(১)
এই শরৎকালে আমি কিছুতেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠতে চাই না। রাতে শুতে যাওয়ার আগে মনে মনে ভাবি, আমার ছোটবেলার সেই লতাপাতার ঘ্রাণ মেশানো, রেডিও বেজে ওঠা, নীল সকালে যেন ঘুম ভাঙে।কিন্তু দেরি হয়ে যায়; সূর্য ভোর ছেড়ে সকালের দিকে হাঁটা শুরু করে।শরীরে লোমের গোড়ায় অল্প অল্প শীতের হাওয়া তিরতির করে কাঁপে।মাথা টলোমলো করে মেলায় বিক্রি হওয়া মাটির বুড়োর মতো , বুকে চাপ।একটু একটু করে এগিয়ে টাইমকলে হাতমুখ ধুই কচলে কচলে।অনেক অনেক জল দেখলে খুব আনন্দ হয়।ঠান্ডা-নরম জল।এরপর জল দেখার আনন্দ বুকে ধরে বারান্দায় ফিরে বেশি মিষ্টি দেওয়া চা বাটিতে ঢেলে মু্ড়ি দিয়ে ভিজিয়ে খেতে বসি।
খানিক তফাতে আমাদের বাগানে উপেন কাকা বসে বসে গাছপালার গোড়ার মাটি আলগা করে দেয় নিড়ানি দিয়ে, এতে শিকড়ে আলোজল ভালো খেলা করতে পারে,গাছ বাড়ন্ত হয়,ঝাকুমাকু হয়।ভোররাত থেকে এইসব কাজ করে এখন ও ভাত নিয়ে বসে।খুব যত্নে প্রতিটি ভাতের কণা থালার একটা জায়গায় ঢিপঢিপ করে রাখে।হাত বাড়িয়ে বোম্বাই লঙ্কা ছিঁড়ে নেয়।সেদ্ধ কুমড়োর অস্পষ্ট হলুদ গা দেখা যায় এখান থেকেই।
চারিদিক চুপচাপ শুধু খাওয়ার শব্দ ; আর দু একটি পাখি ডাকছে।বাতাসে ভাত খাওয়ার ঘ্রাণ মিলেমিশে যাচ্ছে।ছোটবেলা থেকে কাকার জিভের সমস্যা আছে ব'লে চিরকালের জন্য নীরবতার ছেলে হয়ে যেতে হয়েছে ওকে। তবু ও মনে মনে কিছু ভাবনার বুদবুদ ভাসিয়ে দিচ্ছে চরাচরে, আমাকে যা বলতে চাইছে সেই নীরব কথাগুলি যদি সাজানো হয়, তাহলে এমন হবে –
বুঝলা পোলা, বিহানে বড়ো বাটি ভরতি কইরা খাইতে হয়।
পৃথিবীতে ভাতের ফ্যানের লাগান উপকারী আর কিসুই নাই।
পক্ষী হইয়া চা হুড়ুম ঠুকরাইয়্যা খাইলে শরীল তুমার কুনোদিন সারবো না, ওমনই রোগে ভুগবা।
এই দ্যাহো আমি ভাত খাই,কুমড়া সেদ্ধ,কালাজিরা-রসুনতেল ভাজা,কাঁচা মরিচ...
খাইবা?
এই না বলতে পারা কথার ঢেউ আমাকে এসে কাঁপায়।পেটের ভিতর ঢুকে সব আলুথালু করে দেয়।কুমড়ো সেদ্ধর গা থেকে ওঠা কেমন এক ঝিমঝিমে গন্ধ আমাকে সুড়সুড়ি দেয়।ওয়াক চলে এল আমার।ভেবেছিলাম আজ অন্তত চাট্টি খেতে পারব বহুদিন পর।হল না।সমস্ততে জল ঢেলে রোদে ভরে যাওয়া সকালে আবার বিছানায় গিয়ে চিত হয়ে শুই।ঠোঁটে থেকে হাত তিন দূরে কোথাও পিঁপড়ে চলে।আবার চোখ চটচট করতে থাকে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের আঠায়।
বন্ধ চোখের ওপারে লাল নীল ঘুমের আলগা আলগা সুতো।সুতো বেয়ে বেয়ে নামতেই চিনিদানা দিয়ে তৈরি মঠ,কুঠি,গীর্জা,কবর আর কতো কতো চিনির ঘাসবন।
সেখানে একটা টেপাকলের পাশে মা মেরী নাকি শচীদেবী চুপ করে বসে আছে।মুখ ভয়ে চিন্তায় ঘন নীল। আমার ঠেলে ওঠা পাটকাঠির মতো পাঁজরের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে হাতে ধরা গেলাস মাটিতে নামিয়ে রেখে বলতে থাকে -
- খাবারে জল কেন ঢাললি তুই?
- আমি উত্তর না করে চুপ করে বসে থাকি।
- দুধ রোজ করা হলো প্রতিদিন তাও গেলা হয় না কেন?
- এবারেও চুপ করে আছি।আমি সম্পূর্ণ নিরুত্তর।
- যা খাবি সব তুলে দিয়ে দিয়ে, বমিতে ভাসিয়ে সারা ঘর ভোঁটকা ভোঁটকা গন্ধ করে ছেড়েছিস।কতো ডাক্তার দেখাব তোকে আর! পয়সা কি বলদের পোঙায় মোচড় মারলে আসে?
এমন ভাষায় তো মেরী বা শচী কেউ কথা বলবেন না।ঘুমের জল থেকে ভুস করে ভেসে উঠে দেখি,মা এইসব কথা বলে বিছানার পাশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। চলে গিয়ে গেলাসটা উঠোনের কলের পাশে রাখা ঢাকা বালতির জল দিয়ে ধুচ্ছে।শাঁখা পরা হাত জলে চুবিয়ে কিছু খলবল করে ধুলে আমার খুব আনন্দ হয়।
ঘরে ফিরে মা আবার বলতে লাগল -
- শোন দামড়া,তোর বাবার বয়স হয়েছে,আর কতোদিন তার মাথায় চেপে ঠ্যাং নাচিয়ে নাচিয়ে খাবি! সারাক্ষণ খালি অসুখ আর অসুখ! আর বেহুলার মাগির ঘুম চোখের মধ্যে ভরেই আছে! একটার পর একটা ঝামেলা শুধু।আমি আর পারি না।
- মা,আমি ঘরে বসে বসে টিউশনির চেষ্টা তো করলাম।ছেলপেলেগুলো ভয় না পেলে আমি কী করব?সারাক্ষণ হাসে আর গল্পো শুনতে চায়।
- ভয় না পেলে আমি কী করব! তুমি নাচবা! কেন ওদের মারতে পারো না! ভয় দেখাতে পারো না! যত্তোসব!
আর শোন,যতই বমি কর কাল থেকে আবার বোমমানি মায়ের চানজল খাওয়াব তোকে...
- আমার ওয়াক আসে মা...
- কিচ্ছু আসবে না।ঢকঢক করে গিলবা।
মা এইসব কথা বলে চলে যায় রান্নার কাজে।জানি মুড়িভাজার গরম বালির মতো তীব্র এইসব কথা মা'কে জোর করেই বলতে হয়।বাবা কাঠের নক্সা করার কাজ নিয়ে কোন দূর বিদেশে আছে মুখ কান গুঁজে।তাকে ভারবাহী পশু মনে হয়।আমার এই অসুখ আর সারে না।শরীরের এত কিছু পরীক্ষার পরেও কোনো রোগ ধরা পড়ল না।বুকের ছবি,পেটের ছবি,রক্তপরীক্ষা এক কাঁড়ি টাকা নষ্ট শুধুমুদু।খালি খালি ঘুম পায়, দুই পা চলতে গেলে মনে হয় টলে পড়ে যাব।চোখের সামনে কতো কতো লাল নীল আলো নেচে বেড়ায়।কতো কতো নানানরকমের কচিঘাসের গন্ধওয়ালা, ঘোড়ের লেজের মতো, লবঙ্গগাছের চামড়ার মতো,শীলমাছের চর্বির মতো চৌকো বাঁকা সরু আয়তকার গোল গোল ফাঁপা দৃশ্য তৈরি হয়।অবশ লাগে আর ঘুম চলে আসে।ডুবতে থাকি ধীরে ধীরে ঘুমের জলের তলাকার নৌকো আর জ্যান্ত নেচে বেড়ানো দৃশ্যের ভিতর।
আমাকে অনেক ব্যথা দেওয়া কথা বলে মা দুঃখিত হয়ে রান্নাঘরে একলা একলা চোখের জল ফেলছে।কাকার বয়স্ব চুপচাপ চোখ দুটি জ্বল জ্বল করছে সন্ধের দিকে, জল ভরে টুবুটুবু হয়ে থাকছে।মশা ভনভন করছে।আমি ঘুমের ভিতর ডুবসাঁতার এবং চিৎসাঁতার দিয়ে নীচে নামছি।
আমার ঘুমের নীচে কারা যেন বসে থাকে।সেখানে দুটি পুকুরের ভিতর দিয়ে চলে যাওয়ার রাস্তার পাশে আলো হয়ে আছে আনারসবন।বিষহীন একলা সাপ শুয়ে থাকে মুখ গুঁজে।
(২)
ওইসব রিনরিনে দৃশ্য থেকে পালানোর জন্য আমি ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।মাথাটা একটু একটু ঘুরছে তবু শেষ দুপুরে কাউকে কিছু না বলে রোদে ভরে থাকা পাড়া গাঁয়ে ঘুরে বেড়ানোর কোনো তুলনা হয় না।
বাঁশবনের নীচে নীচে অন্ধকার।গোরুর গাড়ি ঠেসিয়ে রাখা। বুনো কচুপাতায় জল জমে জমে কেমন নরম হয়ে থাকছে।একটা শুকনো গাছের ডাল হাতে নিয়ে আমি ঠাকুমার বাড়ির দিকে যাই।আমাদের পাড়ার সবচেয়ে প্রাচীন বুড়ি, সকলের ঠাকুমা।অসুখ বিসুখে ওষুধ দ্যান, আর বিড়বিড় শব্দ করে মন্ত্র পড়েন।বু্ড়ির আবার মনসার ভর হয় তখন হাতদুটো সাপের ভঙ্গিতে ওঠানাম করে।সারা বাড়ি গাছে গাছে অসংখ্য ফুল বুড়ি ফুটিয়ে রেখেছে।দোপাটি,টগর,পঞ্চমুখী জবা এইসব।
দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া বুড়ি ব্রাশ করে না,পানসুপারি খাওয়া মুখ সকালে একবার শুধু জল দিয়ে কুলি করে।খোসা ছাড়ানো সাপের মতো মুখের ভিতরটা।তবু ওই মুখে জিভ নাড়িয়ে নাড়িয়ে যখন সে পরস্তাব বলে তখন দুঃখে মন ভারি হয়ে আসে।জনমনিষ্যি কিন্তু ওর প্রকৃত শ্রোতা নয়।এই গাছগুলিই বুড়ির একমাত্র শ্রোতা।জল বুলোতে বুলোতে বলবে - ওই ঝুমকোজবার ছা,মুখ দিয় নালা ঝরাইয়া মাটির বালিশ এক্করে ভিজাই দিছ, আর দোপাটি তুমি তো মাটির বিছানায় না ঘুমাইয়া খ্যাড়াইয়া খ্যাড়াইয়া মুতছ সারারাত, সাধে কী আর গাল দি তগো, হালা গাছের পুত।
প্যাঁচার দিনমানে দৃষ্টি যেমন লেপেপুছে যায়,বুড়ির তাই হয় রাতেরবেলা।তাই ঘরের কাঠের চৌকির নীচে একটি শ্যাওলাধরা মাটির হাঁড়ি রাখা থাকে ওর, ওখানেই সে পেচ্ছাপ করে,ভোরে ফেলে দেয় রাতের মুত।
পুকুরের পাশে ঠাকুমার ঘর।দক্ষিণমুখো একটা নিমগাছ। উবু হয়ে বসে বসে নিমগাছের তলা থেকে কী যেন টোকাচ্ছে।আমি গিয়ে বলি -
- তুমি তো ভালোই আছ বৌ আমার, আর এদিকে যে তোমার বর অসুখ বিসুখে ভাজা ভাজা হয়ে বুকের হাড় পাঁজরা বের করে ফেলল সেদিকে বুঝি খেয়াল নেই! তার উপর আবার মায়ের ঝাঁঝানি শুনতে হয়।
- আরে নাগর আমার,কানুসোনা,এদ্দিন পর বুসি মনে পড়ল চন্দ্রাবলিরে!
ওইসব ঝাঁঝানি সব মিইট্যা যাইব, হাড় পাঁজরায় কাদামাটি বুলাই নাও,আর পাড়ার সকল মানুষরে লাউপাতা বিলাও। তাইলেই সব সাইরা যাইব।
এইটুকু কথা বলেই ঠাকুমা দ্রুত ঘরে ঢুকে গেল।ফিরে এল যখন তখন সারা মুখ ভুরভুর করছে সুগন্ধে।পান জর্দা আর কাঁচা আদার কুচি মেশানো তীব্র ঝাঁঝালো ঘ্রাণ, এই গন্ধে মনে হয় একটি ফুলে ভরা ছাতিমগাছ যেন সাদা থান জড়িয়ে আমার সামনে বসে আছে। বুড়ি আমাকে সামনে বসিয়ে বিড়বিড় মন্ত্রে ঝাড়তে লাগল -
"পেটকামড় পেটকামড় তুমি বড় জেদি।
নর পশু কেহ নহে স্থির তুমি কামড়াও যদি।।
আমি ওঝা দিনু আজ্ঞা নাম ত্বরা করে!
তা না হ'লে দিব ফেলে সমুদ্র মাঝারে।।
কার আজ্ঞে? কামরূপ কামিক্ষে দেবীর আজ্ঞে।
আর হাড়ীর ঝি মা চণ্ডীর আজ্ঞে।। "
এই মন্ত্র পড়ল বুড়ি যন্ত্রের মতো গলগল করে।তারপর আমার পেটে তিনবার ফুঁ দিয়ে বলল - এ আমি শিখসি ভুঁইমালী বউয়ের কাসে, মনের ভিতর মন্তর ধরে রাখতে বেগ পাইতে হইছিল।তোর পেটবেদনা সাইরা যাইব।আবার তুই খাইতে পারবি ভাতজল।যা এহন এট্টু দুধের চাঁছি খাইয়া ল মুড়ি বাতাসা দিয়্যা রান্ধনঘরে আসে,কিস্যু হইব না, তাপর বিকালে ঠাকুর আসব মহাভারতগান শোনাইতে হেইয়্যা শুইন্যা যাবি,আমি তর মায়রে খবর পাঠাইয়া দিতাসি নিমাইরে দিয়্যা...
ঠাকুমা বুড়ির কথা অমান্য করি এমন বুকের ভিতর শক্ত কাঁঠাল কাঠের পাটা আমার নেই।তাই খানিক তফাতে বসে চেয়ে দেখলাম পুকুরের ঠাণ্ডা জল।জলের মধ্যে কেমন করে তেচোখো মাছেরা এসে খেলা করছে।ইতিমধ্যে খাওয়া সেরে ফেলেছি।মুড়ি বাতাসা দুধ।এখনো অবধি বমির ভাবটা আসেনি।মনে হয়নি পেটের ভিতরে বালি কিচকিচ করছে।খাওয়ার অনেক সময় পর ঠান্ডা জল খেয়ে একটু শুকনো করা আমলকী চিবিয়ে শরতের নীল রোদে ভরে থাকা জলমাটিঘাসে হাঁটছি।ঠাকুমা ওদিকে যোগাড় করছে কাটাফল,গঙ্গাজল এইসব।গাছপালা ঘেরা মাটির তুলসীমঞ্চ লেপছে।
আমার ঘুরে বেড়াতে খুব ভালো লাগছে।ছোট বয়েসেও এখানেই ঘুরে ঘুরে কেটেছে।কতো কতো মাটির ঠাকুর গড়ে খেলা করেছি পাড়ার বন্ধুরা।ওই পুকুরের পাড়টাতেই তো একবার গেদু আমি দুজনে বসেছিলাম বর্ষার বিকেলে ঘন্টাতিনেক মাছ শিকারের জন্য। সে মাছ ডিমে ভরা পোয়াতি ছিল বলে গেদু আর ট্যাঁটা ছুঁড়ল না।আমরা খালিহাতে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।
সেই গেদু কেরালায় কাজে চলে গেল সাবান কারখানায়।তারপর ওকে রাস্তায় ট্রাক পিষে দিল পেট ফাটা ঢোঁড়া সাপের মতো।এই তো সেদিনকার কথা মনে হয়! শেষবার যখন ও এল তখন আমার জন্য পেঁপে গন্ধের সাবান এনে দিয়েছিল।
কোথায় যে ডুবে গেল সেইসব দিন।কোথায় যে ডোবে।ওই যে দূরে দত্তদের বাড়ির ছাদ রোদ লেগে ঝকঝক করছে। ওরাও আর থাকে না।চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে।পোষা বেড়ালটা ঘুরে ঘরে কাঁদে এখনো দিনভর।
বয়স বাড়ার সাথে বেলা কেমন ঝিম মেরে আসে। কতো কতো বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় কোথায় যে হারায়! শত শত মাটি খুঁড়ে ফেললেও, মহাকাশে গিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে এলেও আর পাওয়া যায় না তাদের।এই স্বাভাবিক সত্যি হঠাৎ উপলব্ধি করে মনের ভিতর ছায়া পড়ছিল।
হঠাৎ দেখি কচুবনের পাশে একটি সজারুর কাঁটা ঝরে আছে।রাতেরবেলা কচুগাছের কাছে ঝমঝম শব্দে করে আসে সজারু তারপর গোঁড়া খুঁড়ে দিয়ে সব নষ্ট করে চলে যায়।
একটি কাঁটা দুপুরবেলার বুকে গেঁথে আছে এখন, আর সারি সারি লাল পিঁপড়ে কাঁটাটাকে ঘিরে পিলপিল করছে।বেলা একটু একটু করে ঢলতে শুরু করেছে বৈকালের দিকে।
আমি নির্জন টালিভাঁটা মাঠ পেরিয়ে এগোতে থাকি।অল্প অল্প করে কাশফুল ফুটছে। কুকুর ডাকছে দূরে।তাড়াতাড়ি পা চালাই আমি।এতক্ষণে বোধহয় ঠাকুর চলে এসেছেন ঝোলা কাঁধে করে।
কথক ঠাকুর মানুষটি অদ্ভূত গোছের।সারা সকাল দুপুর বাড়িতে বসে সবজির গাছ লাগায়, বীজ বোনে,জল দেয়।লাউয়ের মাঁচা বাইয়ে দেয়,পুঁইলতার পাশে ছোট্ট লাঠি দিয়ে দেয়।সন্তানস্নেহে সকলকে আদর করে।পাতা থেকে ছোট ছোট পোকা বেছে দেয়।
আর বিকেলের দিকে ঠাকুরমশাই সুর করে করে পাড়ার কাকিমা,জেঠিমা,দাদু,ঠাকুমা,দিদিমা সকলকে রামায়ণ,মহাভারত, গীতা পড়ে পড়ে শোনায়।দু ভাঁজ করা একটা কাঠের উপর বইখানা স্থাপন করা থাকে।রামায়ণ মহাভারতের পাশে আমি একদিন স্পষ্ট দেখেছিলাম রবীন্দ্রনাথের ' সঞ্চয়িতা ' বই রাখা।' সঞ্চয়িতা ' থেকে 'কর্ণকুন্তি সংবাদ 'পড়ে শোনানো হয়।আমি দেখেছি, ওই দরদভরা পাঠ শুনে পাড়ার মহিলাদের চোখ ভেসে যেতে চোখের জলে।
ঠাকুমার উঠোনে পা দেওয়ার আগেই দেখি একটা সুর আমার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আমি দেখতে পাই - ঠাকুরের কোলের কাছে কাশীদাসী মহাভারত রাখা।প্রায় সূর্যাস্তের আলো এসে উঠোনে তেরছাভাবে পড়েছে গোয়ালঘরের দেওয়ালে।উঠোনের তুলসীমঞ্চের কাছে পাঠ চলছে।একটা ছোট্ট তামার রেকাবিতে জল বাতাসা আর একটু পায়েস রাখা।পাশে একটা পেতলের বালতির মুখ কলাপাতায় ঢেকে রাখা।
ঠাকুমা আমায় হাতের ইশারায় বসতে বলল।এই পাঠ চলার সময় কথাবলা বারণ।পাঠ শুনতে শুনতে বুঝতে পারলাম,আজ যুধিষ্ঠির রাজা হচ্ছেন।এ পাড়া ও পাড়া থেকে আসা জনাকয়েক
মানুষ চুপ করে বসে আছে,এরা সকলেই বিড়ি বাঁধে।কুলোর ভিতর পাতা, দোক্তা নিয়ে বিড়ি মোড়ায়।আর বিকেলের দিকে সকলে একসাথে বসে গল্পো করে।আজ এখন সবাই কথক ঠাকুরের পাঠ শুনছে।
মহাভারত পড়া শেষ হল। আকাশে অল্প অল্প সন্ধেবেলার চাঁদ উঠব উঠব করছে।ঠাকুমা দাওয়া থেকে নেমে এসে কলাপাতার ঢাকা খুলল বালতি থেকে, তারপর বই পড়া শুনতে আসা সবার হাতে হাতে ছেঁড়া কলাপাতা দিয়ে একটি করে রসগোল্লা দেওয়া হল।সবাই মিষ্টি জল খেয়ে ফিরতে লাগল বাড়ির পথে।মাথার উপর মশার ঝাঁক উঠে গেছে।গোরুদের পায়ে মশা লাগছে সাঁঝাল দেওয়া প্রয়োজন।
এর আগে প্রতিবার কথকতার জন্য জল বাতাসা খাওয়ানো হয়েছে। এবারে তাহলে রসগোল্লা দেওয়া হল কেন?
মিষ্টির শরীর অল্প অল্প করে ভাঙতে ভাঙতে আমি জিগগেস করলাম চেঁচিয়ে- ঠাকুমা,আজ হঠাৎ মিষ্টি যে! কী ব্যাপার?
বাতাসের ভিতর দিয়ে এ প্রশ্ন বুড়ির কাছে পৌঁছনোর আগে লুফে নিল কথক ঠাকুর। সে চোখের তারায় হাসতে হাসতে থেমে থেমে মৃদুস্বরে বলল - আজ তো যুধিষ্ঠির রাজা হলেন সেই আনন্দেই সবার জন্য মিষ্টিমুখের আয়োজন।
কবেকার মহাকাব্যের জন্য এই পাড়াগাঁয়ে কতোগুলো সাধারণ মানুষের মায়াবাসনা দেখে আমার মাথা আবার ঝিমঝিম করে উঠল।হস্তিনাপুরে যুদ্ধশেষের হাওয়ায় নীল নীল হয়ে উঠল আজকের সন্ধ্যার গাছপালা।আমি কাউকে কিছু না বলে প্রায় ছুটে দ্রুত বেরিয়ে বুড়িঠাকুমার কচাগাছ দিয়ে ঘেরা বেড়ার বাইরে। রসগোল্লার রস লেগে থাকা কলাপাতাটা ছুঁড়ে দিলাম লেবুবনের অন্ধকারে।
(৩)
আমাদের পাড়ার সবচেয়ে পুরোনো সমাজবাটী প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখা যাবে আর পনেরো মিনিট হাঁটপথের পথের পরে।সেখানেই আলো আছে,তার আগে সমস্ত পথঘাট নিঝঝুম অন্ধকার।আমার মাথার ভিতরেও আলো অন্ধকারের অতীত কোনো মাছ ঘুরে ঘুরে ঘাই মেরে বেড়াচ্ছে। ওই তো সাম্যদের পুকুরের জলের মাঝখানটাতে বাতাসের গোঙানির শব্দ আসছে।অনেকদিনের পুরোনো পুকুরে এসব হয় শুনেছি।কিন্তু আমার মন আর কোনোদিকে নেই আজ। মন সম্পূর্ণ অধিকার করে নিয়েছে ছায়া ছায়া মানুষজনের দল।তাদের মুখ ঢাকা।কিন্তু তাদের আত্মার গন্ধ মহাসময় পার করে আজও সাধরণ মানুষের বুক ভরিয়ে রাখছে।
একটু দূরে কবরখানা, সেখানে কতো কতো দিনের প্রাণ হাড়মাটি হয়ে আছে।আমি কবরখানা বাঁচিয়ে বেশ খানিকটা তফাত করে পেচ্ছাপ করতে বসি।
এরপর হাঁটতে শুরু করলেই আমার মাথার ভিতর সন্ধেবেলার তারা ফোটার মতো ফুটে উঠতে লাগল আমার মতোই মাথাখারাপ কতো কতো হারিয়ে যাওয়া,ডুবে যাওয়া নারীপুরুষ।
দুলাল মামার গোমস্তার চাকরি ছিল।সে ঘোড়ায় চেপে ঘুরে ঘুরে বেড়াত বনজঙ্গল।মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা। শেষ বয়সে বুড়োহাড়ে তাকে ছাতার ব্যবসা করতে হত মাটিয়ারীর বাজারে।সে তো একলা লোক, নিজের হাত পুড়িয়ে খেত হত দুবেলা।একবেলা চিনেমুড়িজলেই পেট ভরাতে হত।
যেদিন খুব অসুখ হত মামার, বিছানায় চিঁ চিঁ করে ডাকত।তখন শুয়ে শুয়ে বিশ্বাস করত মামা, দ্রৌপদী এসে জল গড়িয়ে দেবে, রান্না করে দেব,অমৃত সমান রান্না।
এসব তালগোল ভাবনার জট যখন বুড়োকে ঘিরে ফেলত, তখন হয়তো পাড়ার কোনো মেয়ে এসে দুটো ভাত, একটু সুজি বা মুড়িজল দিয়ে গেলে মামা ওকেই ভাবত অনাথবউ।
দুলাল মামা মারা যাওয়ার আগে আমার প্রতি জন্মদিনে কিছু না কিছু দিত।একবার তলতলে নরম হাঁসের ডিম দিয়ছিল মনে আছে।
শেষবার আমাকে একটি গাঢ় আকাশি রঙের ছাতা দিয়ে যায়।ছাতা দিতে এসে বলে - আমি তো এত ভারি ব্যাগ টেনে আনতে পারছিলাম না।তাই ব্যাগের একটা দিক আমি ধরলাম অন্যদিক মা কুন্তি ধরে ধরে এনে দিল।
শোন, এই ছাতাখানা তোকে দিয়ে গেলাম।এটা দিয়ে দিনেরবেলা তোর গায়ে জল পড়বে না আর রাতেরবেলা ছাতা ফোটানোর সঙ্গে সঙ্গে আকাশের সমস্ত তারা তুই দেখতে পাবি ছাতার ভিতর দিয়েই।
ছোটবেলায় বুঝতে পারিনি, কিন্তু এখন বুঝতে পারি মামা শুধু ছাতা নয় তার সাথে সাথে আমাকে দিয়ে গিয়েছিল লাল নীল স্বপ্ন ভাবনার আদিবীজ।তাতেই আমার মাথাবুক দিবানিশি টইটুম্বুর হয়ে থাকে।
বাড়ি ফেরার পথে মনে হল মিষ্টি মিষ্টি সাপের গন্ধ পেতে লাগলাম।কোথাও কী তবে কোনো সাপ ডাকছে অন্য সাপকে।চারিদিক বনজ লতাপাতার গন্ধে ভরে আছে।
একটু দূরেই সরকারি প্রকল্পের মাটি কাটার কাজ চলেছে।অন্ধকার অন্ধকার কালো কালো মাটিগুলো ডাঁই হয়ে আছে।চারিদিক কেমন শান্ত ভিজে ভিজে সুদূর।
(৪)
বাড়ি ফিরতে দেখি মা কেমন শান্ত হয়ে আছে।
আমাকে দেখে বলল - আজ কি বমি হয়েছে?
আমি বললাম - না, বমি হয়নি।ভালোই ছিলাম সারাটা দিন।
- বেশ, রোদে রোদে টো টো করে ঘুরিস নি তো?
- না, না।ঠাকুমার বাড়িতেই বসেছিলাম।ওদের বাড়িতে আজ কথকদাদু এল।মিষ্টি খেলাম।
- মিষ্টি খেলি! তোর তো গা গোলায়!
- অসুবিধা হল না আজ, ঠাকুমা মন্ত্র পড়ে দিল আজ ফুঁ দিয়ে দিয়ে।
- এত চানজল, ডাক্তার বদ্যিতে কিছু হোলো না, দেখা যাক বুড়ির ফুঁ'তে কিছু হয় নাকি! শুনেছি ওর মন্ত্রে কাজ দেয়...রাতের খাবার ঢাকা দেওয়া আছে,খেয়ে নে গা। আর শোন...
- বলো।
- না খেয়ে মোষের মতো বসে বসে ঘুমের ভিতর বিড়বিড় করে আবোলতাবোল বকবি না...
আর তোকে বলা হয়নি,তোর বাবার শরীরটা খারাপ করেছে খবর এসেছে,মাথা ঘুরে গিয়েছিল দুদিন আগে,পায়ে চোট পেয়েছে,বাড়ি চলে আসবে সে...
মা বারান্দা থেকে ধীরে ধীরে উঠে ছোট্ট টর্চটা নিল তারপর বাগানের দিকে যেতে লাগল।
- মা,তুমি এত রাতে বাগানে যাচ্ছ কেন?
- দুটো তুলসীপাতা তুলব ।
- রাতে পাতা তুলতে নেই তুমি যে বলো।
- তোর কাকার কাশিটা খুব বেড়েছে। ঘঙঘঙ করে কাশছে।পাতা তুলব না।গোড়া থেকে কুড়িয়ে আনব।একটু ফুটিয়ে মধু দিয়ে খাইয়ে দিলেই সেরে যাবে। তুই যা এখন শুয়ে পড়।
আমি রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বুঝতে পারলাম, মা এখন কিছুতেই পাতা ছিঁড়বে না,তুলসীতলায় ঝরে থাকা হলদেটে পাতা কুড়িয়ে নেবে।চাঁদের আলোয় খনি মজুরের মতো খাটা মায়ের মুখ করুণ দেখাবে।যেন অনেক জ্বরের পর কলার পাতায় মাথা রেখে জল থাবড়ে থাবড়ে মায়ের মাথা ধুইয়ে দেওয়া হয়েছে।
মা পাতা না তুললেও গাছের গোড়ায় উবু হয়ে বসে বসে বলবে,
" ডালে কৃষ্ণ, পাতায় হরি
সরে যাও কৃষ্ণ তুলসী তুলি "
আমি রান্নাঘরে বসে কিছুই খেতে পারব না।মনে পড়বে বেদের সময়ে মানুষ কীভাবে গাছপালার কাছে পরম মমতায় ভালোবেসে বসে থেকেছে।মাটিগাছজলের দান গ্রহণ করে ভরে উঠেছে ভিতরে ভিতরে।আজ চারিদিক বিষিয়ে গেলেও সেই উত্তরাধিকার রক্তের ভিতর বহন করেছি।
ঠাকুমার যেদিন অন্যগ্রামে যাওয়া থাকে মন্ত্র পড়ে অসুস্থ লোককে সারানোর জন্য। সেদিন তো তাকে ভোর ভোর উঠে নেয়ে ধুতে নিতে হয়।আগে গোরুর গাড়ি আসত, এখন আসে টুকটুকি গাড়ি বা ছই খাটানো ভ্যান।ঠাকুমাও তো ভোরে উঠোন লেপার সময় বলে -
" জল শুদ্ধ, স্থল শুদ্ধ
শুদ্ধ তামার ঘটি
আড়াই হাত নিকিয়ে দিলাম উঠানের মাটি। "
ঠাকুমা এটিও শিখেছে ভুঁইমালী বউয়ের কাছে।আমাকে গল্পো করেছিল।
খাবার না খেতে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে যেতে গিয়ে দেখি কাকা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। বাবার শরীর খারাপ,ফিরে আসবে বলেছে।তাহলে সংসার চলবে কী করে?
এসব বিষয় না ভেবে আমার মাথায় নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছে গাছপালা, বনবাদাড়ের মায়া,ভালোবাসার সুতো।যত রাজ্যের সাপ ব্যাং,সমস্ত লাল নীল আলোর এই বুদবুদ আমাকে তাড়িয়ে একজন সুস্থ, বাস্তববোধযুক্ত, স্বাভাবিক মানুষ হতেই হবে।মেরে ফেলতে হবে এই মহিষের মতো দেহমন।
মা ঠিকই বলে,আমি একটা মোষ, ঘুমের অলস জলেপাঁকে ডুবে বসে থাকি।হোমেও লাগি না, যজ্ঞেও না।অসুখে ভুগে ভুগে বসে থাকি।মাথার শিঙের ভিতরে ঘিয়ের মতো চর্বি পেকে ওঠে,পোকা নড়ে ওঠে,আর বেজে ওঠে স্বপ্নের শিঙা। আমি লাল নীল হলুদ সবুজ দৃশ্যের জন্ম দেখি।
আজ ঘুমের ভিতর দেখতে পাচ্ছি, উপেন কাকার সারা গায়ে যেমন ঘামাচি হয় তেমন শিউলিফুল ফুটেছে সারা গা জুড়ে।মন্ত্র দেওয়া ঠাকুমার বাড়ি গুড়িয়ে সেখানে হনুমান মন্দির হচ্ছে। পতপত করে উড়ছে পতাকা।
আমি আরো রোগা হয়ে গেছি আরো,পুজোয় নতুন জামা ঢলঢলে হয়ে গেছে।ক্রাচে ভর দিয়ে দিয়ে হাঁটছি।মা বাবা আর একজন বন্ধু আমাকে ধরে ধরে নিয়ে গেছে দত্তদের দুর্গা দালানে।সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছে বাইশ বছরের রুগ্ন যুবককে,যার চোখ দুটো ধকধক করছে।
কোনো কারণ ছাড়াই আমার মনে পড়ছে শৈশবে বনশালের ছাল দিয়ে খেজুরপাতা খেয়ে পানের পিকের মতো জিভ রঙ করার ঘটনাটি।দূরে একটি পানের দোকান দাঁড়িয়ে আছে।আগুনজ্বলা পান খাচ্ছে ছেলেমেয়ের দল।
আমি একটি সাধারণ পান ভিক্ষা করছি মায়ের কাছে।কারণ, আমার মুখের ভিতর খুলে গেছে রক্তের কল।বগবগ করে শব্দ হচ্ছে। পানটা খেলে ওই পিকের রঙ দিয়ে চাপা দিতে পারব রক্তস্রোত।পান খেয়ে থুতু ফেলছি এটি দেখিয়ে চাপা দিতে পারব অসুখ।আমার অসুস্থতা কেন ম্লান করে দেবে ওদের উৎসব!
একটু ঠাণ্ডা মাটির কোলে, মাটির বৃন্তে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতে পারলে ভালো হত।চাপ ধরা বুক আর রক্তভাসা মুখ শান্তি পেত।নিজেকে মনে হচ্ছে দশমহাবিদ্যার ছিন্নমস্তা। রক্তপানের স্বাদে মুখ নোনতা। বমিতে ভেসে উঠছে বুক।
আমার কষ্ট বুঝতে পেরে দুর্গা প্রতিমার পায়ের নীচে মরে থাকা মাটির মোষের চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে।
(৫)
আজ মহালয়া। ভোরের নরম আলো দুধের মতো ছেয়ে আছে আকাশে।ছোটবেলা থেকে আজকের দিনে মনটা অন্যরকম হয়ে থাকে প্রতিবার।সকাল থেকেই কেমন এক অন্যরকমের হাওয়া বয়।আজ বাবার শরীরটা ভালো আছে অনেকটা।কাজ থেকে ফিরে আসার পর বাবা বেশ কয়েকদিন থম মেরে বসে ছিল।এখন একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়েছে। পাতলা একটা চাদর জড়িয়ে বারান্দার কাঠের চেয়ারে বসে আছে।মা রান্নাঘরে চায়ের জল চাপিয়েছে।কাকা এই ভোরে যথারীতি শেফালি গাছের গোড়ায়।
আমাদের রেডিওর ব্যাটারি ফুরিয়ে গিয়েছিল।গত পরশুই নতুন কেনা হয়েছে ব্যাটারি।গমগম করে বাজছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠস্বর।মধুপান করতে করতে দেবী এবার শূলে বিদ্ধ করছেন মহিষাসুরকে।
চোখে জল চলে আসে। ভিতর অবধি চোখের জলে ধুয়ে যাচ্ছে। কতোদিন আগে থেকে এই অনুষ্ঠান চলে আসছে, তবু শুনলে নাড়িতে টান লাগে।
হঠাৎ কাঠের দরমার শব্দ হতে দেখি ঠাকুমা এসেছে।হাতে ধরা লতাপাতা।সমস্ত সকালবেলার আলোয় জ্বলজ্বল করছে সাদা থান।আমাকে বলে -
- চন্দ্রাবলীরে আবার ভুলছ কানাই।খাইতে টাইতে পারতাসো তো?
কানুর বাপের লাইগ্যা হাড়মচকা লতা আনছি এইয়্যা থ্যাঁতলাই্যা বাইন্ধা দিলে দুদিনে সব ঠিক হইয়্যা যাইব।
- তোমাকে ভুলব কী করে ঠাকুমা।দাও লতাগুলো আমার হাতে দাও।উপরে উঠে এসো।বসো চেয়ারে।
- কানু গো উপরে বসতে পারি না কিসুতেই।
মা সঙ্গে সঙ্গে আসন এনে দিল।বাবার শরীরের কুশল জিগ্যেস করে ঠাকুমা বলল,বৌ একখান পিদিম আর ধূপকাঠি ধরাই দাও।আজ উমা মা আইলেন...
বুড়ি একথা বলে সাদা থান ঘোমটার মতো করে রেডিওর সামনে লুটিয়ে প্রণাম করল। যেন গজে নয়,নৌকায় নয়,হাতি নয় ; ওই বেতারের তরঙ্গ বেয়ে বেয়ে উমার পদধ্বনি ভেসে আসছে।
বাংলার বুকে শরতের ভোরে যখন এই ঘটনা ঘটেছে, তখন ষষ্ঠী কাকা যে মাটির দুর্গা প্রতিমা গড়ছে,তার পায়ের নীচের রঙ না করা মাটির মোষের চোখ একটু বেঁকে আসছে,কেন যে চোখ ভরে জল আসছে...


1 মন্তব্যসমূহ
মুগ্ধ হলাম
উত্তরমুছুনরঞ্জনা ব্যানার্জী