অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত
১. নভেম্বর
ও খুবই ভয় পেয়ে গেছে, আর যখন কাউকে বলে ফেলল, “ঠাণ্ডাটা বেড়ে গেছে,” ও আসলে সান্ত্বনা পেতে চাইছিল।
“তা বৈকি, নভেম্বর মাস চলছে যে,” অন্যজন বলে উঠল।
“বড়দিনের আর বিশেষ দেরি নেই,” সে বলল।
ও প্যারাফিন কিনে নিয়েছে, একটা গরম ওভারকোটও ওর আছে, শীতের জন্য ও তৈরিও, তা সত্ত্বেও ভয় পেয়ে গেছে। শীতে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। শীতের সময় ভয়ানক কিছু ঘটে যেতেও পারে, যেমন একটা যুদ্ধ। শীতের সময় চাকরি চলে যেতে পারে, শীতে সর্দিকাশি হতে পারে। স্কার্ফ, দস্তানা, কোটের কলার দিয়ে শীতের প্রকোপ থেকে নিজেকে বাঁচানো যেতে পারে। কিন্তু ঠাণ্ডাটা তো আরও বেড়ে যেতে পারে।
এই সময় “বসন্ত” কথাটা বলবার কোনো মানেই হয় না।
দোকানের জানলাগুলোয় আলো ঝলমল করছে, তার থেকে উত্তাপের একটা বিভ্রম তৈরি হয়। কিন্তু গির্জার ঘন্টা ঢং ঢং করে বাজে। রেস্তোরাঁতে উষ্ণতা রয়েছে, বাড়িতে বাচ্চারা জানলা খুলে দেয় আর সদর দরজা খুলে রাখে, দোকানে টুপিটা খুলে রেখে আসতে হয়।
গাছ কীভাবে পাতা ঝরিয়ে দেয়, কেউ খেয়ালই করে না। হঠাৎ দেখা যায় গাছগুলো পত্রহীন হয়ে গেছে। এপ্রিল মাসে আবার ওদের পাতা গজায়, খুব সম্ভবত, মার্চেই গজিয়ে যায়। নতুন পাতায় ওদের ভরে যাওয়াটা সকলেরই চোখে পড়ে।
ঘর থেকে বেরনোর আগে ও টাকাগুলো গুনে নেয়।
তুষারপাতের কোনো সম্ভাবনাই নেই, আজকাল আর তুষারপাত বলে কিছুই নেই। শীতে কাঁপতে থাকা মেয়েদের বেশ সুন্দর লাগে, মেয়েরা সুন্দরীই হয়।
“ঠাণ্ডায় ধাতস্থ হয়ে উঠতে হয়,” বলল সে, “জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয় আর জোর জোরে হাঁটতে হয়।” – “বড়দিনে ছেলেমেয়েদের জন্য কী কিনতে পারি?” জিজ্ঞেস করল ও।
“ঠাণ্ডায় ধাতস্থ হয়ে উঠতে হয়,” সে অন্যজনকে বলল। “ঠিকই, ঠাণ্ডাটা বেড়ে গেছে, মাসটা যে নভেম্বর,” অন্যজন বলল।
২. সিংহেরা
দাদুর ইচ্ছে ছিল সিংহদের বাগে আনানোর পেশা গ্রহণ করবার, যারা ওঁকে অপদার্থ মনে করে তাদের মুখে যাতে ঝামা ঘষে দিতে পারেন, যাতে সকলের মুখে ঝামা ঘষে দিতে পারেন। মুখে অবশ্য কখনোই কিছু বলেননি। ছোট্ট একটা পুকুরে উনি হাঁস পালতেন। এখন আর উনি বেঁচে নেই – বড় বেশি মদ খেতেন।
জীবৎকালে কোনো না কোনো সময়ে উনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, সিংহদের বাগে আনার পেশা উনি কোনোদিনই গ্রহণ করতে পারবেন না। তখন থেকেই ওঁর মনে হতে লাগল যে সার্কাসের আসনের মূল্য মাত্রাছাড়া।
বিয়ে করেছিলেন একটি সুন্দরী মেয়েকে আর ক্যালেন্ডারে আবহাওয়া, তাপমাত্রা আর বাতাসের গতি লিখে রেখেছিলেন। ওঁর মৃত্যুর পর টাকাপয়সা ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সকলেই দাদুকে একটু কি আধটু ভোগ দখল করেই ফেলেছিল।
সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের কাছে জনৈক পাঠক চিঠি লিখে জানতে চান যে ৪৫ বছর বয়সে, পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও বাঁশি বাজাতে শেখা সম্ভব কিনা। ব্যাপারটা এমন হল, যে জবাবে জানানো হল, কোনো একজন নাকি ৬৪ বছর বয়সেও সেটা সম্ভব করতে পেরেছিল – বলা বাহুল্য অধ্যবসায়, নিষ্ঠা আর ধৈর্যের সঙ্গে। উনি হয়ে গেলেন একজন মৃতব্যক্তি। বৃদ্ধ বয়সে উনি অনেকের অন্ত্যেষ্টিতেই অংশগ্রহণ করেছিলেন, আবেগমথিত এবং উদাসীন মনে গির্জার ঘেরা আসনে বসে থাকতেন আর টুপিটা হাতে ধরে মুচড়ে উঠতেন।
যখন উনি মারা গেলেন, ওঁর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বলতে আর কিছুই রইল না। উনি ক্রমশ ক্ষুদ্রকায় হয়ে আসছিলেন, ওঁর আত্মগরিমা বিলীন হয়ে যাচ্ছিল, নিজের দৃষ্টিকোণে অনড় থাকার ক্ষমতা, জুতোর ফিতে বাঁধবার সামর্থ্য চলে গেছিল আর মৃত্যুর পর ওঁর স্বতন্ত্র অস্তিত্বটাও রইল না।
ওঁর ঘুম অনিয়মিত হয়ে গেছিল, ঢুলতেন, যেখানে সেখানে, আবার পরমুহূর্তে জেগেও উঠতেন। সিংহরা ওঁর স্বপ্ন থেকে বিদায় নিয়েছিল, তার সাথে স্বপ্নরাও অদৃশ্য হয়ে গেছিল। সুন্দরী মেয়ে বলতে কী বোঝায় উনি ভুলেই গেছিলেন, পরিচারিকাদের অতিরিক্ত টিপস দিয়ে ফেলতেন।
এখন ওঁর টাকাপয়সার ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেছে। ওঁর নাতিনাতনিরাই সিংহগুলো দখল করেছে, সেগুলো ওরা বিছানার তলায় লুকিয়ে রেখেছে। সেটা ওঁর জন্যে ভালই হয়েছে, আমাদের জন্যেও। দাদুকে কেউ কখনোই কিছু জিগ্যেস করেনি, ওঁর আক্কেল বাড়েনি। তবে ওঁর বয়স বেড়েছে। বয়স বাড়াটা খুবই জরুরি। সিংহদের ছেড়ে যেতে কষ্ট হত। সিংহরাই অত্যন্ত নীরবে ছেড়ে গেছে, যার ফলে দাদু লক্ষ্যও করেননি। উনি মারা গেলেন, কারণ উনি বড় বেশি মদ খেতেন।
৩. মিউজ়িকাল বক্স১
একদিন মেয়েটি বলল, “আমার একটা পিয়ানো চাই,” আর ছেলেটা জানত যে অনতিবিলম্বেই কালো একটা দৈত্য ঘরে এসে দাঁড়াবে। ছেলেটি বলল, “না, আমি পিয়ানো কিনছি না।”
মেয়েটি কাঁদতে লাগল।
“আমি পিয়ানো চাই না, ছেলেটি বলল, আর নিজের মিউজ়িকাল বক্সের কাছে চলে গেল।
ওটা ওর ডেস্কের গোপন দেরাজে তালাবন্ধ করে রাখা। এটার সম্পর্কে কারোই কিছু জানা ছিল না, এডেলউইস ফুলের নক্সা খোদাই করা কালো রঙের একটি বাক্স। কেউই এর বাজনা শোনেনি – মিউজ়িকাল বক্সের আওয়াজ অনুচ্চই হয়, আর ফেয়ারগ্রউন্ড অরগ্যানটা২ বাজানোর সময় ছেলেটি তার ওপরে একটি কম্বল দিয়ে ঢাকা দিয়ে দেয়। বাক্সটিকে ছেলেটি সেলারে রাখত।
মেয়েটি একটি পিয়ানো চাইল আর ছেলেটি একটি পিয়ানো কিনে আনল। ও মেয়েটিকে একটি ফেয়ারগ্রাউন্ড অরগ্যান কিনে দিতেই পারত, তাহলে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যেত, হয়ত মেয়েটি কান্না জুড়তে পারত, ও বাড়ি ফেরার পর মেয়েটি মুখভার করে থাকতে পারত কিংবা এমনও হতে পারত ওকে জ্বালাতন করার জন্য মাঝ রাতে উঠে ওর অ্যালার্ম ঘড়িটা ভেঙ্গেও দিতে পারত। ওর গোপন দেরাজগুলো যে ভেঙ্গেই ফেলতে পারত তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ইস্কুলে মেয়েটিকে শেখানো হয়েছে যে মিউজ়িকাল বাক্স অতি ফালতু একটি জিনিস। ওকে বলা হয়েছিল ইংরেজরাই মিউজ়িকাল বক্স কেনে। ইস্কুলে যেহেতু এই কথা শেখানো হয়, তাই ইস্কুলে শেখানো বুলির বিরুদ্ধে গিয়ে ছেলেটির কয়েকটি গোপন দেরাজ ছিল।
আজকাল মেয়েটি পিয়ানো বাজায় আর বলতে থাকে, “আমি জানি, তুমি ঠিক আমার মতই সংগীত শুনতে ভালবাস।” মেয়েটিকে বাজাতে শোনে আরে মনে মনে ভাবে, পিয়ানোর তুলনায় মিউজ়িকাল বক্স কী এমন জিনিস। “আমি চাই না তুমি পিয়ানো বাজাও,” এই কথাটা মেয়েটিকে ওর বলা উচিত ছিল, ওর ভয় মিউজ়িকাল বক্সকে ও না ভুলে বসে, অথবা দেরাজের চাবি না হারিয়ে ফেলে কিংবা হয়ত এমন হবে যে ওর গোপন দেরাজ কেউ তালা ভেঙ্গেই খুলে ফেলল।
খুব সম্ভব মেয়েটিকে কথাটা বলার দরকার ছিল, তবে মেয়েটি খুব চট করেই ওকে বুঝে ফেলবে আর বলবে যে ও জানে যে ছেলেটি সংগীত শুনতে ভালবাসে।
দিনে দিনে ছেলেটির নিজের মিউজ়িকাল বক্স বাজানোর সাহস ক্রমশ কমে যেতে থাকল; নিজের ঘরে বসে থাকে, মেয়েটির বাজানো শোনে, পিয়ানোটা দেখে আর দেখে ওর এলোমেলোভাবে আঙ্গুল চালনা, আর সন্ধেবেলা মেয়েটি এসে ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলবে, “আমি জানি, তুমি সংগীত শুনতে ভালবাস।”
----------
টীকা
১ মিউজ়িকাল বক্স – বা মিউজ়িক বক্স হল একটি বাক্সের মধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় বাদ্যযন্ত্র যা একটি স্টিলের চিরুনির টিউন করা দাঁত উপড়ে ফেলার জন্য একটি ঘূর্ণায়মান সিলিন্ডার বা ডিস্কের উপর রাখা পিনের সেট ব্যবহার করে বাদ্যযন্ত্রের নোট তৈরি করে।
২ ফেয়ারগ্রউন্ড অরগ্যান - হল একটি বাদ্যযন্ত্র যা একটি অর্কেস্ট্রার বায়ু এবং পারকাসিভ বিভাগগুলিকে আবৃত করে সুর সৃষ্টি করে।
লেখক পরিচিতি: পিটার পিকসেল একজন জনপ্রিয় সুইস লেখক এবং আধুনিক জার্মান সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বকারী সাংবাদিক। তিনি গ্রুপ ওলটেনের সদস্য ছিলেন। পিকসেল ১৯৩৫ সালে সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি কায়িক শ্রমিকের ছেলে। তার জন্মের কিছু পরেই, পিকসেল পরিবার সুইজারল্যান্ডের ওল্টেনে চলে যান।
অনুবাদক পরিচিতি: উৎপল দাশগুপ্ত জন্ম কলকাতায়। আদিবাড়ি ওপার বাংলার শ্রীহট্টের পঞ্চখণ্ডে এবং অসমের করিমগঞ্জে। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কার। কর্মজীবনের শুরু ভারত সরকারে অর্থ মন্ত্রক থেকে। কর্মসূত্রে দিল্লী, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং অসমে কাটিয়েছেন। অল্প লেখালেখি আর অনুবাদের কাজ করেন। তবে নিজের লেখালেখির চাইতেও বই পড়তে বেশি ভালবাসেন, বিভিন্ন বিষয়ে। ঘুরে বেড়াতে, অবসর সময়ে গান শুনতে ভালবাসেন। শখের ফটোগ্রাফি করে থাকেন। কলকাতায় থাকেন।


0 মন্তব্যসমূহ