
ইংরেজি থেকে অনুবাদ : © শুভদীপ বড়ুয়া
সেই রাতে ঝোড়ো বাতাসে বেদানা গাছটি তার সবগুলো পাতা খুলে ফেলে দিল। পাতাগুলো গাছের গোড়ায় জমেছিল গোল করে। সকালবেলায় গাছটিকে নগ্ন দেখে কিমিকো অবাক হয়েছিল, আরও আশ্চর্য হয়েছিল পাতাগুলোর নিখুঁত গোল হয়ে ঘিরে থাকা দেখে। তার হয়তো আশা ছিল যে ঝোড়ো বাতাসে পাতাগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে থাকবে। আর একটা বেদানা, খুব সুন্দর দেখতে, গাছের ঠিক পেছন দিকটায় পড়েছিল।
‘এসো একবার, দেখে যাও।’ সে চিৎকার করে তার মা’কে ডাকে।
‘ওঃ আমি ভুলেই গেছিলাম।’ তার মা মুখ বের করে একবার গাছটার দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই রান্নাঘরে ঢুকে পড়েন। ব্যাপারটা কিমিকো-কে আবার একাকিত্ব নিয়ে ভাবিয়ে তুলল। কোনও এককালে উঠোন ছেয়ে থাকা বেদানা গাছের মতোই যা একলা এবং বিস্মৃত।
দু-সপ্তাহ কী ওরকম কিছুদিন আগের কথা, কিমিকো-র সাত বছরের ভাইপো এসেছিল বাড়িতে। এসেই তার বেদানা গাছের দিকে নজর পড়েছিল সবার আগে। তরতর করে উঠে গেল সে, পাতা-ডাল সব চটকে হ্যাজর-ভ্যাজর করে দিল। আর কিমিকো-র মনে হচ্ছিল গাছটা যেন ভরপুর জীবনের মধ্যে বেঁচে রয়েছে।
‘ওপরে তাকিয়ে দেখো, একটা বিরাট বেদানা ধরে রয়েছে।’ সে উঠোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিল।
‘দেখেছি, কিন্তু ওটা পেড়ে ফেললে আমি আর নেমে আসতে পারব না!’
ব্যাপারটা সত্যি। দু-হাত ভরে বেদানা নিয়ে গাছ বেয়ে নেমে আসাটা মোটেও সহজ কথা নয়। হাসল কিমিকো। ছেলেটার সবটুকুই তার প্রিয়। কাজেই সে আবার না আসা পর্যন্ত তাদের বাড়িটা বেদানা গাছটাকে ভুলে থাকবে। ঠিক যেমন এই মুহূর্তে ভুলে রয়েছে বেমালুম। তাই হয়তো ফলগুলো এতকাল পাতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। আজ আকাশ পরিষ্কার হতে স্পষ্ট হচ্ছে ব্যাপারটা।
পাতার গোলাকার স্তুপের আড়ালে জমেছিল ফলের আধিক্য, কিমিকো একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পাতাগুলো সরাতেই তারা বেরিয়ে পড়ছিল। এতটাই পাকা যে বীজগুলো ভেতর থেকে ফলটাকে ফাটিয়ে দিয়েছে যেন। কিমিকো ওগুলোকে উঠোনের এক ধারে সরিয়ে রাখতেই সূর্যের আলোয় ঝলসে উঠল। রশ্মিগুলো যেন ওদের দেহ ভেদ করে ওপারে চলে যেতে চাইছে।
কিমিকো-র কেন জানি খুব ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করছিল। দশটা নাগাদ দোতলায় সে যখন সেলাই-ফোঁড়াই নিয়ে ব্যস্ত, কেইকিচি-র গলা শুনতে পেল সে। সদর-পথে তালা দেওয়া নেই, তবু সে বাগানের দিকটায় ঘুরে আসছে কেন কে জানে। তবে গলা শুনে মনে হয়, একটু তাড়ায় রয়েছে সে।
‘কিমিকো কদিন ধরেই বলছিল যে ও তোমাকে যাবার আগে ঠিক কীভাবে দেখতে চায়—’ মা’য়ের গলা শুনতে পেল সে। কেইকিচি যুদ্ধে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কথা হচ্ছিল। ‘এদিকে তুমি আমাদেরকে নেমন্তন্ন করনি যে আমরা গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করে আসতে পারি, তুমি নিজেও আসছ না। ভালোই হল, তুমি আজকে এলে।’
মা তাকে দুপুরের খাওয়া সেরে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু সে ছিল খুবই তাড়ার মধ্যে।
‘ঠিক আছে, তাহলে একটা বেদানা খেয়ে যাও অন্তত। আমাদের বাগানে ফলানো।’ বলেই মা আবার কিমিকো-র নাম ধরে ডাকতে শুরু করে দিলেন।
সে বিস্মিত হয়ে চেয়েছিল তার দিকে, অর্থাৎ একজনের সিড়ি বেয়ে নেমে আসার জন্য আরেকজন আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে পারে। আর সে সিড়িরই কোনও এক ধাপে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
তাকে দেখতে পেয়ে চোখের ভেতর একরকম গরম বোধ হচ্ছিল তার, আর বেদানাটা হাত ফসকে পড়ে গেল।
কিমিকো মনে করল যে সে হাসছে, ভাবতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। উঠোনে এসে দাঁড়াল কেইকিচি। ‘সাবধানে থেকো কিমিকো।’
‘তুমিও।’
ততক্ষণে সে পেছন ফিরে হাঁটা দিয়েছে, আর তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বিদায় জানাচ্ছে। সে চলে যাওয়ার পর কিমিকো অনেকক্ষণ বাগানের দিকে চেয়েছিল।
‘ছেলেটা এত তাড়াহুড়োয় ছিল—’ মা বলল, ‘আর বেদানাটাও এত ভালো ছিল।’
সে বেদানা-টা উঠোনের ওপর রেখে গিয়েছে।
এমনি এমনি ওটা তার হাত থেকে পড়ে যায়নি, সবে বেদানাটা দু-হাতে ছাড়াতে চেষ্টা করছে সে, তখনও দু-ভাগ হয়ে যায়নি ফলটা, দুয়েকটা বীজ সবে বাইরে বেরিয়ে এসেছে, ঠিক ওই সময়ে তার চোখের ভেতর যেন গরম ভাপ ঢুকছিল। তাই ফলটা আর ছাড়ানো হল না তার। সে ওটা ওমনি রেখে গিয়েছে উঠোনে। গুটিকয় বীজ বাইরে বেরিয়ে আসা অবস্থায় এখনও উঠোনে পড়ে রয়েছে।
মা ওটাকে তুলে এনে ভালো করে ধুয়ে তার হাতে তুলে দিলেন। কিমিকো-র ভ্রূ কুঁচকে গেল, খানিকক্ষণ ওভাবেই রয়ে গেল। আবার সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তারপর খানিক দ্বিধা নিয়েই যেন সে ওটা হাতে নিল।
কেইকিচি বোধহয় একধার থেকে কিছু বীজ খুবলে নিয়ে গিয়েছে।
মা সামনে বসে, তাই কিমিকো-র পক্ষে কোনোভাবেই ব্যাপারটাকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। তবে সে খাচ্ছিল না। উদাসভাবে তার আঙুলগুলো ফলটার ভেতরে নড়াচড়া করছিল। তার মুখের ভেতরটা নোনতা স্বাদে ভরে উঠছিল। এক বিমর্ষ রকমের আনন্দ অনুভব করছিল সে, যা এরই মধ্যে তার দেহের অনেকটা গভীরে প্রবেশ করে গিয়েছে।
একঘেয়ে লাগছিল, তাই একসময়ে উঠে দাঁড়ালেন মা।
তারপর আয়নার সামনে গিয়ে বসে পড়ে বললেন “আমার চুলের হাল দেখেছ? একবার তাকিয়ে দেখো। আমি কিন্তু এই বিশ্রী খোপা নিয়েই কেইকিচিকে বিদায় জানিয়েছি।’
কিমিকো চিরুনি চালানোর শব্দ পেল।
‘তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে—’ মা খুব কোমল স্বরে বললেন, ‘আমি চুলে চিরুনি দিতেই ভয় পেতাম। খালি মনে হতো, মাথায় চিরুনি চালালেই আমি ভুলে যাব এতক্ষণ কি করছিলাম আমি। তারপর মনে পড়ে গেলে ব্যাপারটা ঠিক তোমার বাবার মতো হবে, যে নিজের কাজটুকু শেষ করার পর অধীর অপেক্ষায় রয়েছে আমার— কখন আমি আমারটুকু শেষ করব, তবেই কাজটা পুরোপুরি শেষ হবে।’
কিমিকো-র মনে পড়ে গেল, বাবার খাওয়া শেষ হয়ে গেলে থালাতে যা কিছু পড়ে থাকত, মা সেগুলোও খেতেন। হঠাৎ মা-কে কাছে পেতে ইচ্ছে করে তার, মনটা খুশি হয়ে যাওয়াতে চোখ দুটো জলে ভরে ওঠে। তার মনে হয়, মা তার হাতে বেদানাটা উদাসভাবে তুলে দিয়েছিল শুধু এই কারণেই যাতে ওটাকে বাইরে ফেলে দিতে না হয়। কোনো কিছুকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলাটা তারা দীর্ঘকালের অনভ্যাসে পরিণত করেছে।
তার এই একান্ত খুশি খুশি ভাব দেখে সে লজ্জা পেল, মায়ের সামনে বলে একটু বেশিই পেল। সে ধরে নিল, এটাই ভালো হল। কেইকিচি যা ভেবেছিল তার চাইতেও ভালো করে বিদায় জানানো হল তাকে, নয়তো জীবনের এক লম্বা সময় ধরে তার ফিরে আসার অপেক্ষায় থেকে যেতে হতো।
সে মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। কাগজের দরজা পার হয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে, যেখানে আয়নার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন মা।
একটু দ্বিধাগ্রস্ত। হাতে ধরে সেই বেদানা-টা। কামড় দেবেন কি দেবেন না, বুঝে উঠতে পারছেন না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ : © শুভদীপ বড়ুয়া, ২০১৩
সূত্রঃ Contemporary Japanese Literature, edited by Howard Hibbett, Translated by Edward G. Seidensticker, (New York: A.A. Knopf, 1977)
অনুবাদক পরিচিতিঃ শুভদীপ বড়ুয়া - যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্নাতক। সাহিত্যে প্রবেশ 'সন্দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত 'চাকা' (১৯৯৩) গল্পের মাধ্যমে। বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছেন প্রায় শতাধিক ছোটগল্গ, প্রবন্ধ এবং অনুবাদ সাহিত্য। প্রকাশিত বই 'আলোকবিদ্ধ অন্ধকার' (২০০০) একটি অনুগল্পের সংকলন। 'নিঃশব্দ পাহাড়' লেখকের প্রথম বড় উপন্যাস, যার রচনাকাল ২০০১ থেকে ২০১৪। উপন্যাসটি তিন খণ্ডে সমাপ্ত।


0 মন্তব্যসমূহ