রাজীব তন্তুবায়ের গল্প: বন কুঁদরি





খন‌ও আঁধার নামেনি পঞ্চাননের নিকানো খামারে। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের গা থেকে ঠিকরে পড়া লাল আভায় রেঙে উঠেছে গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে থাকা ইউকেলিপটাস আর তাল গাছের মাথা জোড়া। যেন সূর্যাস্তের শেষ নির্যাসটুকু মেখে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে ওরা।

সামনে একটা মাদার গাছ। গাছ জুড়ে প্যাঁচিয়ে আছে বন-কুঁদরির লতা। লতায় লতায় থোকা থোকা বন-কুঁদরি — বিয়ে বাড়ির টুনি-বাল্বের মতো ঝলমল করছে সব। তার‌ই ফাঁক ফোকর দিয়ে কিছুটা আভা ছিটকে এসে পড়েছে পঞ্চাননের চোখে-মুখে। একটু একটু করে লাল হয়ে উঠছে পঞ্চানন।

আরতি তখন সামনে এসে দাঁড়ায়। সবটুকু আলো গায়ে মেখে নিয়ে সম্বিত ফেরায় পঞ্চাননের, "অত চিন্তা ক‌ইরে কী হবেক? উয়ারা যখন ঘরে আইসে বলে গেল, তখন ঘর থাক্যে ত একজন কে যাতেই হবেক।"

"বলে গেলেই যাত্যে হবেক ন-কি! পাটির লোক বলে মাথাটা কিনে রাইখেছে?" বলতে বলতে পাশের গাদি দেওয়া ধান পালুইটার গায়ে হাত রাখে পঞ্চানন। আরতি দেখে আধখানা পালুইটাও অস্তরাগের শেষ আলোয় আগুনের মতো ঝলক দিচ্ছে। আগুন জ্বলে উঠছে পঞ্চাননের মাথার ভিতর। যে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে দুটো রাশভারি মুখ — ভবা মোড়ল আর পদু রায়...

তখন শেষ-দুপুর। খাওয়া দাওয়া সেরে খাট পেতে সবে শরীরটা একটু এলিয়েছে কি এলায়নি, অমনি মনে পড়ে গোরুর গাড়ির জোয়ালের দড়িটা তো কেটে গেছে। কাজের মানুষের কি আর নিস্তার আছে? সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে পঞ্চানন। জোয়াল থেকে দড়িটা খুলে এনে ঘরের উঠোনে বসে পাকাতে শুরু করে দেয়। পায়ের নিচে শক্ত করে চেপে ধরে পাকের পর পাক দিয়ে চলে এক মনে। তখনও হেলে পড়া সূর্যের আলো লাল হয়ে যায়নি। কপাট বিহীন সদর দরজা থেকে উঠোনের একটা অংশ হলুদ আলোয় তকতক করছে। সেই পথেই প্রবেশ করেছিল দুটো কালো ছায়া। হাতে একটা লিস্ট ও কয়েকটা কাগজ নিয়ে হাঁক পাড়ে, "কী হে পঞ্চানন, কী করছ..?"

খানিকটা চমক আর বিষ্ময় নিয়ে পঞ্চানন‌ দেখে ভবা মোড়ল আর পদু রায় স্বয়ং দুয়ারে দাঁড়িয়ে। দেখা মাত্রই দড়ি ছেড়ে উঠে এসে বলে, "ই-বাবা, তুমরা! আইসো, আইসো.... ক‌ই গো আরতি, আয় গো একটু খাটটা বিছায় দিবি..."

"না, না, — অত ব্যাস্ত হবার কিছু নাই।" হেসে হেসে ঘাড় নেড়ে বলল ভবা মোড়ল, "এখন কি আর বসার সময় আছে হে? গোটা গ্রামটা ঘুরা বাকি আছে এখনও।"

লুঙ্গিটা শক্ত করে বেঁধে গায়ে প্যাঁচানো রংচটা গামছাটা ঠিক করতে করতে মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে পঞ্চানন।

পদু রায় কিছুটা এগিয়ে এসে বলে, "শুন খুড়া, কাল বাঁকুড়ায় পার্টির মিটিং। ক‌ইলকাতার থাক্যে বড় বড় নেতারা সব আইসছে। তুমরা সব না গেলে কি চলে? — মোড়ের মাথায় বাস রেডি থাইকবেক। সকাল সকাল সবার সঙে তুমিও চাপ্যে যাবে। চিন্তা নাই, একটা টিফিন আর খিচুড়ির ব্যবস্থা আছে।"

এই ভয়টাই যেন করছিল পঞ্চানন। ছেলেটা বাড়িতে থাকলে কোনো চিন্তা ছিল না। তাকেই না হয় পাঠিয়ে দিত মিটিংয়ে। কিন্তু সে তো এখন কলকাতায়। এই মাস দুয়েক হল বড়জোর, গেঞ্জি কলের কাজটা করছে মন দিয়ে। পার্টির লোকেরাও তা জানে। তাই হয়তো পঞ্চানন ভেবেছিল তাদের বাড়ির কাউকে মিটিংয়ে যেতে বলবে না ওরা। কিন্তু না, সে গুড়ে বালি। একেবারে দু' দুজন বাঘা বাঘা লোক এসে দাঁড়িয়েছে উঠোনের মাঝে। আর‌ও জনা কয়েক রয়েছে রাস্তায়। তাদের কথা কী করে অমান্য করবে পঞ্চানন?

তবুও একরকম অনুনয় বিনয় করে নিজের অসুবিধার কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল । কাচুমাচু করে বলেছিল, "সেইটাই ত হে, খেতে অতগুলা ধান কাটা অবস্থায় পড়ে আছে যে ! ইদিকে মেঘটার গতিকও ভালো মনে হচ্ছে নাই। জল পড়লে বড় আতান্তরে পড়্যে যাব যে হে। ইবারটা যদি..."

"ধুর্, এখন আবার মেঘ আসছে! সে নিয়ে তুমি কনো টেনশন ক‌ইরো না খুড়া। এখন জলটল হবেক নাই।" হাত নেড়ে কতকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ছিল পদু রায়।

ভবা মোড়ল বলেছিল, "শুধু তুমার একার ধান তো লয়, গোটা গ্রামের লোকের ধান‌ই তো মাঠে পড়ে আছে এখনো। তাও তো সবাই যাচ্ছে। তাছাড়া, তেমন কিছু হলে আমরা তো আছি নাকি!"

"লোকের সঙে কি সঙ দাদা..." বলতে বলতে গলাটা দেবে আসে পঞ্চাননের।

ভবা মোড়ল শান্ত স্বরে বলে, "দ্যাখ পঞ্চানন, আমরা যদি ওপর মহলের নেতাদের কথা শুনি, তবে তো তারা আমাদের কথা শুনবেন। আমাদের কথা শুনলে তো তোমাদের জন্য কিছু করতে পারবো। তাই ওনাদের কথা শুনা উচিত। ওপর মহলের চাপ আছে, যে করেই হোক মিটিংয়ে মাঠ ভরাতে হবে। তাই এবারটাতে অন্তত চলো।"

"সব‌ই ত বুঝি হে, কিন্তু..." আরও কিছু বলার চেষ্টা করেছিল পঞ্চানন। শোনেনি ওরা। যাবার সময় পদু রায় বলে গেল, "দ্যাখ খুড়া, তুমার ইচ্ছা হয় যাবে, না হয় যাইও না। তবে পরে ফ্যাসাদে প‌ইড়লে আমাদিগে ব‌ইলতে আইসো না।"

ফ্যাসাদ! এক খেত কাটা ধানের ওপর বৃষ্টি হলে যে কী 'ফ্যাসাদ'-এ পড়তে হবে, তা কি ওরা বোঝে না?

ওরা চলে গেলে বাড়িতে আর মন টেকে না পঞ্চাননের। সোজা খামারে এসে আধখানা ধান পালু্ইটার কাছে দাঁড়ায়। সেই তখন থেকে এক মাথা আগুন নিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আনমনে।

কৃষকের চোখ পঞ্চাননের। ঠিক জানে এ মেঘে বৃষ্টি আসবে। একবার বৃষ্টি শুরু হলে ধানগুলো আর ঠিকমত ঘরে তোলা যাবে না। ভেজা খড়ে অর্ধেক শীষ ভেঙেই পড়ে যাবে। তাছাড়া একবার যদি ভেজা ধানে আঁকুর বেরিয়ে যায় তখন আবার মহা সব্বনাশ। ভেতরের চালটা নষ্ট হয়ে যাবে । অভাবের সংসারে ওইটুকু ধান‌ই তো সম্বছরের ভরসা। তা কি আর হেলায় হারাতে পারে? ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠে পঞ্চানন।

আরতি বলে, "কী অত ভাইবছ? গাঁয়ে ঘরে থাকতে গেলে পাটির লোকের সঙে বিবাদ ক‌ইল্যে চলে? তুমি যাও মিটিংয়ে। ধানগুলা থাক। আমি বলছি জল হবেক নাই.. "

"বেশি চেঁচাস না দেখি। শালা মিয়ালোক, তুই কী বুঝুস ইসবের? এত দিন ধরে দেখে আসছি, মেঘের গতিক আমি বুঝি নাই? জল হবেকেই। অত কষ্ট করে ঘাম ঝরাই চাষ ক‌ইরেছি। কনহ্ ফেলনা ন-কি?" দাঁত খিঁচিয়ে ধমক দিয়ে ওঠে পঞ্চানন। চুপ করে যায় আরতি। কিন্তু মনকে কি আর চুপ করাতে পারে পঞ্চানন? আরতি তো মিথ্যা কিছু বলেনি। সময়ে অসময়ে পার্টির লোকের কাছেই ছুটে যেতে হয়। পার্টির লোকের ক্ষমতা পঞ্চানন জানে।

কিন্তু অতগুলো ধান কি এমনি এমনি নষ্ট হবে? তাছাড়া শুধু তো আর খেতের ধানগুলোই নয়। খামারে আধখানা পালুইটা পড়ে আছে। বৃষ্টি হলে জল ঢুকে যাবে। যতক্ষণ না মাঠের ধানগুলো এনে সম্পূর্ণ ছাউনি দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রক্ষে নেই। এ অবস্থায় কি মিটিংয়ে যেতে পারে? হাজার হোক চাষি তো! মন তো কাঁদবেই।

আরতি তখন পাশের ঝোপ থেকে একটা বাঁশের লাঠি নিয়ে এসে মাদার গাছে ঝুলে থাকা বন-কুঁদরিগুলো পাড়ার চেষ্টা করে। নাগাল পায় না মোটেও। দেখেশুনে পঞ্চানন নিজে থেকেই লাঠিটা হাত বাড়িয়ে চেয়ে নেয়। না, তার‌ও নাগালের বাইরে বন-কুঁদরি। বারকয়েক চেষ্টা করে যখন ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে, তখন শেষমেষ রেগে গিয়ে 'লে শালা' বলে লাঠিটাই জোরে ছুড়ে মারে মাদার গাছে। লতায় পাতায় লটকে যায় লাঠি। যেখান দিয়ে খড় পচা ঘোলা জলের মতো অন্ধকার নেমে আসে চারপাশে। যার সাথে মনের আঁধার কখন যে মিলে মিশে এক হয়ে যায় বুঝতে পারেনি পঞ্চানন।


।।দুই।।


সকালে ঘুম ভাঙলে চমকে উঠে আরতি। বিছানা ফাঁকা। পঞ্চানন কোথায়? কাল রাতে খবর পেয়ে ফোন করেছিল ছেলে। অনেক করে বুঝিয়েছে বাপকে। ছেলের কথায় মিটিংয়ে যেতে রাজিও হয়েছে পঞ্চানন। সেই মতো শোবার আগে ব্যাগপত্রও গুছিয়ে রেখেছিল মাথা শিতানে। কিন্তু তাই বলে কি এতো ভোর ভোর উঠে বাস ধরতে যাবে?

না, রাতের ব্যাগটা তো যথা স্থানেই রাখা। তাহলে — তাকে না বলে মানুষটা গেল কোথায়?

চারিদিক খোঁজাখুঁজি করেও যখন পাওয়া গেল না তখন আর বুঝতে বাকি রইল না আরতির। তড়িঘড়ি এগিয়ে গেল খেতের দিকে। কাছাকাছি যেতেই চোখে পড়ে মাথায় গামছা বেঁধে একমনে ধানের আঁটি বাঁধছে পঞ্চানন। ভাসা ভাসা মেঘের ফাঁক দিয়ে ছলকে পড়া নতুন সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে ধান — পঞ্চাননের সারা শরীর।

চোখগুলো ছলছল করে ওঠে আরতির। আলের ওপর এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে পঞ্চাননকে। যেন এক অন্য মানুষ, সব ভুলে নিমগ্ন হয়েছে সাধনায়।

আরতি যে দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ করে পঞ্চানন। কাজ থামিয়ে হেসে হেসে বলে, "ই-বাবা, কাঁদছু ন-কি গো? কাঁদার কী আছে? নিজেদের কাজ নিজেদিগে করতে হবেক নাই আগে?"

আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না আরতি। আঁচল দিয়ে দুচোখ মুছে নেমে পড়ে জমিতে। আঁচলটা কোমরে শক্ত করে বেঁধে হাত লাগায় স্বামীর সাথে। পঞ্চাননের উৎসাহ তখন দ্বিগুণ। গান ধরে গুনগুন করে। একটার পর একটা আঁটি দু'হাত দিয়ে ধরে প্যাঁচ দিয়ে বেঁধে শুইয়ে দেয় মাটির ওপর।

"হেট্ - হাট্ - হুর..." শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকায় আরতি। দেখতে পায়, মদন বাউরি এক পাল ছাগল নিয়ে সেই পথেই এগিয়ে আসছে। পঞ্চাননের জমির কিছুটা পরেই একটা ফাঁকা মাঠ। সেখানেই রোজ ছাগল চরায় মদন। কাছাকাছি আসতেই বলে, "কী হে ব পঞ্চাখুড়া, আইজকের দিনে ধান বাঁধছ বড়! মিটিংয়ে যাও নাই?"

ঘাড় তুলে পঞ্চানন। মুখের হাসিটা চ‌ওড়া করে বলে, "ধুর, কাজ ফেলে মিটিংয়ে গেলে কি আর আমাদের চলে হে?"

"যা ব‌লেছ। শালারা আমাকেও বলেছিল। যাই নাই।" লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বিড়ি বের করে দাঁত দিয়ে চেপে ধরে দেশলাই ঠোকরাতে ঠোকরাতে মদন বলে, "উখেনে গেলে কি আমাদের পেট ভ‌রবেক, বল?"

"কেনে হে, এক পাত খেচড়ি দিবেক, তাতেও পেট ভরভেক নাই?" রসিকতা করে পঞ্চানন।

ভস ভস করে বিড়িতে দু'টান দিয়ে হো হো করে হেসে উঠে মদন। বলে, "ওই এক পাত খেচড়িতে কি আর আমার ছাগলগুলার পেট ভরবেক হে?"

হাসিতে যোগ দেয় পঞ্চানন‌ও, "বেশ বলেছ মদন।" আরতিকে শুনিয়ে বলে, " দ্যাখ, শুধু আমাকে একাই বলছিলি যে মিটিংয়ে যাই নাই। আমার মতন আরও কেউ আছে ন-কি দ্যাখ।" কিছু না বলে মুচকি মুচকি হাসে আরতি।

মদন বলে, " না হে খুড়া, তুমিই বল, আগে কতবার মিটিংয়ে গেছি। কী হয়? ফালতু ফালতু হয়রানি।"

"ঠিকই বলেছ, হয়রানি হয় বটে। দাও, দাও, একটা বিড়ি আছে ত দাও দ্যাখি?" খেত ছেড়ে আলে উঠে আসে পঞ্চানন। মদনের কাছে বিড়ি নিয়ে টান দিতে দিতে বলে, "একটা কথা বলি মদন, দাও-ন একটু হাত লাগাই‌, ধানগুলা আমার বাঁধে দাও। বিশ - পঞ্চাশ টাকা লিবে না হয়। কাজটা একটু হোক তাড়াতাড়ি।"

"ব‌ইলছ যখন, তখন কি আর না বলা যায়। দাঁড়াও, আগে ছাগলগুলা মাঠটায় তুলে দিয়ে আসি।" তড়িঘড়ি ছাগল নিয়ে মাঠের দিকে এগিয়ে যায় মদন। আলের ওপর বসে পড়ে পঞ্চানন। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভাবতে থাকে, সত্যি তো জীবনে কতবার মিটিংয়ে গেছে বাসে ঝুলে, ট্রাকে চেপে। যাবার সময় যতটা না উৎসাহ নিয়ে যেত, ফেরার সময় ততটাই ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরত সব। মনে হতো আর নয়, এই শেষ।

তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছিল সেইবার, যেবার কলকাতা গিয়েছিল দলবেঁধে। ব্রিগেডের মাঠ। সেই প্রথম কলকাতা যাওয়া পঞ্চাননের। চারিদিকে শুধু শুধু লোক আর লোক। হাঁ হয়ে এদিক ওদিক দেখছিল পঞ্চানন। না, মিটিংয়ের মাঠ অব্দি পৌঁছাতে পারেনি ওরা। রাস্তায় কেটে গিয়েছিল সময়। শুধু দূর থেকে মাইকে শুনছিল ভাষণ দিচ্ছে নেতারা। দিক ভাষণ। ওসবে তার কী কাজ। মিটিংয়ের বাসে এসেছে, গ্রামের নেতারা নাম লিখেছে সেই বড়ো কথা। তবে সেদিন আর একটা বড়ো কাজ করেছিল পঞ্চানন। ফুটপাতের দোকান থেকে একটা লাল টুকটুকে শাল কিনেছিল আরতির জন্য। ফেরার পথে শক্তিগড়ে নিয়েছিল এক প্যাকেট ল্যাংচা‌। শাল পেয়ে আরতির সে কি আনন্দ। আজ‌ও যত্ন করে রেখে দিয়েছে সে শাল। শীতের দিনে উৎসবে, অনুষ্ঠানে সেটাই তো গায়ে দেয় আরতি। তবে ইদানীং রংটা কিছুটা ফিকে হয়েছে এই যা।

তা হোক, এখন কি আর বসে বসে ওসব ভাবার সময় আছে। রোদটা চড়া হ‌ওয়ার আগেই ধানগুলো সব বেঁধে ফেলতে হবে। বিড়িটা শেষ হতেই উঠে পড়ে পঞ্চানন। মদন‌ও ফিরে এসে সাথ দেয় কাজে। তিনজনে গল্প গুজব করতে করতে আঁটি বাঁধে একের পর এক, বিড়া করে তুলে রাখে আলের ওপর।

খানিক বাদে হঠাৎ কাজ ছেড়ে উঠে পড়ে মদন। বলে, "না খুড়া, আর লয়। তুমরা নিজেরাই বাঁধ ইবার। ওই দ্যাখ, এক পাল কুকুর আসছে। কোন সময় আসে ছাগলগুলাকে ধরবেক তার ঠিক নাই। আমি যাই।"

সায় দিয়ে পঞ্চানন বলে, "হঁ, হঁ, যাও যাও। ইগুলা আমি একাই বাঁধে লিব। দিন দিন দ্যাখছি কুকুরগুলা বেদম হিংস্র হয়ে উঠছে।"

"যা বলেছ খুড়া!" এর বেশি আর কথা বলার অবসর নেই মদনের। যেই না দেখে কুকুরের দল ছাগল পালের কাছাকাছি চলে এসেছে, লাঠি নিয়ে তেড়ে যায়।

বাঁধার কাজে চটক বাড়ায় পঞ্চানন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করে গোরুর গাড়ি নিয়ে আসে বাড়ি থেকে। ধানে বোঝাই করে গাড়ি। খামারে নিয়ে এসে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে পালুই সাজায়।

মিটিং সেরে বাসগুলো তখন ফিরছে এক এক করে। দুর থেকেই শ্লোগান শুনতে পায় থেকে থেকে। গাছে গাছে ছড়িয়ে যায় সে চিৎকার। পদু রায়, ভবা মোড়ল যেন ভর করে ডালে ডালে। চমকে চমকে ওঠে পঞ্চানন। খুসখুস করতে থাকে গলাটা। বুঝতে দেয় না আরতিকে। বরং খুক খুক করে বারকয়েক কেশে নিয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলে, "চেঁচা, চেঁচা, যত পারবি চেঁচা... পরের খাওয়ার বল আর কত টুকু রে!"

সন সন করে হাওয়া ওঠে ইউক্যালিপটাস গাছে — তাল গাছে — মাদার গাছে — বন-কুঁদরির লতায়। টুকরো টুকরো মেঘগুলো জড়ো হতে থাকে একটু একটু করে। লেপটে যায় একে অপরের গায়ে। বাড়তে থাকে হাওয়া। পড়িমড়ি করে ছাউনি দেওয়া শেষ করে পালুইয়ের মাথায় বসে দম নেয় পঞ্চানন। ধানে ধানে উঁচু হয়ে গেছে পালুইটা। অনেক উঁচু। যার ডোগায় বসে আছে পঞ্চানন — একা। মাদার গাছে ঝুলে থাকা বন-কুঁদরিগুলো তখন হাতের নাগালে তার। মাথার কাছে দোল দোল দুলছে হাওয়ায়। গত দু'বছরের দুঃসময়ে — পুঁই, পরল, কচুর সাথে যারা আলো করে তুলেছিল আরতির রান্নাশালা। দেখা মাত্রই অদ্ভুত এক প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে মুখে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একথালা সাদা ভাত আর চাকা চাকা করে কাটা বন-কুঁদরি ভাজা। আহ্, কী তার সুবাস! জিভে জল এসে যায়। ঢোক গিলে পঞ্চানন। যে জলে গলে যায় বহুক্ষণ ধরে গলায় আটকে থাকা পদু রায় — ভবা মোড়ল।

সঙ্গে সঙ্গে পালুইয়ের ওপর উঠে দাঁড়ায় পঞ্চানন। হাওয়া লাগে গায়ে। হাত বাড়িয়ে টুপটাপ তুলতে থাকে বন-কুঁদরি। ভরে যায় লুঙ্গির ঝোলা। আরতি তখন ঝরে পড়া ধান কুড়াচ্ছে ঝুড়িতে। এক বুক তাজা নিশ্বাস টেনে নিয়ে গদগদ স্বরে হাঁক পাড়ে পঞ্চানন , "চ আরতি, ভাত বসাবি চ। ইবারে যত পারে মেঘ আসে আসুক..."

বাতাসের গতি তখন অনেকটাই বেড়ে গেছে। যার দোলায় লটকে থাকা লাঠিটা ধপাস করে পড়ে পালুইয়ের ওপর। পালুই বেয়ে গড়িয়ে পড়ে খামারে, যেখানে ঝরে পড়া ধান উঁকি মারছে ওপরে ঝুলে থাকা বন-কুঁদরির দিকে।

-----------

লেখক পরিচিতি: রাজীব তন্তুবায়এর জন্ম ১৯৮৭ সালে বাঁকুড়া জেলার ইন্দপুর গ্রামে। পেশায় শিক্ষক হলেও সাহিত্যচর্চায় অনুগত প্রাণ। মূলত গল্পকার। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে আসছেন। নেশা: বইপড়া, ভ্রমণ।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ