প্রতিভা সরকারের গল্প: পিঞ্জর




পেছনের বড় লোহার দরজাটা ঝনঝন শব্দে বন্ধ হয়ে যাবার পরেই তাকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে বাঁ দিকের একটা ছোট অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে দিল। আর তারপরেই ঘটে গেল সেই অদ্ভুত আর ভয়ংকর ঘটনাটা যার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

পেটের ওপর কনুইয়ের একটা গুঁতো, গলা চিরে একটা অঁক বেরিয়ে আসতে না আসতেই দেওয়ালে কেউ বাঁ হাতে ঠেসে ধরে তার ব্যথায় কোলকুঁজো শরীরটা, আর ডান হাতের পাঁচ আঙুলের ছুরি চালিয়ে দেয় শাড়ির নীচ দিয়ে একদম ভেতরে, যে পথ দিয়ে মাত্র দুদিন আগেই আধা গলা টুকরো টুকরো মাংসের ডেলা রক্তের স্রোতের সঙ্গে বহে গেছে। আইম্মা, আচমকা চেঁচিয়ে ওঠে পাবকী। যন্ত্রণা আর ঘটনার আকস্মিকতায় সে ছটফট করে যেন সিংহ ঘাড়ে উঠে পড়া এক বুনো মহিষ। তার খেটে খাওয়া শরীরে তো আর শক্তি কিছু কম নয়। কিন্তু প্রবল গা মোচড়ামুচড়িতেও সেই হাত সরে না একচুল, আরও খাবলে খিচলে ধরে, জ্যান্ত মহিষের পেছন থেকে খুবলে মাংস খাবার যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। আর সহ্য করতে না পেরে অন্ধকারের দেওয়াল ফাটিয়ে অসহ্য চেঁচায় পাবকী, মুঝে ছোড় দো !

দুনিয়ায় কত যে আশ্চর্য কিসিমের ঘটনা ঘটে, একই আকাশে চাঁদ সুরজ কত রকমের খেলা দেখায়, আবার মেঘবৃষ্টির দিনে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের উঁচু থেকে গলা কাদার স্রোত নেমে আসে, সঙ্গে বড় বোল্ডার, অজস্র নুড়িপাথর, শেকড় ওপড়ানো পিতামহ বৃক্ষেরা! ভোরের আলো পাহাড়ের পেছন থেকে সোনালি আভা ছড়াতে শুরু করলেও এপাশের আঁধার কাটে না। ছোট ছোট সাদা ফুলে ভরা প্লাম গাছের ডালে লাফাতে থাকা ব্রাউন ডিপার পাখির চেঁচামেচিতে পাহাড়ের গায়ে সবচেয়ে উঁচু বাড়িটার মুরগি-খোঁয়ারে মাথা উঁচু করে চারদিক দেখে জোয়ান মোরগটা। রোদ না উঠলেও মৃদু মরা আলোতেই তার গলার কাছের সবজেটে ময়ূরপঙ্খী পালক ঝলমল করে, সেগুলোকে ফুলিয়ে সে আর একবার হাঁক দেয়, কঁ-কর-কঁ। নুড়িপাথরে শরীর ঢাকা নদীটাকে ওপর থেকে দেখতে লাগে যেন একটা সোনার ফিতে। পাহাড়ের ওপারের ফুটি ফুটি সোনালি রং প্রথম প্রতিফলিত হয় তার জলে। তখনও এপাশে কেমন সাদাটে মরা আলো, ঘর বাড়ি, মন্দির, হোমস্টের ছদ্মবেশে নদীর বুকের ওপর চেপে বসা সব হোটেল, সবার ওপরে যেন ঘুমের চাদর পাতা রয়েছে এখনও। ঘুমের রং কি তবে এইরকম নিরাসক্ত ছাই ছাই? ভাবতে ভাবতে হাই তুলে পাবকী। তখনই তার চোখে পড়ে টলমল পায়ে পাকদন্ডী পেরিয়ে নেমে যাচ্ছে বাচ্চাটা, নাদুসনুদুস, লাল সোয়েটার পরা, মাথায় তেকোনা উলের টুপি। হেই, পেছন থেকে হাঁক পাড়ে পাবকী, কাল রাতে জল বেড়েছে নদীতে, পাহাড়ি মানুষদের চোখে দেখতে হয় না, বোল্ডারে স্রোতের ধাক্কা খাবার শব্দ শুনে তারা কম্বল রজ্জাইয়ের নীচে শুয়ে থেকেও এইসব টের পায়। হেই, তাই হাঁক পাড়ে পাবকী, বাচ্চাটা মাথা ঘোরায়, ছোট ছোট বাদামি চোখ, ব্রাউন ডিপার পাখির মতই চঞ্চল, হাতের পেছন দিয়ে গড়িয়ে পড়া নাকের পোঁটা মুছে তাকিয়ে আছে, হাসছে, অচেনা মানুষকে একটুও ভয় নেই। কিন্তু পাবকী ওকে ঠিক চিনতে পারে, যার জন্য গাঁয়ের বাস উঠিয়ে দিয়ে সিমলার বস্তিতে বাসা বেঁধেছে শংকর, সেই ঢলানি মেয়েটার বাচ্চা, দেখতে সুন্দর ওর মায়ের মতই, কিন্তু সাপের বাচ্চা তো সাপই হয়, তাই না ?

জেলের লপসি যে না খেয়েছে সে জানে না তার আত্মাকে অবধি দুমড়েমুচড়ে দিতে পারে এই পাথুরে বাড়িটা ! ভেতরে ঢোকা মাত্র তার কঠিন আর নিষ্ঠুর ভার নিয়ে চেপে বসে মনের মধ্যে, মন থেকে মাথা, মাথা থেকে সমস্ত শরীর ভরে যায় পাহাড়ি গাঁও-এ ঐ ছাই ছাই রং ঘুমের আস্তরণের মতো। যতক্ষণ না সূর্যের আলোয় সব ঝলমলে হবে, ততক্ষণ সর্বত্র মন খারাপের ছাই ওড়ে। আর এখানে সূর্য কোথায়, সেই মাথার ওপর উঠলে তবে কিছুক্ষণ। নাহলে বিরাট উঁচু দেওয়ালের ছায়া আর সামনের কাঁঠাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে যেটুকু রোদের লুকোচুরি খেলা! আলোর অভাবেই যেন মাথাটা ভারী লাগে পাবকীর। মৌত কি সাজা পাবার পর তাকে এই নতুন জেলে নিয়ে আসা হয়েছে,আর আসতেই মহিলা-রক্ষীদের হাতে তার অমন হেনস্থা হবে কে ভেবেছিল! শরীরের ওই গোপনে কেউ কিছু লুকিয়ে রাখে নাকি! ধ্যাত্তেরিকা, ওটা কেবল তল্লাসির নামে নতুন আসা বন্দিটির মনোবল ভেঙে দেবার ফন্দি। দ্যাখ শালি, তোর শরীর মন সব আমাদের জুতোর তলায়। তাছাড়া ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করা মানুষগুলোকে ওরা ইঁদুর ভাবে। জলে চোবানো, ইঁটে থেঁতলে মারা, ঝাঁটা চালানো সপাসপ, যেন সবই জায়েজ। চেঁচিয়ে, কেঁদে কঁকিয়ে কোনও লাভ নেই। এটা জেলখানা, পৃথিবীর বুকে জ্যান্ত নরক! এখানে ভগবান হচ্ছে ওয়ার্ডেন, রক্ষী আর খবরিরা।

তবে ফাঁসি বললেই তো আর ফাঁসি হয় না। সেশন কোর্ট রায় শোনাল, তারপর হাইকোর্ট, তারও কত বছর পর সুপ্রিম কোর্টে গেল তার কেস। এর পরেও হাতে আছে রাষ্ট্রপতির কাছে দয়াভিক্ষার চিঠি। গোটা সময়টা বন্ধ পিঞ্জরায় থেকে পাবকীর পিঠের নানা রঙের পালক দিয়ে বানান অদৃশ্য ডানাজোড়া ভেঙে চুরমার হল, সে এক অকালবৃদ্ধায় পরিণত হল, অমন সুগঠিত স্বর্ণাভ বাহু শুকিয়ে দড়ির মতো দেখায় এখন, দুশ্চিন্তায় চুল সব সাদা, আর নতুন জেলে প্রথম দিনেই তার ভেতরটা ঘেঁটে দিয়েছিল যে খবরি, সে ছাড়া পেয়ে মুক্ত পৃথিবীর বাসিন্দা হলেও, সেই পেটের ব্যথা পাবকীকে ছাড়ল না। মাঝে মাঝেই কোলকুঁজো হয়ে সে সিয়ারাম সিয়ারাম জপ করে। প্রচন্ড রক্তস্রাব হয় তার। ডাক্তার সার্ভিকাল ক্যান্সারের জন্য বায়োপসি লিখতে গিয়েও আনমনা হয়ে পেন বন্ধ করে রাখল, দেখাই যাক আর দুদিন, আইনে বলে ফাঁসির সাজা পাওয়া মানুষকে দড়িতে ঝোলাতে হবেই, তা সে যতই অসুস্থ হোক না কেন। তাহলে এর জন্য আরও ব্যথা বেদনাময় চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবস্থা করে কোন ছাতা হবে! ডাক্তার পাবকীকে পেইন কিলার দেয়, তাকে বেশি করে স্যানিটারি ন্যাপকিন দেবার কথা লেখে প্রেসক্রিপশনে।

আর এই ন্যাপকিন নিয়েই সেদিন বেদম মার খেতে হল তাকে। খুনি মাগি, মানুষ খেয়ে শরীরে রক্ত বেশি হয়েছে না, একা তুই অতগুলো চাইছিস কোন সাহসে, এই বলে অন্য মেয়েরা তাকে মারল। প্রেসক্রিপশন তো আর মরিজের কাছে থাকেনা, আর থাকলেই দেখতে যাচ্ছে কে!

সারাদিন মেয়েগুলো পান থেকে চুন খসলে মারপিট করে, মুখে অকথ্য গালাগাল, মাথাপিছু এক ডাব্বা বরাদ্দ জলে কাকস্নান করে তাদের মেজাজ আরও আগুনেমার্কা হয়ে ওঠে। তারপর ডালের বাটিতে ডালের বদলে নোংরা ট্যালট্যালে জল দেখে তারা জেলের চোদ্দপুরুষকে খিস্তি দিতে থাকে, কিন্তু সন্ধে বেলায় পাকা চত্বরে গোল হয়ে বসে তারা পোকা-মটর বেছে খাবার দু:খ ভুলে গান গায়, নাচে, নোংরা ঠাট্টায় দাঁত বার করে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে। পাবকীর ভাগ্য যে এই মজলিসে সেও এতদিন যোগ দিতে পেরেছে। কারণ অনেক জেলে মৌত কা কয়েদিরা আলাদা ওয়ার্ডে থাকে। গরাদের ফাঁক দিয়ে জুলজুল করে এইসব রঙ্গ দেখা ছাড়া চোখের জল ফেললেও তাদের এখানে এসে বসার ইজাজত মেলে না।

কিন্তু মার-খাওয়া পাবকী সেদিন নিজের কম্বলের ওপর শুয়েই থাকল। তার শরীর যুতে নেই। দূর থেকে মেয়েদের গলার আওয়াজ, হাসির হররা ভেসে আসছিল, তার বড় উদাস লাগছিল। অনেক দূরে নিজের গাঁয়ে পাহাড়ের খাঁজে আটকে থাকা নিস্তব্ধ বিকেলে দূর থেকে বাচ্চাদের চ্যাঁচামেচি, বল পেটাবার আওয়াজ কানে এলে একা ঘরে যেমন উদাস লাগত তেমনই। তার নিজের কোনো ছেলেপিলে হল না, এই অপরাধে শংকর মৌলাম্বা গ্রামের সবচেয়ে ঢলানি মেয়েটাকে বিয়ে করে সিমলা চলে গেছে। দুমাস অন্তর অন্তর আসে, ভিখারিকে টাকা ছুঁড়ে দেবার মতো কিছু নোট ছুঁড়ে দেয় দাওয়ায় বসা আগের বৌয়ের দিকে, তার সবজি খেতিতে জল দেবার ইনাম। নিজেকে না দেখতে পেলেও পাবকী বুঝতে পারে, তাকে দেখাচ্ছে শিবজি মন্দিরের ফাটকের সামনে বসা ভিখারিটার মতই। নোংরা আর অলস। করুণ আর কৃতার্থ।

তবু গ্রামের লোক শংকরের কতো প্রশংসা করে। কত মায়ার শরীর, আগের বৌকে কিছু হলেও দিচ্ছে তো! যেন বলা নেই কওয়া নেই, বিয়ে করা বৌকে ফেলে অন্য মেয়েকে নিয়ে ঘরবসত বসানোয় কোনো পাপ লাগে না। আর যেদিন শোনা গেল নতুন বৌ- এর বাচ্চা হবে, সেদিন শংকরের বুড়ো বাপের চিল্লানি শোনে কে! যেন ছেলে নয়, নিজেই সে মর্দানির পরীক্ষায় পাস করে গেছে। পাবকী লুকিয়ে লুকিয়ে প্রচুর চোখের জল ফেলেছে, সেও তো চাইত একটা বাচ্চার মা হতে ! কিন্তু তার অশ্রুতে মুলি খেতের অর্ধেকটা হয়ত ভিজে যাবে, কিন্তু আসল কাজের কাজ কিছুই হবে না। শংকর আর ফিরবে না।

মহা শিবরাত্রির সেইদিনটার কথা হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় পাবকীর। গোটা পাহাড়ের আনাচ কানাচ থেকে দেবতারা মানুষের কাঁধের পালকিতে চেপে যাচ্ছে তিনশ বছরের মান্ডি শিব মন্দিরের দিকে। যতদূর চোখ যায় পাকদন্ডী বেয়ে নেমে আসছে রঙিন ছোট ছোট জলুশ। বাচ্চা বুড়ো, মেয়েমদ্দ সবাই আছে, সবার পরনে তাদের পূর্বপুরুষের পোশাক। মেয়েদের মাথা ঢাকা রং বেরঙের ধাটুতে, ছেলেদের মাথায় কাজকরা টুপি। কহাবত এই যে, মান্ডির রাজা বহুবছর যাবত বন্দি ছিলেন পাঞ্জাবের রাজার কারাগারে, মুক্তি পেয়ে শিবরাত্রির দিন তিনি রাজধানী মান্ডুতে পাহাড়ের সমস্ত দেবতাদের দাওয়াত দেন। কিশোরি পাবকী ছিল তার গ্রামের মিছিলে, শংকরের কাঁধে ছিল শিবজির পালকির পেতলের ডান্ডা। কিন্তু সে থেকে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিল বাচ্চা মেয়েটার দিকে, যেন জিজ্ঞাসা, কবে সে ধাটু মাথায় বাঁধবার মতো বড় হয়ে গেল ! আরও কিছু তো ছিল সেই চোখে, পাবকীর রোমাঞ্চ হচ্ছিল, লাল ফুল ছোপ কামিজের নীচে তার হৃদয় যেন ঘোড়দৌড়ে সামিল হয়েছিল।

দুবছর আগের বন্যায় মান্ডি প্রায় ভেসে গিয়েছিল, হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল ব্রিটিশ আমলের বানান সেতু। কিন্তু সেই দুর্যোগের মধ্যেও বিন্দুমাত্র না হেলে দাঁড়িয়ে ছিল মান্ডি শিবমন্দির। এত জাগ্রত যে দেবতা, তার মন্দিরের চত্বরে পেতলের পালকি নামিয়ে টুপি খুলে ঘর্মাক্ত শংকর নিজেকেই হাওয়া করছিল, তার সেই লাল টকটকে মুখ, জুলপি বেয়ে নেমে যাওয়া ঘামের রেখা দেখতে দেখতে পাবকীর হঠাৎ মনে হল চিৎকার করে উঠে সবাইকে জানিয়ে দেবে, শিবজির কৃপায় আজকের দিনে এমন কিছু সে পেয়ে গেছে, যা বাকি জীবন তার সঙ্গেই থাকবে। অন্য মহিলাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গাইছিল মেয়েটা, কিন্তু শংকর আর পাবকীর নজর থেকে থেকে পরস্পরকে জাপটে জড়াজড়ি করছিল, যেন দুই শঙ্খ-লাগা সাপ!

দূর থেকে ভেসে আসা জেহেল- জেনানাদের হাসিঠাট্টার আওয়াজ এবার যেন রাগারাগিতে বদলে যাচ্ছে! কী হল আবার! কম্বলের ওপর শোওয়া অবশ শরীরটাকে পাশ ফেরাতে গিয়ে পাবকী ব্যথায় উ: করে ওঠে। তখনই নজরে পড়ে গরাদের ফাঁকে দুটো জ্বলজ্বলে চোখ। সন্ধের অন্ধকার তখনও ঘন হয়নি বলে জেলের বাতি জ্বলেনি, হুড়মুড় করে উঠে বসতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিল সে, এমনিতেই দুর্বল শরীর, তার ওপর মনে পড়ে যায় আগুনে চোখের পাহাড়ি অপদেবতার ভয়। বিষম খায় সে, তারপর কাশতে কাশতেই শোনে কে যেন ডাকল, মা! ভালো করে কান পাততেই বোঝা গেল ওটা মা নয়, ম্যাও। একটা মুমূর্ষু বেড়ালবাচ্চা, পেট পিঠের সঙ্গে লেগে রয়েছে। গরাদের ফাঁকে সেটা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে সেলের ভেতরে এসে ঢোকে। সেঁধিয়ে যায় নোংরা কম্বলের ভেতরে। মেয়েরা বোধহয় এদিকেই আসছিল, পায়ের আওয়াজে বোঝা গেল ওরা উল্টোদিকে ঘুরে গেছে, কারণ মাথা গিনতি করবার হুইসিল বাজছে ঘন ঘন। এই সন্ধ্যার অন্ধকারকে দুভাগে চিরে তীক্ষ্ণ শব্দের তলোয়ার সবার কানে যেন ঘা করে দিচ্ছে!

গিনতির সময় সবাইকে থেবড়ে বসতে হয়। পাবকীর পাশে নড়বড়ে হাঁটু নিয়ে বসেছিল জসসি। নড়তেচড়তে তার দেরি হয়, ওঠার আগে তাই জসসি সব কথাটুকুই বলতে পারে পাবকীকে। বিল্লির কিসসা। বন্দিমেয়েদের কারও কারও বাড়ি থেকে পরিজন খাবার আনে মোলাকাত বা ইন্টারভিউ-এর সময়। চিঁড়ে,গুড়, কেক, বিস্কুট, যার যেমন সাধ্য। মেয়েরা বিস্কুট খেয়ে বাড়তিটুকু পরে খাবে বলে কাগজে জড়িয়ে রেখে দেয় মাথার কাছে। কেকের এক টুকরো রেখে দেয় খবরিকে ঘুষ দেবে বলে। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে সব সাফ হয়ে গেছে। কে খেল, কে নিল, এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে গালাগালি, মারপিট যখন তুঙ্গে, তখন কেউ একজন দেখেছে সাদা বেড়ালের মতো কী একটা পাবকীর সেলের দিকে ছুটে পালিয়ে গেল। ঐ সেলের দিকটা নির্জন, পেছনে একটা কদম গাছ। তার পাশে উঁচু দেওয়াল জেনানা ফাটককে পুরুষ কয়েদীদের আস্তানা থেকে আলাদা করেছে। কে জানে, ঐ পথেই যাওয়া আসা করে কিনা এই শয়তানের আউলাদটা। লাঠি ছুঁড়ে মেরেছিল, কিন্তু লেগেছে কিনা বোঝা যায়নি। মারমুখো মেয়েগুলো রক্ষীদের একটু বিষ যোগাড় করে দিতে বলে, আর একটু দুধ! ওটাকে একদম শেষ করে দিতে হবে।

কত ছুতোয় তাদের কত মোলাকাত বানচাল করে দেয় কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ভেরিফিকেশন, কাগজ জমা, জেল অফিসে দৌড়োদৌড়ি– কত ঝামেলার পর হা পিত্যেশ করে বসে থেকে তবে তাদের আপনজনের ক্ষণিক দেখা মেলে। মাত্র দশ মিনিট। আর সেই মোলাকাতে পাওয়া আদর আর কষ্ট মাখানো খাবার পেটে যাবে কিনা ঐ নোংরা জন্তুটার! মেয়েরা এমন হাহাকার করতে থাকে, যেন নিষ্ঠুর ডাকাতদল এসে তাদের সর্বস্ব লুটেপুটে নিয়ে গেছে!

পাবকী গিনতি থেকে সেলে ফিরে বাচ্চাটাকে কম্বল দিয়ে ভালো করে ঢাকে। ওদের মাথায় খুন চড়ে গেছে। দেখে ফেললে এটার কপালে মরণ আছে। ঘাড় ধরে বাচ্চাটাকে কম্বলের ভাঁজে ঢোকাতে গিয়ে সে শিউরে ওঠে। বহু বহুদিন আগের একটা স্পর্শের কথা মনে পড়ে সে আমূল কেঁপে ওঠে।

বাচ্চাটা পাকদণ্ডী দিয়ে টলটলে পায়ে নেমে যাচ্ছিল! চরিত্রহীন মা-টা নিজের বাচ্চার ওপর নজর রাখেনা। সবসময় ফষ্টিনষ্টিতেই ব্যস্ত! হ্যাক থু:, এইসব জেনানাদের মুখে। বাচ্চার মা বনে গেল, তবু স্বভাব পাল্টাল না! একহাতে ঘাগড়া সামলে তরতর করে নেমে যায় পাবকী, ডান হাতে ঠেসে ধরে টুপির নীচে বাচ্চাটার ঘাড়। কী নরম আর উষ্ণ সেটা! তুলতুলে রোমশ একটা বেড়ালের ঘাড়ের মতই। বেড়াল বাচ্চার মতই কেঁদে ওঠে বাচ্চাটা, তবে জোরে নয়, কারণ ততক্ষণে সে উঠে গেছে পাবকীর কোলে, কাজ করে করে শক্ত হয়ে যাওয়া দুই বাহুর বন্ধনে। তার বুকের ওপর দুই হাত রেখে শরীরের ওপরের অংশকে পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাটা বড় বড় চোখে দেখতে থাকে, পিছলে নেমে যাবার জন্য দুই পা ছোঁড়ে। কিন্ত পাবকী ছাড়লে তো! এ:, এক্কেবারে মায়ের মুখ বসানো। কেন রে বাচ্চা, বাপের মতো হতে পারলি না? কেমন শিউজির মতো নাদুসনুদুস চেহারা তোর বাপের! মাথায় কেমন ঘন কালো চুল! বাঁহাতের বেষ্টন অটুট রেখে পাবকী থুতনি ধরে বাচ্চাটার মুখ ঘোরায় তার দিকে।

হয়ত অজান্তেই একটু বেশি জোর করে থাকবে, বাচ্চাটা তারস্বরে কেঁদে ওঠে, তারপর রাগ করে একগাদা থুথু ছুঁড়ে দেয় পাবকীর মুখের ওপর।

পাবকী প্রথমে ভ্যাবাচাকা খায়, তারপর রাগ করে বাচ্চাটাকে দুম করে নামিয়ে দেয় মাটিতে। জাত গোখরো সাপের বাচ্চা! যতই আদর করে কোলে নাও, ওর কি মন ভেজে! বাচ্চাটা বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে এক মুহূর্তে কান্না থামায়, তারপর ছুটে পালাতে গিয়ে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে একটা পাথরের ওপর, তারপর আর একটা পাথর, আরও একটা, ওর লাল সোয়েটার পরা ছোট্ট দেহটা তখনও দেখা যাচ্ছে যেন ঝরা লাল পাতার মতো ঘুরে ঘুরে নেমে যাচ্ছে খাদের দিকে আর পাবকীর দুই হাত বাতাসে ভাসছে ওকে ধরে ফেলার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ! ঠিক সেইসময় তার পেছন থেকে কে যেন চিৎকার করে ওঠে, মার ডালা রে! মেরি বাচ্চি কো মার ডালা!

বাচ্চাটার মা! ছেলেকে খুঁজতে এসে কতটুকু সে দেখেছে কে জানে, কিন্তু ক্ষতবিক্ষত পাবকীর যখন জ্ঞান ফেরে তখন তাকে খুন করতে দেখেছে প্রায় সারা গাঁয়ের লোক, পুলিশ চলে না এলে হয়ত পিটিয়েই মেরে ফেলা হত তাকে! সতীনের বাচ্চাকে খুন করা রাক্ষসীকে মেরে ফেললে শিউজিও তুষ্ট হন।

বেড়ালের নরম ঘাড়ে হাত রেখে পাবকী ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। লজ্জায় অপমানে বেদনায় তার বুকটা যেন ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছিল! গত ছ’ মাসে গ্রামের আশেপাশে যত বাচ্চা অপঘাতে মরেছে, সবার বাবা মা তার ঘাড়েই দোষ চাপিয়ে দিল ৷ সে যে রক্তখেকো ডাইন একথা সাবুদ হয়ে গেলে পাবকী প্রথমে লকআপে, তারপর জেলের ভেতর এতগুলো বছর কাটিয়ে দিল। এতদিন পর আবার একটা বাচ্চা, হোক সে পশুর, তার হাতের নীচে এসে আশ্রয় নিয়েছে! যা: যা:, হ্যাট হ্যাট করেও সেটাকে তাড়ানো যায় না, আরও ঘুসটেমুসটে সে কম্বলের ভেতর ঢুকে যায়! বাইরে ঠান্ডা, তাছাড়া কী করে যেন ও টের পেয়েছে সেলের ভেতর ও নিরাপদ।

অসহায় পাবকী চোখ তুলে দেখতে যায় গার্ড তার সেলের দিকে আসছে কিনা! কী করবে এখন সে বাচ্চাটাকে নিয়ে ! কিন্তু গরাদের ওপাশেই যা দেখে তাতে তার চক্ষুস্থির হয়ে যায়! যে মেয়েটির বিস্কুট চুরি হয়েছিল, তাকে মাঝখানে রেখে দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে দুই জাঁদরেল খবরি, পেছনে রুল হাতে গার্ড। এখন কোনো ইনমেটের বাইরে থাকার কথা নয়, তবে খবরিদের হাতে রাখলে জেলের ভেতর সবই হয়। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে পাবকীর। আবার সে প্রবল মার খাবে, ভাবতে গিয়ে যেন তার ধুম জ্বর এসে যায়!

তবু ওদের নির্দেশমতো বাচ্চাটাকে বাড়ানো হাতে তুলে দিতে পারে না। এখনই ওরা এটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা লাল শুকনো পাতার ঘুরে ঘুরে খাদের দিকে চলে যাবার দৃশ্য!

বেড়ালটাকে হাতে তুলে পাবকী পেছাতে থাকে, একসময় তার পিঠ ঠেকে যায় দেওয়ালে। ওরা সমস্বরে হেসে ওঠে, খুনি মাগির আবার কত ঢং! দে দে গলাটা টিপে দে, ঐ তো একফোঁটা বাচ্চা, পায়ে চেপে মেরে দে। নাহলে আমরা ঢুকব তোর সেলে, ওটাও যাবে, তুইও যাবি!

পাবকী এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে যেন ওর কানে কোনো কথাই ঢুকছে না। বেড়ালটাও সব নড়াচড়া বন্ধ করে চুপ করে থাকে তার হাতের ভেতর। যেন দুটো কোণঠাসা পশু মৃত্যু নিশ্চিত জেনে অপেক্ষা করছে কখন লাঠির বাড়ি এসে মাথায় পড়ে!

তারপর সব নিস্তব্ধতা ভেঙে পাবকী হাহাকার করে ওঠে, এ মুঝসে নেহি হোগি ! আমি পারব না! আমি কোনোদিন পারিনি !



লেখক পরিচিতি: প্রতিভা সরকার, একজন ভারতীয় ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্পকার। অনুবাদ কর্মেও তিনি আগ্রহী। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং অধ্যাপক প্রতিভা নিজের পাঠ এবং পেশাসূত্রেই অনেক অনুবাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। রতিভা সরকারের প্রথম উপন্যাস মানসাই। প্রকাশিত হচ্ছে আরও দুটি, রসিকার ছেলে এবং কমলেকামিনীর কিসসা। প্রবন্ধের বই মেয়েদের কথা এবং হননকাল। ছোট গল্প সংকলন ফরিশতা ও মেয়েরা, গুনিন ও বেলেহাঁস, শ্মশানবন্ধু, সদাবাহার।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ