সাদিক হোসেনের গল্প : শপিং মল




রেলওয়ে স্টেশন থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় ২০ মিনিট। সেটা সুবিদ সাইকেলেই কভার করে নেয়। সেজন্য সাড়ে আটটার ট্রেন ধরতে তাকে আটটার মধ্যেই বেরতে হয়। তা না হলে ১০টায় শপিং মলে পৌঁছানো যাবে না। সাইকেলে প্যাডেল দিতেই মিনু পেছন থেকে টোকা দিল, ভাই, ইয়াসমিন চাচি আরেকবার খবর পাঠিয়ে ছিল। তুই দেখা করে নিস। সুবিদ পেছন ফিরে আর মিনুকে দেখল না। তার থেকে বছর দুয়েকের বড়ো মিনু। বয়েস ধরলে এখন ৩২। এই বয়েসে তো অনেকেরেই বিয়ে হয়। বিয়ের বয়েস তো পেরিয়ে যায়নি। কিন্তু মিনুর যেন আর তর সইছে না। তার নিজের দিদির উপরই ঘেন্যা হতে শুরু করল। মেয়েটা নিজের বিয়ে নিজেই ঠিক করে নিতে চায়। এতোটুকু চক্ষুলজ্জা বলে কিছু নেই। মিনু আবার বলল, ছেলেটা প্রাইমারিতে চাকরি করে।

এবারেও পেছনে তাকাল না সুবিদ। প্যাডেলে চাপ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

বছর দেড়েক হল নিয়মিত সাড়ে আটটার ট্রেন ধরে সুবিদ। সেই সূত্রে তার বেশ কয়েকটি বন্ধু হয়েছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। পরস্পরের পেশাও ভিন্ন। কিন্তু অফিসটাইমের ভিড়ের মধ্যেও কী এক কায়দায় তারা নিজেদের জন্য জায়গা তৈরি করে নিতে পারে। পিকলু তাস সঙ্গে রাখে। টোয়েন্টি-নাইন খেলা শুরু হয়ে যায়। প্রথমদিকে তাস খেলার প্রতি অরুচি ছিল সুবিদের। এখন সেসব কেটে গেছে। রিঙ্কু বড়োবাজারের গদিতে খাতা লেখে। তবে তাসে তুখোড়। হাতে তেমন পয়েন্ট নেই। তাতেই ডাক তুলেছে ২৪। সেভেন কার্ডে ট্রাম। সুবিদ সিওর ছিল এই যাত্রায় রিঙ্কু রেহাই পাবে না। কিন্তু হল ঠিক উল্টো। রিঙ্কু আবার বাজিমাত করে দিল। সুবিদ বলল, তুই শালা চুরি করিস।

রিঙ্কু হেসে বলল, করি তো। কিন্তু চুরিটা ধরে দেখা? ভাই, চুরি হল একটা আর্ট। সেইটা শিখতে এলেম লাগে।

পিকলু পাল্টা দিল, তা খাতাতেও ঝাপিস নাকি?

রিঙ্কু বলল, ভাবছি একটা বাইক কিনব। রয়্যাল এনফিল্ড। সে মুখ দিয়ে ভ্রু-ভ্রু আওয়াজ করে বাইকের ধ্বনি তুলল। মুঠো পাকিয়ে উপর-নীচ করে এমন ভঙ্গি করল যেন এখুনি বাইক চালাচ্ছে। তারপর পিকলুকে খোঁচা মেরে বলল, তোদেরও মাঝে মাঝে লিফট দেবো। যেদিন গার্লফ্রেন্ড পেছনে থাকবে না, সেইদিন তোরা চান্স পাবি। হাজার হোক বন্ধু তো!

- শালা।

শিয়ালদা অব্ধি এভাবেই কেটে যায়। শিয়ালদহে নেমে আবার সাউথ সেকশানে আসতে হয় সুবিদকে। সে যাবে বালিগঞ্জ। বালিগঞ্জ অব্ধি পিকলু তার সঙ্গে থাকে। কিন্তু বালিগঞ্জ এলেই সুবিদ কেমন কুঁকড়ে যায়। পিকলু চা-সিগারেট খেয়ে তবে বাসে ওঠে। কিন্তু সুবিদ পিকলুকে সঙ্গ দেয় না। প্রতিবার বলে, তাড়া আছে।

আসলে তাড়া নেই সুবিদের। তার হাতে এখনো আধাঘন্টা রয়েছে। সে অটোতে ওঠে না। বালিগঞ্জ থেকে গড়িয়াহাট ছাড়িয়ে শপিং মল অব্ধি হেঁটেই যায়। এই সময়টুকুতে সে একলা। ভিড়ের মধ্যে একলা। তার নিজেকে বড়ো ছোটো লাগে। প্রতিদিন ভাবে এই চাকরগিরি করা ছেড়ে দেব। শালা বড়োলোকদের বাচ্চাদের খেলনা গাড়ি চড়ানোর জন্য জন্মেছি নাকি আমি? তবে আজকে মিনুর বলা শেষ কথাটা তার কানে বাজছে - ছেলেটা প্রাইমারিতে চাকরি করে!

২০১৬-তে টেট পাশ করেছিল সুবিদ। র‍্যাঙ্ক তেমন কিছু ভালো ছিল না। তাও আশা করেছিল কোনোভাবে ঠিক প্রাইমারি স্কুলে চান্স পেয়ে যাবে। তখন থেকেই পম্পা চাপ দিচ্ছিল। দেখা হলেই অন্য কোনো কথা না, শুধু তার বিয়ের কী কী সম্পর্ক এসেছে তার বিবরণ। একদিন সুবিদ রেগে গিয়ে বলেছিল, তালে তুই রাজি হয়ে যা। আমার সঙ্গে আর দেখা করিস না।

সেদিন ঢিপঢিপ বৃষ্টি পড়ছিল। টেট পাশ করেও চাকরি না-পাওয়া ছেলেমেয়েদের একটা বিক্ষোভ সমাবেশ ছিল বিকাশভবনের সামনে। বিক্ষোভ জমেনি। দু-একটা স্লোগান দেবার পরেই পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়েছিল। ছাতা নিয়ে গেলেও সেদিন ফেরার পথে ছাতা খাটায়নি সে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগছিল। সারাদিনের ক্লান্তি যেন ধুয়ে যাচ্ছিল বৃষ্টির জলে। পুলিশ দেখে বেশ ভয়ও পেয়ে গিয়েছিল সে। ঠিক করে নিয়েছিল আর কোনোদিন ঐসব বিক্ষোভ-টিক্ষোভে যাব না। বাড়ি ফিরে দেখল মিনুর সঙ্গে পম্পা গল্প করছে। সুবিদকে দেখেই ওরা চুপ করে গেল। মিনু চলে গেলে পম্পা বলল, তোর সঙ্গে দরকার ছিল।

- কী?

পম্পা তার বিয়ের কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে বলল, সামনের মাসের ২৪ তারিখ। তোরা দু-জনাই যাবি কিন্তু।

পম্পা তখনো যায়নি। মিনু চা করে নিয়ে এসেছে। সুবিদ রাগ দেখিয়ে প্রথমে ভেবেছিল চায়ের কাপটা পম্পার সামনেই ছুড়ে ফেলবে। কিন্তু কী আশ্চর্য সে চায়ের কাপটা নিয়ে পম্পার সঙ্গেই বসল। সারাদিনের বিক্ষোভ নিয়ে প্রচুর গল্প বলল। তার বেশির ভাগটাই বানিয়ে। শেষে বলল, উপরমহল থেকে নির্দেশ আছে একমাসের মধ্যেই আমাদের চাকরি হয়ে যাবে। তখন তুইও কিন্তু বরের সঙ্গে আমার বিয়েতে আসবি।

পম্পা চমকে গেছিল। জিজ্ঞেস করল, পাত্রীও জুটে গেছে নাকি?

- চাকরিটা হয়ে গেলেই খবর পাবি।

পম্পা আর কথা বাড়ায়নি। মিনুর সঙ্গে কিছু কথা বলে চলে গিয়েছিল।

এখন হাঁটতে হাঁটতে তার যত রাগ এসে পড়ল পম্পা নয়, মিনুর উপর। আগের বার যখন বিয়ের কথাবার্তা চলছিল, সে নিজের অনিচ্ছা জানিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিল। রাতে ভাত দিতে গিয়ে মিনু সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল, ব্যাপার কী?

মাংসের সঙ্গে ডাল মেশাতে মেশাতে সুবিদ জবাব দিয়েছিল, খবর পেয়েছি। ছেলেটা ভালো না।

- ওদের তো রেশনের ডিলারশিপ। ঐ ব্যবসায় অনেক পয়সা। আমি জানি।

সুবিদ আবার বলল, ছেলেটা ভালো না।

এবার মিনু গলা চড়িয়েছিল, কী খারাপ তার?

- মদ খায়।

- সেতো সবাই একটু-আধটু খায়। তুই কোনোদিন খাসনি?

সুবিদ ভাতের বাসন সরিয়ে উঠে পড়েছিল। সে ভেবেছিল এরকম রাগ দেখিয়ে মিনুকে চুপ করিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু মিনু চুপ থাকার মেয়ে না। রাগ উগরে দিয়ে বলল, সব বুঝি। সব বুঝি। আসলে তুই হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরছিস। নিজের প্রেমটা কেটে গিয়েছে তো, এখন সেইটার শোধ নিচ্ছিস আমার উপর।

শপিং মল এসে গিয়েছে। সুবিদ এক্সেলেরেটর ধরে সেকেন্ড ফ্লোরে উঠছিল। হঠাৎ তার কাঁধে চাপড়। তাকিয়ে দেখল চন্দ্রিমা। সে টপ ফ্লোরের সিনেমা হলে সিকিউরিটির কাজ করে। চন্দ্রিমা আগ বাড়িয়ে বলল, আজকে আমার সকালের শিফট। ৬টা অব্ধি।

সুবিদ চন্দ্রিমাকে পাত্তা দিল না।

সেকেন্ড ফ্লোরে কফিশপের পাশে দুটো ব্যাটারি চালিত ছোটো গাড়ি রাখা রয়েছে। গাড়িগুলো রিমোটে চলে। দেখতে হুড-খোলা কারের মতোই। সারারাত চার্জে দেওয়া ছিল। সুবিদের প্রথম কাজ প্লাগ পয়েন্ট থেকে চার্জারটা খুলে গাড়ি ঠিকঠাক চলছে কী না তা দেখে নেওয়া। মনোজ এখনো এসে পৌঁছায়নি। সে খানিকটা দেরিতে আসে। সারাদিনের হিসেবটা সে-ই মালিককে দেয়। সেদিক দিয়ে সুবিদের বেশ সুবিধা। টাকা-পয়সা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে সে পছন্দ করে না।

একজন মা এসেছেন লাগোয়া ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কেনাকাটি করতে। তিন বছরের বাচ্চা মেয়েটা কী যেন জেদ ধরেছে। মা মেয়েটাকে নিয়েই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে ছিলেন। সেখানে মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে আবার বেরিয়ে এলেন। এবার তিনি মেয়েকে গাড়ি চড়ার লোভ দেখালেন। একবার ফ্লোরটা রাউন্ড দিয়ে ঘুরিয়ে আনা হয়। সময় লাগে মিনিট কুড়ি। প্রতি রাউন্ডের জন্য ১৫০টাকা। মা টাকা মিটিয়ে মেয়েকে গাড়িতে বসিয়ে চলে গেলেন। মিনিট খানিক মেয়েটি চুপ ছিল। তারপর হঠাৎই কাঁদতে শুরু করে দিল। সুবিদদের কাছে কিছু ক্যান্ডি রাখা থাকে বাচ্চাদের দেবার জন্য। বাচ্চাটা ক্যান্ডিটা নিয়ে চুপ করল। কিন্তু আবার মিনিটখানেক পর চেঁচাতে শুরু করে দিল। সে থামতেই চায় না। সুবিদ গাড়ির হর্ন বাজাল। রিমোটের একটি সুইচ টিপলে রাইম শুরু হয়ে যায়। সে সেটাও করল। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই থামে না। মুখ দিয়ে গালাগাল বেরিয়ে আসছিল সুবিদের। পরিবর্তে সে গাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে বাঁদরের মতো লাফাতে শুরু করে দিল। হঠাৎই উপরের ফ্লোর থেকে হা-হা হাসির আওয়াজ। সুবিদ তাকিয়ে দেখল চন্দ্রিমা তাকে দেখে হাসছে। হোয়াটস-আপে একটা এনিমেটেড বাঁদরও পাঠিয়েছে।

দুপুরে দিকে কাজের চাপ থাকে বেশি। সুবিদ হিসেব কষে দেখেছে বড়োলোকের বউ-রা দুপুরের দিকেই বাচ্চা কোলে নিয়ে কেনাকাটা করতে আসে। বিকেলের দিকটা খানিকটা ফাঁকা। সন্ধ্যা থেকে রাত আটটা অব্ধি আবার ভিড়। তবে রাতের দিকে তাদের বিশেষ কাজ থাকে না। ঐ ভিড়টা মূলত সদ্য প্রেম করা ছেলেমেয়েদের ভিড়। ওরা কফিশপ বা ফুটকোর্টে বসে।

বিকেল চারটে থেকে সাড়ে চারটে অব্ধি ব্রেক। মনোজ দেরিতে আসে বলে ও পাঁচটার সময় ব্রেক নেয়। পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটা। উপরে গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা। সেখানে গিয়েই টিফিন খায় সুবিদ। এখানে সিগারেটেও টান মারা চলে।

পার্কিং স্লটে গিয়ে দেখল চন্দ্রিমা দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে সুবিদের জন্য ওয়েট করছে। সুবিদ একটা গাড়ির ডিকির উপর টিফিন বক্স খুলে দেখল মিনু রুটি আর আলুর দম করে পাঠিয়েছে। সপ্তাহে পাঁচদিন একই খাবার। চন্দ্রিমা তার পাশে এসে দাঁড়াল। সুবিদের মুখ দেখে বলল, আমি চাউমিন এনেছি। খা।

- না থাক।

- খা না।

- তুই কী খাবি?

- আমি একটু বেশিই এনেছি।

সে প্রায় পুরো চাউমিনটাই সুবিদের টিফিন বক্সে ঢেলে দিল। একটা ছোটো কৌটোও এনেছে। বলল, এটায় টম্যাটো সস আছে।

সুবিদ ইয়ার্কি করল, আমাকে টিফিন খাওয়াবি বলে রোজ রোজ সকালের শিফট নিচ্ছিস বুঝি?

- হতেই পারে। চন্দ্রিমা হাসল। তারপর মুখ গম্ভীর করে বলল, জানোয়ারটা খুব জ্বালাচ্ছে।

- কে?

- কে আবার, বর।

- কিন্তু তুই তো বাপের বাড়িতে থাকিস।

- হ্যাঁ, এখন সেখানে গিয়েও ঝামেলা পাকিয়েছে। সেদিন রাতের শিফট ছিল আমার, আমাদের ঘরে গিয়ে মায়ের সঙ্গে হুজ্জুতি করেছে। বলে কী না ছেলেকে নিয়ে চলে যাবে।

- তারপর?

- পাড়ার লোক জড়ো হয়ে গেছিল। ইস কী লজ্জা। আর একদিন ঘরে ফেরার সময় আমাকে ধমকি দিল। মনে হচ্ছিল খুন করে দি' ব্যাটাকে। কাছে ছুরি থাকলে চালিয়ে দিতাম।

চন্দ্রিমার চোখ ছলছল করছিল। মুখে সুবিদের রুটি আর আলুর টুকরো। সুবিদ অন্যদিকে কথা ঘোরাতে গিয়ে বলল, এতো যে মেয়েদের গায়ে হাত দিয়ে সার্চ করিস কোনোদিন কিছু পেয়েছিস?

- গায়ে হাত দি' কোথায়। মেটাল ডিটেক্টরটা শুধু একবার উপর-নীচ ঘুরিয়ে নেওয়া।

- তাও।

- তাও আবার কী?

- কোনোদিন কারো গায়ে হাত দিসনি?

- খুব মজা না? চন্দ্রিমা হেসে ফেলে বলল, এইরে শো-ভাঙার টাইম হয়ে গিয়েছে। আমি যাই।

বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। মিনু বারান্দায় আলো নিভিয়ে বসে রয়েছে। জুতো খুলতে খুলতে সুবিদের কেমন মায়া হল দিদির জন্য। বলল, অন্ধকার করে বসে আছিস কেন? রোজ তো সিরিয়াল দেখিস। আজ দেখছিস না। মশা কামড়াবে তো।

মিনু উত্তর দিল না।

সুবিদ হাতে মুখে জল দিয়ে বলল, ছেলেটা কোথায় থাকে?

- পঞ্চানন তলায়।

- নিজেই তো সব খবর নিয়ে রেখেছিস।

লাইট জ্বালিয়েছে সুবিদ। কতোদিন পর মিনুকে দেখে মনে হল সে লজ্জা পেয়েছে।

- কোন স্কুলে পড়ায়।

- সৌদামিনী স্মৃতি প্রাইমারি স্কুল।

- সেইটা আবার কোথায়? কোনোদিন নাম শুনিনি তো।

- ওদের বাড়ির কাছেই।

- বাব্বা। বাড়ির কাছেই স্কুল পেয়ে গেল? টাকা-পয়সা দিয়ে চাকরি বাগাইনি তো। দেখিস আবার।

কথাটা শুনেই মিনু থম মেরে গেল। সুবিদ হেসে বলল, এই সপ্তাহে ছেলেটার খোঁজ নিতে যাব'খন।

আজ পুঁই ডাঁটা দিয়ে মাংস রেঁধেছে মিনু। সঙ্গে আবার পিঁয়াজ-শসা-টমেটোর স্যালাড। খেতে খেতে বারবার মিনুর দিকে তাকাচ্ছিল সুবিদ। মিনু হাসছে। হাসলে তার গালে টোল পড়ে। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে গজ দাঁতটা বেরিয়ে যায়। তার মনে হল, মিনুর বয়েস পেরিয়ে গেলেও তার মধ্যে বেশ ছেলেমানুষি রয়েছে। ছেলেরা এই ছেলেমানুষিটা পছন্দ করে।

রাতে ঘুম ভেঙে গেল সুবিদের। সে জলের আওয়াজ শুনতে পেল। ঝপঝপ। ঝপঝপ। কারা যেন ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। তাদের বাড়ির পাশের পুকুরটা সর্দারদের। পুকুরটা জেলেদের লিজ দেওয়া রয়েছে। জেলেরাই এই পুকুরে মাছ চাষ করে। সেই মাছে সর্দারদের অধিকার নেই। তাই রাতের বেলা সর্দারদের বাড়ির ছেলেরা পুকুরে জাল টানছে। নিজের পুকুরে নিজেরাই মাছ চুরি করতে নেমেছে ওরা।

পেচ্ছাপ করতে এসে সে মিনুর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। দরজাটা ভেজানো। ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে। সুবিদ বুঝতে পারল মিনু জেগে। সে কান পাতল। মিনু গান গাইছে। কী গান সে শুনতে পেল না। কিন্তু সুরটা যেন চেনা। অনেক আগে কোথায় সে শুনেছিল। সে কিছুই মনে করতে পারল না। মিনু গাইছে। কতো পুরনো সুর রাতের অন্ধকারে ধীর পায়ে যেন এগিয়ে যাচ্ছে। বাঁশবাগান পেরিয়ে, শুনশান ইস্টিশান চত্বরে পিশাচের মতো মিনুর সুর যেন ঘুরঘুর করছে। আবার ভীষণ রাগ চেপে বসল সুবিদের। তার মনে হল, মিনু একজন বিশ্বাসঘাতক। মিনু তার পেছনে ছুরি মেরে পালাতে চাইছে।

উৎসবের মরসুম শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা বলে আলাদা কিছু নেই। সারাদিন বড়োলোকদের বাচ্চাদের নিয়ে দৌড়োতে হচ্ছে সুবিদ আর মনোজকে। কখনো হর্ন বাজাচ্ছে। কখনো রাইম শোনাচ্ছে। বাচ্চারা হাসছে। হাসতে হাসতে লাথি ছুঁড়ছে। কেউ আবার কান্না থামাচ্ছেই না।

দু-হাত ভর্তি ব্যাগ। বরের কোলে বাচ্চা। পম্পা এগিয়ে এসে বলল, এই সুবিদ, চিনতে পারছিস?

সুবিদ অন্যদিকে মুখ ঘোরালো। পম্পা আবার ডাকল, এই, তুই এখানে কাজ করিস?

এবার আর পালাবার জায়গা নেই। পম্পা তার বরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ছেলেটি রেশন ডিলার। এর সঙ্গেই মিনুর বিয়ের কথা উঠেছিল একবার। পম্পা তার বরকে বলল, সুবিদ আমাদের ব্যাচমেট।

পম্পার বর হাসল।

পম্পা ব্যাগগুলো বরকে দিয়ে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিল, মাম্মাম গাড়ি চড়বে... ঐ দ্যাখো মামা তোমাকে গাড়ি চড়াবে।

ছেলেটা হামলে উঠল গাড়ির উপর।

আর কিছু করার নেই সুবিদের। সে রিমোট টিপে গাড়ি চালানো শুরু করে দিল। পম্পাও তার সঙ্গে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল, তোর প্রাইমারির চাকরিটার কী হল?

- দেখতেই তো পাচ্ছিস এখানে কাজ করি।

- উপরমহল থেকে এখনো নির্দেশ আসেনি?

সুবিদ চুপ করে গেল।

একটা রাউন্ড পুরো ঘুরিয়েছে ছেলেটাকে। পম্পা কিন্তু ছেলেটাকে গাড়ি থেকে তুলল না।

- মাম্মাম আরেকবার চড়বে রাইড?

ছেলেটা মাথা নেড়ে পা ছুড়তে থাকল। সে বেশ মজা পেয়েছে গাড়ি চড়ে। মাথায় রাগ চড়ছিল সুবিদের। পম্পা আবার শুরু করল, আমরা একটা চারচাকা নিয়েছি। একদিন বাড়িতে আয়। বিয়ের পর তো একবারও দেখা করলি না।

সুবিদ কথা বলছিল না। একবার এক্সেলেরেটরের সামনে দিয়ে যাবার সময় মনে হল বাচ্চা সমেত গাড়িটাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিই। তারপর যা হয় দেখা যাবে। পম্পা বলল, আমি ভেবেছিলাম তোর বিয়ের নেমতন্ন পাব শিগগির। মিনুদিরও তো বিয়ে হল না রে।

সুবিদ মিথ্যা বলল, ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

- কোথায়?

- ছেলেটা আইটিতে জব করে। বিয়ে করেই বিলেতে চলে যাবে।

পম্পা হেসে ফেলল, কালকেই মিনুদির সঙ্গে দেখা হল। ও তো কিছু বলল না। কী রে?

- কিছু না।

পম্পা চলে যাবার পর মাথা ঘুরছিল সুবিদের। মনে হচ্ছিল টপ ফ্লোরে গিয়ে ঝাঁপ দিই একেবারে নীচে। শালা এই লাইফ নিয়ে করবটা কী?

নটার পর শপিং মল থেকে বেরোতেই সে দেখল চন্দ্রিমা সারা মুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সুবিদ এলেই তার হাত ধরে বলল, একটা হেবি জিনিস হয়েছে।

- কী?

চন্দ্রিমা ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল, চুপ। এইখানে নয়।

কিছুদূর গিয়ে চন্দ্রিমা বলল, একটা জিনিস।

- কী?

- একজন ব্যাগ জমা রেখেছিল। যাবার সময় নিয়ে যেতে ভুলে গেছে।

- তো?

- আমি ব্যাগটা সরিয়ে নিয়েছি।

- কিন্তু তার কাছে তো টোকেনটা রয়েছে। কাল যদি ফেরত চাইতে আসে? চাকরিটা খোয়াবি কিন্তু।

- এখানেই ট্যুইস্ট। মাল-টা টোকেনটা ব্যাগের ভেতর রেখেই জমা দিয়ে চলে গেছে।

- সিসিটিভি?

- ফুঃ। ওদিকের ক্যামেরাটা অনেকদিন ধরেই চলে না।

ব্যাগটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল চন্দ্রিমা। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একগোছা পাঁচশ টাকার নোট বের করে বলল, এই যে?

- কত?

- তুই গুনে দ্যাখ।

সুবিদ গুনে দেখল সাড়ে আট হাজার টাকা। সে চন্দ্রিমাকে বলল, আজকে মাল খাওয়াবি?

- এখন?

- বেশি খাব না তো। দু-পেগ খাব।

বারে গিয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারল না সুবিদ। চন্দ্রিমার এক-পেগও তখন শেষ হয়নি, অথচ সুবিদ চার-পেগে দৌড়াচ্ছে।

দোতলা বার থেকে নামার সময় হঠাত-ই চন্দ্রিমা ঘুরে সুবিদকে চুমু খেয়ে নিল। কিন্তু সুবিদ যেন ব্যাটারি চালিত গাড়িটার মতোই অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে।

বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি। চন্দ্রিমা ওর হাত ধরে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে লাগল। গাড়ির আলোগুলো তীব্র হয়ে উঠছে। মাথার উপর ফ্লাইওভার। ফ্লাওভারের নীচে দাঁড়িয়ে সুবিদ বলল, তুই এখান থেকে কীভাবে যাবি?

- আজকে তো ট্যাক্সি নেব। তোকে বালিগঞ্জ অব্ধি ছেড়ে দিয়ে আসব?

সুবিদ হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। চন্দ্রিমাকে ফেলে সে একাই হাঁটতে শুরু করে দিল।

লাস্ট ট্রেনের বেশ কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছিল শিয়ালদায়। প্লাটফর্মে রিঙ্কুর সঙ্গে দেখা। ট্রেন এলে রিঙ্কু বলল, ভেন্ডারে উঠব।

- ভেন্ডারে?

- হ্যাঁ, বেটা ভেন্ডারে। ক'পেগ চড়িয়েছিস?

ভেন্ডার পুরো খালি। দমদম পেরোতেই রিঙ্কু বিড়ি ধরাল। তারপর মানিব্যাগ থেকে গাঁজার পাউচ বের করে পাতাগুলো ছাড়াতে লাগল। সিগারেটে ভরে প্রথমে নিজে টান দিয়ে সুবিদকে বলল, নে, টান।

সুবিদ টানবে কী টানবে না ঠিক করতে পারছিল না। রিঙ্কু বলল, এই বালের লাইফে একটু নেশাভাঙ কর ভাই। নাহলে আরো পস্তাবি।

দু-তিনটে টান মারতেই সুবিদের পেচ্ছাপ পেয়ে গেল। রিঙ্কু বলল, এখানেই সেরে নে'।

- এখানে?

- কোনো শালা নেই। এখানেই করে ফেল।

রিঙ্কুর কথায় হাসতে গিয়ে ধপাস করে পড়ে গেল সুবিদ। মেঝেতে পড়ে গিয়েও সে হাসছে। হাসতে হাসতে প্যান্টেই পেচ্ছাপ করে ফেলেছে।

গভীর রাত। সবকটা জানলা খোলা। বৃষ্টি তখনো থামেনি। বৃষ্টির ছাট ভেতরে ঢুকে পড়ছে।

সুবিদ মেঝেতে গড়াচ্ছে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, এই পিকলু।

রিঙ্কু জবাব দিল, কী?

- তাস ফাঁট। আজ শালা আমিই জিতব।

রিঙ্কুর কাছে তাস থাকে না। তারও খানিকটা নেশা হয়েছে। বলল, এই নে তাস।

সুবিদ বলল, তুই কল কর।

রিঙ্কু কল শুরু করল একেবারে, ১৮ থেকে।

সুবিদ বলল, ১৯।

রিঙ্কু বলল, আছি।

- ২০।

- আছি

- এক।

- আছি।

- দুই।

- আছি।

- তিন।

- আছি।

- চার।

- আছি।

আবার হেসে ফেলল সুবিদ। নিজের ফাঁকা হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই শালা আজকেও জিতবি?

তারপর দুজনা একসঙ্গে বলতে থাকল, চুরি হল একটা আর্ট। এটা শিখতে গেলে এলেম লাগে।

অন্ধকার চিরে ট্রেন ছুটছে। ঝিলের পাশ দিয়ে, বস্তির পাশ দিয়ে, স্কুল-কলেজের পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে ট্রেন ছুটছে। সুবিদ যেন আবার ঝপঝপ শব্দ শুনতে পেল। সর্দারদের ছেলেরা মাছ চুরি করতে নেমেছে। তার কানে এলো সেই কবেকার পুরনো সুর। মিনু গাইছে। সুরটা কোথায় সে শুনেছিল? সুবিদ মনে করতে পারল না।

শুধু নেশা জড়ানো গলায় নিজের মনেই বলল, সবাই বিট্রে করছে। সবাই।
-----------

লেখক পরিচিতি: সাদিক হোসেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একজন বাঙালি লেখক ও গ্রাফিক ডিজাইনার। স্নাতকে পড়াকালীন সময় থেকে সাদিক হোসেন কবিতা লিখতে আরম্ভ করেন ও ২০০৭ সালে তিনি ছোটগল্প লেখা শুরু করেন। তিনি তার ছোটগল্প সংকলন সম্মোহন এর জন্য ২০১২ সালে যুব পুরস্কার লাভ করেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা: রিফিউজিক্যাম্প, মোন্দেলা, আনন্দধারা, মোমেন ও মোমিনা, হারুর মহাভারত ইত্যাদি।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. সমকাল বেশ সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে লেখকের লেখনীতে। এই প্রজন্মের পীড়িত শিক্ষিত বেকার ... আজন্ম লালিত শিক্ষকতার স্বপ্ন তাদের অধরা ই থেকে যায়।।। মাটির নীচে কবরে শায়িত হয় মূল্যবোধ নীতিশিক্ষা প্রেম ও সংসার।।।ভাষা ও শব্দচয়ন বেশ সাবলীল ও গতিময় যা পাঠক কে আকর্ষণ করে।

    উত্তরমুছুন