এই গ্রামে একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে। এখন আম গাছের ডালে বসে কাঁদতে কাঁদতে এই কথাটাই আবার মনে পড়ে গেল চুহরুর। নীচে কাঁদলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দেখবে। তখন মান থাকবে না। তাই কান্না পেলে চুহরু উঠে বসে লিচু গাছের ডালে। আম গাছের ডালে। সেবার লিচু গাছের ডালে বসে কাঁদছে, এমন সময় বাগান দিয়ে যাচ্ছিল আসমান সেখ। চুহরুকে কাঁদতে দেখে বলল, "ফলন্ত গাছের নীচে বসে কান্দিস না চুহরু। গাছ মইরে যায়। সেই যে ধলো বুড়ি প্রতিদিন নিয়ম করে কাঁদত বেল গাছের নীচে বসে, ফলে অমন টুপটুপ করত যে বেলগাছ একদিন পাতা শুকাতে শুকাতে মইরে গেল।"
আজ অনেকদিন পর আবার ছোট ব্যাটার বাড়িতে গিয়েছিল চুহরু ঘোষ। এমনিতে যায় না। বাড়ি দূরে না। মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। দুইপাশে তুঁত-এর বাগান রেখে মাঝখান দিয়ে যে ঢালাই রাস্তা চলে গিয়েছে, সেই রাস্তা ধরে খানিক এগোলে দেখা যায় বাঁশ বাগান। সেটা পার করলে প্রাইমারী স্কুলের বিশাল মাঠ। সেই মাঠ পার করে আরও খানিকটা গিয়ে দু কাঠা জায়গা কিনে বাড়ি করেছে ব্যাটা। তা প্রায় বছর খানেক হল বাড়ি করা। এই এক বছরে চুহরু কয়বার ওই বাড়িতে গিয়েছে হাতে গুনে বলা যাবে। এমনকি কয়দিন আগে যখন চুহরুর বউ আর মেয়ে কুটুম বাড়িতে গিয়ে তিন রাত বাড়িতে ফেরেনি তখনও চুহরু নিজে হাত পুড়িয়ে রেঁধে লবন ভাত খেয়েছে। ওই বাড়িতে যায়নি। সেই চুহরু আজ আবার গিয়েছিল ব্যাটার বাড়িতে। শুধু যে গিয়েছিল তাই নয়। ব্যাটা আর বউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে কান ধরে বলেছে, "আমার ভুল হয়েছে। এবারকা তোমরা আমাকে ক্ষমা কইরে দাও।" নাকে খত দিয়ে বলেছে, "এমন ভুল আর হইবে না গো।"
ব্যাটার সম্মুখে এমন অপমান। চোখের জল কি মানে! হড়মড় করে বেড়িয়ে আসতে চায়। ফেরার পথে চুহরু উঠে বসে আমগাছের নীচু দিকের একটা ডালে। বাড়ির পেছন দিকের এই একটা আমগাছ চুহরুর নিজের। গাছ ফলে টুপটুপ করছে। পুষ্ট আম। এখন সময়মতো ভেঙে না নিলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে। আরে সেইজন্যেই তো যাওয়া ব্যাটার ঘরে। বচ্ছরকার ফল। এখন গোঁসা করে থাকলে চলে! লাতিন গুলো সব খাবে না! ব্যাটা বউয়ের গোঁসা হয়েছে। ফল কিনে খাবে তবু শ্বশুরের গাছের আম খাবে না। চুহরু আগে বার তিনেক খবর পাঠিয়েছে- একে তাকে ধরে। ফোন করে। কিন্তু না, মন গলেনি। তাই এবার নিজেই গেছিল ক্ষমা চাইতে। বাপ রে, কী বিশাল অপরাধ তার। তবে! দু-পয়সার মুরোদ না থাকা চুহরু ঘোষ, এমন অপরাধ করলে শাস্তি তো হবেই! কান্নাই তো নিয়তি!
তবু প্রবাদের কথাটা মনে পড়তে নিজেকে সামলে নিল চুহরু। বলা যায় না কী থেকে কী হয়। কাঁধে ফেলে রাখা গামছা দিয়ে চোখ মুছে ঘরের দাওয়াতে গিয়ে বসল। বউ কেমন করে জানল কে জানে! এক গেলাস জল নিয়ে এসে বলল, "তোমাকে কুকথা বলল? যাও ক্যানে?"
"বউ, এই এত্তগুলা আম। উয়ারা মুখে না দিলে আমরা মুখে দিই কেমন করে! হামি কাইন ধর্যে কহিলাম, বাপ রে আমার ভুল হয়েছে। মেননে লে। মেননে লে। মাইনলে না।"
"হ্যাঁ ভুল তো হয়েছেই। এমন ভুল কেউ করে!"
রাত্রে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসতে চায় না চুহরুর। এতগুলো আম গাছে! লাতি- লাতিনদের মুখ মনে পড়ে। বিশেষ করে ওই ছোট লাতিনটা। ওই ওকে নিয়েই তো যত অশান্তি। অবশ্য অশান্তির মুলে হচ্ছে ওই সুন্দর বিকেলটা। যেদিন চুহরু আর ওর ছোট লাতিন মাঠে খেলছিল। পড়ন্ত রোদে খুব মায়াবী লাগছিল সবুজ গালিচার মতো বিছিয়ে থাকা মাঠের ঘাসগুলোকে। দূরে একধার দিয়ে আমবাগান। এদিক ওদিক গরু চরছে। ছাগল চরছে। মাঠের এক কোনায় কলুটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। তখন ছোট লাতিনটাকে স্কুলে ভর্তি করার কথা চলছে বাড়িতে। সে অবশ্য এই স্কুল নয়। নর্থ স্টার ইংলিশ অ্যাকাডেমি। টাউন-এ। যেখানে চুহরুর বড় নাতিও পড়ে। একবার কী কাজে টাউন-এ গিয়ে চুহরু দেখে এসেছে সেই স্কুল। রাস্তার পাশে অল্প জায়গার ওপর চারতলা বিল্ডিং। ওটাই স্কুল। না আছে গাছপালা, না আছে খেলার মাঠ। ছোট বাচ্চাদের স্কুল কেউ বলবে! অথচ এখানে দেখো, কী মোহময় মাঠ বুক পেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাচ্চাদের দাপাদাপি সহ্য করবে বলে! এ এক আশ্চর্য সময়, বাড়ির কাছে স্কুল থাকতেও সেখানে পড়ানো যাবে না! পড়াশোনা বিশেষ করেনি চুহরু, তাই নিজের বুদ্ধিতে এসবের কোনও যুক্তি খুঁজে পায় না ও। তবু ব্যাপারটা মনের উপর এইটুকু জোরজুলুম করেই থেমে যেত যদি না ছোট লাতিন নিজে মুখে বলত,"দাদা আমাকে এই স্কুলে ভর্তি করে দে। এখানে কত্ত বড় মাঠ।"
ব্যাস, কী যে রোখ চাপল চুহরুর। কাউকে কিছু না বলে পরদিন লাতিনকে ভর্তি করে দিল গ্রামের স্কুলে। পেটে তিন কেলাসের বিদ্যে ধরা চুহরু ঘোষ, এতবড় জুলুম সবাই মানবে কেন? ব্যাটা বউয়ের কানে যেতেই সে চিৎকার ধরল। দোষের মধ্যে চুহরু কেবল বলেছিল,"হামি তো উয়ার ঠাকুরদা হই নাকি? তা হামার কোনও কথাই কি চইলবে না?" ব্যাস আর যাই কোথায়! বউ কানে ফোন নিয়ে কী গুজগুজ করল, ব্যাবসার জায়গা থেকে ধাঁ করে ব্যাটা এসে হাজির। তারপর চুহরুকে কেবল মারতে বাকি রেখেছে।
এমনিতেই চুহরু ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে। তার উপর কাল সারারাত ভাল করে ঘুম হয়নি। খুব ভোরে বাড়ির বাইরে বেরতেই নজর গেল আমগাছটার দিকে। আরে! পাতাগুলো কেমন ঝিমিয়ে রয়েছে মনে হচ্ছে না? চোখ কচলে আবারও ভাল করে দেখে চুহরু। তাহলে কি প্রবাদের কথাটাই ফলতে বসেছে! তড়িঘড়ি পাইকারকে খবর দিল চুহরু। আম না ভাঙ্গলে নষ্ট হবে। তারপর গেল আসমান সেখ-এর বাড়ি। "ও আসমান ভাই, গাছটাকে কি আর বাঁচানো যাবে না?"
"যেতে পারে। একটা পথ আছে। এও একটা প্রবাদ।"
"কী বল?"
"গ্রামের সবচেয়ে সুখী মানুষটাকে ওই গাছের নীচে বসে তার সুখের স্মৃতিচারণ করতে হবে।"
"গেরামের সব চেয়ে সুখী মানুষটা কে আসমান?"
"তার আমি কী জানি! সে তোমাকেই খুঁজে বাহির করতে হবে।"
চুহরু পড়ল মহা চিন্তায়। সবচেয়ে সুখী মানুষ বলতে প্রথমেই যার কথা মনে আসে সে হল গুধন মেম্বার। কয়েকবছর আগেও ওর সাইকেলের সিট ফেটে স্পঞ্জ বেড়িয়ে আসত, এখন বোলেরো চাপে। তিনতলা বাড়ি তুলেছে। বিঘা বিঘা আমবাগান কিনেছে। বাস্তু জমি কিনেছে। মাটির ব্যবসা করে। ওর চেয়ে সুখী মানুষ আর কে আছে! কিন্তু গুধন কী এই উপকারটুকু করবে চুহরুর। করবে নাই বা কেন! চুহরুকে সে মান্যি করে না এমন তো নয়। অবশ্য মান্যি করে বলে যে আবাস যোজনার ঘর চুহরু পেয়েছে, তা নয়। সে ব্যাপারে গুধনের সাফ কথা,আগে ত্রিশ হাজার জমা দাও। তবে সত্যি কথা বলতে কী চুহরুকে গ্রামে চেনে সবাই। অনেকদিন আগে যখন এই গ্রামে কমবেশি প্রায় সব্বাইই কংগ্রেস পার্টি করত, চুহরু তখন একেবারে নীচু তলার কর্মী ছিল বই কী! এখন সব কংগ্রেস ছেড়ে এই দল ওই দলে গেছে বটে তবে চুহরুর মুখ টুকু তারা ভুলে যায়নি। গুধন মেম্বার প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু করছিল শুনে। শেষমেশ রাজিই হল। পরদিন সকালে কয়েকজন চ্যালা চামুণ্ডা নিয়ে সে হাজির। খাতির করতে কসুর করেনি চুহরু। সবুজ প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে বসতে দিয়েছিল উঠোনে। প্লেটে প্লেটে মানিকের দোকানের রসগোল্লা।
তার পরের কাজটা অবশ্য গুধনের একার। গাছতলায় বসে গুধন প্রথমে একটু সুস্থির হয়। তারপর ভাবে কীভাবে তার এই উত্থান সম্ভব হল! যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। এলাকায় হম্বিতম্বি করার ক্ষমতা ওর আগে থেকেই ছিল। কেমন করে যেন জেলার এক নেতার হাত চলে এল মাথার ওপর। তারপর কেবলই উত্থান। টাকা আর টাকা! টাকার সমুদ্র। ভাবতে ভাবতে ঘুম চলে আসছিল গুধনের। তাল কেটে গেল লাইলাতুন বেওয়ার কথায়। মুখরা বুড়ি লাইলাতুন তখন যাচ্ছিল ওখান দিয়েই। গুধনকে দেখেই দে গাল! আসলে পঞ্চায়েতে চাকরি পাইয়ে দেবার নাম করে গুধন ওর ব্যাটার থেকে বেশ কিছু টাকা নিয়েছিল। তারপর না হয় চাকরি না ফেরত দেয় টাকা। আর লাইলাতুন একবার কথা বলতে ধরলে থামায় এমন সাধ্যি কার আছে!
পরপর দু-তিনদিন চুহরু খুব আগ্রহ নিয়ে গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু না, নতুন পাতা গজানো তো দুরের কথা, পাতা ক্রমশ শুকিয়ে যায়। ঝরতে থাকে। গাছের নীচে ডাই হয়ে পড়ে থাকে। চুহরুর খুব মনখারাপ হয়। আসমান বলে,"লোক নির্বাচন তোমার ঠিক হয়নি ভাই। ও গুধন মেম্বার নিশ্চয়ই প্রকৃত সুখী লোক নয়।"
তাহলে আর কে! চুহরু রেশন ডিলারের কথা ভাবে। তাছাড়া গ্রামে এক মাষ্টার আছে যে প্রায়দিনই স্কুলে না গিয়ে সারা মাসের বেতন নেয়। উপরন্তু জমির দালালি করে। রেশন ডিলারকে রাজি করাতে না পারলেও মাষ্টার রাজি হয়। সুখের স্মৃতিচারণ করে গাছের নীচে বসে। চুহরু উৎকণ্ঠিত হয়ে গাছের দিকে তাকায় নতুন পাতার খোঁজে। কিন্তু না। ক্রমশ পাতা ঝরতে থাকে। গাছে এখন আর একটাও পাতা নেই। করাত দিয়ে গাছের কাণ্ড একটু ফাঁক করে রস খোঁজে চুহরু। দেখে বেঁচে আছে কী না। গ্রামেরই আরও দু--একজনকে বসিয়ে সুখের স্মৃতিচারণ করিয়ে একটা মরিয়া চেষ্টা চালায়। কোনও ইতিবাচক ফল হয় না। সমস্ত পাতা হারিয়ে একটা কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকে গাছ। গ্রামে কী তবে একটাও সুখী মানুষ নেই! চুহরু মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। এদিকে ঘরে পেরে রাখা আমগুলোতেও রঙ ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু মুখে দেওয়ার বাসনা হয় না। নাতি- নাতনিগুলোই এখনও মুখে তুলল না। দিনমান মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে চুহরু।
এই বসে থাকতে থাকতেই একদিন ওর বউকে দেখে শাড়ির আঁচলে করে কী যেন বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। কৌতূহল চেপে রাখতে পারে না চুহরু। বউয়ের পিছু নেয়। অবশ্য বেশিদুর যেতে হয় না। স্কুল বাড়ির পেছন দিকেই একটু জংলা মতো জায়গায় থামে বউ। চুহরু দেখে ওখানে ছুটতে ছুটতে আসছে ছোট লাতিন। বউ ওর কোঁচড় থেকে পাকা আম বের করে দিচ্ছে। লাতিন দাঁত দিয়ে চোকা ছিঁড়ে খাচ্ছে। থুতনি বেয়ে গড়িয়ে নামছে আমের হলুদ রস। বউয়ের মুখের দিকে তাকায় চুহরু। ভাঙাচোরা মুখ হাসিতে ভরে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য হাসি! চুহরু অবাক হয়। বউ এত সুন্দর হাসতে পারে! চকিতেই একটা ভাবনা খেলে যায় ওর মাথায়। ও বাড়ি ফিরে বউয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
বউ ফিরলে বলে,"তোমাকে আমার জন্যে একটা কাজ করতে হবে।"
"কী কাজ?"
"তোমাকে আম গাছের নীচে বসে তোমার সুখের স্মৃতিচারণ করতে হবে।" কথাটা বলে অবশ্য চুহরু নিজেই একটু বিব্রত হয়। বিয়ের এই এতগুলো বছরে চুহরু বউয়ের দিকে নজর দিয়েছে কোথায়! কিছুই তো সেভাবে দিতে পারেনি বউকে। দু-একবার যে রাগের মাথায় গায়ে হাত তুলেছিল সেকথাও সত্যি। তবু এই গরীব ঘরের বউদের বোধহয় আশ্চর্য ক্ষমতা আছে অসুখকেই সহ্য করতে করতে ভালবেসে সুখে রূপান্তরিত করে নেবার।
বউ বলে,"তুমি বোধহয় সত্যিই পাগল হয়ে গেছ। একটা আমগাছ মরেছে, তাকে কেটে দিলেই তো পারো।"
"না না, গাছটাতে এখনও প্রাণ আছে। এই শেষ বার।"
শেষ পর্যন্ত রাজি হয় বউ। না হয়ে উপায়ই বা কী! জীবনে কোনদিন সে চুহরুর কথা অমান্য করেছে! একটা নতুন ছাপা শাড়ি পড়ে বউ বসেছে। জীবনের অতল গভীর থেকে সে খুঁজে নিয়ে আসছে সুখের সবটুকু।
দিন যায়। চুহরু তাকিয়ে থাকে গাছের দিকে। কংগ্রেস আর সিপিএম দলের মতো গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। গোটা রাজ্য জুড়ে শুকিয়ে যাওয়া, গোটা দেশ জুড়ে শুকিয়ে যাওয়া বিরোধী দলের মতো গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। সবাই বলে, এবারে কেটে দাও। ও গাছে আর পাতা আসবে না। কিন্তু না। চুহরু খুঁটে দেখে, সামান্য আঘাত করে দেখে রস আছে কী না। সে নিশ্চিন্ত এবারে, আর কিছুদিনের মধ্যেই গাছটাতে নতুন পাতা আসবে। আসতেই হবে।
লেখক পরিচিতি
শুভজিৎ ভাদুড়ী
জন্ম মালদহে। 1985 সালে। পেশায় সরকারি আধিকারিক।
দুটিগল্প গ্রন্থের পাশাপাশি এখনও অবধি প্রকাশিত হয়েছে একটি উপন্যাস।


1 মন্তব্যসমূহ
এই গল্পটা ভালো।
উত্তরমুছুন