কী অদ্ভুত আলো আঁকে সে। কী অদ্ভুত আঁধার আঁকে। চাঁদ নয়, জোছনা যেন তার কলম থেকেই ঝরে। সেই জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় রাঢ় বাংলার দামোদর অববাহিকার গ্রাম, মাঠ, বন, প্রান্তর। বাঁকুড়ার সোনামুখীর ভূমিপুত্র হামিরউদ্দিন মিদ্যা আমাদের সেই রোদ্দুর মাখা, কুয়াশায় ভেজা, জ্যোৎস্না ভাসা পথে হাঁটিয়ে নিয়ে যান এমন এক লোকে, যে লোক আমাদের চেনা উচিত ছিল কিন্তু চেনা হয়ে ওঠেনি। রাঢ বাংলার এই মানুষগুলোকে জানা উচিত ছিল কিন্তু আমরা সে ভাবে জানার চেষ্টা করিনি। পেশায় অন্নদাতা কৃষক হামিরউদ্দিন মিদ্যার গল্পগ্রন্থ 'মাঠরাখা' আমাদের এক অচেনা বা স্বল্পচেনা বাংলার নাড়ির স্পন্দন অনুভব করায়।
প্রথম গল্প 'ডাকপুরুষ।' তাতেই পাঠক সম্মোহিত হবে৷ এই গল্প রাঢ় বাংলার এমন এক আচার নিয়ে যা সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত এবং হিন্দু-মুসলমান উভয়েই পালন করে। এক ইমাম সাহেব একে 'সেরেকি গোনাহ' ঘোষণা করলেও, এই আচার থেকে গ্রামের মুসলমানদের বিরত থাকার নির্দেশ দিলেও যারা সেই বাপ-পিতামহর সময় থেকে আচার পালন করে আসছে তারা মন থেকে মেনে নিতে পারে না। পাছে তাতে ফসলের ক্ষতি হয়। এখানেই মানুষ ধর্মের গণ্ডী ছাড়িয়ে পরিচয়ে কৃষক হয়ে ওঠে। এবং হামিরউদ্দিনের গল্প আবার মনে করিয়ে দেয় মধ্য প্রাচ্যের মুসলমানদের থেকে ভারতীয় মুসলমানরা অনেক ভিন্ন। ভারতের অন্য প্রান্তের মুসলমানদের থেকে বাংলার মুসলমানরা অনেক ভিন্ন। কারাণ, ধর্মের থেকে অনেক শক্তিশালী ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি।
আর একটি মুগ্ধ করা গল্ল 'নিশিকাব্য।' যে ধান জমি বুজিয়ে বাগান করতে চায় ছেলে, সেই ধানখেতের আলে গভীর রাতে মাছেদের মিছিল দেখে মরিয়মের স্বামী রায়হান। সে মিছিল লৌকিক-অলৌকিকে মেশা। মরিয়ম ও তার স্বামীর রায়হানের সঙ্গে পাঠকও যেন এক মায়াবী বিভ্রমের দেশে চলে যায়।
'কস্তুরী' গল্পটি শেষ হওয়ার পর শিবদাস যেমন তার সারা গায়ে মৃগনাভি কস্তুরীর গন্ধ পায়, তেমন গন্ধ পায় পাঠকও। 'পাতুনি' অর্থাৎ মাটিতে তেরপল বা প্লাস্টিক বিছিয়ে জিনিসপত্র বেচার ব্যবসা করতে হাটে গিয়ে ক্ষণিকের আলাপ সেই রাজস্থানি মেয়েটি ও তার মায়ের সঙ্গে দেখা। মৃগনাভি কস্তুরী বলে তারা যা বেচে তা হয়ত ঝুটো, কিন্তু মেয়েটির লাজুক মুখ, আড় চোখে তাকানো, হাসি, এই সব মিলে যে মুহূর্তের সম্পর্ক তৈরি হয়, তা ঝুটো নয়।
হামিরউদ্দিনের আর একটি অভিভূত করা গল্প 'ডালিম গাছের ছায়া।' চাঁদের আলোয় ডালিম গাছ প্রয়াত কলিম চাচার চেহারা নেয়। বিভ্রম তৈরি হয়। কী করে এল কলিম চাচা? আসতেই পারে। যে জন ভালোবাসে তার ভূত বৈরী হয় না। তাই যে ডালিম গাছকে চাচা দোয়াদরুদ পড়ে ভূত-জিন-পরির আস্তানা হওয়া থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন সেই গাছেই তিনি মূর্ত হলেন।
হামিরউদ্দিনের এই বইয়ের প্রতিটি গল্পই এক একটি হীরকখণ্ড। তবু 'মাঝি' গল্পটির কথা আলাদা করে উল্লেখ করি। ছামু মিয়াঁর বুকের ভিতর দামোদর ছলাৎ ছলাৎ করে, সেই দামোদরে তার মন নৌকা বায়। বাপ পিতামহ নিজের নৌকায় পারাপার করত, কিন্তু এখন ঘাটের ডাক হয়ে পারাপারের জিম্মা অন্যের হাতে। তার অধীনে মাঝিগিরি সে করে ছামু, বউয়ের গালাগালি খায় তবু জন খাটতেও যায় না। । সেই ছামু মিয়াঁর নৌকা নিয়ে যখন তার আলু কুড়িয়ে বেড়ানো কিশোর চছেলে দহের জলে হেঁইয়ো রে হেঁইয়ো ধ্বনি তোলে, তখন ছামু তো বটেই কবরের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা তার দাদো দিলজান মিয়াঁ, বাপ জামিল মিয়াঁও বোধ হয় খুশি হয়।
'পীর সাহেবের আস্তানা। ' আহা, গল্পের কী বুনন, কী নির্মাণ। '.....কালো ঘোড়ার পিঠে চেপে গ্রামের ঈশান কোণ থেকে সাদা আলখাল্লা পরা, মাথায় পাগড়ি, মুখে চাপদাড়িওয়ালা এক বান্দা নাকি আল্লাহর প্রেরিত কোনও অলি টগবগ টগবগ শব্দ তুলে ঝড়ের গতিতে এসে আস্তানার বুড়ো নিম গাছটার তলায় থামল।' পড়ছি না চোখে দেখছি গুলিয়ে যায়। এই গল্পের নহুরা বুড়ি, পীরের থানে সিন্নি দিতে আসা বুড়ি ও তার নাতনি, যেন জ্যান্ত সব চরিত্র।
'জলকুলি।' এই গল্পে ঝগড়া করে ভিন্ন হয়ে যাওয়া, বাপ মায়ের মুখ আর না দেখতে চাওয়া ছেলে মাঘারাম যখন একশো দিনের কাজের প্রকল্পের কাজে মাটি কাটতে গিয়ে ছাতিফাটা প্রখর রোদে জলকুলি বাপ গুহিরামের হাত থেকে জল খায় তখন গুহিরামের মত সব বাপেদেরই বুক তোলাপাড় করে ওঠে।
'উড়োকাক' গল্পে মেলায় মেলায় পাতুনির ব্যবসা করে বেড়ানো শিবদাসের সঙ্গে যেন পাঠকও ভাঙা মন নিয়ে নদীর তীরে বসে থাকে নৌকার অপেক্ষায়।
গল্প আছে অনেক। অল্প কথায় সব নাই বললাম। হামিরউদ্দিন মিদ্যার 'মাঠরাখা' বইটির গল্পে এন আর সি, করোনা কাল, মাঠে ধান কাটার যন্ত্রের দাপাদাপি এমন বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উঠে আসে, তা সাম্প্রতিক জনজীবনের দলিল হয়ে যায়। ধান কাটার যন্ত্র আসায় চাষির যেমন সুরাহা হয়েছে তেমন রুখু মাটির দেশ থেকে নাবাল জমির দেশে জন খাটতে আসা কৃষিশ্রমিক ঝিনুকদের পেটে টান পড়েছে। এই সত্য এত বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উঠে আসা বড় সহজ নয়। ধানকাটার যন্ত্র দেখেছি, কিন্তু তার অভিঘাত নিয়ে গল্প এই প্রথম পড়লাম। এই বইয়ের গল্পগুলিতে ধান ডাকা, কান-টু দেওয়া, মাঠারাখার মত বাংলার কত প্রথা উঠে আসে। কারণ, এই গল্পগুলি ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা গ্রামের গল্প নয়, গ্রামের বুকের ভিতর বসে লেখা। আর একটা কথা, এই বাংলার মুসলমান সমাজের রীতিনীতি, লোকাচার সম্পর্কে আজও আমারা অনেকটাই অজ্ঞ। ঘরের পাশের আপনজন সম্পর্কে এই অজ্ঞতা নিয়ে আমাদের কোনও অপরাধবোধও নেই। তাই সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আবুল বাশার বা এখনকার অন্য লেখকরা যারা নাম পরিচয়ে মুসলমান, তাঁরা যখন লিখেছেন একমাত্র তখনই তার উপর আলো পড়েছে। খুব কম অমুসলমান বাঙালি লেখক বাংলার মুসলমান সমাজের বিশ্বাসযোগ্য ছবি আঁকতে পেরেছেন। গৌরকিশোর ঘোষরা ব্যতিক্রমই। হামিরউদ্দিনের লেখায় রাঢ বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকাচার, ঐতিহ্য ও বিভেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে৷ এও এক প্রাপ্তি।
'মাঠরাখা' গল্পটির প্রসঙ্গ এনে শেষ করি।
'জমির মালিক হয়ে কী হবে রে! গোটা মাঠটার মালিক হয়ে যাবি। আলের উপর লাঠি হাতে যখন দাঁড়াবি, সেই মাঠটাই তুর।' নাসেরের বাপ তাকে এই কথাই বলেছিল। কিন্তু রাতের মাঠের রাজা মাঠরাখা হলেও দিনের আলো ফুটলেই জমির মালিকানা হস্তান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু আমি, এক বাপ হয়ে বলছি হামিরউদ্দিন, তুমি আমার ছেলের থেকে এক বছরের বড়, তাই ছেলের মতই। ধর কিনা ছেলেই। তুমি বাপ বাংলা সাহিত্যের যে মাঠের দখল নিলে, সে মাঠ বরাবরের জন্য তোমার হয়ে গেল। দিন হোক বা রাত, ও মাঠ তোমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। ভালো থেকো বাপজান। বাংলা কথাসাহিত্যের মাঠের দখল আরও পোক্ত করো।


0 মন্তব্যসমূহ