ঋভু চট্টোপাধ্যায়ের গল্প : মানুষের ডিম

       


সকালের আলো আকাশের অন্ধকার দূর করলেও ভজার মুখ আরো কালো হয়ে উঠেছে। বড়ছেলে সুকুমার তিনদিন ধরে ডিম পাড়ছে, এমনিতে যে সব সময় পেড়েই যাচ্ছে এমন নয়, বেশ কয়েক দিন ধরে সকালে পায়খানার সাথে একটা ডিম বেড়িয়ে যাচ্ছে। কথাগুলো শুনতে খ্যাপা খ্যাপা মনে হলেও ঘটনাটা এক্কেবারে সত্যি। অন্তত ভজার নিজে গিয়ে দেখে এসে সেকথাই মনে হয়েছে। অবাক হয়েছে,‘এত বড় ডিম ঐ ফুটো দিয়ে বের হল কি করে?’

বড়ছেলেটা এমনিতে খুব শান্ত, পড়াশোনাতেও খুব মাথা। কোন প্রাইভেট দিতে না পারলেও প্রতিবছর একবারের নতুন ক্লাসে উঠে যায়। কয়েকদিন আগে ওর ক্লাসের এক স্যারের সাথে বাজারে দেখা হয়েছিল। সুকুমার নিজে গিয়ে কথা বলবার পর স্যার ভজার সাথেও কথা বলেন। তখনই ভজা সুকুমারের মাথার কথাটা জানতে পারে। কিন্তু এটা কি হচ্ছে কারোর মাথাতে ঢুকছে না। ছেলেটার শরীর ভালোই ছিল, এই দিন কয়েক হল সকালে পায়খানার জন্যে মাঠে গিয়ে বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে। কে’জানে আবার পুকুরে মাছ ধরছে কি না, কিন্তু ধরতে পারলে লুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসতো। আগে বেশ কয়েকবার এনেছে।পালপুকুরের লোকগুলো খুব পাজি, দেখতে পেলেই চিৎকার করে। তাহলে কি ছেলেটা কোথাও ঘুরতে চলে যাচ্ছে, কোন বদ সঙ্গে পড়ল? কয়েকটা দিন দেখে ভজার বৌ, পাখি, ছোট ছেলে রাজারামকে তার দাদার খোঁজে পাঠালে ও কিছু সময় পর একা ফিরে এসে বলে, ‘হাগার পর দাদার পোঙায় বাজছে, বটগাছের তলায় শুয়ি পড়িছে।’

ভজা তখন মাঠে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। রাজারামের কথা শুনেই পাখির সাথে এক ছুটে পৌঁছে গেল সেই বটগাছের নিচে। একটু হয়ত ব্যথাটা কমলেও ক্লান্তি শরীরটাকে তখনও আরো বিপর্যস্ত করে রেখেছিল। পাখি ভজার আগে পৌঁছে সুকুমারের মাথাটা নিজের কাঁধের উপর রেখে বলে ওঠে, ‘ব্যাটা, কুথাকে বাজছে?’

সুকুমার একটু লজ্জাতে পড়ে যায়। মুখ দেখে সদ্য কাটিয়ে ওঠা ব্যথা বোঝা গেলেও সেটা প্রকাশ করতে তার অপারগতা বুঝতে পেরে পাখি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, ‘মায়ের কাছে লজ্জা কি, কি হয়েছে বল?’

–আমার হাগার সাথে ডিম বেরোয়ছে।

‘ডিম!’ পাখি একটু অবাক হয়ে যায়। এমনিতে পেটে কৃমি থাকলে তাদের ডিম পায়খানার সাথে বের হয়। সে কথাটা মনে করেই পাখি উত্তর দেয়, ‘পেটে কৃমি হনছে, আমি আজ রমলা পিসিকে শুধাই রাখব, কালকে হেল্থ সেন্টার থিকে ওষুধ এনি দিবেক।’

– এই ডিম সেই ডিম লয়, ইট বড় ডিম, পায়রার ডিমের পারা।

- সেকিরে, তাহলে কি সাদা হাগা হচে, পীতজ্বর হল নাকি ?

– না গো ইট ডিম বটে, কালকেও বেরোয়ছিল। কয়েকট দিন ধরে বেরোয় যেছে।

ভজা এতক্ষণ বোবার মতো সব কিছু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। সুকুমারের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে একরকম ঝাঁপিয়ে বলে উঠল, ‘চল তো দেখি জিনিসট কি বটে।’

সুকুমার ততক্ষণে অনেকটাই ঠিক হয়েছে। তাও কিছুটা খুঁড়িয়ে ভজার পিছন পিছন পুকুরের ধারে গেলে একটা শুয়রের ডাক শুনে শুধু মাটি দেখেই ফিরে আসতে হয়। বাড়ি ফেরার রাস্তায় সুকুমারের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘জিনিসট কি বটে দেখতে তো পেলম নাই, কালকের দিনট যাক তারপর হেল্থ সেন্টার বা বড় হাসপাতারে লিয়ে যাবো। কালকে মনে হয় স্বাস্হ্য দিদিমণি কলকেতায় যাবেক, উয়াদের কি সব মিছিল রইছে।’

সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পর সুকুমার আরেকবার পায়খানা গেলেও আর কোন ডিম বের হয় নি। সুকুমারের মুখ থেকেই সেটাই জানা গেল। পরের দিন অবশ্য সুকুমারকে একটু অন্ধকার থাকতেই পুকুরের পাড়ে যেতে হয়। পিছন পিছন তার মা পাখিও যায়। একটু আড়ালে থেকে কিছু সময় পর পর জিজ্ঞেস করতে থাকে, ‘ডিম বেরোল…’

সুকুমার কিছু ক্ষণ ‘না.. না..’ বললেও মাঝখানে তার গলা আটকে যায়। যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে, পাখি তাড়াতাড়ি সেখানে পৌঁছায়। ততক্ষণে পরিষ্কার দিনের আলো ফুটে গেছে। পাখি সেই আলোতে স্পষ্ট ভাবে সুকুমারের পায়খানাতে সাদা রঙের ডিমের মতো কিছু একটা দেখতে পায়। ও বসে বসে খুঁটিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখে। একটা কাঠি দিয়ে নাড়ে, তখনও ওটাতে রক্ত লেগে ছিল। তার মাথাটা কেমন যেন করতে আরম্ভ করে, গা’টাও গুলিয়ে ওঠে। কোন দিন মানুষের পায়খানাতে ডিম বেরিয়েছে বলে তো শোনা যায় নি। এটা কি আদৌ ডিম, নাকি অন্য কিছু, কিছু খেয়ে ফেলেছিল সেটাই বেরিয়েছে। পাখির মাথার মধ্যে নানা রকম শব্দ অক্ষর ঝাঁপাঝাঁপি আরম্ভ করে। কাঠিটা দিয়ে ঐ সাদা জিনিসটা আলাদা করে। তারপর হাল্কা চাপ দিতেই ওটা ভেঙে যায়। না পরিষ্কার পাখির ডিমের মতো কিছু একটা, সেই হলুদ অংশ, সাদা অংশ, ডিম ভাঙলে যেমন আলাদা ভাবে সব কিছু বের হয়। কাউকে বলবে কীভাবে, আর বললে কেউ বিশ্বাসই বা করবে কেন? শুনে তো অনেকেই মুখের সামনে হেসে উঠতে পারে। কিন্তু ডিমটা বের হচ্ছে কোথা থেকে, তাহলে কি সুকুমারের পেটে পাখি ঢুকেছে বা কোন পোকা, ওটারই ডিম…!

পাখি ছেলেটাকে ধরে ধরেই বাড়িতে নিয়ে আসে। ততক্ষণে ভজাও ঘুম থেকে উঠে গেছে। সে তাকে সব ঘটনা খুলে বললে তারও মুখ চোখ ছোট হয়ে যায়। পরপর কয়েকটা দিন ছেলেটার পায়খানার সাথে ডিম বেরোল, এটা কি কোন রোগ, না কোন ভূত প্রেতের উপদ্রব? কার কাছে যাবে, কাকে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বলে পরামর্শ চায়বে? ছোটছেলে রাজারামেরও ঘুম ভেঙে যায়। দুই ছেলের মুখের দিকে তারা তাকাতে পারে না। এর মাঝে ভজা আবার পাখির উপর রেগে যায়, ‘ডিমট ভাঙি দিলে তুলে আনতে লাড়লে? কাউকে দেখাব কীভাবে?’ কথাগুলো পাখির মনে গাঁথে। হক্ কথা বটে। তাহলে কালকে যদি বেরোয় একট তুলি রাখতে হবেক।

পাখি সুকুমারকে স্কুলে যেতে বারণ করে। ভজার নিজেরও মাঠে যেতে মন করে না। কিন্তু উপায় নেই, নিজের কোন জমি নেই, পরের জমিতে লেবার খাটে, আজকে না গেলে কালকে ভাতের হাঁড়ি নাও চড়তে পারে। সকালে মাঠে কাজের পর আরেকজনের বাড়িতেও কাজ করে, খড় কাটে, রাতে দুধ দোওয়ায়, তারপর মালিককে সব কিছু বুঝিয়ে গোয়ালে ধোঁয়া জ্বেলে বাড়ি ফেরে।

বাড়ি ফিরতেই পাখি চিৎকার করতে আরম্ভ করে। কিন্তু ভজা বোঝাতে পারে না সুকুমার তারও ছেলে কিন্তু কিছু করবার নেই। অবশ্য তার মুখে শুনতে পায় সারাটা দিন সুকুমারকে দেখে কিছু মনেই হয় নি, এক্কেবারে স্বাভাবিক ছেলে। স্কুলে না গেলেও সারাটা দিন মাঠ, গাছ, পুকুর কিচ্ছুই বাকি রাখে নি। বিকালেও তাই। সন্ধেবেলা পড়তে বসলেও সেরকম ব্যথা নেই। সে বহুবার সুকুমারকে তার শরীরের কথা জিজ্ঞেস করেছে। সুকুমার প্রতিবারই উত্তর দিয়েছে, ‘একটু বাজছে এক্কেবারে একটুকুন।’

পরের দিন সকালে ভজা নিজে গিয়ে সুকুমারের পায়খানার থেকে ডিমটা আলাদা করে। তারপর বাঁহাতে সেটাকে তুলে সামনের পুকুরের জলে ধোয়, একটা কাগজে মুড়ে ঘরে নিয়ে আসে।

সেদিনই সন্ধেবেলা ভজা বাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গে পাখি তার সাথে পরামর্শ করতে বসে। সুকুমারকে কোন ডাক্তারের কাছে দেখানো যেতে পারে ? হেল্থ সেন্টার, আশাদিদি, বড় হাসপাতাল, সব কিছু ছেড়ে পাখির মাথায় শান্তি ডাক্তারের হাট কথা মনে আসে।

হাটতলাতে বসে শান্তি ডাক্তার। ভজাদের মতো গরিব মানুষদের ছোট বড় কোন রোগ হলে তো ঐ একটাই মানুষ আছে। ছোট হাসপাতালে ডাক্তার নেই, আর বড় হাসপাতালে যাওয়া মানে গেদে ফের। সব কিছু ভেবে শান্তি ডাক্তারের কাছে গিয়ে সব খুলে বলে। সুকুমারকে দেখিয়ে সাথে করে নিয়ে যাওয়া ডিমটা দেখালে স্বাভাবিক ভাবেই শান্তি ডাক্তার অবাক হয়ে যান। কাগজ থেকে বের করে ডিমটা অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করেন। সুকুমারেরও বুক পেট ভালো করে পরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করেন, ‘কখন বেশি কষ্ট হচ্ছে, হাগার সময় না পরে?’

– শুধু ডিম বের হবার সময়।

সুকুমারের উত্তর শুনে ভজার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আমি ভালো বুঝছি না, কয়েকটা স্তন্যপায়ী প্রাণী ডিম পাড়ে এটা শুনেছিলাম, কিন্তু কোন মানুষ যে ডিম পাড়তে পারে এটা আজকেই জানলাম, তুমি বড় হাসপাতালে নিয়ে যাও। এর বড়বড় সব পরীক্ষা করতে হবে। আমার কাছে উসব কিছুই নাই। তাছাড়া আমি তো আর পাশ করা ডাক্তার নই। এই গ্রামে তুমাদের ওষুধ দি, কিন্তু আমি তো বেশি কিছু জানি না।’

বড় হাসপাতাল! এবার ভজার মুখ কালো হয়ে যায়। শান্তি ডাক্তারের কাছে আরো অনেকের সাথে সুবলও উপস্থিত ছিল। ভজার ছেলেবেলার বন্ধু, বিপদে আপদে তারা দুজন পাশাপাশি কাছাকাছি ছিল। সব কিছু শুনে তার মুখেও মেঘ জমে ওঠে। বাড়ি ফেরার সময় কয়েক জনের সাথে আলোচনাও করে প্রথমে কেউ বিশ্বাস না করলেও পরে অবাক হয়ে যায়। সুবল বলে ওঠে, ‘ আমি নিজে চোখে দেখেছি।’ কিন্তু মানুষ কখনও ডিম পাড়তে পারে?

।।দুই।।

খবরটা গ্রামে ঠিক আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ে। তখনও বাতাসে ভোরের গন্ধ ছিল। বেশির ভাগ মাঠই খোলা আকাশের নিচে নিজেদের একাকীত্ব তুলনা করে অপেক্ষা করছিল কখন মাঝমাঠে চাষের লোক আসবে। যে কয়েকটা চায়ের দোকান আছে তাদের মধ্যে আশুর দোকানেই বেশি ভিড় হয়। সেখানেই পশ্চিমপাড়ার সুবল একটু গম্ভীর মুখেই বলে উঠল,‘খবরটা সত্যি গো, আজকেও বেরিয়েছে, টানা আটদশ দিন হয়ে গেল, কালকের থেকে আজকে আবার একটু বড়, আমি সকালেই ভজার ঘর থেকে খোঁজ নিয়ে এলাম, আমি নিজের চোখে ডিমটা আরেকবার দেখলাম।’

চায়ের ভাঁড় মুখের কাছে রেখে বসে থাকবার পাশে অনেকেই ড্যাবড্যাব চোখে সুবলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, হয়ত আরো কিছু বলবে… গলা খ্যাকারি দিয়ে উঠল নীতু। চার নম্বর গ্রাম সংসদে গতবারের ভোটে পঞ্চায়েতের সদস্য হয়েছিল, সাত ক্লাস অবধি পড়েওছিল। ‘এবছর আর দাঁড়াই নাই, তুদের বৌদির মত নাই, রেতের বেলাও খ্যাদারছে গা, অত লারি।’ এবারে ভোটে বকুকে দাঁড় করায়ছে। নীতু সবাইকে এই কথা বললেও পার্টির ভেতরের খবর ‘ও নাকি টাকা দিতে পারে নাই।’ কানাঘুষো শোনা যায় পঞ্চায়েত থেকে ব্লক সব জায়গায় যতসব সদস্য দাঁড়ায় পার্টির বড় নেতাদেরকে লাখ লাখ টাকা দিতে হয়। সুবল এবারে দিতে পারে নাই। কয়েক মাস আগে মেয়েটার বিয়ে দিল, হাতে টাকার একটু টানও আছে। তবে সদস্য না হলেও এখনও সেই দাপট কিছুটা আছে। কথায় কথায় বলে ওঠে, ‘দেখি একবার সভাপতি ম্যাডামকে ফোন করতে হবে।’

সেই নীতু একটু চিল্লিয়ে বলে উঠল, ‘উটো হাগাই বটে, সাদা রং, আরে সেই পীতজ্বরের সময় সাদা হাগা হয়, ইটও সেই কেস।’

-না গো, কালকে ভজার বউ নাকি তুলে দেখিছিল, আজকেও দেখিছে। ভজাতো একট ডিম তুলিও রেখিচে। তুমি গেলে নিজের চোখেই দেখতে পাবে।

–ভজার বউয়েরও মাথাট গেল নাকি রে, গু’য়ের জিনিস আবার হাতে তুলে দেখেছে গা ?

এই কথাগুলো নিতাইকাকা বলে উঠতেই নীতু একরকম ধমকে উঠল,‘তুমার ব্যাটার হলে কি করতে, কাল সুবলার কথা শুননাই, বড় ছিলা, সাত না আট ক্লাসে পড়ে, কাটা পাঁঠার পারা ছটফটাচ্ছে গা।’

চায়ের দোকানে সকালেই একটা থমথমে ভাব নেমে এল। “আমি কাল রেতের বেলা শান্তি ডাক্তারের কাছকে ওষুধ লিতে গেছলম, তখনই ভজার সাথে দেখা। উ ব্যাটাও শান্তি ডাক্তারের কাছকে গেইছিলেক। ডাক্তার কুনু কিছু রা কাড়তে পারে নাই। এক্কেবারে খ্যাপার পারা ভজার মুখের দিকে তাকায়ে বললেক, ‘এটা কি বলছ ভজহরি, মানুষের বাচ্চা ডিম পারতে পারে?’ ইবার বুঝো গা।”

এইবার আশু নীতুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,‘নীতুদা তুমার তো সভাপতি ম্যাডামের সাথকে গেদে ভাব, একবার বল কেনে, যদি বিডিও সার এসি দেখি যান, কুনু বড় হাসপাতালে একটু চিকিৎসা হলে তো…’

সবাই আশুর কথাগুলোর সূত্র ধরে বলে ওঠে, ‘ইট ঠিক বলিছ, ভালো কথা বটে, ভজার ইখন গেদে ফের, নিজে বেচারা লেবার খাটে ।’

শুধু নীতু কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। তার মাথায় এখন হাজার কথা ঘুরতে থাকে। গেল বছর এই ভজা ব্যাটাকে পায়খানাট করি দিলেই হত। শালার হাগা টুপ করে জলে পড়ি যেত, না পেত ডিম, না পেত হাগা। এখন মাঠে হাগে শুনেই তো বিডিও গাল দিবেক, তখন আর এক ফ্যাসাদ। তার থেকে যা হচে হোক, বরং বকুর নামে একবার সভাপতি ম্যাডামকে জানালে ভালো হয়, বলি দিতম,‘আমাকে তো আর দিলেন নাই, দেখুন গে আমাদের গেরামে কি হনছে গা।’

না না ইসব হলে নিজেই ফেঁসি যাবেক। তার থেকে…..।

-কি ভাবছিসরে নীতু? কিছু বলবি?

নীতু একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে, একটু গম্ভীর হয়, ‘ইট উয়াদের কুনু চাল লয় তো?’

–কি যে বল চাল কেনে হবেক ? উয়াদের অবস্থা তো তুমি জানো? কুনু রকমে চলে। কাল ভজাকে দেখে বুকট ফেটি যেছিল। কুনু রকমে চলে। বেচারা ছিলাটকে লিয়ে ফেরেই পড়িছে।

সুবলের কথাগুলো শুনে উপস্থিত বাকি সবাই একরকম চিৎকার করে ওঠে, ‘না রে নীতু তুই সব কিছুতে ভজার দোষ দেখিস না, ছিলাটকে লিয়ে কষ্ট পেছে, কিছু পারলে কর না পারলে ছেড়ি দে, আমরা নিজেরাই....

- কিন্তু তার আগে একবার উয়ার ঘরকে যায়, আসল ঘটনা ট কি ঘটিছে একট বার দেখি আসি গা।

আশুর চায়ের দোকান থেকে প্রায় সবাই সেই সকালেই ভজার বাড়ির দিকে যাত্রা করে।


।।তিন।।

রাজারামের মন ভালো নেই, তার দাদা আজ তিনদিন হাসপাতালে ভর্তি। মা বাবা দু’জনেরই খুব মন খারাপ। মা তো লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। বাবাও এখন রোজদিন কাজে যায় না। ঘরে থাকলে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। অথচ এমনিতে দাদাকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না। সারা দিন সবকিছু আর পাঁচজনের মতো বা আগের মতোই করে। শুধু প্রতিদিন সকালে পায়খানার সাথে কি একটা ডিম বেরোচ্ছে কে জানে? সকালে পায়খানা করতে গেলে কি যে একটা ডিম বেরোচ্ছে ক সময় দাদার কষ্ট দেখে রাজারামেরও চোখে জল চলে আসে। বেশ কিছু সময় দাদা নড়াচড়া করতে পর্যন্ত পারে না। কেমন যেন নেতিয়ে পড়ে থাকে। ঘরে এখন গ্রামের লোকজন খুব আসছে। বাউনপাড়া থেকে তবে কেউ আসে নাই, উয়ারা রাজারামদের ঘর কেন, পাড়াতেই আসে না। দরকার হলে পাড়ার বাইরে থেকে কাউকে দিয়ে ডেকে পাঠায়। তবে গ্রামের অনেকেই প্রায় প্রতিদিন এসে খোঁজ নিচ্ছে। কেউ কেউ আবার সকালে তার দাদার হাগার জায়গাতে চলে যাচ্ছে। সময় ও সুযোগ মতো ডিম দেখতে পাচ্ছে, কেউ আবার বলে উঠছে, ‘আজকে হল নাই, কালকে আবার আসতে হবেক।’

পঞ্চায়েত থেকে খুব তাড়াতাড়ি একটা পায়খানা করে দেবে বলেছে। কয়েকদিন আগে অনেকজন মিলে তাদের ঘরে এসে সব কিছু জিজ্ঞেস করে কোথায় পায়খানা হবে সেটাও দেখে গেছে। পায়খানা হলে আর দাদা হাগাতে ডিম দেখতে পাবে না, হাগলেই টুপ করে গর্তে পড়ে যাবে। রাতে কয়েকদিন আগে বাবা ও মায়ের কথা শুনেছিল। বাবা মাকে বলেছিল। রাজারামের সেটাতেও মন খারাপ হয়ে যায়। দাদার হাগাটা কেউ দেখতে পাবে না এটা ঠিক। কিন্তু দাদার কষ্টটা তো আছে। হেগে এসে দাদার চোখ-মুখ কেমন যেন হয়ে যায়। আগে বাইরে বট তলায় শুয়ে পড়ত। এখন বাবা অথবা মা সঙ্গে যায়, ঘরের ভেতরে নিয়ে আসে। বাইরে এখন লোকজন খুব জ্বালায়। দাদাকে ভালো করে হাগতে পর্যন্ত দেয় না। মা দেখতে পেলে তাদের খ্যাদারে ভাগায়, কিন্তু সব সময় তো দেখতে পায় না। দাদার স্কুল যাওয়া এখন বন্ধ, রাজারামেরও, দাদার সাথেই তো রোজ স্কুল যায়। প্রাইমারি ও হাইস্কুলটা একই জায়গায়। রাজারাম স্কুলে গেলেই সবাই হাজার হাজার প্রশ্ন করে। রাজারাম এখন মাঠে খেলতেও যায় না, দাদাও না।

কয়েকদিন আগে গ্রামের লোক একজন সাধুকে তাদের বাড়ি নিয়ে এসেছিল। রাজারামের তাকে দেখে ভয় লাগে। তার বড়বড় চোখ, কালো পোশাক, মাথায় তিলক কাটা। একদিন পুজো টুজো হল। রাজারাম ওসব জানে না। শুধু সেদিন খুব আনন্দ হয়েছিল। গ্রামের অনেকে পুজো দিতে এসে রাজারাম ও তার দাদাকে ফল মিষ্টি দিয়ে যায়। দাদাকে নাকি কোন এক দেবী শাপ দিয়েছে। সেই শাপেই এই রকম ডিম পাড়ছে। দাদা হয়ত কোন পাখিকে মেরে দিয়েছিল, অথবা পাখির ডিম ফাটিয়ে দিয়েছিল। সাধুবাবা রাজারামের মাকেও জিজ্ঞেস করে, ‘তুই কি কোন দিন কোন পাখিকে মেরে ছিলিস না ডিম ফাটিয়ে ছিলিস?’

আশেপাশের সবাই মজা করে বলে, ‘উয়ার নামও পাখি।’

সাধুবাবা এদিকে কথা আর না বলে সুকুমারের দিকে তাকিয়ে কি সব মন্ত্র পড়তে আরম্ভ করেন। কিছু সময় পরে চোখ বন্ধ করে সুকুমারের মাথায় হাত দিয়ে কি সব বলেন। সাধুবাবা দেবীটার নাম বললেও রাজারামের মনে থাকে না। গ্রামের লোক সবাই মিলে চাঁদা দিয়ে পুজোটা করে-- এটা রাজারামের ভালো লাগে। কিন্তু পুজোর পরে তো লাভের লাভ কিছু হয় না। পরের দিন দাদার পাতলা হাগা হয়, কিন্তু ডিম বেরোয়।

তারপরের দিনেই শান্তি ডাক্তার বাবাকে ডেকে পাঠিয়ে কোন রকম সময় নষ্ট না করে সোজা বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। হাসপাতালে গিয়ে সব কিছু বলতেই দাদাকে ভর্তি করে নেয়। মা বাবা একা বাড়িতে ফিরে এলেও প্রতিদিন নিয়ম করে হাসপাতালে যেতে আরম্ভ করে। রাজারামকে নিয়ে যায় না। রাজারাম একা বাড়িতে থাকে দাদার জন্যে মন খারাপ হয়, চোখে জল আসে।

।।চার।।

কাল রাত থেকেই ভজার বাড়ির সামনে খুব ভিড়। বিভিন্ন খবরের কাগজের লোক আসার পাশাপাশি সরকারি অনেক অফিসার ও ডাক্তার এসেছেন। যদিও রাত থেকে এসেও সবার নজর এখন একদিকেই, সুকুমার কি ডিম পাড়বে? এই কয়েকটা দিন সুকুমার হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সেখানে অনেক পরীক্ষা হয়েছে। তবে সুকুমারের শরীরের কোন কিছু সমস্যা কেউ পায় নি। এখানেই একটা খটকা লেগে গেছে। শরীরের কোন রকম সমস্যা না থাকলেও একটা মানুষ কীভাবে প্রতিদিন একটা করে ডিম পেড়ে যাচ্ছে? ডাক্তারদের মধ্যে আলোচনা হয়, সুকুমারের ডিমের রং সাদা। মেরুদণ্ডী প্রাণীরা যে ডিম পাড়ে সেটা সাদা রঙেরই হয়। এই ডিমের উপরের খোলসে ক্যালসিয়াম কাবোর্নেডের কোশ থাকে, আর পাখিদের ডিমে থাকে দস্তা ও কিছু রঞ্জক পদর্থ। ডিমের ভেতরে সেই বেশি পরিমাণে জল ও বাকিটা কিছু দ্রবিভূত পদার্থ আছে। তবে পাখির ডিমে যে পরিমাণে জল থাকে সুকুমারের ডিমে জলের পরিমাণ তার থেকে কিছুটা কম। সেই ওভ্যালবুমিন, ওভোট্রান্সপেরিন, ওভোমিউকয়েড, ওভোমিউসিন সবই তো আছে। শুধু কোন ডাক্তার বুঝতে পারেন না, এই সব ডিম কীভাবে তৈরি হচ্ছে? এটা অনেকটা সেই রাজহাঁস আর সোনার ডিমের গল্পের মতো শোনালেও ব্যাপারটা যে সত্যি সে সম্পর্কে কেউ বেশি কথা বলতে পারে নি। প্রশ্ন একটাই একটা মানুষ কীভাবে ডিম পাড়তে পারে?

এদিকে হাসপাতালেই সুকুমারের ডিমের পুষ্টিমূল্যের পরীক্ষাও হয়। ডিমের যেসব উপাদান পাওয়া গেছে সেখানে সবাই বলেছে,‘এটা মানুষের ডিম হলেও এর পুষ্টিমূল্য একটা হাঁস বা মুরগির ডিমের থেকে প্রায় দশগুণ বেশি। এই ডিম সেদ্ধ করে খেলে একজন মানুষের শরীরে যা প্রোটিন বা ভিটামিন ঢুকবে তা দশদিন ধরে হাঁস বা মুরগির ডিম খেলে ঢুকবে না।’ আরো কিছু পরীক্ষা করবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সুকুমার মাঝে বেগরা দিয়ে ওঠে।

এত বড় ছেলে অথচ কিছুতেই হাসপাতালে থাকতে চায় না। শুধু চিৎকার করতে থাকে,‘এবার আমি বাড়ি যাবো।’

উপায় না দেখে হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু এখানেও একটা সমস্যা হয়। এইরকম একটা সাঁসালো ঘটনাকে নিয়ে নিপাট চর্চা কেউ ঠিক ছেড়ে দিতে রাজি হয় না। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের থেকে এই ডিমের খবর বিদেশের কয়েকটি জার্নালেও প্রকাশিত হয়ে যায়। তাদের দেশে এই বিষয়ে একটা হুলস্থুল অবস্থার সৃষ্টি হয়। সেই সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের সাথে বিদেশী বিভিন্ন হাসপাতাল এমনকি গবেষণাগার থেকেও যোগাযোগ করা আরম্ভ হয়। কিন্তু তাদের সবাইকে নিরাশ করে সুকুমার একরকম জিদ করেই বাড়ি ফিরে আসে। তারাও তো আর ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। বিশেষ করে তারাও এখানকার ডাক্তারবাবুদের সাথে আলোচনা করে দেখেছেন এই ডিম শুধুমাত্র পুষ্টিগুণেই অন্যান্য ডিমের থেকে ভালো তা নয়, এই ডিম খেলে মানুষের ইম্যুনিটি কয়েকগুন বেড়ে যায়। এটা একরকম যুগান্তকারী ঘটনা। যদিও কোন বিজ্ঞান এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে পারে নি। তারাও তো আর ছেড়ে দেবার লোক নয়। পুরো টিম নিয়ে এক্কেবারে এসে হাজির সুকুমারদের গ্রামে। সে কি বড়বড় গাড়ি, আলো ক্যামেরা, আর সব সাদা চামড়ার মানুষ। এই গ্রাম কেন এই জেলার কোন লোক এভাবে এতজনকে কোনদিন দেখেছিল কি না সন্দেহ।

তবে বিপদে পড়েছে নীতু আর পঞ্চায়েতের প্রধান সহ কয়েকজন সরকারি অফিসার। শোনা গেছে এই কয়েকদিনের মধ্যে পঞ্চায়েত প্রধান, বিডিও, সভাপাতি এমনকি ঐ গ্রামের এ সংসদের প্রতিনিধির সাথে একপ্রস্থ ঝামেলাও হয়ে গেছে। একেই বিভিন্ন প্রকল্পের যে নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল সেগুলিতে আবার পুরানো নাম লিখে সব কিছু চাপা দেওয়ার জন্যে রাতারাতি টেন্ডার ডেকে কাজ চালানো হচ্ছে। রাতেও পঞ্চায়েত অফিস খোলা রেখে বিভিন্ন হিসাবে তেল জল মাখানোর কাজ চলছে। এরমধ্যে যদি আরেকটা ঝামেলা এসে পড়ে তাহলে তো আর দেখতেই হবে না। অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিদের সাথে কেন্ত্রীয় এমনকি রাজ্য সরকারের অনেক আধিকারিকও আসবেন। তাদের সবার মাঝে এই রকম একটা পরিবার যদি থাকে তাহলে তো সমস্যার শেষ থাকবে না। এখনও বাড়ি পায় নি, পায়খানা পায়নি, এমনকি গ্রামের ভেতরে রাস্তাঘাটও খুব খারাপ। এখন কে কাকে দোষ দেবে কার দোষ কে নেবে সেই নিয়েই হয়েছে ঝামেলা।

ভজাকেও ডেকে বোঝানো হয়েছে, ‘যদি তোমাকে বাড়ি বা পায়খানার কথা কিছু জিজ্ঞেস করে বলবে তুমি নিজেই নিতে চাওনি।’

আকাশ থেকে পড়ে ভজা। আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করে, ‘আমার ঘর নাই, জল পড়লে ইদিক উদিক ছুটি বেড়াই, রোজদিন পখুরে হাগতে যেছি, আর বলব আমি নিজেই..., না সার উটো পারব নাই, শেষে আমাকে যদি কিছু বলে। আমি আপনাদিগে অনেকবার করে বলিছিলম, শুনেন নাই, নীতুদা তখন সদস্য ছিলেক, আমরা মরছি, কি বাঁচছি, কুথাকে থাকছি, কুথাকে হাগছি, আপনারা দেখেন....’ পরিবেশটা কেমন যেন থম মেরে যায়। ভজাগে ভয় ও দেখায়,‘শোন এবার তোমাদের কাউকে বাইরে পায়খানা করতে দেখলে পাঁচশ টাকা ফাইন করব।’

এই কথাগুলো শুনে শুধু ভজা নয় পাখিও একরকম তেড়ে এসে বলে, ‘তাহলে তুর ঘরকে গিয়ে হেগে আসবো, খালভরা।’

ভজার বাড়িতে অতসব লোক এলেও নীতু, বুকু বা প্রধান কেউই কাছে পিঠে যায় নি। শুধু বিডিওকে সরকারের লোক হিসাবে থাকতে হলেও কোন কথা বলেনি। এমনিতেই কারোর কোন কথা ছিলই না। সবার চোখ মুখ তখন আটকে ছিল আলো ক্যামেরা গাড়ি আর আর সেই ভিড়ের দিকে। শোনা গেছে এই ভিড়ের মধ্যে কোন এক বিদেশী খাবারের কোম্পানির ভারতীয় প্রতিনিধিও এসেছেন। তাদের কাছে ডিমের পুষ্টিমূল্য ও ইম্যুনিটির পুরো ডেটা আছে। শুধু ভজাদের চারজন চরম সমস্যার মধ্যে রয়েছে। কতরাত যে ভালো করে ঘুমাতে পারেনি সে কথা তারা নিজেরাও জানে না। এই রাত থেকে এতএত লোক বাড়ির সামনে বসে আছে। কতজন কতরকম প্রশ্ন করছে তার ঠিক নেই। একটা মজা আর তাকে জড়িয়ে থাকছে কিছু মানুষ, শুধু পাখি নিজে বুঝছে সুকুমারের নিজের কষ্ট আর ব্যথাটা। এর মধ্যে কয়েকটা সংস্থা এসে ভজাকে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে যায়। এই টাকাতে কয়েকদিন তারা কিছু ভালো মন্দ খাবার খায়। তবে পাখি অবাক হয়ে যায় যখন রাজারাম তাকে বলে ওঠে, ‘মা সবাই বলছে দাদা যে ডিম পাড়ছে সেট খেলে খুব শক্তি হবেক।’

সেদিন পাখি চমকে উঠে রাজারামকে ধমকালেও অবশ্য কাজের কাজ কিছু হয় না। রাজারাম কিছু সময় মুখ ফুলিয়ে বসে থাকলেও পাখির চোখেও জল চলে আসে।

এদিকে কয়েকদিন ধরে একটা লোক এসে খুব উৎপাত আরম্ভ করেছে। ভজার সাথেই কথা বলেছে। তবে পাখি সব কথা শুনেছে। লোকটি একটা বিদেশী কোম্পানির লোক। তারা সুকুমারের সব ডিমগুলো কিনতে চায়। একটা ডিমের জন্যে ভালো টাকা দেবে বলেছে। প্রতি সপ্তাহে একজন এসে ডিমগুলো নিয়ে যাবে বলেছে। এই ডিমগুলো রাখবার জন্যে তারা একটা ঠাণ্ডা হবার মেসিন দিয়ে যাবে বলেছে। এখনও পর্যন্ত কত টাকা দেবে বলেছে সেটা ঠিক না করলেও অনেক টাকা দেবে। ভজা কথাগুলো সুকুমারেরর সামনে বলতে পারে নি। রাতে পাখিকে কথাগুলো বলতেই সে রেগে ওঠে। সুকুমারের মাথায় হাত দিয়ে পাখি উত্তর দেয়, ‘ছেলেটার কোথা থেকে কি হচ্ছে সে সব কিছুই বুঝতে লাড়ছি, ইদিকে উনি টাকার হিসাব মারাচ্ছেন।’

একটা কম বয়সি মেয়েও একদিন হাসপাতালে এসে কথা বলে গেছে। তারা সুকুমারকে বাইরের দেশে নিয়ে যেতে চায়। সব খরচা ওদের। সুকুমারকে নিয়ে গবেষণা করবে। সুকুমারের ডিম পাড়বার কথা শুনেই পাখির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমরা তোমার বাড়ি যাবো, এই বিষয়ে গবেষণা করব, তোমাকে কিছু করতে হবে না, শুধু তোমার ছেলেটাকে যখন বলব তখন একটু এই হাসপাতালে নিয়ে আসবে। তবে তোমার ছেলের আদৌ কি হয়েছে আমরা বলতে পারব না, সারবে কিনা সেটাও বলতে পারব না, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাব, তোমার ছেলের কোন ক্ষতি করব না।’

পাখি সেই ভদ্রমহিলার কথার মধ্যে একটা শক্তি পায়, কিন্তু বাকি... আমরা তোমাকে সেরকম টাকা দিতে পারব না, আসা যাওযার সব খরচ দিয়ে দেব।’

পাখির এই কথাগুলো মনে ধরে ।

বেশ কয়েকটা টিভি চ্যানেলও এসেছে। ওরা সুকুমারের হাগার লাইভ করতে চায়, ভজাকে কয়েকদিন থেকেই ধরেছে, পাখির কাছেও এসেছিল, এর জন্যেও ওদের টাকা দেবে। গাঁয়ের লোক এই সব শুনতে পেয়ে ভজাকে রাজি হয়ে যেতে বলে। ‘তুর তো আরেকট ব্যাটা রইল।’

এই সবের মাঝেই সেদিন ভোর হয়। সুকুমার ঘুম থেকে ওঠে। এখন কিছু ওষুধ খেতে হয়। হাসপাতাল থেকে দিয়েছে। একটা ওষুধ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাতলা পায়খানা হয়। তবে ডিমটা বেরিয়ে যায়, হয়ত একটু কষ্টটা কম হয়। অবশ্য সকালে সব হিসাব গুলিয়ে যায়। সুকুমারের পুকুরে যাবার কথা শুনে পাখির বারণ স্বত্বেও সব ক্যামেরা, মাইক সব পিছন পিছন যেতে আরম্ভ করে। পাখি অনেক বাধা দেবার চেষ্টা করে, পারে না। শেষে ঘর থেকে একটা কাপড় নিয়ে গিয়ে সুকুমারের গায়ে চাপিয়ে দেয়। ডিম বের হবার পর সুকুমার যন্ত্রণায় একটা গাছের নিচে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছিল। ক্যামেরা আর মাইক হাতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক লাইভ করছিল সুকুমারের পায়খানা আর তার মধ্যে থাকা ডিমের। কারোর চোখে উচ্ছ্বাস কারোর বাঁকা দৃষ্টি, কারোর চোখে ঘেন্না। কয়েকজন হয়ত সুকুমারকে জিজ্ঞেস করত, ‘এই ডিম পাড়বার পর তোমার কেমন লাগছে? তুমি একা ডিম পাড়ছো না কি বাকি...’

কিন্তু পাখি ও ভজা তাকে তুলে তাদের বাড়ির মধ্যে এনে একটা ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। ঘরের চাল চুয়ে রোদ নামে, জানলা দরজাগুলো এক্কেবারে নড়বড়ে, তবে একটা শান্তি আছে।

বাড়ির চারদিকেও লোকজনের ভিড়, রাজারাম তার দাদার মাথায় হাওয়া করছে। পায়ের দিকে বসে আছে ভজা, আর মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে প্রায় নেতিয়ে পড়া ছেলেটার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে বসে আছে পাখি। সুকুমারের চোখে মুখে লেগে আছে কষ্ট। কিছু সময় পর একটু সামলে ওঠে। তারপরেই পাখির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে ওঠে, ‘মা, কয়েকটা দিন ধরে ডিমটা একটু একটু করে বড় হচ্ছে...’



লেখক পরিচিতি
ঋভু চট্টোপাধ্যায়
কবি। কথাসাহিত্যিক।
পশ্চিম বর্ধমান। পশ্চিম বঙ্গ।
Email-wribhuwriter.dgp@gmail.com










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ