গুলেরির বাপের বাড়ি ছাম্বাতে। ওর স্বামীর ঘর, যেটা পাহাড়ের ওপর উঁচু জায়গায় অবস্থিত, সেখান থেকে সেই বাড়ি যাবার রাস্তাটা বেঁকে গিয়ে খাড়া নিচে নেমে গেছে। এখান থেকে তাকালেই মনে হয় যেন পায়ের নিচে অনেক দূরের ছাম্বা নিজেকে এলিয়ে রেখেছে। বাড়ির কথা মনে হলেই গুলেরি ওর স্বামী মানাককে নিয়ে এইখানে এসে দাঁড়াত। দেখতে পেত রোদে ঝলমল করছে ছাম্বা, খানিক পরে বেজায় গর্বিত ভঙ্গিতে সে আবার স্বামীকে নিয়ে ফিরে আসত।
বছরে একবার, শস্য কাটা হয়ে গেলে গুলেরিকে বাপের বাড়িতে অল্প কিছুদিন থাকবার অনুমতি দেওয়া হত। লকরমন্ডিতে লোক পাঠিয়ে তাকে ছাম্বাতে নিয়ে যাওয়া হত। ওর আরও যে দুই বন্ধুর ছাম্বার বাইরে বিয়ে হয়েছিল, তারাও ঠিক এইসময়েই বাপের বাড়ি আসত। সারা বছর ধরে মেয়েগুলো এই সময়টার দিকে তাকিয়ে থাকত। রোজ আড্ডা বসত তাদের, নিজেদের সুখ দুঃখের কথায় কলকলিয়ে উঠত তারা। একসঙ্গে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত আর এই করতে করতে নবান্নের উৎসব চলে আসত। তখন তো তাদের নতুন পোশাক চাইই চাই। নিজেদের দোপাট্টাগুলোকে রঙ করে, মাড় দিয়ে, চুমকি ছড়িয়ে দিত তারা। কাচের চুড়ি আর রূপোর কানের দুল কিনত।
গুলেরি নবান্ন উৎসবের দিন গুনত। শরতের বাতাসে যখন আকাশ থেকে বরষার মেঘ সরে যেত, ছাম্বার বাড়ি ছাড়া ওর মাথাতে আর কিছুই থাকত না। কাজকাম সবই করত বটে, গরুকে জাবনা দিত, শ্বশুর শাশুড়ির জন্য রান্নাবান্নাও করত কিন্তু সারাক্ষণ ভেবে যেত, কখন ছাম্বা থেকে তাকে নেবার জন্য লোক আসবে।
এই করতে করতেই সেই সময়টা চলে এল। যে ঘুড়িটার পিঠে চেপে যাবে সেটাকে জাপটে আদর টাদর করে, বাপের বাড়ির মুনিষ নাথুকে খাতিরদারি করে গুলেরি পরদিন যাবার আয়োজন করতে লাগলো। এতো উত্তেজিত বোধ করছিল সে যে তার ভাবভঙ্গিতেই সেই উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে ঝরে পড়ছিল। ওর বর মানাক কিন্তু চোখ বুজে হুঁকো টেনে যাচ্ছিল। যেন ও বৌ-এর চোখে চোখ রাখতে চাইছে না।
· তুমি তো ছাম্বার মেলায় আসবে, আসবে না ? একদিনের জন্য হলেও এস কিন্তু।
গুলেরি মিনতির সুরে বলল। মানাক হুঁকো নামিয়ে রাখল, কিন্তু কোনও উত্তর দিল না।
গুলেরির মেজাজ গরম হয়ে উঠল,
· জবাব দিচ্ছ না কেন? আমার কিন্তু বলার মতো অনেক কথা রয়েছে।
· জানি জানি, তোমার কী বলার আছে। ওই তো সেই একঘেয়ে কথা, বছরে একবারই তো বাপের বাড়ি যাই। তা কোনও বার না গিয়ে ছেড়েছ ?
· তা এবারই বা তোমার আপত্তি কিসের ?
· একবারই তো যেতে না বলেছি !
· তোমার মায়ের কোনও আপত্তি নেই, তুমি হঠাত আমার রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছ কেন ?
· আমার মা…
মানাক কী যেন বলতে গিয়েও বলে না।
ভোরের আলো ফুটবার আগেই গুলেরি তৈরি হয়ে নিল।বাচ্চাকাচ্চা নেই, ফলে নিয়ে যাবার কিম্বা রেখে যাবার ঝঞ্ঝাট নেই।নাথু বুড়ো শ্বশুর শাশুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘুড়িটাকে লাগাম পরাল। ওরা পশুটার মাথা চাপড়ে আশির্বাণী উচ্চারণ করল। মানাক বলে,
· চল, কিছুদূর তোমাদের এগিয়ে দিয়ে আসি ।
গুলেরিকে খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছিল। নিজের দোপাট্টার ভাঁজে সে লুকিয়ে নিয়েছে মানাকের বাঁশের বাঁশিটা।
রাস্তাটা খাজিয়ার অবধি পৌঁছে খাড়া নেমে গেছে ছাম্বার দিকে। এইখানে পৌঁছে হঠাত দোপাট্টার আড়াল থেকে বাঁশিটা বার করে গুলেরি। মানাকের হাতে সেটা গুঁজে দিয়ে বলে,
· এই নাও তোমার বাঁশি। একটু বাজাও নাগো।
কিন্তু মানাক যেন নিজের চিন্তায় ডুবে থেকে তার কথা শুনতেই পেল না।
গুলেরি ফের বললে,
· কী গো , বাজাবে না ?
মানাকের চোখদুটো থেকে যেন না-বলা যন্ত্রণা ঝরে পড়ছিল। সে বাঁশিতে ফুঁ দিল বটে, কিন্তু সেই সুরে পৃথিবীর যাবতীয় বিলাপ আর্তনাদের মতো বেজে উঠল। মানাকের গলায় যেন ফোঁপানির শব্দ, বাঁশিটি ফিরিয়ে দিয়ে সে কোনও রকমে বলল,
· গুলেরি যেও না, এবারটি কি না গেলেই নয় ?
· কিন্তু কেন ? গুলেরি খুব অবাক, - তুমি তো মেলার দিন আসছই। আমরা একসঙ্গেই ফিরে আসব তো!
মানাক আর কিছু বলল না। মুখে কুলুপ এঁটে রইল।
গুলেরি আর মানাক পথের বাঁকে এসে দাঁড়াল। নাথু তাদেরকে একটু একা থাকার সুযোগ দিয়ে ঘুড়িটাকে তফাতে নিয়ে গেল, যেন এখনই ওটার ঘাস খাওয়া খুব দরকার। মানাকের মনে পড়ে গেল সাত বছর আগে ঠিক এই সময়ে সে আর তার বন্ধুরা ছাম্বার শস্য-উৎসবে যাবে বলে এই বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছিল। ওই মেলাতেই গুলেরিকে সে প্রথম দেখে আর প্রথম দর্শনেই তারা পরস্পরকে হৃদয় দিয়ে ফেলে। একবার নিরিবিলিতে তাদের দেখা হতেই মানাক গুলেরির হাত জড়িয়ে ধরে বলে,
· তুমি না-পাকা ভুট্টার মতো। দুধে ভর্তি।
· না-পাকা ভুট্টা খায় গরু ভেড়ারা।
নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গুলেরি বলেছিল,
· মানুষের পছন্দ পাকা ঝলসানো গরম ভুট্টা। যদি আমাকে চাও তো আমার বাপুর কাছে গিয়ে বিয়ের কথা পাড়ো।
মানাকের সমাজে সবাই কন্যাপণ দিয়ে বিয়ে করে। গুলেরির বাবা কতো টাকা চাইবে আন্দাজ করতে না পেরে মানাক খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওদের অবস্থা ভালো ছিল, আর গুলেরির বাবা কিছুদিন শহরেও থেকে এসেছে। সে কোনও টাকাই চাইল না, বরং মেয়েকে সৎ পাত্রে বিয়ে দেবার ইচ্ছে বার বার ব্যক্ত করল। মানাককে তার সৎ পাত্রই মনে হয়েছিল, তাই খুব তাড়াতাড়ি তাদের বিয়েটা হয়ে গেল। এইসব স্মৃতির মধ্যে মানাক এমন ডুবেছিল যে তার কাঁধে গুলেরির হাতের ছোঁয়া পেয়ে সে চমকে উঠল।
ঠাট্টার সুর ছিল গুলেরির গলায়,
· কিসের স্বপ্ন দেখছ তুমি জেগে জেগে ?
মানাক এবারও তার কথার উত্তর দিল না। ঘুড়িটা অধৈর্য হয়ে ডেকে উঠল। অনেকটা পথ বাকি, গুলেরিও যাবার জন্য তৈরি। তবুও সে রহস্য করে বলল,
· মানাক জান তো, নীল ঘন্টার জঙ্গল এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে? কেউ ওই জঙ্গলের পথ মাড়িয়ে ফেললে চিরদিনের মতো বধির হয়ে যায়।
- হ্যাঁ, জানি।
- আমার তো মনে হচ্ছে তুমি ওই জঙ্গলে বেড়িয়ে কানে কালা হয়ে ফিরেছ। আমার কোনও কথাই তো তোমার কানে যাচ্ছে না।
একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস ফেলল মানাক,
· হ্যাঁ গুলেরি, তোমার কোনও কথাই আমি শুনতে পারছি না।
দুজনেই দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু কেউই বুঝতে পারছিল না অন্যজনের মনের মধ্যে কী চলছে।
গুলেরি ব্যস্ত হয়ে বলল,
· এবার আমাকে যেতেই হবে। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। অনেক দূর চলে এসেছ কিন্তু।
· হ্যাঁ যাচ্ছি। তুমিও তো এতটা হেঁটেছ। এবার জানোয়ারটার পিঠে চেপে বসলে হয় না ?
· ঠিক আছে। তোমার বাঁশিটা ধর।
· না থাক, ওটা তুমিই নিয়ে যাও।
এবার গুলেরি হেসে ফেলল।
· তুমি কি মেলার দিন এসে এটাকে বাজাবে ?
ওর চোখে সূর্যের কিরণ পড়ে ঝলমল করতে থাকে। মানাক মুখ ঘুরিয়ে নেয়, কিছু বুঝতে না পেরে গুলেরি কাঁধ ঝাঁকায়, তারপর ছাম্বার রাস্তায় নেমে যায়। মানাকও বাড়ির পথ ধরে।
বাড়িতে ফিরে মানাক চারপাইয়ের ওপর শুয়ে পড়ে গা হাত পা ছেড়ে, যেন তার শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই।
· এতক্ষণ লাগল ! তুই কি ছাম্বা চলে গিয়েছিলি নাকি?
- না, পাহাড়ের মাথা অব্দি গিয়েছিলাম।
· আরে, তোর গলার আওয়াজটা শোনাচ্ছে যেন কোনও বুড়ি মেয়েছেলের মতো। পুরুষের মতো তাকত নাই তোর ?
ওর মা চেঁচাচ্ছিল। মানাক বলতে চাইল,
· তুমি একজন নারী হয়ে সব উলটে দেবার জন্য এতোটা লাফালাফি করতে পার, আর সব দোষ কিনা আমার!
কিন্তু কী ভেবে মানাক চুপ করেই রইল। মায়ের মুখের ওপর কোনও কথাই বলল না।
মানাক আর গুলেরির বিয়ে হয়েছিল সাত বছর। কিন্তু তাদের কোনও বাচ্চা না হওয়ায় মানাকের মা প্রতিজ্ঞা করেছিল, আট বছরের বেশি অপেক্ষা সে কিছুতেই করবে না।
এ বছর সে পাত্রীর জন্য পাঁচশ টাকা দিয়ে বসে আছে , আর মানাক ভালো করেই জানত, বুড়ি অপেক্ষা করছে কবে গুলেরি বাপের বাড়ি যাবে।
মায়ের কাছে বাধ্য থাকার দায়ে, তার সমাজের রীতিনীতির প্রতি বাধ্যতায় মানাকের দেহটা নতুন বৌয়ের হল হয়ত, কিন্তু তার ভালবাসবার মনটা চিরকালের মতো মরে গিয়েছিল।
একদিন সকালে আঙিনায় বসে সে ছিলিম খাচ্ছিল। এমন সময় পুরনো বন্ধুকে যেতে দেখে সে বলল,
· এই ভবানী সাতসকালে উঠে কোথায় চললি রে ?
কাঁধে বোঝা নিয়ে ভবানী দাঁড়াল বটে, কিন্তু আমতা আমতা করে বলল,
· এই একটু হোথা।
· যাবার আগে এক ছিলিম খেয়ে যা, আয়। মানাক ডাকাডাকি করল।
ভবানী এল, ছিলিম নিল, তারপর বলল,
· ছাম্বার মেলায় যাচ্ছি।
তার কথাগুলো তীক্ষ্ণ শলাকার মতো মানাকের হৃদয় এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল।
· মেলা কি আজ নাকি রে?
· আরে, প্রত্যেক বছর তো একই দিনে হয়। সাত বছর আগের এই দিনটার কথা মনে পড়ে , মানাক?
ভবানী আর কিছুই বলেনি, কিন্তু তার কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভর্তসনার সুর মানাক ঠিক শুনতে পেল। তার অস্বস্তি হচ্ছিল। ভবানীও ছিলিম নামিয়ে বোঝা তুলে নিল, সেখান থেকে মুখ বার করে ছিল তার বাঁশিটা, যতক্ষণ দেখা যায়, মানাক বাঁশিটার দিকেই তাকিয়ে থাকল।
পরের দিন মানাক ক্ষেতে কাজ করছিল। হঠাত দেখল ভবানী ফিরে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে যেন দেখতেই পায়নি এইভাবে মানাক মুখ ঘুরিয়ে নিল। মেলা নিয়ে কোনও কথাই সে আর শুনতে চায় না। কিন্তু ভবানী ঠিক তার কাছে এসে উবু হয়ে মানাকের মুখোমুখি বসল। তার মুখ ছিল বিষণ্ণ, আলোহীন।
· জানিস তো, গুলেরি আর নেই।
· তার মানে?
· তোর দ্বিতীয় বিয়ের খবর পেয়ে ও গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল।
যন্ত্রণায় মানাক বোবা হয়ে গেল, হাঁ করে শুধু ভবানীর মুখের দিকে চেয়ে রইল, কিন্তু নিজেই সে টের পাচ্ছিল, তার সমস্ত জীবনীশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে।
দিনের পর দিন কাটতে লাগল। কাজ, খাওয়া, মানাক কিছুই বন্ধ করেনি, কিন্তু ওর মনটা ছিল একেবারে ফাঁকা, চোখদুটো দৃষ্টিশূন্য !
· আমি কি ওর বৌ নাকি! শুধুমুধুই আমাকে বিয়ে করেছে লোকটা।
মানাকের নতুন বৌ খালি গজগজ করত।
কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সে গর্ভবতী হয়ে পড়ল আর তার শাশুড়ি মা বেজায় খুশি হল। মানাককে আনন্দের খবরটা দিতে গিয়ে দেখল ছেলে তার মুখের দিকে চেয়ে আছে যেন কিছুই বোঝেনি, আর চোখদুটো সেইরকমই ফাঁকা, দৃষ্টিশূন্য।
ফিরে এসে শাশুড়ি বৌকে আর অল্প কিছুদিন মানাকের এই অবস্থা সহ্য করার পরামর্শ দিল। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, নবজাতককে কোলে নিলেই মানাক আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
কিছুদিন পর মানাকের একটি পুত্রসন্তান হল।খুশি হয়ে মানাকের মা বাচ্চাটাকে ধোয়াল মোছাল, তারপর নতুন জামা পরিয়ে মানাকের কোলে তুলে দিল। মানাক অনেকক্ষণ কোলের বাচ্চাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। মুখে তার আনন্দ বেদনা কোনও কিছুরই প্রকাশ ছিল না। হঠাত তার ফাঁকা চোখদুটো ভয়ে ফেটে পড়তে চাইল, সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
এটাকে নিয়ে যাও, নিয়ে যাও। ওর গা থেকে কেরোসিনের গন্ধ আসছে !
-----------
মূলগল্প: Stench of Kerosene


0 মন্তব্যসমূহ