কাহো গল্পটি নিয়ে হারুকি মুরাকামির সঙ্গে ডেবোরা ট্রাইজ়ম্যানের আলাপচারিতা : জুলাই ১, ২০২৪

অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

আপনার লেখা “কাহো” গল্পে, একটি লোক কাহো নামের একটি মেয়ের সঙ্গে ব্লাইন্ড ডেটে যায়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে একটি অপমানকর বাক্যে, সেটিই গল্পটির প্রথম লাইন - “জীবনে নানা ধরণের মেয়ের সঙ্গেই আমি ডেটে গিয়েছি, তবে বলতেই হবে তোমার মত এমন কুৎসিত কাউকে আমি দেখিনি।” গল্পের এই খণ্ডমুহূর্তটিই কি প্রথমেই আপনার মাথায় এসেছিল? এই উপাদানের ওপর মির্ভর করেই কি গল্পটা সাজিয়েছিলেন?

একেবারে ঠিক ধরেছেন। ওই দৃশ্যটাই আমার প্রথমে মনে এসেছিল। একটি লোক, দেখে বেশ হাসিখুশিই লাগে, একটি মেয়ের সঙ্গে ডেটে গিয়েছে, সুখকর পরিবেশে সম্পন্ন একটি রেস্তোরাঁয়, আর যে মুহূর্তে ডেজ়ার্ট খাওয়া শেষ হল, ইচ্ছে করেই মেয়েটিকে অপমান করল। কেন এমন করল? কী উদ্দেশ্য তার? আর মেয়েটিই বা  কীভাবে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল? সেটাই আমি জানতে চেয়েছিলাম। এখান থেকেই গল্পটির শুরু।

গল্পটি লিখেছিলাম সর্বসমক্ষে পাঠ করবার জন্য, প্রথম অনুচ্ছেদ থেকেই শ্রোতাদের মনযোগ আকর্ষণ করার তাগিদ ছিল। আমার স্থির বিশ্বাস, ওঁরা যা শুনতে পেলেন, তাতে ওঁরা বিস্মিতই হলেন।

গল্পের সেই লোকটি –  যার নাম জানা গেল সাহারা – যখন এই সব অপমানকর কথাগুলো বলছিল, তখন ও হাসছিল, “অমায়িক, বন্ধুসুলভ হাসি।” একটি লোকের মুখের হাবভাব এবং শরীরী ভাষা যখন তার বক্তব্যের সঙ্গে বেমানান হয়, তখন সেটি কেন এত গোলমেলে লাগে?

সত্যি বলতে কী, সাহারার চিন্তাভাবনা আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি। ও খুবই জটিল চরিত্রের ব্যক্তি, আর ওর কথা এবং আচরণের মধ্যে একটি সুক্ষ্ম হিসেবের ব্যাপার আছে বলে মনে হয়। হাসিখুশি, মৃদুভাষী, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটি অর্থবহ অস্থিরতা কাজ করে। ওর মনের গভীরে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি দিক আছে, পাঠক শুরু থেকেই সেটি অনুভব করতে পারেন। তবে ঠিক কোন ধরণের অসুস্থতা সেটি, ঠিক কী ধরণের অন্ধকার, সেটি কল্পনা করা মোটেই সহজ নয়।  

গল্পের সিংহভাগ ঘিরে, ওকে এইভাবে অপমান করার কারণ নিয়ে কাহোর মনে জল্পনা কল্পনা চলতে থাকে – পাঠকের মনেও তাই। গল্পের শেষের দিকে সাহারা একটি ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করে, যেটিকে পুরোপুরি সন্তোষজনক বলে মনে হয় না (কাহোর কাছে তো নয়ই, পাঠকের কাছেও নয়)। এটি একটি রহস্য হয়েই থেকে যায় কেন?

এই গল্পে আমার উদ্দেশ্য হল, প্রথমত,  আমি পাঠক সকাশে একটি গূঢ় প্রশ্ন পেশ করতে চেয়েছি, তবে সে প্রশ্নের  একটি প্রামাণিক সমাধান এনে হাজির করার কোনও উদ্দেশ্যই আমার ছিল না। পরিবর্তে আমার মনে হয়েছে পাঠকদের নিজেদেরই নিজস্ব প্রতিক্রিয়ার অনুসন্ধান করা উচিত। লেখক হিসেবে, অবশ্যই, আমার নিজস্ব একটি ব্যাখ্যা রয়েছে, কিন্তু সেটিই যে সঠিক ব্যাখ্যা সেরকম ভাববার কারণ নেই।  সেটিকে বড়জোর একটি অনুমান বলা চলতে পারে, তার বেশি কিছু নয়।  

আমার ব্যক্তিগত অনুভূতিটি হল – কাহোর কাছে, সাহারা ভিনগ্রহ থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোনও বিসদৃশ চরিত্র নয়, বরং এক অর্থে, আয়নায় প্রতিবিম্বিত ওর নিজস্ব প্রতিমূর্তিরই একটি প্রতিরূপ।  অনিবার্য ছিল তাই সেই প্রতিরূপের আবির্ভাব ঘটেছে। যদিও, এটি নেহাতই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি।

সাহারা কাহোর ভাবনা পড়ে নিতে পারে, এরকম কিছু একটা মনে হয়; সেই অর্থে, ও পুরোপুরি মানবসুলভ নয় জাতীয় একটি ধারণা মনে হতেই পারে।  একটি জায়গায় ওকে “একটি পিঁপড়েখেকো প্রাণী যে একটি উইয়ের ঢিবিকে চেটে সাফ করে দেয়” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; ও পরে মাকড়শাদের আরশোলা খেয়ে ফেলার প্রসঙ্গ তুলেছে আর “খাদ্য শৃঙ্খলার চাতুর্য আর চমৎকারিত্ব” নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। ও কি আসলে একজন লোলুপ শিকারীচ –  যার বিনাশের কারণ ও নিজেই তার থেকেই নিজের পুষ্টি আহরণ করে?

কাহো যে আতঙ্ক অনুভব করেছে সেটির মূল উৎস ঠিক এখানেই। প্রাণঘাতী লোলুপ এক শিকারীর সম্মুখীন হয়ে পড়ার আতঙ্ক।  আর এটাও কি হতে পারে না যে এটিই হল ওর জীবনের সেই অতল গহ্বর যেটির দিকে ও প্রথমবার দৃষ্টিপাত করল?  

জীবনের অধিকাংশ সময় নিজের চেহারা সম্পর্কে ও অনবহিত অথবা উদাসীন থেকেছে –   বিস্ময়করভাবে নির্লিপ্ত থেকেছে, এমন একটি দুনিয়ায় যেখানে চেহারার কদর তুলনামূলকভাবে অপরিসীম। আত্মাভিমানের অভাব এবং আত্মসমালোচনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা – উভয় দিক থেকেই ও হল ব্যতিক্রমী। এক অর্থে, ও হল সাহারার একজন পূর্ণাঙ্গ যুযুধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সে কি জয়লাভ করবে বলে মনে হয়?  

গল্পের সূত্র ধরে আমরা জানতে পারি যে কাহো এতাবৎকাল একটি সুচেত জীবন যাপন করেছে। অপরিমেয় স্নেহ দ্বারা পরিপূর্ণ জীবন।  কিন্তু হঠাৎই একদিন সেই সুচেত জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকটির মুখোমুখি হতে হল এবং তার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হল।  কে জিতবে সেটা যদিও স্পষ্ট নয়, তবুও আমি আশা করব যেন এর জ্যোতিষ্মান দিকটিই প্রতিভাত হোক।

শেষমেশ, সাহারার সঙ্গে ওর মোকাবিলার ফলে ও নতুন একটি শিশুপাঠ্য বই রচনা করতে অনুপ্রাণিত হল, এবং যেটি অসম্ভব সাফল্যের মুখ দেখল। নিজের ব্যাপারে কিছু শিক্ষালাভ করেছে ও, যেটিকে ও একটি গল্পে রূপান্তরিত করেছে। শেষ পর্যন্ত আপনি কি পাঠকদের কাহোর জীবনের জ্যোতির্ময় মুহূর্তটি দেখাতে চেয়েছেন?

কাহোর জীবন তো সবে শুরু হয়েছে। সাহারা কটাক্ষ করে বলেছে যে ওদের আবার দেখা হবে, কোথাও না কোথাও। কে বলতে পারে সাহারা (বা সাহারার দ্বিতীয় সংস্করণ) আশেপাশের কোনও জায়গা থেকে চুপিসারে ওর ওপর হয়ত নজর রেখে চলেছে?

২০১৪ সালে আপনি একটি ছোটগল্প সংকলন বের করেছিলেন যেটির শিরোনাম এবং আখ্যানবস্তু ছিল “নারীবিহীন পুরুষ” (“Men Without Women.”)। এই গল্পটি কি “পুরুষবিহীন নারী” – এর প্রথম গল্প হয়ে উঠতে পারে?

আমি জানি না, ভবিষ্যতে “কাহো” ঠিক কোন জায়গা দখল করবে। আমি এখনও কাহো আর সাহারাকে দুটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেব ভাবতেই আগ্রহী, আর হয়ত এই গল্পের একটি সিকোয়েল লিখে ফেললেও ফেলতে পারি। কে বলতে পারে? হয়ত বা এখানেই গল্পটির সমাপ্তি হয়ে গেল। ভবিষ্যতের গর্ভে কী আছে, আমি সত্যিই জানি না।   

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ