কালো মিশমিশে রাত যখন ফিকে হবার অপেক্ষায়, তার নৈশঃশব্দের অভ্যন্তরে এক স্বর ভেসে বেড়ায়।
'আরে শরীর তো আমারই, যা হয় কর, দাফন বা দাহ-যা করলে তোদের বিপদ হবে নাই। আমার কোনো কিছুতে আপত্তি নাই। আমি বলছি কোনো গুনাহ হবে না।'
পঞ্চানন কথা বললেও কারো কানে যাচ্ছে না। মৃত মানুষের কথা কারো কানে যায় না। পঞ্চানন একটু আগে মারা গেছে। দেহ পড়ে আছে। কেমন করে হবে এ দেহের সৎকার তা নিয়ে চুনি ও সনকা এই ভোর রাতে ভেবে কোনো হদিশ করতে পারছে না। যেদিকে এগোবে সেদিকেই বিপদ। কতক্ষণ তারা মৃতদেহ আগলে বসে থাকবে ?
-'বিপদ তো জীবন ভর ছিল। মরণকালে আর নতুন কী হবে ? যা করবি ভেবে করবি, আমি তো আর থাকছি না, তোদের থাকতে হবে খেয়ে পরে। ভয়ডর নিয়ে, লুকোচুরি করে কদ্দিন যাবে ?'
পঞ্চানন যাই বলে যাক বিড়বিড় করে, কেউ তাতে কর্ণপাত করবে না, সে জানে। চোখ না খুলেও সে দেখছে ঘরের মধ্যে ছটফট করছে চুনি আর ওর বউ। ক্রমশ হিমশীতল হয়ে আসা তার শরীর আর কতক্ষণ এভাবে পড়ে থাকবে ? রোজ এ সময়ে তার ঘুম ভাঙত। পাশের বাড়ির এক চিলতে বাগান থেকে সাদা যুঁই ফুলের গন্ধ তার নাকে আসত। যুঁই ফুলের আতর বড় পছন্দের ছিল। আজ সেটা পাবার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ। একটা টক দুর্গন্ধ ছিল তার ইহকালের শেষ ঘ্রাণ।
যখন চারপাশ শুনশান, রোগ চেপে বসেছে মানুষের ঘাড়ে, মৃতের চাপে স্বজনহারা হচ্ছে, কাজ হারানো লোক সংখ্যায় বেড়ে উঠছে ও রেললাইন ধরে হাঁটছে অবিরাম,তখন কাজের খোঁজ পাওয়া যেন অবিশ্বাস্য খবর। সে সৌভাগ্য হয়েছিল চুনির। সে শহরের প্রজেক্টে কাজের হদিশ পায়। কোনো বিকল্প ভাবনায় না গিয়ে সুদুর জেলা থেকে চুনির সিদ্ধান্ত- শহরে আসবে কাজে যোগ দিতে। তখন সবে ট্রেন আবার চালু হয়েছে। অসুস্থ বৃদ্ধ বাপকে দেশ গাঁয়ের লোকজনের হাতে রেখে দেওয়ার ভরসা হয়নি তার। একেই মহা রোগের কারণে এক মানুষ অন্য মানুষকে এড়িয়ে চলে। তার ওপর বাপের বয়স একটা সমস্যা। মালপত্র গুছিয়ে সব নিয়ে যেদিন সে শহরে পাড়ি জমাল সেদিন গ্রামের প্রতিবেশীরা কাজ পাওয়ার এই ব্যতিক্রমী ঘটনার জন্য ওপরওলাকে কুর্নিশ করতে ভোলেনি। ওদের বিদায় জানিয়েছিল হাসিমুখে।
বড় শহরে পা রেখে কালঘাম ছুটেছিল চুনির। পাঁচ ছটা বাড়ির দোরগোড়া থেকে ফিরে যেতে বলা হয়েছিল তাদের। শুধু বিপুল ভাড়া যে এশহরের সমস্যা নয়, আরো অন্য কোনো অজানা কারণও থাকতে পারে- তা হাড়ে হাড়ে টের পেতে কদিন লেগেছিল। যা প্রায় পাহাড় ডিঙোনোর মত একটি কঠিন লাফ বলে মনে হচ্ছিল, তা শেষে এক দালালের বুদ্ধি ও পরামর্শতে একটু অল্পেতে মিটেছিল। কাজের সুত্রে একটা মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হল এ শহরে। একেই বিল ছাড়া বাড়িভাড়া মানে একটা অনিশ্চয়তা। তার ওপর ছিল আরো অনেক খবরদারি।
-নাম ?
-চুনিলাল কর্মকার।
-কাজ ?
-রাজমিস্ত্রি।
-দেশবাড়ি কোথায় ? এখানে আসার কারণ ?
…
বাড়িওলার এরকম আরো কয়েকটা প্রশ্ন ও কিছু নিয়মমাফিক শর্তে রাজি হতে হয়েছিল। সব প্রশ্নের উত্তর নিখুঁত দিতে পেরেছিল দালালের ফিসফিস পরামর্শ মতো। যার একটু এপাশ ওপাশ হলে আবার বিতাড়ন অবশ্যম্ভাবী ছিল।
পুকুরের একদিকের পাড়ে পা ও গা ডুবিয়ে সাবধানে স্নান সারে চুনিদের পরিবার। একটা বারোয়ারি পায়খানা শুধু বরাদ্দ আছে। ঘরের বাইরে বাঁধানো দাওয়ায় চুলা জ্বালিয়ে রান্না। পুকুরের ধারেই তাদের ভাড়া নেওয়া ঘর। বৃদ্ধবাপ,যুবতী বউ ও শিশু কন্যা নিয়ে চুনির পরিবারের থাকা ও তাদের চলাফেরায় অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের নানা কৌতুহল। ওরা যেহেতু এ অঞ্চলে নতুন। চুনি সকালে কাজে বেরোয়। সন্ধ্যায় ফেরে। ওর বউ ও ছোট মেয়েটি সারাদিন বাড়ির বাইরে খুব কম বেরোয়। বাপ দিনে একবার বাড়ির বাইরে বেরোয় পুকুরে নেমে স্নান সেরে নিতে। এক আধ দিন বেরোয় না শরীর না চাইলে। আকাশ দেখে ঘরের একমাত্র জানলায় মাথা রেখে। অচেনা এলাকায় প্রতিবেশী বা তাদের মনও তাদের অজানা। পুকুরের পাড়ে বাঁধানো ধাপ যেখানে জলে মিশেছে সেই জায়গাটা অবধি নেমে ওরা জলে ভিজিয়ে নেয় নিজেদের। ফেরার পথে চারপাশ দেখতে দেখতে ঘরে ফেরে। কে কীভাবে তাদের ওপর নজর রাখছে, প্রকাশ্যে বা আড়ালে, তা সতর্ক নজরে দেখাই উদ্দেশ্য।
একদিন,দুদিন,একমাস,দু মাস পেরিয়ে ওদের বন্ধু হল কয়েকজন। চুনিও পরিচিত হল এলাকায়। ভালো রাজমিস্ত্রি বলে লোকে জানল।
দুই
–---
জল সকলের। জলের অধিকার সকলের। স্বচ্ছ জল বিতর্কহীন। জলের নীচে নুড়ি পাথরের ছোটখাটো সংঘর্ষ থাকতে পারে। কিন্তু এটাই তো সব নয়। ক'মাস পর চুনিদের কানে এল পুকুরের মধ্যে বিপদ তৈরি হয়েছে। কোন্ সেই বিপদ জানতে সকলের মতো চুনির পরিবারও উদগ্রীব হল। মানুষের জীবন এত রকমের টানাপোড়েনে চলে যে একখণ্ড শান্তির মধ্যে কখনো অশান্তি, নির্ঝঞ্ঝাট যাপনে কখনো বিপদ আচমকা দখল করে বসে।
এই পুকুর ঘেরা ছোট পাড়ায় হঠাৎ বিপদের গন্ধ কীভাবে টের পাওয়া গেল ? কেউ কি পেয়েছিল সে গন্ধ ? দিনের শুরুতে মানুষের চোখে দ্বিতীয় শালিকটি না দেখা, অথবা রাস্তা কেটে বিড়ালের পথ করে নেওয়া, দাঁড়কাকের ডাক বা রাতে কুকুরের কান্না- এর কোনো এক বা একাধিককে মানুষ বিপদসংকেত হিসেবে দেখে। সন্দেহ করে তার আগমনের। সতর্ক হয় চলাফেরা। সেরকম কিছু ঘটেছে কিনা, একা বা অনেকের সে ধরনের কোনো পর্যবেক্ষণ ছিল কিনা তা বোঝার এবং ভাবনার বিষয়।
জলের কোনো শ্রেণী নেই। ধর্মও নেই। জল পবিত্র বলে পরিচিত। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে সেই পবিত্রতায় ইদানীং কিছুটা পাপ দখল নিয়েছে বলে অনুমান অধিকাংশের। অর্থাৎ,অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে এই পুকুরের জল হঠাৎই অশুদ্ধ।
অশুদ্ধ বলেই কি জলে ভেসে উঠছে মরা মাছ ? প্রশ্নটা অনেকের মনে হয়েছে। জলের রং কালো হয়ে উঠেছে বলে মাছের মড়ক- এ অভিমত এদেরই। হয়তো সত্যি। কিন্তু জলের রং কেন কালো হয়ে উঠেছে এ নিয়েও রীতিমতো সোরগোল পড়েছে।
রাতে বাড়ি ফিরে চুনি ও তার পরিবার এই আলোচনায় তটস্থ হয়ে পড়ে। তারা এ পাড়ায় নতুন। একখানা ঘর ভাড়া পেতে তাকে কী করতে হয়েছে তা শুধু তারাই জানে। তাদের কানে গেছে বিধর্মীদের ছোঁয়ায় নাকি জল এভাবে কলুষিত হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলে গোপনে এই মত মানুষের চিন্তায় দখল নিচ্ছে ক্রমশ।
কে বিধর্মী ? কজন বিধর্মী ? এই জলে কাপড় কাচা, বাসন মাজা, হাত পা ধোওয়া এবং সর্বোপরি সম্পূর্ণ অবগাহন করে শুধুমাত্র এক ধর্মের মানুষেরাই ?
মানুষের মস্তিষ্ক বড়ো সাংঘাতিক। সেখানে কখন অমানুষ দখলদার হয়ে যায় তা বোঝা বেশ শক্ত। এভাবে বিধর্মী চিহ্নিতকরণ হতে শুরু করলে কার বা কাদের দিকে আঙুল উঠবে সেই জবাব এখনও গভীর আঁধারে লুকিয়ে থাকা সাপের ফণার মতো। যা অতর্কিত এবং প্রবল বিষধর।
চুনি খুব কাছেই এক কারখানার সিভিল লেবার বা নির্মানের মিস্ত্রি। একদিন কাজের ফাঁকে তার নজরে আসে কারখানার বর্জ্য নালা দিয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। যে মাটি কারখানা ছাড়িয়ে ক্রমশ ঢাল হয়ে চলে গেছে এই পুকুরের দিকে !
চুনি চমকে ওঠে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে। কারখানা তৈরির নিয়ম বেনিয়ম নিয়ে তার মাথাব্যাথা নেই। কর্তাদের বোঝাপড়া নিয়েও নয়। দুষিত তরলের চলাচলের এই অভিমুখ দেখে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে যায়। তাহলে কি এটাই কারণ ? তাকে বলতে হবে একথা। এলাকার সবাইকে জানাতে হবে। যে আতঙ্ক গ্রাস করেছে সকলের মনে তা থেকে উদ্ধার পেতে এই সত্যিকে সকলের সামনে আনতে হবে। কেন মাছের মৃত্যু, কেন জলের রং আকস্মিক ভাবে কিছুটা কালো, কোন্ 'বিধর্মী' দখল নিয়েছে এই পুকুরের পবিত্র জলের-সেই সত্যিটা জানাতে হবে।
সন্ধ্যায় কাজ থেকে ছাড়া পেয়ে সে বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে। মাথার ওপর প্রাক পূর্ণিমার চাঁদ তার সঙ্গে এগোতে থাকে। যত এগোয় ততই সে অবাক হয়। গোটা রাস্তায় যে কজনের সঙ্গে তার দেখা হয় প্রত্যেকের স্থির বিশ্বাস বিধর্মীদের জলস্পর্শেই জলের বিপদ ঘনিয়েছে। পুকুর লাগোয়া এক মন্দির আছে। জল সেজন্যই পবিত্র - দীর্ঘকাল এ ধারণা চলে আসছে। যে কোনো অপবিত্র ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় নিষেধাজ্ঞা। অন্য ধর্মের কাউকে এই জল ছুঁতে দেওয়া হবে না- এই মর্মে সিদ্ধান্ত নিতে স্থানীয়দের খাপ পঞ্চায়েত বসতে চলেছে কাল সকালে। এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকের নাম, ঠিকানা, ধর্ম ইত্যাদি আধার কার্ড মোতাবেক রেকর্ড হবে। এতে সহজ হবে কাঙ্ক্ষিত চিহ্নিতকরণ।
শুধু বিস্ময় নয়, এতে একটা ভয় চুনিকে আস্তে আস্তে গ্রাস করে। খাপ পঞ্চায়েতে গিয়ে সে তো সত্যটা জানা স্বত্বেও বাধ্যত নীরব থাকবে। কারণ, কেউ তার মতকে সমর্থন করবে না। জল কেন কালো তা জানা সত্বেও ভয়ঙ্কর সংখ্যাগুরুর মতের বিরোধিতা সে করতে পারবে না। তাতে তার গোটা পরিবারের বিপদ বাড়বে। সংখ্যাগুরু মানুষের অন্ধ বিশ্বাস যখন যুক্তির ওপর অন্যায় দখল নেয়, বুদ্ধিমানের ওপর মুর্খদের দখল কায়েম হয়, সত্যের ওপর মিথ্যা একনাগাড়ে দখল নেয় তখন নীরব হয়ে যায় সংখ্যালঘুরা।
এই দমবন্ধ করা অবস্থায় সে চুপচাপ বাড়ি ফেরে। সন্ধে পেরিয়ে রাত হতেই সে পরিবারের মুখোমুখি হয়। তারা স্বামী স্ত্রী ঘটনাচক্রে প্রবল আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শিশু কন্যারটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। খাপ পঞ্চায়েতে কী হবে সেই আতঙ্ক বুড়ো পঞ্চাননকেও গ্রাস করে। তারা যেদিন এই ঘরে ঢুকেছিল সেদিনই একটা মিথ্যা তাদের সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। প্রতিমাসে বাড়িওলা এসে ভাড়া নেবার সময় জানিয়ে যায় এপাড়ার পুকুরটির মাহাত্ম বা, ওই জলের ঐশ্বরিক ক্ষমতা। তাদের এখানে বসবাস করা বা ওই পুকুরের জলে স্নান করা যে বহু পূণ্যের ফল- একথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না। তাদের তো দরকার ছিল একটা মাথার ছাদ, মোটামুটি দিন গুজরান হতে পারে এমন ঠাঁই। বহু জায়গায় ঠোক্কর খেয়ে বাধ্য হয়েই চুনি ও তার পরিবার এক মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল এ বাড়িতে পা রাখতে। এখন হটাৎ একটা এমনই সংকট ঘনিয়ে উঠেছে যে,সেই মিথ্যার ঘেরাটোপ তারা আর রাখবে কিনা- এই নিয়ে অনেক রাত অবধি তাদের ফিসফাস চলে। ঘুমন্ত শিশুটি কাল সকালে আবার জলে নামবে কিনা তার বাপ মায়ের সঙ্গে তা ঠিক করতেই রাতের কথাবার্তা আরো গভীর হয়। এই চাপা আতঙ্ক পঞ্চানন নিতে পারেনি। কদিনের কথাবার্তা তার কান এড়ায়নি। শরীরের ওপর আকস্মিক নেমে আসা এই ঘটনা যে চাপ তৈরি করেছিল তার ধকল নেওয়া আটাত্তর পেরনো পুরোন মানুষটা নিতে পারছিল না। মনের মধ্যে লুকোনো সাপ নিয়ে বেশ কিছুদিন এ অঞ্চলে কাটিয়ে দিতে পেরেছিল চুনির বাপ। ভয়ঙ্কর সেই জীবন কাটিয়ে নিশ্চিন্তে কেটে পড়া যাবে কোনো এক সাতসকালে- এরকমই ভেবেছিল এক কালের টালি মিস্তিরি। কিন্তু, পরের দিন সকালের সম্ভাব্য ঘটনা কী হতে যাচ্ছে এই চিন্তা তাঁকে আর রেহাই দেয়নি। হঠাৎ বুকে প্রবল চাপ নিয়ে কুঁকড়ে শুয়ে পড়েন। চুনি ও সনকা ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুখে সাদা গাঁজলা তুলতে তুলতে শেষ রাতে পঞ্চানন স্থির হয়ে যায়।
চোখের সামনে এই মৃত্যু আরো অসহায় করে দেয় চুনিদের।
এই বিপর্যয়ের বেশ কিছুক্ষণ আগে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কাল সকালে খাপ পঞ্চায়েত বসার আগেই এই ঘর ত্যাগ করবে। চুনিরা স্বপরিবার ঐ সভায় হাজির হবে না।
রাতজাগা সিদ্ধান্ত মতো খুব ভোরে তারা প্রস্তুতি শুরু করার মুহুর্তে দুর্ঘটনাটি ঘটে। আকাশে যখন আলো সবে ফুটবে সেই অসময়ে বাড়িওলাকে ডেকে বিদায় জানানোর ভদ্রতা করতে গিয়ে তারা দেখে ওঁর মুখের আকাশ কালো হয়ে উঠছে ক্রমশ।
-একটা জরুরী কথা ছিল কাকু।
-তা বলে এই রাতে ?
দরজা খুলেই একটা হাতে চোখ কচলে, অন্য হাত কোমরে রেখে গভীর বিস্ময়ে কপালের ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে যান ভদ্রলোক।
-আপনাকে এসময়ে বিরক্ত করার জন্য খারাপ লাগছে। আমরা ঘর ছেড়ে দিচ্ছি।
-তার মানে ? আগে তো বলনি চুনি।
-আমি সাবির, সাবির আলি নস্কর। চুনি নয় ! আমার স্ত্রী সাকিলা আর মেয়ে পাখি এখনই আপনার কুঠি ছেড়ে চলে যাবো। আমার আব্বাজানের ইন্তেকাল হয়েছে একটু আগে।
সব শুনে স্তম্ভিত বাড়িওলা মৃদু সহানুভূতি দেখিয়ে পরক্ষণেই চিৎকার করে ওঠেন।
-মিথ্যে বলতে লজ্জা করেনি অ্যাদ্দিন ? জাহান্নমে যাও।
আস্তে আস্তে ভদ্রতার আগল ভেঙে বাছা বাছা কুকথা বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে। তিল তিল করে গড়ে তোলা বালিপাহাড় হঠাৎ ধসে মাটিতে মিশে গেলে যেমন হয়। আর একটু সময় পেলে হয়ত লোক জড়ো করে ফেলবেন।
এই বিস্ফোরণের জন্যে আগাম প্রস্তুত ছিল সাবির ও সাকিলা। ভাড়ার বকেয়া মিটিয়ে তারা খোলসা করে এই লুকোনো সত্য প্রকাশ করে এবং গা থেকে মিথ্যার বর্মটা খুলে ফেলে। শুধু জীবিত পঞ্চানন তার আসল পরিচয় মিজানুর-এ ফিরতে পারল না। তার আগেই সে মুক্ত হয়ে গেল। কাজ পেয়ে যখন ঘর খুঁজতে নেমেছিল সাবির, ধর্মপরিচয় গোপন রাখা ছাড়া উপায় ছিলনা তার। আসল পরিচয় দিয়ে এ পাড়ায় তাদের ঘর ভাড়া পাওয়া অসম্ভব-দালাল এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছিল। মিজানুরের সঙ্গে সঙ্গে আজ সেই মিথ্যে পরিচয়েরও ইন্তেকাল ঘটাল তারা। কিন্তু ছেড়ে দিয়ে কোথায় উঠবে তারা ? এ শহরে এখন আরো অন্ধকার নেমে আসছে কিনা তাদের জন্য, তা জানতে হয়তো আর একটু অপেক্ষায় থাকবে তারা। এক অনিশ্চিত ভবঘুরে জীবন বেছে নেওয়া ছাড়া আর উপায় কী ?
ভেবেছিল ভোরের আলো ফোটার আগেই সকলের চোখের আড়ালে সব হয়ে যাবে। কিন্তু বাধ সাধল আব্বাজান। নিজের ইন্তেকাল ঘটিয়ে সে লোকসমক্ষে সবটা খোলাখুলি জানাতে চাইল কি?
বাড়িওলাকে জানানোর পরও সাবির ও সাকিলার সমস্যা এত সহজে মেটেনি। একটু পরেই সবাই জানবে এবং রটবে- 'পঞ্চানন কর্মকার দেহ রেখেছেন।' তার শেষযাত্রা ও দাহকাজে প্রতিবেশি কয়েকজন থাকতে চাইবে। কিন্তু, শুধু মান ও জান বাঁচাতে তার বাপের দাফনের বদলে দাহ কী করে তারা মেনে নেবে। সেটা তো অসম্ভব। মৃত আব্বাজানকে ফেলে রেখে তারা তো পালিয়ে বাঁচতেও চায় না। তাহলে ?
'বিপদ সবদিকেই। তুই সব জানালেও বিপদ, আমায় ফেলে পালালেও বিপদ! তার চেয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখা জায়েজ। মিথ্যে জবানের বদলে সত্যিটা বরং কবুল করে দে।'
মিজানুরের এই শেষ কথাগুলো বোধহয় সাবিরের কানে পৌঁছেছিল।
এরপর দ্রুত তোড়জোড় শুরু করে তারা। এক এক করে মিজানুরের গোসল ও কাফন সেরে এই ঘর ও পাড়া ছেড়ে তারা চলে যায়। মিজানুর যে পঞ্চানন কর্মকার নয়, তাকে যে দাফন করতে হবে, দাহ নয় তা খাপ পঞ্চায়েত জানবে সূর্যোদয়ের পর।
এভাবেই স্রোতের বিপরীতে, সকলের অগোচরে এক মিথ্যার ওপর সত্যের একান্ত দখলদারি শুরু হয়। সাবির মনে করে, শুধু তার বাপের নয়, এতদিন ধরে বয়ে বেড়ানো এক মিথ্যারও দাফন করতে চলেছে সে, তার পরিবার সমেত। আকাশে ফুটে বেরনো সদ্য ফিকে নীল আর পাখির প্রথম শিস যার একমাত্র সাক্ষী।
কবরে মাটি পেয়ে মিজানুর রেখে গেল ছেলে সাবির ও তার ছোট্ট পরিবারকে। দাহ নয়, মিথ্যের দহনে তো আগেই পুড়েছে সে। আজ সত্যটা সে দেখল নিজের মৃত্যুতে। রাজমিস্ত্রির ছেলে রাজমিস্ত্রি- শুধু এই পরিচয়ে বাঁচবে সাবির ও তার বেটি,বিবি। এভাবেই খাপ পঞ্চায়েতের তোয়াক্কা না করে এলাকা থেকে 'বিধর্ম' স্বেচ্ছায় চলে গেল। পুকুরের পানির দিকে সম্ভবত শেষবার ফিরে তাকিয়েছিল সাবির।
তবু, যত দিন গেল,পুকুরের জল আরো কালো হয়ে উঠল। কেউ জানল না এর কারণ। এ রহস্যের উদঘাটন শুধু সাবিরের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে আবহমান কাল। অহেতুক জমে থাকা এক মিথ্যের দাফন বকেয়া হয়ে রইল।


2 মন্তব্যসমূহ
খুব ভালো গল্প।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ।
উত্তরমুছুন