এলহাম হোসেন
এ এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। এই নৈরাজ্য শব্দ, বাক্য, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, শব্দের অর্থ, ধারণা- সবকিছুর মধ্যে। অনবরত চিন্তার কেন্দ্র সরে যাচ্ছে, ভেঙ্গে যাচ্ছে, পুনরায় নির্মাণ হচ্ছে। শেষে আবারও ভেঙ্গে যাচ্ছে। কী যিশু, কী বুদ্ধ, কী পোপ, আর কী একেশ্বরবাদ- কেউই আর একচ্ছত্র হেজেমনি ধরে রাখতে পারছে না। সালভাদোর দালীর পার্সিস্টেন্স অব মেমরী-এর মতো, যে ক্যানভাসের সবকিছু গলে পড়ে যাচ্ছে। ঘড়িগুলোও। ট্যাবুগুলো আর ট্যাবু থাকছে না। সব আড়াল ভেঙ্গে অন্তরালে উলঙ্গ হয়ে পড়ছে। সব সিক্রেট এখন ওপেন সিক্রেট। কোনকিছুতেই ঐক্যতান বা হারমনি নেই। যেমনটা ডবিøউ. ডব. ইয়েট্স তাঁর দ্য সেকেণ্ড কামিং কবিতায় বলেছেন ‘থিংস ফল এপার্ট, সেন্টার ক্যানট হোল্ড’। সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল চলাকালে, ১৯১৯ এ। অনৈক্যের উদযাপন চলছে সর্বত্র। ফ্যাক্ট আর ফ্যাক্ট নেই। ফিকশনও আর নিরবচ্ছিন্ন ফিকশন নেই। দু’য়ে মিলে ফ্যাকশনের রূপ নিয়েছে। ফ্রান্সিস বেকনের সেই অমোঘ উপদেশের মতো, যা ধ্বনিত হয়েছে তাঁর অব ট্রুথ প্রবন্ধে- সত্যের সঙ্গে মিথ্যার সংমিশ্রণ সত্যের স্থায়িত্ব বাড়ায়, এর গতর শক্ত করে। এই ম্যাকিয়েভ্যালীয় মনোভঙ্গি আর নিন্দনীয় ঠেকছে না। এটি এখন যুগের হাওয়ায় পরিণত হয়েছে! এর গতরে চেপে দেওয়া হচ্ছে স্মার্টনেসের উর্দি, বুদ্ধিদীপ্ততার চাদর! মানুষের প্রতিদ্ব›দ্বী আর অন্য কোন মানুষ নয়, তার নিজের সৃষ্টিই এখন তাকে কেন্দ্রচ্যুত করার হুমকি দিচ্ছে। যৌনতা আর রাখঢাকের বিষয় থাকছে না। এটি এখন মৃত (ডেড) কারণ, এটি এখন ওপেন সিক্রেট। বরং এটি এখন কমোডিটিতে পরিণত হয়েছে। আগে তো এটা ট্যাবু ছিল।
বিশুদ্ধ টেক্সট বলেও কিছু নেই। ইন্টারটেক্সুয়ালিটি এখন অপরিহার্য বাস্তবতা। খুঁড়ে খুঁড়ে জ্ঞানের নৃতত্ত¡ উলঙ্গ করে তুলে ধরেছেন মিশেল ফুকো। দেরিদা তো লোগোসগুলোর দৌরাত্ম ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছেন। লিওতাঁ মেটান্যারেটিভ বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভগুলোর বেলুন ফুটো করে দিয়েছেন। জাঁক লাঁকা মানুষের অবচেতনকে ভাষার কাঠামোয় ব্যাখ্যা করছেন। বাখতিনের মতে, টেক্সট একক স্বর বিশিষ্ট নয়, বহুস্বরিক। দ্বিরালাপ বা ডায়ালোজিজম অনবরত নতুন নতুন অর্থ উৎপাদন করে। মানুষের অবচেতন এখন ভাষার জায়গা দখল করেছে। পৃথিবীটা তৈরী হচ্ছে শব্দ দিয়ে, যে শব্দগুলোর অর্থ আবার খামখেয়ালী। এরা অনবরত বদলে যায়, বদলে যাচ্ছে। আপেক্ষিকতা শাসন করছে পরমের টুটি চেপে ধরে। মানুষের জাতীয়তাবাদ, জাতির ধারণা, স্থান, দেশ, সংস্কৃতি, ভাষা এখন আর বিশেষ আকৃতিসম্পন্ন কোন ধারণা নয়। এটি তরল। সবসময় এদিক-ওদিক টোল খেতে খেতে প্রবাহিত হতে থাকে। গন্তব্যহীনভাবে। আইডিয়োলজি এখন পণ্যের বাজারে ঢুকে পড়েছে। জীবন এখন ট্র্যাজি-কমেডি। বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব ও খন্ডতা এখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের গর্বের বেলুন ফুটো করে দিয়েছে। এখন আর বন্দুকের সঙ্গে বন্দুকের যুদ্ধ হয় না। এখন যুদ্ধ হয় তথ্যের বিরুদ্ধে তথ্যের, প্রপঞ্চের সঙ্গে প্রপঞ্চের। এমন নৈরাজ্যের মধ্যেও জীবনের যাপন চলছে। উদযাপনও যে চলছে না, তা কিন্তু নয়। এই যে বৈপরীত্য বা ডাইকোটমি, এটি যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, সেটিই উত্তরাধুনিক পরিস্থিতি, উত্তরাধুনিকতা।
আসলে পোস্টমডার্ন বা উত্তরাধুনিকতা একটি চেতনা বা অনুভূতি ছাড়া আর কিছু নয়। এটি এমন এক চেতনা নির্দেশ করে যা প্রথমে ভাষা, তারপর একটি বিশেষ ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভাবনাকাঠামোকে বুঝায় যার মধ্যে আমরা থাকতে চাই। কিন্তু আমরা জানি না, এই ভাবনাকাঠামো কীভাবে কাজ করে। কারণ, এটি খামখেয়ালী। আমরা ভাষার নির্মাণ করি বলে দাবী করলেও ভাষাই আমাদের নির্মাণ করে। সেই স্তেফান মালার্মের মতো, যিনি মনে করেন, কবি কবিতা সৃষ্টি করেন না, বরং কবিতাই কবির সৃষ্টি করে। আমরা শব্দ সৃষ্টি করি, না-কি শব্দই আমাদের সৃস্টি করে- এ এক কঠিন প্রশ্ন। সাদৃশ্য নয়, বরং বৈসাদৃশ্যই আমাদের পরিচয় নির্মাণ করে। একটি দ্বিরালাপীয় স্পেস বা ডিসকার্সিভ লোকেশন রয়েছে। এখানে প্যারাডাইম বা ধারণাগুচ্ছ সবসময় শিফট বা স্থান ত্যাগ করতে থাকে। মিশেল ফুকোর মতে, নৈর্ব্যক্তিকতা বা অবজেকটিভিটি বলে কিছু নেই। আমাদের সংজ্ঞা, পরিচয় এবং উপলব্ধি আমাদের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও ভাষার অঙ্গাঙ্গিক সম্পর্ক ও সংকরায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের হাতে এসে পড়েছে। যতই বলি না কেন, আমরা আমাদের এই উপষঙ্গগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করি, আসলে তা নয়। আমরাই বরং নিয়ন্ত্রিত হই এগুলোর দ্বারা। এর মানে এই নয় যে, আমরা যন্ত্র বা রোবট হয়ে গেছি। এর মানে আসলে ‘অকাট্য সত্য’ বলে সাধারণত যা বুঝায়, তাকে আমরা ত্যাগ করেছি। সত্য আসলে আমাদের স্বীকৃতির ফল। আমরা এটির শরীর-স্বাস্থ্য নির্মাণ করি। আবার এর স্বার্থপর ব্যবহার করি। এর নিজস্ব কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নেই। সবই বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া। এটিও এর হেজেমনি আমাদের উপর চর্চা করে।
আসলে উত্তর-আধুনিকতা মূলত ভাষা সংক্রান্ত ভাবনাব্যবস্থা। ভাষা কীভাবে আমাদের চিন্তাকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ করে, কীভাবে অর্থের নির্মাণ করে এবং কীভাবে আমরা এই ভাষাকে অ্যাপারেটাস হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করি? আমরা ভাষা, বিশেষ ঐতিহাসিক সময়কাঠামো, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষিক ছাঁচে ফেলে নিজেদের সংজ্ঞায়ন করি। এই ছাঁচ বা ম্যাট্রিক্স আবার ধ্রæব নয়। প্রতিনিয়ত ভাঙ্গে। এই ছাঁচের মালমশলা আসে সম্প্রদায়ের পরিচয়, শ্রেণি, লিঙ্গ, যৌনতা, জাতীয়তা, সময়, নৃতাত্তিকতা ইত্যাদি থেকে। এতে কোন শৃংখলা নেই। আছে বৈসাদৃশ্য বা পার্থক্য। এই বৈপরীত্য ক্ষমতার সঙ্গে ক্ষমতাহীনতার, ভাবনার সঙ্গে ভাবনাহীনতার, অর্থের সঙ্গে অর্থহীনতার। এই বাইনারীগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেছে। তাই এরা সহাবস্থান করে। এই সহাবস্থান দ্বা›িদ্বক বা দ্বিরালাপীয়। আমরা এই বাইনারীগুলোর মধ্যে হিসেব কষি আর হিসেব কষি। কিন্তু অংক আর মেলাতে পারি না। এখানে জ্ঞান লাভ করা যায়। কিন্তু ‘জ্ঞানের বিশুদ্ধতা’ শব্দবন্ধটি হাস্যকর। আমরা উপলব্ধি অর্জন করি, কিন্তু উপলব্ধির অন্তর্দষ্টি কখনই লাভ হয় না। উত্তরাধুনিকতা মূলত ইতিহাস সংক্রান্ত। কিন্তু এই ইতিহাস কখনই আমাদের অতীত নিয়ে ভাবতে দেয় না। মানুষের সামনে যখন কিছু থাকে না, তখন মানুষ পেছনে তাকায়। কিন্তু এখন তো আমাদের সামনে কিছু আছে। কী এই কিছু? অনিশ্চয়তা। দ্বিধা, সন্দেহ, আশঙ্কা। এক ধরনের প্যারানইয়া সবাইকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে, অনিশ্চয়তার দিকে। ইতিহাস উত্তরাধুনিককালে এসে আর একবচনে আবদ্ধ থাকছে না। হয়ে গেছে বহুবচন। ইতিহাসসমূহ। আর এটি শুধু প্রশ্নে আর প্রশ্নে জর্জরিত। এটি অকথ্যকে সামনে আনে। অদেখাকে দেখায়, লুক্কায়িতের উপর থেকে পর্দা সরিয়ে দেয়। একের মধ্যে বহুর আবিষ্কার করে। সুন্দরের মধ্যে কুৎসিতের আর কুৎসিতের মধ্যে সৌন্দর্যের আবিষ্কার করে। ইতিহাস সরল পথে যে চলে না, এঁকে বেঁকে চলে- সেটিই এটি দেখিয়ে দেয়। এটি তথ্য হাজির করে। কিন্তু তথ্যের নৈরাজ্যের মধ্যে সুষম তথ্য বলে আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে ক্ষমতার কথা আছে। এই ক্ষমতার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে তথ্যের কথা আছে। এই তথ্য নিজেই নৈরাজ্যে ভরা।
এতসব কথা বলে এ কথা স্পষ্টই বোঝা যায় যে, উত্তরাধুনিকতাবাদ কোন মতবাদ বা ‘ইজম’ নয়। ‘ইজম’ হলে তো এর একটা সম্পূর্ণ চিন্তাকাঠামো থাকত। এর কিন্তু তা নেই। কাজেই ‘বাদ’ শব্দটাকে ব্রাকেটে রাখাই যুক্তিযুক্ত। উত্তরাধুনিকতাকে সময়ও বলা হয়। সমসাময়িক সময়। এটি এমন এক সময় যা জাঁক দারিদার ফরভভবৎধহপব এর মতো। এই শব্দের মধ্যে যেমন ‘পার্থক্য’ নির্দেশক ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি ‘স্থগন’ বা ‘থামানো’ নির্দেশক ইঙ্গিতও রয়েছে। সস্যুর ও দেরিদা এই শব্দের দ্বারা প্রকৃতপক্ষে বুঝিয়েছেন যে, শব্দের অর্থ আসলে নির্মাণ, এটি আপেক্ষিক। অর্থাৎ, এক অর্থের মধ্যে অনেক অর্থ বিদ্যমান এবং এক সময়ের মধ্যে অনেক সময়ের অঙাগাঙ্গিকতা। ফলে পোস্টমডার্ন বা উত্তরাধুনিককালে সময়কে আর ঘড়ির কাঁটার ক্রমানুযায়ী পাঠ করার সুযোগ নেই। সময় একটি হেঁয়ালিপূর্ণ টেক্সট। মানুষের চেতন মন পারে না এর যথাযথ পাঠ আবিষ্কার করতে কারণ, তাঁর অবচেতন মনে সবসময়ই বয়ে চলে চিন্তার ¯্রােত। এই চিন্তা বৈচিত্র্যময়। একটার সঙ্গে আরেকটা মেলে না, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে এরা প্যাঁচ লেগে যায়। আর যে কথা একটু আগেও বলেছি, অর্থাৎ ভাষাতাত্তি¡ক মনোবিজ্ঞানী জাঁক লাঁকার কথাই বিবেচ্য- মানব অবচেতন মন ভাষার মতই কাঠামোবদ্ধ। ভাষা তো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা একটি সিস্টেম। এর নানান উপষঙ্গ এর অর্থকে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তোলে। তাই তো জাঁ ফ্রাঁকোয়া লিওতাঁ তাঁর দ্য পোস্টমডার্ন কন্ডিশন (১৯৮৪) গ্রন্থে বলেন, আসলে উত্তরাধুনিকতা হলো মহান সব বয়ানগুলোর প্রতি সন্দেহ বা অবিশ্বাস। অর্থাৎ উত্তরাধুনিক পরিস্থিতিতে পরম সত্য, সমগ্র বা মানুষের মন-মস্তিষ্কের উপর একচ্ছত্র আধিপত্যকারী কোন প্রপঞ্চ নেই। সবই প্রশ্নের শিকার, বিনির্মাণের শিকার। লোগোসেন্ট্রিজমের প্রতাপ বা হেজেমনি এখানে খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। কেন্দ্র বিক্ষিপ্ত। এর প্রধান মূল নেই, আছে গুচ্ছ মূল। বড় বড় সব বয়ান, তা সেটা ধর্মের হোক আর বস্তুবাদী দর্শনের হোক- সবকিছুই তাদের হেজেমনি হারিয়েছে, হারাচ্ছে। এ যেন বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরের পরিস্থিতি। সবকিছু ছিটকে পড়েছে চারদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে।
আসলে উত্তরাধুনিকতা ঠিক পোস্টস্ট্রাকচারালিজম বা উত্তরকাঠামোবাদের সমান্তরালে চলে। এই উত্তর-কাঠামোবাদ আবার কাঠামোবাদকেই প্রশ্ন করে এগিয়ে চলে। যেখানে কাঠামোবাদ বলছে যে, অর্থের নির্মাণ হয় সিস্টেম বা কাঠামোর মধ্যে, সেখানে উত্তরকাঠামোবাদ এই সিস্টেমকে ব্যবহার করে, আবার ভেঙ্গেও ফেলে। কাঠামোবাদের নীতি অনুযায়ী অর্থের নির্মাণ হয় পার্থক্য থেকে। যেমন, যেটিকে আমরা কালো বলি, তাকে কিন্তু সাদার বিপরীতে ফেলে তবেই কালো বলি। এখন উত্তরকাঠামোবাদ এই দু’য়ের মাঝখানে যে স্পেস রয়েছে, সেখানে কাজ করে। কাঠামোবাদ আমাদের নিয়ে যায় একটি উপসংহারের দিকে, শেষ বিন্দুর দিকে। কিন্তু উত্তর-কাঠামোবাদ শেষ বিন্দু বলে কিছু আছে, তা মানে না। আমাদের চিন্তাকাঠামোর প্যারাডাইমগুলো প্রতিনিয়ত শিফট যে হচ্ছে সেটাই উত্তর কাঠামোবাদ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়।
এবার আসা যা’ক প্রখ্যাত ইতালীয় সাহিত্যিক ইতালো ক্যালভিনোর ‘অ ঝরমহ রহ ঝঢ়ধপব’ ছোটগল্পের উত্তর-কাঠামোবাদী ব্যাখ্যায়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বেশি অনূদিত ইতালীয় লেখক হলেন ক্যালভিনো। জন্ম ১৯২৩ সালে। মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৫ সালে। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বেও ইতিহাসে যেসব বড় বড় ঘটনা ঘটে, সেগুলোর অভিঘাত স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় ক্যালভিনোর রচনায়। কমিউনিজমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং তা থেকে আবার বেরিয়ে আসা ইত্যাদি প্রমাণ করে যে, তিনি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক হতাশার মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন। এই পথ বন্ধুর। পথ আছে, চলা আছে, কিন্তু গন্তব্যের নির্দিষ্টতা নেই। এ যেন উত্তরাধুনিক পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিই তাঁর ‘অ ঝরমহ রহ ঝঢ়ধপব’ গল্পে অভিনব ও চিন্তাদ্দীপকভাবে ধরা দিয়েছে।
উত্তরাধুনিককালে ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপষঙ্গ বিবেচনা করা হয়। এই মহাবিশ্বের সবকিছু তৈরী হয়েছে ভাষা ও ভাষা ছোট ছোট একক, অর্থাৎ শব্দ দিয়ে। আমাদের চারপাশের যা কিছুকে আমরা বস্তু বা বিষয় বলে আখ্যায়িত করি, তার সবই কিন্তু এসেছে ভাষা থেকে। মাথার উপরের আকাশ, সামনের দিগন্তপ্রসারী সবুজ মাঠ, পাশে উপবিষ্ট সঙ্গী, পেছনের কুলকুল রবে বয়ে চলা নদী- সবই কিন্তু শব্দ। এই শব্দ দিয়ে মহাবিশ্ব তৈরী হয়। তাই ভাষা দিয়ে মাহবিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। কাঠামোবাদী তত্তে¡ একটি বস্তুকে সংজ্ঞায়িত করা হয় আরেকটি বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে। শব্দের অর্থগুলো আপেক্ষিক। আমাদের চিন্তাভাবনার সবকিছুই আসে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা থেকে। এই অভিজ্ঞতার সংজ্ঞায়ন ও বর্ণনা সম্ভব শব্দ দিয়ে। কাঠামোবাদী ভাবনায় সবকিছুই একটি বিরাট কাঠামোর অংশ। কিন্তু উত্তর-কাঠামোবাদী তত্ত¡ বস্তুসমূহকে স্বাধীন করে দেয়। একে অপরের মধ্যকার সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে দেয়। তাই বস্তুর বা বিষয়ের সংজ্ঞায়ন একটি বিরাট প্যারাডক্স বা কূটাভাষ। এই সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য। সেখান থেকেই উৎপত্তি ঘটছে শক্তির যা অন্যসব গ্রহ গ্রহণ করছে। একইভাবে ভাবনার একটি কেন্দ্র রয়েছে যেখান থেকে সব অর্থের উৎসারণ ঘটে। এই কেন্দ্রই লোগোসেন্ট্রিজম নামে পরিচিত। এই লোগোস অর্থে ভরা। এটি একটি ফ্রেব্রিক্সের মতো। এর সুতো ধরে যত টানা যায়, এই সুতোর গিট ততই খুলতে থাকে। এই লেগোস একটি শব্দ নয়। অসংখ্য শব্দের একটি জটিল জট। এটি খোলা যায়, তবে খুলে শেষ করা যায় না। লোগোসের এই যে ধারণা, এটি একে একটি হেজেমনি বা প্রতাপে পরিণত করেছে। এই প্রতাপ সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ও সবার আনুগত্য আদায় করতে চায়।
১৯৬৬ সালের ২১ শে অক্টোবর তারিখে জাঁক দারিদা জন্স হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি লেকচার দেন। তাঁর লেকচারের শিরোনাম, ‘Structure, Sign and Play in the Discourse of the Human Sciences.’ এখানে তিনি কাঠামোবাদের কথাই বলেছেন, গভীর বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, কিন্তু মজার ব্যাপারটা হলো, এখান থেকে তত্ত¡বিশ্ব উত্তর- কাঠামোবাদী ভাবনার সূত্র সংগ্রহ করেছেন। দেরিদা মনে করেন, যদিও লোগোস, তা সেটা ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ আর ঈশ্বরের রূপেই হোক না কেন, মানুষের উপর হেজেমনি কায়েম করতে সচেষ্ট থাকে, তবুও এর একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে কারণ, কোন কিছুর সংজ্ঞায়ন বা আইডেনটিটি প্রতিনিয়ত আপেক্ষিকতার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়। ভাষা ও সংস্কৃতির সব উপকরণ একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। তবে এই কাঠামোর উপকরণগুলো আবার প্রতিনিয়ত একে অপরকে হটিয়ে দিতে তৎপর। কাজেই এই কাঠামোর ইতিহাস আসলে প্রতিস্থাপনের ইতিহাস। দূর থেকে সূর্যকে স্থির মসৃণ মনে হলেও এর ভেতরে যেমন অনবরত বিক্রিয়া, প্রতি-বিক্রিয়া ও বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে, ঠিক তেমনি কেন্দ্র আদতে আদৌ কেন্দ্র নয় কারণ, এর মধ্যে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গা, গড়া, যোগ, বিয়োগ চলছে। মূলত দেরিদার এমন ধারণা থেকেই উত্তর-কাঠামোবাদী ভাবনা কাঠামোর সূত্রপাত।
ভাষা কখনই বিশুদ্ধ বা নিষ্কলুষ বা পরম নয়। ভাষা যখন কোন ভাব বহন করে তখন এর সঙ্গে ভাবের একটা অঙ্গাঙ্গিকতা ঘটে অপরিহার্যরূপেই। এই অঙ্গাঙ্গিকতার কারণে ভাষা ও ভাবনা দুই-ই আর আগের মতো থাকে না। ভাষা সব সময় অনুক্রমিক বৈপরীত্যের ওপর নির্ভর করে। বাইনারী অপজিশন যা উপস্থিতি/অনুপস্থিতি, বাস্তবতা/আপাত রূপ, ভেতর/বাহির, অর্থ/রূপ এর দ্বারা ভাষা অনবরত নিজেকে এনকোডিং ও ডিকোডিং করতে থাকে। এই এনকোডিং ও ডিকোডিং একই সঙ্গে ঘটে। এটি যেন রসায়ন শাস্ত্রের জারণ-বিজারণ প্রক্রিয়ার মতো। যুগপৎ ঘটনা। শব্দ ও দ্যোতনা, সিগনিফায়ার ও সিগনিফাইডের মধ্যে অনবরত বোঝাপড়া চলতে থাকে। এই মধ্য দিয়েই জ্ঞানের নির্মাণ হয় (স্কেমা)। যেহেতু বোঝাপড়া থামে না, তাই জ্ঞানও থামে না। এই গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে থাকে সময়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সর্বদা পরিবর্তনশীল প্রতœ উপকরণ সঙ্গে নিয়ে। জ্ঞান স্থির নয়। চলমান। প্রশ্ন উদ্রেককারী। প্রশ্নবিদ্ধ।
জ্ঞানের ও শব্দের অর্থের এই যে পথ চলা, এটি কিন্তু সরলরৈখিক নয়। এটি কারণ-ফলাফল সমীকরণ নয়। বরং এটি ভেঙ্গে ভেঙ্গে, পরিবর্তিত হতে হতে, অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পথ চলে। যে কারণে জ্ঞান-কাঠামো অনবরত স্থান পরিবর্তন করে। এর বিবর্তন হয়। প্রতিনিয়ত এর নবায়ন হয়। এই ব্যাপারটির প্রতিফলন দেখা যায় ইতালো ক্যালভিনোর “আ সাইন ইন স্পেস” গল্পের মূল চরিত্রের মধ্যেও। তার নাম কফুক। কাজ করে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ গন্ডির মধ্যেই। শব্দ আর শব্দের ব্যাঞ্জনা- এই দু’য়ের মাঝখানে সে নিজেকে স্থাপন করেছে। এরপর সে দেখছে এই স্পেস বা জায়গাটাই তার ‘আত্ম’ বা ‘সেল্ফ’ কে নিয়ন্ত্রণ করছে। শব্দের অর্থ যেমন খামখেয়ালী, ঠিক তেমনি এই আত্ম’র পরিচয়ও অনবরত পরিবর্তনশীল। অর্থ সুষম নয়, বিষম। এই বিষম স্বভাব অনবরত প্যারাডক্স বা কূটাভাষ নির্মাণ করে। এই নির্মাণ আবার নিরবিচ্ছিন্নভাবে গঠনমূলক নয়। এটি গঠন করে, ভাঙ্গে, আবার গঠন করে, আবার ভাঙ্গে। ফার্ডিনান্ড ডি সস্যুরের কাঠামোবাদকে এটি প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে চলে।
‘আ সাইন ইন স্পেস’ গল্পে কফকু, যে আসলে নারী, নাকি পুরুষ, নাকি আদৌ কোন রক্তমাংসের প্রাণী- এমন কিছু তার ব্যাপার জানা যায় না। সে মহাশূন্যে একটি চিহ্ন তৈরী করতে চায়। কফকুর বয়স বাড়ে না। সে মহাজাগতিক শক্তির প্রতিভূ। তার ধ্বংস বা বিনাশ নেই। শুধু একরূপ থেকে আরেক রূপে পরিবর্তন আছে। সে শক্তি, তার ধ্বংস বা বিনাশ নেই। সে নিত্য। সে মহাশূন্যে এমন একটি চিহ্ন নির্মাণ করতে চায় যাতে দুইশ’ মিলিয়ন বছর পরে সে ধরতে পারে যে, সূর্য যে বিন্দু থেকে মহাবিশ্বে যাত্রা শুরু করেছিল ঠিক সেখানেই ফিরে এসেছে। কিন্তু এটি তো বাস্তবে সম্ভব নয়। যেখানে চিহ্নই অনবরত পরিবর্তনশীল সেখানে সূর্যের যাত্রাবিন্দু আর অন্তিম গন্তব্য বিন্দু নির্ধারণ করা অসম্ভব। আবার যে সাইন বা চিহ্ন কফকু নির্ধারণ করেছিল, সেটিও তো আর নেই। সেটির জায়গায় অসংখ্য চিহ্ন তৈরী হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে। এই মহাবিশ্ব এভাবে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে। এটি থামছে না, থামবে না। কিন্তু সেই বিন্দুটাও আর চেনা থাকছে না। এর প্রতিনিয়ত বিস্তরণ যেন একটি অসীম খেলা। কাজী নজরুলের গানের মতই। ‘খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট শিশু আনমনে।’ এই বিরাট শিশুই সেই বিন্দু যা প্রতিনিয়ত ভাঙ্গছে, গড়ছে। নির্মাণ করছে। বিনির্মাণ করছে। এখানেই উত্তর কাঠামোবাদী ব্যাখ্যা পদ্ধতি নিহীত। এই বিন্দু যদি শব্দ হয়- সেটি আমাদের ভাষার শব্দ আর কর্ণবিদারী বিগ ব্যাংয়ের শব্দ- যাই হোক না কেন, সেটিও প্রতিনিয়ত ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চরেছে।
‘অ্যা সাইন ইন স্পেস’ গল্পের মূল চরিত্র কফকু ছায়াপথের বাইরে একটি বিচ্ছিন্ন বিন্দু আবিষ্কার করে। এটিকে সে মহাবিশ্বের যাত্রা বিন্দু মনে করে। এই ছায়াপথের চারিদিকে আবর্তন করতে সূর্যের সময় লাগে দু’শো মিলিয়ন বছর। কফকু মনে করে, চিহ্ন কী অর্থ নির্দেশ করে, তার চাইতে চিহ্ন সৃষ্টি করাই বড় ব্যাপার। কফকু দু’শো মিলিয়ন বছর পরেও তার চিহ্ন খুঁজে পায় না। কাজেই সে ভাবে, তাকে আরও দু’শো মিলিয়ন বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু আরো দু’শোর মিলিয়ন বছর অপেক্ষার পরও দেখা যাবে আগের চিহ্ন আর নেই। এটির রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। এ যেন শক্তির নিত্যতার সূত্র। শক্তির ধ্বংস বা বিনাশ নেই। শুধু রূপান্তর রয়েছে। এই রূপান্তরই বিবর্তন। এই বিবর্তন টেক্সটের অর্থদ্যোতকতা ও ব্যাঞ্জনার মধ্যেও বিদ্যমান। উত্তর-কাঠামোবাদী ভাবনায় অর্থও অনিশ্চিত। ধ্রæব সত্য বলে কিছু নেই। এই সত্য রূপ, রং পাল্টায় সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। সন্দেহই চিরন্তন। রেনে দেকার্তও এ কথাই বলেছিলেন। তার মতে, তিনি শুধু নিজেকে বিশ্বাস করেন, আর কাউকে নয়। কারণ, তিনি শুধু নিজেকে, নিজের আত্মকে চেনেন। যারা তার চেনা ও জানার বাইরে, তাদের সবাইকে তিনি সন্দেহ করেন। এই সন্দেহ অবশ্য কৌতুহল-উদ্দীপক কারণ সন্দেহ থেকেই মানুষ তার সত্তার বাইরের সব কিছুকে জানতে-বুঝতে চায়। কিন্তু এই জানতে-বুঝতে চাওয়ার ও মহাবিশ্বের মতোই কোন শেষ বিন্দু নেই। আপাত শেষ যা, তা থেকেই আবার শুরু হয়।
কফকুর যে চিহ্ন তার একটা অর্থ অবশ্য আছে। কারণ, এটি সৌরজগতের মধ্যকারই একটি স্থানে অবস্থিত। তাই পারিপার্শ্বিকতার প্রেক্ষিতে এর একটা অর্থ অবশ্য রয়েছে। এটি অন্য সবকিছুর মতো নয়। সস্যুরের কথায়-
ধারণাগুলো পরমভাবে দ্বান্দ্বিক। এই সারবত্তা এদেরকে ইতিবাচক রূপে সংজ্ঞায়িত করে না। বরং এগুলো অন্যসব ধারণা, কথা ও যুক্তির প্রেক্ষিতে নেতিবাচকরূপে সংজ্ঞায়িত হয়। এদের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য হলো- এরা অন্যসব ধারণার মতো নয়।
গল্পের মূল চরিত্র কফকু একটি চিহ্নের নির্মাণ করতে চায় যা তার অভিপ্রায়ের প্রতিফলন এবং অর্থ এর গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়।
এই চিহ্ন তার কাছে পশ্চিমা আধ্যাত্মবাদের ঈশ্বরের ধারণার মতো। এই ঈশ্বর অপরিবর্তনশীল, ধ্রæব এবং পরম বিশুদ্ধ। তাই সে সেই চিহ্নের কাছে আবার ফিরে আসতে চায়। সে বলে,
যেভাবে গ্রহগুলো ঘুরতে থাকে সৌরজগতে, সৌরজগত যেভাবে চলতে থাকে, আমিও ঠিক সেভাবে চিহ্নটাকে অনেক পেছনে ফেলে যাই। এর অসীম ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। কখন এর কাছে আবার ফিরে আসব, এর সঙ্গে আবার মিলিত হব; একে আমি কীভাবে চিনবো, এটিকে ফিরে পেয়ে কতটা খুঁশি হব; কত কোটি আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে কোন পরিচিত কিছুর সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেই; শত-সহস্র শতাব্দীর পথ মাড়িয়ে ফিরে আসব ঐ চিহ্নের স্থানেই, সেই সাদামাটা চিহ্ন, সেই অভ্রান্ত অবয়ব যা আমি এর উপর আরোপ করেছিলাম।
এখানে গল্পের প্রধান চরিত্র চিহ্নের যে ধারণা হাজির করে, তা পশ্চিমা আধ্যাত্মবাদী মতবাদে ঈশ্বরের ধারণারই উপস্থাপনা। এই বিশ্বাস মতে, ঈশ্বর অবিনশ্বর, ধ্রুব, অপরিবর্তনীয়। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য, সেটি হলো- ঈশ্বরের উপর আরোপিত অবয়ব। অর্থাৎ, শব্দের উপর যেমন অর্থ আরোপ করা হয়, তেমনি গল্পের কথকও ঈশ্বরের উপর রং চড়ান। এটি তারই রং যা ঈশ্বর ধার করে নির্দিষ্ট আকার গ্রহণ করেন। এভাবে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা মেটাফিজিক্স- এর একেশ্বরবাদী ধারণার লোগোসও এখানে বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে তার একচ্ছত্র আধিপত্য হারাচ্ছে। এ তো রাশিয়ান ফর্মালিস্ট মিখাইল বাখতিনেরও ধারণা। বাখতিনের মতে, জীবনটাও তো ডায়ালোজিক বা দ্বিরালাপীয় উপষঙ্গ। সমাজের নানান উপষঙ্গের সঙ্গে দ্বিরালাপ করতে করতে সময় এগোয়। সময় ও সমাজ বদলায়, তাই জীবনও বদলায়। এই প্যারাডাইম শিফটের মধ্য দিয়েই অর্থের উৎপত্তি হয়। আবার একটা টেক্সটের মধ্যে অসংখ্য টেক্সট বিদ্যমান থাকে। কোন টেক্সটই একক স্বর বিশিষ্ট নয়। একের মধ্যে বহুস্বর বিদ্যমান থাকে। এই বহুস্বর আবার প্রতিনিয়ত একে অপরের সঙ্গে দ্বিরালাপ ও অঙ্গাঙ্গিকতার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে। ফলে স্বর, অর্থ, ব্যাঞ্জনা অনবরত বদলাতে থাকে। এই বদলানোর কারণে গল্পের হেজেমনিও বদলে যাচ্ছে। সহস্র বছর ধরে যে গল্পগুলো মানুষের মন-মগজ শাসন করে আসছে; মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে আসছে, সেগুলোও তাদের ‘লোগোস’- এর স্ট্যাটাস হারাচ্ছে। প্রায় ৩৪৫-৩০০ অব্দের দিকে রচিত পঞ্চতন্ত্রের যে ৬৯টি গল্প পণ্ডিত বিঞ্চুশর্মা রচনা করেছিলেন মাহিলারোপ্য’র রাজা অমরাশক্তির পড়াশুনায় অমনোযোগী তিন সন্তানকে শিক্ষাদানের উদ্দেশে; তাদের মন-মগজ তৈরির জন্য, সেই গল্পগুলো উপমহাদেশের নীতিনৈতিকতা নির্মাণে লোগোসের কাজ করেছে প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে। আজকের দিনে সাইবার টেকনোলোজির অভিঘাতে পঠন-পাঠনের ভিন্নতার যুগে পঞ্চতন্ত্রের হেজেমনি বা একচ্ছত্র প্রতাপ আর অবিকল (সলিড) থাকছে না, তরল (লিকুইড) হয়ে যাচ্ছে সংকরায়ন ও ইন্টারটেক্সুয়ালিটির কারণে। এই সংকরায়ন ও ইন্টারটেক্সুয়ালিটিই উত্তরাধুনিক পরিস্থিতি। এই বয়ান আর একই জায়গায় নেই যেখানে পূর্বে ছিল।
তাহলে ইতালো ক্যালভিনোর গল্পের মূল চরিত্র কেন একই শব্দের বা চিহ্নের কাছে ফিরে আসতে চায়? কেন সে মনে করে, যে শব্দটা সে শত-সহ¯্র কোটি আলোকবর্ষ পূর্বে ছেড়ে গিয়েছিল, তার কাছেই ফিরে আসতে পারবে? এর উত্তরে আবার সস্যুরের ধারণা কাজে লাগতে পারে। কাঠামোবাদী ধারণায় চিহ্নকে যথার্থভাবে বুঝতে অর্থ নিয়ে ভাবার দরকার নেই। চিহ্ন আর অর্থ একে অপর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অর্থ চিহ্নের বাইরের একটি উপষঙ্গ। এটি স্বাধীন, খামখেয়ালি, আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘূর্ণায়মান গ্রহ-নক্ষত্রের মতো যেগুলো অনবরত মহাশূন্যে ঘুরছে, ঘুরছে আর ঘুরছে। এই যে ঘূর্ণন- এর মধ্য দিয়ে তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন অর্থ।
উত্তর-আধুনিক যুগে উত্তর-কাঠামোবাদী ভাবনায় টেক্সটকে বিচার-বিশ্লেষণ করার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো কাঠামোবাদী পদ্ধতি। এই কাঠামোবাদী ভাবনা টেক্সটের বিষয়বস্তু নয়, বরং ভাষা নিয়ে কাজ করে। এই ভাষা আবার সর্বদা চলমান। এর নির্দিষ্ট কোন অর্থ নেই। অর্থ সবসময় খামখেয়ালী, যার ফলে টেক্সটের অর্থ অন্বেষণ যদি করতে হয়, তবে তা ভাষার খামখেয়ালি স্বভাবের মধ্যেই করতে হবে। অর্থ যত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, শব্দকে ধরা ততোই কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এক অর্থ আরেক অর্থের জন্ম দেয়, দিতেই থাকে। এ যেন মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রক্রিয়া। একটি পরমাণু ভেঙ্গে দু’টি, দু’টি ভেঙ্গে চারটি, চারটি ভেঙ্গে আটটি- এভাবে চেইন বিক্রিয়ার মতো অর্থের উৎপাদন চলতে থাকে। এর কোন শেষ বিন্দু নেই। আছে শুধুই চলমানতা, গতিশীলতা ও বর্ধিষ্ণুতা। তাই জাঁক দেরিদা তাঁর বিখ্যাত গ্রামাটোলোজি গ্রন্থে যে বিনির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন, তা কিন্তু ধ্বংস নয়। বরং পুনঃসৃষ্টি। শব্দের তথাগত অর্থের গভীর বিশ্লেষণ এবং বিশ্লেষণের গতানুগতিক কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়া। শব্দের অর্থগুলো অনবরত একে অপরের সঙ্গে দ্ব›দ্বরত। এই দ্বন্দ্বে কেউ নিঃশেষ হয়ে যায় না, বরং এরা গ্রীক পুরানের হাইড্রার মতো, যার একটা মাথা কাটলে আরেকটা নতুন মাথা গজায়। এখন আর পঠনের বা পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সম্ভব নয়। এখন চলছে পুনঃপাঠ। এই পুনঃপাঠ কখনও বন্ধ হয় না। চলতে থাকে। আর উত্তরাধুনিকতাবাদ অভিনব সব অর্থ নির্মাণের অশেষ প্রক্রিয়াকেই উৎসাহিত করে।


1 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ
উত্তরমুছুন