মাকে নিয়ে কোনওদিন কোনও
গল্প লিখিনি। খুব সাধারণ আটপৌঢ়ে মা আমার। সারা গায়ে রান্নার গন্ধ। আগে নাকি মায়ের
গায়ে নদীর গন্ধ ছিল। লোনা গন্ধ। এ কথা আমার বড়দি আমাকে বলেছিল। বড়দি প্রথম এসেছিল,
তাই হয়তো মায়ের গায়ে নদীর লোনা গন্ধ পেয়েছিল। আমি অনেক পরে এসেছি, ততদিনে হয়তো
এ-শহর সেই গন্ধ শুষে নিয়েছে।
শহর খুব কঠিন। কঠিন দেওয়াল
কুঁড়ে জাল আর আলোর খেলা। তোলা উনুনের কালো ধোঁয়া মেঘের মতো জিলিপি প্যাঁচে গলিপথে
জমা হতো। সারাদিন ঘরকন্নার শেষে আমাদের ছোট্ট-বাড়ির রুমালের মতো ছাদে ছিল আমার মায়ের
আকাশ। মায়ের ছবিটিও সাদা কালো। তাতে রং বঙ্গতে দুটো— সিঁথিতে লাল, আঁচলে হলুদ। সেই
দুটো রঙেই আমার মা আঁকা ছিল আমার মনে। সেই মাকে আমি অনেকটাই দেখতে পাইনি, বা দেখলেও
টের পাইনি। অনেকদিন পরে মাকে দেখলাম সেদিন। হঠাৎই। মা মারা যাওয়ার চরিশ বছর পর...।
একসময় এদিকটা আমি কখনও কখনও এসেছি। তারপর
আর আসা হয়নি দীর্ঘ দীর্ঘ বছর। আর ইদানীং এত বাড়িঘর ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ছয়লাপ, ভোলই
বদলে গেছে জায়গাটার।
জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ভবানীপুরের
মতো জায়গায় থেকেছি। হার্ট অব দ্য সিটি। শহর বাড়ছে। বড় লোকজন দামি জায়গার দখল নিচ্ছে।
ভাড়াবাড়িগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে ফ্ল্যাটবাড়িতে। যেটুকু ভাড়া আছে, তারও ভাড়া বাড়ছে
হু হু করে। নিম্নবিত্তের মানুষজন শহর ছেড়ে পিছু হটছে। সেসময় আমার বাবা আয়ের সঙ্গে
সংগতি না রাখতে পেরে চলে এসেছিলেন কলকাতার বাইরে। গড়িয়া স্টেশনের এদিকটা। বাবা ছোট
একটা জায়গা কিনেছিলেন মায়ের সব সোনাটুকু খুইয়ে। জলা জমি। মাটি ভরে তিল তিল করে সেখানে
বাড়ি উঠেছিল৷ ছোট বাড়ি। সাদা দেওয়াল। মাথায় অ্যাসবেসটস। বাবা নিজের হাতে বাড়ির
চারধারে বাঁশের বেড়া দিয়েছিলেন। তাতে ঘন সবুজ রং। বেড়ার গায়ে উচ্ছে গাছ।
উঠোনে শিউলি আর কাশীর পেয়ারা,
ভেতরে লাল।
কিন্তু বাড়িটার দু দিকে
দুটো পুকুর। পিছনের পুকুরটা মজা। কচুরিপানায় বারোমাস হেয়ে থাকত। বছরের একটা সময়
বেগুনিরঙের আশ্চর্য ফুল হতো সেখানে। সারা পুকুর জুড়ে বেগুনিরঙের মেলা! কিন্তু সে ফুলের
কদর ছিল না, সে ফুলের পাশে দিয়ে জলঢোঁড়ার দল এঁকেবেঁকে আলপনা দিত। আর সামনের পুকুরটাকে
ঘিরে অনেকগুলো ঘাট। চারদিকের সব বাড়ির একটা করে। এই পুকুরের দখিন পাড় পুরো আমাদের
জমির বাউন্ডারি। ঠিক তার ধারেই একটা ঘাট ছিল, সেটা বারোয়ারি। সারা গ্রীষ্মকালে দলে দলে লোকে এসে স্নান করে। সে করুক
গে। সবাই আমাদের পাড়ার লোক, পাড়া- প্রতিবেশী।
আমরা শহর থেকে এসেছিলাম।
আমরা পুকুরে চান করতাম না। সাঁতার জানি না। জলে নামলে হাবুডুবু খেতাম। কিন্তু এখানে
আসার কিছুদিনের মধ্যে মাকে দেখতাম, সারাদিনে একবার হলেও পুকুরে দুটো ডুব দিত। মা পুকুরে
স্নান বা চান করত না, দুটো ডুব দিত।
বাবা কখনও দেখলে বলত — দেখ
দেখ নদীর দেশের মেয়ে! আমরা দেখতাম — গ্রামের মেয়ে! জলে ডুব দিয়ে মায়ের মুখে চুলের
আলপনা। কপালে সিঁদুর লেপটে যেত। আগেই বলেছি, আমরা কোনও ভাইবোন সাঁতার জানতাম না। কোনও
কোনওদিন সারা পুকুর দাপিয়ে মা সাঁতার কাটত, আর মুগ্ধ হয়ে আমরা ভাইবোনেরা দেখতাম।
এখন সে সব কথা মনে হলে মনে হয়, মা হয়তো ভবাণীপুরের ভাড়া বাড়িতে হারিয়ে যাওয়া
জীবন আবার খুঁজে পাচ্ছিল একটু একটু করে। আর দেওয়াল টিপে আলো নেই। আবার ঘাট সরতে পারত।
ডুব দিতে পারত। সেই সঙ্গে বড় সুখ ছিল পায়ের তলায় মাটি, ঘাসজমি। শান বাঁধানো পৃথিবী
নয়। তার নিজের বাড়ি, ভাড়াবাড়ি নয়। ভাড়াবাড়ির জীবন বড় গ্লানির। মা এখানে এসে
বড় সুখে ছিল। আড়াই কাঠা জমির এই ভূখণ্ড মাকে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিল। এই বাড়িতেই
মা মারা যান। চরিশ বছর আগে। তার আগেই বাবা মারা গিয়েছিলেন। দিন বদল হয়। এই জমি বিক্রি
হয়ে যায়। আমরা ভাইবোনেরা সবাই যে যার মতো এই শহরেই ছড়িয়ে পড়ি। আমি সল্টলেকে এক
ফ্ল্যাটে আমি চলে যাই। এ কাহিনীর শেষ এখানেই। কিন্তু মা মারা যাওয়ার চলিশ বছর পরে
আমি অদ্ভুতভাবে মাকে আবিষ্কার করলাম। আমার এ গল্প সেই আবিষ্কারের কাহিনী।
...
নেমেছিলাম যখন ঝিরঝির করে
বৃষ্টি হচ্ছে। চারদিক অন্ধকার করে আছে। আরও জোরে বৃষ্টি নামতে পারে। এসব কাজে দুপুরবেলাটাই
সেরা সময়। তখন রিকশচালকদের অখণ্ড অবসর। সওয়ারি থাকে না। হয় তাস খেলে, নয় রিকশয়
বসে ঝিময়।
এই সময়টাই একটু বাড়তি
ভাড়ার কথা বললে খুব তাড়াতাড়ি তাদের সঙ্গে ভাব হয়ে যায়। যত দ্রুত ভাব হবে, তত তাড়াতাড়ি
কাজ হবে। আমি এখানে একটা জরুরি কাজে এসেছি।
দাঁড়িয়েছিলাম একটা দোকানের শেডের নীচে।
অপেক্ষা করি কে টোপ খায়! সিগারেট ধরিয়ে চারদিক মাপছি। এক্ষেত্রে একটু মদোমাতাল নেলাখেপা
মতো রিকশচালক হলেই ভালো। দিনে দুপুরে মদ খাওয়া মাতাল কোনও রিকশচালক পেলে আরও ভালো
হয়। দেখা যাক, একটু অপেক্ষা করি, কিছু একটা পাব— এই বিশ্বাস ছিল মনে।
এসেছি একটা গুরুত্বপূর্ণ
কাজে। নিজের পরিচয়টা এই মুহূর্তে নাইবা দিলাম। শুধু জেনে রাখুন আমি কিছু খুঁজছি, এই
খোঁজাটাই আমার কাজ। আমার কাছে সে অর্থে কোনও ঠিকানা নেই। দরকারও নেই। তবে আপাতত আমি
একটা ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছি। খুব কমন একটা ঠিকানা। ধরুন রিকশায় বসে বলব— - হরিসভা
যাব।
রিকশচালক বলবে, কোন হরিসভা?
আমি হরিসভাতেই থেমে থাকব
না। বলব, আরে ওই যে একটা মোড় আছে। সেই মোড়ের মাথা
পেরিয়ে —
রিকশচালক আমার সঙ্গে ভাববে। বলবে — ব্যানার্জিপাড়া?
—হ্যাঁ, ব্যানার্জি পাড়া?
তাহলে তাই হবে।
রিকশচালক বলবে, নিয়ে গেলে চিনতে পারবেন ?
—হ্যাঁ হ্যাঁ পারব, খুব পারব, কেন পারব
না? ততক্ষণে আমি রিকশয় উঠি উঠি করছি।
অসময়ের প্যাসেঞ্জার রিকশচালক ছাড়তে
চাইবে না, হোক অনির্দিষ্টযাত্রা, ঠিকানাবিহীন, কিন্তু টাকা তো মিলবে।
সে আকাশের দিকে তাকাল।
আমি বলব, বৃষ্টির আগে আগে পৌঁছাতে হবে।
সে বলবে, চলেন, এ মেঘে বৃষ্টি হবে না।
দেখেন না, মেঘ উড়ে যায়—
এবার রিকশচালক চালাতে শুরু করেছে। বলবে,
ব্যানার্জিপাড়া হরিসভা চোদ্দো টাকা ভাড়া কিন্তুক—
আমি
বলেব,
, টাকার জন্য চিন্তা করো না, তোমাকে আমি
বেশি দেব, খুশি করে দেব। এই দুপুরবেলা
তুমি রেস্ট নিচ্ছিলে—আমি তোমাকে পুষিয়ে
দেখ ভাই।
ভাই শুনে সে শান্তি পেয়েছে। রিকশ চলছে।
প্যাডেলে চাপ দিয়ে ও রিকশটা এগিয়ে নিয়ে
যাচ্ছে। একটা অবাধ্য কোঁচ কোঁচ শব্দ।
আমি ওকে দেখি, শীর্ণ চেহারা।
প্যাডেল চাপার সময় পিঠের হাড়গুলো যেন উঠে আসছে। পরনে স্যান্ডো গেঞ্চি আর ঢোলা বারমুডা।
মাথার চুলগুলো ছোট ছোট করে ছাঁটা। এবড়ো খেবড়ো দাড়ি না কাটা গাল, ভাঙাচোরা মুখ।
দাঁড়িয়েছিলাম শেডের নীচে।
রিকশ নিয়ে ও এসে আমার সামনে দাঁড়াল। মুখে একগাল হাসি। যেন কত চেনা। বলল, বাবু ভালো
আছেন? কোথায় যাবেন ?
বুঝলাম, এ আমার থেকেও সরেস। সওয়ারি নেওয়ার
জন্য চেনা পরিচিতির ভাব করছে। আমি ওকে বধ করতে চাইছি, আর চেনা হাসি হেসে ও এসেছে আমাকে
বধ করতে। শেয়ানায় শেয়ানায়
কোলাকুলি তাহলে। আচ্ছা, শুরু করা যাক—
আমি বললাম, তুমি আমাকে খুঁজে বার করে
দাও দিকি—শম্ভুনাথ পালের বাড়ি। আগে কত এসেছি। —আগে এসেছেন? তালে তো চিনে নেবেন।
—হ্যাঁ হ্যাঁ একবার গেলেই ঠিক চিনে নেব।
আগে কত এসেছি।
রিকশা চলছে। বললাম, কতটা দুর হবে এখান
থেকে ?
—এই তো, এরপরের মোড় পেরিয়ে ডাইনে হরিসভা।
আমি বুঝলাম এসে গেছি।
এবার বলতে শুরু করব, এদিকটা মনে হচ্ছে
না। কিছুই তো চিনতে পারছি না। সব পালটে গেছে। রিকশচালক বলবে, কস্তুদিন আগে এয়েছেন?
—উমম, তা বছর কুড়ি বাইশ আগে।
বছর কুড়ি-বাইশ! সে তো অনেকদিন গো। তারপরে
আর আসা হয়নি ?
—হ্যাঁ, বারো বছরে এক যুগ। প্রায় দু
যুগ!
—এই তো হরিসভা। কী নাম বললে — শম্ভুনাথ
পাল ?
—হ্যাঁ, একটা ইনসিউরেন্স কোম্পানির দালালি
করত, শম্ভুনাথ পাল।
–তালে এখানে হবে না বলেছ?
-এখানে কী করে হবে? আমি জায়গাটাই তো
চিনতে পারছি না। এটা হরিসভা ?
—ওই তো হরিসভা। ব্যানার্জি পাড়া হরিসভা।
ওই যে বোড লেখা। হরিসভা।
আমি সামনে তাকিয়ে দেখি। একটা মন্দির।
তার গায়ে বোর্ড: হরিভক্তি প্রদায়িনী সমিতি। ব্যানার্জিপাড়া। হরিসভা।
আমি মুখ ব্যাজার করি— কী জানি? চেনা লাগছে
না। ঠিক আছে একবার জিয়েস করো তো কাউকে, শম্ভুনাথ পালকে কেউ চেনে নাকি? ইনসিউরেন্সের
এজেন্ট। মানে দালালি করতো।
রিকশচালক এদিক ওদিক মুখ বাড়িয়ে শম্ভুনাথ
পালের খোঁজ করল। জানি পাবে না। পেতে পারে না। পেলেও সে ইনসিউরেন্স কোম্পানির দালাল
নয়। ধুসস শম্ভুনাথ পাল বলে এখানে কেউ নেই। কস্মিনকালেও কেউ ছিল না। আর থাকলেও ইনসিউরেন্স
কোম্পানির দালাল নয়, হলেও শম্ভুনাথ নয়। আমার ভাবনা মতো সে পেল না। একে তাকে জিজ্ঞাসা
করে সে আমার দিকে মুখ ফেরাল। কালো ঠোট উলটে বলল,
—কেউ যে চেনে না।
এখন আমি চুপ করে বসে। এখন দায় রিকশচালকের।
বুঝতে পারছি ও আমাকে নিয়ে বেশ
আতান্তরে। চেনা হাসি দিয়ে রিকশায় তুলেছিল।
ফ্রি হাসির জন্য ভেবেছিল দু চার টাকা বাড়তি পাবে, এখন যদি বাড়িই না পাই, কাজই না
হয়, ভাড়া পাবে, কিন্তু বাড়তি মিলবে না।
বৃষ্টি আসেনি। সত্যি সত্যি মেঘ উড়ে গেছে।
তবে ঘোর ঘোর চারদিক।
দু কদম রিকশ এগোচ্ছে, আর যাকে পাচ্ছে
তাকে জিজ্ঞেস করছে। আমি ওকে মৃদু গলায় আবারও আশ্বস্ত করলাম, , ভাড়া নিয়ে চিন্তা
নেই। বেশিই দেব। খুশি করে দেব।
শুনে ও তেড়েফুঁড়ে উঠল। ও হাল ছাড়েনি,
জিজ্ঞেস করছে। করুক, করুক ও খুঁজে না পেয়ে আমার দিকে তাকালে তখন আমি ওকে বধ করব।
—না পাচ্ছি না গো। রিকশচালক বলল।
—তালে কী হবে? আমি শম্ভুনাথকে পাব না?
এবার ও রিকশ দাঁড় করাল, বলল,
-
- ঠিকানা নেই?
—ওই তো হরিসভা। তার আগে একটা মোড়। মোড়ের
মাথা পেরিয়ে—
—তালে কি, ওদিকে বটতলার দিকের হরিসভা?
—আমি বললাম, তাই হবে, তাই হবে। হ্যাঁ
একটা বট গাছ ছিল বটে।
—সেটা যে বেশ দুর। ভাড়া—
আমি ওকে কথা বলতে দিলাম না। বললাম, তুমি
টাকা নিয়ে চিন্তা করো না ভাই। যা হবে তার থেকে তোমাকে আমি বেশিই দেব। ওখানে গেলে আমার
কিছু পাওনা হবে। সেখান থেকেই দেব তোমাকে। —চলুন তালে। রিকশচালক গাড়ি ঘুরিয়ে ছুটে
চলে।
আমি বলি, একটু কষ্ট করো। শম্ভুনাথ আমার
জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। আমি গিয়ে তাকে মুক্তি দেব। তোমার তাড়া নেই তো? আমি শম্ভুনাথকে
না পেলেও তোমাকে খুশি করে দেব।
রিকশ চলছে।
এবার আমি আস্তে আস্তে বলি, চলো আগে একটা
চা খাই। হাই উঠছে। তারপর নয় বটতলার হরিসভায় যাওয়া যাবে। আমার অত তাড়া নেই।
রিকশচালক একটু খুশি হল। টাকা নিয়ে চিন্তা
নেই। উপরি হল চা। সে অন্যদিকে রিকশ গড়াল। একটা চায়ের দোকানে এসে সে থামল। বলল, এখানে
চা খেয়ে নিন।
আমি বিশ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিয়ে
বললাম—দুটো চা, আর দুটো বিস্কুট বলে দাও।
সে তাই করে। আমি রিকশ থেকে নামি না। চা
আসে। দুজনে মিলে চুক চুক করে চা খাই। বলি,
তোমার বাড়ি কোথায়? বলি, এদিকটা কত পালটে
গেছে। বলি, হ্যাঁ গো ইটখোলা এখানে কোথায় ? -কোন ইটখোলা ?
—ওই যে যেখানে মেয়েটাকে বাচ্চা সুস্থ
নিয়ে গিয়েছিল। —ও সে তো নন্দ ঘোষদের ইটখোলা।
—হ্যাঁ সেটার কথা বলছিল, সেটা কতদুর ?
—তা দুর আছে।
চা শেষ করি। বলি, কোনদিকে? আমরা কি ওদিকেই
যাব?
—হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, ওদিকেও একটা হরিসভা
আছে। কালীবাড়ি, মাঝে মাঝে কেন্ডন হয়। হ্যাঁ হরিসভা, ঠিক বলেছেন— এ
সে ভাবে। আমি বলি, চালাও তো নন্দ ঘোষদের
ইটখোলার দিকে। কাগজে পড়েছিলাম। যাওয়ার
পথে, একবার দেখে নেব জায়গাটা।
— যাবেন, চলেন।
সে গাড়ি ঘুরিয়ে চলতে শুরু করে। বলি,
কারা করল বলত, কাজটা?
-খুব অন্যায় কাজ। পাপ!
—কাগজে তো লিখেছে, একজন রিকশঅলা নাকি
বউটাকে রিকশায় তুলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে এসেছিল। তা কোন রিকশঅলা? তাকে তো পাওয়ায়ই
গেল না। তাকে পেলে – সে বলতে পারত? —হুমম। রিকশচালক গাড়ি টানতে টানতে উত্তর দেয়।
আমি বিড়বিড় করি— ওই রিকশঅলা, সে ব্যাটা
নির্ঘাত কিছু দেখেছিল। কারা করেছে জানে। কিন্তু ভয় পেয়ে মুখ বন্ধ রেখেছে। ফালতু হুজ্জতি
কে জড়াতে চায়, গরিব মানুষ।
রিকশ চলছে।
আমি বলি— কিম্বা তার সঙ্গে শয়তানগুলোর
যোগসাজস আছে। এক গেলাসের বন্ধু। কী মনে হয় তোমার?
রিকশচালক উত্তর দেয় না। জানি দেবে না।
বলি, কিন্তু সে তো পুলিশের সামনেই এল
না। এসে পুলিশ জানতে পারত, কারা করেছে। পুরস্কার পেত। পুলিশ পুরস্কার দেবে। আর যারা
করেছে, তাদের যদি ভয় পায়—তাহলে বলব, একদম নয়। পুলিশ তাদের পেলে ফাঁসিতে চড়াবে।
রিকশ টানতে টানতে সে বলল, খুব অন্যায়
করেছে। পশুও এমনভাবে মারে না।
আমরা এসে পড়লাম একটা ফাঁকা জায়গায়।
পাশাপাশি বিশাল বিশাল দুটো পুকুর। তাতে টলটল করছে জালে। সে বলল – নন্দ ঘোষের ইটখোলা।
সে আমাকে বলল। মনে মনে বললাম, আরে ভাই,
এসব জায়গাই আমি চিনি। গত দুদিন ধরে কতভাবে যে পাক দিচ্ছি —।
বললাম, কোন পুকুর থেকে বউটার বড়ি পাওয়া গেছে বলত?
রিকশচালক আমাকে ডানদিকের পুকুরটা দেখাল।
ঠিকই দেখাল। আমি পুকুরটার দিকে অনেকক্ষণ "চেয়ে থাকলাম। বললাম, আর বাচ্চাটার বড়ি?
রিকশচালক আমাকে, সামনের একটা ঝোপ দেখাল,
ওই ঝোপে পড়েছিল।
এবারও ঠিক দেখাল। যাক এ খোঁজখবর রাখে।
আমি রিকশ থেকে নামলাম। আমি সিগারেট খাই
কখনও সখনও। কিন্তু সিগারেটে বন্ধুত্ব করতে বড়
সুবিধে হয়। তাই পকেটে এক প্যাকেট কিনে
রেখেছিলাম। একটা নিজের মুখে তুলে, ওর দিকে আর একটা এগিয়ে দিলাম। বললাম, আগুন দাও।
ও লাইটার বের করে দিল। ধরালাম। বললাম,
রিকশাটা কে চালাচ্ছিল? চেনো?
-ও ধোঁয়া ছেড়ে বলল, '
আমাদের লাইনের না।
–তবু, কে হতে পারে? লাইনের না হলেও তোমাদের
চেনা হবে। কিছু শোনোনি? কে?
-ও খুব আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়ল। অন্যদিকে
তাকিয়ে আছে।
বললাম, কাগজে পড়ে আমার খুব কষ্ট হয়েছে।
মানুষ পশুর থেকেও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারাচ্ছে। পৃথিবীতে কি কেউ
কাউকে সাহায্য করবে না।
এই ধরনের কথা যাত্রার ডায়লগ। এক্ষেত্রে
ডায়লগই দিতে হয়। ভোকাল টনিক!
-বললাম, , একটা বউ, তার কোলে দুধের শিশু।
সে রিকশয় উঠল। রিকশঅলা তাকে অন্ধকার এই পুকুরের ধারে নিয়ে এসে ছেড়ে দিল দুষ্কৃতীদের
হাতে। আর পশুগুলো তাকে খুবলে খুবলে খেয়ে পুকুরে ডুবিয়ে মারল। বাচ্চাটাকে ছুঁড়ে ফেলে
দিল ঝোপে। তাকে কুকুরে খেলো। উঃ! এমন মানুষ করে? ইমপসিবল। কে বলত রিকশঅলাটা? নাম কি?
কেউ তাকে চেনে না। ওই চায়ের দোকানের বউটা বলেছিল, সে তখন দোকান বন্ধ করছে, ঠিক সাড়ে
নটা। তখন একটা রিকশাঅলা চিৎকার করছিল বউটার ওপর— বউটা কোথায় যাবে বলতে পারছিল না।
তার কাছে ভাড়ার টাকাও ছিল না। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। চায়ের দোকানের বউটা চলে
যায়। সে আর কিছু বলতে পারেনি। ওদিকে রিকশঅলাকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। দুজন মানুষ এভাবে
মরে যাবে! বিচার পাবে না? কোলে বাচ্চা ছিল। যারা করেছে তাদের ধরে গুলি করে মারতে হয়।
“এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে আমি থামলাম।
শ্বাস নিলাম। আড় চোখে রিকশচালককে দেখলাম।
বললাম, আর একবার চা খাবে? চলো সামনে বউদির
দোকান থেকে আর একটা চা খাই।
আমি জানি ওই দোকানটা একটা বউ চালায়।
তাকে সবাই বউদি বলে। আগে আমি দুবার এসে চা খেয়ে গেছি।
—চা খাবেন? চলেন, আগে ওখানে গিয়ে বসি।
পুকুর ধারে রিকশ পড়ে থাকল। আমরা দুজনে
চায়ের দোকানের সামনে পেতে রাখা বেঞ্চে বসলাম। বউটার থেকে মুখ ফিরিয়ে আছি, বউটার না
আমাকে আবার চেনা চেনা লাগে...।
চা এল। বৃষ্টি আর আসবে বলে মনে হয় না।
তবে অন্ধকার মাথার ওপর ঝুঁকে আছে। হয়তো অন্য কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে।
আমি ফিসফিস করলাম, রিকশাওয়ালাটকে পেলে — সব জানা
যেত—
রিকশচালক আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, অনেকদিন
আগে আমার কাছে এমন একটা কেস এয়েছিল বুঝলেন। কথাটা বলে ও আয়েশ করে বসল।
—মানে? আমি ওর দিকে তাকালাম। অনেকদিন
আগে ?
চায়ের মাসে চুমুক দিয়ে ও বলল, 'হ্যাঁ
সত্যি বলছি, ভরা বর্ষাকাল তখন। সারাদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডের ব্রিজের ওপাশ
থেকে ফিরছি। বিষ্টিও হচ্ছে, খুব বাজাও পড়ছে। এমন সময় হঠাৎ একটা বউ আমাকে হাত দেখালে।
বউটাকে দেখে আমি থমকে দাঁড়ালাম। দেখলাম বউটা একা নয়, কোলে একটা বাচ্চা। পরে অবশ্যি
সে বলেছিল, সে হাত দেখায়নি। আমি তাকে দেখেই তার সামনে রিসকা লাগিয়েছিলাম। তো বউটা
উঠে এল আমার রিসকায়। উঠে এসে একটা ঠিকানা বলল, শেতলা মন্দির। নানু মাইতির বাড়ি। কত
শেতলা মন্দির চারদিকে। একটার পর একটা শেতলা মন্দিরে তাকে নিয়ে ঘুরলাম। বিষ্টি পড়ছে।
বাজ পড়ছে। আমি তাকে নিয়ে ঘুরছি। সে কিছুতেই চিনতে পারছে না। সব মন্দির দেখে আর সে
বলে, এটা না। আমি ঘুরছি তো ঘুরছি। সেই শেতলা মন্দির আর নানু মাইতিকে আর পেলাম না। কী
করব? এদিকে রাত হয়েছে। বউটিকে বললাম, চলো আমার বাড়িতে। কাল সকালে খুঁজে দেব। নিয়ে
তুললাম আমার বাড়িতে। আমি আর মা থাকি।
রিকশচালক থামল। চায়ের মাসে আবার চুমুক
দিল। আমি বললাম, 'পরেরদিন শীতলা মন্দির-নানু মাইতিকে পেলে?’
‘নাহ্! পরেরদিনও অনেক খুঁজলাম কিন্তুক
তার সেই শেতলা মন্দির আর নানু মাইতিকে খুঁজে পেলাম না।'
'তাহলে?'
'তাহলে আর কী? বউটা আমার কাছেই থেকে গেল।'
চায়ের দোকানের বউটা কখন এসে আমাদের পিছনে
দাঁড়িয়েছিল। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘ওরে ও গোবরা
তুই বেস্পতির কথা বলছিস। গোবরা সুযোগ পেলেই বউয়ের গল্পো করে। যাথা তোর মতো কেউ বউ পাগল
হয় না। বেস্পতির কী কপাল রে—ম’
আমি বললাম, ‘সেই মেয়েটিই তোমার বউ? বাহ! আর বাচ্চাটা
?”
‘সেও আমার কাছে। মা ছেড়ে যাবে কোথায়?
এখন ক্লাস টেন, এবার পরীক্ষা দেবে।’
গোবরা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। ওর হাতের
চায়ের মাসে শেষ চুমুক দিল, ওর চোখ মুখ চকচক
করছে। বলল, ‘কেন
করলাম জানেন ?’
‘মানুষের কাজ করেছ ?'
‘সেই মানুষটা আমাকে কে করল?'
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি। গোবরা কী বলবে
এবার —
গোবরা নড়ে বসল, ‘তালে আর একটা ঘটনা
বলি—। কাউকে তো বলিনি কোনওদিন আপনাকেই
বলি— শোনেন—'
চায়ের দোকানের বউটা চায়ের গেলাস ধোয়া
বন্ধ করে গোবরার পিছনে সেঁটে দাঁড়িয়েছে। আমার হাতে চায়ের গ্লাস। একটা চুমুক দিয়েছিলাম।
হাতে ধরাই আছে।
গোবরা বলল, ‘আমি তখন গড়িয়া স্টেশনের
দক্ষিণ পাড়ায় থাকি। দুপুর হলেই ঢান করতে যেতাম ডাক্তারদের পুকুরে। আসলে চান নয়।
একটা ছিপ নিয়ে যেতাম। বড্ড মাছ ধরার নেশা ছিল আমার। বড়শিতে আরশোলা বেঁধে ফেলে মাছ
ধরতাম। একদিন চান করার আগে বড়শিতে একটা আরশোলা গেঁথে ফেলে দিলাম ঘাটের একধারে। দুপুরবেলা।
চুপ করে বসে আছি। হঠাৎ দেখি ফাতনা নড়ছে। আরশোলার টোপটা খেয়েছে একটা বড় শোল মাছ।
আমি সঙ্গে সঙ্গে হিপের দখল নিয়ে মাছটাকে দিলাম এক টান। মাহুটা বেশ বড় খেলিয়ে তুলতে
হবে। মাহটাকে টেনে তুলছি। এমন সময় একটা বউ এসে পিছন দিক থেকে খপ করে আমার চুলের মুঠি
চেপে ধরল। কী তার তেজ। বলল, ‘তুই এই মাছটা ধরবি
না।’
আমি বললাম, ‘কেন?
তুমি আমার চুল ছাড়ো।’
সে আমাকে ঝটকা দিল। বলল, ‘সেটা পরে বলব, আগে মাছটা টেনে তুলে ওর মুখ থেকে বড়শি ছাড়া। তবে
তোর চুল ছাড়ব। নইলে এই পুকুরে তোকে মেরে রেখে দেব।’
আমার রোখ চেপে গেছে। আমি বললাম, ‘এটা তোমাদের পুকুর নয়, এটা ডাক্তারদের পুকুর, মাছও তোমাদের নয়।’
ততক্ষণে আশপাশের চারদিকে থেকে আরও মেয়ে বউরা সব হইহই
করছে? কী হল, কী
হল করছে?
বউটা বলল, আরে যে শোল মাছটা গাদাখানিক
বাচ্চা নিয়ে পুকুরে ঘোরে— এই ছেলেটা তাকেই বড়শিতে গেঁথেছে। তুই যদি মাকে ধরে নিয়ে
যাস, তাহলে ওর ছানাপোনাগুলো বাঁচবে কী করে?' রিকশচালক এক নিশ্বাসে কথাটা বলে থামে।
খুব আস্তে আস্তে বলে, ' –সেদিন আমি মাহুটা
তুলে তার মুখ থেকে বড়শি খুলে আবার পুকুরে ছেড়ে দিলাম। তারপর বউটা আমাকে ছেড়ে দিল।
সেই বউটা আমাকে সেদিন একটা শিক্ষা দিয়েছিল—।' গোবরা হাসল। বলল, 'বউটা ছিল আপনার মা।'
আমি গোবরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
না, চিনতে পারলাম না। চিনতে পারার কথাও না। তবে চব্বিশ বছর পরে হঠাৎ যেন মাকে চিনতে
পারলাম।
আমার মা!
মায়ের সেই সাদা কালো ছবিটা আমার মনে
পড়ে গেল। তাতে রং বলতে দুটো— সিঁথিতে লাল, আঁচলে হলুদ। সেই দুটো রঙেই আমার মা আঁকা
ছিল আমার মনে। সেই মাকে আমি অনেকটাই দেখতে পাইনি, বা দেখলেও টের পাইনি। অনেকদিন পরে
মাকে দেখলাম সেদিনই। হঠাৎই। ভিন্ন রঙে উজ্জ্বল। মা মারা যাওয়ার চরিশ বছর পর...।
একটা খুনের তদন্ত করতে আমাদের পুরনো এলাকার
লাগোয়া এদিকটা তিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু আজ এভাবে নিজের মাকে আবিষ্কার করব ভাবতে পারিনি।
গোবরা ফিসফিস করল, 'আমি কিন্তুক আপনাকে
দেখেই চিনেছি। ভালো করে খোঁজেন স্যার, পেলে ছাড়বেন না। আর আমি যদি তাকে পাই, এই পুকুরের
ধারেই মেরে রেখে দেব।'
লেখক পরিচিতিঃ
জয়ন্ত দে – ভারতীয় কথাসাহিত্যিক। পশ্চিমবঙ্গে, কলকাতায় থাকেন।
তিরিশের বেশি বই লিখেছেন। ম্যাজেশিয়ান ও এক নারী, আত্মজন, অন্নপূর্ণা, দশচক্র, মৃত
না জীবিত তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা।


3 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ এই গল্প। আগে পড়েছি। আবার পড়া হল।
উত্তরমুছুনআগাগোড়া গল্পের ভাষা সহজ ও সুন্দর। তাই পড়তে ভালো লাগে। প্রথমে মায়ের ও পরিবারের দীর্ঘ বর্ণনা পড়তে ভালো লাগলেও তার থেকে গল্পের আভাস পাওয়া যায় না। এরপরে শুরু হয় রিক্সা পর্ব। অনেক কথা অনেক জায়গা পেরিয়ে আবার মায়ের কাছে ফিরে আসা। গল্পটি খুব সুন্দর করে বোনা হয়েছে। ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর। ভালো লাগল।
উত্তরমুছুন