মৃতা প্রীতম পাঞ্চাবি এবং হিন্দি ভাষার একজন উল্লেখযোগ্য লেখক। একাধারে তিনি কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর আদি নাম অমৃতা কৌর। ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত ভারতবর্ষের পাঞ্জাব অঞ্চলের গুজরানওয়ালা গ্রামে ১৯১৯ সালের ৩১ আগস্ট তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাঁর বাবার নাম করতার সিং ও মায়ের নাম রাজ বিবি। বাবা করতার ছিলেন হিতকরি ব্রজ ভাষার একজন পণ্ডিত, স্কুল শিক্ষক, শিখ ধর্ম প্রচারক এবং কবি। লেখালিখির নেশাটা বাবার কাছ থেকে তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয়। ছোটো বেলা থেকেই তিনি গতানুগতিক নিয়মকানুনের ফাঁক-ফোকর নিয়ে প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। প্রশ্নহীন ভাবে কোনো নিয়ম-নীতি মেনে নেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। সমাজ-সংসারে সেই সময় হিন্দু-মুসলমানের সাথে প্রচলিত নানা বিপরীতমুখী রীতিনীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। সময়ে তার বিরুদ্ধে বলতে ছাড়েননি। তাঁর লেখালিখিতে সেই দ্রোহ, প্রতিবাদ স্পষ্ট।


তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন ‘অমৃত লেহরে’ (অমৃত তরঙ্গ) প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোল। সেই বছরই তিনি বিয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হন শৈশবে পরিবারিকভাবে ঠিক করা বাগদত্তা প্রীতম সিং এর সাথে। প্রীতম সিং ছিলেন এক হোসিয়ারি ব্যবসায়ীর ছেলে এবং পেশায় একজন সম্পাদক। বিয়ের পর অমৃতা কৌরের নাম হয় অমৃতা প্রীতম সিং। প্রীতম সিংয়ের সাথে তার দাম্পত্য জীবন খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। বিবাহ বিচ্ছেদের পর কবি সাহির লুধিয়ানভির সাথে পরিচয় এবং প্রণয় ঘটে। সে পর্বেরও ইতি ঘটে এক সময়। এর পরে শিল্পী ও লেখক ইমরোজের সাথে পরিচয় হয়। সঙ্গী হিসেবে আমৃত্যু পাশে পেয়েছেন ইমরোজকে। কবিতা অমৃতার রক্তেই ছিল। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে তাঁর ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সাহিত্য জীবনের প্রথমার্ধে তিনি প্রেমবিষয়ক প্রচুর কবিতা রচনা করেন। এরপর তিনি দেশভাগ পূর্ববর্তী প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। চল্লিশ দশকের মাঝামাঝিতে তিনি সমাজ- কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। রাজনৈতিক অস্হিরতার সেই সময়কালে সাধারণ মানুষের দুদর্শা নিয়ে তাঁর কলম আগাগোড়া ছিল সোচ্চার।


১৯৪৭ সালে দেশভাগের নামে মানবতার যে বিপর্যয় তিনি চাক্ষুস করেছিলেন সেটি তাঁকে ভেতরে ভেতরে গুড়িয়ে দিয়েছিল যেন। তাঁর জন্মস্হান পাঞ্চাবে দেশভাগের আঘাত, বিশেষ করে সমাজ-সংসারের কাছে তুচ্ছ নারীদের জীবনে যে মর্মন্তুদ থাবা আঘাত হানে, ১৯৫০ সালে সেই অভিজ্ঞতার আলোকে রচনার করেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পিঞ্জর’। এই উপন্যাসটি নিয়ে পরবর্তীতে বলিউডে অসাধারণ একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।


অমৃতার কলম যেমন মানবতার কথা বলেছে, আবার প্রেম বিষয়েও যথেষ্ট সরব ছিল। ছয় দশকের দীর্ঘ সময় ধরে তিনি অজস্র সাহিত্য রচনা করেন। ভারত-পাকিস্তান দুই ভূখণ্ডের মানুষের কাছেই শুধু নন, অনুবাদের কারণে বর্হিবিশ্বেও অমৃতা প্রীতম আজ পরিচিত এক নাম। সাহিত্য কীর্তির জন্য তিনি যথাযথভাবে সম্মানিত হয়েছেন। ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মানে ভূষিত একজন লেখক অমৃতা প্রীতম। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘ব্ল্যাক রোজ’, বিখ্যাত কবিতা ‘আজ আখখা ওয়ারিস শাহ নু(আজ তোমায় ডাকছি ওয়ারিস শাহ) সহ অনেক রচনা ইংরেজিসহ নানা ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। ২০০৫ সালের ১৩ অক্টোবর অমৃতা প্রীতম মৃত্যু বরণ করেন।