‘কি ব্যাপার কি ? আলো আসছে না তো ঘরে , আমি না থাকলে ঘরে আলোও কি ঠিকঠাক আসবে না ? ‘
সোফায় বসে টিভির দিকে তাকিয়ে মুনিয়া-
‘কি দেখছো’?
‘ও ওই তোমার পোলারবেয়ার ছানা আর তাদের মা ?’
‘ হ্যাঁ পোলার বেয়ার ।’
কয়েকমুহূর্ত টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে মিনি।
‘আচ্ছা শোনো আমার বড্ড খিদে পেয়েছে কি করা যায় বলোতো ?’
‘ কি খাব?’
‘ হ্যাঁ কি খাই বলতো আমরা? মুড়ি খাব, মুড়ি বেশ করে পেঁয়াজ দিয়ে মেখে ,একটু লঙ্কা, চানাচুর আর একটুখানি সর্ষের তেল দিয়ে। তুমি ততক্ষণ দেখো পোলার মা কি করছে ।ও শোনো ,আরতি কে আমি কয়েকটা জিনিস আনতে পাঠিয়েছি। এক্ষুনি এসে যাবে সিঁড়িতেই ওর সাথে দেখা হল ।’
মিনি দুটো বাটিতে মুড়ি আনলো। একটা হালকা গোলাপি রঙের বাটি খুব সুন্দর একটা চামচ দিয়ে মুনিয়াকে দিল।অল্প এইটুকুন মুড়ি।
‘ নাও । এই চামচ দিয়ে একটু একটু করে তোলো, তারপর আস্তে আস্তে খাও। তোমাকে আমি লঙ্কা দিইনি ।দু-একটা দিয়েছি। বেশি লঙ্কা খেলে তোমার ঝাল লাগবে, বুঝলে মুনিয়া ?
আচ্ছা বলতো কার নাম মুনিয়া ?’
‘ আমি মুনিয়া।’ বলে মুনিয়া নিজের বুকে হাত রাখলো।
‘ কে মুনিয়া ডাকত তোমাকে?’
‘ ছোট পিসিমনি, কাকু ঠাম্মি বাবা সবাই ডাকে। মা ডাকে পাখি। ছোট পিসিমনি মুন্নিও বলে।
‘ ছোট পিসিমনি তোমাকে অনেক গল্প বলে, না ?’
‘ হ্যাঁ। এই তো সব অ্যানিমেলসের আর ছানাদের গল্প। বায়োলজি টিচার তো ছোট পিসিমণি । টিঙ্কু, তপু, নুপুর টুলু আর আমাকে।দুপুরে বারান্দায় চিক টেনে। খুব গরম হয়, খুব গরম।’
‘তোমরা শ্রীরামপুর যেতে গরমের ছুটিতে?’
‘ শ্রীরামপুর দাদুর বাড়ি।’
‘ ইস, দাদুর বাড়ি শুনে মেয়ের মুখ চিকচিক করছে দ্যাখো।না, অতটা চিকচিক করছে না তো… তোমাকে একটু ক্রিম মাখাতে হবে। একটু মালিশ দরকার। বেশ খসখস করছে।দেখি একটু’।
মুনিয়ার কপালে একটু আঙ্গুল বুলিয়ে বললো-
‘আরতিটা যে কি করে .. বলেছিলাম রোজ একটু ক্রিম মাখাবি চানের পর ‘।
‘ না ক্রিম না।’ মুনিয়া প্রতিবাদ করলো।
‘ ক্রিম না তো কি ? তুহিনা? বসন্ত মালতি? হি হি..'
মুনিয়ার মুখেও এক চিলতে হাসির কড়া নাড়া।
‘ আচ্ছা এবার বলতো ছোট পিসিমণি যে তোমাদের এত গল্প করতো, কি বলতো? এদের মধ্যে কোন মা সবচেয়ে ভালো, মানে কোন অ্যানিমাল মা?’
মুনিয়ার বসে যাওয়া হারানো দৃষ্টিতে অনেক পুরনো এক আলোর ঝিকমিক-
এক নিঃশ্বাসে-
‘সোনা দিদি বলে ব্ল্যাক স্পাইডার, আর টিঙ্কু বলে’
‘ কি বলে টিঙকু?
‘লায়ন মা’।
‘ আর তুমি কি বলতে তুমি মুনিয়া দেবী তোমার ফেভারিট মা কে?'
‘ওরাং ওটাং।’
‘ ওরাং ওটাং কেন ?’
‘ ওরাং ওটাং মেয়ে, বড় হয়ে গিয়েও মায়ের কাছে যায়, ফিরে যায় তার মাকে দেখতে।’
মিনি স্তব্ধ হয়ে গেল।এটা নতুন ।এটা এর আগে কখনো বলেনি মুনিয়া।
‘ও তাই ? আর কি করে ওরা ?
‘ ওরাং ওটাং মা, মা সারাদিন রোজ একটা করে বাসা বাঁধে। সেখানে তার বেবিকে শোয়ায়। এত কাজ করে, কষ্ট করে, কিন্তু বেবিকে কখনো নিচে রাখে না। বাসা বাঁধে, বেবিকে কোলে নিয়ে। পরের দিন আবার নতুন বাসা বাঁধে। অনেক অনেক বাসা। ’
আজ মিনির চোখে জল এসে গেল।
‘ বাঃ কি দারুণ ’।
‘ আচ্ছা এবার আমি তোমাকে একটা গল্প বলি’? মিনি বললো।
‘আমার মায়ের গল্প। আচ্ছা বলতো মুনিয়া, তুমি আমার মাকে চেনো ?’
মুনিয়ার চোখ এই প্রশ্নটাতে কেমন একটা হাঁক পাঁক করে ওঠে। গলার কাছে একটা শিরা কাঁপতে থাকে থিরথির - মুখটা একটু লাল । মিনি সাবধান হল।
‘এই গল্পটা আমার মা আমাকে বলেছিল । রাজগীরের গল্প ।মুনিয়া, তুমি গেছো রাজগীর?
‘রাজগীর।’
‘ মুনিয়া জানো আমার মায়ের নাম কি ? মনে হয় জানো না।আচ্ছা আমি বলছি। খুব মজার। আমার মায়ের নামও না-মুনিয়া । তুমি যেমন ছোট মুনিয়া, তোমার মায়ের, বাবার, ছোটপিসিমণি, কাকুনের- আমার মা মুনিয়া বড় মেয়ে এই এতটা’ হাত দিয়ে দেখালো মিনি। তার মেয়ে মানে ছোট্ট আমি, মা,বাবা গেছিলাম।
ওই দেখো আমার মার কোলে আমি ছোট্ট ।’
মা বাবা আর মিনির ছবি দেয়ালে, একটা সিপিয়া টোনের মধ্যে দিয়ে যেন-তবু তার মধ্যেও মায়ের বেগুনি শাড়ি, কপালে টিপ, গলার মটর দানা হার, তরুণী মুখে চোখে লুকোনো হাসি…দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু বইছে কুলকুল।বাবার মুখে দিব্যি চওড়া হাসি। কিন্তু কেন জানি না, মিনি ভীষণ সিরিয়াস, মুখটা উৎকট গম্ভীর ।
‘ওই দেখো মার সামনে আমি।’ মুনিয়া ছবির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল.. যেমন রোজ থাকে ।
‘ এবার গল্প শোনো , সেই রাজগীরে নালন্দা যাবার পথে, ওদের বাসের টায়ার গেল পাংচার হয়ে। তো টুর পার্টি কি করল, তারা ওখানেই তাবু খাটিয়ে স্টোভ জ্বালিয়ে শুরু করে দিল রান্না। কিন্তু ওদের কাছে কোন দুধ ছিল না। আমার মায়ের মাথা তো খারাপ হয়ে গেল।
মা চারদিকে দেখতে থাকলো আশপাশে কোন বাড়ি ঘর আছে কিনা, বাসের পেছনদিকে যেখানে তাবু ছিলো, সেটা পেরিয়ে বেশ দূরে মার মনে হল কুঁড়েঘর মতো দেখা যাচ্ছে।’
‘কুঁড়েঘর’?
‘হ্যাঁ।তো মা কি করল বলতো ? কাউকে কিছু না বলে হাঁটা দিল। মায়ের মোটে বাইশ বছর বয়স, কলকাতায় মা কাউকে ছাড়া বাইরে প্রায় বের হয়নি, কোথাও একা যায়নি। আমাকে কোলে নিয়ে সে চলেছে তো চলেছে, আমার কিনা দুধ দরকার। আমার বয়স কিন্তু অত কম ছিল না, যে দুধ না হলে আমার চলবে না… কিন্তু আমি ছিলাম ওরকমই, সত্যিই দুধ ছাড়া আমার চলত না। একবেলাও।’
এখন মুনিয়া কথাগুলো গিলছে।
‘আমি ছিলাম বুঝলে বেশ মোটাসোটা বাচ্চা। আর মা আমার টিংটিঙে রোগা। আমাকে কোলে নিয়ে ঘেমে নেয়ে অনেকক্ষণ বাদে কোনরকম ওই কুঁড়েঘর গুলোর কাছে পৌঁছল। প্রথম বাড়িটার দেওয়ায় বসেছিলেন একটা বুড়ো লোক। পাকা চুল, পাকা গোঁফ, কিন্তু বেশ শক্তপোক্ত।
মা তাকে বলল ‘বাচ্চা কা দুধ মিলেগা? দুধ নেহি হ্যায়। উধার বাস খারাপ হুয়া।’
হঠাৎ এরকম শহুরে তরুণী একজন মেয়েকে বাচ্চা কোলে দেখে, তারপর তার মুখে ওরকম অপূর্ব হিন্দি শুনে বুড়ো একটু চুপ করে রইলেন, তারপর হিন্দিতে ঘরের দিকে তাকিয়ে কাউকে কিছু বললেন। একজন বয়স্ক মহিলা মাথায় ঘোমটা, বেরিয়ে এলেন বাইরে।তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে উঠোনে নেমে অন্যদিকে একটা ঘরে চলে গেলেন। কিছুক্ষন বাদে, চকচকে পেতলের বাটিতে দুধ আর কি সুন্দর নাকি একটা ঝিনুক , খুব সুন্দর সেপের । আনন্দে আমার মা তো আত্মহারা, মেয়ের দুধ জোগাড় করে ফেলেছে ঐরকম অচেনা বিদেশ বিভুঁইতে ..মাতো সুকরিয়া, সুকরিয়া বলে অস্থির। ওই কথাটা নাকি হিন্দি গান থেকে শিখেছিল। তারপরে দাওয়ায় বেশ গুছিয়ে বসে, আমাকে কোলে ফেলে, ঝিনুক দিয়ে দুধ খাইয়ে দিল। মার যে সে কি আনন্দ ! ভেবে দেখো মুনিয়া আমার মা, মানে বড় মুনিয়া কিন্তু একবারও আমাকে কোল থেকে নামায়নি। ওই ওরাং ওটাং মায়েদের মতই আমার মা ও চ্যাম্পিয়ন ।’
‘চ্যাম্পিয়ন’।মুনিয়া বললো।
‘তারপর কি হল বলতো ?একসাথে মা ‘বাটি ঝিনুক কাঁহা ধোনা’ জিজ্ঞেস করছিলো, তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার করছিল ,তারপর বটুয়া থেকে টাকা বার করে দিতে যাচ্ছিল।
দুধের দাম টা দিতে হবে তো … তখন কি হল জানো ?’
বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে চুপ করে গেলো মিনি।
মূনিয়া বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে-
‘ওই বয়স্ক মহিলা বুড়ো লোককে ফিসফিস করে কি বললেন; বুড়ো মানুষটি হেসে বললেন ‘তুমহারি বেটি হামারি বেটি নেহি হ্যায়? পয়সা লেঙ্গে তুমসে ?’
মা তো অবাক ।
‘ঠেয়রো বেটি , ইয়ে লেতি যাও।’
ওই ফাঁকে চট করে ওই বয়স্ক মহিলা ঝিনুকটা ধুয়ে এনেছেন ওটা আঁচল দিয়ে মুছে মার হাতে দিলেন।
‘বিটিয়াকো দুধ পিলানা।’
মা ততক্ষণে প্রায় কাঁদতে শুরু করেছে।
গল্পটা শেষ হতে হতে মিনি ওঠে, ওয়াল ক্যাবিনেটের একটা ড্রয়ার খুলে একটা খুব সুন্দর নীল বাক্স নিয়ে আসে। খোলে । এখনো চকচক করছে ঝিনুকটা- মুনিয়ার হাতে দেয় | ওই ঝিনুকটা মুনিয়ার জীবনের সবথেকে প্রিয় গল্প । মুনিয়া দুর্বল শির বার করা হাতে ঝিনুকটা ধরে। হাতটা একটু একটু কাঁপে। ঠোঁটও।
মুহূর্তরা গড়ায়, পল,অনুপল ....
মিনি নিজের হৃদস্পন্দন যেন শুনতে পায় একটা মিরাকেলের আশায় -যে ঝিনুকটা যদি আজ চাবি হয়ে যায়, খুলে দেয় মুনিয়ার স্মৃতির দরজা। কিন্তু না, মিরাকেল হয় না কাঁপতে থাকা মুনিয়ার হাত থেকে আস্তে আস্তে ঝিনুকটা নিয়ে নেয় মিনি। বাক্সে তুলে রাখে। যেমন রাখে, প্রত্যেকদিন।
কালকের বিকেলও, আজকের বিকেল। জানলার সবুজ পর্দা দিয়ে হয়তো আরেকটু হাওয়া অথবা তেজি আলো। সন্ধ্যে নামবে একটু একটু করে .. ছোটপিসিমণি, শ্রীরামপুর, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল নিয়ে
সোফায় পাশাপাশি বসে থাকবে-
মা আর মেয়ে।
মেয়ের চুল সাদা, শীর্ণ ছোট শরীর, বেভুল হয়ে আসা চোখ-
মায়ের ক্লাচ দিয়ে বাঁধা উল্টানো চুলে দু একটা রুপোলি রেখা, চোখের নিচে দিন শেষের ক্লান্তি ।
মায়ের বলিষ্ঠ ভরাট হাত, সন্ধানী আঙুল মেয়ের পাকা চুলে ভরা মাথায় তেল মাখাতে মাখাতে, গল্প করে ভুলিয়ে একটু ছানা বা উপমা খাওয়াতে খাওয়াতে, স্মৃতি খোঁজে প্রত্যেকদিন। আর তারপরে ওই স্মৃতির খড়কুটো দিয়ে বানায় একটা বাসা, জেনেই, যে কালকে ওটা আর থাকবে না-
আবার নতুন বাসা তৈরি করতে হবে। তবু একটু একটু করে তার হারাতে থাকা বুড়ো মেয়েকে, কিছুতেই হারাতে দেয় না মা।
পাশাপাশি বসে থাকে সোফায়।
মা আর মেয়ে ।
মিনি আর মুনিয়া।
'ক্যালাইডোস্কোপ' এবং 'অপরাজিতা', বই দুটি দে'জ কমলিনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। পেশাগত জীবনে মহুয়া স্পেশাল এডুকেশনে যুক্ত রয়েছেন। বর্তমান বসবাস যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট্সে।


0 মন্তব্যসমূহ