আজকের দিনটা গত সপ্তাহের পরিকল্পনা আর আন্তরিক ইচ্ছের ওমে নির্ধারিত হয়েছিল। অলিখিত চুক্তিতে ছিল বাঁধা রুটিনের আর্গল খুলে সময়কে নিজের মতো বইতে দেবার প্রতিশ্রুতি। পূর্বনির্ধারিত জায়গায় পৌঁছানোর আগেভাগে বুকভরতি ফুর্তি নিয়ে ওরা যে যার গাড়ির গতি তুলেছিলেন। আজ তারা দুদণ্ড নিজেদের মতো সময় কাটাবেন। যেখানে কলিগদের অযৌক্তিক কথার ঘায়ে খালিদকে মুহূর্তের জন্যও কোণঠাসা দেখাবে না। থমাস আরনল্ডও আজ নিজের ঘনায়মান ক্ষোভ বশে রাখতে ধোঁয়ার আশ্রয় নিতে ছুটবেন না যখন তখন। ধূমপান প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। ইদানীং আবার তাকে ঘনঘন স্মোকিংজোনে ঢু দিতে দেখা যাচ্ছে। স্পর্শকাতর ইস্যু, চাইলেও মুক্তকচ্ছ হওয়ার উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অদৃশ্য ডেকোরাম নীরব সর্তকতায় আটকে দেয়। খালিদের ধৈর্য তাকে মুগ্ধ করলেও নিজে সেই বৃত্তে দাঁড়াতে ব্যর্থ।
গত কয়েকদিন টিভিতে লাগাতার হামাস কথিত ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’-এর খবরাখবর ঘুরেফিরে প্রচারিত হচ্ছে। তার ছুতোয় ডিপার্টমেন্টের অধিকাংশেরই হঠাৎ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল হয়ে ওঠা অসহ্য। জ্ঞানপাপীরা যখন একচোখা অন্ধের আচরণ করেন তখন সেটা মুখবুঁজে সহ্য করা কঠিন। শিক্ষার্থীরা হলেও না হয় মানা যেত। লিখিত ইতিহাসের চাইতে যাদের জ্ঞানার্জনের পরিধিতে একপেষে সংবাদের গুরুত্বই বেশি। একতরফা ভাবনার বৃত্তে আটকে থাকাদের কাছ থেকে দুজনের কেউই আর সৎ মতামত আশা করেন না। কলিগদের কাঠগড়ায় একতরফা অপরাধী হামাস এবং তাদের জঘন্যতম অপরাধ সাম্প্রতিক হামলা। ওরা দুজন কোনোভাবেই সে হামলার পক্ষে নন। তাদের প্রশ্ন সোজাসাপটা। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে কেন প্রয়োজন হলো হামলার? বিশ্ব রাজনীতির মাঠে ছড়ি ঘোরানেওয়ালাদের দায় নেই এতে? কেন সত্তর বছরের রক্তাক্ত ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছে দেশহীন এক ভূখণ্ডের মানুষ! এ যেন রাজ্যহীন রাজা-প্রজার করুণ গল্প।
সিরিয়ার ইয়ারমুক শিবির থেকে আজকের ডক্টর খালিদ হোসাইনের যাত্রার শুরুটা ছিল কেবলি দীর্ঘশ্বাস, গোপন অশ্রু আর ক্ষরণের ধারাপাত। জীবন বাঁচানোর তাগিদে মা-বাবা, ভাইবোনের সঙ্গে খালিদ যখন পালিয়ে আসেন, তখন তিনি নিতান্তই শিশু। দেশ কী, কেমন ইত্যাদি বোঝার বয়স তিনি পার করেছেন উদ্বাস্তু শিবিরে। মায়ের মুখে নিরন্তর দেশের গল্প শুনেছেন। বাবার কর্মহীনতার দীর্ঘশ্বাসে লেপটে থাকতো দেশ, তার গ্রামের বাড়ি, আর জলপাই বাগানের পরিশ্রমী দিনের ঘ্রাণ। বড় দুই ভাইবোনের গল্পগুলোও গচ্ছিত ছিল সেই ভূখণ্ডের মাটিতে। যেখানে তারা ফেলে এসেছে অজস্র আনন্দমাখা জীবনের একটা অংশ। সে জীবন জুড়ে থাকা বন্ধুসকল, ভোকাট্টা ঘুড়ির মুক্ত আকাশ, ছেঁড়া মালা, রঙিন পাথরের গুপ্তধন। যে গুপ্তধন বাড়ির পেছনের কুয়ার কাছে নুয়েপড়া খেজুর গাছটার খোদলে কাপড়ে বাঁধা পুটলিতে আপা রেখে এসেছে। দিনমান একটা হারিয়ে ফেলা দেশের গল্প শুনতে শুনতে তার মগজের কোথাও সেই দেশটার স্হায়ী ছাপ পড়ে গেছে। তার উদ্বাস্তু পরিবার যেভাবে বুকের পাঁজর ঘেষে প্যালেস্টাইনের মানচিত্র বয়ে বেড়ায়, হুবহু সেরকম একটা মানচিত্র তার বুকেও কখন সেঁটে বসেছে।
যেদেশটা চোখের দেখাও দেখেননি খালিদ। সন্তর্পণে সেদেশটাকে তিনিও বয়ে বেড়ান। সেটা ইয়ারমুককে পাশে রেখেই। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর জেনেছেন ইয়ারমুক তার প্রথম আশ্রয়স্হল। শেষ হয়তো নয়। তার নিরন্তর মানসিক গন্তব্য না দেখা দেশ, হারানো সুবর্ণ প্রান্তর- প্যালেস্টাইন। যে দেশটা বইয়ের অক্ষরে আর তাদের ইয়ারমুকের বাড়ির ড্রয়ংরুমে ঝোলানো মানচিত্রে রয়ে গেছে। বাস্তবে তার স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। খোদার সৃষ্টি এই মহাবিশ্বে তিনি বুঝি অবাঞ্ছিত, উদ্বাস্তু হিসাবে যেকোনো স্থানেই তার জন্য সর্বাগ্রে একটি ঘর হয়তো হতে পারে, তার বেশি কিছু কী সম্ভব? কেউ যদি জানতে চায় দেশ কোনখানে, দ্বিধাহীন খালিদের উত্তর, "আমি ফিলিস্তিনের অমুক গ্রাম থেকে এসেছি।" সঙ্গে যুক্ত করেন,
“আই এ্যামব্রেসড অ্যা নোম্যাডিক লাইফস্টাইল, ফাইন্ডিং অ্যা ওয়েলকামিং হোম ইন অ্যা ফরেন ল্যান্ড দ্যাট বিকেইম মাই ওঊন সভ্রেন নেশান।”
খালিদ কথা শেষ করতেই সকৌতূকে বলে ওঠেন অন্যজন, “মী টুউ, মী টুউ! ..সো, উই আর টু নোম্যাডস। দ্য ফরেন কান্ট্রি হ্যাজ বিকাম আওয়ার ওঊন কান্ট্রি আফটার ইট বিকেইম আওয়ার ওঊন।”
কথাগুলো যেন ভীষণ কৌতুককর, যা শেষ হওয়ামাত্র তারা দুজনেই ছেলেমানুষের মতো হেসে গড়িয়ে পড়েন। তাদের একজন, এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখচোরা শিক্ষক হিসেবে পরিচিত খালিদ হোসাইন। অন্যজন বাদামি চমড়ার একমাথা কালোচুলের থমাস আরনল্ড। পূর্ব কর্মস্হল কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়, মাস দেড়েক হলো তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে এক্সটারে যোগ দিয়েছেন। এতক্ষণ তিনি মনোযোগী শ্রোতার খোলসের ভেতর বসে খালিদের গল্প শুনছিলেন। তিনিও তার গাম্ভীর্য আর যাবতীয় আড়ালের পর্দা ছিঁড়েখুঁড়ে, মোহিম গাজী হয়ে নিজেকে মেলে ধরলেন খালিদের সামনে। তাদের যৌথ হাসির যুগলবন্দির দোলা রেস্তোরাঁর নিরিবিলি চিবুকে সামান্য চির ধরানো ছাড়া আর কোথাও তেমন ছন্দপতন ঘটালো না। মাপা দূরত্বের টেবিলগুলোতে নিজেদের মধ্যে আলাপে মগ্ন শরীরগুলোও থেকে গেল হেলদোলহীন।
মুখে ঝুলে থাকা হাসি আরেকপরত উসকে দিয়ে থমাস আরনল্ড, যাকে আমরা এরপর থেকে মোহিম গাজী হিসেবে জানবো, আবারও সরব হন। যেন শোনানো নয়, নিজেকেই বলা,
“বাট মাই স্টোরি ক্যারিজ অ্যা টুইস্ট, ব্রাদার। অই’ম অ্যা ওয়ার চাইল্ড, অ্যা প্রোডাক্ট অফ দ্য টোমালটুয়েস ওয়ার অফ নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান ইন বাংলাদেশ। কানাডা বিকেইম মাই স্যাংচুয়ারি, হোয়ার দ্য আরনল্ড কাপল্ এমব্রেসড মী অ্যাজ দেয়ার ওঊন। মাই বার্থ মাদার, প্লেজড বাই মেন্টাল ইলনেস, রিমেইন্স অ্যা পেইনফুল মেমোরি। অ্যাট টাইমস, আই ফেল্ট দ্য ওয়েট অফ শেম, হেজিটেন্ট অফ ক্লেম হার অ্যাজ মাই ওঊন. বাট অ্যাজ টাইম পাসড, দ্য শেম ডিসল্ডভ, লিভিং অনলি হার ইমেজ হ্যাঙিং অন দ্য ওয়াল অফ মাই কনশাসনেস। ডিস্পাইট দ্য ডিফারেন্সেস ইন আওয়ার ন্যারেটিভস্, উই শেয়ার অ্যা কমন থ্রেড অফ ডিসপ্লেসমেন্ট, ফাইন্ডিং সলেস অ্যাজ স্টেটলেস ইনডিভিজুয়ালস শেল্টারড ইন ফরেন ল্যান্ডস। উই প্যাসেঞ্জারস অফ ফেইট, আর আকিন্ টু ব্রাদার্স নেভিগেটিং দ্য সেইম টারবুলেন্ট ওয়াটার্স!”
দীর্ঘ বক্তব্যের ভেতর কখন টুপ করে তার মুখের হাসি খসে গেছে। কৃষ্ণঘন মেঘ রোদের চিহ্ন মুছে আকাশকে যেভাবে অন্ধকারে ছেয়ে ফেলে; মোহিম গাজীর হাসি সেভাবে মুছে গিয়ে মুখ জুড়ে এখন বিষণ্নতায় থইথই। তিনি হালকা চালে কথা শুরু করেছিলেন। পাঁজর খুলে বেরিয়ে আসা ক্ষরণের উৎসমুখে রাশটানার প্রয়োজন দেখাননি। তার নাম-পদবীর সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন চেহারা, গায়ের রং ইত্যাদি নিয়ে অনেকের ভেতর জেগে ওঠা সপ্রশ্ন অভিব্যক্তি দেখে তিনি অভ্যস্ত। ব্যক্তিগত পরিচয়ের গাঢ়বৃত্তের বাইরের কারো সঙ্গে নিজের জন্মপরিচয়ের ইতিবৃত্ত প্রকাশের আগ্রহ ইতঃপূর্বে তিনি দেখাননি।
কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টানে প্রথমে খালিদ, এরপর মোহিম তালুতে মেলে ধরেন স্ব স্ব হৃৎপিণ্ড। দুজনের বন্ধুত্ব খুববেশি দিনের নয়। এত সল্প পরিচয়ে কারো সামনে নিজেকে মেলে ধরা খালিদের মতো মোহিম গাজীর নিজের কাছেও বিস্ময়ের। তবে কথাগুলো বলে দুজনেরই হালকা লাগছে। গলার কাছটায় দলাপাকানো অনুভূতিটুকু চালান দিয়ে খানিকটা জোর করেই হাসি টানার চেষ্টা চালালেন মোহিম গাজী। কিন্তু পোড়া চোখদুটো সঙ্গ দিতে চাইলো না। এমুহূর্তে ওদুটো বিষাদঘন মেঘেদের ল্যান্ডিং স্পেস। চোখে বুঝি কিছু পড়লো খালিদের। সৌজন্যতা ভুলে, দুজন পূর্ণবয়স্ক, মার্জিত মানুষ, নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একজন দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলেন, অন্যজনের হঠাৎই মনে পড়ে গেল ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট ঘেটে একটা নাম্বার খোঁজা খুব জরুরি।
***
সেদিন খালিদ হোসাইনের সঙ্গে আড্ডা শেষে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে রাতঘুমে মোহিম গাজী স্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন, বিরাট উঠানজোড়া একটা বাড়ি, সেই বাড়ির নিকানো উঠানে বসে আছেন এক নারী। আটপৌড়ে শাড়িতে ঢাকা তার শরীরটা স্পষ্ট, কিন্তু মুখটা আবছায়া। ওই গ্রামের নাম তিনি জানেন, লেবুতলা। যে গ্রামের মাটিরগন্ধ তার হৃৎপিণ্ডে গচ্ছিত আছে। স্বপ্নে মহিলার মুখটি দেখতে না পাওয়ার ব্যর্থতায় ছটফটিয়ে তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি নিশ্চিতভাবেই জানেন স্বপ্নে দেখা মহিলার পরিচয়। এস্বপ্ন তিনি আগেও বহুবার দেখেছেন। তার বাম ঊরুর একটু উপরদিকে জন্মদাগটির মতো নারীটির পরিচয় লেপটে আছে তার অস্হি-মজ্জায়।
জন্মদাত্রীর মুখটা দেখবার ইচ্ছায় মোহিম গাজী লাল চমড়া মোড়া ডায়েরিটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পেলেন না কোথাও। একবুক তৃষ্ণা নিয়ে গোটা রাত তিনি প্রায় বিনিদ্রই কাটিয়ে দিলেন। তিনি স্পষ্ট মনে করতে পারেন, কানাডা থেকে আসবার সময় ডায়েরিটা সঙ্গে নিয়েছিলেন। তার ভেতরে রেখেছিলেন ছবিটা। লাল চমড়া মোড়া ডায়েরিটা তার খুব প্রিয় এবং মূল্যবান। যখন যেখানে যান জরুরি জিনিসপত্রের সঙ্গে সেটি নিতে ভোলেন না। ডায়েরিটা যোশেফ আরনল্ডের, যাঁকে তিনি ড্যাড ডাকতেন। মাতৃভাষা তিনি আজও ভুলেননি, কিন্তু তাসত্ত্বেও যোশেফকে ‘বাবা’ ডাকা হয়নি। যেমন ক্যাথরিনকে ‘মা’ ডাকতে পারেননি কোনোদিন। যে ডাকের নেশা প্রায় তাকে নিশির মতো হাতছানি দেয়। মৃত্যুর আগে যোশেফ ডায়েরিটা তাকে দিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের কোথায়, কোন জেলা থেকে তাকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল, জন্মদাত্রী মরিয়ম বেগম, তাকে পিতৃপরিচয় দেওয়া মোক্তার গাজীর নামধামসহ লেখা রয়েছে যাবতীয় বৃত্তান্ত। আর রয়েছে সাদাকালো একটি ফটোগ্রাফ।
পালিত বাবা-মা, যোশেফ ও ক্যাথরিন আরনল্ডের সঙ্গে তার সম্পর্কে কোনো আড়াল ছিল না। আট বছর বয়সের একটা ছেলের পক্ষে যেভাবে বোঝা সম্ভব, সেভাষাতেই তাঁরা তাকে বুঝিয়ে ছিলেন। জন্মের ওপর কারো হাত থাকে না। ঈশ্বর নিশ্চয়ই তার জন্য এমন কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। নিয়মকানুন মতো নাম বদলে থমাস আরনল্ড রাখা হলেও ঈশ্বর অন্তপ্রাণ ওই দুজন তাকে কখনও ধর্ম নিয়ে জবরদস্তি করেননি। ধর্মহীন মুক্ত মানুষ হিসেবে বড় হয়েছেন তিনি। তার বাইরে, যোশেফ-ক্যাথরিন ছেলের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য যে শ্রম দিয়েছিলেন সেও ব্যর্থ হয়নি। নিজেকে সফল এবং প্রতিষ্ঠিত হিসেবে দাঁড় করাতে তিনি সমর্থ হয়েছেন। এ জীবনে সফল না হতে পারলে কী আসতো যেত? খালিদের প্রশ্নের উত্তরটা তিনি দিতে পারেননি। উত্তর যে তার অজানা এমন নয়। তিনি বিশ্বাস করেন খালিদও সেটা জানেন। অকৃতকার্য মানুষকে আজীবন ব্যর্থ জীবনের ভার বয়ে বেড়াতে হয়। সফল মানুষ চাইলেই ব্যর্থতাকে ধুলোর মতো ঝেড়ে সামনে এগোতে পারেন। সত্যিই কি পারেন? হ্যাঁ, পারেন। অন্যেরা তাতে কতটা সফল তার জানা নেই, তবে তিনি হবেন, আত্মবিশ্বাসটা তার ভেতর স্বস্তি ছড়ালো।
হয়তো একারণেই যোশেফ তাঁর ডায়েরিতে ছেলের বিগতজীবনের ঠিকুজি লিখে গেছেন। তিনি যেন জানতেনই একদিন মোহিম গাজীর নাড়ীতে ঠিক টান পড়বে। সেদিন যদি তিনি জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজে বাংলাদেশ যেতে চান তার হদিস দেবে লাল চামড়ামোড়া ডায়েরি। মস্তিষ্কবিকৃত, দশপুরুষের হাতে লাঞ্ছিত একজনকে জীবন থেকে ঘষে মুছে, নতুন জীবনে খাপ খাওয়ানোকেই তিনি জরুরি মনে করেছিলেন একসময়। দুজন চমৎকার মানুষের কারণে তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। নাম, শিক্ষা, খ্যাতি সব পাওয়া হয়েছে। তারপরও যেন কী এক শূন্যতা তাকে মাঝেমধ্যেই সর্বস্ব হারানো ভিখিরিতে পরিণত করে দেয়।
স্মৃতি উজিয়ে তাকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় লেবুতলা গ্রামের বাড়ির উঠানে। ঘরকন্যায় ব্যস্ত আপত এক গৃহিণী, আচমকাই যিনি নিজের অতীত বর্তমান সব ভুলে হয়ে ওঠেন অন্য মানুষ। আবছা কিন্তু যাতনাময় কোনো স্মৃতি যার যাবতীয় সুস্হতা কেড়ে নেয়; তাকে বোধ-অবোধের এক অসহ্য ঘেরাটোপে বন্দি করে ফেলে। তিনি তার সমস্ত ক্ষোভ-ঘৃণা আট বছরের ছোট্ট এক বালকের ওপর ঢেলে দিয়ে যেন স্বস্তি খোঁজেন। হ্যাঁ, ওইমুহূর্তে বালক মোহিম গাজী সেরকমই দেখেছেন। দিনগুলো আজও তার স্মৃতির খোপে জীবন্ত।
এখন তার বুঝতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না, কেন তাকে চোখের সামনে দেখলে তাঁর পাগলামির মাত্রা বেড়ে যেত। কেন ভাঙচুর করতেন, নিজেকে আঘাতে ক্ষত বিক্ষত করতেন আরো বেশি। তার জন্মের পরপরই তাই মোহিমকে দুরসম্পর্কের এক বোনের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মোক্তার গাজী। অকস্মাৎ বোন মারা যাওয়ায় বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। বাধ্য হয়ে তখন ছেলেটাকে বাড়িতে আনতে হয়। পারতপক্ষে মরিয়মের সামনে যেন না পড়ে যায়, তাকে সেভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একই বাড়িতে থাকবে অথচ দেখা হবে না তাই কি হয় নাকি! মাঝেমধ্যে দেখা হয়েই যেত। যখন সুস্হ থাকতেন তখন তেমন সমস্যা হতো না। কিন্তু বিস্মৃতিতে আক্রান্ত মরিয়মের সামনে পড়লে সেদিন আর রক্ষা ছিল না। ছেলে প্রাণের ভয়ে কোথায় গিয়ে যে লুকিয়ে পড়তো। তার ভীষণ অবাক লাগতো, আবার রাগও হতো এ কেমন ব্যবহার? অন্যের ছেলে বলেই তাকে দেখলে যাতা গালাগালি, মারধোর করতে হবে! নানা কাজে কামলা দেওয়া লোকজনের অভাব ছিল না মোক্তার গাজীর বাড়িতে। তাদেরই কেউ কেউ উপযাজক হয়ে ছেলের কানে দেয়– বেটি তোর মা লাগে জানোস না? বেজন্মারে কে আদর সোহাগ করে জাউরা... ইত্যাদি। অতটুকু ছেলের মাথায় কথাগুলো ঢুকতো না ঠিকঠাক। মনে হতো তার সঙ্গে মজা করছে হয়তো। প্রায় দিনই কেউ না কেউ তাকে একই কথা শোনাতো ঘুরেফিরে। জাউরার অর্থ জানা না থাকায় গা করেনি প্রথম প্রথম। যেদিন বালক মোহিম শব্দটার অর্থ জানতে পারে সেদিন বাড়ি থেকে লাপাত্তা হয়ে যায়। টানা প্রায় কয়েকঘন্টা সে মসজিদ ঘরে লুকিয়ে ছিল। স্রেফ কলের পানিতে পেট ভরিয়েছে। নিজের জন্ম পরিচয়ের এমন মর্মান্তিক সত্যি উদঘাটনের পর মরে গেলেই ভালো ছিল ভাবনা তাকে যথেষ্ট কাবু করেছিল। ভাগ্যিস দিনটা শুক্রবার ছিল। নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার মুখে মোক্তার গাজীর চোখে পড়ে যায় মোহিম। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন।
বাড়ি ফেরার পথে অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, “পরিস্হিতির চাপে মরিয়ম বেগমকে তাঁর বিয়ে করতে হয়েছিল। সমাজ-সংসার যখন মরিয়মদের মতো যুদ্ধাক্রান্ত নারীদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, সদ্য যুদ্ধ ফেরত মোক্তার কর্তব্যবোধের খাতিরে স্মৃতিশক্তিহীন, অন্তঃসত্ত্বা অসহায় মরিয়মের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ওর সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজন মিটিয়েছেন। মরিয়মকে বিয়ে করেছেন ঠিকই, কিন্তু না পেরেছেন তাকে ভালোবাসতে, না পেরেছেন স্ত্রী হিসাবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে। স্মৃতিহীনতার কারণে বর্তমানটাই মরিয়মের কাছে সত্যি। নিজেকে তিনি মোক্তার গাজীর সংসারের একছত্র কর্ত্রী ভাবেন।”
ওদিকে ঘটনার গুরুত্ব বুঝে এবং তার সমাধানে মোক্তার গাজী দ্রুত ব্যবস্হা নেন। তার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, এবাড়িতে ছেলেটার কোনো ভবিষ্যৎ নাই। কী করা যায় সে নিয়ে পরামর্শ করতে তার ক্ষমতাশালী আত্মীয়ের কাছে ছুটে যান। সেই আত্মীয়ের মাধ্যমে খোঁজ পান এক বিদেশি এনজিওর, যারা এধরনের শিশুদের সন্তানহীন পরিবারের হাতে তুলে দেবার ব্যবস্হা করে। সেই সূত্রে আরনল্ড দম্পত্তির খোঁজ পান মোক্তার গাজী। মোহিমকে যখন তাঁরা দত্তক পুত্র হিসেবে কানাডা নিয়ে যান, মোক্তার গাজী তখন খুব চেয়েছিলেন শেষবারের মতো ছেলেটা অন্তত মায়ের সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটাক, মায়ের সামান্য আদর মেখে নেবার সুযোগ পাক। আশ্চর্যজনকভাবে মোহিমের চলে যাওয়ার দিনটাতে মরিয়ম বেগম একদম স্বাভাবিক ছিলেন। মোহিম কার ছেলে, কোথায় বাড়ি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করেন সস্নেহে। পাশে বসিয়ে তাকে ভালোমন্দ খাওয়াতেও যত্নের ত্রুটি রাখেন না। বিদায়ের সময় মরিয়ম বেগমকে তিনি বলে উঠতে পারেননি, “শেষবারের মতো ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে একটু আদর করে দাও।” হিতেবিপরীত হয় কিনা, সেই আশঙ্কায় নিজেকে সংযত রাখেন। তবে ছেলেটাকে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলতে ভুলেননি, “বাবা সারাদিন উনি তোমার কত খাতির-যত্ন করলেন। যাবার সময় একটু জড়ায়ে ধরবা না? কসমবুসি করে দোয়া নাও। শরম কিসের, উনি তো তোমারই মা।” আচানক বালক মোহিম ভীষণ এক ঘৃণায় ছিটকে সরে গিয়েছিল সেদিন। মুখচোখ শক্ত করে অনুচ্চকণ্ঠে জানিয়েছিল– ‘ওই বিটি আমার মা না!’
বয়সজনিত কারণে সেসময় সবটা আত্মস্হ করা তার পক্ষে হয়তো সম্ভব হয়নি। অনেক পরে, মোক্তার গাজীর কথাগুলো হারানো টুকরোর মতো জুড়ে গিয়ে তার অতীতজীবন পাজলকে মূর্ত করে তুলেছিল।
ঘুরেফিরে তার ভাবনায় বিগত দিন বহুবার হানা দিয়ে গেছে, কিন্তু তিনি আমল দেননি। গতকাল খালিদ হোসেইন বুঝি তার বোধের দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে দিয়েছেন। সত্যিই তো, একটা দেশের স্বাধীনতায় যে নারী তার সর্বস্ব উৎসর্গ করতে পারেন, তাঁকে অসম্মান করাও যে পাপ। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকায় তার মায়ের রক্ত অশ্রুকে তিনি এতদিন অস্বীকার করে এসেছেন কোন বিবেচনায়! খালিদের কথাগুলো তিনি ভাবেন, আর আক্ষেপে পোড়েন। চাইলেই মানুষ তার জন্মভূমি, রক্তকে অস্বীকার করতে পারে না। তিনি পেরেছেন, এমন ভাবনায় এতদিন নিজেকে ভুলিয়ে রেখেছিলেন। তার জানায় ভুল ছিল। চরম সত্যিটা সপাটে বাইরে আসবার সুযোগ না পেয়ে স্রেফ চাপা পড়েছিল। নইলে যোশেফের দেওয়া ডায়েরিটা কেন তিনি আগলে রাখেন অতি মূল্যবান সম্পদের মতো? সেটার খোঁজে কেনইবা এতটা হন্য হয়েছেন। তার ভেতর তৈরি হওয়া এই চঞ্চলতার উৎস কি?
দিন শুরুর যাবতীয় কোলাহল তার বহুতল আ্যাপার্টমেন্টে এসে পৌঁছায় না। কিন্তু এরই মধ্যে মিষ্টি রোদ দিব্যি ব্যালকনির দখল নিয়েছে। নরম রোদে দাঁড়িয়ে, নতুন দিনের শুরুতে মোহিম গাজী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, তিনি তার জন্মভূমি বাংলাদেশে যাবেন। তার মৃত মাকে বুকে জড়িয়ে ধরবার সুযোগটা তিনি হেলায় হারিয়েছেন। অন্তত তাঁর কবরটা দেখে আসবার সুযোগ তিনি হাত গলে পড়ে যেতে দেবেন না। তার বীরাঙ্গনা মায়ের কবর ছুঁয়ে তিনি শুদ্ধ হবেন, কালিমা রাখবেন না।
------------
লেখক পরিচিতি: নাহার তৃণা। জন্ম ঢাকায়। বর্তমানে ইলিনয়ে বসবাস। মূলত গল্প লেখায় ঝোঁক। পাশাপাশি অনুবাদ, প্রবন্ধ, সিনেমা- সাহিত্য সমালোচনা লিখে থাকেন। দুই বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে নিয়মিত লিখছেন। একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ ‘পেন্সিল পাবলিকেশনস প্রতিভা অন্বেষণে তার “স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট”, সেরা গল্পগ্রন্থ নির্বাচিত হয়। প্রকাশিত গ্রন্থ: স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট(পেন্সিল প্রকাশনী-২০২০), একডজন ভিনদেশি গপ্পো, অনূদিত শিশুতোষ গল্প সংকলন(অন্বয় প্রকাশনী-২০২০), দূরদেশের গল্প, অনূদিত গল্পসংকলন(চৈতন্য প্রকাশনী-২০২২), নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা ও অন্যান্য গল্প(জলধি প্রকাশন-২০২২), ভিনদেশি গপ্পো, অনূদিত শিশুতোষ গল্প সংকলন(চলন্তিকা প্রকাশনী-২০২৩) ‘ভিনদেশি গপ্পো’ চলন্তিকা পান্ডুলিপি পুরস্কারপ্রাপ্ত বই হিসেবে প্রকাশিত। গল্পপাঠ নির্বাচিত জাপানি গল্প সংকলন(যৌথ সম্পাদনা- কবি প্রকাশনী২০২২), গল্পপাঠ নির্বাচিত লাতিন আমেরিকান গল্পসংকলন (যৌথ সম্পাদনা- কবি প্রকাশনী ২০২২)। একক সম্পাদিত গ্রন্থ: গল্পপঞ্চাশৎ, কবি প্রকাশনী, অক্টোবর, ২০২৩। ২০২৪ সালে তার দুটি অনূদিত বই প্রকাশিত হয়। একটি টনি মরিসনের উপন্যাস, ‘সুলা’, কবি প্রকাশনী। অন্যটি আমেরিকান মিশনারি জিম ম্যাকিনলির মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা, যার বাংলা শিরোনাম: মৃত্যু পেরিয়ে জীবন, বইটির প্রকাশক অনুপ্রাণন।

2 মন্তব্যসমূহ
দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার চমৎকার ব্লেন্ড ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন গল্পকার। খুব ভাল গল্প।
উত্তরমুছুনবিপুল প্রাণ আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা। খুব কষ্টের গল্প। পড়তে গিয়ে চোখে পানি এসেছে।
উত্তরমুছুন