ইন্তিজার হুসেইনের গল্প : হাড়ের অবয়ব



অনুবাদ: সাবেরা তাবাসসুম

কোনো এক বছর শহরে এমন কঠিন আকাল পড়ল যে হালাল-হারাম ব্যাপারটাই উঠে গেল। প্রথমে চিল-কাক কমলো, তারপর কুকুর বেড়াল। শুনেছি আকাল পড়ার আগে এখানে একটা মানুষ মরে গিয়ে ফের বেঁচে উঠেছিল। যে মানুষটা মরে গিয়ে বেঁচে উঠেছিল সে তার ভাবনার মধ্যে গেথে গিয়েছিল। সে এই ভাবনাকে ভুলে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনোভাবেই তা ভোলা গেল না। হাড়ের সেই অবয়ব – সেই দৃষ্টিহীন চোখের ক্ষুধার্ত রোগা নারী বারবার চোখের সামনে ভাসতো। এই গল্পের একেকটা অধ্যায় তার মনে ভেতর ভেসে উঠতো।ওই লোকটা যে মরে গিয়ে ফের বেঁচে উঠেছিল। যখন মরে গিয়েছিল না কেউ ইয়াসিন পড়েছিল, না হয়েছিল বিলাপ আহাজারি, না কেউ তার চোখ বন্ধ করেছিল। সকালবেলায় যখন সবাই এলো, দেখলো, যে লোকটা রাতে মরে গেছিল, সে উঠে বসে আছে। ঐ দৃশ্য দেখে তাদের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে রইল। দুর্যোগ হলো কিন্তু সে আবার তার দ্বিতীয় জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তারপর দূর দূরান্ত থেকে লোকজন দেখতে এলো, যে লোকটা মরে গিয়েছিল সেকি আসলেই বেঁচে উঠেছিল।

যে লোকটা মরে ফের বেঁচে উঠল, সে ক্ষুধার্ত ছিল। খাবার চাইল। মরে গিয়ে আবার বেঁচে ওঠার পর এই তার প্রথম ইচ্ছা। সামনে খাবার দেয়া হলে এমনভাবে হামলে পড়লো যেন শত শত বছর না খেয়ে আছে। খেতে খেতে একদিকে ঘাম বেয়ে পড়ছিল, আরেকদিকে শূন্য হয়ে যাচ্ছিল থালা। সন্ধ্যায় সে এর চেয়ে বেশি খাবার খেলো। পরের দিন খিদে লাগলো আগের চেয়েও বেশি। তারপর থেকে সে সারাক্ষণ ক্ষুধার্ত থাকা শুরু করলো।

ওই লোকটা যে মরে গিয়ে ফের বেঁচে উঠেছিল সব সময়, সব রকমেই তাকে ক্ষুধার্ত দেখাত। সব ঘর থেকেই রুটি আসতো। সবগুলোই নিমেষেই শেষ হয়ে যেত। এমনভাবে সে খেত যেন শত শত বছরের খিদে তার। যেন শহরের সব কিছুই চেটে খাবে। এমন ভাবে লোকমা তুলে খেত, মনে হতো কোনো পশু তার শিকার ছিড়েফুঁড়ে খাচ্ছে। এত বিশ্রী করে তাকে খেতে দেখে দর্শকদের মনে একটা ঘিনঘিনে ভাব তৈরি হতো। গজগজ করতে করতে তারা চোখ সরিয়ে নিত।

ঘরগুলোয় ধীরে ধীরে খাবারের সংকট দেখা যেতে লাগলো। ঘরের বউদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলতো, হ্যাঁ, এ বছর তো মরে বেঁচে ওঠা লোকটার জন্যেই তো খাবার পাঠানো হয়েছে। এরপর থেকে ওই লোকটার খাবারের হিসাব মতো ঘরে ঘরে খাবার রান্না করা হতো। কিন্তু খাবার কম পড়তেই থাকলো। জিজ্ঞেস করলে গিন্নিরা বলতো ওই লোকটাকেই তো দিতে হচ্ছে যে মরে বেঁচে উঠেছে। লোকজন দস্তরখান থেকে আধপেটা উঠে যেতে লাগলো। রসুইয়ের স্বল্পতা টের পাচ্ছিল সবাই। তাদের সন্দেহ হল ঘরে যত রুটি বানানো হচ্ছে তার বেশিরভাগটাই ওই মরে বেঁচে ওঠা লোকটা খেয়ে নিচ্ছে। এর এতটাই প্রভাব পড়ল যে সকলকে ক্ষুধার্ত দেখাতে লাগল। রিযিকের চিন্তায় অস্থির হল সবাই।

মরে গিয়ে ফের বেঁচে উঠেছিল যে লোকটা তার ক্ষিধে ছিল প্রবল। কারো সাথে কোনো কথা না মেলামেশা ছিল তার। না রাগ না বেদনা। সুখ-দুঃখ নিয়ে উদাসীন, ভালোবাসা-ঘৃণা সম্পর্কে অনাগ্রহী। তো যখন একজন তাকে খাবার পাঠাতে রাজী হলো না, লোকটার রাগ হলো না, দুঃখও না। হ্যাঁ, সে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মরে বেঁচে ওঠার পর এটাই প্রথম দিন যেদিন সে ঘরের বাইরে বেরুলো। গলির নেড়ি ককুর তাকে দেখে চাপা গর্জন করে উঠল। কিন্তু লোকটা যখন কুকুরের চোখে চোখ রাখলো, লেজ গুটিয়ে বেচারা কুকুর ভাগলো একটুও দেরি না করে। ‍

যে লোকটা মরে বেঁচে ওঠা মানুষটাকে খাবার পাঠায়নি, কড়া নাড়া শুনে দরজার বাইরে বেরিয়ে এলো। এসে দ্যাখে মরে বেঁচে ওঠা মানুষটা দুয়ারে দাঁড়িয়ে। দেখে সে এতই হতভম্ব হলো যে ঘরে যা খাবার রান্না হয়েছিল তার সবটাই এনে লোকটাকে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন। মরে বেঁচে ওঠা লোকটা এরপর থেকে বাইরে বেরুতে লাগলো। প্রতিটা খাবারকে সে এমন মুমূর্ষ আর শুন্য দৃষ্টিতে দেখত যে মালিকের খাবারের উপর রুচি নষ্ট হয়ে যেত। রুটির দোকনের পাশ দিয়ে যেতে যেতে গরমাগরম রুটির সুঘ্রাণ টেনে নিত এমন ব্যগ্র হয়ে যে রুটির সুগন্ধ উড়ে যেত, নষ্ট হয়ে যেত স্বাদ। মিষ্টির দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এমন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতো যে মিষ্টির রঙ যেত উবে আর হয়ে পড়ত বিস্বাদ। ফলের দোকানের পাশ দিয়ে গেলে ফলের সতেজতা রঙ, সব যেত। এভাবে ধীরে ধীরে খাবারের রঙ, সুগন্ধ আর সতেজতা উধাও হতে লাগলো। খাবারগুলো কখনও বিস্বাদ, কখনও স্বাদ বদলানো ঠেকত। পেট ভরা ভরা লাগতে শুরু করল। কিন্তু ক্ষুধা রয়ে যেত ঠিকই। আশেপাশের লোকের মুখের স্বাদ চলে যেতে লাগল আর ক্ষুধা বেড়ে যেতে লাগল। যত বেশিই খাক বা অল্পই হোক, বিস্বাদ লাগতে শুরু করল।

মরে বেঁচে ওঠা লোকটা একদিন বাজারের ভেতর ঢুকল। একটা কুকুর হাড় নিয়ে কসরৎ করছিল। তাকে দেখে থমকে গেল আচমকা। লোকটাকে দাঁত দেখালো গরগর করতে করতে। মরে বেঁচে ওঠা লোকটা কুকুরটার চোখের দিকে এমন হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল যে লেজ গুটিয়ে বেচারা পালাল গলির ভেতরে যদিও সেখান থেকেই তার চাপা গর্জন চলতে থাকল।

এই ঘটনার পর লোকজনের ভেতর খাবার লুকিয়ে রাখার হিড়িক পড়ে গেল। একটা ভয় ঢুকে গেল সবার মধ্যে। খাবারের কদর করা শিখল। এমন ভয় ঢুকল যে ওই লোলুপ দৃষ্টি থেকে খাবারগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় নামল। মরে বেঁচে ওঠা লোকটা যখন বাজারের ভেতর যেত, মিঠাইওয়ালা মিঠাইয়ের ওপর ঢাকনা ফেলে দিত, রুটির দোকানের পাশ দিয়ে গেলে পর্দা ফেলে ঢেকে দিত তন্দুর। এত সতর্কতা সত্বেও প্রত্যেকে অনুভব করল রুটি মিঠাই আর ফলের ওপরের ঢাকনা ভেদ করে মরে বেঁচে ওঠা লোকটার দৃষ্টি ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছে। খাবারগুলোর স্বাদ গন্ধ টেনে নিচ্ছে কোনো এক যাদুমন্ত্র বলে। এভাবে চলতে থাকলে লোকজন বিরক্ত হওয়া শুরু করল লোকটার ওপর। অসন্তোষ পুষতে পুষতেই তারা নিয়ম করে লোকটার দরজায় খাবার রুটি পাঠানো চালু রাখল। সকাল-সন্ধ্যা তারা লোকটার ঘরের সামনে নীরবে খাবার রাখত আর মনে মনে অভিশাপ দিত। কিন্তু কারো সাহস হতো না খাবার না পাঠানোর। যদি এটা করে, তারা জানত, মরে বেঁচে ওঠা লোকটা গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ঠিকই তাদের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়বে।

একদিন এক সাধু এলো ওই শহরে। বাজারের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে মরে বেঁচে ওঠা লোকটাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর লোকটা চোখে চোখ রেখে চিৎকার করে উঠলেন, “বল তুই কে?” তারপর তিনি খোদার নাম নিয়ে জোরে জোরে আওয়াজ দিতে লাগলেন। তার চিৎকারে মরে বেঁচে ওঠা লোকটা আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এই ঘটনায় ভয় পেয়ে যাওয়া লোকজন মরে বেঁচে ওঠা লোকটার কাছে উঁকি দিয়ে দেখে সে মরে পড়ে আছে। সাধু লোকজনকে লক্ষ্য করে বললেন, “হে শহরবাসী, খোদা তোমাদের ওপর রহম করুন। মরা মানুষকে তোমরা একলা ছেড়ে দাও । তোমাদের শহরে একজন মানুষ মরল, তোমরা তার শিউরেও বসলে না। আর অশুভ এক আত্মা সেই দেহ দখল করে নেয়। খোদা তোমাদের শহরকে রহম করুন।”

ওই বছরই এই শহরে আকাল পড়ল। দেখতে দেখতে চিল কাক গায়েব হলো আর কুকুর লেজ গুটিয়ে পালাল শহর ছেড়ে।

মরে বেঁচে ওঠা লোকটা - যে মরে বেঁচে উঠেছিল, যা ভাবনায় গেঁথে গিয়েছিল। সে তা ভোলার বহু চেষ্টা করল। সেই রাতে কথাটা শোনার পর থেকে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছিল। যে কথা তার বুদ্ধিতে কুলায় না, কেন সেদিকে বারবার মনোযোগ দাও? কিন্তু লোক মরে বেঁচে উঠেছিল সে তার ভাবনায় রূপ বদল করে করে এলো, কী জানি তার কোন সময়ের কথা মনে পড়ল আর কতদিকেই না তার ভাবনা গেল। মনে পড়লো এক তাগড়া লোকের কথা, শৈশবে এক কালো আমবাগানে যার দেখা পেয়েছিল সে। এই নিশ্চুপ দুপুরে কি জানি কোন দিক দিয়ে এসে দাঁড়ালো সামনে? কুচকুচে কালো, বড় বড় সাদা চোখ, সরু পা, বেয়ে নামা লম্বা লম্বা চুল, মাথায় বড় পাগড়ি,কানে বালা। খুব কাছ ঘেঁষে চলে যায় লোকটা। যখন সে চলে গেল, আশেপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকা একটা ছেলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আরে, লোকটা গেল কোথায়?” প্রত্যেকেই তার কথা শুনে ঘুরে তাকাল। ওই মোড়টা ছিল শুনশান। ছেলেটার মুখে বাতাস খেলা করছিল। কেউ একজন এমন ভাব দেখিয়ে প্রশ্ন করলো— “কে ছিল সে?” সকলেই এ ওর মুখের দিকে চাইতে লাগলো। ফের একজন ভয় না পাওয়া স্বরে বললো, “আরে কেউ তো আসে নি এখানে। ওটা প্রেতাত্মা ছিল।”

“প্রেতাত্মা ছিল?”

“হ্যাঁ, প্রেতাত্মা।”

“ তুই ওর পা দেখেছিস? ”

“না”

“ওস্তাদ, ওটার পা পেছন দিকে ছিল।”

“পেছন দিকে?” সকলে একযোগে জানতে চায়।

“খোদার কসম” বলতে বলতে মিইয়ে যায় তার গলা।

তারপর ফিসফিস করে বলে, “ইয়া বড় বড় পায়ের পাতা, কিন্তু পেছনমুখো।”

সবাই দমে যায় এই কথা শুনে। তাদের চোখ চারদিকে তাকাতে থাকল। এমন কি তাদের দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে নিছক চোখ হয়েই রয়ে গেল। বড় বড় চোখ, যে চোখগুলো একে অপরকে দেখছিল। তারপর তারা বিদ্যুৎ বেগে যার যার জুতো চপ্পল ফেলে সোজা দৌড় লাগালো। যেখানে এতক্ষণ শূন্য দৃষ্টি ছিল, সেখানে এখন শূন্য শূন্য পা। তাদের সাহস দেখে হাসি পেল লোকটার। শিশুকালে মানুষ কেমন বোকার মতো ভাবে। জঙ্গলে চলতে থাকা প্রত্যেকটি মানুষকে তার জ্বীন বলে মনে হতো। এই জঙ্গল তো শহর থেকে বেশি দূরে নয়। শুনশান দুপুরবেলা বড় কোনো গাছ থেকে যদি কোনো বাঁদর হঠাৎ লাফিয়ে মাটিতে নামতো - মনে হবে কোনো মানুষ এসে পড়লো। আর যতটা না সেই মানুষ বলে মনে হওয়া বানরকে ভয় লাগত তার চেয়ে বেশি ভয় লাগত মানুষকে দেখে যে কি জানি এই যদি মানুষটা মানুষ না হয়। তার মনে পড়ে কেমন ছিল সে। হঠাৎ কোনো এক সময় চাষবাস আবাদী বন্ধ হয়ে গেল এই সড়কের জন্যে, যেখানে এখন লরি চলে। তারও আগে এখানে চলত গরুর গাড়ি। গাড়ি থেকে গরুগুলো খুলে রাখা হতো আর ওই ডাণ্ডার সাথে টাঙিয়ে দেয়া হতো ময়লা চাদর গোছের কাপড়। আর এখান থেকে ওখানে ধোঁয়ায় রোদে পেটাইয়ের শব্দ শোনা যেত। মনে হতো পুরনো কোনো গোত্র শহর ঘেরাও করে ফেলেছে। লম্বা চুল, কানে বড় দুল, কালো ভুজঙ্গের মতো দেখতে, হাড় বের হওয়া, প্রায় বের হয়ে যাওয়া সাদা চোখের হাতুড়ে। মোটা মোটা গনগনে লোহা আর তার ওপর হাতুড়ির বেদম আঘাত। ঘামে ভেজা ওই লম্বা লম্বা হাতে ধরা হাতুড়ি একই গতিতে পেটাতে থাকত আর আকার পেত তপ্ত লোহা। সপ্তাহ দুই গাড়ির ছায়ায় গড়ে উঠা তাবু এমন করেই পড়ে থাকতো। রোদ, ঘাম আর হাপরের পাশে লোহা পেটানোর শব্দ চলতেই থাকত। তারপর আচমকা একদিন সেই তাবু গায়েব হয়ে যেত। ব্যস, তারপর ভাঙাচোরা চুলা , মরে আসা ছাই আর শুকনো-ভেজা গোবর এখানে সেখানে পড়ে থাকত।

“দোস্ত, প্রেতাত্মা চলে গেছে।” আচমকা প্রেতাত্মা চলে আসায় ছেলের দল যেমন অবাক হয়েছিল তেমনি আচমকা চলে যাওয়াতেও। জঙ্গলের দিকে টলোমলো পা যেতে গিয়েও থেমে যায়। তাদের মনে হয় একটা কাফেলা এলো, থামলো আর চলে গেল। উজাড় চুলা আর বাসি ছাইয়ের দিকে তারা চেয়ে থাকে।

“দোস্ত, এই প্রেতাত্মা খুব নোংরা হয়। টিকটিকি ধরে খায় “

“টিকটিকি! আরে ও তো সাপ পর্যন্ত ধরে খায় “

“সাপ… নারে দোস্ত।”

“বিশ্বাস করিস না।”

“কিন্তু দোস্ত, সাপ কেউ কীভাবে ধরে খেতে পারে।”

“আল্লাহর কসম, আমি নিজের চোখে দেখেছি। ইয়াব্বড় সাপ! প্রেতাত্মা ওটাকে টুকরা টুকরা করলো, তারপর কড়াইতে ফেলে…” মুখটা বাঁকিয়ে সে থেমে গেল। এইসব স্মৃতিচারণ লোকটার ওপর এমন প্রভাব ফেলল যে তার গা ঘিনঘিন করতে লাগলো। আপন মনেই বলল, মানুষ কী সব জিনিস দিয়ে তার পেট ভরে। টিকটিকি ব্যাঙ সাপ বিচ্ছু সব। তাহলে মানুষও তো ওই প্রজাতিরই হলো, না? আর মানুষের পেট? এই পেট আসলে কী রকমের আপদ? একে বাঁচাতে গিয়েই সব ঝামেলা।

“ও আম্মা, পুরো থাল ভরা রুটি শেষ করে ফেলল গো।”

“বাপ আমার, থাম, এত খেতে হয় না।”

“আম্মাজী, ওর পেট আজ আর ভরবে না। পেটে জ্বীন ঢুকে বসে আছে।” তো জ্বীন অনেক বেশি বেশি খায়? এই কথার সাথে সাথে তার ওই মানুষটার কথা মনে হলো যার সামনে থেকে জ্বীন রুটি উঠিয়ে নিয়ে গেছিল আর তারপর থেকে সে শুকিয়েই যাচ্ছিল। আগের কাহিনি থেকে মনোযোগ সরে এখন আরেকটা কাহিনিতে ঢুকে গেল সে।

“বিবি, মুর্দার সাথে খেতে দেখা ভালো নয়”। আম্মাজী ভয়ে ভয়ে বলে, মৌলবী সাহেব এই স্বপ্নের কথা শোনার পর চুপ হয়ে গেছে। তারপর বলল, সদকা দাও। অনেক সদকা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যা ঘটার তা তো ঘটছিলই। সব সয়সম্পত্তি উজাড় হয়ে গেল। ব্যস, এই দুঃখে মাথা খারাপ হয়ে গেল বেচারার। গোরস্থানে গোরস্থানে পাগল হয়ে ঘুরত। আর দেখতে হাড়ের অবয়বের মতো হয়ে গেল। ব্যস, এটাই ধরে নাও, বেচারা বেঁচে থাকতেই মরে গেল।”

ওই লোকটা যে বেঁচে থেকেই মরে গেছিল, কল্পনায় তাকে দেখতে লাগল সে। শুকনো টিঙটিঙে শরীর, কোটরে বসে যাওয়া চোখ, নোংরা চুল, হাতে, তোয়ালেতে খাবার লেগে আছে, দুদ্দাড় করে কবরখানার মসজিদের দিকে যায় আবার কাউকে না পেয়ে হয়রান হয়ে এ গলি সে গলি খুঁজে বেড়ায়। ওই লোকটা যে বেঁচে থাকা অবস্থায়ই মরে গেছিল, এই মসজিদের পাশে এক ফকিরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। দেখলেই ফকির লোকটা সারাক্ষণ বলত, বাবা আমার খিদে পেয়েছে। আর সেই লোকটা কিনা এই ভিখারীকে বলল, ‘বাবা, তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি খাবার নিয়ে আসি।’

তারপর ওই লোকটা দৌড়ে চলে আসে ওখান থেকে আর রুটি কেনার জন্যে পয়সা জমাতে শুরু করে। তিন দিন ধরে পাই পাই করে পয়সা জমায়। তিন দিনের মাথায় যখন রুটি কেনার পয়সা জমলো, রুটি কিনে সে দৌড়ে আবার মসজিদের কাছে এসে অবাক হয়ে দেখে ফকির লোকটা ওখানেই নেই। কোথায় গেল ফকির বাবা? প্রথমে সে অবাক হলো। তারপর অস্থির হয়ে এ গলি সে গলি খুঁজতে লাগল। যখন কোথাও তার দেখা মিলল না, যেখানে ফকিরকে রেখে গেছিল, ফিরে এল সেখানেই আর কবরস্থানের দিকে চলল তাকে খুঁজতে। তারপর আবার তার মনে হলো এ যেন রুটিন কাজ যে চেয়ে আনা টাকায় যে চেয়েছিল তার জন্য রুটি কেনা, বড় বড় পদক্ষেপে কবরস্থানের কাছের মসজিদের কাছে যাওয়া, তারপর যে রুটি চেয়েছিল তাকে সেখানে না পেয়ে শহরে তাকে খুঁজে বেড়ানো আর আবার ফিরে কবরস্থানের দিকে যাওয়া … আর ওই লোক যার ভেতর দুষ্টু আত্মা ঢুকে পড়েছিল, ঝিলের কিনারে কিনারে, কবরস্থানে আর পাহাড়ে পাহাড়ে চেঁচিয়ে ফেরা আর নিজেকে পাথরের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত করা। ওই লোকটা নৌকা থেকে যারা নামতো তাদের সামনে দাড়ায় কবর থেকে বের হয়ে আর উচু গলায় চিৎকার করে খোদার কসম আমাকে এমন আজবে ফেল না। … এটা কবেকার ঘটনা সেটা তার মনে পড়ায় চমকে উঠলো সে। কত কত আগের ঘটনা তার মনে পড়তে লাগলো। সে অবাক হতে লাগল ভাবনার পরম্পরা কোথায় কোথায় যাচ্ছে আর কতসব অমূল্য স্মৃতি জমা করছে। ভাবল ভাবনার পরম্পরাও কত পরম্পরাহীন হয়ে যায়। আর কল্পনায় আসা ভাবনারা তাকে ভীত করে তুলল। সে ভেবে দেখল, এই সময়টায় বাইরে চলে গিয়ে মনটাকে ফুরফুরে করতে পারে। ধ্যানগ্রস্ত থাকার উপলব্ধি ভাগ করে নেয়া যাবে আবার মনটাও ভালো হবে।

সে অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। তারপর হঠাৎ করে থমকে গেল। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে যাচ্ছে কোথায়? কবরখানার দিকে? আর এটা কোন মসজিদ, এখানেই তো সেই ফকির … কিন্তু দ্রুতই তার বেখেয়াল হওয়ার অনুভব হলো। এই পথ কবরখানা নয়, মল রোডের দিকে গেছে। এরকম মসজিদ যেখানেই হোক তার ছায়ায় দাঁড়ানো সব ফকিরকে একই রকম লাগবে। সামনে একটা রেস্তরাঁ দেখে তার পা অনিচ্ছুক সেদিকেই এগোল। ভাবলো কিছুক্ষণের জন্যে জিরিয়ে নিই, চা-ও খেয়ে নিই। একা একা ঘুরে বেড়ালে যে এলোমেলো ভাবনা আসে, সেগুলো থেকে মুক্তি মিলবে।

লম্বা সাদা দাঁড়ি, বলিরেখা ভরা মুখ, কোমর একটু ঝোঁকানো আর গায়ে ময়লা ঢিলে আচকান পরা একটা লোক খাবারের ওপর হামলে পড়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে গোগ্রাসে খাচ্ছিল। এমন হুলুস্থুল খাবার খাওয়া দেখে তার বিরক্ত লাগল। আজব লোক তো, দুভিক্ষপীড়িত লোকের মতো খাচ্ছে। কতদিন সে রুটি খেতে পায়নি? হামলে পড়ে খেতে থাকা লোকটা খাওয়া শেষ হলে তাড়াতাড়ি আঙুল দিয়ে প্লেট কাঁচিয়ে খেল, তারপর পাঁচটা আঙুল মুখে পুরে চেটে চেটে খাওয়া শুরু করল, শেষে আলাদা করে রাখা হাড় নিয়ে চুষতে লাগলো। প্রথমে তো এই পাগলের মতো খেতে থাকা লোকটাকে অবাক হয়ে তীক্ষ দৃষ্টিতে দেখছিল সে, তারপর তার গোগ্রাসে খাওয়া দেখে তার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করল। ওদিকে না তাকিয়েও খাওয়ার চপ চপ, চুক চুক শব্দে দৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল। সে লোকটার দিকে একবার কৃপার দৃষ্টিতে চাইল আর ভাবল এটা মানুষ না আপদ? তারপর ওই কৃপা থেকে বেরিয়ে সন্দেহ আর কিছুটা আর কিছুটা মিশ্রিত অনুভূতি হলো তার। প্রশ্ন জাগলো, কি জানি লোকটা মানুষ না হয়। খুব তীক্ষ্ণভাবে লোকটাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো সে। সে কি জীবিত? বিষয়টা এরকম না তো… আবার তার মনে পড়লো এলোমেলো ভাবনার দিকে সে চলে যাচ্ছে। ওই টেবিলটাই বদলে ফেলল সে। আরেকটা টেবিলে গিয়ে লোকটার দিকে পিঠ দিয়ে বসলো যাতে ওদিকে চোখ চলে না যায়, ভাবনাও না আসে। টেবিলে রাখা ছড়ানো ছিটানো খবরের কাগজ চেয়ে নিয়ে গুছিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করলো সে।

কাগজ পড়তে পড়তে হঠাৎ তার মনে হলো হোটেলে শোরগোল বেড়ে গেছে। কাগজ থেকে চোখ তুলে দেখে আশেপাশের সব টেবিল ঘিরে বেয়ারারা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সামনে টাঙানো দেয়াল ঘড়ির দিকে নজর গেলো তার। লাঞ্চের সময় হয়ে গেছিল। দরোজা বার বার খুলতে খুলতে, জোরে জোরে কথা বলতে বলতে এরকমই কোনো একদল লোক এসে গেছিল আর টেবিল ঘিরে বসেছিল। হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় সে ঘুরে তাকালো। গ্যাছে ওই লোকটা? আচ্ছা, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।

দেখতে দেখতে হোটেল এত ভরে উঠল যে লোক এসে টেবিল খালি না পেয়ে ফেরত চলে যাচ্ছিল। প্রতিটি টেবিলে প্লেট আর চামচ আর লোকজনের দ্রুত খাবার খাওয়ার শব্দ। সবাই খাচ্ছিল, আসলে গিলছিল। প্রতিটি টেবিলে প্রতিটি মানুষের মুখ সে খুঁটিয়ে দেখছিল। কী হলো এইসব মানুষের, এরা মানুষ না আপদ বালাই? ধীরে ধীরে তার এটা মনে হতে লাগলো যে এই আলাদা আলাদা চেহারাগুলো লম্বা হয়ে যাচ্ছে আর চোয়াল ঝুলে পড়ছে।

তার কল্পনায় আবার কিছু ছায়া দুলতে লাগলো। কিন্তু সে দ্রুতই সামলে উঠে এত জোরে বেয়ারাকে ডাকলো যে আশেপাশের লোক ঘুরে তাকালো। সে নিজেও এই আচরণে হকচকিয়ে গিয়ে বেয়ারাকে ফুলকোর্স খাবার অর্ডার করে বসলো। অথচ তার কেবল চা আর সামি কাবাব হলেই চলতো।

অর্ডার দিয়ে সে আবার আশেপাশের টেবিলে নজর বুলালো। কিন্তু এবারে তার ম্যুড অন্যরকম ছিল। হাপুস হুপুস করে খেতে থাকা লোকগুলোকে সে সহানুভূতির চোখে দেখল। ভাবল, লাঞ্চের জন্যে এক ঘণ্টা সময়ই তো পায়, এই সময়ের মধ্যে আর কত রয়ে সয়ে খাবে, ব্যস পেটের দোজখ ঠাণ্ডা করছে এরা।

আনমনে খাওয়া শুরু করল সে আর খেতেই থাকল। এত বড় বড় লোকমা সে মুখে পুরছিল যে একসময় গলায় খাবার আটকে গেল। তার মনে হলো পানি না খেলে তার চোখ ঠিকরে বেরুবে। পানি খেতে খেতে তার মনে হলো, আমি এত দ্রুত খাচ্ছি কেন আর তখনই তার একটা অদ্ভুত ভাবনা মনে এলো। এটা কি সত্যিই আমি? এই টেবিলে বসে যে লোকটা খাবার খাচ্ছে সে কি সত্যিই আমি? সে ধীরে সুস্থে গ্রাস তুলল, ধীরে ধীরে মুখে পুরলো, এমনভাবে চিবোতে শুরু করল যেন মুখ একটা আলাদা মেশিন আর তার হাতল ধরে সে ঘুরিয়েই চলেছে। ওই সময়ে সে ভাবছিল, প্রতিটি গ্রাসের শুরু থেকে শেষ হওয়ার প্রক্রিয়াটা যদি সে জানতে পারত। তারপর সে ভাবল, এটা কি হতে পারে না, ধীরে সুস্থে খাওয়া লোকদের বাদ দিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকা লোকদের টেবিলে গিয়ে সে বসে আর দেখে ওখানে যারা খেতে বসেছে তারা আসলে কে? আমি কি সত্যিই আমি? যদি আমরা জানতে পারতাম যে আমি আছি আর ওটা সত্যি আমিই আর যদি আমরা জানতে পারতাম আর যদি আমরা আসলেই থাকি তাহলে সেটা কি আসলেই আমরাই। আর যদি আমরা নিজেদের দেশকে দুষ্টু আত্মাদের থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য পবিত্র আত্মার প্রয়োজন হতো। আর যে মানুষটা মরে বেঁচে উঠেছিল তার ভাবনা আবার মাথায় ঘুরতে লাগল। কিন্তু এবার তার সন্দেহ হল, মরে বেঁচে ওঠা লোকটা তার কল্পনায় ঢুকে গেছে নাকি সে ঢুকে পড়েছে ওই মরে বেঁচে ওঠা লোকটার ভেতর।

যে দ্রুততা নিয়ে সে খাচ্ছিল ঠিক তার বিপরীতে ধীর লয়ে এবার সে খাবার খেতে শুরু করল। হঠাৎই তার সব ক্ষুধা নষ্ট হয়ে গেল। খিদে থাকবে কী করে, তার মাথায় এখন এই ভয় এসে হাজির হয়েছে সে নিজেই তো গোগ্রাসে গিলতে থাকা লোকগুলোর চেয়ে আলাদা কিছু না। তার বিভিন্ন হোটেলে হারাম মাংস বিক্রির কথা মনে পড়ল। এই ব্যাপারটা তাকে এমন আচ্ছন্ন করে ফেলল যে তার খাবার ইচ্ছাই উবে গেল।

যখন সে বাথরুম থেকে হাত ধুয়ে বেরিয়ে এলো, দেখলো হোটেল প্রায় খালি হয়ে এসেছে। দু’একটা টেবিলে লোকজন বসে নিরাসক্ত মুখে চা খাচ্ছে। বেয়ারাও তেমন নেই। শুধু একজন বেয়ারা খুব মনোযোগ দিয়ে টেবিল পরিষ্কার করে চলেছে। অন্য এক কোণায় বসে চুপচাপ চা খেতে থাকা এক লোককে দেখে তার মনে হলো লোকটা তার দিকেই তাকিয়ে নেই তো! কিন্তু নিজের কাছেই তার এই মনে হওয়া বোকার মতো মনে হলো। আমাকে কেন দেখে। আমার কি শিং গজিয়েছে। তারপর সে যখন বেয়ারাকে ডাকল, চমকে উঠে সেদিকে চোখ গেল তার। একটা উদাস দৃষ্টি নিয়ে দেখল। না সে ওই ব্যক্তিটি নয়। অবশ্য এই ঘটনার পরে মনে সন্দেহ দানা বাঁধছিল তার। তারপর ভাবল হোটেলে আর কতক্ষণ বসে থাকা যায়। কিছুটা তাড়াহুড়া করেই সে বিল মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।

সামনের বাসস্ট্যান্ডে তখনই একটা বাস এসে থামল। দৌড়ে গিয়ে বাসে চড়ে ভিড় ঠেলে পেছনের কোণায় সবার থেকে আলাদা একটা সিটে বসে পড়ল সে। কিন্তু পরের স্টপেজে এত যাত্রী উঠল যে বাসটা ভরে গেল আর আর যে সবার থেকে আলাদা ছিল সেও ভিড়ের অংশ হয়ে গেল। তার মুখোমুখি বসা এক যাত্রীর মুখ সারাক্ষণ চলছিল। সে চানাবুট চিবুচ্ছিল। তার মুখ থেকে ভেসে আসা চানার সুগন্ধে অস্বস্তি হচ্ছিল। ক্রমাগত মুখ নাড়তে থাকা লোকটাকে দেখে হোটেলের গোগ্রাসে খাওয়া লোকটার কথা মনে পড়ে গেল তার। কিন্তু এখন সে এমন কল্পনায় বিরক্ত হল। ভাবল, কল্পনাও কেমন ক্লান্ত করে ফ্যালে। কেউ কল্পনা উদ্রেককারী হয়ে মগজের কোষে কোষে ঢুকে যায়, মাথার ভেতর ‍ঘোরে ফেরে। তারপর বিপদের ওপর বিপদ এসে হাজির হয় আর সমস্যার ভিড় জমে যায়। এই ভাবনা থেকে তার মাথায় আরেক রকম ভাবনা এলো। দুষ্টু আত্মা মানুষের শরীরে ঢুকে কোথায় বসত গড়ে? পেটে? না মাথায়? মাথা? মাথা নিজেই দুষ্টু আত্মা নয় তো যে মানুষের দেহে ঢুকে বসে আছে? এই দুষ্টু আত্মার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব? আর সে এসব ভাবতে ভাবতে মস্তিষ্কহীন মানুষের অবয়ব কল্পনা করা শুরু করল। তার কল্পনা এরকম অনেক অবয়ব বানিয়ে আবার মুছে দিল।

আর ভাবুন তো মানুষের মুণ্ডই নেই? এই কল্পনা প্রথমে তার কাছে অদ্ভুত লাগলেও ধীরে ধীরে সেটা একটা আকার পেতে শুরু করল। মুণ্ডহীন কিন্তু মায়ের পেট থেকে বের হওয়া উলঙ্গ এক মানুষ। সেই মায়ের পেট থেকে বের হওয়া উলঙ্গ মানুষ তার মাথাটাকে হাতের তালুতে রেখে সাবধানে মসজিদের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। কিন্তু এই কল্পনায় সে নিজেই আতঙ্কিত হলো। যত দ্রুত সে এমন মানুষের ছবি কল্পনায় এনেছিল, তত দ্রুতই সে এটাকে খারিজ করল। ভিড়ের চোটে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কিছু সময়ের জন্যে ভিড় থেকে মুক্তি পেতে সে জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে দেখল। একটু সময় তাজা হাওয়া লাগায় সে আবার শ্বাস ফিরে পেল। কল্পনাও একটা ভয় পাইয়ে দেবার মতো ব্যাপার, সে ভাবল, আর আগেপিছের সব ভাবনাই মাথা থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করল। আর তখন আদতেই কিছু ভাবছিল না সে। হ্যাঁ, অনেকগুলো বিক্ষিপ্ত স্মৃতি, কল্পনা আর ছবির মিশেলে মাথার ভেতর জট পাকিয়ে গিয়েছিল। এই কুয়াশাজট বেশ কিছুক্ষণ এমনভাবেই আটকে থাকল যে মনে হল সে জমে গেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে আবার সহজ হল সব আর মাটির স্তরের মতো আবছা অবয়বগুলো কল্পনায় আসতে থাকল— সেই ব্যক্তি যে মরে গিয়ে বেঁচে উঠেছিল, সেই ব্যক্তি যে বেঁচে থাকতেই মরে গেছিল, সেই ব্যক্তি যে মরেও মরল না— মায়ের পেট থেকে বের হওয়া উলঙ্গ মাথা কাটা মানুষ। কল্পনা আবার ভিত্তি পেল যেন। কিন্তু যে কল্পনায় ভয় পেয়েছিল সে এই বৃত্ত থেকে পালিয়েছে। সে আরেকবার জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিল। এই বাস আর কতক্ষণ ছুটে চলবে। ভুল বাসের টার্মিনাল তখনও দূরে। কিন্তু তার এমন ভয় লাগল যে পরের স্টপেজেই সে নেমে পড়ল।

এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কোলাহল করা কাকগুলো গাছের ডালে বসছিল আর অকারণেই ভয় পেয়ে আবার এলোমেলো উড়ে যাচ্ছিল। এক ঝাঁক আবাবিল পাখি উড়তে উড়তে এত উপরে উঠে গেছিল যে এখান থেকে মনে হচ্ছে তারা স্থির হয়ে আছে। সড়কের ধারে ঠায় বসে থাকা কুকুর আওয়াজ পেয়ে মাথা তুললো, তাকে দেখলো আর মৃদু গজরাতে লাগলো। চাপা গর গর করতে থাকা কুকুরটাকে পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগোলো সে। এগিয়ে যাওয়ার পর তার মৃদু গর্জন করতে থাকা কুকুরটার কথা আবার মনে হল। আর সাথে সাথে মনে হল আজ তো বৃহস্পতিবারের রাত আর তারপর সে মনে করার চেষ্টা করল কুকুরটা কালো ছিল কিনা। পা থমকে গেল। ঘুরে তাকাল সে। ঘুরে তাকানোর এমন কোনো কারণ ছিল না। ব্যস, তার মনে হল যে এখন তো রাত হবে। শহরে আর কোথায় যাবে, ঘরের দিকে চলে। সড়কের মোড়ে গিয়ে আশপাশ ভালো করে জরিপ করে দূরে দেখছিল সে। চিন্তায় পড়ল, কারণ এটুকু সময়ের ভেতর কুকুরটা গেল কোথায়। তার মনে পড়লো ওই কুকুরটা কালো রঙের ছিল আর এখন বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যা তাহলে কুকুরটা দুষ্টু আত্মা নয় তো? অনেকক্ষণ ধরে সে এই ভাবনায় মশগুল থাকল যে ওটা কুকুর ছিল না অন্য কিছু। যখন সে গলির দিকে মোড় নিল আর রুটিওয়ালার দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, রাধুনি তখন রান্না হতে থাকা হাঁড়ির ঢাকনা তুলতেই খাবারের সুঘ্রাণ নাকে লাগলো তার। মনে পড়লো, সে নামমাত্র দুপুরের খাবার খেয়েছিল। সাথে সাথে খিদে পেল তার আর দ্রুতই সে ঘরের দিকে পা চালালো। কিন্তু এর সাথে সাথেই উধাও হয়ে যাওয়া কুকুরের কথা তার মনে এলো। ওটা কুকুর ছিল না অন্য কিছু? তারপর কুকুরটার গর্জন আর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকাটা চোখে ভাসলো। কুকুরটা আমাকে দেখে অদ্ভুত গর্জন করছিল। ওটা কুকুর ছিল না আমি… দ্বিধায় পড়ে গেল সে। আমি কে? আমি কি আমিই? শীতল ঘাম ঝরতে লাগল তার। পরে মনে হল একটা হাড়ের অবয়ব হয়ে রয়ে গেছে সে। আর পা হয়েছে লম্বা লম্বা। গোটা দুনিয়া খেয়ে ফেলা খিদে পেল তার। ‍

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ