হামিরউদ্দিন মিদ্যার গল্প: হাসিনার ঘরকন্না





হাসিনার মন উদাস। হাসিনার খিদে নেই। হাসিনার চোখে নিন্দ নেই। হাসিনার মনে আনন্দ নেই। হাসিনা চুল আচড়াতে ভুলে যাচ্ছে। হাসিনা তরকারিতে নুন দিতে ভুলে যাচ্ছে— হাসিনার হয়েছে কী! নতুন বউ,এমন মতিভ্রম কেন! শাশুড়ি জয়গন বেওয়া ছেলের বউকে নিয়ে বড়ই দুশ্চিন্তায় পড়েছে।

সবে দিন দশেক হল জয়গন ছেলের বিয়ে দিয়ে বউ এনেছে ঘরে। মনিরুল একটু হাবাগোবা প্রকৃতির,মেঠো মানুষ। খাইদাই,আর সারাদিন খেতেখামারে খাটে। সে লাঙল চালায়,ভুট্টা ফলায়,পাট ফলায়,শীতকালে আলু,ফুলকপি,নানান শাকসবজী ফলায়। জয়গনের ঘরে খাওয়া-পরার অভাব তো নেই। তা তুমি কোন রাজার বেটি গা! তুমার বাপের ভালো ঘর নাই,দুয়োর নাই,চাষের ভুই নাই, গাঁয়ে গাঁয়ে মশারি-গামছা বেচে বেড়াই। তুমাকে কত ভালোবেসে আপন করে আনলাম এই ভেবে, যে ছেলেটা সাধাসিধে,দূরের গাঁ থেকে বউ করে নিয়ে যায়—ঝগড়া ঝামেলা হলেও তুমি হুট করে বাপের বাড়ি চলে যাবে না,কাপড় থলি বগলে পুরে ড্যাং ড্যাং করে বেরিয়ে যেতে পারবে না,গরীব-দুখী মেয়ে, আমাদের মতো চাষা বাড়িতে ভালো থাকবে,দুটো পেট পুরে খাবেদাবে, ঘরগেরস্থের টুকিটাকি কাজকর্ম করবে। তুমি সংসারকে গুছিয়ে নেবে নিজের হাতে,আমি আর ক’দিন? আজ মল্লে কাল কবরে উঠব। তুমার হয়েছে কী!

হাসিনা কথা বলে না,সাড়া দেয় না,চারবার খেতে ডাকলে একবার বলে, ‘যাচ্ছি।’ যাচ্ছি তো যাচ্ছি। চলনের গতি নাই,কাজেপাটে মন নাই,সারাদিন শুধু আঙিনায় বসে নদীর পানে চেয়ে থাকে,কখনও জামরুল তলায় দাঁড়িয়ে থাকে বোবা মানুষের মতো। নদীর ওপারে তুমার কে আছে গা? আইবুড়ো বেলায় পীরিত করে বেড়াতে! তুমার নাগর আছে ওপারে! খালি নদীর পানে চাও কেনে! জয়গন ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠে।

মনিরুল খেতে এল। পাট কাটা চলছে এখন। দেখল বউ তার তেমনই। রাতের বেলা দুটো মানুষের কত ধস্তাধস্তি— পাথর নড়ে,কিন্তু হাসিনা নড়ে না। না তো না,হ্যাঁ তো হ্যাঁ। এত জেদ কীসের! মনিরুল না পারে মাকে বলতে,না পারে শশুরবাড়ির কাউকে জানাতে। এ যে কী জ্বালা! তা একমাত্র মনিরুলই জানে। মাটির বুকে মনের আক্রোশ ঝাড়ে। কাস্তের বাটে ক্ষমতা ক্ষয় হয়। বুকের ভেতর দু:খের গাঙ বয়ে বেড়াই।

খেতে খেতেই ডাক পাড়ল মনিরুল,বউ শুন।

হাসিনা মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়াল। মুখে কথা নেই। ‘কী?’ এটাও তো বলে মানুষ। হাসিনা বলে না। বলার প্রয়োজন মনে করে না।

—রোজ তুই খালি নুন দিতে ভুলে যাস,মনটা কুথায় পড়ে থাকে তোর? তরকারি এত আলুনে কেনে? নুনের ভাড়টা সুড় সুড় করে দিয়ে যা।

মনটা কোথায় পড়ে থাকে তা একমাত্র হাসিনাই জানে। তার মনের কিনারা কেউ খুঁজে পায় না। কোনও কৈফিয়ত নেই,কাকুতি-মিনতি নেই,দোষ স্বীকার নেই,হাসিনা নিরব,নির্বিকার।

চুঁলোশালের দেওয়ালে ঘুঁটে পেটাতে পেটাতে জয়গন ধমক দেয়,আবাগীর বেটি,মরদটা ভুখের জ্বলনে মাঠ থেকে গাঙিয়ে খেতে এইচে,কথা কানে যায় না? নুনটা এনে দে লো।

শাশুড়ীর ধমকানি খেয়ে হাসিনা এবার নড়ল। নড়ল তো নড়ল,গট গট করে মহারানীর মতো চলে গেল হেঁসেলঘরে। হেট হয়ে ঢুকে নুনের ভাড়টা বের করে এনে মনিরুলের সামনে ঠকাস করে নামিয়ে দিল।

মনিরুল সহজে রাগে না,কিন্তু এই মেয়ের ত্বেজ যেভাবে দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে, সে এত তেজিবান পরিশ্রমী পুরুষ মানুষ হয়েও যে সব মুখ বুজে মেনে নিচ্ছে- কেন মেনে নিচ্ছে এটাই ভেবে পাচ্ছে না। তার কি আত্মসম্মানে লাগছে না! লাগছে লাগছে,স্বীকার করতে পারছে না সে। কতবার ভেবেছে চুলের মুঠি ধরে উঠোনে আছাড় মেরে ফেলে কঞ্চির সোঁটা কতক দিয়ে বুঝিয়ে দেয়…এখানে এসব ভিমরতী চলবে না,পোষাচ্ছে তো থাক,নাহলে বাপের বাড়ি চলে যা। কিন্তু কচি মুখটার পানে চাইলে বড় মায়া হয়,মায়া। কী নিস্পাপ চাহুনি! ঠিক যেন অবোধ শিশুটি! বাছুর ছানাটি! বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলে উঠতে চাই,তা নিভে যায় হাসিনার মুখের দিকে চাইলে। জয়গনও আড়ালে বুঝিয়েছে তাকে,দেখ বাপ,কচি বয়েস,স্কুল শেষ করেনি এখনও,বোধবুদ্ধি হোক,পরে ঠিক হয়ে যাবে। গায়ে হাত তুলিস না। বুঝিয়ে বুঝিয়ে কথা কস। তোরও তো বাবা বয়স কম হলনি,কত জায়গায় মেয়ে দেখেছি বলদিনি! অবশেষে হিল্লে হয়েছে একটা,মানিয়ে গুছিয়ে নিয়ে চল।

মনিরুল তো মানিয়েই চলে। কিন্তু এক হাতে কি তালি বাজে! অপর পক্ষের মানুষটা যে তাকে ধরা ছোঁয়া দিচ্ছে না,তারবেলা! দুটি মানুষ,দুটি বালিশ,দুটি মুখ দু’দিকে।

অনুষ্টান করে ধুমধাম ভাবে বিয়ে হয়নি তাদের। মনিরুলের চাচাতো বোন জরিনা সম্বন্ধটা লাগিয়েছিল। সেই পদ্মাচরের দুধীনগর গাঁ। জরিনার শ্বশুরের ইন্তেকাল হল,গাড়ি করে মউত বাড়ি গিয়েছিল চাচা-চাচী,মা,গাঁয়ের আরও দু-একজন। মুসলমানের মরা মরলে মুসলমান যায়। জয়গন সেখানে দেখেছিল হাসিনাকে। ফুটফুটে পুতুলের মতো মেয়েটি,পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। জরিনাকে বলেকয়ে মেয়েটার খোঁজ নিয়ে এসেছিল। প্রস্তাব দিতে প্রথমে বেঁকে বসেছিল হাসিনার মা। মেয়ে তার টুইলভে উঠেছে,এখন পড়তে চায়,বিয়ে করবে না সে। পরে জরিনার কাছে তার চাচাতো ভাইয়ের স্বচ্ছল অবস্থার কথা শুনে আর গররাজি হয়নি। কিছুদিন পরেই ফোন এল বিয়ে দিতে চাই তারা,তবে কিছু দিতে থুতে পারবে না।

জয়গন বলেছিল,নেব আবার কী! আমার মেয়ে নাই,তুমাদের মেয়েকে চাই।

একদিনেই দু’চারজন গাঁয়ের মুরুব্বি মানুষদের সঙ্গে নিয়ে মনিরুল দুধীনগর গেল। সাঁঝেরবেলা বউ আনল ঘরে। মনিরুলের বউ দেখতে এল পাড়াপড়শিরা। বেরনোর সময় কেউ কেউ বলে গেল,ঘরে আলো জ্বালতে হবেনি গো চাচি,চাঁদের মতো মুখ। তুমার চোখ আছে বলতে হবে।

গাড়িতে আসার সময় সারা রাস্তা কেঁদে কেঁদে এসেছিল হাসিনা। মেয়েরা বাপের বাড়ি ছেড়ে আসার সময় এমন কান্না কাঁদে। হাসিনার সেই কাঁন্দনের যে কি মানে ছিল,তা কেউ বুঝতে পারেনি, অন্য মানে আর খুঁজে পাইনি কেউ,এমনকি মনিরুলও না।

রাত্রে যখন পাড়ার ভাবিরা মুখটিপে হেসে একঘরে পুরে দরজায় খিল দিল তাদের, মনিরুল ঘোমটা সরিয়েই হাসিনার মুখের অবস্থা দেখে বুঝেছিল,এই মেয়ে তাকে স্বামী হিসাবে মেনে নেয়নি। জোর করে তার বিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিংবা তার মনের মানুষ অন্য কেউ,যাকে সে পাইনি,ফেলে এসেছে। যেমন ফেলে এসেছে পদ্মার চর, তার গাঁ,বাবা-মা,আত্মীয়স্বজনদের,তেমনি সেই মানুষটাকেও চিরতরে একা করে দিয়ে চলে এসেছে সে।

প্রথমে দুইজনেই চুপচাপ বসেছিল,তারপর একাই কথা বলছিল মনিরুল,হাসিনা হ্যাঁ,না ছাড়া কোনও জবাব দেয়নি। তারপর হাতটা যখন ধরতে গেল মনিরুল,ছিটকে সরে পড়েছিল হাসিনা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আপনার দুটি পায়ে পড়ি,আমাকে ছেড়ে দিন।

মনিরুল বিষম খেয়েছিল। ছেড়ে দিন মানে! কী ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছে! শারীরিক ভাবে এখন মিলিত হতে চাইছে না তার বউ! নাকি তাকেই ছেড়ে দিতে বলছে! ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে থাকে মনিরুল। দুধটুকু খেয়ে শুয়ে পড়ল সে। পাশে শুয়েও মনিরুল অনুভব করল, হাসিনা কাঁদছে,বাচ্চা মেয়ে, এত কম বয়সী মেয়েকে তার বিয়ে করা বোধহয় ঠিক হয়নি৷ অনুশোচনাও হয় তার। সে ভাবে এখন থাক,বয়স বাড়লে জ্ঞানবুদ্ধি হবে ঠিক ধীরে ধীরে। ততদিন সে অপেক্ষা করবে। তখন তাকে নিশ্চয়ই অনেক ভালোবাসা দেবে। সেও অনেক ভালোবাসবে,আদর করবে হাসিনাকে। সাতপাঁচ হাবিজুবি ভাবনা ঢেউ হয়ে আসে,আবার মিলিয়ে যায়। মনিরুল জিজ্ঞেস করে,এত কাঁন্দনের কী আছে!

হাসিনা শুধু বলে,কিছু না।

এই ‘কিছু না’ বড়ই কঠিন বিষয়,তার মধ্যে যে কত তল,কত গভীরতা থাকতে পারে,তুমি বুঝতেও পারবে না। মনিরুল হাতড়ে বেড়ায়,কিন্তু নাগাল পায় না।

তারপর রাত গেল,দিন গেল- হাসিনা তবুও ধরাছোঁয়া দেয় না। মনিরুল মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোর মন খারাপ করছে বউ? আমাদের এখানে ভালো লাগছে না? মন খুলে বল আমাকে।

হাসিনা মাথা নামিয়ে রাখে। এ যে বড়ই রহস্যময়ী! মনিরুল কী করবে ভেবে পায় না।

একদিন সাঁঝের বেলা জয়গন দেখল,আঁধার নেমেছে উঠোন জুড়ে,হাসিনা তখনও জামরুল তলায় এলোচুলে দাঁড়িয়ে। নতুন বউ,মাথায় ঘোমটা নেই। সে আড়াল থেকে অনেকক্ষণ ধরে দেখল। তারপর মনিরুল বাড়ি ফিরলে বলল,একবার উস্তাজিকে ডেকে আন দিনি। আমার তো মুনে হয়,বাও বাতাস লেগেছে। ভিন জায়গা।

‘উস্তাজি’ হল গ্রামের ইমাম সাহেব। মনিরুল মায়ের কথা ফেলতে পারল না। তারও একবার করে মনে হয়েছে জ্বিন-টিন পেয়েছে হাসিনাকে। সে যেন ইহজগতেই নেই,দেহ আছে,মন নেই,সবসময় অন্য জগতে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে।

ইমাম সাহেব এসে দেখল হাসিনাকে। তাবিজ দিয়ে গেল। বাড়ির চারিপাশ দেখে বলে গেল,জায়গাটা খুবই নিরিবিলি। বাড়ির চারিধার একবার ‘বনধ’ করা দরকার। যাতে আশেপাশে কোনও খারাপ জ্বিন ঘুরঘুর করতে না পারে।

হাসিনা সেদিন প্রথম হাসল। জামরুল তলায় দাঁড়িয়ে ফিক ফিক করে হাসি। সেই হাসি জয়গন শুনেছে। শুনে মনিরুলকেও বলেছে।

হাসিনা হেসেছে,এটা তুচ্ছ ব্যপার নয়। হাসি পেলে মানুষ হাসতেই পারে,এতে আশ্চর্যের কিছু নেই,কিন্তু হাসিনা কি মানুষ! মনিরুল ভাবে,ওর তো কোনও অনুভূতি কাজ করে না। এতগুলো দিন পেরিয়ে গেল,কত হাসির কথা হয়েছে,হাসিনা হাসে না। হাসিনা মন খুলে কথা বলে না। হাসিনা খিদে পেলেও খায় না। হাসিনা সময়ে গোসল করে না। হাসিনা সাজগোজ না। হাসিনা রাতে ঘুমাই কি ঘুমাই না তাও বোঝা যায় না। তাই হাসিনা হেসেছে,এটা কম আশ্চর্যের বিষয় নয়।

রাতের বেলা মনিরুল ইনিয়ে বিনিয়ে হাসিনার মন বোঝার চেষ্টা করে, নিজে নিজেই কত কথা বলে- তাও মুখে কোনও ভালোভাবে কথা নেই হাসিনার। মনিরুল ভাবে,সে দিনকে দিন ভেড়া হয়ে যাচ্ছে,কেন সহ্য করছে এসব? বিয়ে করেছে কি এমনিই! তুমি আমার খাবে,আমার পরবে,আর আমিই তোমার পর!

মনিরুল বলল,আজ জামরুল তলায় দাঁড়িয়ে হাসছিলি শুনলাম?

--কিছু না,এমনিই।

--যাক,একটা কথা বলেছে হাসিনা।

--এমনি আবার কী কথা! এমনিই বলে কিছু হয় না। মনিরুল বলল।

--হয় না তো হয় না।

এই তো তালে,আসছে। মনিরুল উৎসাহ পায়। পাশ ফিরে আরও একটু কাছাকাছি হয়। তারপর হাতটা টেনে নিজের বুকে নেয়। হাসিনা টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করে,কিন্তু মনিরুল ছাড়ে না।

--আচ্ছা বউ,কি হয়েছে তোর? আমাকে সব খুলে বল। আমি তোকে কিছুই করব না। বিশ্বাস করতে পারিস।

হাসিনা গর্জে উঠল, আমি কাউকে বিশ্বাস করি না। আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল।

-বুঝেছি,তোর আমাকে পছন্দ নয়। কিন্তু কী করবি বল। বিয়ে যখন হয়ে গেছে,এখন মানিয়ে গুছিয়ে…

মনিরুলের কথা শেষ হওয়ার আগেই হাসিনা ফুঁসে উঠল, মানিয়ে নিতে আমি কোনওদিনও পারব না। আর কোথাও মেয়ে পেলেন না? দুনিয়ায় এত মেয়ে থাকতে আমাকেই নজরে পড়ল! এবছর আমার এইচ এস পরীক্ষা। এখন তো আমি বিয়ে করতে চাইনি!

--তোমার আব্বু-মায়েরও তো দোষ আছে বলো। তুমি যদি এতটাই নারাজ ছিলে,বিয়ে দিল কেন? আমি কি জোর করে তুলে এনেছি!

--ওদের পেটে কি কালি আছে! যে বুঝবে এইচ এসের মুল্য কী? নাইনে যখন থেকে উঠেছি তখন থেকেই শুধু বিয়ে বিয়ে বিয়ে! সেসব কোনও রকম আমি কাটিয়ে কাটিয়ে এতদুর পড়েছি। আলাতন হয়ে গেছি। আমার সাথে যারা পড়ত,রুবিনা,সিলিনা,মহিমা,আরজিনা সবার বিয়ে হয়ে গেছে মাধ্যমিক দিয়েই। আমাকেও কম ছেলে দেখতে আসেনি। আমি কেঁদেকেটে আটকেছি। কত আর লড়াই করব বলেন তো। চোখ দিয়ে জল পড়ছে হাসিনার।

-আচ্ছা,তুই যদি পড়তে চাস,আমি সেই ব্যবস্থা করব। ধবলপুরে ভালো স্কুল আছে,কলেজ আছে পড়বি সেখানে। আমার সাথে এমন ব্যবহার করছিস কেনে বল! ভালো করে কথা বলিস না,একটু্কু কাছে আসিস না।

--আপনার কাছে যেতে আমার কোনও ইচ্ছেই নেই।

এমন জবাব পেয়ে মনিরুল থম মেরে বসে পড়ল। জগ থেকে পানি ঢেলে ঢক ঢক করে পানি খেল। তারপর বলল,তাহলে আমি এখন কী করব? কী করার আছে আমার? বাপের ঘরে দিয়ে চলে আসব তুকে?

--কিছুই করতে হবে না আপনাকে,আমাকে একা থাকতে দিন প্লিজ! নিজের মতো একটু থাকতে দিন। বাপের ঘরে দিয়ে এসেও কোনও লাভ হবে না। মারধর করবে,বকাঝকা করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার এখানেই ফেলে দিয়ে যাবে।

--ফেলে দিয়ে যাবে! এখানে তুই পড়ে আছিস? তুকে মাথায় করে রেখেছি বউ। অন্য মরদ হলে…

হাসিনা চুপ থাকল খানিক। তারপর বলল, জানি। আপনি খুব ভালো মনের মানুষ। একদিনও জোর করেননি। তারজন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

সকাল হল। গোয়াল থেকে হেলে দুটো বের করে জামরুল তলার বাথানে বেঁধে ডাবাতে ছানি,খোল-ভুসি মেখে জাবনা দিল মনিরুল। হাসিনা সাঁঝে কুড়িয়ে রাখা আধভিজে জামা-কাপড়গুলো তারে মেলছে একটা একটা করে। হাত মুখ ধুয়ে মুড়ি খেতে বসল মনিরুল। মাঠ যাবে,কাটা পাটগুলো বয়ে এনে নদীর জলে ভিজতে দেবে। দুটো মুনিষও লাগিয়েছে সে। নামোপাড়ার সাদাই,আর জাফরকে।

জয়গন ঘরের দাওয়ার ওপর বসে বসে শাক বাছছিল পেছেতে। মুরগিগুলো ঘুরঘুর করছে উঠোনে। মনিরুলের মুড়ি খাওয়া হলে জামবাটিটা নিয়ে নদীর ঘাটে গেল হাসিনা। জয়গন আড়চোখে তাকিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, আজ সুর্য কুন পানে উঠিছেল রে। কাজে মুন দিয়েছে দেকছি।

মনিরুল গামছায় মুখ মুছতে মুছতে বলল, কম বয়েস,জেদটা বেশি। ও এখন বিয়েই বসতে চাইনি। পড়াশুনো করতে চাইছিল।

--মেয়ে মানুষ পড়ে উল্টোবেক!

ভয়ে ভয়ে বলল মনিরুল, ওর পরীক্ষা আছে। পড়াশোনা করতে চায় আরও?

চোখগুলো পাকিয়ে ফোঁস করে উঠল জয়গন,কী! তুই বউয়ের ভেড়া হইচিস! আবার পড়তে যাবেক তুর মাগ? আর আমি রেঁধেবেড়ে খাওয়াব?

--না,এমনিই বলছিলাম। মন খারাপ করে থাকে,যদি মাঝেমধ্যে যেতে পারত। পরীক্ষাটা দিত।

দুই বিঘা পাট লাগিয়েছিল মনিরুল। কেটে কেটে বয়ে নিচ্ছে। এখনও কাঠা পাঁচেক কাটতে আছে। জাফর,আর সাদাই খেত চেনে,ওরা এসে পাট কাটতে লেগে গেছে। মনিরুল তাগাদা দিল, টপ টপ কেটে নিয়ে বইতে লেগে যাব। হুস হুস করে কাট।

ওরা একবার উঠে পানি খাই। আলের ওপর বসে।

সাদাই বলল,বিয়ের পর থেকে তুর মুখচোখের অবস্থা এমন কেনে হয়েছে বে? খুব শুকনো শুকনো লাগছে। মন মরা আছিস দেখছি কয়েকদিন।

জাফর দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল, বড় ভাইয়ের এখন কত চাপ বলদিনি,দিনে মাঠের কাজ,ঘরে রাতের কাজ,শুকনো লাগবেনি!

মনিরুল ওদের কাছে গিয়ে বসল,সুখ দুঃখের দুটো কথা বলল। ‘কাউকে বলিস না’ বলে নিজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা খুলে বলল,পরামর্শ নিল।

জাফর বলল, শুধু লেখাপড়ার জন্য লয়,আমার তো মুনে হচ্চে অন্য লাইন আছে। স্কুল টিউশন যাওয়া মেয়ে,ফোনের যুগ,কিছু কেস আছে দেখগা।

--হতি পারে,প্রেমটেম করত,তুর সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। সাদাই ফোড়ন কাটল।

একটা বিড়ি ধরিয়েছে মনিরুল। ফুক ফুক করে ক’বার জোরে টান দিয়ে বলল, কী করব বলদিনি আমি?

সাদাই বলল, তুই একবার শশুর ঘরে যা মনিরুলে। লুকিয়ে যা। কিছু খবর পাবি নিশ্চয়ই।

জাফর বলল,তুর তো আটমঙ্গলাও হয়নি। ওই মেয়ের,শশুরবাড়ির হিস্টোরি কিছুই জানিস না। আন্দাজে একটা মেয়েকে বউ করে আনলি সেই মুর্শিদাবাদ থেকে! এখানে মেয়ে পাসনি!

--ও কথা বাদ দে,ভাগ্যে যেখানে লেখা থাকে সেখানেই হয়। সাদাই থামিয়ে দিল জাফরকে।

পাটগুলো জলঙ্গীর পানিতে জাগ দিয়েই মনিরুল একদিন সকালেই ট্রেন ধরল লালগোলার। হাসিনাকে বলে গেল তার এক ফুফুর বাড়ি যাচ্ছে এক বিশেষ প্রয়োজনে। দু’একদিন পরেই চলে আসবে। রাতে যেন মায়ের কাছে শোয়।

হাসিনার আব্বু সকাল থেকেই ব্যবসায় বেরিয়েছে,তখনও ফেরেনি। হঠাৎ করে জামাইয়ের আগমনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল হাসিনার মা। কী খাওয়াবে,কোথায় বসতে দেবে ভেবে পেল না।

মনিরুল বলল,একদম ব্যস্ত হবেন না। আমি আজ থাকছি,শশুরআব্বা আসুক,কিছু কথা আছে।

--কী হয়িছে বাপ? কুনু খারাপ খবর আছে? বিপদ আপদ হলনি তো কারও? হাসিনা কই! ওকে আননি কেন!

--হাসিনা বাড়িতেই আছে,কোনও বিপদ হয়নি। তবে ওর মনের অবস্থা ভালো না।

--ওইটাই ছোট তো বাপ। খুব লাগাটে ছিল আমার। বাড়ি ছেড়ে একটা দিনও খালার বাড়ি,নানীর বাড়ি গিয়ে থাকতে পারত না। মন খারাপ হচ্ছে মুনে হয়। শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে হিসুরতে হিসুরতে কেঁদে ফেলল সামেলা, ঘরটা ফাঁকা করে চলে গেল এতদূরে। আমারও মনটা খুব কাঁন্দে।

--তা যাবেন মেয়েকে দেখতে। যেতে আসতে তো বারণ নেই।

--যাব বাপ। একটু থিতু হোক। ঘর দুয়োর চিনুক। নিজের ঘরকে আপন করুক আগে।

সামেলা বেগম রান্না চরাল জামাইয়ের জন্য। নতুন জামাই কখনও আসে না। মানসম্মান না করতে পারলে কথা হবে। কিন্তু কী কথা বলতে এসেছে সেটাই ভেবে ভেবে আকুল।

খাওয়া-দাওয়ার পর একটু পাড়াদিকে ঘুরতে বেরল মনিরুল। কয়েকটা ঘর পরেই মনিরুলের চাচাচো বোনের বাড়ি। বোনের বাড়ি দেখা করতে গেল। জরিনা খুব খুশি হল ভাইকে দেখে। বাবা-মায়ের খোঁজ নিল,চাচা চাচিদের খোঁজ নিল,খোঁজ নিল হাসিনার।

হাসিনার কথা বলতেই মনিরুল বলল,একটা সত্যি করে কথা বলবি বুবু? কিছু লুকাবি না।

--হ্যাঁ বল।

--ওর সঙ্গে আমার বনিবনা হচ্ছে না। এখনও মনের মিল হয়নি আমাদের। ওর কোনও খবর তুই জানতিস? স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল?

জরিনা বলল,সেকি! হাসিনার কথা এই গাঁয়ে যাকে জিজ্ঞেস করবি,সেই বুলবে অমন মেয়ে আর হয় না। আজ পর্যন্ত কুনু কালি নাই গায়ে। পড়াশোনাতেও খুব ভাল বুদ্ধি। তবে ও এখন বিয়ে করতে চাইনি। যখন বিয়ের কথা হচ্ছিল,একদিন আমার কাছে এসে পাগুলো জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল,ভাবি বাঁচাও আমাকে। এখন বিয়ে করলে আমার সব শেষ। আমার অনেক স্বপ্ন ভাবি,বিয়ে করে এখনই সব শেষ করতে চাই না।

--আমাকে জানাসনি কেন এগুলো?

--তোর সঙ্গে আর কখন কথা হল! চাচিকে বলেছি। ভাবলাম কত জায়গায় তোর জন্য মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছে,যদি হয় তো হোক,এমন একটা মেয়ে আমাদের বংশে বউ হয়ে যাক। একটু থামল জরিনা। তারপর বলল,ওর সাথে যারা পড়ত সবার বিয়ে হয়ে গেছে একে একে। এখানে এমনই,এইট পাশ করার পরই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে।

মনিরুল বলল,ওর সাথে পড়ে এমন কেউ আছে তুদের এখানে,একবার ডেকে দিবি,কথা বলতাম।

--হুম,আমাদের পাড়াতেই আছে,উয়ার খুব ভাল বান্ধবী,সাহানাজ। একসাথেই ওরা স্কুল টিউশন যেত। তুই বস আমি ডেকে দিচ্ছি।

কিছুক্ষণ পরেই সাহানাজ এল জরিনার সঙ্গে। মনিরুলের দিকে তাকিয়ে মিস্টি হেসে জিজ্ঞেস করল,ভালো আছেন দুলাভাই?

জরিনা বলল,আমার এখনও অনেক কাজ বাকি আছে,তোমরা গল্প করো,আমি কাচাকচালা করে নিই। বলে জরিনা বালতিতে ভেজানো কাপড়গুলো নিয়ে পুকুর ঘাটের দিকে চলে গেল।

মনিরুল বলল, একটা সত্যি করে কথা বলবে আমাকে? লুকাবে না কিন্তু,আমি তেমন ছেলে নয়,যে শুনে খারাপ কিছু পদক্ষেপ নেব। তোমার বান্ধবীর উপকারই করব।

-হ্যাঁ বলেন!

--হাসিনা কি ভালোবাসত কোনও ছেলেকে? জোর করে ওর বিয়ে দিয়ে দিয়েছে?

সাহানাজ কোনও কথা বলল না,চুপ করে থাকল।

--খুলে বলো সাহানাজ। আমার মনের অবস্থা ভালো নয়। এখনও পর্যন্ত তোমার বান্ধবীর মন পাইনি আমি।

--অতিতের কথা বাদ দিন দুলাভাই। বিয়ের পর অতীত না ঘাঁটাই ভালো,সেটা দু’জনের পক্ষেই মঙ্গল। তবে আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ,প্লীজ ওকে পরীক্ষাটাই বসতে দেবেন। রেজিস্ট্রেশনের সময় একবার নিয়ে আসবেন সঙ্গে করে।

--অবশ্যই পরীক্ষা দেবে ও। পরে আমাদের ওখানের কলেজেও ভর্তি করে দেব যদি পড়তে চায়।

--বইপত্তরগুলো ওদের বাড়ি থেকে নিয়ে যাবেন প্লিজ! আর ওকে ওখানে পড়তে একটু সময় দেবেন,খুব বুদ্ধি ওর। বইগুলো পড়েও ভালো রেজাল্ট করে দেওয়ার মেয়ে ও।

--সেসব ব্যবস্থা হবে। তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না কিন্তু !

--দেখুন বিয়ে করেছেন,এখন বউয়ের অতীত ঘেটে মনটাকে খারাপ করবেন কেন! ওর একটু সময় লাগবে আপনাকে মেনে নিতে।

মনিরুল তাদের সম্পর্কের কথা সব খুলে বলল সাহানাজকে। বলল,সারাদিনে একমুঠো ভাত তাও ভালভাবে খাচ্ছে না। কী করলে ও খুশি হবে একটু বলো।

সাহানাজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল, শুনে কোনওরকম সিন ক্রিয়েট করবেন না প্লিজ। আমাদের কোচিং সেন্টারে সেকেন্ড ইয়ারের একটা ছেলের সঙ্গে ওর খুব ভাব। দু-জনেই দু-জনকে খুব পছন্দ করত। ছেলেটা এখনও পড়ছে,নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তারপর বিয়ে করতে চায়। ঠিক ছিল হাসিনাও এইচ এস দিয়ে দেবে,ততোদিনে কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেবে ছেলেটা। কিন্তু হাসিনার বাড়িতে শুধু বিয়ে বিয়ে বিয়ে করে পাগল করে দিত। আপনার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ওরা বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল,কিন্তু হাসিনা যেতে পারেনি। ওর মা জানত। ফোনটোন কেড়ে রেখে দিয়েছিল। স্কুল-টিউশন কোথাও যেতে দিত না। এক কথায় জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল।

--ছেলেটার সঙ্গে যোগাযোগ আছে তোমার?

--হ্যাঁ,কোচিং এ কালকেই দেখা হয়েছিল। অনেকক্ষণ কথা হল,খুব মনমরা হয়ে গেছে। বলছিল,সবাই সবাইকে পায় না সাহানাজ। কপালে লেখা থাকতে হয়। হাসিনাকে আমি নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম,কিন্তু ওর বিয়ে হয়ে গেছে যখন,আমি আর ওর জীবনে ঢুকব না। আমার বুকের মধ্যে যে জায়গাটা রাখা আছে ওর জন্য,ওটা তোলাই থাকবে,আর কেউ নিতে পারবে না। এই জনমে ওকে পেলাম না ঠিক কথা,তবে পর জনমেও আমরা মিলিত হবো।

মনিরুলের বুক ঠেলে বেরিয়ে এল একটা চাপা শ্বাস। বলল, বিয়ের আগে যদি এগুলো জানতাম! আচ্ছা ওর ফোন নাম্বার আছে?

--আছে,কিন্তু আপনাকে দেব না। আর সিনক্রিয়েট করার প্রয়োজন নেই। কী করবেন আপনি,ডিভোর্স দিয়ে দেবেন? আপনার বিয়ে করা বউকে ওই ছেলেটা আবার নিয়ে নেবে সুড় সুড় করে? যদি না নেয়!

--আমি কথা বলব না নাও,তোমার বান্ধবীকে দেব। ওরা একবার কথা বলে নেবে নিজেদের মধ্যে।

হাসিনার কাছে আছে ওর নাম্বার। আপনি শুধু ফোনটা দেবেন ওকে। আমার কথাও বলবেন,যেন ফোন করে,আমি স্কুলের টিউশনের নোটগুলো ছবি তুলে তুলে পাঠাব ওকে। ওকে পড়তে দেবেন প্লিজ!

--ওকে ফোন কিনে দেব একটা। বাড়িতে বসে যদি পরীক্ষাটা দিতে পারে,তাহলে তো খুবই ভালো,তুমিও সাহায্য করবে ওকে।

--জানেন,ছেলেটা আমার কাছে জানতে চাইছিল,কোন গ্রামে বিয়ে হল,শশুর শাশুড়ির নাম কী,জামাইয়ের নাম কী! আমি বললাম কেন,তুই তুলে আনবি নাকি! তখন কী বলল জানেন! বলল,নিজে সংসার না গড়তে পারি,কারও সংসার ভাঙব না কখনও। তবে একবার গিয়ে ওকে আঁড়াল থেকে লুকিয়ে দেখে আসব। শাড়ি পরে,বউ সাজে কেমন লাগছে হাসিনাকে,কেমন গুছিয়ে নিয়েছে সংসারটাকে। এতদিন ভালবেসেও অন্য মানুষকে কীভাবে আপন করে নিয়েছে। দেখাও দেব না ওকে। জাস্ট ও হয়তো কলতলায় থালাবাসন ধুবে,আমি শুধু সেটুকু দেখব,হয়তো তারে কাপড় মেলবে,আমি সেটুকু দেখব,তারপর সুড় সুড় করে চলে আসব। আর কখনও যাব না,কক্ষনো না। ওকে কোনওদিন বুঝতেও দেব না,আমি গিয়েছিলাম।

সেদিন রাততুকু থেকে সকালেই রওনা দিল মনিরুল। বুকে অনেক কষ্ট জমা হয়েছে। সে কী করবে,কী করা উচিত কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না। তবে হাসিনাকে ও আর জোর করে আটকে রাখবে না। ওকে একটা ফোন কিনে দেবে। নিজের ফোনটাও এখন আপাতত ওর হাতে দিয়ে দেবে। কথা বলে তো কথা বলুক ছেলেটার সাথে,যদি যেতে চাই হাসিনা,মনিরুল নিজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। সে এমনই উদার। একবার করে মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে গেছে,কী যা তা ভাবছে সে। কাউকে না পাওয়ার থেকে,পেয়ে না পাওয়ার যন্ত্রণা অধিক। সেই অধিক কষ্ট বুকে বয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরছে মনিরুল।

স্টেশন থেকে নামল। হাঁটছে মনিরুল। যেন সে হাঁটছে না,তাকে কেউ ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। সব কেমন অচেনা অচেনা লাগছে,যেন কখনও সে আসেইনি এই গ্রামে। এটা তার নিজের গ্রামই নয়,যেন সে মনিরুলই নয়,সে হাসিনার প্রেমিক,বাড়ি দুধীনগর,সামনে পদ্মা। সে ভালোবাসত হাসিনাকে,একটা বয়স্ক দামড়া বদমাইস লোক তার প্রেমিকাকে,তার সোনামনীকে,তার কলিজাকে,তার জানের টুকরোকে বিয়ে করে নিয়ে চলে গেছে। সে কি ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছে? না না,সে শুধু দেখতে যাচ্ছে,কেমন আছে তার হাসিনা? মুখে হাসি আছে? জানে সুখ আছে?

জলঙ্গীতে পানি নেই এখন। কোথাও হাঁটু খানেক,কোথাও কোমর অবধি,কোথাও পায়ের গোড়ালি ডুবা পানি। খালেডোবায় পাট জাগ দেওয়া আছে। পানি পচে কালো হয়ে গেছে। প্যান্ট গুটিয়ে নদী পেরল সে। প্যান্টটা ভিজে গেল। কেন ভিজে গেল? কারন সে মনিরুল নয়,সে হাসিনার প্রেমিক। মনিরুল জানে নদীর কোনখানে কতটা পানি,কোথায় পা দিলে টুকুস করে পেরিয়ে যাওয়া যায়। সে যেহেতু হাসিনার প্রেমিক,তাই সে জানে না,অচেনা পথঘাট,অচেনা গ্রাম,অচেনা মানুষ।

নদী পেরিয়ে মনিরুল তাদের পাড়ার পথ ধরল। ভেতর দিকে না গিয়ে সে আড়ালে আবডালে চলতে লাগল,তারপর চোখে পড়ল সেই জামরুল তলা,টিনে ছাওয়া দু’কামরা বাড়ি,চালে লাউ-পুইয়ের লতা,দুটো হেলে গরু। সামনে নদী,তালগাছের গুড়ি দিয়ে বাঁধানো ঘাট।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল মানুষটা। একটু পরেই একটি নতুন বউ থালাবাসন নিয়ে বেরল। নতুন শাড়ি,হাতে চুড়ি,বউ সাজে কী টুকটুকে লাগছে হাসিনাকে! হাসিনার শাশুড়ি জাবনা দিচ্ছে গরুকে,হাসিনা থালাবাসন নিয়ে নদীর ঘাটে চলে গেল,ভাল করে দেখার জন্য আরও কিছুটা এগিয়ে গেল মনিরুল। হাসিনা থালা ধুয়ে একবার মুখ তুলে নদীর ওপারে তাকাল,ওপারেই তো তার বাড়ি,সেই দুধিনগর গাঁ। জমা পানিতে হাঁস চরছে। বাহ বেশ তো গৃহিনী হয়ে গেছে হাসিনা! থালাগুলো রেখে সে হাতে একটা ভাঙা জামবাটিতে ভাত-কুড়ো মাখিয়ে নিয়ে আবার এল নদীর ঘাটে। তারপর হাঁসগুলোকে ডাকল,আয় চৈ চৈ চৈ চৈ…

হাসিনা উঠোনে ঘুর ঘুর করছে,কখনও তারে মেলা এটা সেটা কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর মাঝেমধ্যে নদীর পানে তাকাচ্ছে,যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে। কার জন্য অপেক্ষা করছে হাসিনা? এতদূর থেকে হাসিনার চোখদুটো দেখা যাচ্ছে না। বাহ! এতদিন ভালোবেসে সব কিছু কেমনে ভুলে গেল হাসিনা,তার কথা কি মনে পড়ে না? ক’দিনেই অন্যের ঘরকে আপন করে নিল! অন্য মানুষকে আপন করে নিল! মনিরুল এখন মনিরুল হতে চাইছে না,হাসিনার প্রেমিক হয়ে থাকতে তার বেশ ভালো লাগছে। আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে সে আপন মানুষ হারিয়ে ফেলা এক মেয়ের ঘরকন্না।
----------------

লেখক পরিচিতি: হামিরউদ্দিন মিদ্যার জন্ম ১৪ই জানুয়ারি ১৯৯৭,পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায়। এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ: আজরাইলের ডাক (সৃষ্টিসুখ প্রকাশন), মাঠরাখা (সোপান), নির্বাচিত ২০টি গল্প ( বেঙ্গলবুকস, বাংলাদেশ)। 'মাঠরাখা' গল্পগ্রন্থের জন্য ২০২৩ সালে পেয়েছেন সর্বভারতীয় সাহিত্য অকাদেমী যুব পুরস্কার। এছাড়াও পেয়েছেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে 'ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০২২', কৃত্তিবাস পত্রিকা প্রদত্ত 'সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার ২০২২'।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ

  1. ভালো লাগলো।লালগোলা,মুর্শিদাবাদের উল্লেখ থাকায় এবং এই এলাকা ছেলে হওয়ায় অন্য ধরনের ভালো লাগলো।হাসিনার বিয়ে কোন জেলায়? নদীয়া?

    উত্তরমুছুন
  2. একটু আগের। যেনো দেবদাস পারুল। লেখার জবাব নেই। প্রাণ ভরানো।

    উত্তরমুছুন
  3. শেষটায় বেশ চমক।খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন