মাহবুব লীলেনের গল্প : নবালি


বাথরুমে খচরমচর শব্দে শেষ রাইতে ঘুম ভাঙলে পাত্তা দেয় না নবালি। বৌ বাথরুম করে ভাইবা পাশ ফিরতে গিয়া দেখে বৌ তো ঘুমায়। তারপর আর কিছু ভাবার আগে ঘুম চইলা আসায় ফটাশ ফটাশ শব্দে আবার ঘুম ভাঙলে সে ভাবে ঘরের কোনো পোলা বোধহয় বাথরুমে হাত মারতে আছে। আবার পাশফিরা শোয়ার সময় বাথরুমের দরজার তলা দিয়া কোনো আলো না দেইখা নবালি মনে মনে কয়- লাইটটা জ্বালায়া নিলে পারত…

সে আবার ঘুমায়। ফ্লোর খসখসানি আর দেয়ালপিটানির শব্দে আবার ঘুম ভাঙলে তার সন্দেহ হয়- হাতমারায় দেয়ালঠাপানি ক্যান? তয় কি বাথরুমে কেউ মাগি নিয়া ঢুকছে?

ঘুমের কারণে প্রতিবার এক পর্বের বেশি ভাবতে পারে না নবালি। আবার ঘুম ভাঙলে তার মনে হয় অতক্ষণ ধইরা ঠাপায় কেডা?

সময় দেখতে পারলে ভালো হইত। কিন্তু মুবাইল টিপা টাইম দেখতে গেলে বৌ জাইগা বলবে লুকায়া সে হাবিজাবি ভিডিও দেখতে আছে…

নবালি আবার ঘুমায়। আবার ঘুম ভাঙলে তার মনে হয়- বাথরুমে কোনো পোকা ঢুকছে। আবার ঘুম ভাঙলে পোকার চিন্তা বাতিল কইরা নবালির মনে হয়- কোনো পাখি ঢুকছে। আবার ঘুম ভাঙলে মনে হয়- পাখি তো আন্ধারে ছটফটায় না; পাখি ধরতে নিশ্চয় কোনো বিড়ালও ঢুকছে বাথরুমে…

নবালি আবার ঘুমায়। খচরমচরে আবার ঘুম ভাঙে তার- কী এক বালের বিলাই; একটা পাখি সামলাইতে অতক্ষণ লাগে?

নবালি আবার ঘুমায়। আবার ঘুম ভাঙার পর আর কিছু ভাবে না। উইঠা বাথরুম দেখতে যায়…

লাইটের বোতাম বাথরুমের ভিতরে। দরজা খুইলা এক পা আগায়া ঝটকায় আবার পিছায়া আসে নবালি। কিছু একটায় তার পায়ে থাবা দিছে…

টান দিয়া বন্ধ করা দরজার পিঠেও ফটাশ ফটাশ কয়েকটা শব্দ শোনা যায়…

অন্ধকারে খাড়ায়া নবালি বুঝতে চায়; কিছু একটা তারে থাবা দিছে নাকি কামড় দিছে?

টাউনের আন্ধারেও ভেজাল। কঙ্কর ছাড়া যেমন বাজারি চাউল হয় না; টাউনের আন্ধারগুলায়ও তেমনি কিছু না কিছু লাইটের দানাকণা থাকে…

অন্ধকাররে পুরা আন্ধার বানাইতে নবালি চোখ বন্ধ কইরা ভাবে; তারে থাবা দিছে নাকি কামড় দিছে?

কামড় দিলে সে ব্যথা টের পাইত; কিন্তু তেমন কিছু নাই। তাইলে সাপ না। আর যদি সাপও হয়; তয় ছোবল দিলেও দাঁত বসায় নাই…

কিন্তু অত বড়ো জায়গা নিয়া ছোবল দিব কোন সাপ? থাবাটা পড়ছে তার পায়ের পাতা থাইকা ঘণ্টার উপর পর্যন্ত। এক ছোবলে অত বড়ো এলাকা অজগর ছাড়া তো কেউ কভার করতে পারার কথা না। কিন্তু অজগর হইলে তো খপ কইরা ঠ্যাং মুখে ঢুকায়া অতক্ষণে প্যাচায়া ধরত তারে। নাহ। সাপ না; এইটা বিলাই…

কিন্তু বিলাই তো আন্ধারে দেখে। মাইনসের ঠ্যাং দেখলে বিলাই ভাগল দিতো। তয় বনবিলাই হইলে থাবা দিলেও দিতে পারে…

কিন্তু বিলাইর থাবা হইলে নখের খামচি টের পাইত নবালি। নাহ। নবালি পায়ে যেইটা খাইছে সেইটা থাবা; তয় বিলাইর থাবা না। হইলে হইতে পারে সেইটা পাখির ডানাঝাপটি…

আন্ধারে চোখ মুইজা নবালি ডানাঝাপটির আইডিয়াও বাতিল করে- পাখির ডানায় থাবা হয় না। পাখি কুংফু মাস্টারগো মতো ডানা দিয়া পাথাইরা কোপ মারে। এইটা কোপ না; এইটা একটা থাবা…

অনুমান বাদ দিয়া নবালির মনে হয় পায়ের পাতাটা ছুঁইয়া দেখা দরকার কোনো ক্লু পাওয়া যায় কি না…

নবালি হাত দিয়া থাবাখাওয়া ঠ্যাং ছুইতে গিয়া ডরায়। বিষয়টা যদি এমন হয় যে; যেইটারে সে থাবা ভাবতে আছে সেইটা মূলত একটা কাট?

সুন্দরবনে শুনছে কামটে ঠ্যাং কাইটা নিলে বহুক্ষণ টের পায় না মানুষ। যদি এমন কিছু হয়? যদি এমন হয় যে নবালির একটা পায়ের পাতা অলরেডি গায়েব?

নবালি হাত দিয়া পা ছোঁয়ার চিন্তা বাদ দিয়া থাবাখাওয়া পায়ের বুড়া আঙুল নাড়ায়। নড়তেছে তো। মনে হয় বুড়া আঙুল খায় নাই…

নবালি বুড়া আঙুল দিয়া ফ্লোরে ঘষা দেয়। ঘষা হইতেছে তো। মানে বুড়া আঙুল ঠিকাছে। নবালি পা কাইৎ কইরা কনে আঙুল দিয়া ফ্লোর গুতায়। এইটাও ঠিকাছে…

ঘষাঘাসা দিয়া বাকি সব আঙুল পরীক্ষা করে নবালি। ঠিকাছে। গোড়ালি দিয়া ফ্লোরে লাত্থিও মারা যাইতেছে। ব্যায়াম করার মতো ঘণ্টা থাইকা পায়ের পাতা ডাইনে বামে ঘোরায় নবালি। ঘোরে; ঘুরতে আছে। তার পায়ের পাতা কেউ কাটে নাই…

নবালি ভাবে- ঠ্যাং কাটার চিন্তাটা বাজে। বাথরুমে কামট ঢুকব কেমনে?

নবালি এইবার হাত দিয়া পা ছুঁইয়া দেখে ভিজা আর পিচ্ছিল। নবালি আবার ডরায়। রক্তও ভিজা আর পিচ্ছিল হয়…

আন্ধারে আবার চোখ মুইজা নবালি ভাবে- রক্ত হইলে ব্যথা কই?

নবালি নিজের বিদ্যা ঘুঁটায়- কেডা জানি কইছিল কিছু প্রাণীর লালা ব্যথানাশক হয়; কামড় দিলেও জ্বলে না। যদি এমন কিছু হয়?

নবালি থাবা খাওয়া পা লটকায়া রান্নাঘরে গিয়া লাইট জ্বালায়; পায়ে রক্ত নাই কিন্তু ভিজটা চকচকি করতে আছে…

নবালি পায়ে হাত দেয়; পিছলা। হাতটা নাকের কাছে আনে; গন্ধ…

গ্যাসের চুলার রান্নাঘরে নবালি কোনো লাঠি পায় না। বটিদাও নাই। টাউনের কিচেনে জিনিসপত্র টেবিলে ফালায়া চাকু দিয়া কাটে…

নবালি একটা চাকু নিয়া বাথরুমের দরজার সামনে অন্ধকারে খাড়ায়; ভিতরে খচরমচর থাবাথাবি চলতে আছে…

নবালি এক হাতে চাকু বাগায়া অন্য হাতে দরজাটা অল্প খোলে। দরজার পিঠে কয়েকটা থাবা পড়ে। নবালি পা বাড়ায় না। দরজা আরেকটু ঠেইলা হাত ঢোকানোর মতো ফাঁক করে। আরো কিছু থাবাথাবি আর খচরমচর…

নবালি ফুরুত্তি হাত ঢোকায়া ভিতরে লাইটের বোতাম টিপে। লগে লগে প্রচুর খসাখস থপাথপ। নবালি দরজা বন্ধ কইরা দেয়…

খসাখস থপাথপ কইমা আসলে নবালি দরজা একটু ফাকা কইরা তাকায়। কিছু নাই কিন্তু শব্দ আছে। আরেকটু খোলে; অবস্থা একই…

দরজার ফাঁকাটা মাথা ঢোকানোর মতো হইছে। কিন্তু মাথা ঢুকাইলে যদি আড়াল থাইকা কেউ ঘাড়ে থাবড়ায়?

নবালি শার্ট খুইলা পোটলা বানায়া চাকুর আগায় লটকায়। চিপা দিয়া পোটলা ঢোকায়া উপরনিচ করে। নাহ পোটলায় থাবায় না কেউ…

নাবালি মাথা ঢোকায়া দেয়। নবালি আর নড়তে পারে না। বাথরুমের ফ্লোরে পইড়া আছে অনেকগুলা মুঠি সাইজের মাছ…

পুঁটিমাছগুলা মরা। কইমাছ হাঁপাইতেছে। বোয়াল-শোল-পাঙাশ-মাগুরগুলাও জেন্দা…

বাথরুমে ঢুইকা দরজা বন্ধ কইরা নবালি ভাবে দোতলা বাড়ির বাথরুমে মাছ ঢুকল কেমনে?

নবালি ছেন্দা খোঁজে। বাথরুমে মাছ ঢোকার মতো ছেন্দা শুধু কমোডের লাইন। নবালি উঁকি দেয়; কমোডের প্যানে খলবল করতে আছে মাছ…

নাবালি ভাবে কমোডে অত মাছ আইল কেমনে? পাখির হাগু থাইকা কিছু গাছের বীজ আবার গাছ হইয়া জন্মায়। মাইনসে মাছের ডিম খাইয়া হাগলে কি সেইগুলা থাইকাও মাছ হয়?

নাবালি আরেকটু ভাবতে গিয়া আর ভাবার বিষয় পায় না। মরা মাছগুলা কুড়ায়া একটা বালতিতে রাখে। তারপর জেন্দা মাছগুলাও কুড়ায়। বালতিতে পইড়া জেন্দা মাছ লাফালাফি করে। নবালি বদনা ভইরা বালতিতে পানি ঢালে। মাছেরা আরাম পায়…

ফ্লোরের সব মাছ কাছায়া নবালি ভাবে; কমোড একটা হাগুময় স্থান। কমোডে হাত ঢোকানো কি ঠিক?

নবালি আরেকটু ভাবে- হাইগা হছার সময় হাতে তো গু লাগেই…

কমোডের পাইপে যতদূর যায় বামহাত ঢোকায়া মাছ ধরে নবালি। বালতিতে খলবলায়া কয়েকবার মাছগুলা ধোয়। দুয়েকটা মাছ নাকে নিয়া শুঁকে। মাছ থাইকা মাছের গন্ধই সে পায়। নাবালি ভাবে মাছগুলারে হা করায়া মুখ ধোয়াইতে পারলে ভালো হইত; ভিতরে গু থাকতে পারে…

সকাল হইতে আছে। নবালি আর ভাবে না। মোটমাট পাঁচ কেজির বেশি হবে মাছ। নবালি রান্নাঘরে গিয়া জাতে জাতে আলাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে মাছগুলা ঢোকায়…

পোশাক বদলায়া নবালি মাছের ব্যাগ হাতে বাইরে আইসা রিকশা খোঁজে। রিকশায় চইড়া নবালি মাছের বাজারে যায়। কিছু মাছুয়া ডালা খুইলা বসছে; কেউ ডালা মেলতে আছে…

নবালি মাছ দেখে; মাছ হাতায়; নাক মুছতে গিয়া মাছের গন্ধ শুঁকে। নবালি অন্য হাত ব্যাগে ঢোকায়া আবার সেই হাত দিয়া নাক মোছে। মাছবাজার ছাইড়া নবালি এক বোতল সিরকা কিনে। রিকশা ডাইকা বাড়ি ফিরে…

সকাল পুরাপুরি হইছে। রান্নাঘর চালু হইছে। নবালি মাছের ব্যাগগুলা রান্নাঘরে রাখে- সকালে হাঁটতে গিয়া কিছু টাটকা মাছ পাইলাম…

ইস্কুলিরা উইঠা পড়ছে। মাছ নিয়া রান্নাঘরে মাথা ঘামায় না কেউ। নবালি মাছের পাশে সিরকার বোতল রাখে- ফার্মের মাছ। সিরকায় ধুইয়া রান্ধন ভালো; গন্ধটন্ধ থাকলে যাবে গা…
-----------

লেখক পরিচিতি: মাহবুব লীলেন, কবি, গল্পকার এবং নাট্যকার। লীলেন গল্প বলেন বাংলার পালাকার ও বয়াতি-বাউলের মতো বৈঠকি ঢংয়ে। কবিতা, গল্প ও মঞ্চ নাটক মিলিয়ে প্রকাশিত বই এক ডজনের বেশি। তাঁর প্রচুর লেখালিখির ভেতর 'অভাজনের মহাভারত' বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
                                                                          
                                                                         



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ