মেঘের ডাক শুনতে শুনতে মায়া গায়ে কাঁথাটা জড়িয়ে নিল। কে যে ফট করে তার নাম রেখেছিল মায়া! মা বাপ তো রাখেনি ।মায়ের একটার পর একটা মেয়ে হতো আর বাপ মাকে গাল পাড়তো। "খানকিমাগী ছেলে জন্মাইতে পারলি না? " পেটে ক্যাৎ করে লাথিও মেরে দিত। মায়ার পরের তিনটে বোনের জন্মের পরে পরে মায়া নিজের চোখে প্রায় প্রতিদিন এসব দেখেছে। মার খেতে খেতে কুঁজো হয়ে যাওয়া মা আঁতুর থেকে বেরিয়ে কোনমতে রান্নাঘরে ঢুকতো আবার রান্নাঘর থেকে আঁতুরে যেত।কোনদিন মার না পড়লে সে ভারি একটা আশ্চর্য দিন হয়ে যেত মায়া ছায়াদের কাছে। বাপের কাছে মার খেয়ে মা কাঁদতো না। শুধু তার নাক দিয়ে টসটস করে রক্ত পড়তো। সেই টাটকা রক্ত কাপড়ের পোছায় মুছে মা আবার মায়া ছায়া বেবিদের পিঠে দুমাদুম কিল থাপ্পড় বসিয়ে দিত। কাজেই মায়াদের নামটাম বাবা মা রাখেনি। বাচ্চা জন্মালে মানে কিছু হলে তো একটা নাম ধরে ডাকতে হবে । তাই বাড়ির মাসি পিসিরা কোনও একটা নাম রেখে দিত। এইভাবে মায়ার বড় বোনের নাম ছায়া , মায়া মেজ তারপরে বেবি, ছবি। ছোটটা সান্তনা। যথারীতি।ছায়া, বেবি এবং সান্তনার বিয়ে হয়ে গেছে। বাপ মা মারধোরের ফাঁকে ফোকরে ছোট থেকেই মেয়েদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে তাদের পাত্র তাদের নিজেদের খুঁজে নিতে হবে। যে যত তাড়াতাড়ি বিষয়টা বুঝে যাবে, তার তত তাড়াতাড়ি গতি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।ছায়াকে পাড়ার এক যুবক প্রস্তাব দেয় ।বেবি আর সান্তনা ফেসবুক বন্ধু করে বিয়ে করে নেওয়ার পর বাড়িতে এখন মায়া আর ছবি।মায়ের কাছ থেকে মেয়েরা পেয়েছে এক ঢাল পিঠ ভরা কুচকুচে কালো চুল।তা সত্ত্বেও মায়া আর ছবি যে এখনও নিজেদের গতি করে উঠতে পারলো না, এইটা বাপ মায়ের প্রবল বেদনার কারণ। এই একটা জায়গায় তারা দুজনে একমত হয়ে যায়।
মায়ার বাপ হরেন পাল খেঁকুড়ে মানুষ। চোলাই মদের ব্যবসায় ভাগ আছে। সবাই জানে এবং মানে। পার্টি পুলিশ সব ধরা আছে ।
সামনে দিয়েই উঠে গেছে একটা সিঁড়ি বেশ এবড়ো খেবড়ো সিমেন্টের সিঁড়ি। কাঠের রেলিং। উপর থেকে মেজো মামার গলার স্বর পাওয়া গেল। বল দেখি কে মনিরাম আর কে শ্যামলাল? মায়া ও ছায়া উপরে উঠতে উঠে দেখল ধুতির ওপর স্ট্রাইপড শার্ট পরা একজন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন। মাথায় একটু ঢেউ খেলানো চুল। অসম্ভব ঝকঝকে ফর্সা রং। লম্বা পেটানো চেহারা। দেখেই মায়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ইনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মনিলাল সাজছেন? আশ্চর্য হওয়ার পালা আরো ছিল। আর একটু পিছনে একটা হালকা নীল লম্বা ধুতি শার্ট আর সাদা ধুতি টকটকে গোলাপি গায়ের রঙে আর নীলে মিলেমিশে কেমন একটা আবেশ তৈরি করে দিয়েছে পায়ে কোলাপুরি চটি ।ফটফট করে এগিয়ে আসছেন বাংলা ছবির অবিসংবাদিত নায়ক। তিনি উত্তম কুমার। চমকে যাওয়ার একটা লিমিট থাকে এখন সেটা ক্রস করে গেছিল। তাই তারা কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে পিসেমশাইয়ের সামনে রাখা খাটিয়াতে বসে পড়ল। এই ছাদটা অদ্ভুত ধরনের এক সারি ঘরের সামনে লাগোয়া একটা খোলা ছাদ। ছাতে অজস্র গাছপালা জবা গাছ পাঁচ ছয় রকমের। ছোট ছোট পেয়ারা গাছে ওঠাতে বসানো আছে সামনে দিয়ে গোলাপ গাদা রজস্র টব। এগুলি পিসিমার অবদান। পিসেমশাই একটা রকিং চেয়ারে সাধারনত বসে থাকে। চেয়ারটা বেশ পুরোনো। গদি গুলো খুঁটি ফাটা । তার ওপরে একটা তোয়ালে পাতা।মায়ারা খাটিয়ায় বসে ভালো মানুষের মতো মুখ করে এদিক ওদিক চাইতে লাগল। এখানে দুজন মহানায়ক ঘোরাঘুরি করছেন অবশ্যই শ্যুটিংয়ের কাজে এসেছেন তাঁরা । তাদের একেবারে বিরক্ত করা চলবে না । তাঁদের বুঝতেও দেওয়া যাবে না যে মায়ারা তাদের দেখছে অতএব তারা পিসেমশাইয়ের সামনে খাটিয়ায় বসে সুখাদ্যের অপেক্ষা করতে লাগল। বিকেলবেলা এই বাড়িতে এলে সাধারণত লুচি এবং ছোলার ডাল জলখাবার আসে খানিকক্ষণ পরে মোহন ভোগ। পিসেমশাইয়ের মাথার ঠিক পিছনে একটা মস্ত পাখির খাঁচা নানা ধরনের বুলবুলি টিয়া কিচমিচ করছে। আজ তো আবার শ্যুটিং হচ্ছে ।তাহলে কি স্পেশ্যাল কিছু খাদ্য আসবে ? মহানায়ক কী খাবেন?
এই পর্যন্ত স্বপ্নটা খুব স্পষ্ট ছিল কিন্ত তারপর সব আবছা আবছা।বাপের কাশি আর হালকা অথচ তীব্র গোঙানির শব্দের সঙ্গে স্বপ্নটা মিশে গিয়ে সব কেমন ঝাপসা হয়ে গেল । কাঁথাটা পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পল্টিয়ে গেছে।সেটাকে পা দিয়ে সোজা করতে করতে মায়ার ঘুমটুকুর
সর্বনাশ হয়ে গেল।স্বপ্নে দেখা উত্তমকুমার সৌমিত্র , গোলাপি রং, পাখিদের কিচিরমিচির, সব মিলিয়ে যেতে যেতে বাপের কাশির মধ্যে ডুবে গেল।অথবা বলা যেতে পারে কাশিটা গিলে নিল সব। মায়া ঘামতে লাগল। বৃষ্টির রেশ কেটে গেলে দুরন্ত গরম এবং খুপরি ঘরে টেবিল ফ্যানের ঘর্ঘর শব্দে স্বপ্নটা কেমন ফালাফালা হয়ে কেটে গেল।কোণের চৌকিতে বাপ, জানলা ঘেষা ঈষৎ বড় চৌকিতে মায়া ও ছবি, পাশের ছোট খুপরিতে মা। এইটা নিয়মের কিছু ব্যত্যয় বটে।
সাধারণ হিসেব মতো মেয়েরা মায়ের সঙ্গে ঘুমায়। যদি আলাদা জায়গা থাকে সেখানে বাপ ঘুমাবে।আলাদা জায়গায় । কিন্তু আপাতত সে নিয়ম ভেঙ্গে মায়া ছায়ার মা পাশের খুপরিতে থাকছে কারণ তার হাড়ে টিবি হয়েছে। হাসপাতালে ওষুধ ইনজেকশন। বাসনপত্র আলাদা। অতএব কাঠকুটো গোবর ঘুঁটে এবং যাবতীয় বাক্স প্যাটরা রাখার জন্য যে জায়গা সেখানে সে বিছানা পেতে ঘুমাচ্ছে।এই নব্য সিস্টেমের জন্য মায়া ও ছবির বেশ অসুবিধা হয় বৈকি। কিন্তু তারা মানিয়ে নিয়েছে। খুব ছোট থেকেই তাদের মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস। আপাতত যে একটা গোটা চৌকি পাচ্ছে শোয়ার জন্য তাই ঢের। বাকি বোনেরা যখন ছিল তখন মায়া, ছবি মাটিতেই শুয়েছে। এখন সময় কিঞ্চিৎ পাল্টেছে।
মা উঠে গেছে অনেকক্ষণ আগে। ছবিও উঠে গেছে। শুয়ে থেকে যে শব্দ পাওয়া যাচ্ছে তাতে বোঝা যায় যে জল ভরার কাজ হয়ে গেছে ।রান্না এবং খাবার জল তোলা হয়ে গেল এবার তাহলে ছবি ঘর মুছতে আসবে।
মায়া ভাবছে সে কেন উত্তম কুমারকে স্বপ্নে দেখল ? দেখা উচিত ছিল শাহরুখ খানকে অথবা অক্ষয় কুমার কে। এরাই মায়া বেবি ছবির আরাধ্য দেবতা অথচ স্বপ্নে এলেন সাদাকালো যুগের দুই নায়ক। মায়া ঘুম থেকে উঠতে উঠতে, দাঁত মাজতে মাজতে ভাবতে লাগল কেন? এত লোক থাকতে উত্তম কুমার কেন? সৌমিত্র কেন? অবশ্য পিসির বাড়িটা সত্যি। ছাতটা সত্যি। পিসেমশায়ের ওইভাবে বসে থাকাটাও সত্যি।পিসের পিছনে ফুলের টব পাখির খাঁচা ইত্যাদি সব বাস্তব। কিন্তু যেটা নেই সেটা কেন? অবশ্য স্বপ্ন এরকমই হয়। এটা মায়া জানে। তার বিশেষ কোনো স্বপ্ন কোনদিন ছিল না।অথচ তার জীবনে একটা ব্যাপার ঘটে গেছে।সে কল্পনাও করতে পারেনি এরকম কিছু ঘটবে। অথচ যেটা ঘটার সেটা ঘটেই যায়। না চাইলেও ঘটে যায়। আপাতত মায়া একজন ফিল্মস্টার।তাই সে কিছুক্ষণ বেশি সময় , বেলা করে তাদের তেলচিটে বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে। ছায়া বেবি ইত্যাদি থাকাকালীন গ্যাদাগাদি করে একবিছানায় ঘুমানোর জ্বালা তো নেই। তারপর থেকে চৌকিটাও তো পাচ্ছে।
দিন প্রতি চারহাজার টাকা। এইরকম একটা ব্যাপার মায়া এবং মায়ার গুষ্টিশুদ্ধ কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি কোনওজন্মে। মাস গেলে চারহাজারের জন্য উদয়াস্ত খাটতে হয় এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু এই ব্যাপারটা শেষ, মানে প্যাক আপ হলেই চারহাজার।ক্যাশ।মায়ার ফোন পে গুগল পে নেই।বড় ফোন নেই। কালো মেঘপানা গায়ের ওপর দুখানা বড় বড় চোখ আছে আর মাথায় কিছু চুল আছে।তাই দেখেই ডিরেক্টর পছন্দ করেছে তাকে। ছবিতে মায়ার নাম বুধনি।বুধনি মেঝেন।বসন্তদা মানে ডিরেক্টর ওকে বুধনি বলেই ডাকে।বলেও দিয়েছে, নিজেকে সবসময় বুধনি ভাববি। ডিরেক্টরের ভালো নামটা খুব কঠিন।ইউনিটের সবাই বসন্তদা বলে ।তাই মায়াও বসন্তদা বলেই ডাকে।ডিরেক্টরের গার্লফ্রেন্ড তাকে উদোমগায়ে শাড়ি পরতে শিখিয়েছে। মায়া প্রথমে বেদম লজ্জা পেয়েছিল। বস্তিতে ছিছিক্কার পড়ে যাবে। ডিরেক্টরের গার্লফ্রেন্ডের নাম বনি।বনিদি খুব একচোট হাহা করে হেসেছিল। তারপর ওকে টিউবটপ পরা শিখিয়ে দিয়েছে। ওটা পরে শাড়ি পরলে মনে হবে উদোম গায়ে শাড়ি পরা হয়েছে। বাড়িতে অবশ্য মায়া এসব কিছুই বলেনি। বাপ চোদ্দগুষ্টি ধুয়ে দেবে শুনলে।অবশ দিনের শেষে টাকাটা গুণেই নিচ্ছে বাপ।ঐরকম কথাই হয়েছে বাপের সঙ্গে। টাকা মায়ার হাতে যাবে না।তবে বাড়িতে মায়ার সামান্য হলেও মান ইজ্জত বেড়েছে।বাপের খ্যাকানি, মায়ের গজগজানি আপাতত কিছুটা কম। ছবিও মুখে মুখে ঝগড়া করছে না। ফিল্মস্টার বলে কথা। ছবি এখন দুয়ারে বসে একটা মালার জট ছড়াচ্ছে।শস্তার নবরত্নমালা।কেউ দিয়েছে। মালা এবং মালার বাপ মা জানে ছবি লাইনে নেমে গ্যাছে।কেউ কিছু বলে না।যদি ওখান থেকেই কিছু হিল্লে করে নিতে পারে নিজের তবে তাই হোক।
বনিদি ওকে বাংলা ছবি দেখিয়েছে কয়েকটা।নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে।মায়া তখনি জানতে পারে যে বনিদি বসন্তদার বউ নয়।গার্লফ্রেন্ড। মায়া আশা করে গেছিল যে হাল ফ্যাশনের কিছু সিনেমা হয়তো ফোকটিয়া দেখা হয়ে যাবে।কিন্তু ওকে দেখানো হল বাংলা সাদা কালো ছবি। মায়ার প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছিল। তখনই বেশ কয়েকটা উত্তমকুমার আর সৌমিত্রর ছবি তাকে দেখতে হয়েছিল। চেহারাগুলো ছাড়া মায়ার খুব একটা কিছু মনে নেই।
কলপাড়ে কুলকুচো করতে করতে স্বপ্নটা মনে করে মায়া ফিক করে হাসল। চা খেয়ে পার্ট মুখস্ত করতে বসবে।আউটডোর শ্যুটিং এ ছ' হাজার করে দিতে হবে। হরেন বলে রেখেছে। নইলে মেয়েকে ছাড়বে না।মায়া ভেবে রেখেছে ঐ একস্ট্রা দু' হাজার তার নিজের চাই।বাপের সঙ্গে একটা মুখোমুখি বোঝাপড়া করতে হবে। পার্ট মুখস্ত করবে মায়া। অ্যাক্টিং করবে মায়া সারাদিন রোদে জলে পুড়ে।আর টাকার বেলা বাপ। এ কতদিন চলে? পার্টণ মুখস্ত করতে করতে মায়া বাপের সঙ্গে হেস্তনেস্তর একটা ছক কষছিল। চুলের গোড়ায় ভীষণ ব্যথা।বুধনি সাজলেই টেনে একেবারে সাপটে চুল বেঁধে দিচ্ছে মেক আপ ম্যান। মাথার ওপরে চুড়ো করে বাঁধা। গোড়া দপদপ করে শেষে।
ইউনিটে কেউ তেমন কথা বলে না মায়ার সঙ্গে।বনিদি আর মেঘাদি ছাড়া। মায়া শুধু মুগ্ধ হয়ে দ্যাখে। পুরো একটা বস্তির সেট তৈরি হয়ে গেছে স্টুডিওতে। তবে স্টুডিওর বস্তিতে মায়াদের বস্তির মতো কোনও দুর্গন্ধ নেই।
"মালটাকে কোথ্থেকে তুলেছো গুরু"?
বিক্রম জেল করা চুল দুহাত দিয়ে পিছনে ঠেলে হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে আটকে নিল দুরন্ত কেশগুচ্ছ।
বসন্ত বলে যাকে সেটে ডাকে সবাই , সে ডিরেক্টর পূরব মিত্র। মাঝে মাঝে ধুতি পরে চলে আসে শ্যুট করতে।
বিনম্র হাসলো। বিক্রম এইরকমই। বিক্রমের বান্ধবী দেয়ালা খ্যা খ্যা করে হাসছে।
এরপর মায়ার ফিগার নিয়ে চাঁছাছোলা বিশ্লেষণ শুরু করবে।
বসন্ত মায়াকে মেকাপে পাঠিয়ে দিল।ওকে ডিস্টার্ব করে লাভ নেই। ঘাবড়ে গেলে ডায়ালগ ভুলে যাবে।
বুধনি মেঝেনকে খুঁজে খুঁজে যখন বসন্ত হয়রান হচ্ছে, তখন বনি একদিন নিয়ে এসেছিল মায়াকে। বোন টিবি ধরার আগে মায়ার মা কাপড় কাচতো বনিদের বাড়িতে।
খুব কম সংলাপ রেখেছে মায়ার মুখে বসন্ত। ভাষাটা আয়ত্ত্ব করতে বেগ পেতে হচ্ছে মায়ার। তাছাড়া বেসিক্যালি বসন্ত ব্যবহার করতে চায় মায়ার চোখ আর চুল। প্রথম শটে বুধনি কাঁকই দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে পিছন ফিরে। লং শটে ওর দীর্ঘ চিকুর ধরা পড়বে শুধু। তারপর আস্তে আস্তে ক্যামেরা এগোবে।বুধনি মুখ ফেরাবে। রাইট প্রোফাইল। মিড লং।ক্লোজ আপ। বুধনি চোখ ফেরাবে।বসন্ত জানে প্রথম শটেই দর্শক মজে যাবে।
বুধনি মেঝেন। বয়েস পনেরো।
মায়ার উনিশ। কিন্তু ঐ পনেরো ষোলোই লাগে। বুধনির এতো চুল ছিল কিনা জানা নেই। কিন্তু মায়ার চুল ছবিতে কাজে দেবে। বসন্ত হেয়ার ড্রেসারকে ইনস্ট্রাকশন দিয়ে মনিটরে বসলো।বিক্রম বাজে বকেই যাচ্ছে।
বুধনি মেঝেন সোজা ক্যামেরার দিকে তাকালো।সিনেমাটোগ্রাফার রশিদ লেন্স পাল্টাতে পাল্টাতে বসন্তকে বললো, একবার এখানে এসে ফ্রেমটা দেখে যাও।
বুধনি যেভাবে সোজা তাকিয়ে আছে তাতে ওর দৃষ্টি স্পষ্ট।আস্তে আস্তে মুখ তুলতে হবে। মালা এসে পড়বে ওর গলায়। ক্লোজ আপ স্টুডিওতে।লং শট পান্চেৎ।পান্চেৎ ড্যাম।
বুধনি মেঝেনকে সোনার মালা পরাচ্ছেন জওহরলাল নেহরু।
রঘুবীর শ্রীবাস্তবকে নেহরুর রোল করাতে বহু কাঠখড় পুড়িয়েছে বসন্ত। সে এখন বলিউড ওটিটির বড় নায়ক। কিন্তু নেহরুর রোলে যাকে তাকে কাস্ট করা যাবে না।সাত মিনিটের অ্যাপিয়ারেন্স।দুদিনের শ্যুট। চার লাখ। গল্পটা নেহরুকে নিয়ে নয়। বুধনিকে নিয়ে।
নেহরু মালা পরানোর পরে বুধনিকে সমাজ একঘরে করে দিয়েছিল।পরপুরুষে যে মেয়ের গলায় মালা দেয় , সে মেয়ে সমাজে তোলা চলবে না।
বুধনি এবার আস্তে আস্তে মুখ তুলবে।পিছনে বীরেন মোহান্তি, জুগনি মেঝেন, শীলা সোরেন, মেরি চুমকি হাঁসদা। এই ফ্রেমটা আউটডোরে অবিকল এক থাকবে।কন্টিনিউইটি নোটসে বনি লিখে রাখছে।
রশিদ দেখে নিয়ে বলল, চোখগুলো ভীষণ বড়ো করে তাকাচ্ছে ।একটু নরম করে তাকাতে বলো।মনে হচ্ছে ভয় পেয়ে মালা পরাচ্ছে।
মালা সত্যি ভয় পাচ্ছে। বসন্তদা বুঝি বিরক্ত হচ্ছে কিছু।এত করে মালাকে রোল বোঝানো হয়েছে।এমনকি টানা তিনসপ্তাহ বাংলা ছবি দেখানো হয়েছে তাকে। ফাঁক পেলেই বাংলা ছবির ক্লিপিংস দেখাতে বসে যায় বনি বা মেঘা অথবা অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর তমোঘ্ন দেবনাথ। মালার এসব পুরোনো বাংলা ছবি একেবারেই দেখার অভ্যেস নেই। তবু কেমন করে যেন উত্তমকুমারকে চোখে লেগে গেল।আর সৌমিত্রকে। সে শুনেছে এই ছবিতে দুটো দৃশ্যে তার সঙ্গে মিতা ঝরিয়া কাজ করবে।তিনটে দৃশ্যে অজিতাভ চক্রবর্তী । এরা সব বড় বড় স্টার। বসন্তদা বলেছে কোনও ভয় নেই।সবাই ওকে হেল্প করবে। তবু মালার ভয় যাচ্ছে না।প্রথম শটে এন জি হচ্ছে না।
বুধনি মেঝেন কারো বাড়িতে জল পায়নি।দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন।নেহরুজির সাধের আধুনিক ভারতবর্ষের স্তম্ভ। বুধনি আর পাঁচটা মেয়ের মতো প্রজেক্টে কাজ করতো। নেহরুজি এসেছিলেন থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট উদ্বোধন করতে। ভিড়ে উপচে পড়ছে চারদিক। ভাসা ভাসা চোখের বছর পনেরোর মেয়েটি সামনে দাঁড়িয়েছিল। হাঁ করে দেখছিল চারপাশ।ঠিক যেমন মালা দ্যাখে স্টুডিওর সেট। নেহরু বুধনিকে ডেকে নিয়েছিলেন কাছে। টিকা পরালো মেয়েটা এইমাত্র।থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের সুইচে প্রথম হাত পড়ুক এই কিশোরী মেয়েটির। তারপর নিজের গলার সোনার চেইন বুধনির গলায় পরিয়ে গটগট করে হেঁটে হাত নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ভারতবর্ষের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী। বুধনির বাড়িতে তখনো বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। উনিশশো উনষাঠ। বুধনির জীবন আরো অন্ধকার , আরো অতলে তলিয়ে যাচ্ছে।সে ছটফট করে হাত তুলছে ।কেউ ধরছে না। চোখে এই ব্যাপারটা আনতে হবে।বসন্ত বারবার বলছে মালাকে।
৬ ডিসেম্বর ১৯৫৯।
বুধনির কাজ ছিল নেহাৎ নেহরুর কপালে একটি টিকা লাগানো।এইসব কাজে সবসময় কিশোরী কন্যাদের নির্বাচন করা হয়ে থাকে।বুধনি ওয়জ আর নেচারাল চয়েজ।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনিসি ভ্যালি অথরিটির অনুকরণে ভারতের প্রথম মাল্টি পারপাস ড্যাম। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ,ভূমি সংরক্ষণ, তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন, নেভিগেশন। নেহরুর আনন্দের শেষ নেই।তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষ আধুনিক প্রযুক্তির দিকে পা বাড়াচ্ছে। উচ্ছসিত মুখ চারপাশে। বুধনির হাতে থালি। তিলক কেটে দিতে হবে পন্ডিতজিকে।
মালা আপাতত রঘুবীরের ডামিকে তিলক পরাবে। রঘুবীর সেটে আসবেন কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে তিনটে। তার আগেই মালাকে রেডি করে রাখতে হবে।বসন্ত ভীষণ টেনশনে আছে।
পারবে তো ছুঁড়ি?
তমোঘ্ন বারবার করে বলেছিল, এসব আনকোরা মাল নিও না দাদা। নন্দিনী দাসকে নাও কিংবা শাল্মলী দত্তকে। ফাটিয়ে কাজ করে চলে যাবে।
বসন্ত জানে। কিন্তু নন্দিনী বা শাল্মলীর ডেট পাওয়া কঠিন। তারপর লিড রোল। টাকার অঙ্ক মারাত্মক য বেড়ের যাবে।তার ফিনান্সে কুলাবে না।
সবচেয়ে বড় কথা , ওদের দুজনের বয়স অনেকটা বেশি। পনেরোতে আনা যাবে না মেকাপে।
বুধনির মাঝবয়স আর বৃদ্ধবয়সের জন্য প্রমিতা সেন অনেকটা কম টাকায় রাজি হয়েছেন বলে বাঁচোয়া।প্রমিতা জানেন এটা অ্যাওয়ার্ড উইনিং ছবি হতে চলেছে। নন্দিনী বা শাল্মলী ওসব কম্প্রোমাইজ করবে না। নিজেদের রেট একপয়সা কম করবে না তারা।বাজেট এমনিতেই বেড়ে চলেছে।অন্তত একমাসের আউটডোর।
মালা একটা নতুন মুখ।অজানা মুখ।ওর চেহারায় একটা নাইভ সৌন্দর্য আছে যেটা মেকাপ করে হয় না।
নেহরুজ ট্রাইবাল ওয়াইফ।
কমলা ঠাকুর খবরটা কাভার করেছিলেন।
পন্চায়েত বসিয়ে বুধনিকে সমাজচ্যুত করা হয়েছিল।
বুধনি মেঝেন।বয়স পনেরো। ডিভিসির কনস্ট্রাকশন কর্মী।
গলার মালা বদল হয়েছে। তাই সমাজের মতে বুধনি নেহরুর স্ত্রী। রাভো মাঝি টিকা লাগানোর সময় সঙ্গে ছিল। তাকে মালা পরাননি পন্ডিতজি। ডিভিসি কর্মীদের জন্য প্রতিশ্রুত ফ্রি বিদ্যুৎ আর বাড়ি কোনোদিন বাস্তবায়িত হয়নি।
বসন্ত ছবিটা শুরু করবে সারা জোসেফকে দিয়ে। বুধনি। সারার অনেক বছরের পরিশ্রমের ফসল এই বই। সারার কিছু ইন্টারভিউ ইতিমধ্যেই ডকুমেন্টেড করে নিয়েছে বসন্ত। সেটিও বেশ খরচসাপেক্ষ।
বুধনি সুইচ অন করেছিল।আট হাজার পরিবারকে উৎখাত করে যে বাঁধ নির্মাণ হয়েছে , সেই পরিবারগুলির কী হয়েছিল? বাসস্থান পেয়েছিল তারা? ডেটা নেই।নেহরুজি মাথা ঘামাননি আদৌ। বুধনির নিগ্রহ এই উৎখাতের বিরুদ্ধেও একটা প্রতিবাদ। ছবিতে এই দিকটা বড় করে রাখতে চায় বসন্ত। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির পাশাপাশি আসবে বৃহত্তর সামাজিক ট্র্যাজেডি।আউটডোর নিয়ে রীতিমতো চাপ আছে।
ফুটেজ লম্বা রাখতে হবে।মায়া মাঝেমাঝেই ক্যামেরায় তাকিয়ে ফেলছে।
বসন্ত কানের কাছে গিয়ে বললো, ক্যামেরাতে দেখবে না। আমার দিকে তাকাবে।আমার চোখের দিকে। ক্যামেরার বাঁদিকে।মনে করো প্রধানমন্ত্রী তোমাকে মালা পরাচ্ছেন।বলেছি তো! তুমি কীভাবে তাকাবে?
প্রধানমন্ত্রী কে মোদিজি না মমতাজি মালার মনে থাকে না। তবে কন্যাশ্রীতে তারা পাঁচশ পায়।পাল , তাই একহাজার পাবে না। মায়ার হাতে কিছু নগদ পেতে ইচ্ছে করে। একটা নাকফুল বানাবে।সিনেমার জন্য বনিদি যেমন নাকফুল বানিয়ে দিয়েছে, ঠিক সেইরকম একটা।
বুধনির চাকরি চলে গেছিল কন্সট্রাকশন প্রজেক্ট থেকে।বাষট্টি সালে। কেউ খোঁজ রাখেনি। সরকারি তরফে কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। অনেক অনেক পরে রাজীব গান্ধী বুধনির খোঁজ করেছিলেন। ততদিনে বুধনি সুধীর দত্তর সঙ্গে সহবাস করছে।বিবাহ সম্ভব হয়নি সামাজিক বিধিনিষেধের জন্য।
বুধনি তখন তিন সন্তানের মা। প্রমিতা সেন পার্ফেক্ট এই বয়সের বুধনির জন্য।ইতিমধ্যে ওয়র্কশপ শুরু করেছেন বন্দনা বসুর কাছে।
মায়ার চারটে শট হল আজ। প্রায় সাড়ে চারঘন্টা লাগল ফ্রেম ঠিক করতে। লান্চ ভাত, ডাল, আলুভাজা, চিকেন,আত মিষ্টি। সন্ধে নাগাদ একটা প্রি- পেড উবের এলো মায়াকে বস্তিতে নামিয়ে দেবার জন্য।এটা প্রডিউসারের ব্যবস্থা।বসন্ত রাজি করিয়েছে।
বস্তির মুখে একটা ছোটখাটো জটলা দেখলো মায়া। টুনু,প্রদীপ, ব্যাঁকা সতু, আরো সব ছেলেরা। মায়া পাশ কাটিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেলো। সকালে মেঘ করে এসেছিল। মনে হয়েছিল খুব বৃষ্টি হবে। দু চার ফোঁটা পরেওছিল। তারপর সব কেটে গেল।কী রোদ কী রোদ। মায়ার মুখে চকচকে কী একটা মাখিয়ে দিয়েছিল মেকাপম্যান সুজনদা।তাতে মায়ার কালো রঙ আরো চকচক করে, চেকনাই বাড়লে শট ভালো হবে।মেকাপ করে দেয় অন্যে, তুলতে হয় মায়াকেই।ঘষে ঘষে নারকেল তেল দিয়ে রঙ তোলে মায়া।আজ বোধহয় পুরো রঙ ওঠেনি।কিছুটা লেগেই আছে আঁঠালো তেলের মতো চিপচিপে হয়ে।মায়া পরে আছে একটা শস্তার কুর্তা আর লেগিনস।
ছেলেগুলোকে পার হয়ে যাওয়ার সময় দুএকটা খুচরো মন্তব্য কানে এলো। -সিনেমায় নেমেছে।
-নায়িকা হবে মাইরি।
- চৌত্রিশ- চব্বিশ- চৌত্রিশ।
- রেট কত বে?
মায়া হাঁটার গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিল।
ঘরের সামনে জটলা।বেশ কিছু লোক। নিতাই কাকা আছে। সুবল জ্যাঠা। ব্রজেন জ্যাঠা। রতনদা। মালুদা। মণিপিসি। সরলাদি।এরা সবাই পার্টি অফিসের লোক।কাউন্সিলরের লোক।
মায়া ওড়নাটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল।
মায়া কেন সিনেমায় কাজ করবে? উবের করে ফিরবে কেন রোজ রাতে? সিনেমায় নামে যে মেয়েছেলে তার চরিত্র কি ঠিক থাকে? প্রোডিউসার, ডিরেক্টর, নায়কের সঙ্গে শুতে হয় না?
সব প্রশ্নগুলোই ভেতরঘর থেকে মায়া শুনতে পাচ্ছিল। জলি পিসির আওয়াজ সবচেয়ে বেশি। নৌটঙ্কী করছে।মায়ার মা পাশের খুপরিতে শুয়ে কোঁকাচ্ছে আর মায়াকে শাপান্ত করছে।ছবি তার প্লাস্টিকের ব্যাগে লিপস্টিক আর চিরুণী ঢোকাতে ঢোকাতে কেমন একটা অদ্ভুৎ চোখে মায়ার দিকে তাকালো। এইসময় ছবি বেরিয়ে যায়।এগারোটার আগে ফেরে না। কোথায় যায়, কেন যায়, সে নিয়ে বস্তির বা বাড়ির কেউ কোনওদিন কোনও কথা তোলেনি।
-নায়িকা হবে মাইরি।
- চৌত্রিশ- চব্বিশ- চৌত্রিশ।
- রেট কত বে?
মায়া হাঁটার গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিল।
ঘরের সামনে জটলা।বেশ কিছু লোক। নিতাই কাকা আছে। সুবল জ্যাঠা। ব্রজেন জ্যাঠা। রতনদা। মালুদা। মণিপিসি। সরলাদি।এরা সবাই পার্টি অফিসের লোক।কাউন্সিলরের লোক।
মায়া ওড়নাটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল।
মায়া কেন সিনেমায় কাজ করবে? উবের করে ফিরবে কেন রোজ রাতে? সিনেমায় নামে যে মেয়েছেলে তার চরিত্র কি ঠিক থাকে? প্রোডিউসার, ডিরেক্টর, নায়কের সঙ্গে শুতে হয় না?
সব প্রশ্নগুলোই ভেতরঘর থেকে মায়া শুনতে পাচ্ছিল। জলি পিসির আওয়াজ সবচেয়ে বেশি। নৌটঙ্কী করছে।মায়ার মা পাশের খুপরিতে শুয়ে কোঁকাচ্ছে আর মায়াকে শাপান্ত করছে।ছবি তার প্লাস্টিকের ব্যাগে লিপস্টিক আর চিরুণী ঢোকাতে ঢোকাতে কেমন একটা অদ্ভুৎ চোখে মায়ার দিকে তাকালো। এইসময় ছবি বেরিয়ে যায়।এগারোটার আগে ফেরে না। কোথায় যায়, কেন যায়, সে নিয়ে বস্তির বা বাড়ির কেউ কোনওদিন কোনও কথা তোলেনি।
হরেন পাল খেঁকুরেপানা ভুলে চুপ করে বসে আছে।
দিনপ্রতি চারহাজার।
আউটডোর ছয়।
টাকার অঙ্কটা নেহাৎ কম তো নয়। হরেনের চোঁয়া ঢেক উঠে আসে। টাকাটা হাতছাড়া হয়ে যাবে?
ঘরের মধ্যে দম আটকা গরম।টেবিল ফ্যানের হাওয়া আরো গরম। ছবি ব্যাগ গুছিয়ে পালাজো কুর্তা পরে নিয়েছে। একটাও কথা নেই মুখে। বোনে বোনে কথা হয় খুব কম আজকাল। দুজনেই এ নরক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে।সবশেষে চোখে লাইনার লাগাবে ছবি। কম আলোতে ছবিকে কেমন হলুদ মাখানো মরা মাছের মতো দেখাচ্ছে।
ব্রজেন জ্যাঠা খুব চেল্লাচ্ছে।অথচ এই লোকটাই মায়ার দিকে কেমন নোংরা চোখে তাকায়।
মায়া যদি সিনেমায় নেমে চরিত্র খারাপ করে তাহলে বস্তির মান ইজ্জত থাকে কেমন করে?
সিনেমার কাজ বন্ধ করতে হবে। নয়তো নিতাই কাকার হাতে নগদ টাকা দিতে হবে পঁচিশ হাজার। ভাগ বাটোয়ারা তারা নিজেরা করে নেবে।
উত্তমকুমারের চোখে গভীর বিস্ময়।এও হতে পারে? জল খেতে খেতে মায়া ঐ দেবদুর্লভ চোখের কথা ভাবে। পিসেমশাইয়ের পাখিরা খাঁচার মধ্যে ফড়ফড় করে। ডানার শব্দ হয়। লুচি আর মোহনভোগের গন্ধ স্বপ্ন থেকে এসেও ফিরে ফিরে যায়। উত্তমকুমার তাঁর সাবলীল ভঙ্গিতে হেঁটে চলে যান ওপরের সিঁড়ির দিকে।
পিসেমশাইয়ের পরনে নীল লুঙ্গি। উর্ধাঙ্গে সাদা গেন্জি। একটু ঝুঁকে বসে। একহাঁটু তুলে তারওপর হাত রেখে।
- মেয়েকে সিনেমায় নামানোর আগে একবার আমার মতামত নিতে পারোনি? কথায় কথায় তো দৌড়ে আসো।
হোর বাপলা । বিবাহ।
বিয়ে হয়ে গেছে তোর বুধনি। তোর আর সমাজে জলচল নেই। প্রধানমন্ত্রীজি বিয়ে করে চলে গেছেন।
বুধনিদের সমাজে বিয়ে হয় পাঁচদিন ধরে।ঘাস আর চালের দানা দিয়ে আশীর্বাদ হয়।বিয়ের শাড়ি চুবিয়ে রাখা হয় হলুদ জলে।বর কনের কাপড় একসঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। ঘরের বাইরে উঠানে মান্ডোয়াতে মহুয়ার ডাল, শালগাছের ডাল।পাশাপাশি দুটো মাটির কলস। জলভরা। দুটি কুমারী কন্যা নদী থেকে বয়ে এনেছে সে জল, সখীত্বের নিদর্শন।
এসব কিছুই হল না। অথচ বুধনির বিয়ে হয়ে গেল?
চেইন পারানোর সময় পন্ডিৎজি কী কিছু বলছিলেন? বুধনির মনে নেই।
ওরা গুমকে। বৌ। বলেছিলেন কী? না তো।
আপে বাহারে ।সমাজ বলেছিল।পন্চায়েৎ বলেছিল।
মায়ার খুব ক্লান্ত লাগে। তার একটা ভালো চটি দরকার।সাবান দরকার। একটা তোয়ালে।সেটে বড়ো লজ্জা লাগে।
এরা কী সিনেমা করা বন্ধ করে দেবে তাহলে? নিতাই কাকার গলা শোনা যাচ্ছে।বাপের চোলাই ব্যবসার বারোটা বাজিয়ে দেবে টাকা না দিলে। একঘরে করে ছাড়বে হরেন পালকে। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের নালিশও উঠবে।
এতোদিন যেন চোলাইয়ের ব্যবসা চলছিল না! হরেন যেন কোনওদিন বৌ মেয়ে পেটায়নি যেন !
পা দুটো ব্যথা করে মায়ার। ক্যামেরার সামনে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকা। মেকাপ চামড়ায় সেঁটে যায়। বসন্তদা যেমন করে চায়, তেমন করে কিছুতেই তাকাতে পারে না মায়া।
অথচ এখন যদি বসন্ত দেখতো! টিমটিমে আলোতে, টিনের চালের নিচে দাগধরা আয়নাতে অবিকল বুধনি মেঝেনের চোখ।
কে যেন ফেলে চলে গেল তাকে? কে গেল! সে কি তাকে চেনে?
প্যাকেট একটা দিয়েছে ইউনিট থেকে। ঠান্ডা চাউমিন আর চিলিচিকেন। কিন্তু সেটা একেবারেই মুখে রুচবে না মায়ার। সকালের ভাতে জল দেওয়া আছে। পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা আচার দিয়ে সেই ভাত এখন অমৃত।একটু আলুভাজা হলে ভালো হত। সেটা কেই বা করে রাখবে মায়ার জন্য। মা এখন শরীর নাড়াতে চায় না। ঐ ভাত করে রাখে সেদ্ধ দিয়ে।ছবি বাইরে থেকে খেয়ে আসে।হরেনও অধিকাংশ দিন বাইরে খায় রাতে।
না খেয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ল মায়া। বাইরে ক্যাঁচাল তুঙ্গে। হরেন পালের গলা উঠছে একটু করে।
ছবি বাক্যব্যয় না করে বেরিয়ে গেল।কেউ ফিরেও তাকালো না তার দিকে।
কাল কলটাইম সকাল সাড়ে আটটা।
শ্যুটিং এ যেতে পারবে কীনা মায়া জানে না। বসন্তদা কি একবার এসে কথা বলবে? লাভ হবে কিছু? ডায়ালগ মুখস্ত করবে কখন?
অবসন্ন শরীর তলিয়ে যেতে যেতে মায়া ভাবল, ঘুম আসুক। সবচেয়ে ভালো ঘুমিয়ে পড়া। উত্তমকুমার কি আজ স্বপ্নে আসবেন!


2 মন্তব্যসমূহ
খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনরুদ্ধবাক।
উত্তরমুছুন