, আর এমন নিষ্ঠুর ভাবে, যে ওর ব্যথা লাগছে। হাতের নির্দয় চাপ মুখের ভেতরে গিয়ে চোয়ালে খোঁচা মারছে। ওঁর মুখের বাদামি ত্বক ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে, চোখে উদ্বিগ্ন কঠিন দৃষ্টি। এক ঝটকায় মেঝে থেকে তুলে নিয়ে, নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে ওর ছটফট করতে থাকা শরীর কোলে নিয়ে চেয়ারে বসলেন।

“দোহাই, প্রিয়তমে! বন্ধ কর! চুপ কর! চেঁচামেচি কোরো না। তাহলে এখুনি ওরা ঢুকে পড়বে। শান্ত হও। ইয়াঙ্কিরা তোমাকে এই অবস্থায় দেখুক, সেটা কি তুমি চাও?”

কে কার কথা শোনে! কী এসে যায় কে কী দেখে ফেলল! তখন ওঁকে খুন করে ফেলবার তীব্র অভিপ্রায় ছাড়া আর কিছুই ওর মাথায় ঢুকছে না। মাথাটা বনবন করে ঘুরছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। ওঁর চাপে দমবন্ধ হয়ে আসছে। ফ্রকের দড়ি শক্ত হয়ে কেটে বসছে। ওঁর বাহুবেষ্টনীতে অসহায় বোধ করছে, রাগ আর ঘেন্নায় শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। ওঁর কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে, ওঁর মুখটা বিরক্তিকর কুয়াশায় ঢেকে যেতে যেতে একেবারে মিলিয়ে গেল। ওঁকে আর দেখতে পাচ্ছে না – কিছুই আর দেখতে পাচ্ছে না।

সাঁতার কাটার ভঙ্গিতে হাত পা নেড়ে হুঁশে ফেরার চেষ্টা করতে করতে মনে হল সমস্ত শরীর অবসন্ন, দুর্বল লাগছে, বিচলিত লাগছে। চেয়ারের ওপর শুয়ে আছে, বনেটটা খসে পড়েছে, রেট ওর কব্জিতে আস্তে আস্তে চাপড় মারছেন, উদ্বিগ্ন কালো চোখে ওকে ঠাহর করার চেষ্টা করছেন। সেই ভদ্র তরুণ ক্যাপটেন গ্লাস থেকে ওর মুখে ব্র্যান্ডি ঢেলে দিচ্ছেন, তার খানিকটা ওর ঘাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে। বাকি অফিসাররা ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন আর নিজেদের মধ্যে হাত নেড়ে নেড়ে ফিসফিস করে কথা বলছেন।

“আমি – আমি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম,” ক্ষীণ কণ্ঠে স্কারলেট বলল। মনে হল আওয়াজটা যেন কোন সুদূর থেকে ভেসে আসছে। ওর ভয় করতে লাগল।

“এটা চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেল,” গ্লাসটা নিয়ে রেট সেটা ওর ঠোঁটের ওপর ধরলেন। এবার ওর সব কথা আস্তে আস্তে মনে পড়তে লাগল। কিন্তু রেগে ওঠার শক্তি সঞ্চয় করতে পারল না।

“নাও – অন্তত আমার কথা ভেবে খেয়ে নাও ।”

তাড়াহুড়ো করে ঢোঁক গিলতে গিয়ে স্কারলেট বিষম খেল, কাশতে শুরু করল। তবুও রেট গ্লাসটা মুখের সামনেই ধরে রইলেন। পানীয়টা গলা দিয়ে জ্বলতে জ্বলতে নামতে লাগল।

“মনে হয় এখন ও সুস্থ বোধ করছে, মহাশয়েরা,” রেট বললেন, “আর অজস্র্য ধন্যবাদ আপনাদের। আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে জেনে ও নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেনি।”

নীল ইউনিফর্মরা কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবে পায়চারি করলেন, ওঁদের চেহারায় অপ্রস্তুত ভাব, তারপর বেশ কয়েকবার গলা খাঁকারি দিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। তরুণ ক্যাপটেন বেরোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়লেন।

“আমার যদি আরও কিছু করবার থাকে – ”

“আরে, না, না, ধন্যবাদ।”

দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে উনি বেরিয়ে গেলেন।

“আরও একটু খেয়ে নাও।”

“না।”

“খেয়ে নাও বলছি।”

ও আরও এক ঢোঁক খেল। উষ্ণ একটা আমেজ ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কাঁপুনি থেমে গিয়ে দুই পায়ে আস্তে আস্তে বল সঞ্চার হতে লাগল। গ্লাসটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু উনি ওকে আবার ঠেলে বসিয়ে দিলেন।

“হাত সরিয়ে নিন। আমি চললাম।”

“এখুনি নয়। মিনিটখানেক অপেক্ষা কর। আবার জ্ঞান হারাতে পার।”

“আপনার সঙ্গে এখানে থাকার চেয়ে আমার বরং রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়াই ভাল।”

“তবুও। আমি তোমাকে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়তে দিতে পারি না।”

“যেতে দিন আমাকে। আপনাকে আমি ঘেন্না করি।”

কথাটা শুনে ওঁর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে গেল।

“হ্যাঁ, এই কথাটা ঠিক তোমার নিজের মতই শোনালো। তার মানে তুমি এখন সুস্থ বোধ করছ।”

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ শুয়ে থেকে, স্কারলেট রেগে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল, মনের জোর ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু বড়ই অবসন্ন লাগছে। এতই অবসন্ন লাগছে যে রেগে উঠতেও পারছে না। দুনিয়া রসাতলে গেলেও ওর কোনো পরোয়া নেই। পরাজয়ের গ্লানি সীসের মত ভারি হয়ে বুকে চেপে বসেছে। নিজের যা কিছু ছিল জুয়া খেলার বাজিতে চড়িয়েছিল, হেরে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। এমনকি অহঙ্কারটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। এক অন্ধ গলিতে ঢুকে শেষ আশাটাও নির্মূল হয়ে গেছে। টারার সর্বনাশ হয়ে যাবে, ওদের সকলেরই সর্বনাশ হয়ে যাবে। অনেকটা সময় ধরে চোখ বন্ধ করে চিত হয়ে শুয়ে রইল। একদম কাছ থেকে ওঁর জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দ পাচ্ছে। ব্র্যান্ডির প্রভাব উত্তরোত্তর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে, উষ্ণবোধ করছে, শরীরে যেন বল ফিরে পাচ্ছে। অবশেষে চোখ যখন খুলল, ওঁকে দেখেই ভেতরে ভেতরে রাগটা আবার ফুঁসে উঠতে লাগল। বাঁকা ভুরুদুটো জড়ো হয়ে ভ্রূকুটি করে রেটের মুখে চোখ পড়তেই, ওঁর মুখে সেই পুরনো হাসিটা ফিরে এল।

“হ্যাঁ, এবার তোমাকে বেশ সুস্থ লাগছে। তোমার ওই কোঁচকানো ভুরু দেখেই মালুম হচ্ছে।”

“নিশ্চয়ই! আমি একদম ঠিক আছি। আপনি অত্যন্ত ঘৃণ্য একজন মানুষ, ছুঁচোও আপনার চাইতে ভাল! আমি মুখ খুলতে না খুলতেই আপনি বুঝে নিয়েছিলেন আমি কী বলতে চলেছি, আর তখনই ঠিক করে নিয়েছেন যে টাকা আপনি আমায় দেবেন না। তা সত্ত্বেও আপনি আমাকে বলে যেতে দিলেন। আমাকে অন্তত অপদস্থ হওয়ার হাত থেকে রেহাই – ”

“বল কী! রেহাই দিলে এত সব রসালো কথা শোনা থেকে বঞ্চিত হয়ে যেতাম যে! তাও তো সেরকম কিছুই না! বিনোদনের সুযোগ এত কম এখানে! এমন মুখরোচক কথাবার্তা শেষ কবে শুনেছিলাম, মনেই পড়ে না,” ছদ্ম পুলকে রেট হেসে ফেললেন। স্কারলেট লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, বনেটটা ছিনিয়ে নিল।

উনি চকিতে ওর কাঁধে হাত রেখে আটকালেন।

“এখনই নয়। ধৈর্য ধরে দু’চারটে কথা শোনার মত মাথা তোমার ঠাণ্ডা হয়েছে কি?”

“যেতে দিন আমাকে!”

“হুঁ, বোঝা গেল তুমি বেশ ভালই আছ এখন। তাহলে একটা কথা বলে যাও। আমিই কি তোমার একমাত্র বলির পাঁঠা?” তীক্ষ্ণ, সজাগ চাউনি। স্কারলেটের মুখের রেখার প্রতিটি কম্পন যেন খুব মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করছেন।

“কী বলতে চাইছেন আপনি?”

“মানে আমিই কি একমাত্র পুরুষমানুষ যার ওপর তোমার ছলা কলা পরীক্ষা করবে বলে ভেবেছ?”

“তাতে আপনার মাথাব্যথার কী আছে?”

“কতটা মাথাব্যথা, সেটা যদি তুমি বুঝতে! অন্য কোনও পুরুষমানুষকেও তোমার জালে আটকানোর কথা ভেবেছ কি? বল – বল আমাকে!”

“না।”

“অবিশ্বাস্য! ভাবতেই পারছি না, অন্তত পাঁচ ছ’জনকে হাতে না রেখেই তুমি এগিয়েছ! তোমার এমন লোভনীয় প্রস্তাবটা একজন না একজন লুফে নেবেই! এই ব্যাপারে আমি খুবই নিশ্চিত, আর তাই তোমাকে একটা ছোট্ট উপদেশ দিতে চাই।”

“আপনার উপদেশ আমি শুনতে চাই না।”

“কিন্তু উপদেশ যে আমি তোমাকে দেবই। অন্তত এই মুহূর্তে উপদেশ ছাড়া আর কিছুই তোমাকে দেবার মত নেই। মন দিয়ে শুনে নাও, খুবই ভাল উপদেশ এটা। কোনো পুরুষমানুষের যদি কিছু আদায় করার থাকে, তাহলে সব কথা উগরে দিও না, আমার কাছে যেমন করেছ। আরও একটু চালাক হতে হবে, বেশি করে পটাতে হবে। ভাল ফল পাবে। আগে কায়দাটা খুব নিখুঁতভাবেই রপ্ত ছিল তোমার। কিন্তু এই একটু আগে – তুমি যখন আমার টাকার বদলে – ওই – জমানত রাখার কথা বললে – তখন তোমাকে খুব কাঠ কাঠ দেখাচ্ছিল। তোমার মত ওইরকম চাউনি আমি আগেও দেখেছি – ড্যুয়েলিং-এর পিস্তল নিয়ে বিশ পা দূরে থাকা আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে – খুব সুখকর চাউনি সে নয়। পুরুষ হৃদয়ে সেই চাউনি কোনও কামনা জাগাতে পারে না। এভাবে পুরুষমানুষকে তুমি মানাতে পারবে না। যৌবনের আদিতে শেখা পাঠগুলো কি ভুলে গেলে?”

আমার আচরণ কেমন হওয়া উচিত সেই ব্যাপারে আপনার জ্ঞান শোনবার কোনও প্রয়োজন আমার নেই,” ক্লান্তভাবে বনেটটা মাথায় লাগাতে লাগাতে বলল স্কারলেট। মাথার ওপরে ফাঁসির দড়ি ঝুলে থাকা আর ওর করুণ অবস্থার কথা জেনেও উনি কীভাবে হৃষ্ট মনে এই ধরণের রসিকতা করে যেতে পারেন, সেটা কিছুতেই ওর মাথায় ঢুকছিল না। স্কারলেট এটাও লক্ষ্য করল না যে নিজের অক্ষমতার জন্য অসহিষ্ণু হয়ে হাতদুটো শক্ত মুঠো করে পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছেন।

“মুখটা ব্যাজার করে রেখো না,” বনেটের ফিতে বাঁধতে থাকা স্কারলেটের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন। “আমাকে ফাঁসি দেবার দিন আসতে পার। মন ভাল হয়ে যাবে। তোমার সব পুরনো ক্ষতে প্রলেপ লাগবে – এমনকি আজকেরটার জন্যও। আর হ্যাঁ, আমার উইলে তোমার নাম উল্লেখ করে যাব।”

“অনেক ধন্যবাদ। কে জানে ওরা আপনাকে কবে ফাঁসিতে ঝোলাবে? তখন হয়ত খাজনা দেওয়ার সময় পেরিয়ে যাবে,” ওর মানসিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গলায় যতটা সম্ভব বিষ ঢেলে কথাটা বলল। এবং দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গেই বলল।

----------

টীকাঃ

১ নিহিল ডেস্পারেন্ডুম – Nihil Desperandum – যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ।

২ হামান – বাইবেলের একটি চরিত্র। রাজসভাসদ এবং খলনায়ক যে ইহুদিদের ধ্বংস করার জন্য রাজাকে পরামর্শ দিয়েছিল। পরে এস্থারের কাছ থেকে সত্য জেনে রাজা তাকে ফাঁসির সাজা দেন। যে উঁচু ফাসিকাঠ হামান ওর পরমশত্রু মরডেকাইয়ের জন্য বানিয়েছিল, সেই ফাঁসিকাঠেই হামানকে লটকে দেওয়া হয়েছিল। 
 
টীকা

১ নিহিল ডেসপারেন্ডুম (Nihil desperandum) - হতাশ হবার কিছু নেই (ল্যাটিন)

২ হামান – হিব্রু বাইবেলের একটি চরিত্র যিনি পারস্য সাম্রাজ্যে সম্রাট আসিরিয়াসের উজির ছিলেন। উনি পাপী হামান নামেও পরিচিত ছিলেন। উনি সম্রাটকে সাম্রাজ্যের সমস্ত ইহুদিদের হত্যা করবার প্ররোচনা দিয়েছিলেন, কিন্তু রাণী এস্থারের হস্তক্ষেপে সেই পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায়। সম্রাটের আদেশে তাঁকে পঞ্চাশ হাত উঁচু ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়।


অনুবাদক পরিচিতি:
উৎপল দাশগুপ্ত - অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কার। কর্মজীবনের শুরু ভারত সরকারে অর্থ মন্ত্রক থেকে। অল্প লেখালেখি আর অনুবাদের কাজ করেন। তবে নিজের লেখালেখির চাইতেও বই পড়তে বেশি ভালবাসেন, বিভিন্ন বিষয়ে।  ঘুরে বেড়াতে, অবসর সময়ে গান শুনতে ভালবাসেন। শখের ফটোগ্রাফি করে থাকেন। কলকাতায় থাকেন।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ