দেবর্ষি সারগীর গল্প : শব্দ, নৈঃশব্দ্য



বৃষ্টি আবার থামল, হয়ত একটু পরে আবার শুরু হবে বলেই। একটা আদিম ভোর, যার স্তব্ধতা ভাঙছে শুধু গাছের পাতায় পড়তে থাকা হীরের দানার মতো বৃষ্টির ফোঁটা। ওই ফোঁটা শোভা বাড়িয়েছে মণিমুক্তোখচিত রাজার মাথার মুকুটেরও। নিজের মাথাটা দুপাশে একটু দোলাল রাজা এবং উজ্জ্বল ফোঁটাগুলো ছিটকে নিচে পড়তে লাগল। রাজার দেখাদেখি রাজার সঙ্গীরাও দুপাশে মাথা ঝাঁকাল। ওদের মাথায় অবশ্য মুকুট নেই। ঘোড়াগুলোও, যাদের পিঠে ওরা সবাই বসে এবং যারা মাথা নামিয়ে জলে ভেজা ঘাসপাতা চিবোচ্ছে, ঘাড়ের চুল থেকে মাঝেমাঝে জল ঝরাচ্ছিল। ভোর হয়ে গেলেও চারদিকে অস্পষ্ট অন্ধকার, কারণ বৃষ্টি ও মেঘ আলোর মুখ ঢেকে রেখেছে। ঘন অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে তৃণভূমি। কিন্তু কোথাও পাহাড় নেই। একটা জলাশয়ের ধারে একটা সারস নিখুঁত প্রতিবিম্ব রচনা করে বিষণ্ণভাবে দাঁড়িয়ে। রাজার একজন সঙ্গীর মনে হল সারসটাকে মারতে হলে এর প্রতিবিম্বটাকে তীরবিদ্ধ করলেও চলবে। বৃষ্টি থেমেছে দেখে দূরের একটা পাতাহীন গাছ থেকে একটা চিতার বাচ্চা সন্তর্পণে নিচে নেমে এল। রাজার লোকেরা ওকে দেখতে পায়নি। পশ্চিমদিকের একটা শূন্য ও বিস্তৃত জমির রঙটা আশ্চর্য বাদামি এবং ওটার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে কালচে নীল নদী। জায়গাটায় এখনও অন্ধকার, আর ওখানে নিঃশব্দে উড়ে চলেছে হাজার হাজার সাদা বক। প্রেক্ষাপটের অন্ধকার ও বাদামি মাটির জন্য বকগুলোকে বেশি সাদা দেখাচ্ছিল। ওদের দিকে তাকাতে তাকাতে রাজার মনে হল সে যেন এখনও ঘুমিয়ে আছে। এবং স্বপ্ন দেখছে। বিষন্ন লাগছিল রাজার। সেটা হয়ত বৃষ্টির জন্য । কিংবা যাদের জন্য আসা তাদের কাউকে এখনও দেখা গেল না বলে। কিংবা রাজার স্বভাবটাই এরকম যে অধিকাংশ মুহূর্তে বিষাদে আচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসে।

আবার বৃষ্টি শুরু হল, হঠাৎ মুষলধারে, এবং রাজার সঙ্গীরা বিরক্ত, তোষামোদি ও নিষ্ঠুর মুখগুলো একসঙ্গে তুলে তাকাল রাজার দিকে। নির্দেশের অপেক্ষায়। কিন্তু রাজা কোনও নির্দেশ দিল না, এমনকি কোনও গাছতলায় দাঁড়াবারও। ফলে সবাই বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল । চোখ তুলে রাজা আবার ওই বাদামি জমি ও বকগুলোর দিকে তাকাবার চেষ্টা করল। বৃষ্টির ধূসর আবরণের ওপাশে কয়েকটুকরো উড়ন্ত সাদা রঙ ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না। হঠাৎ, এই তুমুল ও অস্বচ্ছ বৃষ্টির ভেতর, সবাই দেখে যে একদল মানুষ ঘন গাছপালার ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে। সবাই সতর্ক হয়ে ওঠে। রাজার বিষণ্ণ মুখে ফুটে ওঠে আশ্চর্য তৃপ্তি। এতক্ষণে রাজার মন ভাল হল, কারণ এই মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা করবে বলেই সে সঙ্গীদের নিয়ে গত দু-দিন ধরে সূর্যহীন ভোর থেকে শুরু করে কালো অমাবস্যার রাত পর্যন্ত অসীম অরণ্যটায় অপেক্ষা করছে।

বৃষ্টির আবরণের জন্য লোকগুলোকে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কুয়াশা মাখা আলোয় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একবার ওদের মাথা ও শরীর ভেসে উঠছে, তারপর গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ভাসতে ভাসতে ওরা এগিয়ে এল রাজার কাছে এবং সামনে এতগুলো অশ্বারোহী মানুষকে দেখে থমকে দাঁড়াল। ওদের একজন, যার বয়স অন্যদের তুলনায় কম, জীবনে প্রথম ঘোড়া দেখে। ফলে বিস্মিত চোখে সে সাদা ও বাদামি ঘোড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। এবং রাজাকে তো ওরা সকলেই এই প্রথম দেখছে। ফলে রাজার গাম্ভীর্য এবং পোশাক ও মুকুটের সৌন্দর্যের দিকে বাকিরা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রাজাও ওদের দিকে। মানুষগুলোর প্রত্যেকের পরনে একটা সাদা কাপড়, যা বৃষ্টিতে ভিজে লেপটে গিয়েছে ওদের রোগা শরীরের সঙ্গে। প্রত্যেকের মাথায় ঘন লম্বা চুল, কয়েকজনের মুখে জলে ভেজা ভারি দাড়িও। যা উল্লেখযোগ্য সেটা হল ওদের চোখ। এবং একটু ফাঁক করা পুরু ঠোঁট। এই চোখ ও ঠোঁট থেকে ওদের শৈশবের সারল্য ও মুগ্ধতা যেন এখনও কাটেনি। একজন ছাড়া সবাই পূর্ণবয়স্ক যুবক।

'আমি রাজা। এবং আমার রাজত্বে এই মুহুর্তে পূর্ণ শান্তি বিরাজ করছে।'

রাজা মানুষগুলোর উদ্দেশে বলে। বৃষ্টিতে উন্মাদ হয়ে চিতার বাচ্চাটা একটু দুরের একটা গাছে চড়তে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়। রাজার সঙ্গীরা এবার দেখে ফেলে ওকে, তারপর মুখ দিয়ে বিচিত্র শব্দ তোলে। একজন ধনুকে তীর বাধিয়ে চিতাটার দিকে একটা তীরও ছোঁড়ে। কিন্তু তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ঠ হয়।

‘এবং রাজ্যে পূর্ণ শান্তি বিরাজ করলে রাজার মন অশান্ত হয়ে ওঠে,' রাজা বলল। 'সেটা কেন জানো? তখন অলস রাজার ভেতর ঢোকে জ্ঞানের পিপাসা, যা সহজে মেটে না। আমি শুনেছি তোমরা ঈশ্বরকে দেখেছ। আমি দেখিনি। কখনও দেখব বলে আশাও করি না। তাই তোমরা কি অনুগ্রহ করে ঈশ্বরের একটু বর্ণনা দেবে আমার কাছে?'

বৃষ্টি একটু কমল, তারপর থেমে গেল, হয়ত একটু পরে আবার মুষলধারে পড়ার জন্য বিশ্রাম নিচ্ছে। রাজার মুকুটে আবার হীরের ফোঁটা, যা মাঝেমাঝে মাথা ঝাঁকিয়ে দুপাশে ছিটিয়ে চলেছে সে। ওর দেখাদেখি মাথা ঝাঁকাচ্ছে মুকুটহীন সঙ্গীরাও। লাগামে শক্ত টান থাকার ফলে ঘোড়ারা অবশ্য ঘাস খাওয়ার জন্য আর একটুও মাথা নামাতে পারছিল না।

“তবে একটা শর্ত আছে, যা আরোপ না করলে তোমাদের সততা এবং আমার রাজকীয় মর্যাদা দুটোকেই অবমাননা করা হয়,' রাজা বলল। ‘শর্তটা এই যে বর্ণনাটা যথাযথ না হলে বর্ণনাকারীকে শাস্তি পেতে হবে। বিষয়টা যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ, তাই শাস্তিটাও লঘু হলে চলবে না। ওটা অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই স্থির হবে। এখন তোমাদের ভেতর থেকে কেউ একজন প্রথম বর্ণনাটা শুরু করতে পারো।'

এরকম অনুরোধ বা নির্দেশ মানুষগুলো এর আগে কখনও পায়নি। ওরা সবাই মনে মনে ওদের পরিচিত সমস্ত শব্দের ভেতর ভেসে বেড়াতে লাগল । এবং ওদের মনে হল সব শব্দই বা যে-কোনও একটা শব্দই ঈশ্বরের বর্ণনা দিতে সক্ষম। কারণ প্রতিটি শব্দই বিশ্বের কোনও না কোনও বস্তু বা অনুভব বা ক্রিয়ার প্রতীক। এবং বিশ্ব ঈশ্বরের প্রতীক। ফলে রাজার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য যে-কোনও একটা শব্দ উচ্চারণ করলেই যথেষ্ট। বিশ্ব রাজা কি সেটা মানতে রাজি হবে? ‘ঘোড়া' বললে রাজা শব্দটাকে ঈশ্বরেরই একটা বর্ণনা বলে মানতে কি রাজি হবে? তাছাড়া, ওরা জেনেছে ঈশ্বর যেমন বিশ্বে আছেন তেমনি বিশ্বের বাইরেও আছেন। এবং বিশ্বের বাইরের ঈশ্বরকে জানাই তাঁকে পূর্ণরূপে জানা। কিন্তু বিশ্বের শব্দ দিয়ে তাঁকে কীভাবে বর্ণনা করা সম্ভব যিনি বিশ্বাতীত? মানুষগুলো কখনও চিন্তিত, কখনও অমোদিত মুখে তাকাতে লাগল রাজার দিকে, বৃষ্টি আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল, এবং প্রায় সমস্বরে ওরা বলতে বাধ্য হল, মহারাজ, ‘আমরা ঈশ্বরকে দেখিনি। আমরা শুধু তাঁকে একটু জেনেছি।'

‘শব্দের ব্যবহারে তোমাদের সূক্ষ্ম জ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করেছে,' রাজা হেসে বলল। আমি আশা করছি ভাষার ওরকম গভীর জ্ঞানের সাহায্যেই তোমরা আমাকে একটু জানাবে তোমরা কী জেনেছ।

ওরা যা জেনেছে সেটা যে কিছুতেই শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না সেটা ওরা জানে। এরকম অসহায়তা থেকে অনেক সময় মুক্তি দেয় উপমা। কিন্তু রাজা হয়ত উপমাকে মেনে নিতে রাজি হবে না, কারণ এটা সত্যি যে উপমা মূল বিষয়কে এড়িয়ে অন্য অনেক কিছু সম্পর্কে অনেক বর্ণনা দেয়। শেষপর্যন্ত চুপ করে থাকাটাই ওরা সবচেয়ে ঠিক মনে করে চুপ করে থাকল।

'বর্ণনা দেওয়া যাবে না, মহারাজ।’ হঠাৎ বলে ওঠে মানুষগুলোর ভেতর যার বয়স সবচেয়ে কম সেই ছেলেটা। ওর মুখে গোঁফ ও দাড়ির কোমল রেখা । সে যে আচমকা কথা বলে উঠবে অন্যেরা ভাবেনি। সবাই শঙ্কিত হল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। অনেক দূরে একটা বাজও পড়ল ।

‘সেটা তো তোমার ব্যর্থতা, বালক!” রাজা বলল, ঘোড়াকে ছেলেটার কাছে একটু এগিয়ে নিয়ে গিয়ে। ‘এবং এটা জেনে যাও যে কোনও কোনও ব্যর্থতার শাস্তি মৃত্যুই ।

সূর্যের আলো না থাকা সত্ত্বেও রাজার তরোয়ালটা হঠাৎ ঝলসে উঠল শূন্যে। তারপর ওটা নিমেষে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিল ছেলেটাকে, ভাষার দারিদ্র যাকে আগেই অনেক স্তব্ধ করে রেখেছিল। বৃষ্টির জলে লাল রক্তটা ফিকে হতে হতে এক সময় জলের রঙ ধারণ করে অদৃশ্যভাবে বইতে লাগল ।

'এবার তুমি চেষ্টা করতে পারো’, মানুষগুলোর ভেতর থেকে একজনের দিকে তাকিয়ে রাজা বলল। ‘কারণ, ওর চেয়ে তোমার বয়স বেশি । আর আমার অনুমান করার ক্ষমতা যদি বিশেষ দুর্বল না হয় তাহলে বলব তোমার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানও বেশি।'

মানুষটি রাজার চোখের ভেতর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, ‘তার আগে মহারাজ আমার একটা অনুরোধ আপনি রাখুন।'

আদেশ শুনে এক মুহূর্তের জন্য একটু অবাক হল রাজা, ওর ক্রুদ্ধ সঙ্গীরা থতমত খেল, তারপর অবাক হয়ে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, লোকটাকে হত্যা করতে রাজা এখনও দেরি করছে দেখে। কিন্তু রাজা রাগ করল না। জ্ঞানের পিপাসা ওকে এতই বিচলিত করে রেখেছিল যে প্রয়োজনে একটু বিনয়ী হতেও ওর আপত্তি ছিল না।

'অনুরোধ নয়,' রাজা বলল। 'তুমি জ্ঞানী। অন্তত অন্যরকম প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমি সেটাই বিশ্বাস করি। তাই রাজাকে তুমি হুকুমও করতে পারো।'

‘ছেলেটাকে হত্যা করার সময় আপনার ভেতরে যে অভিজ্ঞতাটা এক মুহূর্তের জন্য জন্ম নিয়েছিল সেটার নিখুঁত বর্ণনা একটু শুনতে আগ্রহী আমি।'

প্রস্তাবটায় রাজা একটু চমকে উঠলেও উত্তর দিতে উৎসাহিত বোধ করল।

‘ওকে মারতে আমার ভাল লাগছিল, কারণ ওর ওপর আমি সত্যি খুব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলাম,' রাজা বলল ।

‘এ কথায় বেশি কিছু বোঝানো গেল না। কারণ আরও অনেক কিছু করতে আপনার ভাল লাগে, যাদের সঙ্গে এই ভাললাগাটার তফাত আছে।'

‘ওকে মেরে আমার ক্রোধ শান্ত হয়’, রাজা বলল।

'ক্রোধও নানাভাবে শান্ত হয়। তাছাড়া, আজকের ক্রোধটা ঠিক কেমন ছিল ?'

নিজেকে হঠাৎ বাঘ মনে হচ্ছিল।’

‘দয়া করে উপমা ব্যবহার করবেন না, মহারাজ। বাঘ হওয়া যে ঠিক কী, কোনও মানুষই জানে না।

বিরক্তি বা ক্রোধের চেয়ে রাজার ভেতর অস্বস্তিটাই বেশি হচ্ছিল, কারণ ছেলেটাকে মারার সময় নিজের ভেতর ঠিক যে যে অভিজ্ঞতা, অনুভব ও প্রতিক্রিয়াগুলো ঘটে সেগুলোর অনেকটাই ভুলে গিয়েছে সে। এবং যা মনে আছে তাও যে ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারছে না সে সম্পর্কে সে সচেতন ছিল।

‘ওর মাথায় তরোয়ালের কোপটা মারার সময় মনে হয়েছিল ওর খুলিটা বেশ নরম,' উত্তেজিত হয়ে রাজা বলল। উত্তেজনাটা ছিল নিজেরই ওপর, নিজের অসহায়তার ওপর।

‘সেটা হয়ত সত্যি। কিন্তু তরোয়ালের স্পর্শে কারও খুলি নরম লাগলে ঠিক কেমন অনুভব জাগে মনের ভেতর?’

অসহায়, হতবুদ্ধি দৃষ্টিতে রাজা তাকিয়ে থাকে মানুষটির দিকে। মানুষটি চোখ নামায়, তারপর বেদনার্ত দৃষ্টিতে তাকায় মৃত ছেলেটার দিকে। বৃষ্টি আবার তুমুলভাবে শুরু হল।

'আমাকে একটু সময় দাও,' ক্ষিপ্ত স্বরে হঠাৎ বলে ওঠে রাজা। 'আমি তোমাকে দেব ওই অভিজ্ঞতাটার নিখুঁত বর্ণনা।’

ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে রাজা পেছন ফিরল, তারপর এগিয়ে যেতে লাগল অরণ্যের ভেতর। ওর মন অশান্ত, দিশেহারা। বর্ণনা দেওয়ার ব্যাপারে মানুষগুলোর ব্যর্থতার চেয়ে নিজের ব্যর্থতা অনেক বেশি অসহ্য লাগল ওর। নিজেকে খুব লজ্জিত ও অপমানিত লাগছিল।

এরপর হত্যা করার অভিজ্ঞতাকে নিখুঁতভাবে মনে গেঁথে নেওয়ার জন্য সে একের পর এক হত্যা করতে লাগল। প্রথমে আচমকা হত্যা করল চারজন সঙ্গীকে। একজন অবশ্য মারাত্মক আহত হয়ে গাছপালার ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর হত্যা করল ওদের ঘোড়াগুলোকে। বৃষ্টির বর্ণহীন ধূসরতার ভেতর মাঝেমাঝে ছিটকে ওঠা লাল রক্তগুলো জঙ্গলের মাটিতে এক ধরণের নৈসর্গিক বৈচিত্র্য রচনা করছিল। স্বপ্নগ্রস্ত মানুষের মতো করে রাজা এরপর হত্যা করল একটা সদ্যোজাত হরিণশিশু, একটা সজারু, দুটো ব্যাঙ, একটা সাপ, এবং কিছু কীটপতঙ্গকে যাদের গায়ে রক্ত নেই। প্রতিটি হত্যার পরই সে চোখ বুজে ফেলছিল, যাতে হত্যার দৃশ্য ও অনুভবগুলো মনের ভেতর অনুপুঙ্খভাবে গেঁথে যায়।

সন্ধের ঠিক আগে, যখন বৃষ্টি থেমে আকাশ ও চরাচর থমথম করছে, রক্ত ও কাদায় মাখামাখি হয়ে রাজা মানুষগুলোর সামনে এসে দাঁড়াল। ওর মাথায় মুকুটটা আর ছিল না। মৃত ছেলেটাকে সামনে রেখে মানুষগুলো তখনও দাঁড়িয়ে, কারণ ওরা জানত রাজা ফিরে আসবে।

কয়েক মুহূর্ত বিশ্রাম নিয়ে নিজেকে শান্ত করল রাজা। তারপর উজ্জ্বল হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল, 'এবার আমার অভিজ্ঞতার নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারব আমি।'

মানুষগুলো চুপ।

'কী হল? জানতে চাও না'? চিৎকার করে জিজেস করে রাজা ।

‘বলুন।'

বলা হয়ে থাকে রাজা এরপর হত্যার অনুভব ও অভিজ্ঞতার নিখুঁত বর্ণনা দিতে সত্যি সক্ষম হয়েছিল।

‘কিন্তু আমরা তবু বুঝতে পারছি না, মহারাজ,’ ওদের একজন রাজাকে বলল !

‘এবং কখনওই বুঝব না যদি না নিজের হাতে কখনও হত্যা করি।'

কথাগুলো বলে সাদা কাপড়ে মোড়া মানুষগুলো নিজেদের সরল, মুগ্ধ ও বেদনার্ত চাহনি নিয়ে অস্বচ্ছ ঢেউয়ের মতো ভাসতে ভাসতে অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রায়ান্ধকার বনভূমিতে একা দাঁড়িয়ে রাজা চিৎকার করে ওঠে, কোনও দুঃস্বপ্ন ভাঙার ঠিক আগের মুহূর্তে কেউ যেমন চিৎকার করে জেগে ওঠে। রাজার উন্মাদ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু হয়নি। কারণ অতল অন্ধকার গহ্বরে পড়ার হাত থেকে ওর চেতনাকে শেষপর্যন্ত ধরে রেখেছিল মানুষটির শেষ শব্দগুলো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. একেবারে অন্য রকম! উনার বই সম্পর্কে কেউ জানাবেন প্লিজ...

    উত্তরমুছুন
  2. এই ফর্মেই খুঁজে পাওয়া যাবে আন্তর্জাতিক গল্পের অন্তরাত্মাকে। লেখককের অনুশীলনকে স্যালুট। ছোটো ছোটো দার্শনিকতাকে সামগ্রিকতায় বাঁধতে গিয়ে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করেছেন। 🙏

    উত্তরমুছুন