চন্দন মল্লিক বাজারে বেরতে গিয়ে দাঁড়াল। কার ফোন এল? এসে ভালো হয়েছে। ফোন নিয়ে বাজারে যায় সে। ফেলেই যাচ্ছিল। ফোন থেকে দাম মেটায় বাজারে। রসিক চন্দন বলে, ফ্রি কিনছে। তার অ্যাকাউন্ট থেকে মাছ, মুদি, লাউ কুমড়ো বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে যায়। টাকা দেখা যাচ্ছে না, শূন্যে চলাচল করছে। খুচরো নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। খুচরোই নেই। খুচরো টাকা নয়, সিকি, আধুলি আনি, দুয়ানি, দু আনি, একানি, দশ পয়সা, বিশ পয়সা, পঁচিশ পয়সা, পঞ্চাশ পয়সা। এসব উঠে গেছে বহুদিন। পাঁচ টাকা কিংবা এক টাকার নোট নেই। কয়েন। কালে ভদ্রে বাজারে মুখ দেখায় কাগুজে নোট।
মহামারীর পর এইসব হয়েছে। মহামারীর পর কী হয়েছে? অনেক কিছু। মহামারীর আগের চুরি সব ধরা পড়ে যাচ্ছে, মহামারীর পরে। চন্দন কবিতা লেখে। কয়েকটা বই আছে। তার কবিতা চুরি হয়ে গেছে কয়েকবার, আবার সে ধরা পড়েছে বার তিনেক। কী করে যে হয়, চন্দন বুঝতে পারে না। কার কবিতার স্মৃতি তার কবিতায় প্রবেশ করল, তাও বুঝতেই পারেনি চন্দন। ফোনে কবি বন্ধু নির্মল। সে বলল, চন্দন, তোর কবিতায় আমার লাইন হুবহু ঢুকল কী করে?
আবার সেই অভিযোগ। পৃথিবীতে কত নতুন লাইন আর লেখা হবে, কারো সঙ্গে কারো মিলে যাবেই। কথাটা তার নয় এক তরুণ উপন্যাসিকের। তার উপন্যাসে বিখ্যাত এক লেখকের প্রথম জীবনের উপন্যাসের কয়েক পংক্তি হুবহু দেখা গেছে। সুতরাং চন্দন বলল, তাই, আমি তো জানি না।
-হ্যাঁরে, তোর বই পড়তে পড়তে আবিষ্কার করলাম, আচমকা মনে হল চেনা লাইন, বারবার পড়ে অমিল পেলাম না ।
চন্দন বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না এমন হচ্ছে কেন, না পড়তেই পারতিস?
নির্মল বলল, চন্দন তোর নামে এমন অভিযোগ কয়েকবার হল।
চন্দন মল্লিক বলল, কিছু করার নেই, কোথা থেকে কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না, তুই বল অদৃশ্য মুদ্রা চলাচলের মতো হয়ে যাচ্ছে সব। এক কবিতার পংক্তি অন্য কবিতায় গিয়ে ঢুকছে। এইটা আমার কবিতার একটি লাইন হবে, নিয়ে নিস না।
-কী যে বলিস, কেন নেব?
-তুই নিবি না, কিন্তু কেউ কেউ পেয়ে যাবে, নিয়েও নেবে।
-কী করে পাবে, আর নেবেই বা কী করে ?
-ফোন পে যেভাবে যায়। বলে চন্দন মল্লিক লাইন কেটে দিয়ে ফোন সমেত বেরোল। তার কবিতায় কার কবিতা মিলেছে, তাতে তার কিছু করার নেই। মহামারীর পর এমন হয়ে থাকে। অদ্ভূতুড়ে কাণ্ড। মহামারীর আগে যে হত না তা নয়। দখিনা হাওয়ায় ধাক্কা খেয়ে তিনতলা থেকে নীচে পড়ে গেল একজন। মৃত্যু।
মহামারী গেছে দু’বছর। সেই সময়ে রাশিয়া ইউক্রেনের ভিতর যে যুদ্ধ বেঁধেছিল, তা চলছে। যুদ্ধবাজরা মহামারীর তোয়াক্কা করেনি। কখনো থামে, ক’দিন বিরতি হয়, তারপর আবার মিসাইল এসে পড়ে মানুষের ঘরবাড়িতে। এ ব্যতীত নতুন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। চন্দন মল্লিক ভাবছিল, এমন হওয়া ঠিক নয়, এখন যদি নির্মল লেখে ফেসবুকে, তার মান চলে যাবে। নির্মল লিখবে না। সব কিছু লিখতে নেই। শতং বদ, মা লিখ। নির্মল খুব সিওর নয় যে চন্দন মল্লিক তার লাইন ঝেঁপে দিয়েছে। অমিল পাচ্ছে না। পেয়ে যাবে। তবে কী, প্রতিদিন নতুন নতুন সংবাদ আসে, আগের সংবাদ হারিয়ে যায়, নতুন সংবাদ জন্ম নেয়। চন্দন মল্লিক মনে করতে চাইল, নির্মলের নামে কী অভিযোগ হয়েছিল। নারী ঘটিত। নির্মল তখন সাময়িক বিশ্রামে গিয়েছিল ফেসবুক ছেড়ে। সে নাকি কাউকে কাউকে জ্বালাতন করত গভীর রাতে। তারপর নির্মল সাবধান হয়ে গেছে। একা মানুষ, কবিতা আএ বই নিয়ে থাকে, তাই অমন মনোবৈকল্য। এখন সে প্রকৃত নির্মল এবং পবিত্র। সেই তরুণী কবি বিদেশে চলে গেছে বিয়ে করে। কবিতা আর বিদেশের রম্য ছবি পোস্ট করে। চন্দন ভাবে, নির্মলের কিংবা সেই তরুণীর কবিতায় কি তার নিজের কবিতা ঢুকে গেছে? চেক করা হয়নি। সময় কই যে উকুন বাছবে?
চন্দন ফোন নিয়ে বেরতে উকিলের সঙ্গে দেখা। শ্যামল উকিল বলল, দাদা, জামিন পাবে?
-তুমি উকিল, আমাকে জামিনের কথা জিজ্ঞেস করছ?
-আমি তো একজনের জুনিয়র হয়েই আছি, বড় বড় কেসে বড় বড় লইয়ার।
-কার কথা বলছ?
শ্যামল বলল, সেই যে এক সাঁওতাল জনজাতি কন্যা ধর্ষিতা হল?
-কোথায় হল বলতো?
-মফসসলে এমন কত হচ্ছে, কলকাতা খোঁজ রাখে না। শ্যামল বলল, এইটা ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির কেস, মা বাবাকে বেঁধে রেখে, মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে মেয়েটাকে রেপ করে চলে গেল, অপরাধীকে ধরেছিল পুলিশ, দেরি হলেও ধরেছিল জঙ্গলমহলে অশান্তি ঘনিয়ে উঠতে, জামিনের চেষ্টা করছে শয়তানটা, এবং পেয়ে যাবে, বাপের টাকা আছে আর রাজনৈতিক আশ্রয় আছে।
- সব মনে থাকে না, হ্যাঁ এমন হয়েছিল বটে।
-আমাদের মনে রাখতে হয়, কেস স্টাডি করতে হয়।
চন্দন বুঝল সকালের বারোটা বাজল। বলল, জামিন পেতে পারে, না পেতেও পারে। কত ভাববে, এইরকম ঘটে অহরহ। তা নিয়ে মাথা ব্যথা করে কিছু হবে না। না ভাবলে বেশ ভুলে যাওয়া যায়। যে মেয়েটি খুন হয়েছিল হাসপাতালে, তার কী হল, বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, আসল অপরাধী ধরা পড়েছে? ভুলে যাচ্ছে চন্দন মল্লিক। ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক, তার স্মৃতি থেকে মুক্ত হয়ে সে শূন্যে চলাচল করছে টাকার মতো। কেউ দেখতে পাচ্ছে না, অথচ দেওয়া নেওয়া, স্মৃতি বিস্মৃতি ঘটে যাচ্ছে।
চন্দন মনে করতে চাইল একটু আগে কী বলেছে নির্মল দত্তকে। সেই লাইনটা না লিখে রাখলে কবিতা হবে না। সে দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার ধারে, মোবাইল ফোনের নোট প্যাডে লিখবে বলে মনে করতে চাইল, অদৃশ্য মুদ্রা…। লিখতে লিখতে অন্য লাইন লিখল। অদৃশ্য মুদ্রায় ভরে আছে আমার সিন্দুক, অদৃশ্য খুনে লাশ নেই, খুনি নেই, তবু জেনে গেছি, রক্তপাতে মৃত্যু হয়েছিল তার। ‘তার’ হবে, না ‘কারও’?
বাজারে পা দিতেই লম্বা উটের মতো গলা বাড়িয়ে শান্তনু গুপ্ত বলল, এই যে চন্দন, আমি জানতে চাই, কবিতা আর মহাকবিতার পার্থক্য কী?
শান্তনু দুর্গাপুর থেকে পাকাপাকি চলে এসেছে কলকাতায়, নিজের পাড়ায়। কাজ করত ইস্পাত কারখানায়। আজ সেই গলানো লোহা, ইস্পাতের কথা না বলে কবিতার কথা। সে কি গোপনে কবিতা লেখে? বলেনি তো। গলন্ত ইস্পাত শীতল হয়ে গেছে?
শান্তনু বলল, গতকাল ডি ডি-বাংলায় শুনলাম কথাটা, এইটা কি ভারত আর মহাভারত যেমন, তেমন?
চন্দন বলল, ভারত তো সব মিলে, ভারত নামে আলাদা জায়গা নেই, কিন্তু মহাভারত ঘরে ঘরে আছে।
শান্তনু বলল, আমার কথার জবাব হল না, কবিতা আর মহাকবিতার তফাত কী?
-একদিন এস, মহাকবিতা শোনাব, পুরোন প্রোগ্রাম রি টেলিকাস্ট করেছে?
-হ্যাঁ মনে হয়, তুমি ছিলে, তোমার গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি, এইটা কি সেইটা?
-হুঁ, সেইটা, আট বছর আগের।
-মহামারীর আগের?
-হ্যাঁ, তাই তো জানি।
-আচ্ছা গতকাল অনুষ্ঠানে একজন ইয়াং ছিল, দারুণ কবিতা পড়ল, ভয় করে, আমার ভয় করে…।
-মনে হয় সমদর্শী, বেঁচে নেই। বলতে গিয়ে বিষণ্ণ হল চন্দন।
-বেঁচে নেই! অবাক হল শান্তনু, বোঝা গেল না তো?
শান্তনু যত না অবাক হয়েছে, তার চেয়ে সে বেশি, বলল, টিভিতে উত্তমকুমারের সিনেমা দেখে মনে হয় তিনি বেঁচে আছেন?
শান্তনু বলল, উত্তমের মৃত্যু আমার জানা, আমি গিয়েছিলাম শ্মশানে, কিন্তু সমদর্শী কবে চলে গেলেন, ইয়াং, কোভিডে ইয়াং মারা গেল, আমি জানি এজেড ম্যান মারা গেছে বেশি, আর যাদের কো মরবিডিটি ছিল।
না, কোভি্ড নয়। সাল মনে করতে চাইল চন্দন। সতের না আঠের? আঠেরই হবে, এইটা টেলিকাস্ট হয় সতেরর নভেম্বরে, তার ছমাস বাদে আঠেরর এপ্রিলে মারা যায় সমদর্শী। মৃত্যু রহস্যময়। পুলিশ বলল, আত্মহত্যা। কিন্তু কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। এখনও মনে হয় সমদর্শী সুইসাইড করেনি। খেলার ছলে তাকে মেরে দেওয়া হয়েছিল। তার বাবা মা থাকেন বসিরহাট। তাঁরা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের একটি মেয়ে আছে। অভিযোগ করতে করতে, একজনকে অভিযুক্ত নির্ণয় করতে করতে চুপ করে গিয়েছিলেন আচমকা। ভয় পেয়েছিলেন। শান্তনু এসব জানে না। জানার কথাও নয়। সমদর্শীকে টিভিতেই প্রথম দেখেছে গতকাল।
শান্তনুর কথায় মন খারাপ হয়ে গেল। বাজারে মন বসল না। মাছ কেনার ছিল না। ডিম, ফল আর কিছু সবজি নিয়ে ফিরে এল চন্দন মল্লিক। বাড়িতে এসে স্ত্রী তনিমাকে বলল, সমদর্শীর কথা মনে আছে?
-কেন, কিছু হল মানে সেই হত্যা না আত্মহত্যা?
-না গতকাল ওকে ডি ডি বাংলায় দেখিয়েছে। নিজের কথা বাদ দিয়েই বলল চন্দন। তনিমা চুপ করে থাকে। বুঝতে চেষ্টা করে টিভিতে কেন দেখাল। তনিমার মনেই নেই সেই প্রোগ্রামের কথা। তরুণ কবি আর ধারালো গদ্যের লেখক সমদর্শীকে চিনত তনিমা। জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছিল বল তো, ভুলে গেছি ?
মাথা নাড়ে চন্দন। খবরে প্রকাশ সেদিন সদ্য চৈত্রের উত্তাল দখিনা বাতাস উঠেছিল। ঝাপটা দিচ্ছিল। সেই ঝড়ো বাতাসের ঘায়ে হোস্টেলের তিন তলার বারান্দা থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল কবি সমদর্শী। বলল, বোঝা যায়নি।
-পুলিশ বুঝতে পারল না?
-খেলার ছলে ধাক্কা মনে হয়, যাকে সন্দেহ, সে বিদেশ চলে গেছে হাত ধুয়ে।
তনিমা বলল, খুব বড়লোক!
-মনে হয়, ফ্যামিলিতে দুটো আই এ এস, একটা আই পি এস, আগে আর একটা কিছু করেছিল শোনা যায়, সেই মেয়েটি সুইসাইড করে মেট্রো রেলে, তার সুইসাইড নোটে সেই অধীশের কথা ছিল, কিন্তু চাপা পড়ে গেল সব।
-তাকে তুমি চিনতে?
-চিনতাম,এ ফ্ল্যাটেও একবার এসেছিল, না চিনলে আসবে কেন, টিভি প্রোগ্রাম করেছিলাম এক সঙ্গে।
-তুমি কার কথা বলছ, সেই ছেলেটি এসেছিল, আই এ এস, আই পি এস রিলেশন?
-না না, সমদর্শীর কথা, সে এসেছিল।
-আমি অন্যটির কথা জিজ্ঞেস করছি, সে কেমন ছেলে ছিল?
-সমদর্শী ভালো কবিতা লিখত, অধীশের বিপক্ষে ছিল শুনেছি।
-উফ, তা আমি জানি, সেই অধীশ কি ভয় দেখিয়েছিল সমদর্শীকে?
চন্দন বুঝল, একটার ভিতরে অন্যটা ঢুকে যাচ্ছে। আসলে সে যা বলতে চায়, তেমন প্রশ্ন করছে না তনিমা। নিজের পছন্দ মতো হলে একের কথার ভিতরে অন্যে প্রবেশ করে না। একের কবিতার ভিতরে অন্যের, একজনের ভয়ের ভিতরে অন্যের ভয় ঢুকে যায় না। সে বলল, বুঝতে পারিনি, আভিজাত্যের ছাপ ছিল, একটু রাফ, সকলকে তুচ্ছ মনে করত, সমদর্শীর কবিতার খাতা ছিঁড়ে দিয়েছিল। এই নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল।
-সত্যি খেলার ছলে, এসব ঘটনা হয়, তার জন্য এতটা হবে?
-শুনেছিলাম, তখন ভিডিও করা হত না, কেউ কেউ দেখেছিল তো, দেব ধাক্কা, দেব, দেব?
-উফ, থামো।
চন্দন বলল, মা বাবা পর্যন্ত চুপ করে গেল, তবে শুনেছি টাকা নেয়নি তাদের কাছ থেকে, তার ফলে ছেলেটা বিদেশ চলে গেল।
সকালটা খুন জখম নিয়ে ভারী হয়ে গেল। কী চমৎকার অদৃশ্য মুদ্রার চলাফেরা দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর নির্মলের ফোন এবং তার কবিতার সঙ্গে মিল, এই অভিযোগ। মাথায় নতুন লাইন চলে আসা। জানাল দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে চন্দন।
দুই
নির্মল বিকেলে ফোন করল, বলল, চন্দন, সকালবেলার কথায় রাগ করো না, আমার ভুল হয়েছে।
চন্দন বলল, আমি জানি না সত্যিই যে কীভাবে অন্যের ভাব আর আমার ভাব মিশে যায়।
নির্মল বলল, এখানে মেশেনি, ওসব লাইন আমার নয়।
-তাহলে কার?
-তোমার বইয়ে তোমার ছাড়া কার হবে?
চন্দন বলল, কার হবে আমিও জানি না, আজ একটা কবিতা এসেছে মাথায়, লেখা হবে কি না জানি না।
নির্মল বলল, চন্দন, গতকাল তোমাদের সেই প্রোগ্রাম ছিল ডি ডি বাংলায়, মানে আবার দেখিয়েছে, সমদর্শীকে দেখে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল, কথাটা কি সত্যি?
-জানি না।
নির্মল বলল, গতকাল আমাকে কস্তুরী জিজ্ঞেস করল।
-কে কস্তুরী?
-অমিতেশদার মেয়ে, কবিতা ও গল্প লেখে, বলল, কী হয়েছিল, পুলিশ কী স্টেপ নিয়েছিল?
-বললাম তো জানি না।
নির্মল বলল, সেও জানে না বলেছে। কিন্তু বলার পর মনটা এত খারাপ হয়ে গেল। ঘটনাটা সত্যি, খেলার ছলে তাকে ধাক্কা মে ধাক্কা করতে করতে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল সে। তার নাম অধীশ চক্রবর্তী। সমদর্শী মণ্ডল মরেই গেল। কস্তুরী জানতে চাইছিল, ও একটা লেখা লিখবে, কবির মৃত্যু।
-লিখে কী হবে?
নির্মল বলল, সে-ও সেই কথা বলেছিল, কিন্তু কস্তুরী বলল, আমরা কেন কিছু বলিনি, সে ছাড়বে না।
চন্দন বলল, আমরা কী বলতাম, সঠিক জানিই না।
-কস্তুরী বলল, যা জানি তা বলতে, বাবা মা আর বোনের খোঁজ চাইছে, বসিরহাটে গিয়েছিল সে, তারা থাকেন না সেখানে।
-তাহলে কোথায় গেছেন? চন্দন জিজ্ঞেস করে।
-কেউ বলতে পারল না।
-কেউ না কেউ তো জানবে।
নির্মল বলল, জানে না মনে হয়, ওরা ভয় পাচ্ছিল, ওদের কেউ নজরে রাখছে বলত, টাকা না নেওয়ায় ওরা ভেবেছিল সুযোগ বুঝে বাবা মা কিংবা সমদর্শীর বোন কেসটা খুঁচিয়ে তুলবে।
চন্দন বলল, আর ভেবে লাভ নেই।
-কস্তুরী তোমার কাছে আসবে চন্দন, আচ্ছা আমার লেখায় কি কারো ছায়া আছে?
চন্দন বলল, সমদর্শীর ছায়া আছে।
নির্মল চুপ করে থাকে, তারপর বলে, আচ্ছা এই যে ইজরায়েল এক একটা শহর ধ্বংস করছে, কেন করছে?
-এমনি, ধ্বংস করতে ভালো লাগে, মারব মারব, মেরে থেতলে দেব, ধাক্কা মেরে ছাদ থেকে ফেলে মেরে দেব, খেলার ছলে খেলার ছলে।
কস্তুরী অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছে কিছু একটা খুঁজে বের করতে, মৃত্যু রহস্যের কিনারা করতে, লিখবে, কিন্তু এখনও কেউ মুখ খুলছে না।
-জানে না কেউ, ভুলে গেছি আমরা সকলে, গতকাল মহাকবিতা আর কবিতার সেমিনার টেলিভিশনে দেখাতেই সমদর্শী জেগে উঠল। সেই যুবক স্যোসাল নেটওয়ারকিং সাইটে রয়েছে অন্য নামে। নজরে রাখছে কে কী বলছে।
-কোন নামে আছে?
চন্দন বলল, ছিল কোন নামে আছে জানি না।
কিছু সময় কথা বলল তারা। মানুষমারার প্রথম অভিজ্ঞতা নিয়ে পশ্চিমে চলে গেছে সে। অধীশ। কে যেন বলেছিল, কিংবা কারো কবিতা কিংবা গল্পে ছিল এমনি একটি কথাঃ নরহত্যার অভিজ্ঞতা নিয়ে সিংহাসনে বসল সে, সিংহাসনে বসে অনেক হত্যার পরিকল্পনা করতে লাগল।
সেই অধীশ কি সিংহাসনে বসে আকাশপথে আক্রমণে নেমেছে?
সমদর্শীর মৃত্যু কি এত মৃত্যুর সূচনা? চন্দন মল্লিক একা হয়ে ভাবতে লাগল, সমদর্শী কী বলেছিল তাকে? ভয় করে ভয় করে, না বেঁচে না মরে ভয় করে, ভয় করে।
একটু বাদে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। কস্তুরী রায়। তাকে প্রণাম জানিয়ে বলল, স্যার আমি সমদর্শী মণ্ডলের মৃত্যু সম্বন্ধে জানতে চাই।
-আমি জানি না তেমন কিছু, অনেক জুনিয়র ছেলে, সন্তানের মতো, হোস্টেলে ছিল।
-তা জানি স্যার, কিন্তু আপনার কী মনে হয়?
-আমার ভয় করে, ভয় করে, না বেঁচে না মরে, ভয় করে ভয় করে।
-গতকাল ডি ডি বাংলায় কবিতাটি শুনেছি স্যার।
-ওর কবিতা।
-হ্যাঁ স্যার, সমদর্শীর কবিতা।
-গতকাল শুনলে ওর মুখে?
-শুনলাম তো।
-না শোনোনি, এখন মনে হয় কবিতাটি আমার।
-আপনি তখন চুপ করে তাকিয়ে আছেন ওঁর দিকে।
-মনে নেই, কিন্তু কবিতাটি আমার ভাবে এসেছে, লিখব আমি।
কস্তুরী বলল, ওঁর কবিতা, গতকাল পাঠ করেছেন।
-গতকাল নয়, আট বছর আগে একদিন।
হ্যাঁ স্যার, সেদিনের কথা কিছু মনে আছে।
-আমার ভয় করে, ভয় করে…।
-কেন ভয় করে?
-যদি খেলার ছলে কেউ, যদি খেলার ছলে বোমারু বিমান এসে ধ্বংস করে যায় সংসারের সব কিছু, মানুষ আর থাকবে ?
কস্তুরী বলে, ঠিক এই কথাটিই শুনতে চাইছিলাম, ওঁর মা বাবা কোথায় জানেন?
-না, তাঁরা ভয়ে লুকিয়ে গেছেন, ভয় ভয় ভয়, দেখ কস্তুরী এই কারণেই আমার কবিতায় অন্যে ঢুকে পড়ছে, অন্যের কবিতায় আমি।
কস্তুরী বলল, স্যার একটা কাজ করতে পারেন?
-কী কাজ ?
-আগামীকাল সমদর্শী মণ্ডলের জন্মদিন, আগামীকাল সকলে ফেসবুক ভরিয়ে দেব, আমার ভয় করে, ভয় করে, ভয় করে…। কবিতা দিয়ে ভরিয়ে দেব। সমদর্শীর নামে নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে বলব, ভয়ে কিছু বলিনি সেদিন, ভয়ে কেটে গেছে এতটা দিন, স্যার আমি সমদর্শীর কবিতা লিখব, রাজি আছেন স্যয়?
চন্দন বলল, ভয় করে, আমার ভয় করে…।
-ভয় ত্যাগ করো, ত্যাগ করো। বলতে বলতে তনিমা হেঁটে আসছে, বলছে, আমি কবি নই, আমিও লিখব, নির্ভয়ে লিখব, আমার ভয় করে, ভয় করে।
পরদিন ভাইরাল হলো সমদর্শীর কবিতা। মৃত সমদর্শী এতদিন বাদে বেঁচে উঠল, তার পুনরুজ্জীবন হল। পুনরুত্থান হল। ভয়ে লুকিয়ে থাকা বোন আত্মপ্রকাশ করে সমদর্শীর হয়ে লেখা কস্তুরীর কবিতা শেয়ার করে নিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সেদিন ভয় মুক্ত হয়ে লিখতে লাগল, আমার ভয় করে, ভয় করে… বলতে লাগল। নির্ভয়ে সবাই লিখে যেতে লাগল, আমার ভয় করে, ভয় করে, যে কোনো দিন আমার কী হয়ে যাবে জানি না, আমার ভয় করে।


2 মন্তব্যসমূহ
এত আধুনিক আপনি হলেন কেমন করে!!!
উত্তরমুছুনপুনরুত্থান, এই একটি শব্দ যেন গোটা গল্পটাকে বহন করে নিয়ে চলেছে।
উত্তরমুছুন