উৎপল দাশগুপ্তের সঙ্গে কথোপকথন
গল্পপাঠ:. বাংলাভাষায় অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি পাঠকের একধরনের অনীহা কাজ করে। এর পেছনে কী কী কারণ আছে বলে মনে করেন?
উৎপল দাশগুপ্ত: ঠিক অনীহা কাজ করে না বোধহয়। বিদেশি সাহিত্যে আমরা প্রথমে বাংলা অনুবাদের মাধ্যমেই প্রবেশ করি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই অনুবাদ সাহিত্যের ভাষা একটু খটোমটো লাগে। দুটি ভাষার প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হওয়ার দরুণ এরকম মনে হতে পারে। তাছাড়া ভিন্ন দেশের মধ্যে সংস্কৃতিগত পার্থক্যও থাকে, ফলে পরিবেশটা অপরিচিত বলে মনে হয়। অনুবাদ করার সময় এই ব্যাপারগুলো খেয়াল রাখতে পারলে এবং একেবারে আক্ষরিক অনুবাদ না করে বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলে হয়ত সুবিধে হবে। অন্য ভাষার প্রবাদ প্রবচনের ব্যবহারকে আক্ষরিকভাবে অনুবাদ করে দিলেও সমস্যা হয়।
আরও একটা কারণ মনে হয়, বাঙালি পাঠক যেহেতু ইংরেজ অনুবাদ থেকেই বিদেশি সাহিত্যের রসগ্রহণ করে থাকেন, তাই বাংলা অনুবাদের প্রতি আগ্রহ কম থাকে। অবশ্য অনুবাদের মান উন্নীত হলে এই প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাবে।
গল্পপাঠ: মৌলিক সাহিত্য হিসেবে অনুবাদকে অস্বীকারের পেছনে মূল কারণ কি?
উৎপল দাশগুপ্ত: অনুবাদও এক ধরণের সাহিত্য। অন্য ভাষার লেখকের মৌলিক ভাবনার সঙ্গে অনুবাদকের মৌলিকতাও কাজ করে। নাহলে সেই অনুবাদ সার্থক হয়ে ওঠে না। অনুবাদ সার্থক হলে তাকে মৌলিক সাহিত্য বলে স্বীকার না করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।
গল্পপাঠ: অনুবাদ পরিশ্রমসাধ্য একটি কাজ। ভালো অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
উৎপল দাশগুপ্ত: (আমি বাংলা অনুবাদ নিয়েই বলতে চাই) যতটা সম্ভব বাঙালিকরণ করা প্রয়োজন, যাতে পাঠকের সেটা অনুবাদ নয় মৌলিক গল্প বলেই মনে হয়। ইংরেজি ভাষায় আমরা অনেক বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ পড়ে থাকি। সেখানে কখনোই মনে হয় না আমরা অনুবাদ পড়ছি। অনুবাদককে এই ব্যাপারে দক্ষ হতে হবে।
গল্পপাঠ: একজন অনুবাদক উৎস ভাষা (Source Language) এবং উদ্দিষ্ট ভাষায় (Target Language) দক্ষ হলেই তিনি ভালো অনুবাদক হবেন এমন কোনো ফরমূলা কি অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে খাটে?
উৎপল দাশগুপ্ত: অবশ্যই। উৎস ভাষায় এবং উদ্দিষ্ট ভাষায় পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকলে অনুবাদ সার্থক হয়ে উঠতে পারে না। কোনও ফর্মুলাই কাজ করবে না।
গল্পপাঠ: মৌলিক সাহিত্যচিন্তার ক্ষেত্রে অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম, এই বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
উৎপল দাশগুপ্ত: অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সাহিত্য সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হবে। বিচিত্র শৈলী, বিচিত্র ধারণা, বিচিত্র সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটবে।
গল্পপাঠ: দেশি সাহিত্য বাংলা ভাষায় যতটা অনূদিত হচ্ছে, বাংলাসাহিত্য ইংরেজিতে সেমাত্রায় অনূদিত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দক্ষ অনুবাদকের অভাব ছাড়া আর কী কী কারণ আছে বলে মনে হয়?
উৎপল দাশগুপ্ত: এর মূল কারণ দক্ষ অনুবাদকের অভাব। এমন অনুবাদক যিনি সেই বিদেশি ভাষাটিকে প্রায় মাতৃভাষার মতই গভীরভাবে জানবেন। নাহলে অনুবাদটি কৃত্রিম শোনাবে। আরও একটি উপায় হল বাংলা জানা বিদেশি যদি তাঁর ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ করতে রাজি হন।
গল্পপাঠ: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর পঞ্চতন্ত্র বইয়ের অনুবাদ সাহিত্য পর্বের একটা জায়গায় বলেছিলেন, ‘ইংরেজি সাহিত্য বহু ভাষা থেকে বহু বস্তু অনুবাদ করে কীভাবে পরিপুষ্ট হয়েছে, নব নব অনুপ্রেরণা পেয়েছে, নব নব অভিযানে বেরিয়েছে সেই আদিযুগের শুভক্ষণ থেকে।’ যদি বলি, একই প্রক্রিয়ায় বাংলা সাহিত্যেরও উত্তরণের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে– এমন ভাবনার সাথে আপনি কতটা সহমত পোষণ করবেন?
উৎপল দাশগুপ্ত: আমি পূর্ণ সহমত পোষণ করি।
গল্পপাঠ: অনুবাদ কর্মের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফার্সী ভাষায় অনূদিত উপনিষদ পরবর্তীতে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল যা ইউরোপীয় মননশীলতায় গভীর প্রভাব রেখেছিল। প্রায় শুনতে হয় অনুবাদ সাহিত্য ঠিক সাহিত্য নয়, বা এর তেমন পাঠক নেই ইত্যাদি। প্রশ্ন হচ্ছে, অনূদিত বিদেশি সাহিত্য সার্বিকভাবে বাঙালি লেখক/পাঠকের মননশীল জগতে টোকা দিতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে? এর জন্য শুধুমাত্র মানসম্মত অনুবাদ না হওয়াকে দায়ী করা কতটা যৌক্তিক?
উৎপল দাশগুপ্ত: অনুবাদ সাহিত্যের পাঠক নেই বলাটা ব্যোধহয় সঠিক নয়। ভালো অনুবাদসাহিত্য মৌলিক সাহিত্যের মতোই পাঠককে আকর্ষত করে। আমরা বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমেই পরিচিত।
গল্পপাঠ: মানসম্মত অনুবাদ করতে হলে কোন কোন বিষয়ের উপর একজন অনুবাদকের গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলে মনে করেন?
উৎপল দাশগুপ্ত: এরকম একটা তালিকা করা যেতে পারে –
ক) দুটি ভাষার গঠনতন্ত্র ভিন্ন। সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
খ) দুটি ভাষার প্রবচনের ব্যবহার এবং প্রকাশভঙ্গিও ভিন্ন। সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার।
গ) কিছু কিছু শব্দের দুটো বা তার অধিক অর্থ থাকতে পারে। সঠিক অর্থটাই অনুবাদে প্রয়োগ করতে হবে।
গল্পপাঠ: উৎকৃষ্ট অনুবাদের ক্ষেত্রে উৎস টেক্সটের নিবিড়পাঠ, সময়, মনোযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি
মূলের প্রতি অনুবাদকের সৎ থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ– এ বিষয়ে কি আপনি একমত?
উৎপল দাশগুপ্ত: আমি মূলের প্রতি সৎ থাকতে ভালবাসি। তবে সেজন্য ভাষার ব্যাপারে সমঝোতা করতে রাজি নই। এখানে একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাই। রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর The Phantom Rickshaw গল্পে একটা লাইন আছে – “the tale of bricks is always a fixed quantity” – এখানে লেখক অবশ্যই Old Testament – এর Tower of Babel – এর তুলনা টেনেছেন। তবে এটার আক্ষরিক অনুবাদ করলে ব্যাপারটা খটোমটো হয়ে যাবে, বোধগম্য হবে না। তাই আমি তার সমান্তরালে রাবনের স্বর্গের সিঁড়ি বানানোর তুলনা টেনে এনেছি। আমি অনুবাদ করেছিলাম – “প্রায় স্বর্গের সিঁড়ি বানিয়ে ফেলার মতোই অসম্ভব”। এর থেকে আরও একটা কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দুটি ভাষার মীথ সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
গল্পপাঠ: বিদেশি এবং বাংলা ভাষাসংস্কৃতির মধ্যে স্পষ্টতই ভিন্নতা রয়েছে। একজন অনুবাদক এই ভিন্নতা সম্পর্কে সচেতন থেকে ভাষার গ্রহণ ক্ষমতাকে বিস্তৃত করতে সক্ষম হন– এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।
উৎপল দাশগুপ্ত: অবশ্যই প্রয়োজন। আগের প্রশ্নের জবাবে এই ব্যাপারে আমি একটা উদাহরণ টেনেছি।
গল্পপাঠ: অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল লেখায় লেখক তাঁর যে কৃষ্টি-সংস্কৃতি বা আচার-আচরণের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন, অনুবাদক সেখান থেকে সরে গিয়ে নিজের মতো সেটা প্রকাশ করতে পরেন কি? (উদাহরণ: একজন হিন্দু লেখক, যিনি তাঁর গল্পে সৌজন্যমূলক সম্বোধনে নমস্কার ব্যবহার করেছেন, একজন অনুবাদক সম্বোধনটিকে সালামে রূপান্তর ঘটাতে পারেন কি? ভাইসভার্সা)
উৎপল দাশগুপ্ত: প্রয়োজনমতো অবশ্যই করা যেতে পারে।
গল্পপাঠ: উৎসভাষার টেক্সটের সময়কাল অনুবাদের উদ্দিষ্ট ভাষার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উৎপল দাশগুপ্ত: স্হান-কাল-পাত্র সবটুকুই গুরত্বপূর্ণ। তাই সেই ব্যাপারটা অবশ্যই খেয়াল রেখেই ভাষাকে সমসাময়িক করে তুলতে হবে।
গল্পপাঠ: অনুবাদ সাহিত্যের সার্বিক সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে সংক্ষেপে আপনার বক্তব্য বলুন।
উৎপল দাশগুপ্ত: কিছু সমস্যা ওপরের উত্তরের মধ্যেই নিহিত আছে। অনুবাদ করতে গিয়ে আমি এই সব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। আরও সমসয়া নিশ্চয়ই আছে। অনুবাদ সাহিত্যের সম্ভাবনার ক্ষেত্রটাও বিশাল। এই সম্ভাবনাকে যথাসম্ভব উন্মুক্ত এবং সুন্দর করে তুলতে হবে। তাতে বাংলা সাহিত্যই সমৃদ্ধ হবে।
গল্পপাঠ: অনুবাদ সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
উৎপল দাশগুপ্ত: ইংরেজি সাহিত্যে অনুবাদ সাহিত্যও একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের শাখাপ্রশাখা যেহেতু বিচিত্রভাবে ছড়ানো, সংস্কৃতিতেও বৈচিত্রের শেষ নেই, অথচ একজন মানুষের পক্ষে প্রতিটা ভাষা আয়ত্ত করে সেই সাহিত্যে প্রবেশ করা সম্ভব নয়, তাই অনুবাদের ওপর গুরুত্ব দিতেই হবে। ইংরেজি ভাষা সেই গুরুত্ব দিয়েছে, এবং তার ফলে আমরা বিশ্বসাহিত্যের বৈচিত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। তবে সাহিত্যের রসাস্বাদন করবার মত ইংরেজি ভাষার জ্ঞান অনেকেরই থাকে না। তাঁদেরই হিতার্থেই স্বচ্ছন্দ বাংলা অনুবাদ হওয়া জরুরি। আর একবার এই বৈচিত্রময় বিশ্বসাহিত্যের রসগ্রহণ করার পর মানুষের চাহিদা বেড়েই যাবে। তাই আমি অনুবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই আশাবাদী।
[উত্তরদাতার বানানরীতি অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে]


0 মন্তব্যসমূহ