শহরটিতে একদা নিজেদের বাড়ি ছিলো। সেই বাড়িটির অনেক বছরের অনেক স্মৃতি ট্রেনের জানালায় দূরে ফেলে আসা বয়সী বটের মতো অস্পষ্ট হয়ে গেছে।কিন্তু সব ছাপিয়ে শুধু একটা স্মৃতি মস্তিষ্কে স্পষ্ট ফটোগ্রাফের মতো বাধাই হয়ে আছে। একটা সন্ধ্যার স্মৃতি। সেই সন্ধ্যার রং ছিলো দত্ত পাড়ার সোহাগী বধূর লেপ্টে যাওয়া কুমকুমের মতো।আকাশময় সূর্যাস্তের রঙের আভা…।এ বাড়ি ও বাড়ি ছড়ানো ছিটানো ছেলে বুড়ো মা কাকীরা দিনের ব্যস্ততা ঝেড়ে ঘরমুখো হলে এরকম সন্ধ্যায় উঠানগুলো নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। বাড়ির চারপাশে আম,জাম,লিচু গাছের মাকড়সার জালের মতো ডালপালা জুড়ে তখন শুরু হয় নীড়ে ফেরা পাখ পাখালিদের তুমুল হল্লা।
দত্ত বাড়ির চারভিটার চার ঘরের টিনের বেড়ার বাঁশের পাল্লায় ঝুলানো হারিকেনগুলো প্রস্তুত হতে থাকে আসন্ন অন্ধকারের মুখোমুখি লড়বার জন্য। ঠিক তখনই তার হাফপ্যান্ট পরা মেজদা মাথায় হারমোনিয়াম নিয়ে মাঝ উঠানে দাঁড়িয়ে ডাকছে, মা, মা...।
মা তখন উনুনের সামনে কাঠখড়ির ধোঁয়ায় চোখের পানি-নাকের পানিতে নাস্তানাবুদ। ঘরভরতি কাচ্চাবাচ্চার রান্নার যোগাড়ে। সেই উনুন থেকে উঠে আসার আগেই দাদাজি মাগরিবের নামাজে যাবার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে মেজদার গালে লাগিয়েছেন কষে এক চড়। প্রচণ্ড চড়ের তোরে মাটিতে পড়ে সেদিন রাতে মেজদার কী প্রচণ্ড জ্বর! অথচ মেজদার হাত থেকে ছিটকে পরা হারমোনিয়ামটি ছিলো অক্ষত। মেজদা যখন জ্বরের ঘোরে বিছানায় শুয়ে ফুটবল খেলার মাঠে একের পর এক গোল দিচ্ছিল, হারমোনিয়ামটি তখন অসহায় অপরাধীর মতো পড়ে ছিল ঘরের কোণে সিন্দুকের উপর।
এই হারমোনিয়ামটি দিয়েই সেতারার গানে হাতেখড়ি। শিল্পী হিসাবে আজ যা নামডাক,তা এর জন্যই। বিশ বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িটিতে ছিলো সে।এর কতো শতো ঘটনাই তো মনে পড়তে পারতো। কিন্তু তার শুধু মনে পড়ে সেই একটি সন্ধ্যার কথা।
সেতারা শহরটিতে যাচ্ছে শুনে আহমাদ হাসে। অফিস থেকে ফিরে ফেসবুকে ঢুঁ মারতে মারতে লাল চায়ে চুমুক দেয় আহমাদ। যেনো হেঁয়ালির স্বরেই বলে, না গেলেই নয়?হ্যা হেঁয়ালিই বটে। আহমাদ কখনো সেতারাকে গানের ব্যাপারে কোন বাধা দেয়নি। বিয়ের পর থেকে সেতারার এ পর্যন্ত আসা আহমাদের কারণেই। বয়সে প্রায় বারো বছরের বড় আহমাদ সেতারার ইচ্ছা অনিচ্ছা সবকিছুর মূল্য দিয়েছে সেতারার ইচ্ছামতোই। বিয়ের প্রথম রাতেই জানতে চেয়েছে, তুমি আমার কাছে কী চাও? আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত সেতারা কিচ্ছু চায়নি,শুধু বলেছিলো আপনি আমাকে গান গাইতে দেবেন?আহমাদের হাসিতে প্রশ্রয় ছিলো, নিতান্তই বালিকা সুলভ আবদারের সহজতায় দারুন মজা পেয়েছিলো সে। হো হো করে হাসছিলো আহমাদ। তার হাসিতে কেঁপে উঠেছিলো বাসরের প্রতিটি ফুল আর অজানা ভবিতব্য। এই কথা! কেনো নয়।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবার পর সেতারার স্বাভাবিক সংসার জীবন শুরু হয়েছিলো হাড়ি পাতিল খুন্তি, খাট সোফা ড্রেসিং টেবিলের সাথে বাড়িতে হারমোনিয়ামের প্রবেশ দিয়ে। বলা যায় সব কেজো প্রাণহীন জিনিসের সাথে এই একটি অকেজো অথচ সপ্রাণ জিনিস ঢুকেছিলো বলেই সংসারটা একঘেয়ে হয়ে ওঠেনি কখনো। বয়সের ফারাকের কারণে যে মানসিক দূরত্বের শূন্যতা সবসময় মিলিয়ে গিয়েছিলো সুরের রেশে।
এখন এমন লাইভ অনুষ্ঠান মাসে গোটা কয়েক করতে হয় সেতারার। নিজের পরিচিতি তো বটেই, আসর জমানোর কৌশলটাও ও জানে বেশ। উপার্জনও হয়।কিন্তু উপার্জনটা যে সংসারের জন্য খুব প্রয়োজন তা নয়। বর্তমানে নিজের উজ্জ্বল উপস্থিতির প্রমাণই হলো প্রতিনিয়ত নিজেকে জানান দেয়া। ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ এলেও পারতপক্ষে সেতারা তাই না করেনা। টিভি লাইভ হলেতো কথাই নেই। টাকা যাই দিক, সেটা বড় নয়। ফেইসবুকে প্রচার, ম্যাসেঞ্জারে বন্ধু বান্ধবদের জানানো, বয়স্থ যারা ফেইসবুক চালান না, তাদের ফোন করে জানানো, প্রচারের কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনা সে।এই জানান দেয়াতেই যে কতো সুখ। ফলে অন্য কোন কারণে আত্মীয় পরিজন বন্ধু বান্ধবকে ফোন করলেও সবাইকেই নিজের অনুষ্ঠানের খবর জানায় খুব যত্ন করে, সচেতন ভাবে মনে রেখে। নিজের ভেতরে এসব অনুষ্ঠান নিয়ে হয়তো এখন আর খুব উচ্ছ্বাস থাকেনা, কয়েকটি গান ঘুরেফিরে গাইলেই চলে। খুব চর্চারও দরকার পড়েনা।
যদিও যাদের নিয়ম করে জানায় তাদের কজনই বা দেখে তা নিয়ে সন্দেহ আছে সেতারার! তবু তার জানাতে ভালো লাগে। যে কেউ গান গাইতে ডাকলেই সে যায়। না ডাকলে বরং ভেতরে উৎকণ্ঠা কাজ করে এই বুঝি সে হারিয়ে গেলো, এই বুঝি মানুষ তাকে ভুলে গেলো। নিজেকে হারানোর বড় ভয় সেতারার। গানগুলো যেন হারিয়ে না যায় এজন্য মেয়েটা একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলে দিয়েছে সম্প্রতি। সময় পেলেই সেখানেও গান আপ্লোড করে সে।
নিজের শহরটিতে যাচ্ছে সে পাক্কা ২৩ বছর পর। একদা এই শহরে তার বাড়ি ছিলো। যাকে বলে সাত পুরুষের ভিটা। সেতারার বাবার বাবা তার বাবার বাবা তার বাবার বাবা...সেতারার বাবা এ পর্যন্তই বলতে পারতেন। এর বেশি পারতেন না,তবে সাত পুরুষই হবে। সেতারার বাবার আমলেই বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়।
এতোগুলো বছর পরে এই শহরে যাবার উচ্ছ্বাস মোটেই গোপন রাখতে পারছে না সেতারা। কোনভাবেই নিজেকে নির্বিকার রাখতে পারছে না। অন্যদিন যে নিজেকে ইচ্ছে করে নির্বিকার রাখে তা নয়। অথচ আজ ইচ্ছা করে নির্বিকার রাখতে চেয়েও পারছে না। ভেতর থেকে আসা যে উচ্ছ্বাস তাকে উজ্জ্বিবীত করছে,যার প্রভা তার চোখেমুখে ছিটকে পড়ছে, তার নিয়ন্ত্রণ মোটেই তার হাতে নেই। অবাধ্য হয়ে চোখে মুখে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। নিজেকে সে গোপন রাখতে পারছে না। কোনভাবেই পারছে না।
আজ নিজের শহরে গান গাইতে যাব সেতারা। যে কলেজের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে আজ মূল শিল্পী হিসাবে গান গাইবে সেই কলেজেরই প্রাক্তন ছাত্রী সে। কলেজ পার হবার আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়াতে ফিরে আর শহরে যাওয়া হয়নি। ততোদিনে বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেলো। বাবা মারা গেলেন। ভাইয়েরাও যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো দেশে বিদেশে।
সকাল থেকেই অচেনা ঘোর লেগে থাকা সেতারার অন্যরকম চেহারা আহমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। টিপ্পনী কাটেন তিনি, বড় ফুরফুরে মেজাজ আজ, এতো বছর পর প্রাক্তনের সাথে দেখা হবে।
হয়তো। হয়তো মনের গহীন গোপন কোনে তার সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার গোপন বাসনা রয়েছে সেতারার। সেকি বেঁচে আছে? সেকি খুঁজে আসবে সেতারাকে? সুব্রত ওস্তাদজি কি বেঁচে আছেন? এখনো কি আগের মতো নেশায় ঢুলঢুলে চোখে গানের আসরগুলোতে যান? আসর স্তব্ধ করে দিয়ে সুর তোলে,গুরু তোরে রাঙ দিলো না সোনা দিলো, চিনলি না মনা...মাঝখানে কতোগুলো বছর। যদি দেখা হয়ে যায়। সেতারার নাম শুনে যদি দেখতে আসেন। ওস্তাদজি কি তার গান শুনেন? জানেন তার শিষ্য এখন বড় শিল্পী হয়ে গেছে? সেতারার গান-নাম-ডাক কি তার কানে যায়নি?
বয়স আঠারোর ঘর ছুঁতে না ছুঁতেই কেনো সেতারার মতো অতি মেধাবী অতি গুনবতী মেয়েটিকে বাবা বিয়ে দিয়ে দিলেন? তার চেয়ে প্রায় বারো বছরের বড় আহমাদ খুব কৌতুহল নিয়ে বারবার জানতে চাইতো কারণটা। নিতান্ত ভদ্রলোক আহমাদের এ প্রশ্নের পেছনে নিখাদ কৌতুহলই আছে,অনিরাপত্তা নেই। এমন নিশ্চয়তা পেয়ে ঘটনাটা আহমাদকে বলে দিয়েছিলো সেতারা।
মায়ের অতর্কিত মৃত্যুর পর ওরা সব ভাইবোনেরা বুঝে গিয়েছিলো, তাদের এবার নিজেদেরই বড় হতে হবে। দাদাজি থ মেরে গিয়েছিলেন। আর বাবা সংসার নিয়ে এতোটাই উদাসীন হয়ে গিয়েছিলেন সন্তানদের কোন কিছুতেই বাধাও দিতেন না,উৎসাহও দিতেন না। বড়দা ফুটবল খেলতে চলে যেতো শহর থেকে শহরে। কেউ নিষেধ করতো না। দিনের পর দিন বাড়ি ফিরতো না,কারো কোন মাথা ব্যাথা ছিলো না। মেজদা বখে গেলো, মদ গাঁজা, ফেনসিডিলের আড্ডায় ডুবে গেলো। কেউ খোঁজও রাখলো না। শুধু ছোট দাদা বাড়ি বাড়ি ঘুরে টিউশনি পড়িয়ে বি এ পাশ করলো।
সেতারার জন্য গানের ওস্তাদজিও ঢুকলো তখন বাড়িতে। আর কারো খোঁজ খবর না নিলেও মেয়ের গানের ব্যাপারে খুব উৎসাহী হয়ে উঠলেন। মায়ের নাকি ইচ্ছা ছিলো, মেয়ে বড় শিল্পী হবে। বাবা সুব্রত ওস্তাদজিকে বাড়িতে ডেকে আনলেন। যে দাদাজি বাড়িতে হারমোনিয়াম ঢুকেছিল বলে মেরে মেজদাকে চড় মেরে অসুস্থ করে দিয়েছিলেন সেই দাদাজিও কিচ্ছু বললেন না। বাবার কিন্তু এই মাস্টার রাখা পর্যন্তই, ওস্তাদজি কখন আসেন কখন যান কিচ্ছু খেয়াল করতেন না। ওস্তাদজির সাথে এখানে ওখানে গান গেয়ে বেড়াতো সেতারা। হয়তো বাবার উদাসীনতার সুযোগেই জন্ম নিলো এই অসম সম্পর্ক। ওস্তাদজির সাথে এখানে ওখানে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোন বিধিনিষেধ ছিলো না কারো। ওস্তাদজি নিজেই ভালোবাসার কথা বলেছিলেন।
একবার ঢাকায় অনুষ্ঠান সেরে রাত করে ফিরতে ফিরতে ট্রেনে সেতারাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন ওস্তাদজি । যে মানুষটির গানের মগ্নতায় স্তব্ধ হয়ে থাকে পুরো শহর,তাকে প্রত্যাখ্যান করার সাহস,শক্তি বা সামর্থ্য কোনটাই ছিলো না সেতারার। নিজেকে পতঙ্গের মতো সমর্পণ করেছিলো সে সুব্রত নামের আগুনের কাছে। স্কুলের নাম করে বের হয়ে সে চলে যেতো ওস্তাদজির বাসায়। ওস্তাদজির বৃদ্ধ মা কিছু বুঝতেন কিনা কে জানে। স্কুল ছুটির সময় বাসায় ফিরত সেতারা। ছোট মফস্বল। খবর গোপন থাকেনি। একান ওকান হয়ে বড়দা,মেজদা, বাবা। সুব্রত ওস্তাদজির যতোটা গানের সুখ্যাতি, ততোটাই মাতাল হিসাবে কুখ্যাতি শহরে। বয়স আর ধর্মের অসম পার্থক্য নাহয় অগ্রাহ্যই করা গেলো। পাগলেও নাকি নিজের বুঝ বুঝে। গান শিকেয় উঠলো। উঠেপড়ে লেগে বাবা ঘটক লাগালেন। ঘটক বর খুঁজে আনলো আহমাদকে।
আহমাদ বৃত্তান্ত শুনে মোটেই খেপে উঠেনি। যেনো অবোধ বালিকার ভুলের মতোই তুচ্ছ করেছে। এতো বছরের সংসার জীবনে কোনদিন অযাচিত ভাবে প্রসঙ্গ তুলে সেতারাকে আহতও করেনি।
কলেজে সবচেয়ে প্রবীণ ছাত্রীটির সংবর্ধনা শুরু হয়। নিবেদিতা হালদার। ঝুলে পড়া চামড়া। বয়সের ভারে নুব্জ। কী আভিজাত্য চেহারায়।কাঁপা গলায় কতো স্মৃতিকথা বললেন কলেজকে ঘিরে, মন খুলে গাইলেন, আমি অকৃতি অধম বলেও তো তুমি...।
সেতারা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী হিসাবে যখন মঞ্চে উঠে, তখন কেনো যেনো বর্ষিয়সী মহিলার পায়ে ধরে সালাম করলো। মহিলা জড়িয়ে ধরলেন। তার গায়ে চন্দনের গন্ধ। কতোদিন পর গন্ধটা পেলো সেতারা। মূহুর্তের জন্য স্মৃতিরা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো স্মরণে। দৌড়াতে দৌড়াতে দত্তপাড়ার মণ্ডপের সামনে গেলেই নাকে ঝাপটা দিতো চন্দন-তুলসীর পবিত্র গন্ধ। গন্ধটা ভুলেই গিয়েছিলো সেতারা।
গান গাইতে গাইতে এদিক সেদিক উদভ্রান্ত একজোড়া চোখ ঠিকই খুঁজে ফেরে সেতারা। মুহুর্মুহু হাততালিতে মুখর হলের কাকে জিজ্ঞেস করা যায় সুব্রত ওস্তাদজির কথা? একটার পর একটা সুরে টান দিতে দিতে ভআবে, এ হাততালিতো প্রাপ্য সুব্রত ওস্তাদজির। হারমোনিয়ামে সপ্তস্বর চিনিয়েছিলেন যিনি।কেমন আছেন সুব্রত ওস্তাদজি? কাকে জিজ্ঞেস করা যায়?
পরদিন সকাল সকাল উঠে তৈরি হতে হতে চোখের সামনে হেঁটে যায় শৈশব কৈশোর, চার ঘরে ঘের দেয়া চৌকোণা উঠান। টলটলে পুকুর। নিজ শহরের গন্ধটা মায়ের শাড়ির মতো জড়িয়ে ধরছে কতো বছর পর! মাটিতে চাটাই পেতে সারিবেঁধে ভাইবোনদের খেতে বসা। প্রতি বৃ্হস্পতিবার সন্ধ্যায় সুব্রত ওস্তাদজি...। পাড়াটার নাম মধ্যপাড়া। একবার নেমে বাড়িটায় গেলেই হয়। কেজানে ২৩ বছরে বাড়িটাই আগের মতো আগের জায়গায় আছে কিনা!
নিজেদের বাড়িটা দেখতে গিয়ে থমকে যায় সেতারা। প্রথম আসা অচেনা রাস্তার মতো সবকিছু।যেখানে ঢোকার মাটির রাস্তা ছিলো, দুপাশে মাধুরীলতার ঝোঁপ। সেখানে এখন সুউচ্চ বাহারি স্টেইনলেস স্টিলের গেট। ভেতরে মাটির দাওয়ায় রাজপ্রাসাদ। আলাদা করা যায়না,কোনটা দাদাজির ঘর ছিলো, কোনটা ছিলো কাছারি ঘর! পুকুরটার জন্য মরে যাওয়া স্বজনের মতো কষ্ট হয়। যে পুকুরে সাঁতার কেটে শৈশব কেটেছে, সে পুকুর এখন আবর্জনার ভাগাড়। টলমল দীঘিটার এভাবে বুজে যাওয়া মায়ের মৃত্যুর মতো কষ্ট দেয় আজ।
এখানে তাদের বড়ঘরটা ছিলো,এখন যেখানটায় বহুতল ভবনে উঠার সিঁড়ি। দু'দুটো চকি জোড়া লাগানো বিছানায় মাকে মাঝে রেখে ভাইবোনরা ঘুমাতো। আর মধ্যরাতে হঠাৎ কুকুরের ডাকে ঘুম ভেঙে গেলে ভয়ে মাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরতো সেতারা।
বারান্দা লাগোয়া দরজার পাশে প্রশ্বস্ত ঘরটায় ছিলো দাদাজির ঘুমের জায়গা। ঘরময় সাজানো ছিলো আকাশি কাঠের চেয়ার। এশার নামাজ শেষ করে মুসল্লিরা দাদাজির কাছে আসতো প্রতিদিন। দাদাজি দেওঘর ছিলেন বছর খানেক। খুব সুন্দর বয়ানের কণ্ঠ ছিলো তার। দাদাজি বয়ান করতো, তারা শুনতো।
দত্ত বাড়িটা এখান থেকে আর বুঝার উপায় নেই। হাইরাইজ বিল্ডিং এর আড়ালে আর কোন অতীত নেই। বাড়ির পেছনে দাঁড়ালে দীঘি পেরিয়ে দত্ত বাড়ির ঠাকুর দালান সরাসরি দেখা যেতো। দীঘির পার ঘেঁষে হেঁটে যাবার রাস্তা। দত্তরা যেবার বাড়ি বিক্রি করে চলে যায়, পুরো পাড়ার মানুষ ভেঙে পড়েছিল ওদের ঘরের জিনিসপত্র নিতে।কেউ কাঁসার জিনিস,কেউ মেহগনি কাঠের খাট,কেউ শ্বেত পাথরের থালা কতো কিছু। সেতারার মা তার মেজোছেলেকে পাঠিয়েছিলেন হারমোনিয়াম আনতে।
মায়ের মুখে শুনেছিল সেতারা, দত্তদের বড় মেয়ের অপরূপ গানের কণ্ঠের কথা। সূর্য উঠার আগে অন্ধকারে গলা সাধতে বসতেন তিনি। ভৈরবী রাগে। দাদাজির ওজুর পানি এগিয়ে দিতে দিতে মসজিদ থেকে ভেসে আসতো ফজরের আজান। দাদাজি বিড়বিড় করতেন নাউজুবিল্লাহ...। আর মায়ের মন উদাস হয়ে যেতো অচেনা কোনো সুরের দেশের জন্য।
খুব খুশি হয়েছিলেন দত্তদের বড় মেয়ে। কাঁসার বাসন কোসন, সিরামিকের কাপ পিরিচ, সেগুন মেহগনির আসবাব নিতে যখন হুড়োহুড়ি তখন কেউ একজন সাধ করে তার হারমোনিয়ামটা নিতে চায়। চোখের জল মুছতে মুছতে সবচেয়ে আনন্দের সাথে হারমোনিয়ামটি দিয়েছিলেন তিনি।কেউতো একজন ভালোবেসে তার প্রিয় জিনিসটি নিচ্ছে। তাকিয়ে ছিলেন মেজদার চলে যাওয়া পথের দিকে, যতোদূর চোখ যায়। আম গাছটা আর নেই। সেখানে বিশাল বিশাল পানির ট্যাংকি। আম গাছটা ঠিক কোথায় ছিলো ঠাওর করা যায়না। মা যে গাছটায় ঝুলে ছিলেন। ফজরের নামাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরে দাদাজি যেদিন শুনে ফেলেছিলেন মায়ের গলায় ভৈরবী সুর। সেদিনই বাবাকে ডেকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, মাকে যেনো তালাক দেয়। মা সে সুযোগ দেননি। কোন ফাঁকে গলায় রশি বেঁধে ঝুলে পড়েছিলেন আম গাছের ডালে কেউ টের পায়নি।
সেতারা বের হয় অচেনা হয়ে যাওয়া নিজের বাড়ির অচেনা রাস্তা দিয়ে। ২৩ বছর আগে রেখে যাওয়া একই মাটি। স্তরের পর স্তর বিস্মৃতির ধুলো পড়ে এখন সেটা যেকোনো বাড়ি। চোখের দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়। এ যেনো গত জন্মের কথা! গাড়িতে উঠার আগে অশ্রু মুছে সেতারা ।
ঠিক তখন পিঠে হাত রাখে কেউ একজন। সেতারা মগ্ন হয়ে ছিল অতীতে, স্মৃতিতে,হারানোর বেদনায়। হঠাৎ চমকে যায়। নিবেদিতা হালদার,কলেজের প্রোগ্রামে কাল যার সাথে মঞ্চে দেখা হয়েছিলো। গলায় তার মায়ের মতো দরদ, তুমি দিলারার মেয়ে? উনি সেতারার মায়ের নাম জানলেন কী করে,সেতারা অবাক হয়। অবাক হচ্ছো- সেতারার বিস্ময় ধরতে পেরে মহিলার কণ্ঠ স্নেহে আরও আর্দ্র হয়। আসল নামটা জানলে অবাক হবে না, আমি নিবেদিতা দত্ত। দত্তদের বড় মেয়ে! ওপাড়ে বিয়ে করে হালদার হয়েছি। কী যে খুশি হয়েছিলাম তোমার মা আমার হারমোনিয়ামটা চেয়ে নেওয়াতে। আমার হারমোনিয়াম ধন্য হয়েছে তোমার মতো মেয়ের হাতে পড়ে। তোমার মা হারিয়ে গিয়ে তোমার কণ্ঠে বেঁচে আছেন।আর দেশ ছেড়ে গিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আমি বেঁচে থেকেও সব হারিয়ে ফেলেছি।
সেতারা পুনর্বার তার পা স্পর্শ করে। আপনার হারমোনিয়ামটা আমার বাসায় এখনো আছে,সেখানে আপনার স্পর্শ, অশ্রু আর আশিস আছে। আপনিও আমার মাঝে বেঁচে আছেন,কোনো রকম বাস্প রুদ্ধ গলায় কথাগুলো বলতে পারে সেতারা। মা,নিবেদিতা হালদার, সুব্রত ওস্তাদজি…কতো জনকে যে বাঁচিয়ে রেখেছে একটা হারমোনিয়াম। এবার গিয়ে এটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে হবে।
লেখক পরিচিতি:
রুমা মোদক
কথাসাহিত্যিক। নাট্যকার। জন্ম ১৯৭০ সালে। পড়াশোনা- বেড়ে ওঠা, বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হবিগঞ্জ /বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জ/ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত গ্রন্থ:নির্বিশঙ্ক অভিলাষ (কবিতা),ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলো( ঐতিহ্য) , প্রসঙ্গটি বিব্রতকর (অনুপ্রাণন), গোল(জেব্রাক্রসিং),নদীর নাম ভেড়ামোহনা (পেন্সিল),সেলিব্রিটি অন্ধকারের রোশনাই(সময়), এইসব প্রেম মোহ (জলধি), মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস (তাম্রলিপি ),মুক্তিযুদ্ধের তিনটি নাটক(চৈতন্য প্রকাশনী),অন্তর্গত, (নাটকের পাণ্ডুলিপি, দেশ প্রকাশনী), মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর ও অন্যান্য গল্প(নালন্দা প্রকাশনী


2 মন্তব্যসমূহ
ভালো লাগলো
উত্তরমুছুনহারমোনিয়াম তো একটা জড় জিনিষ, তাকে মাঝে রেখে জীবন্ত হয়ে ওঠে দিনানুদিনের কথা, ব্যক্তি, সমাজ, দুঃখময় দেশভাগের কাহিনী। ভালো লাগলো!
উত্তরমুছুন