অনুবাদ : দেবব্রত দাশগুপ্ত
বস্তুবৈচিত্র্যে--বিচিত্র অভিজ্ঞতায়--সভ্যতার সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তের জগৎকে সাহিত্যভাত করায় জ্যাক লন্ডোনের কৃতিত্ব। ব্যক্তি জীবনে ভাগ্যান্বেষী জ্যাক লন্ডন সোনার সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছেন আলাস্কার পার্বত্য অঞ্চলে, 'ফার'--এর ব্যবসা করতে মেরু অঞ্চলের হাজার হাজার মাইল তুষার-প্রান্তর পরিক্রমা করেছেন। তাঁর গল্পে একদিকে যেমন রুদ্র প্রকৃতির নিষ্ঠুর রূপ--অন্যদিকে তেমনি সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে সীমাহীন মমতা। জ্যাক লন্ডনের গল্পে পো-র মতোই নিষ্ঠুর ভয়াবহতা, আর সেই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক ব্রেট-হার্টের উচ্ছ্বলিত মানবপ্রীতি। জ্যাক লন্ডনকে বলা হয় ডারউইনবাদের কাব্যিক উপস্থাপক। 'যোগ্যতমের বেঁচে থাকাই' যেন তাঁর লেখনবস্তু।
To Build A Fire গল্পে মেরুর দিগন্তবিস্তারের মধ্য দিয়ে একটি লোক ফিরছে ইউকোনের তাঁবুর দিকে--তাঁর সঙ্গী একটি কুকুর। কিন্তু লোকটি পথ হারিয়েছে। হতভাগ্য লোকটি আগুন জ্বালাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে-শূন্যের পঁচাত্তর ডিগ্রীর নিচের অসহ্য শীতে কীভাবে ধীরে ধীরে লোকটি বেঁচে থাকার চেষ্টা করেও মরে গেল। হাত দুটো ক্রমেই জমে যাচ্ছে, আগুন জ্বালাবার উপায় নেই, তখন লোকটা ভাবছে, কুকুরটাকে হত্যা করে তার তপ্ত রক্তে এবং দেহের ভেতরে নিজের হাত ঢুকিয়ে গরম করে নেবে একটুখানি।
------------------------------------------------------
তখন সবেমাত্র ঠাণ্ডা আর ধূসর, ভীষণ ঠাণ্ডা আর ধূসর রংয়ের ভোর হয়েছে এমন সময় লোকটা ইউকনের বুকের প্রধান পথটা ছেড়ে মাটির উঁচু পাড়ের উপরে উঠল যেখান থেকে একটা অস্পষ্ট আর নির্জন পথ স্প্রুসের ঘন বন ভেদ করে পুব দিকে চলে গিয়েছে। পাড়টা খুব খাড়াই বলে উপরে উঠে সে দম নিতে থামল আর যেন তারই কৈফিয়তস্বরূপ ঘড়িটার দিকে চেয়ে দেখল। ন'টা বেজেছে। রোদ নেই, সূর্যের চিহ্নমাত্রও নেই, যদিও আকাশ সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত। দিনটা পরিষ্কার কিন্তু তবুও সবকিছুর উপরে যেন এক অশরীরী ছায়া পড়েছে, যেন সূর্যের অনুপস্থিতিতে এক অন্ধকারের আভাস দিনটাকে কালো করে তুলেছে। তাতে কিন্তু লোকটাকে বিশেষ বিচলিত করল না। সূর্যের অভাবে সে অভ্যস্ত। শেষবারের মতো সূর্যের দেখা পাবার পর অনেকদিন কেটে গেছে আর সে জানে যে আর মাত্র দিনকয়েক বাদেই সেই বলয়ের হাসিমাখা মুখ দক্ষিণ দিকের দিকচক্রবালের তলা থেকে একবার উঁকি দিয়েই তৎক্ষণাৎ ফের ডুব মারবে।
লোকটা যে পথ দিয়ে চলে এসেছে সেদিকে একবার চেয়ে দেখল। ইউকনের এক মাইল চওড়া নদীবক্ষ তিন ফুট গভীর জমাট বরফের নিচে অবলুপ্ত। তার উপরে আবার ততটাই গভীর তুষারের আচ্ছাদন। সমস্তটাই একেবারে সাদা হয়ে যেখানে যেখানে জমাট বাঁধা বরফের চাপ অত্যধিক তাদের উপর দিয়ে ঢেউ খেলিয়ে চলে গিয়েছে। উত্তরে আর দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় এক অবিচ্ছিন্ন শুভ্রতার বিস্তার যার মধ্য দিয়ে কেবল একটা চুলের মতো সরু কালো রেখা দক্ষিণের স্পুসে ঢাকা দ্বীপটাকে বেড় দিয়ে এসে এঁকে বেঁকে উত্তর দিকে চলে গিয়ে আরেকটা স্প্রুসে ঢাকা দ্বীপের পিছনে উধাও হয়ে গিয়েছে। এই কালো রেখাটাই হচ্ছে পথ—প্রধান পথ—যেটা দক্ষিণ দিকে পাঁচশো মাইল গিয়ে চিলকুট গিরির্ত্ম, ডাই এয়া আর সমুদ্র আর উত্তরে সত্তর মাইল দূরে ড’সন, আরো হাজার মাইল উত্তরে নুলাটো হয়ে অবশেষে দেড়হাজার মাইল দূরবর্তী বেরিং সাগরের উপকূলে সেন্ট মাইকেল অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে।
কিন্তু এই সব কিছু—এই রহস্যময় সুদূরপ্রসারী সরু পথ, আকাশে সূর্যের অনুপস্থিতি, সেই ভয়াবহ ঠাণ্ডা, আর সব কিছুরই একটা অচেনা, অপার্থিব ভাব—লোকটার মনে কোনো দাগ কাটতেই পারল না। সেটা এজন্য নয় যে এ সবে সে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত । এ অঞ্চলে সে এক নবাগত আর এই তার প্রথম শীতের অভিজ্ঞতা। তার সবচেয়ে বড়ো অসুবিধা এই যে সে কল্পনাশক্তি ও রহিত। পার্থিব ঘটনাবলী সম্পর্কে সে সচেতন ও চটপটে কিন্তু সে কেবলমাত্র ঘটনাগুলো সম্বন্ধে, তাদের তাৎপর্য নিয়ে নয়। শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা বরফের চেয়ে মোটামুটি আশি ডিগ্রি নিচে। এই তথ্য তার কাছে কেবল ঠাণ্ডা ও অস্বস্তিকর মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। এরা তাকে তাপের উপরে আপন ভঙ্গুর দেহের নির্ভরশীলতা এবং সাধারণভাবে মানুষের এক সঙ্কীর্ণ তাপমাত্রার মধ্যে প্রাণধারণ করবার ক্ষমতার অনিত্যতা এবং এর থেকে অমরত্বের মতো বিতর্কিত বিষয় এবং বিশ্বজগতে মানবজাতির স্থান সম্পর্কে চিন্তার মধ্যে চালিত করে না। শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা মানে বরফের কামড় যা থেকে আঙুলকাটা দস্তানা, কানের ঢাকা, গরম মোকাসিন জুতো আর মোটা মোজা দিয়ে আত্মরক্ষা করতে হয়। শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা তার কাছে কেবল শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা ছাড়া আর কিছু নয়। এর মধ্যে তার বেশি কিছু যে থাকতে পারে সে কথা তার বোধগম্য নয়।
রওনা হবার জন্য তৈরি হয়ে সে পরখ করে দেখার জন্য একবার থুথু ফেলল। ফটাস করে ফাটার এক শব্দে সে চমকে উঠল। সে ফের থুথু ফেলল। আবারও, বরফের উপর গিয়ে পড়ার আগেই, হাওয়ার মধ্যেই থুথুটা ফাটলো। এ কথা সে জানত যে শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রি কম তাপমাত্রায় থুথু বরফের উপরে পড়েই ফেটে যায় কিন্তু এ থুথুটা হাওয়ার মধ্যেই ফেটেছে। নিঃসন্দেহে তাপমাত্রা শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রিরও নিচে-- কিন্তু কতোটা নিচে তা তার জানা নেই। কিন্তু তাপমাত্রায় কিছু এসে যায় না। তার গন্তব্যস্থল হচ্ছে হেন্ডারসন খাঁড়ির উজানে দুমুখো জায়গাটার বাঁ-হাতি শাখার ধারে পুরোনো খনিটা যেখানে তার দলের লোকেরা আগেই এসে জমায়েত হয়েছে। তারা ইন্ডিয়ান ক্রিক অঞ্চল দিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে সিধে চলে এসেছে আর সে বসন্ত এলে ইউকনের দ্বীপগুলি থেকে কাঠ সংগ্রহের সুবিধা-অসুবিধা সরেজমিনে দেখে নেবার জন্য ঘুরপথ দিয়ে এসেছে। ছ'টার মধ্যেই সে আস্তানায় পৌঁছে যাবে; ততক্ষণে বেশ অন্ধকার হয়ে যাবে সে কথা সত্য কিন্তু দলের লোকেরা সবাই সেখানে থাকবে, একটা আগুন জ্বলবে আর গরম গরম খানাও তৈরি থাকবে। দুপুরের খাওয়ার কথা মনে হতে সে তার জ্যাকেটের অভ্যন্তর থেকে উঁচু হয়ে থাকা পোঁটলাটার উপরে হাত রাখল। সেটা তার শার্টেরও তলায় রুমাল দিয়ে জড়িয়ে একেবারে গায়ের অনাবৃত চামড়ার সাথে লেপটে রাখা আছে। বিস্কিটগুলোকে জমে যাবার হাত থেকে রক্ষা করার এটাই একমাত্র উপায় । লম্বালম্বি করে কাটা, বেকনের চর্বিতে চোবানো আর এক এক খণ্ড মোটা বেকনের ওপরে জড়ানো বিস্কিটগুলোর কথা মনে হতে সে আপন মনেই আত্মপ্রসাদের হাসি হাসল।
বিশাল স্প্রুসের বনের মধ্যে সে ঢুকে পড়ল। পথরেখা অতি অস্পষ্ট। শেষ স্লেডটা চলে যাবার পর এক ফুট তুষারপাত হয়েছে আর সে নিজে যে বিনা স্লেডে হাল্কাভাবে চলেছে তাতে সে খুশিই হল। বস্তুতপক্ষে রুমালে জড়ানো খাবারটা ছাড়া তার কাছ আর কিছুই নেই। কিন্তু ঠাণ্ডার বহর দেখে সে অবাক হয়ে যাচ্ছিল। আঙুলকাটা দস্তানা পরা হাত দিয়ে অবশ হয়ে যাওয়া নাক আর গাল ঘষতে ঘষতে সে এই সিদ্ধান্তে এল যে ঠাণ্ডাটা সত্যিই প্রচণ্ড রকমের। লোকটার গালে চাপদাড়ি কিন্তু তাতে তার গালের উঁচু হাড় অথবা ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে খাড়া হয়ে থাকা নাকটাকে একটুও আশ্রয় দিচ্ছিল না।
লোকটার পিছন পিছন আসছিল একটা কুকুর, একটা প্রকাণ্ড দেশীয় হাস্কি, খাঁটি নেকড়ে-কুকুর, ধূসর লোমে আবৃত এবং আকৃতি ও প্রকৃতিতে তার জাতভাই বুনো নেকড়ের সাথে যার কোনো আপাত পার্থক্যই নেই। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জন্তুটা বিমর্ষ হয়ে আছে। সে জানতো যে এটা পথ চলার সময় নয়। তার সহজাত বোধশক্তি তাকে মানুষের বিচারবুদ্ধির চেয়ে বেশি খাঁটি সংবাদ দিচ্ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাপমাত্রা তখন যে শূন্যের কেবলমাত্র পঞ্চাশ ডিগ্রি কম তা নয়, তা ষাট ডিগ্রি, এমন কি সত্তর ডিগ্রিরও নিচে। সেটা ছিল শূন্যের পঁচাত্তর ডিগ্রি কম। যেহেতু শূন্যের বত্রিশ ডিগ্রি উপরেই জল জমে বরফ হয়ে যায় তাই এর অর্থ তাপমাত্রা হিমাঙ্কের একশো সাত ডিগ্রি নিচে নেমেছে। কুকুরটা তাপমান যন্ত্রের বিষয়ে কিছুই জানত না। হয়তো ভীষণ ঠাণ্ডা সম্বন্ধে মানুষের মনে যে সজাগ চেতনা আছে তার মস্তিষ্কে তাও ছিল না। কিন্তু জন্তুটার সহজাত বোধ ছিল। সে এমন একটা অস্পষ্ট অথচ ভীতিপ্রদ আশঙ্কা বোধ করছিল যে তাতে সম্পূর্ণ দমে গিয়ে সে লোকটার পিছন পিছন গুটি গুটি আসছিল আর তার প্রতিটি বেহিসাবী কার্যকলাপে এমন প্রশ্নসূচক ভাব করছিল যেন সে চাইছিল যে লোকটা হয় আস্তানায় পৌঁছে যাক আর নয়তো কোথাও আশ্রয় নিয়ে একটা আগুন জ্বালাক। কুকুরটা আগুন চিনেছে আর সে চাইছিল যে হয় আগুন জ্বালানো হোক আর নয়তো সে তুষারের নিচে ঢুকে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে বাতাসের হাত থেকে পরিত্রাণ পাক।
তার নিঃশ্বাসের জলকণা জমে গিয়ে তার লোমের উপর এক মিহি তুষারের সৃষ্টি করছিল আর তার চোয়াল, মুখ, আর চোখের পালক তার নিঃশ্বাসের গুঁড়োয় সাদা হয়ে উঠছিল। লোকটার নিজের লাল রঙের দাড়িগোঁফও একই রকমভাবে জমে গিয়েছিল কেবল তার ক্ষেত্রে সেটা বরফের আকার ধারণ করে অনেক বেশি শক্ত হয়ে জমছিল আর প্রতিবার প্রশ্বাস ফেলার সাথে সাথে সেটা বেড়েই যাচ্ছিল। তার উপরে লোকটা দোক্তা চিবোচ্ছিল আর জমাট বরফে তার দুই ঠোঁট এমন শক্ত হয়ে ঠেসে গিয়েছিল যে পিক ফেলার সময় সেটা তার থুতনি পার হতে পারছিল না। তার ফলে তার থুতনির নিচে গাঢ় বাদামী রংয়ের স্ফটিকের মতো আকৃতির এক দাড়ি ক্রমাগত লম্বা হয়ে চলেছিল। কিন্তু তাতে সে মোটেই পরোয়া করছিল না। সে দেশে সব দোক্তাবিলাসীদেরই সেই খেসারৎ দিতে হয় আর সে নিজেও এর আগে বার দুয়েক ঠাণ্ডার মধ্যে বেরিয়েছে। তার কোনোবারই এমন ভয়ানক ঠাণ্ডা পড়েনি কিন্তু সিক্সটি মাইলের স্পিরিট থার্মোমিটারে সে তাপমাত্রা শূন্যের পঞ্চাশ এবং পঞ্চান্ন ডিগ্রি অবধি নিচে নামতে দেখেছিল।
বনের ভিতরের সমতল ভূমি দিয়ে কয়েক মাইল পথ চলে এবং তারপর নিগারহেড ঝোপে ভরা একটা বিস্তীর্ণ মাঠ পার হয়ে একটা ঢালু পাড় বেয়ে সে একটা ছোট খালের মধ্যে নামল। এটাই সেই হেন্ডারসন খাঁড়ি আর সে জানতো যে তার শাখা থেকে সে এখন দশ মাইল দূরে। সে ঘড়ি দেখল। দশটা বেজেছে। সে ঘণ্টায় চার মাইল করে পথ চলছে তাই সে হিসেব করে দেখল যে সে সাড়ে বারোটা নাগাদ শাখার ধারে গিয়ে পৌঁছবে। সেখানে পৌঁছে দুপুরের খাওয়া দিয়ে তার সংবর্ধনা করতে সে মনস্থ করল।
লোকটা খাঁড়ির তলা দিয়ে রওনা হতে কুকুরটা ফের তার পিছুপিছু চলল কিন্তু তার ঝুলে পড়া লেজটা নিরুৎসাহ প্রকাশ করতে লাগল । পুরোনো স্লেডের পথের আকৃতি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল কিন্তু সর্বশেষ স্লেডটার টানার দাগ এক ফুট তুষারের নিচে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। গত একমাস ধরে খাঁড়ির সেই নিঃশব্দ পথ দিয়ে কেউ যায়নি। লোকটা ক্রমাগত এগিয়ে চলল। একে তো চিন্তা করার বেশি অভ্যাস তার নেই আর সেই সময়ে সে যে শাখার কাছে পৌঁছে দুপুরের খাওয়াটা সারবে আর ছ'টা নাগাদ আস্তানায় হাজির হয়ে সঙ্গীদের সাথে মিলবে এ ছাড়া ভাববার আর বেশি কিছু তার ছিল না। কথাবার্তা বলারও কেউ নেই; আর থাকলেও মুখের উপর বরফের মুখোশটার জন্য কথা বলা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই সে একনাগাড়ে দোক্তা চিবিয়ে তার বাদামী দাড়িটাকে দীর্ঘতর করে চলল।
তবে মাঝে মাঝে এ কথাটা তার মনের মধ্যে উঁকি দিতে লাগল যে ঠাণ্ডাটা প্রকৃতই মারাত্মক আর সে নিজে আগে কোনোদিন এমন ভয়ানক ঠাণ্ডার মধ্যে পড়েনি। চলতে চলতে সে তার আঙুলকাটা দস্তানা পরা হাতের পিছন দিয়ে গাল আর নাক ঘষতে লাগল। কিন্তু যতই ঘষুক না কেন, ঘষা থামালেই তার গাল জমে যাচ্ছিল আর পরক্ষণেই তার নাকও জমে যাচ্ছিল। তার গাল নির্ঘাত জমে যাবে, ঠাণ্ডার সময় তার বন্ধু বাড যেমন একটা নাকের ঢাকা পরে নেয় তেমনি একটা বানিয়ে না নেবার জন্য তার আফসোস হতে লাগল। সে রকম ঢাকা গালের উপর দিয়ে গিয়ে তাদেরও রক্ষা করে । কিন্তু তাতে এমন কিছু এসে যায় না। গাল জমে গেলেই বা কী? একটু বেদনা হবে, তার বেশি কিছু নয় ; আর তাতে কখনোই খুব একটা অনিষ্ট হয় না ।
লোকটার মস্তিষ্ক চিন্তাশূন্য হলেও তার দৃষ্টি খুবই সজাগ আর সে খাঁড়িটার অদলবদল, আঁকবাঁক, কাটা গাছের গুঁড়ির স্তূপ, সব কিছুই নজর করে দেখছিল আর সাবধানে খেয়াল করে পা ফেলছিল। একবার একটা বাঁক পেরোতে গিয়ে সে সচকিত ঘোড়ার মতো সহসা থমকে দাঁড়াল তার পর যেখান দিয়ে হাঁটছিল সেখান থেকে একপাশে সরে গিয়ে কয়েক ধাপ পিছিয়ে এল। সে জানত যে খাঁড়িটার তলা অবধি বেমালুম জমাট—সেই মেরুপ্রদেশের শীতের মধ্যে কোনো খাঁড়িতেই জল থাকা সম্ভব নয়—কিন্তু সে এও জানত যে পাশের পাহাড়ের গা থেকে জলের ঝরনা সব বেরিয়ে এসে খাঁড়ির তুষারের তলা দিয়ে আর বরফের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সে জানত যে সবচেয়ে কঠিন শীতেও ঝরনাগুলো জমে যায় না আর তাদের বিপদ সম্বন্ধেও সে অবহিত ছিল। সেগুলো ফাঁদ বিশেষ। তারা তুষারের নিচে জলের ডোবা লুকিয়ে রাখে গভীরতায় যেগুলো তিন ইঞ্চিও হতে পারে আবার তিন ফুটও হতে পারে। কখনো কখনো আধ ইঞ্চি মোটা এক বরফের স্তরে তাদের ঢেকে দেয় যাদের আবার তুষারে ঢেকে ফেলে। কখনো কখনো জল আর বরফের পাতলা আচ্ছাদন স্তরে স্তরে তৈরি হয় যাতে কেউ একবার তাদের ভেঙে ঢুকলে একের পর এক স্তর ভাঙতে ভাঙতে কেবলি নিচে নামতে থাকে ; কখনো কখনো কোমর অবধি ভিজে যায়।
এই জন্যেই সে অত ভয় পেয়েছিল। সে পায়ের তলায় নমনীয় ভাব অনুভব করেছিল আর তুষারের নিচে লুকানো বরফের চাদরের মড় মড় আওয়াজও তার কানে এসেছিল। এত ঠাণ্ডার মধ্যে পা ভিজে গেলে তাতে অসুবিধা ও বিপদ দুইই আছে। নিদেনপক্ষে তাতে দেরি হয়ে যাবে কারণ তখন তাকে যাত্রা স্থগিত রেখে একটা আগুন জ্বালিয়ে নিয়ে তারই আওতায় খালি পায়ে জুতো মোজা শুকিয়ে নিতে হবে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাঁড়িটার তলাটা আর পাড়গুলো পর্যবেক্ষণ করে স্থির করল যে জলের ধারা ডান দিক থেকে বইছে। নাক আর গাল ঘষতে ঘষতে খানিক ভেবেচিন্তে সে অতি সন্তর্পণে প্রতিটি পদক্ষেপ পরখ করে ফেলে ফেলে বাঁ ধার দিয়ে পাশ কাটিয়ে গেল। বিপজ্জনক জায়গাটা পার হবার পর সে নতুন করে দোক্তা মুখে ফেলে ফের ঘণ্টায় চার মাইল বেগে পথ চলা শুরু করল।
পরবর্তী দুঘণ্টার মধ্যে সে ঐ রকম আরও গোটাকয়েক ফাঁদের সম্মুখীন হল। সাধারণত উপরের তুষারের নিচে লুকনো জলের ডোবাগুলো তাদের দেবে যাওয়া, ঝুরঝুরে তুষারে ছাওয়া চেহারা দিয়ে বিপদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছিল। তবু আরো একবার ফাঁড়াটা তার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল ; আর একবার বিপদ সন্দেহ করে সে কুকুরটাকে সামনের দিকে এগিয়ে দিল। কুকুরটা যেতে চাইছিল না। যতক্ষণ না লোকটা তাকে সামনে ঠেলে দিল ততক্ষণ সে গড়িমসি করতে লাগল আর তারপর দ্রুতপায়ে শুভ্র বিস্তারটা পার হতে লাগল। হঠাৎ সে আস্তরণটা ভেঙে একপাশে কাত হয়ে পড়ে গিয়ে হাঁচড় পাঁচড় করে শক্ত জমির উপর ঠেলে উঠল। তার সামনের পা আর থাবা ভিজে গেছে আর প্রায় সাথে সাথেই লেগে থাকা জলটা বরফে পরিণত হল। সে চট করে পায়ের বরফটা চেটে চেটে সাফ করার চেষ্টা করল আর তারপর তুষারের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ে কামড়ে কামড়ে থাবার ফাঁকের বরফ পরিষ্কার করতে আরম্ভ করল। এটা স্রেফ সহজাত বোধের ব্যাপার। বরফটাকে লেগে থাকতে দেবার অর্থই হল পায়ের বেদনাকে ডেকে আনা। সে কথা অবশ্য সে জানত না। সে শুধু তার অস্তিত্বের গোপন গহ্বর থেকে পাওয়া রহস্যময় আদেশ পালন করছিল মাত্র। কিন্তু লোকটা এ বিষয়ে তার বিচারবুদ্ধি দিয়ে সে কথা জানত আর সে তার ডান হাতের আঙুলকাটা দস্তানা খুলে ফেলে বরফের টুকরোগুলোকে খুঁটে বার করার কাজে সহায়তা করতে লাগল। আঙুলগুলো এক মিনিট খোলা পেতেই এত দ্রুত অবশ হয়ে আসতে লাগল যে সে তাতে বিস্মিত হয়ে পড়ল। ঠাণ্ডাটা সত্যিই মারাত্মক। সে তাড়াতাড়ি দস্তানাটা ফের পরে নিয়ে বুকের ওপরে জোরে জোরে হাত চাপড়াতে লাগল ।
বারোটার সময় দিনের আলো সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু দক্ষিণায়নের সূর্য এত নিচে যে তা দিকচক্রবালের উপর মাথা তুলতেই পারল না। পৃথিবীর গোলাকৃতি তার আর হেন্ডারসন খাঁড়ির মধ্যে আড়ালের সৃষ্টি করেছে যেখান দিয়ে লোকটা দিবাদ্বিপ্রহরে মেঘমুক্ত আকাশের নিচে কোনো ছায়া না ফেলে হাঁটছে। কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে বারোটায় সে খাঁড়ির শাখার ধারে এসে পৌঁছল। আপন অগ্রগতিতে সে খুশিই হল । এইভাবে চালিয়ে যেতে পারলে নির্ঘাত ছটার মধ্যেই সে দলের লোকেদের কাছে গিয়ে পৌঁছতে পারবে। সে জ্যাকেট আর শার্টের বোতাম খুলে খাবারটা বার করল। কাজটা করতে তার সিকি মিনিটের বেশি সময় লাগল না কিন্তু সেই স্বল্পকালের মধ্যেই তার অনাবৃত আঙুলগুলো অবশ হয়ে এল। সে দস্তানাটা না পরে তার বদলে আঙুলগুলো দিয়ে পায়ের উপর বারকতক সজোরে আঘাত করল। তার পর সে তুষারে ঢাকা একটা গাছের গুঁড়ির উপরে খেতে বসল। পায়ের উপরে আঙুলগুলো দিয়ে আঘাত করাতে যে চিনচিনে ভাবটা এসেছিল সেটা এত চট করে থেমে গেল যে তাতে সে চমকে উঠল। বিস্কিটে কামড় দেবার অবসরও তার জুটল না। কয়েকবার আঙুলগুলোকে থাবড়িয়ে দস্তানা পরে নিয়ে সে খাবার খেতে অপর হাতটা উন্মুক্ত করল। সে এক কামড় দেবার চেষ্টা করল কিন্তু জমাট বরফের মুখোশটা তাকে প্রতিহত করল। একটা আগুন জ্বালিয়ে সেটাকে গলিয়ে নেবার কথা সে ভুলে গেছে। নিজের বোকামিতে সে নিজেই হেসে উঠল কিন্তু হাসতে হাসতেই তার খেয়াল হল যে খোলা আঙুলগুলো অবশতায় ছেয়ে আসছে। সে আরো লক্ষ্য করল যে বসার সময় তার পায়ের আঙুলে প্রথমে যে চিনচিনে ভাবটা এসেছিল সেটাও চলে যাচ্ছে। সে ভাবতে লাগল যে তার পায়ের আঙুলগুলো উষ্ণ হয়ে উঠেছে না, জমে যাচ্ছে। মোকাসিন জুতোর মধ্যে নাড়াচাড়া করে সে সিদ্ধান্ত করল যে সেগুলো জমেই গেছে।
তাড়াতাড়ি দস্তানা পরে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। সে একটু ভয় পেয়েছে। সে ধপাধপ করে পা ঠুকতে লাগল যতক্ষণ না চিনচিনে ভাবটা ফিরে আসে। বেজায় ঠাণ্ডা পড়েছে, সে ভাবল। সালফার ক্রিকের লোকটা ঠিকই বলেছিল এ অঞ্চলে কখনো কখনো কি ভয়ানক রকমের ঠাণ্ডা পড়ে। আর সে কিনা তখন তার মুখের উপরে হেসেছিল ! এর থেকেই বোঝা যায় যে কোনো বিষয়েই নিজেকে খুব বেশি সবজান্তা বলে মনে করা উচিত নয়। অস্বীকার করবার জো নেই যে এ সত্যিই ঠাণ্ডা। সে এদিক ওদিক পায়চারী করে, পা ঠুকে আর হাত ছুড়ে গেল যতক্ষণ না উষ্ণতার প্রত্যাবর্তনে তাকে আশ্বস্ত করে। তারপর দেশলাই বার করে সে একটা আগুন জ্বালাবার উদ্যোগ করল। ঝোপঝাড়ের তলায় যেখানে গত বসন্তের জলে ভেসে আসা পুরোনো ডালপালা জমে আছে সেখান থেকে সে তার জ্বালানি কাঠের জোগাড় করল। সাবধানে ছোট্ট করে শুরু করে সে শিগগিরই একটা গনগনে আগুন জ্বালিয়ে ফেলল আর তাতে মুখের বরফ গলিয়ে নিয়ে তারই আঁচের আশ্রয়ে বিস্কিটগুলো খাওয়া শেষ করল। ক্ষণকালের জন্য মহাশূন্যের হিম পরাভূত হল। কুকুরটা আগুন পেয়ে খুব খুশি হল আর চার পা সামনে লম্বা করে দিয়ে এতটা কাছে শুয়ে পড়ল যাতে করে আগুনের উত্তাপও পায় অথচ আবার এতটা দূরত্বে যাতে গায়ের লোম পুড়েও না যায়।
আহার সমাধা করে লোকটা পাইপে তামাক ঠেসে ধীরেসুস্থে আয়েস করে ধূমপান করে নিল। তার পর সে দস্তানা পরে নিয়ে কানের ঢাকা ভালো করে এঁটে খাঁড়ির বাঁ দিকের শাখা ধরে উজানের দিকে রওনা হল। কুকুরটা নিরাশ হয়ে কেবলি আগুনের দিকে ফিরে ফিরে যেতে লাগল। লোকটা ঠাণ্ডার ব্যাপার কিছুই জানে না। হয়তো তার সমস্ত পূর্বপুরুষেরাও ঠাণ্ডা, বরফের চেয়ে একশো সাত ডিগ্রি কম ঠাণ্ডা সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিল। কিন্তু কুকুরটা তা জানতো ; তার সমস্ত পূর্বপুরুষেরাও জানতো আর সেই জ্ঞান সেও উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জন করেছে। সে আরো জানতো যে এমন প্রলয় ঠাণ্ডার মধ্যে চলে-ফিরে বেড়ানো মোটেই ভালো নয়। এখন উচিত হচ্ছে তুষারে একটা গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে আরাম করে শুয়ে শুয়ে যেখান থেকে এই ভয়াবহ ঠাণ্ডা আসছে সেই মহাশূন্যের মুখ কখন মেঘের পর্দায় ঢেকে যাবে তারই জন্যে অপেক্ষা করা। কিন্তু অন্যদিকে আবার কুকুরটা আর লোকটার মধ্যে কোনো গভীর সখ্যতার সম্পর্কই নেই ৷ তাদের একজন অন্যজনের শ্রমদাস মাত্র এবং তার ভাগ্যে যে একমাত্র চুম্বন জুটেছে তা হচ্ছে চাবুকের আঘাতের চুম্বন আর সেই কশাঘাতের ভয় দেখানো নানারকম কর্কশ ও ভীতিপ্রদ কণ্ঠস্বর। কাজেই কুকুরটা তার সংশয় সম্বন্ধে লোকটাকে অবহিত করবার কোনো চেষ্টাই করল না। লোকটার মঙ্গল নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাই নেই ; নিজের স্বার্থের খাতিরেই সে আগুনের দিকে ফিরে ফিরে ধাওয়া করছিল। কিন্তু লোকটা শিস দিচ্ছিল আর মুখ দিয়ে চাবুকের ঘায়ের মতো আওয়াজ করছিল কাজেই কুকুরটা ঘুরে এসে তার পিছন পিছন চলতে লাগল।
লোকটা আরেক দলা দোক্তা মুখে পুরে আরেকটা নতুন বাদামী দাড়ি গজাতে শুরু করল। আর তার আর্দ্র নিঃশ্বাস চট করে গুঁড়োতে পরিণত হয়ে তার গোঁফ, ভুরু আর চোখের পাতাকে সাদা করে তুলল। হেন্ডারসন খাঁড়ির বাঁ দিকের শাখাটাতে তত বেশি ঝরনা আছে বলে মনে হল না আর আধ ঘণ্টা ধরে লোকটা তাদের কোনো চিহ্নই দেখতে পেল না। তার পরেই ঘটনাটা ঘটলো। কোনো দুর্লক্ষণই নেই আর নরম অবিচ্ছিন্ন তুষারের রাশি তলাকার শক্ত জমির আশ্বাস দিচ্ছে এমনই একটা জায়গায় লোকটা বরফ ভেঙে ঢুকে গেল। গভীরতা খুব বেশি ছিল না। হাঁচড় পাঁচড় করে শক্ত জায়গায় উঠতে উঠতে তার হাঁটুর নিচে আধাআধি অবধি ভিজে গেল।
চটে গিয়ে সে উচ্চকণ্ঠে আপন বরাতকে গাল পাড়তে লাগল। সে ভেবেছিল যে ছ'টার মধ্যেই আস্তানায় গিয়ে সঙ্গীদের দলে ভিড়বে আর এখন এই ঘটনাটায় তাকে এক ঘণ্টা দেরি করিয়ে দেবে কারণ তাকে একটা আগুন জ্বেলে জুতোমোজা শুকিয়ে নিতে হবে। এমন ঠাণ্ডায় সেটা যে অতি অবশ্য করণীয়-এ পর্যন্ত সে জানতো ; আর সে পাড়ের দিকে ফিরে সেটা বেয়ে উপরে উঠল। উপরে কতকগুলো স্প্রুস গাছের গুঁড়ির চারধারের ঝোপঝাড়ের মধ্যে জলে ভেসে আসা কিছু শুকনো জ্বালানি কাঠ জড়ানো ছিল, যার মধ্যে বেশির ভাগই ছোট ছোট কাঠকুটো কিন্তু তার বেশ কিছুটা পুরোনো ডাল আর গত বছরের শুকনো ঝুরঝুরে ঘাস। সে কয়েকটা বড় বড় টুকরো তুষারের উপর বিছিয়ে দিল। এতে একটা বনিয়াদ তৈরি হল যাতে করে প্রথম আগুনটা তুষার গলিয়ে ফেলে সেই জলে আপনিই ডুবে না যায়। পকেট থেকে এক টুকরো বার্চের ছাল বার করে তাতে দেশলাইয়ের কাঠি ছুঁইয়ে সে আগুন ধরালো। এতে কাগজের চেয়েও সহজে আগুন ধরে। বনিয়াদের উপরে ছোট আগুনটাকে রেখে সে সেটাকে ঘাসের টুকরো আর সবচেয়ে ছোট শুকনো কাঠিগুলো দিয়ে উস্কে দিতে লাগল।
নিজের বিপদ সম্বন্ধে প্রখরভাবে সচেতন হয়ে সে অতি সাবধানে আর ধীরে ধীরে কাজ করতে লাগল। ক্রমে ক্রমে আগুনের তেজ যতো বাড়তে লাগল, সে ততোই তাতে বড়ে বড়ো ডালপালা দিতে লাগল। বরফের মধ্যে উবু হয়ে বসে বসে সে ঝোপ থেকে কাঠকুটো টেনে বার করে তাদের সরাসরি আগুনের মধ্যে ফেলতে লাগল ৷ সে জানতো যে বিফল হওয়া চলবে না। তাপমাত্রা যখন শূন্যের পঁচাত্তর ডিগ্রি নিচে নেমে যায় তখন কারো পক্ষেই আগুন জ্বালাবার প্রথম চেষ্টা বিফল হলে চলে না--যদি নাকি তার পা ভিজে থাকে। পা শুকনো থাকলে প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলেও সে আধমাইলটাক পথ দৌড়িয়ে রক্তচলাচল ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু শূন্যের পঁচাত্তর ডিগ্রি নিচে ভেজা আর জমে যাবার উপক্রম করছে এমন পায়ের রক্তচলাচল দৌড় দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না। যত জোরেই সে দৌড়াক না কেন, ভিজে পা তার চেয়েও তাড়াতাড়ি জমে যেতে থাকবে।
এ সব কথাই লোকটার জানা ছিল। গত শরতের সময় সালফার ক্রিকের ঘাগী বুড়োটা তাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছিল আর এখন সে তার উপদেশের যাথার্থ্য উপলব্ধি করছিল। এরই মধ্যে তার পায়ের পাতা সাড় হারিয়ে ফেলেছে। আগুন জ্বালাতে গিয়ে তাকে দস্তানা খুলতে হয়েছিল আর তার আঙুলগুলো অতিদ্রুত অসাড় হয়ে গেছে। যতক্ষণ সে ঘণ্টায় চার মাইল বেগে হাঁটছিল ততক্ষণ তার গতিবেগ হৃদযন্ত্রকে চালিয়ে রক্তকে তার দেহের বহির্ভাগে আর সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে চালিত করছিল। কিন্তু যেইমাত্র সে থামল সাথে সাথেই হৃদযন্ত্রের চাপও কমে গেল। মহাশূন্য থেকে নেমে আসা হিম গ্রহের এই অরক্ষিত প্রান্তকে আক্রমণ করছে আর সেই অরক্ষিত প্রান্তে অবস্থান করার ফলে সেই আঘাত পূর্ণশক্তিতে তার উপরে বর্ষিত হচ্ছে। তার দেহের রক্ত এর সামনে থেকে পিছু হটছে। কুকুরটার মতোই রক্তও জীবন্ত, আর ঠিক কুকুরটার মতোই সেও লুকিয়ে গা-ঢাকা দিয়ে এই ভয়াবহ ঠাণ্ডার হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে চাইছে। যতক্ষণ সে ঘণ্টায় চার মাইল বেগে হাঁটছিল ততক্ষণ সে জোর করে সেই অনিচ্ছুক রক্তকে দেহের উপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল ; কিন্তু এখন তা পিছিয়ে গিয়ে দেহের অভ্যন্তরে আত্মগোপন করেছে। দেহের প্রান্তভাগগুলি সকলের আগে তার অনুপস্থিতি অনুভব করছে। তার ভিজে পা আরো তাড়াতাড়ি জমে যাচ্ছে আর তার খোলা আঙুলগুলি আরো তাড়াতাড়ি অসাড় হয়ে যাচ্ছে যদিও তারা এখনো জমে যেতে শুরু করেনি। নাক আর গাল এখনই জমতে শুরু করেছে আর রক্তের অভাবে তার সমস্ত দেহের চামড়া ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।
কিন্তু তবু সে নিরাপদ। পায়ের আঙুল, নাক আর গাল সামান্য বরফের কামড় খাবে মাত্র কারণ আগুনটা এবার সতেজে জ্বলতে শুরু করেছে। তাতে সে আঙুল সমান মোটা ডালপালা ফেলছিল। আর এক মিনিটের মধ্যেই সে তাতে কবজি সমান মোটা ডালপালা দিতে পারবে আর তখন সে তার ভিজে জুতোমোজা খুলে ফেলতে পারবে আর তারপর যতক্ষণ ধরে সেগুলো শুকোবে ততক্ষণ সে তার খালি পা দুখানা আগুনের তাপে গরম রাখবে অবশ্য তুষার দিয়ে তাদের আগে ঘষে নেবার পরে। সে নিরাপদ। সালফার ক্রিকের ঘাগী বুড়োর কথা মনে করে সে মুচকি হাসল। বুড়ো খুব জোর দিয়ে বলেছিল যে ক্লন্ডাইক অঞ্চলে তাপমাত্রা শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রির বেশি নিচে নেমে গেলে কারো একা একা পথ চলা উচিত নয়। তা সে তো সেখানেই রয়েছে ; তার দুর্ঘটনাও ঘটেছে; সে তো একাই ; আর সে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষমও হয়েছে। এই সব বুড়োদের মধ্যে কেউ কেউ একটু বেশি মেয়েলি পুতুপুতু করে, সে ভাবলো। লোকে যদি কেবল একটু মাথা ঠাণ্ডা রাখে তাহলেই সব কিছু ঠিকঠাক থাকে। পুরুষ নামের যোগ্য যে কোনো লোকই একা একা পথ চলতে পারে। কিন্তু যতো তাড়াতাড়ি তার গালদুটি আর নাক জমে যাচ্ছিল তাও এক বিস্ময়কর ব্যাপার। তার আঙুল যে এতো তাড়াতাড়ি নিষ্প্রাণ হয়ে যেতে পারে সে কথা সে ভাবতেও পারে নি। তারা বাস্তবিকই নিষ্প্রাণ কারণ সে আঙুল জড়ো করে একটা ডাল প্রায় ধরতেই পারছিল না আর তাদের যেন তার দেহবহির্ভূত বলে মনে হচ্ছিল। একটা ডাল ছোঁয়ার পরে তাকে চেয়ে দেখতে হচ্ছিল যে সেটাকে সত্যিই ধরতে পেরেছে কি না। তার আঙুলের ডগার সাথে তার যোগসূত্র নিতান্তই ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
কিন্তু এ সব কিছুই মারাত্মক ব্যাপার নয়। ঐ তো সামনে আগুন ফট ফট শব্দ তুলে প্রতিটি নৃত্যশীলা শিখার মধ্য দিয়ে প্রাণের আশ্বাস দিচ্ছে। সে মোকাসিনের ফিতে খুলতে শুরু করল। তারা বরফে ঢেকে গেছে ; মোটা জার্মান মোজাগুলো হাঁটুর প্রায় আধাআধি পর্যন্ত যেন লোহার তৈরি খোলসের মতো হয়ে সেঁটে রয়েছে ; আর মোকাসিনের ফিতেগুলো যেন অগ্নিকাণ্ডের ফলে বেঁকেচুরে যাওয়া লোহার ডাণ্ডার মতো জড়িয়ে গেরো পাকিয়ে আছে। এক লহমার জন্য সে তার অবশ আঙুলগুলো দিয়ে টানাটানি করল আর তার পরেই সে প্রয়াসের নিষ্ফলতা বুঝে খাপ থেকে ছুরিখানা বার করল।
কিন্তু ফিতেগুলো কাটতে পারার আগেই ঘটনাটা ঘটল। সেটাকে তার নিজেরই দোষ অথবা ভুলও বলা যেতে পারে। স্প্রুস গাছটার ঠিক নিচেই আগুনটা জ্বালানো তার সঙ্গত হয়নি। সেটাকে ফাঁকা জায়গায় জ্বালানো উচিত ছিল। কিন্তু কাঠকুটোগুলোকে ঝোপ থেকে টেনে বার করে সরাসরি আগুনে ফেলা সহজতর মনে হয়েছিল। এখন যে গাছটার নিচে কাজটা সে করছিল সেটা তার ডালপালার উপরে একবোঝা তুষার বহন করছিল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো হাওয়া বয়নি তাই প্রতিটি ডালই তুষারের ভারে একেবারে বোঝাই হয়ে ছিল। প্রতিবার ডাল টেনে বার করবার সময় সে গাছটাতে একটা ক্ষীণ স্পন্দনের সৃষ্টি করেছিল—তার কাছে সে স্পন্দন অনুভব করা সম্ভব না হলেও দুর্ঘটনা ডেকে আনার পক্ষে সেটাই যথেষ্ট ছিল। গাছের অনেক উঁচুতে একটা ডাল থেকে তার তুষারের বোঝা খসে পড়ল। সেটা আবার নিচের ডালগুলোর উপরে পড়ে তাদের তুষারের ভারও খসিয়ে দিল। এই রকম চলতে চলতে সেটা সারা গাছটাতে ছড়িয়ে পড়ল। একটা তুষারের ধ্বসের মতো বাড়তে বাড়তে সেটা আসন্ন বিপদের কোনো সঙ্কেত না দিয়েই লোকটা আর তার অগ্নিকুণ্ডের উপর গিয়ে পড়ল আর আগুনটা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল! যেখানে সেটা জ্বলছিল সেখানে এখন কেবল এক বিশৃঙ্খল তুষারের নতুন আস্তরণের সৃষ্টি হল।
লোকটা বিহ্বল হয়ে পড়ল। ঠিক যেন সে এইমাত্র আপন মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শুনেছে। মুহূর্তকালের জন্য সে বসে বসে যেখানে আগুনটা জ্বলছিল সেদিকে অপলকদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার পর সে অত্যন্ত শান্ত হয়ে গেল। সালফার ক্রিকের ঘাগী বুড়োটা হয়তো ঠিক কথাই বলেছিল। তার সাথে একজন চলনদার থাকলেই তার আর কোনো বিপদই হত না। সেই চলনদারই আগুনটা জ্বালাতে পারতো। হুঁ, এখন তার উপরেই আগুনটা নতুন করে জ্বালাবার দায় এবং এই দ্বিতীয়বার কোনোরকম ভুল হওয়া চলবে না। কৃতকার্য হলেও সম্ভবত সে পায়ের কয়েকটা আঙুল হারাবে। তার পায়ের পাতা এখনই খারাপ ভাবে জমে গেছে আর দ্বিতীয় আগুনটা জ্বালাতে আরো বেশ খানিক
সময় লাগবে।
এই সব ভাবনা তার হচ্ছিল কিন্তু সে বসে বসে সে সব কথা চিন্তা করছিল না। তার মনের মধ্য দিয়ে যতক্ষণ এ সব কথা খেলে যাচ্ছিল সমস্তক্ষণই সে কাজ করে যাচ্ছিল। এবার খোলা জায়গায় সে নতুন করে অগ্নিকুণ্ডের একটা বনিয়াদ তৈরি করল যাতে বিশ্বাসঘাতক কোনো গাছই যেন সেটাকে ফের নিশ্চিহ্ন করে দিতে না পারে। তার পর সে জলে ভেসে আসা জঞ্জালের রাশি থেকে শুকনো ঘাস আর ছোট কাঠিকুটি সংগ্রহ করতে লাগল । সে আঙুলগুলোকে একত্র জড়ো করে তাদের টেনে বার করতে পারছিল না বটে তবুও হাতের পাতায় করে সেগুলো জোগাড় করছিল। এভাবে অনেক অবাঞ্ছিত পচা কাঠি আর কাঁচা ঘাসও তার জুটছিল কিন্তু এর বেশি কিছু করা তার সাধ্য ছিল না। সে সুষ্ঠুভাবে কাজ করে চলল এমনকী আগুনের তেজ বাড়লে তখন ব্যবহারের জন্য কিছু অপেক্ষাকৃত বড় ডালও জমা করল। আর সমস্ত সময়টা কুকুরটা বসে বসে চোখে প্রত্যাশার দৃষ্টি নিয়ে তাকে নিরীক্ষণ করতে লাগল কারণ সে লোকটাকে অগ্নিদাতা বলে জেনেছিল আর সেই আগুন আসতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আয়োজন সমাপ্ত হলে লোকটা দ্বিতীয় এক টুকরো বার্চের ছালের সন্ধানে পকেটে হাত পুরলো। সে জানতো যে টুকরোটা সেখানেই আছে আর যদিও সে আঙুলে তার স্পর্শ পাচ্ছিল না তবুও পকেট হাতড়ানোর সময় তার খস খস আওয়াজ শুনছিল। প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও সে কিছুতেই সেটাকে ধরতে পারছিল না। আর সমস্ত সময়টাই তার মনে এই বোধ সজাগ ছিল যে প্রতি মুহূর্তেই তার পা জমে যাচ্ছে। সেই চিন্তা তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছিল আর সে তার সাথে লড়াই করে মাথা ঠাণ্ডা রাখছিল। দস্তানাদুটোকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে সে হাতে পরে নিল আর হাত দুখানা দোলাতে দোলাতে সর্বশক্তি দিয়ে দেহের পার্শ্বদেশে চাপড় মারতে লাগল। কখনো বসে কখনো দাঁড়িয়ে সে এই রকম করে চলল আর সমস্ত সময়টা কুকুরটা তুষারের মধ্যে বসে বসে তার নেকড়ের মতো ঝাঁকড়া লোমওয়ালা লেজের উষ্ণতা দিয়ে সামনের পা দু'খানা ঢেকে নিয়ে আর নেকড়ের মতো তীক্ষ্ণ কানদুটো সামনের দিকে উঁচিয়ে লোকটাকে তীব্র দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। আর লোকটাও তার হাত দুখানা চাপড়াতে চাপড়াতে প্রকৃতিদত্ত আবরণে উষ্ণ এবং সুরক্ষিত জানোয়ারটার দিকে চেয়ে এক প্রচণ্ড ঈর্ষার দংশন অনুভব
করল।
একটু পরে সে তার চাপড়ানি-খাওয়া আঙুলগুলোতে সাড় ফিরে আসার প্রথম ক্ষীণ অনুভূতি টের পেল। সামান্য চিনচিনে ভাবটা বাড়তে বাড়তে এক দুঃসহ কামড়ানির যন্ত্রণায় পরিণত হল কিন্তু লোকটা তাকে পরমসমাদরে স্বাগত জানাল। ডান হাত থেকে দস্তানাটা খুলে সে বার্চের ছালটা টেনে বার করল। খোলা আঙুলগুলো ফের অসাড় হয়ে যাচ্ছিল। তারপর সে গন্ধকের দেশলাই কাঠির গোছাটা বার করল। কিন্তু সেই ভয়াবহ ঠাণ্ডা এরই মধ্যে তার আঙুল থেকে প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে দিয়েছে। গোছা থেকে একটা কাঠিকে আলাদা করতে গিয়ে পুরো গোছাটাই তুষারের মধ্যে পড়ে গেল। সে তুষার থেকে সেটাকে তুলতে চেষ্টা করল কিন্তু পেরে উঠল না। নিষ্প্রাণ আঙুলগুলোর পক্ষে ছোঁয়া অথবা ধরার কোনোটাই সম্ভব হচ্ছিল না। সে খুব সতর্ক হয়ে গেল। নিজের জমে যাওয়া পা, নাক, আর গালের চিন্তা মন থেকে দূরীভূত করে সে তার সমস্ত সত্তাকে দেশলাই কাঠিগুলোর উপরে কেন্দ্রীভূত করল। স্পর্শশক্তির জায়গায় দৃষ্টিশক্তি ব্যবহার করে সে যখন দেখল যে তার আঙুলগুলো গোছাটার দুপাশে পৌঁছেছে তখন সে তাদের একত্রিত করল—অথবা বলা চলে যে তাদের একত্র করবার জন্য তার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আদেশ করল, কারণ তাদের সাথে তার যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল আর তারা সে আদেশ মান্য করল না। ডান হাতে দস্তানাটা পরে নিয়ে সে সেটাকে হাঁটুর উপর বিপুল বেগে চাপড়াতে লাগল। তার পর দস্তানা পরা দুহাত দিয়ে সে বেশ খানিকটা তুষার সমেত গোছাটাকে খাবলে তুলে নিয়ে কোলের উপরে ফেললো। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার অবস্থার কোনো উন্নতিই হল না ।
খানিক কসরতের পর সে কোনোমতে গোছাটাকে তার দস্তানা পরা দুই হাতের চেটোর মধ্যে চেপে ধরতে সক্ষম হল। সেই ভাবেই সেটাকে সে মুখের কাছে নিয়ে এলো। হঠাৎ প্রচণ্ড এক চেষ্টা করে মুখ হাঁ করতে উপরের বরফটা ফেটে টুকরো হয়ে গেল। নিচের চোয়াল ভিতরের দিকে টেনে এনে আর উপরের ঠোঁট বাঁকিয়ে তুলে গোছা থেকে একটা কাঠিকে আলাদা করবার চেষ্টায় দাঁতের উপরের পাটি দিয়ে সেটাকে সে আঁচড়াতে লাগল । একটাকে মুক্ত করে কোলের উপরে ফেলতে সে সক্ষম হল। এতেও তার অবস্থার কোনো উন্নতি হল না। তার পক্ষে সেটাকে তোলা সম্ভব নয়। তখন সে আর এক উপায় বার করল। দাঁত দিয়ে সেটাকে কামড়ে ধরে সে পায়ের উপর ঘষতে লাগল । বিশ বার ঘষবার পর সে তাতে আগুন ধরাতে সক্ষম হল। জ্বলন্ত অবস্থাতেই সেটাকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রেখে সে বার্চের ছালটার কাছে ধরল। কিন্তু জ্বলন্ত গন্ধকের ধোঁয়া নাক দিয়ে তার ফুসফুসে ঢুকতে ধমকে ধমকে অবাধ্য কাশির উদ্রেক হল। দেশলাই কাঠিটা তুষারের উপরে পড়ে গিয়ে নিভে গেল।
এর পরের সংযত নিরাশার মুহূর্তে তার মনে হল যে সালফার ক্রিকের ঘাগী বুড়োটা ঠিক কথাই বলেছিল ; শূন্যের পঞ্চাশ ডিগ্রি নিচে যে কোনো লোকেরই একজন সঙ্গী নিয়ে পথ চলা উচিত। সে হাত চাপড়াতে লাগল কিন্তু তাতে কোনো সাড়ই ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হল না। সহসা সে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে দুহাতের দস্তানাই টেনে খুলে তাদের অনাবৃত করে ফেলল। পুরো গোছাটাকেই সে তার দুহাতের কব্জির মধ্যে চেপে ধরল। তার বাহুর মাংসপেশী জমে না থাকায় সে হাত দুটোকে দেশলাইগুলোর উপরে শক্ত করে চেপে ধরতে পারছিল। তারপর সে পুরো গোছাটাকেই পায়ের উপর ঘষতে লাগল। সত্তরটা গন্ধকের দেশলাই কাঠিতে একসাথে আগুন ধরে গেল! তাদের নিভিয়ে দেবার মতো কোনো হাওয়া ছিল না। দম আটকানো ধোঁয়া থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য মাথাটা একপাশে ফিরিয়ে সে জ্বলন্ত গোছাটাকে বার্চের ছালটার নিচে ধরল। ধরে থাকতে থাকতে এক অনুভূতি সম্বন্ধে সে সচেতন হল। তার হাতখানা পুড়ে যাচ্ছে। তার গন্ধ সে পাচ্ছিল। দেহের গভীর অভ্যন্তরে সে তা অনুভব করছিল। সেই অনুভূতি বাড়তে বাড়তে এক সুতীব্র যন্ত্রণায় পরিণত হল। তা সত্ত্বেও সমস্ত যন্ত্রণা সয়ে সে দেশলাইয়ের আগুনটাকে বার্চের ছালটার কাছে কোনোমতে ধরে রইল কারণ তার নিজের জ্বলন্ত হাতই অগ্নিশিখার উত্তাপ শোষণ করে নিয়ে সেটাকে জ্বালাবার পথে বিঘ্নের সৃষ্টি করছিল।
অবশেষে আর সইতে না পেরে সে এক ঝাঁকি দিয়ে দু'হাত আলাদা করে ফেলল। জ্বলন্ত কাঠিগুলো ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ তুলে তুষারের উপর পড়ে গেল কিন্তু বার্চের ছালটাতে আগুন ধরেছে। সে শুকনো ঘাস আর সবচেয়ে ছোট কাঠিগুলো আগুনে দিতে লাগল । দুহাতের তেলোর মধ্যে চেপে ধরে সেগুলোকে তার তুলতে হচ্ছিল বলে সে বাছাবাছি করতে পারছিল না। ছোটো ছোটো পচা কাঠের টুকরো আর কাঁচা মস্ তাদের সাথে লেগে থাকছিল আর সে দাঁত দিয়ে কামড়ে কামড়ে তাদের যথাসাধ্য সাফ করছিল। সে সন্তর্পণে আনাড়িভাবে আগুনটাকে রক্ষা করতে লাগল। সেটাই তার প্রাণ আর সেটাকে নিভে যেতে দেওয়া চলবে না। দেহের উপরিভাগ থেকে রক্ত সরে যাওয়ায় তার কাঁপুনি ধরছিল আর তার ভাবভঙ্গিও আরো বেশি আনাড়ি হয়ে আসছিল। কাঁচা মসের একটা বড় দলা একদম আগুনটার উপরে পড়ে গেল। সে আঙুল দিয়ে সেটাকে খুঁচিয়ে বার করতে চেষ্টা করল কিন্তু কাঁপুনির ধাক্কায় বেশিদূর খুঁচিয়ে ফেলে সে অগ্নিকুণ্ডের কেন্দ্রটাকে বিশৃঙ্খল করে ফেলল আর জ্বলন্ত ঘাস আর কাঠিগুলো আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। সে তাদের আবার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে একত্র করবার চেষ্টা করতে লাগল কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও সে কাঁপুনির ধাক্কা সামলাতে পারল না আর কুটোগুলো একেবারে এলোমেলো হয়ে চারধারে ছিটিয়ে গেল। প্রত্যেকটি কাঠিই একটু করে ধোঁয়া ছেড়েই নিভে গেল। অগ্নিদাতা বিফল হয়েছে। নিস্পৃহভাবে চারদিকে চাইতে চাইতে তার নজরে পড়ল যে কুকুরটা অগ্নিকুণ্ডের ধ্বংসাবশেষের অন্যধারে তুষারের মধ্যে গুঁড়ি মেরে বসে বসে অশান্তভাবে সামনের পা দুটোকে পালা করে যৎসামান্য তুলে তুলে আকাঙ্ক্ষার সাথে আগে পিছে দুলছে।
কুকুরটাকে দেখে তার মাথার মধ্যে একটা উদ্দাম চিন্তার উদয় হল। একটা লোকের কাহিনি তার মনে পড়লো যে নাকি তুষারঝড়ের মধ্যে পড়ে একটা বলদ মেরে তার মৃতদেহের মধ্যে ঢুকে প্রাণ বাঁচিয়েছিল। সেও কুকুরটাকে মেরে তার উষ্ণ দেহের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে রাখবে যতক্ষণ না তাদের অসাড় ভাবটা কেটে যায়। তারপর সে আরেকটা আগুন জ্বালাবে। সে কুকুরটাকে কাছে আসবার জন্য ডাক দিতে লাগল ; কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে একটা অদ্ভুত ভয়ের ভাব ছিল আর জন্তুটা কোনোদিন তাকে এমন সুরে কথা বলতে শোনেনি বলে সেও ভয় পেয়ে গেল। কিছু একটা ব্যাপার অবশ্যই ঘটেছে আর তার সন্দিগ্ধ প্রকৃতি বিপদের আভাস পেল–বিপদটা যে ঠিক কী তা সে জানে না, কিন্তু তার মস্তিষ্কের মধ্যে কোনোখানে, কোনোভাবে লোকটার প্রতি একটা শঙ্কার উদয় হল। লোকটার কণ্ঠস্বর শুনে সে কানের পাতা ঝুলিয়ে দিতে লাগল আর তার অশান্ত ভঙ্গিতে গুঁড়ি মেরে বসে বসে দুলুনি আর সামনের পাদুটোকে পালা করে তোলা আরো প্রকট হয়ে উঠল ; কিন্তু লোকটার কাছে ঘেঁষতে সে নারাজ। লোকটা চার হাত পায়ে ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে কুকুরটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। সেই অপরিচিত ভঙ্গিতে আবার সন্দেহের উদ্রেক হওয়ায় জন্তুটা গুটি গুটি পাশের দিকে সরে যেতে লাগল ।
লোকটা তুষারের মধ্যে একমুহূর্ত উঠে বসে শান্ত হবার চেষ্টা করল। তার পর দাঁত দিয়ে টেনে দস্তানা পরে নিয়ে সে পায়ের উপর উঠে দাঁড়াল। পায়ের মধ্যে বোধশক্তির অভাবে পৃথিবীর সাথে তার যোগাযোগ হারিয়ে গিয়েছিল তাই তাকে আগে নিচের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই আশ্বস্ত করতে হল যে সে সত্যি সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে। তার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেই কুকুরটার মন থেকে সন্দেহের জাল দূর হতে শুরু করল; আর সে যখন কর্তৃত্বব্যঞ্জক কণ্ঠস্বরে কশাঘাতের ভাব ফুটিয়ে কথা বলল, তখন কুকুরটা তার চিরাভ্যস্ত আনুগত্যের সাথে তার কাছে এগিয়ে এল। সে নাগালের মধ্যে আসতেই লোকটা তার আত্মসংযম হারিয়ে ফেলল। তার হাতদুটো কুকুরটার দিকে বিদ্যুদ্বেগে এগিয়ে গেল আর যখন সে আবিষ্কার করল যে তার হাতের আর মুঠো করে ধরবার ক্ষমতা নেই আর তার আঙুলগুলোর মধ্যেও ভাঁজ অথবা স্পর্শ করার ক্ষমতা নেই তখন সে প্রকৃতই বিস্মিত হল। ক্ষণকালের জন্য সে ভুলেই গিয়েছিল যে তারা জমে গেছে আর ক্রমাগত আরো বেশি করে জমে যাচ্ছে। এ সমস্তই অতি দ্রুত ঘটে গেল আর জন্তুটা সরে যেতে পারবার আগেই সে দুহাত দিয়ে তার দেহটাকে জড়িয়ে ধরল। তুষারের মধ্যে বসে পড়ে সে এইভাবে কুকুরটাকে ধরে রইল আর সেটা দাঁত খিঁচিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক আর কেউ কেঁউ শব্দ করে ছটফট করতে লাগল।
কিন্তু তার দেহটাকে বাহুর আবেষ্টনীর মধ্যে ধরে রেখে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার তার সাধ্য ছিল না। সে হৃদয়ঙ্গম করল যে কুকুরটাকে সে মারতে পারবে না। তার কোনো উপায়ই নেই। তার অশক্ত হাত দিয়ে খাপে ভরা ছুরিটাকে টেনে বার করা অথবা ধরা কিম্বা জন্তুটার গলা টিপে ধরা এসব কিছুই সম্ভব নয়। সে সেটাকে ছেড়ে দিতেই সেটা পিছনের দুপায়ের মধ্যে লেজ গুটিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করতে করতে উন্মত্তের মতো দৌড় দিল। চল্লিশ ফুট দূরে থেমে সেটা কান খাড়া করে তাকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করতে লাগল।
লোকটা তার হাতদুটোর অবস্থান নির্ণয় করার জন্য নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল তারা তার বাহুর প্রান্তে ঝুলছে। কাউকে যে চোখ দিয়ে তার আপন হাতকে খুঁজে বার করতে হতে পারে সে কথাটাই তার কাছে বিস্ময়কর ঠেকল। সে তার বাহুদুটিকে আগে পিছে সবেগে দুলিয়ে দস্তানাপরা হাত দিয়ে দেহের পাশে সজোরে আঘাত করতে লাগল। পাঁচ মিনিট ধরে ভীষণ জোরে এইরকম করবার পর তার হৃদযন্ত্র দেহের উপরিভাগে যথেষ্ট রক্ত চালনা করাতে তার কাঁপুনি থামল। কিন্তু তার হাতদুটোতে কোনো সাড়ই ফিরে এলো না। তার একটা ধারণা হতে লাগল তারা যেন তার বাহুর প্রান্তে জড়পদার্থের মতো ঝুলছে কিন্তু যখন সে সেই ধারণাটাকে জোর করে দাবিয়ে দিতে চাইল তখন সে আর তার উদ্দেশই পেলো না।
কেমন একটা অস্পষ্ট ও ভারাক্রান্ত মৃত্যুভয় তার সামনে এসে দাঁড়ালো। যখন সে অনুভব করল যে এখন আর শুধু আঙুল অথবা হাত-পা হারানোর ভয় নয়, ব্যাপারটা এখন জীবনমৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আর নিয়তি তার বিপক্ষে তখন সেই ভয়টা দ্রুতগতিতে মর্মভেদী হয়ে দাঁড়ালো। ভয় পেয়ে বুদ্ধি হারিয়ে সে পুরোনো অস্পষ্ট পথরেখা ধরে খালের উজানের দিকে দৌড় দিল । কুকুরটাও তার সঙ্গ ধরে পিছু পিছু ছুটল । তার এমন ভয় হল যা এর আগে জীবনে কোনোদিন তার হয়নি আর সে অন্ধের মতো লক্ষ্যহীনভাবে দৌড়তে লাগল। তুষার ভেদ করে হুড়মুড় করে চলতে চলতে ধীরে ধীরে আবার অনেক কিছু তার চোখে পড়তে লাগল—খালের ধার, কাটা গাছের গুঁড়ির স্তূপ, পাতাঝরা অ্যাসপেনের সারি আর আকাশ। দৌড়তে দৌড়তে সে কিছুটা ভালো বোধ করতে লাগল। তার কাঁপুনি থেমে গেছে। হয়তো বা সে যদি দৌড়েই চলে তা হলে তার পাদুটো আর জমে থাকবে না ; আর যাই হোক, সে যদি যথেষ্ট দূর দৌড়তে পারে তা হলে সে আস্তানায় তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে যাবে। সে নির্ঘাৎ হাতপায়ের কয়েকটা আঙুল আর মুখেরও কিয়দংশও হারাবে কিন্তু সেখানে পৌঁছবার পর তার সঙ্গীরা তার দেখাশুনা করবে আর তার দেহের অবশিষ্ট অংশকে বাঁচাবে। একই সঙ্গে তার মনে আরেকটা চিন্তার উদয় হল যে সে তার সঙ্গীদের আস্তানার কাছে কিছুতেই পৌঁছতে পারবে না ; জায়গাটা অনেক মাইল দূরে ; তার দেহ বড্ড বেশি জমে গেছে আর একটু বাদেই সে মরে গিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। এই চিন্তাটাকে সে তার মনের পিছনে ঠেলে দিয়ে সেটাকে আমল দিতে অস্বীকার করল। কখনো কখনো সেটা বাধা ঠেলে সামনে এসে তার মনোযোগ দাবি করতে লাগল কিন্তু সে সেটাকে পিছনে ঠেলে দিয়ে অন্য বিষয়ে মনোনিবেশ করতে চেষ্টা করতে লাগল ।
তার পা এমনভাবে জমে গেছে যে তারা যখন তার দেহের সমস্ত ভার দিয়ে মাটিতে আঘাত করছিল তখনও সে তাদের অনুভব করতে পারছিল না তাই তাদের উপরে ভর করেই সে যে আদৌ ছুটতে পারছিল এটাই তার কাছে এক বিস্ময়কর ব্যাপার বলে মনে হল। সে যেন পৃথিবীর বন্ধনমুক্ত হয়ে জমির উপর দিয়ে ভেসে চলছিল। সে কোথাও একবার পক্ষধারী দেবদূত মার্কারির প্রতিকৃতি দেখেছিল আর সে ভাবছিল তার যেমন জমির উপর দিয়ে ভেসে যাবার অনুভূতি হচ্ছে, মার্কারিরও সে রকম হয়েছিল কি না।
তার আস্তানার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে যাওয়া অবধি দৌড়ে চলার পরিকল্পনার মধ্যে একটা বিরাট গলদ ছিল : তার অতখানি দম ছিল না। কয়েকবার হোঁচট খেয়ে অবশেষে সে টলতে টলতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। উঠতে গিয়ে সে উঠতে পারলো না। সে স্থির করল যে তাকে একটু বসে জিরিয়ে নিতে হবে আর তারপর সে কেবল হেঁটেই চলতে থাকবে। বসে থাকতে থাকতে যখন তার দম ফিরে এলো তখন সে খেয়াল করল যে সে বেশ গরম আর আরাম বোধ করছে। সে আর কাঁপছে না আর এমন কী তার একথাও মনে হল যে তার গায়ে আর বুকে যেন একটা উষ্ণ তাপের আভাস এসেছে। অথচ তার নাক আর গাল ছুঁয়ে সে কোনো স্পর্শই পাচ্ছিল না। দৌড় দিয়ে তাদের জমে যাবার প্রতিকার হবে না। তাতে তার হাত-পায়ের অবস্থারও কোনো উন্নতি হবে না। তার পরে তার মনে হল তার দেহের জমে যাওয়া অংশগুলো যেন বেড়েই চলেছে। সে চিন্তাটাকে জোর করে দাবিয়ে দিয়ে অগ্রাহ্য করে অন্য কিছু ভাবতে চেষ্টা করল ; এতে তাকে কীরকম আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছিল সে কথা সে টের পাচ্ছিল আর সেই আতঙ্ককেই তার ভয়। কিন্তু সেই চিন্তাটা অবাধ্যের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে তার মনের মধ্যে সর্বাঙ্গ জমে যাবার এক ছবির সৃষ্টি করছিল। এটা তার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে সে আরেকবার পথ ধরে উন্মত্তের মতো দৌড় দিল।
আর সমস্ত সময়টা কুকুরটা তার সাথে সাথে পিছু পিছু ছুটছিল। সে যখন দ্বিতীয়বার পড়ে গেল তখন সেটা সামনের পায়ের উপর লেজ ঢাকা দিয়ে তার মুখোমুখি হয়ে এক প্রগাঢ় ব্যগ্রতার সাথে বসে রইল। জন্তুটার নিরাপদ আয়েসের ভাব দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে সে গালাগালি দিয়ে চলল আর সেটা তাকে শান্ত করার অভিপ্রায়ে নিজের কানদুটো চেপটে দিল। এইবার আগের চেয়ে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি লোকটার কাঁপুনি ধরল। হিমের সাথে যুদ্ধে তার পরাজয় ঘটছিল। চারদিক থেকে সেটা তার দেহে অনুপ্রবেশ করছিল। সেই চিন্তা তাকে তাড়িত করে নিয়ে চলল কিন্তু সে একশো ফুটের বেশি আর দৌড়াতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ল। সেটাই হল তার আতঙ্কের সর্বশেষ প্রকাশ। দম আর আত্মসংযম ফিরে পাবার পর সে উঠে বসে আত্মমর্যাদার সাথে মৃত্যুর মুখোমুখি হবার চিন্তা মনে মনে পোষণ করল। অবশ্য চিন্তাটা ঠিক এই ভাবেই তার মনে আসেনি। তার চিন্তাপদ্ধতি বলছিল যে সে একটা মাথাকাটা মুরগির মতো অনর্থক ছুটোছুটি করে নিজেকে সম্পূর্ণ বুদ্ধিহীন প্রতিপন্ন করছে আর এটাই ছিল তার নিজস্ব ধরনে অবস্থাটার তুলনা। জমে গিয়ে মরাই যদি তার ভাগ্যে লেখা থাকে তা হলে সেটাকে সহজভাবে নেওয়াই উচিত। এই নতুন চিন্তাপ্রসূত মানসিক শান্তির সাথে সাথে তার প্রথম ঝিমুনির ভাব ধরতে লাগল। ঘুমোতে ঘুমোতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বার পন্থাটা ভালোই। এ যেন এক বেদনা অপসারক ওষুধ নেওয়া। জমে মরে যাওয়াকে লোকে যতোটা খারাপ বলে মনে করে ততোটা খারাপ নয়। মৃত্যুর আরো অনেক রকম পন্থা আছে যা এর চেয়ে বেশি খারাপ।
সে কল্পনা করতে লাগল পরদিন তার সঙ্গীরা কীভাবে তার মৃতদেহ আবিষ্কার করবে। হঠাৎ সে দেখল সে নিজেও তাদের সাথে সাথে তার নিজেরই খোঁজে পথ ধরে আসছে। এবং তাদের সাথে সাথেই পথের একটা বাঁক ঘুরে সে তুষারের মধ্যে পড়ে থাকা অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করল। সে আর তার নিজের নয় কারণ তখনো সে দেহাতীত রূপে সঙ্গীদের সাথে দাঁড়িয়ে তুষারের মধ্যে আপনাকে দেখছে। ঠাণ্ডাটা সত্যিই ভীষণ, এই কথাই সে ভাবলো। আমেরিকায় ফিরে গিয়ে সে সবাইকে বলতে পারবে সত্যিকারের ঠাণ্ডা কাকে বলে। এ থেকে সরে গিয়ে তার মনশ্চক্ষু সালফার ক্রিকের ঘাগী বুড়োটাকে দেখতে পেল। সে তাকে বেশ স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিল, গরমে আরাম করে পাইপ টানছে।
“তুমি ঠিকই বলেছিলে, বুড়ো ঘোড়া; তুমি হক কথাই বলেছিলে, ” লোকটা সালফার ক্রিকের ঘাগী বুড়োটার উদ্দেশে বিড়বিড় করে বলল।
তারপর লোকটা আস্তে আস্তে এমন ভাবে ঝিমিয়ে পড়ল যেটাকে তার জীবনের সবচেয়ে সন্তোষজনক ও আরামদায়ক ঘুম বলে মনে হল। কুকুরটা তার মুখোমুখি বসে অপেক্ষা করতে লাগল। এক সুদীর্ঘ, মন্থর গোধূলির মধ্যে দিয়ে সেই হ্রস্ব দিনের অবসান হল। আগুন জ্বালাবার উদ্যোগের কোনো চিহ্নই দেখা গেল না আর তা ছাড়া কুকুরটা তার অভিজ্ঞতায় কোনোদিন কোনো মানুষকে অমন করে বরফের মধ্যে বসে থেকেও আগুন না জ্বালতে দেখেনি। গোধূলি গড়িয়ে চলার সাথে সাথে আগুনের জন্য ব্যগ্র হয়ে সে সামনের পা দুটো অনেকখানি উঠিয়ে আর নাচিয়ে মৃদুস্বরে করুণ আওয়াজ করল আর লোকটার বকুনি খাবার আশঙ্কায় কান দুটো লেপটে নিল। কিন্তু লোকটা নিঃশব্দ হয়েই রইল। তার পর কুকুরটা একটু জোরে আর্তনাদ করল। আরো খানিক বাদে গুঁড়ি মেরে লোকটার কাছাকাছি গিয়ে সে মৃত্যুর আঘ্রাণ পেল। তাতে জন্তুটার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলো আর সে পিছু হটে গেল। হিমশীতল আকাশের জ্বলজ্বলে নৃত্যশীল তারাদের দিকে চেয়ে ডাক ছাড়তে ছাড়তে সে আরো খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পরিচিত আস্তানা, যেখানে আরো খাদ্য আর অগ্নিদাতারা সব আছে, তার উদ্দেশে পথ ধরে দুলকি চালে রওনা হল।


0 মন্তব্যসমূহ