তাহার বেন জেলৌনের সাক্ষাৎকার : দ্য প্যারিস রিভিউ আর্ট অফ ফিকশন সাক্ষাৎকার


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : শুশা গুপি
ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

সমকালীন ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক তাহার বেন জেলৌন ‘পবিত্র রাত্রি’ (লা নুই সাক্রে) উপন্যাসের জন্য ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার 'প্রি গঁকুর'-এ ভূষিত হন যা ছিল কোনও আরব লেখকের প্রথম বই। বেন জেলৌন গত কয়েক বছর ধরে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তার উপন্যাসের পটভূমি মরক্কো- সাবেক ফরাসি উপনিবেশ মরক্কো, সাবেক ফরাসি উপনিবেশের স্বাধীনতার পরের মরক্কো।

বেন জেলৌন মরক্কোর ফেজ-এ জন্মগ্রহণ করেন, ১৯৪৪ সালে। বাবা ছিলেন দোকানদার; মরক্কোর সউক শহরের মশলা বিক্রি করতেন, সন্ধ্যায় করতেন খলিফার কাজ- আরব পুরুষদের পোশাক ‘জিলাবা’ তৈরি করতেন।

৫ বছর বয়সে বেন জেলৌন স্থানীয় কোরানিক স্কুলে ভর্তি হন, সেখানে কোরানের আয়াত মুখস্ত করতে শিখেছিলেন, পরে তিনি একটি ফরাসি-আরব স্কুলে ভর্তি হন, ফরাসি এবং আরবি অধ্যয়ন করতে, তারপর- দর্শন বিষয়ে রাবাত বিশ্ববিদ্যালয়ে করেন উচ্চতর পড়াশোনা।

১৯৭১ সালে, ২৬ বছর বয়সে, বেন জেলৌন সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন বলে ফ্রান্স আসেন। সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে কিছুদিন প্যারিসে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে ফেজ শহরের এক বৃদ্ধ গণিকাকে নিয়ে লেখেন প্রথম উপন্যাস 'স্বপ্নের নির্জনতা'। উপন্যাসের পাশাপাশি গল্প, কবিতা এবং ‘মেয়েকে বর্ণবাদ ব্যাখ্যা’সহ বেশ কয়েকটি প্রবন্ধের বই আছে তার যেগুলো বহু ভাষায় অনূদিত। ‘আহমেদ/জাহরা’র করুণ জীবন নিয়ে লেখা ট্রিলজি’র জন্য তিনি বেশি পরিচিটি পেয়েছেন, ট্রিলজির প্রথম ভাগ ‘বালির শিশু’ দ্বিতীয় ভাগ ‘পবিত্র রাত’ এবং শেষ ভাগ ‘ভুল রাত’। ‘বালির শিশু’ (লঁফঁ দ্য সাবল্) উপন্যাসের মাধ্যমে তাহার বেন জেলৌন বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান।

অনূদিত এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয় প্যারিসের স্যঁ-জার্মা-দে-প্রে-তে বেন জেলৌনের অফিসে যার অবস্থান তার প্রকাশক ‘আদিসিওঁ দ্যু সৌল’ এবং ক্যাফে দ্য ফ্লখ থেকে কয়েকশ গজ দূরে দীর্ঘ এক বুলভারের পুরোনো ব্লকগুলোর একটিতে, যেখানে প্রায়শই তাকে বন্ধুদের সঙ্গে আডা দিতে দেখা যায়, যেখানে আছে প্রচুর বই, কাগজপত্র, চেয়ার, টেলিফোন, একটি বড় রাইটিং ডেস্ক আর ওয়ার্ড প্রসেসর; অফিসঘরে চমৎকার নৈঃশব্দ্য; রাস্তার ট্র্যাফিকের শব্দ থেকে কক্ষটি নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে আর ডালপাতা ভেদকরা আলোয় খোলা জানালাগুলো উদ্ভাসিত। তার কথা বলবার ভঙ্গি আন্তরিক। উত্তর-আফ্রিকান ঢঙে অনর্গল ফরাসিতে কথা বলেন।

সাক্ষাৎকারটি প্রখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা প্যারিস রিভিউ-এ আর্ট অফ ফিকশন সাক্ষাৎকার বিভাগে ছাপা হয় ১৯৯৯ সালের শরৎ সংখ্যায়-
.....................................................................


শুশা গুপি: 
জন্ম ও বেড়েওঠার দিক থেকে আপনি মরক্কান, আপনার মাতৃভাষা আরবি কিন্তু লেখালেখির জন্য আপনি মূলতঃ ফরাসি ভাষাকেই বেছে নিলেন; আমি কি জানতে পারি- কেন?

তাহার বেন জেলৌন: 
হ্যাঁ… আমি আসলে- দ্বিভাষিক; আমার প্রথম ভাষা আরবি, তা হলেও আমি কিন্তু ফরাসি-মরক্কান দ্বিভাষিক স্কুলেই পড়তে শুরু করি। একদম তরুণ বয়সে–কোনও রকমের সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাড়াই–যখন লিখতে শুরু করি, তখন ফরাসি ভাষায় লিখতেই বেশি আনন্দিত বোধ করতে থাকি; ফরাসি কোনও সচেতন পছন্দ ছিল না।

শুশা গুপি: 
আরব লেখকদের চেয়ে ফরাসিদের লেখাই বেশি পড়েছিলেন বলেই কি?

বেন জেলৌন: 
আপনার কথাটিই ঠিক। আরবি আমার কাছে এমন কিছু ছিল যাকে আমি কোনওদিনই হারাবো না, তাই এ-ভাষাটির জন্য আমার বিশেষ কিছু চেষ্টার দরকার ছিল না। ভেবেছিলাম–অনেকটা অসচেতনভাবেই–আমার শক্তিকে অন্য একটি ভাষা দিয়ে প্রকাশ করব। বিষয়টি আমার কাছে দারুণ উদ্দিপক ব্যাপার ছিল, প্রায় চ্যালেঞ্জের মতো; আমার ২০ বছর বয়সে যখন স্থিরসংকল্প নিয়ে লিখতে শুরু করি, মনে তখন কোনও সন্দেহ ছিল না যে আমাকে ফরাসিতেই লেখালেখি করতে হবে, যদিও তখনও আমি আরবি এবং ফরাসির মধ্যে যে কোনও একটিকে ইচ্ছাকৃত পছন্দ করিনি; বেছে নেওয়াটি স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে। আরববিশ্বের বুদ্ধিজীবীরা আরবিতে না লেখার জন্য আমার সমালোচনা করেছেন, কখনও খুব আক্রমণাত্মকভাবে; তাদের সমালোচনা আমার জন্য বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল, আমার মনে হয়েছিল তারা সন্দেহজনক কথাবার্তা বলছেন, বিষয়টি বুঝতে চাইছেন না।

শুশা গুপি: 
নিঃসন্দেহে আপনার ‘গঁকুর’ জেতার পর স্বীকৃতি, সাফল্য ইত্যদির সমান্তরালে কিছুটা ঈর্ষাও…

বেন জেলৌন: 
সম্ভবত… কিন্তু আমার উত্তর হলো আমি যে-ভাষায় লিখি আমি তার উপর আমি মাস্টারি করতে পারি। আরবিতে আমি গদ্য লিখতে পারি কিংবা বক্তৃতা দিতে পারি কিন্তু উপন্যাস নয়। আরবির প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে কিন্তু অন্য ভাষাটির প্রতি নির্বিচার অন্যায় করতে পারি না। কিছুতেই না।

শুশা গুপি: 
আরবি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, নমনীয় একটি ভাষা; দুই বা তিনটি ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে গঠিত একটি শব্দমূলের সাহায্যে আপনি সূক্ষ্মতা এবং অলঙ্কারের পুরো শব্দভাণ্ডার তৈরি করতে পারেন। এ ভাষায় উচ্চমর্যাদার কাব্য ও গদ্যসাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। অধিকতর অর্থে, আরবি পবিত্র ভাষা যেমন হিব্রু পবিত্র— ঈশ্বর স্বয়ং এ ভাষায় কথা বলেছেন। এখন, আপনি যেমনটি বলেন, অনেকেই এভাষায় লিখতে দ্বিধা বোধ করেন। আপনি স্কুলে এই ভাষায় পড়াশোনা করেছেন?

বেন জেলৌন: 
লিসে-তে (lycée) আমরা চিরায়ত আরবি সাহিত্য পড়েছি; তারপর যেদিন সে সাহিত্যের অনুবাদ শুরু করলাম, তখন এ ভাষার ঐশ্বর্য, প্রাচীনত্ব, সূক্ষ্মতা ও নিগূঢ়তা সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলাম। খুবই সচেতন। আমার মনে হয়েছিল আরবির সঙ্গে ঝালাইমিস্ত্রিগিরি না করাই উত্তম, যেহেতু এটি একটি পবিত্র ভাষা, কোরানের মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রদত্ত, সুতরাং ভাষাটি ভীতিজাগানিয়া; এই ভাষার সামনে নিজেকে ছোট মনে হয়। পরে কোনও একদিন, আদোনিস—লেবাননের প্রখ্যাত কবি—আমাকে বলেছিলেন যে আরবি ভাষায় এমন একজন শক্তিশালী লেখক নেই ভাষাটিকে যিনি নতুন প্রাচুর্যে গড়বেন, ভাষাটিকে বশ করতে সক্ষম হবেন। কেউ কেউ ইংরেজিকে শেক্সপিয়ারের ভাষা বলি, ইতালিওকে দান্তের ভাষা বলি কিন্তু আরবিকে কেউ আল-গাজালির ভাষা বলি না— সর্বদাই আরবি কোরানের ভাষা। এখানে এসেই সব শেষ হয়ে যায়, আমরা আর কিছুই করতে পারি না; দমে যাই, বাধাপ্রাপ্ত হই। লেখক নিজেকে পুরোপুরি অপরাধী মনে করবেন যদি তিনি এই ভাষার নতুন নির্মাণ ও সৃষ্টির কাজ করতে যান।

শুশা গুপি: 
তবুও কথাটি বলতে হবে যে- ফরাসি বা ইংরেজিতেই লেখা দরকার, তাতে বিপুল সংখ্যাক পাঠকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।

বেন জেলৌন: 
এই কথা বলছেন! এটি আসলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আরব বিশ্বের বাজে ভাবমূর্তির প্রতিফলন, আরব সংস্কৃতির বিকাশকে যা বহুলাংশে প্রভাবিত করে। এটা অন্যায়, অসমতা—বহু মহান আরব কবি আছেন যারা আজও অচেনা, অপরিচিত। একটি দেশের সংস্কৃতি তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। আরবিকে আজ দুইশ মিলিয়ন মানুষের ভাষা আর ফারসি ভাষাকে তেহরানের মোল্লাদের ভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়। আরবি, ফারসি দুই-ই আজ সংখ্যালঘু ভাষায় পরিণত হয়েছে আর পাশ্চাত্যের দৃষ্টি দূরপ্রাচ্যের দিকে চলে গেছে, লোকে হঠাৎ করেই চীন জাপানের কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে মজতে শুরু করেছে, আবিষ্কার করছে। আরব দেশ নিয়ে কারও কিছু করার নেই, আগ্রহ নেই- যতক্ষণ পর্যন্ত আরব দেশগুলির চিত্র রাজনৈতিকভাবে অস্পষ্ট থাকবে, আরব সংস্কৃতিকে এই পরিণতি তো ভোগ করতেই হবে।

শুশা গুপি: 
জন আপডাইক একবার কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন যে তিনি যখন মিশরে গিয়েছিলেন—নাগিব মাহফুজের নোবেল পাওয়ার আগে—সেখানে তিনি এমন কয়েকজন লেখকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন যাদের লেখা বিস্ময়কর, যারা পশ্চিমে অপরিচিত, একদমই অচেনা; যেখানে তিনি সহ অন্যান্য অ্যাংলো-স্যাক্সন লেখকরা হাঁচি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুবাদ এবং বিশ্লেষণ শুরু হয়ে যায়, ডজনখানেক ভাষায় সারা বিশ্বে মন্তব্যের বান ডেকে যায়…

বেন জেলৌন: 
সে তুলনায় আমাদের আগ্রহ কিন্তু পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অনেক বেশি। আমেরিকায়, আমি যেমন ফকনারের উপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারব, তেমনি অন্যান্য আরব বুদ্ধিজীবীরাও বলতে পারবেন; দেখা যাবে- কেউই তেমন বিস্মিত হচ্ছে না, যেন এটাই স্বাভাবিক; সেখানে, পশ্চিমে, আরব লেখকদের সম্পর্কে জানাশোনা প্রাচ্যবিদ নামে পরিচিত স্বল্পসংখ্যক বিশেষজ্ঞের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আশা করি সেদিন খুব বেশি দূর নয় যেদিন এ-অবস্থার পরিবর্তন হবে, শীঘ্রই মানবকল্যাণে সারাবিশ্বে আরবি ও ফারসি সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হবে।

শুশা গুপি: 
আমিও তাই মনে করি। হয়তো আমরা খুব আশাবাদী। আপনি কি মনে করেন যে আপনি যদি আরবিতেই লিখতেন তবে আপনার বইগুলি অন্যরকম হত?

বেন জেলৌন: 
খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্যরকম হতো কারণ ভাষা শুধুমাত্র একটি সাধনী (টুল) নয়, বরং মানসিক প্রক্রিয়ার একটি সেট (সমন্বয়), সেইসাথে ভাষা নির্দিষ্ট সংস্কৃতির এমন এক লাগেজ যে লাগেজকে একজন ভ্রমণকারী তার নিজের সঙ্গে বহন করে। ফরাসিভাষী সংস্কৃতি আরব-ভাষী সংস্কৃতির চেয়ে বেশি বিকশিত। এছাড়াও, আমি যেমন বলেছি- আরবি একটি পবিত্র ভাষা, আরব লেখকরা তাতে আতঙ্কিত, তারা এই ভাষায় বহুকিছুই লিখতে পারেন না।

শুশা গুপি: 
আপনার বই কোন দিক থেকে ভিন্নধর্মী?

বেন জেলৌন: 
থিমের দিকটি দেখতে পারেন। কিছু কিছু বিষয়ই এমন যাকে কিছুতেই আমি আরবিতে মোকাবেলা করতে পারতাম না, যেমন- যৌনতা বা ধরুন নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রের ধর্মীয় আচরণের সমালোচনা। এগুলো এতোই সূক্ষ্ম বিষয় যে এ নিয়ে খুব সাবধানে এগোতে হয়। সাবধান না হলে বিভিন্ন ধরণের বাধার সম্মুখিন আমাকে হতে হতো।

শুশা গুপি: 
যৌনতাকে যে কোনও উপায়ে মোকাবেলা করেন?

বেন জেলৌন: 
চতুর্দশ, পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দির ধ্রুপদী আরবি সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ইরোটিক (কামোত্তেজক) লেখা রয়েছে; চতুর্দশ শতাব্দির লেখক শায়খ নাসজাভি’র আতরগন্ধী তৃণভূমি (দ্য সেন্টেড মেডৌ) হচ্ছে আরব বিশ্বের কামসূত্র। আমিও একই ধারায় লিখতে পারতাম। কিন্তু কেউ যৌনতার মতো বিষয়গুলোর ব্যবহার সম্পর্কে অনেক সময় নিশ্চিত হতে পারে না, যখন কেউ লিখতে শুরু করে তখন সে শতভাগ অনিশ্চিত থাকে যে সে আসলে কোথায় যাচ্ছে, কতদূর যাচ্ছে, কারণ যৌনতা এমন একটি ব্যাপার যা খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটে। আমি মনে করি আরবি ভাষাতেও যৌনতার মোকাবেলা সম্ভব, কিন্তু এ-ভাষায় এত ওস্তাদ আমি এখনও হতে পারিনি।

শুশা গুপি: 
ভারতীয় কামসূত্র তো আছেই, আরও আছে আরব কবিদের তীব্র সব কবিতা; এখানে, উদাহরণস্বরূপ, কবি আবু নাওয়াজের নাম বলা যায় কিন্তু ইরোটিক-অভিব্যক্তি সংস্কৃতি এবং ভাষার মধ্যে ভিন্ন। পাশ্চাত্যে, আরবি কামোত্তেজক লেখা আমাদের থেকে ভিন্ন কোন উপায়ে?

বেন জেলৌন: 
আমি মনে করি পশ্চিমের তুলনায় প্রাচ্যের ইরোটিসিজমের একটি বেশ বড় এবং নিগূঢ় ধারণা রয়েছে, উদাহরণস্বরূপ- সহস্র এক আরব্য রজনীতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইরোটিক উপাদান রয়েছে যা প্রাচ্যকে বোঝার অন্যতম চাবিকাঠি কিন্তু এসব নিয়ে আজ বিশদ আলাপের পথ রুদ্ধ আরব বিশ্বের সেন্সরশিপ এবং অতিশালীনতাবোধের কারণে, এবং সম্ভবত মৌলবাদীদের ভয়ে মানুষ কিছুটা ভীত।

শুশা গুপি: 
আজ যদি উত্তর আফ্রিকায় থাকতেন, আরবিতেই লিখতেন, সেখানকার ধর্মীয় মৌলবাদী আবহাওয়ায় আপনি কি লিখতে পারতেন?

বেন জেলৌন: 
কোনও কিছু লেখাই তখন অসম্ভব এবং আত্মঘাতী হবে। মৌলবাদ স্বাধীনতার পরিপন্থী; একজন লেখকের স্বাধীনতা শুধু ডেস্কে বসে লেখার স্বাধীনতাই নয়, তা অনেক ব্যাপক- স্বাধীন চিন্তা করা, নিজেকে সীমাহীন প্রকাশ করা। মৌলবাদী একটি সমাজ কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না শুধু নীরবতা ছাড়া, শুধু নির্বাসিত কিছু লেখক দূরে বসে সৃষ্টির কাজটি চালিয়ে যেতে পারেন।

শুশা গুপি: 
প্রথম উপন্যাসের আগেই আপনার কবিতার বই…

বেন জেলৌন: 
 হ্যাঁ। একদিন ফ্রাঁসোয়া মাপোরো'র প্রকাশনা সংস্থার দপ্তরে গেলাম, সেখানে তার স্ত্রী ছিলেন, পাণ্ডুলিপিটি তার হাতেই দিলাম। তিনি তাদের কবিতাসংগ্রহ শাখার দায়িত্বে ছিলেন। একদিন জানালেন- বইটি তারা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারপর… সমালোচক এবং পাঠকরা বইটিকে আগ্রহের সঙ্গে নিলেন। তারা বইটির ২ হাজার কপি ছাপিয়েছিলেন, তখনকার দিনে যা বিশাল ব্যাপার ছিল।

শুশা গুপি: 
সে সময় ফ্রান্সে উত্তর আফ্রিকার আরও দু-একজন লেখক ছিলেন না কি আপনি ছিলেন বিরল একজন?

বেন জেলৌন: 
তখন- আরও ক’জন ছিলেন, বিশেষ করে আলজেরিয়ান লেখকদের একটি পুরো প্রজন্ম পঞ্চাশের দশকে সক্রিয় ছিলেন- কাতেব ইয়াসিন, মোহাম্মেদ দিব, জন পেলেগ্রিনি, তে. আমরুশ এবং আরও কয়েকজন, যাদের কাজের মূল ভিত্তি ছিল আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ। লেখক হিসেবে আমার এগিয়ে যাওয়াটি ছিল কিছুটা ধীর গতির। লেখালেখিতে আমি সত্যিকার নিবেদিত ছিলাম। প্রক্রিয়াটি আজকের দিনের মতো ছিল না যেখানে সবাই তিন মাস ধরে কোনও একজন লেখকের কথা বলে তারপর তার কথা ভুলে যায়, লেখক কোনও চিহ্ন ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে যান। হারিয়ে যান। তখন ‘স্বপ্নের নির্জনতা’ (Harrouda) মাত্র ৩ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল, কিন্তু পরের আরও উজ্জ্বল সাফল্যের বিপরীতে, প্রথম প্রকাশের ২৪ বছর পরেও উপন্যাসটি টিকে আছে, এখনও বইয়ের দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। লোকে পড়ে।

শুশা গুপি: 
‘স্বপ্নের নির্জনতা’ অদ্ভুত প্লটের ‘লিটারারি’ উপন্যাস। সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে লিখেছিলেন?

বেন জেলৌন: 
ফেজ নগরে (ফেজ উত্তরপূর্ব মরক্কোর একটি শহর যাকে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়) একজন বৃদ্ধ গণিকা ছিলেন যিনি তখনও কিশোরদের কল্পনাতাড়িত করতেন, যাদের একজন ছিলাম আমি; উপন্যাসে আমি তাকে সন্তে পরিণত করেছিলাম।

শুশা গুপি: 
আপনার লেখক জীবনের সত্যিকার সাফল্য এসেছে ‘গঁকুর’ দিয়ে। আপনিই প্রথম আরব লেখক, প্রকৃতপক্ষে- প্রথম ভিনদেশী লেখক, যিনি এটি পেয়েছিলেন।

বেন জেলৌন: 
আফ্রিকার একজন লেখক (রজে ভেখসেল) যিনি ১৯৩৪-এ প্রি গঁকুর জিতেছিলেন, কিন্তু ৮৭-তে যখন আমার উপন্যাস পুরস্কারটি জিতেছিল তখন কেউ তার নাম বলেনি, ধরে নেওয়া হয়েছিল যে আমিই প্রথম ছিলাম। পুরস্কার আমাকে বিপুল পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে কিন্তু দু’বছর আগের উপন্যাস ‘বালির শিশু’ (লঁফঁ দ্য সাবল্) বেস্ট সেলার হয়েছিল, দেড় লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। যখন ‘পবিত্র রাত্রি’ গঁকুর পেল তখন এ-বইটি আমার অন্য বইগুলোকেও একসঙ্গে বহু পাঠকের কাছে পৌঁছে দিল।

শুশা গুপি: 
লিসে’র (ফরাসি কলেজ) সিলেবাসের বাইরের কোন লেখক আপনাকে লিখতে প্রেরণা দিয়েছেন?

বেন জেলৌন: 
শুনে অদ্ভুত লাগতে পারে- আমার লেখার প্রস্তুতিপর্বে লেখকদেরকে প্রেরণা হিসেবে নিইনি, নিয়েছি চলচ্চিত্রকারদের প্রেরণা, অল্প কয়েকজন নির্মাতা আমার ভিত গড়ে দিয়েছেন (ওরসন ওয়েলস, ফেদেরিকো ফেলিনি, ইয়াসুজিরো ওজু, আকিরা কুরোসাওয়া, মাইকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনি)—যারা গল্প বলতেন; আর অবশ্যই জ্যাঁ পল সার্ত্র, কামু, জঁ জেনে এবং অন্যদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ছিল আমার উপর। লেখক-জীবনের শৈল্পিক পিতৃত্বের জন্য আমি ঔপন্যাসিকদের চেয়ে ওয়ালেস এবং ইয়াসুজিরো ওজু-কে গভীর মনোযোগে দেখেছিলাম!

শুশা গুপি: 
চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে চেয়েছিলেন?

বেন জেলৌন: 
তা হতে চেয়েছিলাম, এমনকি আমি L’Institut des Hautes Etudes Cinématographiques-এ পড়তেও চেয়েছিলাম কিন্তু খুব শীঘ্রই বুঝতে পেরেছিলাম যে চলচ্চিত্র বিস্তৃত এক শিল্পমাধ্যম, বেশ জটিল; একটি শিল্পমাধ্যম যখন বহুসংখ্যক শিল্পী, কলাকুশলী এবং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে তখন একা একজনের পক্ষে শিল্পস্রষ্টা হওয়া সম্ভব নয়। চলচ্চিত্রের প্রতি আমার যে ভালোবাসা তাকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছার সঙ্গে। তাই এ পথ আর মাড়াইনি। ছেড়ে দিলাম।

শুশা গুপি: 
ফরাসি দেশে চলচ্চিত্র গভীর আবেগের বিষয়, ফরাসিরা জিনিসটা আবিষ্কার করেছিল; আপনি যখন এখানকার ছাত্র ছিলেন, তখন হলে ছবি দেখতে যেতেন, যেমনটি আমরা সবাই করেছি?

বেন জেলৌন: 
চিত্রকল্পের (ইমেজের) প্রতি আমার বরাবরের মুগ্ধতা; কীভাবে একটি গল্পকে চিত্রিতভাবে—ইমেজের ভেতর দিয়ে—বলা হয়, যা একজন ওয়ালেস কিংবা একজন হিচকক করে দেখিয়েছেন— আমাকে এ বিষয়টি বেশি টেনেছিল। ছবির রিল ঘুরতে শুরু করার প্রথম কয়েক মিনিটে আপনি চরিত্র এবং পরিস্থিতির উপস্থাপনা করেন, তারপর আপনি নাই হয়ে যান। আজকের মার্কিন চলচ্চিত্র বাস্তববাদী হওয়ার কঠিন চেষ্টা করে— পর্দায় আপনি দেখছেন কেউ কফি খাচ্ছে, রেস্তোরাঁ কিংবা বারে, কেউ কারও মুখে ঘুষি মারছে ইত্যাদি ইত্যাদি…কিন্তু ওজু (ইয়াসুজিরো ওজু) এবং ওয়ালেস এরকম বাস্তবের অনুলিপি করেননি। চলচ্চিত্রে সবচে গুরুত্বপূর্ণ যা তা হলো- একটি গল্প তৈরি করা, তারপর দর্শকদের গল্পটিকে বিশ্বাস করানো; যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো ছবিঘরের অন্ধকারে বসে থাকা একজন দর্শককে কল্পনায় অন্য এক মহাবিশ্বে নিয়ে যাওয়া। উপন্যাসে আমি এটাই করার চেষ্টা করি।

শুশা গুপি: 
আপনি চলচ্চিত্রে নিমজ্জিত ছিলেন, কিন্তু ব্যাপক পড়াশোনাও করেছেন। কাদেরকে বেশি পড়েছেন?

বেন জেলৌন: 
স্টেইনব্যাক, দজ পাসোজ আর ফকনার দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই কৈশোরে, তবে- লেখক হতে যে-লেখ
ক আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন তিনি জয়েস, তার মতো লিখতে চেয়েছিলাম বলে নয় বরং তার দুর্দান্ত দুঃসাহসের জন্য; আমি ভেবেছিলাম- জয়েস যদি এতোটা সাহসী হতে পারেন তো আমারও হওয়া উচিত। আমি যখন মিলিটারি ব্যারাকে ছিলাম, তখন এক বন্ধুকে মোটা একটি বই খুঁজে বের করে পাঠাতে বললাম। ব্যারাকে পড়ার অনুমতি ছিল না। বইটি গোপনে পড়ি। আসলে এমন একটি বই পড়তে চেয়েছিলাম যা ভেতরে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। এ বই পড়ে তো আমি বজ্রাহত! তবে তার ‘ফিনেগ্যানস ওয়েক’ পড়তেই পারিনি, পড়তে কখনওই সফল হইনি।

শুশা গুপি: 
তবুও আপনি আধুনিক কবিতা পছন্দ করেন, যা অন্ধকারময় এবং ঝাপসা, তা না হলেও দৃষ্টিরোধকারী এবং দুর্বোধ্য।

বেন জেলৌন: 
দুর্বোধ্য কবিতা কোথাও থাকে না, কোনও অস্তিত্ব নেই অথবা এসব কবিতা কবিতাই নয়, অন্য কিছু। প্রকৃত কবিতা কখনওই দুর্বোধ্য নয়; এমনকি মালার্মেও বোধ্য। আমি সাঁ জন পার্স, রেনে শার, ইয়েভে বোনফয়ের কিছু কিছু কবিতা এবং লুই-রেনে দে ফরেতের কবিতাগুলোকে ভেতরে যাপন করেছি। আমাকে প্রায়ই কবিতার বই পাঠানো হয়, কবিতাগুলো পড়ি আর মনে মনে বলি- এসব স্রেফ বাজে কথা, প্রকৃত কবিতা দুর্বোধ্য নয়, এর সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক নেই; মাঝে মাঝে মানুষের কিছু বলার থাকে না অথবা বলার মতো কিছুই থাকে না, তবু তারা কবিতা সম্পর্কে বাজে কথা বলেই চলেছে! গোদারের (জঁ-লুক গোদারের) কথা ভাবুন : আমি তার প্রথম দিকের ছবিগুলোয় মজে ছিলাম, সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল, একদিন একটি অদ্ভুত ব্যাপার আবিষ্কার করলাম- তিনি এমন একজন নির্মাতা ছিলেন যার আর কিছু বলার ছিল না। গোদারের টেকনিক (কৌশল) ছিল- ইমেজগুলোকে নিপুনভাবে পরিচালনার দুর্দান্ত কৌশল। তার ছবিগুলোর প্রতি এখন আমার আর আগ্রহ নেই, এগুলো শূন্যগর্ভ। নির্দিষ্ট কিছু কবিদের ক্ষেত্রেও তাই। ফলস্বরূপ আমি অনুভব করি যে এই মুহূর্তে কবিতার অনুপস্থিতি, অন্তত পশ্চিমে, এমন হয়েছে যেন মানুষ আর কবিতা লিখতে সাহসই পাচ্ছে না। ফরাসি রেজিস্তন্স (La Résistance) গোষ্ঠী আরাগঁ, এলুয়ার, রেনে শারের মতো কবিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দুর্দান্ত সব কবিতা লিখেছিল। একজন ফরাসি কবিকে আজ কী বলার আছে? ল্য পেনের বিরুদ্ধে একটি কবিতা লিখবেন? বেকারত্ব সম্পর্কে? তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যা? এগুলো চক্রাকার থিম, সাময়িক বিষয়।

কোয়েলহোর এলকেমিস্টের মতো একটি মামুলি উপন্যাস এগারো মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে, এর কারণ হলো মানুষ একধরনের আধ্যাত্মিকতা খুঁজছে, তাদের আশ্বস্ত করা দরকার, ভরসা দেওয়া দরকার কিন্তু এ হচ্ছে বাজারের চালাকি আধ্যাত্মিকতা, বড় বড় চেইনশপগুলোর আধ্যাত্মিকতা।

শুশা গুপি: 
আজকের গদ্যকারদের লেখায় অনেক পাঠকই কবিতা খুঁজে পান এমনকি ইংরেজি গদ্যেও। আমি মনে করি- আপনার বইগুলোর সাফল্য কিছুটা হলেও আপনার কবি-সংবেদনের কারণে।

বেন জেলৌন: 
এ তো আমার আরব উত্তরাধিকার। যখন গল্প লিখি (বলি), নিজেকে তখন মরক্কান মনে করি, মরক্কান গল্পকারদের মতো গল্পটি লিখি—চিত্রকল্প এবং নির্মাণ সবসময় বাস্তবসম্মত হয় না কিন্তু সেখানে কবিতা থাকে।

শুশা গুপি: 
আরব্য রজনী (এক হাজার এক রাত্রি) খুবই সচিত্র—লেখক এখানে ছবি আঁকেন, কারণ মূলত এই গল্পগুলো মৌখিকভাবে বলা হয়েছিল, এবং গল্পকারদের তাদের শ্রোতাদের মনোযোগ ধরে রাখতে হয়েছিল অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধ করার মাধ্যমে। আপনিও আপনার গল্প বলেন এই প্রাচ্য-সূচক ধারায়…

বেন জেলৌন: 
না, আমি এরকম করি না; আমি আরব্য রজনীর কথকের মতো কোথাও ছদ্মবেশ পরানো পছন্দ করি না, আরব ইতিহাসের নির্দিষ্ট কোনও সময়ের উল্লেখও করি না, তবু যখন লিখি, তখন মনে হয়- আরব সংস্কৃতিতে বাস করছি– আমার লেখায় ‘কবিতা’র উপস্থিতির জন্য আমি অন্তত এই একটিই যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারি। বর্ণনার কৌশলের (ন্যারেটিভ টেকনিক) জন্য আমি রলাঁ বার্ত প্রভাবিত; টেক্সট এবং লিটারেচারের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর প্রবন্ধগুলি পড়ে খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম। ফরাসি ‘নুভো রমাঁ’ (নতুন উপন্যাস) আমাকে চরম বিরক্ত করেছিল, নিজে এরকম উপন্যাস লিখতে চাইনি। আমি যা করেছি, এ একান্তই আমার নিজের : উপন্যাসের রূপরেখা, ছায়ারেখা একান্তই আমার। স্টাইলটি মরক্কান, কিন্তু মরক্কানরা তা মনে করে না!

শুশা গুপি: 
আপনার উপন্যাসগুলোর বিষয়বস্তু (থিম) মরক্কান—গল্প সর্বদা মরক্কো না হয় উত্তর আফ্রিকার পটভূমিতেই থাকে।

বেন জেলৌন: 
হ্যাঁ, ঠিক; থিমগুলি মাগরেবি (মাগরেব, ফরাসি ভাষায় ‘Le Maghreb’ হচ্ছে উত্তর আফ্রিকার একটি অঞ্চল যা দিয়ে মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও মৌরিতানিয়াকে বুঝানো হয়); গভীরতর মারগেবি- এর কারণ— এই জনগোষ্ঠী এমন কিছু ব্যাপারে একীভূত যা আমাদের ভাবাবেই; মুসলিম সমাজে নারী-পুরুষ সম্পর্ক, রাষ্ট্র এবং আইনের মধ্যকার সম্পর্ক, ব্যক্তি এবং সমষ্টিগত সম্পর্ক ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনকে বহু দিক দিয়ে জটিল করে ফেলে।

শুশা গুপি: 
তৃতীয় বিশ্বের সব দেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের (ইসলামি) দেশগুলোতে আধুনিকতা ও পাশ্চাত্যের সংস্পর্শের ফলে পালাবদলের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এরকম একটি টালমাটাল অবস্থায়, আপনার প্রথম দুর্দান্ত সাফল্য, ‘বালির শিশু’র ঘটনা- একটি মেয়ে শিশুর গল্প যার যেখানে তার বাবা মা ভান করে যে মেয়ে নয় এবার ছেলে হয়েছে; ইতিমধ্যে তারা ছ’টি মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছে, একটিও ছেলে জন্ম দিতে না পেরে তারা লজ্জিত। পরে, মেয়েটিকে অবিশ্বাস্য করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। গল্পটি কি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখেছিলেন?

বেন জেলৌন: 
না। সত্য ঘটনা নয়। উত্তর আফ্রিকার নারীদের অবস্থা নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শিক্ষামূলক, জঙ্গি পদ্ধতিতে নয়, আমার মতো করে। আমি ’৮০’র দশকের নারীবাদী সাহিত্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে চেয়েছিলাম, যে-নারীবাদ ছিল অলঙ্কৃত, তীব্র এবং অকল্পনীয়। ভেবেছিলাম যে আমি যদি এমন একটি শিশুকে নিয়ে কিছু লিখি যার ভাগ্য স্বাভাবিক গতিপথ থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে, যে একই সঙ্গে উভয় অবস্থাতে বাস করে— পুরুষ এবং স্ত্রীলিঙ্গ, তাহলে আমি কিছু সমস্যা তুলে ধরতে পারব।

শুশা গুপি: 
‘পবিত্র রাত্রি’ (লা নুই সাক্রে) উপন্যাসটি ‘গঁকুর’ জিতেছে, কিন্তু গল্পটি তখনও শেষ হয়নি, চলছে, চলতে চলতে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ‘পবিত্র রাত্রি’ উপন্যাসটি ট্রিলজির ২য় খণ্ড যার তৃতীয়টি হল ‘ভুল রাত’ (লা নুই দ্য লেরর)। ১ম খণ্ড ‘বালির শিশু’র বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য সমাপ্তি ছিল, সবকয়টি সম্ভাবনাকে আপনি প্রাচ্যের গল্পকারদের রীতিতে লেখায় ধরেছেন কিন্তু গল্পটিকে আরও বহুদূর চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাকে একটি রীতিকেই প্রধানত বেছে নিতে হলো। কীভাবে করলেন?

বেন জেলৌন: 
এ ট্রিলজির পাঠকরা কিছুটা ভূমিকা রেখেছেন, তারা অবিরাম চিঠি লিখে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন, আরও কিছু পড়তে চেয়েছিলেন। উপন্যাসের দ্বৈত লিঙ্গ-পরিচয়সহ প্রধান চরিত্র আহমেদ/জাহরার কী হয়েছে? শেষ পর্যন্ত তার কী হবে? আমি বহু চিঠি পেয়েছি। ট্রিলজিটি ছিল অন্ধবিশ্বাস কিংবা গোঁড়ামি ছাড়া নারীর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বলার একটি উপায়।

শুশা গুপি: 
যদি পাঠকরা ট্রিলজির গল্পের ব্যাপারে না বলতেন, আরও বড় করে লিখতে না বলতেন, তাহলেও কি আপনি গল্পটির উত্তরভাগ (সিক্যুয়াল) লিখতেন?

বেন জেলৌন: 
আমরা হয়তো অন্যভাবে কিছু করতাম, অনেক সম্ভাবনা ছিল এগিয়ে যাওয়ার; আর একটি কথা, খুবই গুরুত্বপূর্ণ- যদি গল্পটির বহুবিস্তৃতির সম্ভাবনা না থাকতো, তাহলে কিন্তু পাঠকরা নীরব থাকতেন, তারা আর কিছুই জানতে চাইতেন না।

শুশা গুপি: 
আপনি বলেছেন, ‘‘নারী হওয়া একটি প্রাকৃতিক/স্বাভাবিক দুর্বলতা যা সবাই মেনে নেয়, পুরুষ হওয়া হচ্ছে একটি ইল্যুশন (বিভ্রম); সহিংসতা এমন কিছু যা সবকিছুকেই ন্যায্যতা দেয়, সমর্থন করে।’’ বিশেষ করে নারীদের লক্ষ্য করে মৌলবাদের উত্তানের প্রেক্ষিতে কি আপনি মুসলিম বিশ্বের নারীর অবস্থা নিয়ে এমনটি ভাবছেন? আমি আপনাকে এই প্রশ্নটি করছি কেননা তথাকথিত মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর নারী নিপীড়নের সমান্তরালে একটি সমৃদ্ধ ইসলামী নারীবাদও কিন্তু আছে।

মুসলিম নারীবাদীরা ইসলামের ইতিহাস এবং বিভিন্ন মতবাদ থেকে তাদের যুক্তিগুলো তুলে ধরেন, এবং তা প্রমাণ করে যে মুসলিম দেশগুলিতে নারীর উপর সহিংসতার, নিপীড়নের সঙ্গে মূল ইসলাম ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই; এই ধর্ম তাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছে, মুক্ত করেছে, এবঙ এই স্বাধীনতার ফলে, এই মুক্তির ফলে- বহু নারীকে আমরা রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপ্রধান, কবি, মরমি হিসেবে পেয়েছি। সেইসব মুসলিম নারীবাদীর মধ্যে সবচেয়ে বাগ্মী ও প্রজ্ঞাবান একজন হলেন আপনার স্বদেশী, ইতিহাসবেত্তা এবং সমাজতত্ত্ববিদ ফাতিমা মারনিসি।

দ্য ফরগটেন কুইনস অফ ইসলাম, ইসলাম এন্ড ডেমোক্রেসি, বিয়ন্ড দ্য ভেইল- আমি এই বইগুলোর কথা ভাবছিলাম, যেগুলো চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখায়- দুর্নীতিবাজ শাসক ও মোল্লাদের কারণে ইসলাম-প্রতিষ্ঠাতার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ইসলাম কতটা নিন্দিত হয়েছে, কতোটা মূল জায়গা থেকে সরে গিয়েছে। ফাতিমা মারনিসি মনে করতেন- আজকের নারীনিপীড়নের সঙ্গে অনুন্নয়ন, দারিদ্র্য, বিচারহীনতা এবং দুর্নীতির সম্পর্ক রয়েছে, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর এক বিশেষ অসুখ।

বেন জেলৌন: 
হ্যাঁ, তারা ঠিকই বলছেন। পর্দা (অবগুণ্ঠন, নেকাব, মুখাবরণ) সব ধর্মেই আছে, এমন কী খ্রিস্টধর্মেও। সম্মানের চিহ্ন হিসেবে চার্চ, সিনাগগ কিংবা মসজিদে প্রবেশ করলে কেউ কেউ মাথা ঢেকে রাখেন বিশেষ করে প্রার্থনার সময় ব্যাপারটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মূল কথাটি হলো- রাজনীতি ও ধর্মকে আলাদা করা জরুরি। ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয়, যা ব্যক্তি এবং ঈশ্বরের মধ্যে বোঝাপড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং সম্পর্কিত। ইসলামকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলো সবচে খাঁটি ধর্মান্ধতা; উস্কানিমূলক, মানুষের উপর নির্যাতন চালানোর চমৎকার একটি পদ্ধতি। ধর্ম হচ্ছে- যা চিরন্তন তা নিয়ে চিন্তা করে, রাজনীতি প্রকৃতিগতভাবে ঐহিক, পার্থিব। এ দুটিকে আলাদা রাখতেই হবে, না রাখলে মুসলিম দেশগুলো কখনওই অনুন্নয়ন এবং নিপীড়ন কাটিয়ে উঠতে পারবে না।

শুশা গুপি: 
চলুন আবার আহমেদ/জাহরা’য় (ট্রিলজির চরিত্র) ফিরি। কীভাবে সে তার সমস্যার সমাধান করে?

বেন জেলৌন: 
আমার কাজ কিন্তু উত্তর দেওয়া নয় কিংবা সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা নয়; আমার কাজ- জিজ্ঞাসা; আমার কাজ অবিরাম প্রশ্ন করা, মানবিক পরিস্থিতির সাক্ষী হওয়া। আমি গল্পটি বলি এই আশায় যে- গল্পটি পাঠকের অভিব্যক্তিকে উদ্দীপ্ত করবে, তার চিন্তাকে উস্কে দেবে।

শুশা গুপি: 
ট্রিলজি’র খণ্ডগুলো লেখার মাঝখানে ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে ছোট্ট একটি বইও আপনি লিখেছেন, যেখানে আপনি আপনার দীর্ঘদিনের বন্ধুদের কথা বলেছেন যারা আপনার জীবনকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন জ্যঁ জেনে, যার অবদান অনেক বেশি। তিনি অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ, নির্জনতাপ্রিয়, অসামাজিক, নির্লিপ্ত, একা এবং খুব কম লোকের কাছেই পরিচিত। সময়ের দূরত্বে থেকে এখন তিনি এবং তার কাজ সম্পর্কে কী বলবেন?

বেন জেলৌন: 
তিনি বহুগুনান্বিত অসামান্য একজন মানুষ ছিলেন। তখন আমার প্রথম উপন্যাস বের হয়েছে, তার প্রকাশকের মাধ্যমে উপন্যাসের একটি কপি তার কাছে পাঠিয়েছিলাম, কোনও প্রতিক্রিয়ার আশা ছাড়াই, কারণ সবাই জানত যে তিনি কতটা অন্তর্মুখী এবং নির্লিপ্ত…তো একদিন আমার এক কমিউনিস্ট বন্ধু যিনি নিয়মিত L'Humanité পত্রিকাটি (প্রখ্যাত ফরাসি দৈনিক) পড়তেন, আমাকে জানালেন যে কাগজে আমাকে নিয়ে একটি লেখা আছে। দৌড়ে গিয়ে পত্রিকা কিনলাম। লেখাটি মূলত বেশ ক'জন আরব লেখক সম্পর্কে রেডিওতে বলা জেনের কথার একটি গদ্যরূপ, জেনে সার্ত্রকে আক্রমণ করেছিলেন; যে-ক'জন আরব লেখকের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী না হওয়ার জন্য সার্ত্রকে দায়ী করেছিলেন তিনি, তাদের মধ্যে আমিও একজন! আমরা দুর্দান্ত বন্ধু ছিলাম, যদিও তিনি বন্ধুত্বে বিশ্বাস করতেন না, তিনি মনে করতেন স্বাধীনতা এবং বিশ্বস্ততা একসঙ্গে যায় না, বড় বেমানান।

জ্যঁ জেনে বলতেন- লিখছেন যখন, পাঠকদের কথা ভাবুন। সরল হোন। তার এ-কথা আজীবন মনে রেখেছি, অনুসরণের চেষ্টা করেছি; আমি মনে করি- সরলতা পরিপক্কতার লক্ষণ।

শুশা গুপি: 
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বন্ধুত্বের সংস্কৃতি খুবই শক্তিশালী। পারস্যে তো আরও বেশি, বন্ধুত্ব প্রেমের মতোই গভীর। মরক্কোতেও একই রকম?

বেন জেলৌন: 
এখানে একটু অন্য রকম। বন্ধুত্ব আমার নিজের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা- ভিন্ন কিছুটা, বন্ধুত্বের বিপরীত; কিছুটা জটিল, নানা অসুবিধায় ভরা। ভালোবাসা সবসময় থাকে না, সম্পর্ক বদলে যায়, সে বহুকিছুর উপর নির্ভর করে কিন্তু বন্ধুত্ব এর বিপরীত- সরলতায়, স্বেচ্ছায়, দীর্ঘস্থাত্বে ভালোবাসার বিপরীত এবং বিপুল বিস্তারি।

শুশা গুপি: 
‘ভুলের রাত’ আপনার ট্রিলজির তৃতীয় খণ্ড। এই পর্বেও উপন্যাসের মূল চরিত্র একজন নারী। এই মুহূর্তে আলজেরিয়ায় নারীদের বিরুদ্ধে যা ঘটছে, এই লেখার মাধ্যমে কি আপনি প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন?

বেন জেলৌন: 
না, কোনও প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়। উপন্যাসে কিছু নির্দিষ্ট সহিংসতার মোকাবিলা করা হয়েছে যা দীর্ঘদিন ধরে মুখ্য চরিত্রের মধ্যে সুপ্ত ছিল, চরিত্রটি অবশেষে তার চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেয়। গল্পটি বাস্তবের নয়। গল্পটি একজন নারীর সহিংসতা যে-নারী দীর্ঘকাল ধরে নিগৃহীত হয়েছে, সমস্ত নির্যাতিন সহ্য করেছে, অবশেষে- প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু এই নারী প্রকৃত নারী নন বরং তিনি কিংবদন্তির নারী।

শুশা গুপি: 
জাদুবাস্তবতা (ম্যাজিক রিয়ালিজম) যা বিদ্যমান পরিস্থিতিকে দীপিত করবার অত্যন্ত জনপ্রিয় উৎস যেখানে পৌরাণিক উপাদানগুলোকে ব্যবহার করা হয় বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার কিংবদন্তিগুলোকে। আপনি কী মনে করেন? লাতিন জাদুবাস্তবতা-অনুসারী ঔপন্যাসিকরা আপনার থেকে কোন দিক থেকে আলাদা? কোন লেখক বা কাজগুলোকে আপনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেন?

বেন জেলৌন: 
আমি রুলফো, হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি’র লেখা গভীর আগ্রহে পড়ি; মার্কেজের কিছু কিছু উপন্যাসও খুব প্রিয় কিন্তু আমি মনে করি না যে আমরা একই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-শিকড়ে প্রোথিত আর আমি আমার মাটিতে। আমি আলাদা শুধু ইসলাম ধর্মের কারণে নয়, ইতিহাস এবং ভূগোলের বিভিন্ন উপাদানের ভিন্নতার কারণেও।

শুশা গুপি: 
আপনি তো রুশদি-বিষয়ক আন্দোলনে জড়িত ছিলেন?

বেন জেলৌন: 
অবশ্যই জড়িত ছিলাম। আমি তার পক্ষে কথা বলেছি। সমর্থন করেছি। এই প্রতিবাদের বিষয়টি এখন এক প্রতীক এবং প্রয়োজনীয়তা হয়ে উঠেছে। রুশদি’র সমর্থনে কথা বলা মানে- লেখার, কল্পনার, সৃষ্টির স্বাধীনতাকে রক্ষা করা।

শুশা গুপি: 
জীবন যাপনের সঙ্গে লেখার প্রস্তুতি কীভাবে নিয়ে থাকেন?

বেন জেলৌন: 
লেখার জন্য প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। সারাদিন লেখালেখির ব্যস্ততায় কাটে; সন্ধ্যায় স্ত্রী আর চার সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে বাড়ি ফিরে যাই।

শুশা গুপি: 
আপনি কি হাতেই লিখেন?

বেন জেলৌন: 
উপন্যাস আমি হাতেই লিখি। সংবাদপত্রের গদ্যলেখাগুলোর জন্য ওয়ার্ড প্রসেসর ব্যবহার করতে হয় কারণ তাদের লেখাটি অবশ্যই ডিস্কে পাঠাতে হবে।

শুশা গুপি: 
লেখার বীজ কোথায় পান? ধারণাটি কীভাবে মাথায় আসে? আপনি কি উপন্যাস লেখার সময় অন্যান্য কাজ বন্ধ রাখেন?

বেন জেলৌন: 
ভেতরে লেখার যে ধারণা (আইডিয়া) জন্মে তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিপক্ক হতে দিই। লিখতে শুরু করি ঠিক তখন যখন মনে করি এটি এখন লিখে ফেলা জরুরি হয়ে পড়েছে; তারপরই শুরু হয়। লেখার মাঝখানে খুব একটা পড়তে পারি না, আসলে তখন কিছুই পড়া হয় না কারণ তখন আমি সম্পূর্ণরূপে লেখার কাছে সমর্পিত। এটিই একমাত্র কাজ যা আমাকে শুদ্ধ আনন্দ দেয়।

শুশা গুপি: 
লেখার কাজে ব্যাঘাত ঘটায় এমন কিছু আছে কী? হেমিংওয়ে বলতেন- এক্ষেত্রে সবচে বাজে জিনিস হল টেলিফোন।

বেন জেলৌন: 
হতাশা, বিরক্তি, বৈপরীত্য- সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা… জীবনে আমলাতন্ত্রের বাজে প্রভাব; এসব লেখার কাছে ব্যাঘাত ঘটায় আর আছে ক্লান্তিকর দৈনন্দিন কাজ, তবুও- কেউ এক কলম লিখতে পারে না যদি না সে বেঁচে থাকে আর বেঁচে থাকার মানে হলো পোস্টম্যানের সঙ্গে কথা বলা, দিনের ব্যাস্ততার ভেতর দিয়ে গাড়ি চালানো, প্রতিদিনের চাহিদার মুখোমুখি হওয়া… কাজেই, লেখায় যেসব ব্যাপার ব্যাঘাত ঘটায় তা সব বাইরের জিনিস কিন্তু একজন লেখকের উদ্যমকে যা সম্পূর্ণরূপে হাওয়ায় মিলিয়ে দেবে তা হলো- আশাহীনতা; আশার অনুপস্থিতি—এমন এক বিন্দুতে পৌঁছে যাওয়া যখন কেউ ভাববে- এসব লিখে কী লাভ? লিখে কী হয়? আমি এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করি। যদি কখনো মনে হতো সাহিত্য অকেজো ব্যাপার, তাহলে লেখা বন্ধ করে দিতাম। আমি তো ততদিন পর্যন্ত সব হতাশা পেরিয়ে এগিয়ে যাবো, যতদিন কলমটি সক্রিয় থাকবে। যখন কেউ আর লেখার প্রয়োজন অনুভব করে না, তখনই সে শেষ হয়ে যায়। থেমে যায়।

শুশা গুপি: 
ভিদাল (মার্কিন লেখক গোর ভিদাল) বলেছিলেন একজন দোকানদার প্রতিদিন যেমন তার দোকানে যায়, বা চিকিৎসক যান অস্ত্রোপচারের জন্য, একইভাবে একজন লেখক লিখতে বসেন প্রতিদিন, মানে- লেখাটি একটি পেশা; তা-ই লেখা যা একজন লেখক প্রতিদিন করেন। আপনি কী বলবেন?

বেন জেলৌন: 
এসব সম্পূর্ণরূপে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি! দেখুন, যদি একজন লেখক জীবিকার জন্য লেখেন, তাহলে তিনি আপস করতে বাধ্য- তিনি কী বিক্রি করবেন আর কী করবেন না কেবল তাই বিবেচনা করবেন। আমি তার মতো ভাবছি না। এ নিয়ে আমি চিন্তাকুল নই। লিখে আমি পাঠক পেয়েছি, পেয়ে আমি সত্যিকার আনন্দিত কিন্তু কেউ কেবল তা-ই লিখতে পারে না যে-লেখার বিক্রয়-সম্ভাবনা আছে। আমি এরকম পারি না। লেখক দোকানদার নন। তিনি কী করেন? একটি কল্পনার জগৎ সৃষ্টি করেন যাকে তিনি অন্যদের ভেতর সঞ্চারিত করেন।

শুশা গুপি: 
এটাই কি লেখকের কাজ? শেলি একটি বিখ্যাত কথা বলেছিলেন যে কবিরাই দুনিয়ার অস্বীকৃত আইনপ্রণেতা। আপনি একথায় বিশ্বাস করেন?

বেন জেলৌন: 
আমি অবশ্য শেলি’র মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী নই। আমার কাছে লেখক হলেন একজন সাক্ষী। তিনি তার সময়ের সাক্ষ্য বহন করেন। এ-কারণে জনমানসে তার একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে কিন্তু আমি এটি মনে করি না যে লেখকের একটি নির্ধারক ভূমিকা আছে। তিনি তার গল্পটি যেমন বলেন, ঠিক একইভাবে তার নিজের সমাজ এবং বিশ্ব সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন। তার সমস্ত যোগাযোগ কল্পনার (ইমাজিনেশনের) মাধ্যমে।

শুশা গুপি: 
উপন্যাসের রূপরেখা একবার পেয়ে গেলে, তারপর লিখতে শুরু করলে- লেখাটিকে কি আপনি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না কি গল্পের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা আপনাকেই নিয়ন্ত্রণ করে?

বেন জেলৌন: 
সবসময় তো আর জানা থাকে না যে কী ঘটবে কিন্তু আমি নিজেকে মুক্ত বোধ করি, সীমাবদ্ধতায় ভুগি না বা নিয়ন্ত্রণ হারাই না, লেখার উপর অস্বাভাবিক চাপও সৃষ্টি করি না, অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে লেখাটিকে নিরীক্ষা করি, কাটাছেঁড়া করি; নতুন ধারণা ও সম্ভাবনার সঙ্গে যেন এগিয়ে যেতে পারি, অপ্রত্যাশিত মোড় নিতে পারি- কেবল সে কথাই ভাবি।

শুশা গুপি: 
প্রথম কোনটি আসে- লেখার আইডিয়া, প্লট না কি চরিত্র?

বেন জেলৌন: 
মূল ধারণাটি (সেন্ট্রাল আইডিয়া) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে শব্দগুলোও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ- যুতসই শব্দগুলোকেই বেছে নিতে হবে; শব্দের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। ব্যাপারটা অনেকটাই গাণিতিক। প্লট সম্পর্কে বলতে গেলে— প্লট এমন কিছু হতে পারে যা আমি দেখেছি, বা পড়েছি বা শুনেছি। কেউই সবকিছু জানে না, জানতে পারে না; যদি কেউ তা জানতো, লেখা তাহলে বিরক্তিকর হয়ে উঠত। একটি গল্পকে যা পথ দেখায়, তা হচ্ছে- পরিবেষ্টনী; এক একটি চরিত্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক একটি জগৎ। এটাই চরিত্রের খেলা- ‘চরিত্র’ গল্পটিকে তৈরি করে তারপর লেখক সেই গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যান।

শুশা গুপি: 
একই লেখাকে বারবার কাটাকাটি করেন?

বেন জেলৌন: 
প্রথম খসড়াই সর্বশ্রেষ্ঠ পাঠ্য কিন্তু এই খসড়া পাঠের জন্য হাতে পাওয়ার ঘটনা এই পৃথিবীতে বিরল, প্রায় অবাস্তব। আমি খসড়ার সম্পূর্ণ অধ্যায়গুলোকেই পুনঃলিখন করি, শুধু একটি পরিচ্ছেদ নয়, এখানে ওখানে গিয়ে এক-দু-লাইন বদলে ফেললাম- তা নয়; লেখা সম্পূর্ণ বদলে যায়, যেতে থাকে। কখনও পুরো অধ্যায় থেকে পুরো একটি অনুচ্ছেদ বাদ দিতে হয়, আবার সম্পূর্ণ নতুন অনুচ্ছেদও যুক্ত হয়ে যায়। এভাবেই কাজ কারবার চলে।

শুশা গুপি: 
আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

বেন জেলৌন: 
উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছি, নেপলসের পটভূমিতে। মরক্কো ত্যাগ করার চেষ্টা করছি। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত ‘বর্ণবাদ’ বিষয়ক দীর্ঘ একটি গদ্যলেখা সংশোধন করছি, লেখাটি এখন আরও প্রসারিত, যার নাম ‘ফঁসে ওসপিতালিতে’ (ফরাসি আতিথেয়তা); গত ১৩ বছরে কী কী পরিবর্তন হয়েছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য একটি দীর্ঘ মুখবন্ধ লিখেছি- পরিস্থিতি আরও কতোটা খারাপ হয়েছে, তার ব্যাখ্যা স্বরূপ।

শুশা গুপি: 
হতে পারে আমি খুব বেশি আশাবাদী। মারিন ল্য পেন (ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ফ্রান্স)-কে মনে করি বিকারগ্রস্ত, এক অস্থায়ী বিভ্রান্তি ছাড়া তিনি আর কিছুই নন। আশা করছি ফরাসি দেশে শীঘ্রই নির্যাতিতদের আশ্রয় ও সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের যে দীর্ঘ ঐতিহ্য, আবার তা ফিরে আসবে। আশ্রয় ও সুরক্ষা দেওয়ার কারণে, সর্বোপরি, ফরাসি সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। গত একশ বছরে এখানকার মহান কবি, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা দেখুন যারা সব বাইরে থেকে এসেছেন।

বেন জেলৌন: 
খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে বলছি- আপনার এমন আশা করাটা ঠিক আছে। আমরা—লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী—আমাদের সেরাটা করে ফেলতে পারি কেবল আমাদের শ্রেষ্ঠতম কাজের মাধ্যমে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ