আমি যা দেখি না, তা দেখার অধিকার আমার প্রজারা কেমন করে পায়? — পঙ্গদেশের মহারাজ ক্রাতিয়া খুব বিচলিত। পিতা রাজা দেমোসের মৃত্যুর পর তিনি ওয়ারিসসূত্রে রাজাসনে বসেছেন। বিগত রাজার আর কোনো সন্তান না থাকায় বিকল্পও ছিল না। অবশ্য ক্রাতিয়া রাজ্যশাসনের ভার গ্রহণ করার পর প্রজারা খুশিই হয়েছিল। হৃদয়বান মানুষ হিসেবে রাজ্যে তার অনেক গালগল্প প্রচলিত ছিল। রাজা দেমোসের দুঃশাসনে অতিষ্ট হয়ে ভেবেছিল, এইবার বুঝি মুক্তি! এইবার বুঝি পঙ্গদেশের উপর মুখ তুলে তাকিয়েছেন ঈশ্বর!
কিন্তু বছর যেতে না যেতেই প্রজাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ঈশ্বর এতো তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নেবেন, এ তারা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। শুরুটা হয় সে বছরের বন্যা দিয়ে। রাজ্যের প্রায় পঁচিশ শতাংশ তলিয়ে গেল পাহাড়ি ঢলে। বন্যাকবলিত মানুষদের জন্য রাজদরবার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলো না। রাজ্যের প্রজাদের এই সীমাহীন দুর্ভোগে রাজদরবারের চরম নির্লিপ্ততা দেখে রাজ্যের কবিরা রাজার সমালোচনা করে কবিতা রচনা শুরু করলেন, গায়েনরা বাঁধলেন গান। দু-একটা রাজগৃহেও পৌঁছে গেল, তাও রাজকন্যার কণ্ঠে। আট বছর বয়সী রাজকন্যা সুরেলা কণ্ঠে কিন্তু বেসুরে গাচ্ছিল:
শোনেন শোনেন, শোনেন দিয়া মন
এক দেশেতে এক ছিলেন রাজা, জন-দুষমন
রাজ্য যে তার ভেসে যায় মহা বন্যায়
বলেন, অন্যায় অন্যায়, বড়ো অন্যায়
সেই রাজায় ঘুমায় তখন নাকে তেল দিয়ে
মন্ত্রিপরিষদ আছে তার আনন্দে গান গেয়ে!
ওরে, শোনেন শোনেন, শোনেন দিয়া মন
এক দেশেতে এক ছিলেন রাজা, জনদুষমন...
পেছন দাঁড়িয়ে নীরবে রাজা ক্রাতিয়া কন্যার গান শুনছিলেন। গানটি শুনে তিনি বেশ মজা পেয়ে তালি দিতে দিতে হেসে উঠলেন। বললেন, বাহ, মজার গান তো! এরপর রাজাও গুনগুন করে সেই গান গাইতে শুরু করলেন। পরদিন রাজার মুখে এই গান শুনে ছুটে এলেন উজির, মন্ত্রিপরিষদের উপদেষ্টা।
মহারাজ! কী সর্বনাশ! এ গান তো আপনাকে নিয়েই লেখা। আপনাকে স্পষ্ট করে জনদুষমন বলা হয়েছে! আর আপনি কিনা আনন্দে গেয়ে বেড়াচ্ছেন?
বলো কি উজির? কার এমন সাধ্য! রাজা হুংকার দিয়ে উঠলেন। যে আমি প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা একদমই দেখতে পারি না, তার বিরুদ্ধে কিনা এত বড়ো অভিযোগ?
জি মহারাজ। এ জন্য এ গান যে বেঁধেছে, তাকে আমরা এক অন্ধকার বন্দিশালায় নিক্ষেপ করেছি। আর কোনো দিন সে আলোর মুখ দেখবে না।
কিন্তু আমি তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাই না, উজির! তুমি তো জানোই, দিনের অর্ধেকটা সময় আমি ঘুমিয়েই কাটাই, এ জন্য কোনো তেলের প্রয়োজন হয় না আমার। রাজা ক্রাতিয়া অভিযোগের সুরে বললেন।
এ জন্যই তো ওকে কঠিন সাজা পেতে হচ্ছে মহারাজ। উজির সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন।
আর বন্যা? আমার রাজ্যে তো কোনো বন্যা নেই। ঠিকমতো বৃষ্টিই হয় না অনেক দিন থেকে।
মহারাজ ঘোষণা দিলেন না জানতে চাইলেন সেটা বুঝতে না পেরে আমতা আমতা করে বললেন উজির, জি মহারাজ। আপনি যথার্থই বলেছেন। তবে পাহাড় থেকে নেমে আসা কিছু পানি ভুল পথে গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়েছে। এই সবই শত্রুপক্ষের চক্রান্ত। চক্রান্তকারীরা মহাপ্লাবন নাম দিয়ে আপনার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে, মহারাজ।
না না, যে বন্যা আমি দেখিনি, সে বন্যা আর কেউ দেখতে পারে না! রাজা চিৎকার করে উঠলেন।
জি মহারাজ। এই কারণে মন্ত্রিপরিষদের কেউ বন্যা পরিদর্শনে যায়নি। যারা দেখছে তাদের জন্য আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। বলে উজির রাজাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু বন্যা যদি আসলেই হয়, তাহলে আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভুলে যেয়ো না, আমি একজন জনদরদি রাজা। শুধু মন্ত্রিপরিষদের না, রাজ্যের প্রত্যেক মানুষের সেটা মুখস্থ থাকা উচিত। পাঠশালাগুলোতে পণ্ডিতদের বলে দাও, শিশুদের যেন প্রথম পাঠ হয় এটা।
জি মহারাজ। আমরা ইতিমধ্যে সে ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আপনি যে জনদরদি, সেটা না লিখে একটা শিশুও পাঠশালা থেকে বের হতে পারবে না। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী।
চমৎকার! অতি চমৎকার! এখন জলদি আমার বন্যা-পরিদর্শনের ব্যবস্থা করো। উজিরকে নির্দেশ দিলেন মহারাজ।
পরদিন হাতির পিঠে বসিয়ে মহারাজকে নিয়ে যাওয়া হলো বন্যা-পরিদর্শনে, সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। এক দিন এক রাত যাত্রার পর মহারাজকে নৌকায় তোলা হলো। মহারাজ নৌকায় চড়ে বন্যাকবলিত গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলেন। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও ঘুরে দেখলেন সব। রাজা ও রাজ্যসভার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এই আগমনে বন্যাকবলিত অসহায় মানুষজন আশ্বস্ত হলো। তারা কেউ গাছের ডালে বসে, কেউ ঘরের চালে উঠে, কেউবা গলা ডুবিয়ে জলে, চিৎকার দিয়ে উঠল: জয় মহারাজার জয়! তাদের চিৎকার যেন আকাশবিদারী হয় সে ব্যবস্থা আগে থেকেই সুনিশ্চিত করে রেখেছিলেন রাজার সৈন্যরা।
রাজা বেশ উদাসচিত্তে ফিরে এলেন রাজদরবারে। মহারাজ কী দেখলেন? উজির হাত কচলাতে কচলাতে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি তো কিছুই দেখলাম না উজির। মহারাজ তৃপ্তস্বরে উত্তর দিলেন। তা ছাড়া শুনলে না, রাজ্যের প্রজারা খুশিতে ‘জয়, মহারাজার জয়’ বলে কীভাবে জয়ধ্বনি দিচ্ছিল! মনেই হলো না তারা সাত জন্মে এ রাজ্যে কোনো বন্যা হতে দেখেছে।
আজ্ঞে মহারাজ, আমরাও দেখিনি। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা সমস্বরে উত্তর দিলেন।
তাহলে যে কবিরা কবিতা লিখছেন, গায়েনরা গান বাঁধছেন বন্যাকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে, রাজদরবারের সমালোচনা করে, তাদের কী হবে? প্রধান সেনাপতি প্রশ্ন করলেন রাজাকে।
কবিদের কাজকর্ম, কথাবার্তা কিছুই তো কিছু বুঝি না, উজির। সহজ কথা এতো ঘুরিয়ে ম্যারপ্যাচ করে বলে যে মনে হয় জগতের সবচেয়ে অসুখী প্রাণী ওরা।
জ্বি মহাজার, এ জন্যই রাজকবি রাখা হয়েছে। তিনিই এসব ভাষার ছলচাতুরি আপনাকে খোলসা করে দেবেন।
ঠিক আছে, আমি রাজকবির বক্তব্য শুনতে চাই। মহারাজ বলামাত্রই রাজকবি হাজির। তিনি সর্বদা ছায়ার মতো রাজার সঙ্গে সঙ্গে থাকেন আর রাজার সৌন্দর্য, অঙ্গভঙ্গি, বাক্্পটুতা ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাব্য করতে থাকেন।
মহারাজ, রাজকবি হাজির! কবি নিজেই ঘোষণা দিলেন তার উপস্থিতি।
কবিরা বন্যা নিয়ে কবিতা লিখছে, গান লিখছে গায়েন। কিন্তু আমি তো কোথাও বন্যা দেখলাম না।
আজ্ঞে মহারাজ, আমিও দেখিনি। তবে কয়েকটি কবিতা শোনার সুযোগ আমার হয়েছে।
তাহলে এসব কবিতা কীভাবে লেখা হচ্ছে? কেনো এই মিথ্যাচার? রাজা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন।
মহারাজ, কবিরা কল্পনাপ্রবণ। তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে তাদের কল্পনায় রং চড়ান। কবিরা যা দেখেন, অন্যরা সে কারণে সেসব দেখতে পায় না, মহারাজ। এই কারণে আপনি বন্যা দেখতে পাননি।
দেখার সমস্যা আপনার না, কবিদের। উজির তখন কবিকে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠেন।
আমি যা দেখি না, তা দেখার অধিকার এ রাজ্যে কারও নেই। থাকতে পারে না। মহারাজ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন।
আজ্ঞে মহারাজ, আমরা রাজ্যের সব কবিকে বন্দী করার ব্যবস্থা করছি। প্রধান সেনাপতি বলে ওঠেন।
না, কবিদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো রাজভান্ডার আমার নেই। ওদের সমস্যা যেহেতু দেখার, অন্ধ করে দাও। আমি যা দেখি না, তারা যেন তা দেখার দুঃসাহস না দেখাতে পারে! মহারাজ ঘোষণা দিয়ে আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। দরবারজুড়ে কিছুক্ষণের জন্য নেমে এলো মৃত্যুর নীরবতা।
মুহূর্তেই সমস্বরে চিৎকার: জো হুকুম হুজুর। মহারাজের জয় হোক!
মহারাজের নির্দেশমতো রাজ্যের সকল কবি, শিল্পীর চোখ তুলে নেওয়া হলো। তবে মহারাজ দয়াবান, এ কাজে কবিশিল্পীদের এক পয়সাও খরচ করতে হয়নি, সকল ব্যয়ভার রাজকোষ থেকে বহন করা হলো।
তবুও তো চোখ থেকে যায় দেখার।
একবার, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর রাজ্যের কৃষকরা সব বেঁকে বসল, আর চাষ করবে না। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলাচ্ছে তারা কিন্তু তাদেরই দিন কাটছে অনাহারে। অল্প দামে ফসল কিনে গুদামজাত করে কয়েকগুণ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। তাদের পেছনে আছেন রাজ্যের মন্ত্রীরা। রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো গুদামটা বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাই আর শ্যালকের। কাজ বন্ধ রেখে কৃষকদের আন্দোলন করার খবর পৌঁছে গেল রাজগৃহে। মন্ত্রিপরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকলেন রাজা।
রাজার চোখ যা দেখে না, কৃষকদের চোখ যদি তা দেখতে পায়, তাহলে রাজার সম্মান বলে কিছু থাকে? মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের উদ্দেশ করে চিৎকার করে বললেন মহারাজ ক্রাতিয়া। আমার রাজ্যে খাদ্যশস্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে, আর আমি তার কিছুই দেখতে পেলাম না, এ কেমন কথা?
না, মহারাজ। শুধু আপনি না, মন্ত্রিপরিষদের কেউই কিছু দেখেনি। খাদ্য মজুদের বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব। চক্রান্তকারীদের সেই গুজবে কান দিয়ে মূর্খ কৃষকরা আন্দোলনে নেমেছে। ধীরে নিচু স্বরে ক্ষিপ্ত মহারাজকে বোঝানোর চেষ্টা করেন উজির মহাশয়।
রাজ্যের বড়ো বড়ো আড়ত-গুদামঘর-মজুতখানাগুলো পরিদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, আমি দেখতে চাই মজুদের অবস্থা। মহারাজের তাৎক্ষণিক নির্দেশ। আমি নিজে যাব তদন্তে।
যথারীতি হাতির পিঠে চড়ে রাজ্যের বেশ কয়েকটি মজুতখানা পরিদর্শন করলেন রাজা। বাণিজ্যমন্ত্রীর আত্মীয়দের গুদামঘরেও গেলেন তিনি। মহারাজ বললেন, অন্যায়কারী যেই হোক, ছাড় পাবে না। দিনব্যাপী এই পরিদর্শন ও তদন্তের কাজ শেষ করে রাজবাহিনী ফিরে এলো দরবারে।
কী দেখলেন মহারাজ? উজির প্রশ্ন করলেন। সামনে উপবিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়রা।
কিছুই তো দেখলাম না। মহারাজ জবাব দিলেন।
আমরাও কিছু দেখিনি মহারাজ। মন্ত্রীরা সমবেতস্বরে উত্তর দিলেন।
আমি যা দেখি না, তা দেখার অধিকার আমার প্রজারা কেমন করে পায়? মহারাজ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন।
তারা যাতে আর না দেখে, আশু সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, মহারাজ! আপনি শান্ত হোন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সামনে এসে বললেন। মন্ত্রিপরিষদের সচিবকে তিনি সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিলেন: দেশের সমস্ত কৃষক, আন্দোলনকারী ও আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়া লোকজনের তালিকা করে রাজদরবারে পেশ করা হোক, আজই, এক্ষুণি।
তালিকা প্রস্তুত।
মাস তিনেকের মধ্যে তালিকা ধরে ধরে কৃষক প্রজাদের না দেখার ‘ব্যবস্থা’ বাস্তবায়ন করা হলো।
তবুও তো চোখ থেকে যায় দেখার।
মহারাজ মহা আনন্দে রাজ্য পরিচালনা শুরু করলেন। তার রাজ্য সুখের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। মানুষের অভাব-অনটন বলতে কিছু নেই। দুর্নীতি নেই। হানাহানি বিবাদ নেই। উন্নয়ন আর সমৃদ্ধিতে ভরে গেছে রাজ্য। উন্নয়নের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে মন্ত্রী, সচিবরাও। প্রজাদের দিক থেকেও আর কোনো অভিযোগ শোনা যায় না। রাজ্যের উন্নয়ন, আইন ও সুশাসন প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে...।
এরিমধ্যে পাঠশালার পণ্ডিতরা যখন শিশুদের উন্নয়নের সিলেবাস পাঠদানে ব্যস্ত, তখনই ঘটে গেল রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো দুর্ভিক্ষটা। এক বছর ভয়াবহ বন্যা, পরের বছর তীব্র খরা। খাদ্যসংকটে সাধারণ প্রজাদের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। রাজার রাজ্যনীতির সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠলেন সচেতন প্রজারা, বুদ্ধিজীবীরা, ছাত্রজনতা। উদ্বিগ্ন হয়ে জরুরি সভা ডাকলেন মহারাজ ক্রাতিয়া।
আমার রাজ্যে দুর্ভিক্ষ, না খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে শয়েশয়ে, অথচ আমি কিছুই জানি না। মহারাজ চিৎকার করে উঠলেন।
আজ্ঞে মহারাজ আমরাও কিছু জানি না। মন্ত্রীরা সমস্বরে জবাব দিলেন।
যদি সত্যিই এমন কিছু ঘটে থাকে, তোমাদের কাজ সর্বপ্রথম আমাকে জানানোর। মহারাজ মেজাজ চড়িয়ে বললেন।
নিশ্চয় মজারাজ। আমরা সব সময় সেটাই করে এসেছি, এবং আগামীতেও সেটা করে যাবো। সত্য হলো, যা বলা হচ্ছে, তেমন কিছুই আমরা দেখিনি মহারাজ। সবাই সমবেত কণ্ঠে জবাব দিল।
যা আমি দেখিনি, যা আমার বিজ্ঞ মন্ত্রীরা দেখেনি, তা দেখে রাজ্যে কার এমন সাধ্য? রাজা ক্রাতিয়া বাঘের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন।
এসবই রাজ্যের বুদ্ধিজীবীদের চক্রান্ত। তারাই আপনার বিরুদ্ধে প্রজাদের খেপিয়ে তুলছে। রাজ্যে অভাব, অনটন, দুঃশাসন, বৈষম্য নিয়ে মুখরোচক গল্প তৈরি করে সাধারণ মানুষকে শোনাচ্ছে। কিছু কিছু পণ্ডিতও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। অশিক্ষিত সাধারণ প্রজারা তাদের বানোয়াট গল্প বিশ্বাস করে দুর্ভিক্ষের যন্ত্রণা পোহাচ্ছে, মহারাজ। উজির ঠান্ডা মাথায় কথাগুলো বুঝিয়ে বলেন রাজাকে।
এই বুদ্ধিজীবীরা কারা? এই রাজ্যের বড়ো বড়ো সব বুদ্ধিজীবী, পণ্ডিতকে তো আমি নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে লালনপালন করে যাচ্ছি, ভরণপোষণ করছি। তাদের এখনই ডাকা হোক।
রাজার নির্দেশ অমান্য করে কার সাধ্য! ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রাজদরবারে রাজ্যের প্রখ্যাত সব জ্ঞানী-গুণী হাজির। অধিকাংশ বয়সের ভারে ন্যুব্জ, স্বচ্ছ সফেদ পোশাক পরা। চর্বি জমেছে শরীরী ও মগজে। রাজার সামনে নতজানু হয়ে বসলেন সবাই।
আমার রাজ্যে নাকি দুর্ভিক্ষ হচ্ছে? মহারাজ প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন।
জি মহারাজ, আমরা শুনেছি, কিন্তু সচক্ষে দেখিনি। রাজ্যের জ্ঞানী-গুণী গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সমবেত কণ্ঠে উত্তর দিলেন।
তাহলে কারা দেখেছে? যা আমি দেখি না, আমার মন্ত্রীরা দেখে না, আমার বুদ্ধিজীবীরা দেখে না, কার এত বড়ো সাহস তা দেখার?
রাজার এই প্রশ্নে কাঁপতে কাঁপতে তার পালিত বুদ্ধিজীবীরা বললেন, মহারাজ, রাজ্যে কিছু বেয়াদব বুদ্ধিজীবীর জন্ম হয়েছে। তারাই এসব দেখেছে বলে সবখানে রটিয়ে বেড়াচ্ছে। সাধারণ প্রজারা এখন তাদের সঙ্গে তাল দিয়ে ভুখানাঙ্গার অভিনয় করে যাচ্ছে। দেখে মনে হবে বাস্তব, আসলে সব তাদের অভিনয় আর ভাঁওতাবাজি। মহারাজ, আমরা যেহেতু কিছু দেখি না, আমরা এর বেশি কিছু জানি না।
তাহলে যারা দেখে তাদের ব্যবস্থা করা হোক। তারা উচ্ছৃঙ্খলকারী, তাদের কারণে রাজ্যে শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে। এই রাজ্যে আমি যা দেখি না, আমার মন্ত্রীরা যা দেখে না, আমার বুদ্ধিজীবীরা যা দেখে না, তা যাতে আর কেউ দেখতে না পারে....! আমার আদেশ এটা।
জি হুজুর। বুদ্ধিজীবীরা বললেন।
আজ্ঞে মহারাজ। উজির বললেন।
যথার্থ মহারাজ। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা বললেন।
মহারাজের জয় হোক। উপস্থিত সুধীসমাজ সমস্বরে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল।
অতঃপর...
মহারাজ যা দেখে না রাজ্যের কেউ আর এখন তা দেখে না। মন্ত্রীরা দেখে না, বুদ্ধিজীবীরা দেখে না, কবি-লেখকরা দেখে না, কৃষকরা দেখে না, মজুররা দেখে না। বৃদ্ধরা দেখে না, দেখে না তরুণরাও। এবং বছরের পর বছর দেখতে না পাওয়া প্রজাদের ঘরে অন্ধ না হয়েও অন্ধত্ব নিয়ে জন্ম নিতে থাকে শিশুরা।
আহা, সময়মতো কেউ যদি সাহস করে বলত, মহারাজ আপনি তো জন্মান্ধ, আপনি কিছুই দেখেন না! আপনি দেখতে পান না! এই বলে এক অন্ধ ফকির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাজ্যের চারপাশে ঘুরপাক খেতে থাকে।


0 মন্তব্যসমূহ