শতাব্দী দাশের গল্প : যেমন খুশি



১.

ঘুম ভাঙলেই ফাঁকা ঘর বিজনকে গিলে খেতে আসে। এ ব্যারামের বয়স বেশি না। বছর দুই বড়জোর। কোভিডের পর থেকে এমন হল। তখন একটা স্বপ্ন দেখত বিজু। সে একটা বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে আছে কেওড়াতলায়, খাটে, ইলেক্ট্রিক চুল্লির সামনেটায়। লাশের ঊর্ধ্ব অংগে কাপড় নেই। ঘুমন্ত বিজু লজ্জায় শিরশির করত। সেই লজ্জা চুঁয়ে ঝরত লাশের বুকে, স্তন্যবৃন্তে। লাশটা তখন ছুটে গিয়ে ডোমের গলার গামছাটা ছোঁ মেরে নিজের বুকে ফেলতে চাইত। লাশ না, আসলে ঘুমন্ত বিজু অমন চাইত। অথচ, লাশ যেহেতু সেই নাটকে নিতান্তই লাশের পার্ট পেয়েছে, তাই তার হাত-পা খাটিয়ায় আঠা দিয়ে সাঁটা। চেয়েও পাচ্ছে না টুকরো আবরণ। ঘুমের মধ্যে ঘেমে-নেয়ে একসা হত বিজু। কবে একা মরে পড়ে থাকবে ফাঁকা ফ্ল্যাটে — তার চেয়েও বেশি ভাবনা তার, বিজু বুঝতে পেরেছিল, মৃত্যুর পরের সময়টা ঘিরে। ওদের ভুলচুক হয়ে যায়। যদি ওরা ভুলে যায় যে, জ্ঞান হওয়া ইস্তক বিজু সব্বসমক্ষে খালি-গা ছিল না কখনও?

মা জানত। লোডশেডিং হলে বাবা খালি-গা হত। মাকে বলত, ‘ওকে জামা ছাড়িয়ে দাও না! ব্যাটাছেলে স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ঘামছে কেমন!’ বিজু সিঁটিয়ে যেত। মা বলত, ‘থাক গে! চায় না যখন৷’ মা সব জানত বাবাও জেনেছিল ক্রমে। মা-বাবা মরে গেছে বছর দশ হল। বিজু, তিন চারটে কোভিড ঢেউ সামলে, দিব্য বেঁচে।

আজ ঘুম ভাঙল তাড়াতাড়ি। ঘর তাকে গিলে খেয়ে নেওয়ার আগেই, বিজু তড়াক লাফে বিছানা ছেড়ে নামল। বাজার গেলে হয় না? দেওয়াল থেকে মা আর বাবা শূন্যচোখে চায়। হাঁ-মুখ ঘর ছেড়ে পালাবে বললেই পালানো যায় না। চাই কিছু যোগ ও বিয়োগ। সন্তর্পণে কাল রাতে গজানো খুচরো দাড়িদের বিয়োগ করে বিজু। সস্তার ফাউন্ডেশন তার মুখকে পেলব করে তোলে৷ বিজু গুনগুন করে। ‘প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে, প্রতি অঙ্গ মোর!’ একখানি পাঞ্জাবি আর চোস্তা পরে নেয়। রাবার ব্যাণ্ড দিয়ে চুলকে বাগে আনে। লিপ বাম লাগাতেই ভেজা ভেজা ওষ্ট-অধর। থলে হাতে দরজায় তালা লাগাতে গিয়ে বিজু চমকে ওঠে। নতুন গলা দোতলায়, না? নতুন ভাড়াটে?

এ বাড়িতে ভাড়াটে আসে যায়। বিজুর তাতে যায় আসে না৷ সব চোখে একই বিস্ময়৷ চিড়িয়াখানার খাঁচার সামনে শিশুর যে বিস্ময়, তেমন নয়। বিস্ময়ে অন্য রঙ মেশে। ঘেন্নার। অস্বস্তির। কখনও ভয়ের। দোতলায় আগে থাকত যে হিন্দুস্তানি পরিবার, তার গিন্নীটির চোখে আবার সমীহ ছিল৷ মহিলা ফস করে একদিন বলে বসল, ‘মেরি বহুকো আশীর্বাদ দেনা। লড়কা হোনা চাহিয়ে। বহত দম হ্যায় আপ লোগো-কে দুয়া মে।’

বিজু বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, সে হিজড়ে নয়৷ কিন্তু মহিলা নাছোড়। তারা চলে যাওয়ায় একরকম স্বস্তি পেয়েছিল বিজু৷ নতুন ভাড়াঘর থেকে একটানা ঘ্যানঘ্যান ভেসে আসছে। একটানা, কিন্তু মিঠে। সা-পা ধরে আছে যেন। শিশুকণ্ঠ। সঙ্গতে, নানা সুরে অনুনয় করে চলেছে নারী।

-খেয়ে নে বাবু!

আর এক গাল!

এই তো!

এটা বাপির গাল।

এটা মাম্মামের গাল।

এটা? এটা দাদুনের।

আঃ! স্কুলের বাস এসে যাবে যে!

হু হু করে। মায়ের উপর রাগ হয়। কেন চলে গেলে? কি সুন্দর, কি নরম মা! পুর্ণ নারী— তাই এত রোয়াব তোমার? বাবাকেও নিয়ে গেলে বছর ঘুরতে। তোমায় ছাড়া বাবা বাঁচতে শেখেনি। আমিও শিখতে চাইনি, মা। শিখে গেলাম।

মায়ের পছন্দ জিওল মাছ। তড়াং তড়াং লাফাচ্ছে। শিঙি কেনে বিজু। জিওল, অথচ বেঁচে আছে এক ঘায়ে মরে যাবে বলে। ফ্রিজে কাঁচকলা আছে। জামবাটিতে নুন আর হলুদ গোলা জল নেবে বিজু। চাকা চাকা কলা তাতে ভাসবে৷ এইভাবে মা আনাজ কাটত। চেরা কাঁচালঙ্কা ছেড়ে দেবে ফুটন্ত ঝোলে। ডিঙি নৌকার মতো পাড়ি দেবে তারা। কালোজিরে বাড়ন্ত। মুদির দোকান যাওয়া চাই।

ফিরতি পথে বাসস্ট্যান্ডে চোখ যায়। ব্যাগ-বোতলে সজ্জিত শিশুর হাত ধরেছে মা। চকিতে বাস ওদের আড়াল করল। ছেলে তুলে দিয়ে এইবার শুধু মা। কামিজে আঁটসাঁট চেহারা। জিন্স। মায়ের পিঠেও ছেলের মতো ব্যাগ। টেরিয়ে দেখছে বিজুকে। নতুন ভাড়াটে।

-আপনি অপালা-য় থাকেন, না? নীচতলায়?

-হ্যাঁ।

-দেখেছি। আমি মিতুল। আমরা তিনজন ভাড়া এসেছি। দোতলায়।

-মিষ্টি বাচ্চা তোমার।


মিতুল আপাদপমস্তক জরিপ করছে বিজুকে। কথায় মায়া আছে, অথচ অস্বস্তি হচ্ছে বিজুর।

-আপনি একা থাকেন?

-হ্যাঁ।

-কী করেন?

-টুকটাক। মেকাপের কাজ। পেলে করি।

-অ্যাঁ! কোথায়?

মিতুল মজা পেয়েছে।

-টালিগঞ্জ। থিয়েটারেও। যখন যা পাই। রোজ তো না। ফ্রিলান্স।

-তার মানে বাড়ি থাকেন বাকি সময়? আজ থাকবেন?

মেয়েটা খপ করে বিজুর হাত জড়িয়ে ধরেছে৷ যেন কতদিনের সই!
বিজুর ভালো লাগে। মাথার ভিতর গুনগুন। ‘আয় তবে সহচরী, হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ, হুঁ হুঁ হুঁ উঁ।’
মেয়েদের হাত খুব নরম। মায়ের যেমন। মিতুল ‘তুমি’-তে নেমেছে।

-আমার ছেলের নাম পিলু। চারটেয় ফিরবে। আমি, ওর বাবা…আমরা কেউ সে সময় থাকব না, জানো? আমার ফিরতে পাঁচটা। বিকেলের ঠিকে মাসি বাস থেকে নামাবে। তুমি একটু দেখবে গো?

বিজুর শরীরে তরঙ্গ ওঠে৷ পিলু। বসন্ত। আনন্দ। সত্‌রঙ। নি স গ ম প নি সা•। পিলু। বিজুর চোখে জল চিক চিক করে অকারণ।

২.

“নন্দরাণি যাহ গো ভবনে।
তোমার গোপাল আনি দিব বেলি অবসানে।।”

বাস মাঝে মাঝে বড় দেরি করে। বিজু উতলা হচ্ছে। রেবা মাসি বাসন ধুচ্ছে নির্ঘাৎ দোতলায়। ওরও অপেক্ষা করার কথা। কিন্তু আসবে কেন সে? পিলু উঠবেই না কোলে। বিজুকেই সে খোঁজে৷ বিজুর ঠোঁটে হাসি খেলে যায়।

চিপস-ঝুরি-লজেন্স জোগাড় করে, কোলে চেপে ফেরেন বাবু। এক-এক দিন এক-এক বরাত৷ পিলু ভাঁজছে বিজু। কোমল গান্ধারের চেয়ে কোমল। শুদ্ধ মা-য়ের চেয়ে শুদ্ধ। চাঁদের আলো হাত আর পা। আঙুল যেন ননীতে গড়া। পিলু এসে পড়ে। হাসে এক গাল৷ গোরুকে বলে ‘গোলু।’ ভোলু কুকুররে ‘ঘৌ’ বলে ডাকে৷ ক্যাডবেরি না পেয়ে ঝুলে পড়ে আঙুল ধরে। এক ঝুড়ি গল্প বলে ইস্কুলের।

-আমি লীনা আন্টিকে ভালোবাসি।

-আমি ভেরিগুড পেয়েছি, জানো?

-লীনা আন্টি লিপস্টিক পরে পার্পল৷ তুমি লিপস্টিক পরো?

-আমব্রেলাতে চারটে কালার করেছি। চারটে কালারওয়ালা আমব্রেলা কোথায় পাওয়া যায় গো?

- মাম্মা আমব্রেলা দেয় না৷ আমার রেইনকোট আছে৷ একটা আমব্রেলা দেবে?

‘ঈষত হাসিতে কত অমিয়া উথলে।
ধরম করম হরে আধ আধ বোলে।’

পিলুকে জামা ছাড়িয়ে দেয় বিজু। পিলুর ঘামে দুধ দুধ গন্ধ৷ পিলুর খালি খালি খিদে পায়।

-ও বিজু, খেতে দাও না!

মিতুল পিলুকে শিখিয়েছে ‘মামা’ বলতে। মিতুলের আড়ালে বিজু শেখায়, মামা না, ‘বিজু’ বলেই ডাকুক।

-খেতে দাও না বিজু!

-এই তো সুজি দিল রেবা মাসি।

-সুজি বাজে। ম্যাগি করে দাও।

রেবা মুখ ঝামটা দেয়। দু দুবার খাবার বানাতে পারবে না। বিজু গ্যাস ধরায়। বিজু আজ রাতে মাকে বলবে, ‘জানো মা, ও আমার হাতে ছাড়া খায় না।’

“রজনী প্রভাতে উঠি নন্দের গৃহিনী।
দধির মন্থন করে তুলিতে নবনী।।
নিদ্রাগত ছিল কৃষ্ণ শয়ন মন্দিরে।
নিদ্রাভঙ্গ হইল বৈসে পালঙ্ক উপরে।।
আমার হয়েছে ক্ষুধা শুন গো জননী।
স্তন কিম্বা দেহ মোরে খাইতে নবনী।।”

কেউ দেখতে পায় না, বিজুর বুকে দুধনদী বয়।

সেদিন পিলুর ইস্কুলে বে-টাইমে রিহার্সাল। কে নিয়ে যাবে? কে নিয়ে ফিরবে? মিতুলের চোখ ছলোছলো। বিজু মৃদু হাসে৷ সে আছে তো! মেকাপের শিডিউল ক্যান্সেল করে দেয়।

সে কে হয় বাচ্চার? অথরাইজেশন লেটার লেখা হল। কী লেখা তাতে, মামা না কাকা, বিজু দেখে না৷ ওর দেখতে ইচ্ছে করে না। সে ইস্কুলে পৌঁছয়। দেখে, আলহিয়া বিলাবল। ইমন৷ পিলু৷ মালহার। কত সুর! আহা, কত রঙ। হাত নাড়ে। পা দোলায়। কলকলায়। রিং আ রিং আ রোজেস খেলে। কি মায়া, মাগো! তোমারও ভাল লাগত, জানো? রাতে ফিরে তোমায় বলব মা। কি যে দুষ্টু এরা!

“গোপালে সাজাইতে নন্দরাণী না পারিল।
যতনে কানাই-এর চূড়া বলাই বান্ধিল।।
অঙ্গদ বলয়া হার শোভিয়াছে ভাল।
শ্রবণে কুণ্ডল দোলে গলে গুঞ্জাহার।।
পীত ধড়া আঁটিয়া পরায় কটিতটে।
বেত্র মুরলী হাতে শিঙ্গা দোলে পিঠে।।
ললাটে তিলক দিল শ্রীদাম আসিয়া।
নূপুর পরায় রাঙ্গা চরণ ধরিয়া।।”

বড়লোকদের বেশি হাঁ কাড়তে নেই। চোখ টিপে হাসে না তারা৷ কথা বলে কম। এ সবই বিজু জানে। কিন্তু বিজুর ভাবতে ইচ্ছে করে, ওরা মাপছে না তাকে, তাকে পিলুর আত্মজন ভাবছে।

স্কুলবাড়ি যেন সুদূর দ্বীপ। ধূ ধূ ঢেউ আড়াল করেছে বেনিয়াটোলা লেন, ভাড়াবাড়ি, হি হি হা হা। এখানে যেন বিজুকে সবাই গ্রহণ করেছে।

লীনা আন্টির সামনে দাঁড়ায় সে৷ অথরাইজেশন লেটার এগিয়ে দেয়। অদৃশ্য স্তনের আড়ালে তিরতির কাঁপছে তার বুক। লীনা আন্টি পার্পল হাসি হাসে। যেন সত্‌রঙ্গ দ্বীপের ভিসা পেয়ে গেল বিজু। পিলুর ছোট হাতটা তালুতে পেয়ে তার মনে হল, টিকিট কনফার্মড।

-ও বিজু, গো অ্যাজ ইউ লাইক কি গো?

-যেমন খুশি সাজো।

-যেমন খুশি?

-যেমন খুশি।

-আমি ডাকাত সাজব। ঢিচকাঁও।

-ধ্যাত, তুই মোটেও ডাকাত না। ননীচোর সাজবি? আমি সাজিয়ে দেব। কত বড় বড় লোককে মেকাপ দিলাম!

-না আ আ আ। আমি ডাকাত সাজব। আমার যেমন খুশি। তোমার যেমন খুশি, তুমিও সাজো।

বিজু হাসে।

৩.

শাকপাতা নিয়ে বাজার থেকে ফিরছিল বিজু। মিতুলকে দেখাল, থানকুনি কিনেছে পিলুর জন্য। ওর পেটটা গড়বড় করছে কদিন। তারপর লাজুক চোখে জিজ্ঞাসা করে,

-বাবুসোনার অনুষ্ঠানের দিন যাব?

-দুটোই মাত্র পাস পেয়েছি গো। আমাদের দুজনের নামে।

ঈর্ষা সবুজ। থানকুনি পাতাও তাই। থানকুনি মিতুলের হাতে থুয়ে বিজু ঘরে ঢোকে। দেখুক ওরা। বিজু তো দুদিন দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল! তাছাড়া, ইস্কুল থেকে ফিরে পিলু নাচখানা প্র‍্যাকটিস করে কার সামনে, শুনি? কে হাততালি না দিলে পা থেমে যায়? মিতুল জানে সেসব বেত্তান্ত?

আজ স্টেজ রিহার্সাল। খাদির পাঞ্জাবি ভেঙেছে বিজু। সাদা চুড়ি পা। উত্তরীয় নিয়েছে বাঁদিকে, দোপাট্টার মতো করে। অডিটোরিয়ামে নিয়ে যেতে হবে পিলুকে। কাল নাহয় মিতুলের দিন। আজ দিনটা তার।

সিঁড়ি ভাঙছে বিজু। দুয়ারে পিলুর ছোট দুটো চটি। এত ছোট যে, মন ভিজে যায়। ভিতরে কেউ গর্জন করছে৷ প্রত্যুত্তরে হিসহিস করছে অন্যজন।

-ছক্কাটার সঙ্গে ছেলের কিসের এত মাখামাখি? উঁ? মা হয়ে আস্কারা দিচ্ছ?

-ফোঁসফোঁস কোরো না। নিজের তো কোনো দায়দায়িত্ব নেই! বাপ হয়েছে! ও আছে বলে আমি পাঁচটার বদলে ছটাতেও ফিরতে পারছি।

-বড় হয়ে ওর মতো হয়ে যাবে, জানো না? ছিঃ! মুখ দেখাতে পারবে তখন?

-ছোঁয়াচে রোগ নাকি! ইডিয়ট। একটা ন্যানি জোগাড় করো দেখি বিকেল টাইমটার জন্য! হুঁঃ! বড় বড় কথা! খরচাও আছে।

-লেডিজটার হাতে ছেলে মানুষ হওয়ার চেয়ে তুমি বরং চাকরি ছেড়ে দাও! ওকে কী বলে জানো পাড়ায়? হিজড়ে!

মাথা ঝিমঝিম করে। উত্তরীয় খসে পড়ে। মুহূর্তটাক। ঝিমঝিম গুনগুন হতে যতক্ষণ লাগে।

“কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল
আকুল হৈল মম প্রাণ।”

দরজায় টোকা পড়ে। মিতুল চমকায়। চোখ নামিয়ে নেয়।

৪.

রাতে মায়ের মুখোমুখি হয় বিজন। ফাঁকা ঘরে। প্রতিদিনের মতো। তুমি যে জানতে, তা মুখে বলোনি কখনও। চোখে নির্ভুল আস্কারা ছিল। চোখ ছিল, ‘যেমন খুশি সাজো।’ ছিল, ‘আমি আছি।’ সাজব মা? যেমন খুশি? হাসছে মা। চোখ হাসছে।

মায়ের আসমানি নীল তাঁত বের করে বিজু। বিজুর খুব লোভ এ শাড়িটায়, জানত বেটি। মায়ের পেটিকোট। মায়ের ব্লাউজ। মায়ের সেলাই বাক্স খুলে সূচ। অল্টার খোলে ব্লাউজের। নিজের মাপযই করে। মা সূচ-ফোঁটা আঙুলে চুমো খায়৷ কাল ‘সাতরা জোড়া’ পরবে বিজুসোনা, বিজন বা বিজয়িনী। সাতরা জোড়া— মেয়েলি পোশাক।

অ্যানুয়াল কালচারাল সেরিমনির দিন অনাসৃষ্টি বৃষ্টি নামায় বেয়াদপ আকাশ। যেন সব ব্যথা আজই বলে ফেলবে, হালকা হবেই হবে। মিতুল হাঁচোড় পাঁচোড় করছে ছেলে কোলে। পৌঁছতে হবে ঠিক সময়ে। উবারের পথ চাইছে সন্দীপ। পিলু হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে ‘বিজুউউউ!’

জল-জমা পথে গোড়ালির উপর কাপড় তুলে হাঁটছে নীলাম্বরী। ‘নিঙারিয়া নীল শাড়ি’-তে যে মুড়কি, তার মতো চঞ্চল চলন। শিশুডাক রাধাকে সহসা যশোদা করে তোলে৷ বিজু ছপাৎ ছপাৎ এগিয়ে আসে। ছাতা মাথায় পাড়ার লোক থমকে দেখে৷ সনাতন বাবুর ছেলেটা না? বৌদি-টাইপ ছিল বটে! ইদানীং মাথা কি একেবারেই গেছে?

মিতুল প্রথমবার পিলুকে আড়াল করে বিজুর থেকে। পিছন ফিরে দাঁড়ায়৷ বিজু থেমে যায়। বুক টনটন৷ যেভাবে দোহনের অভাবে দুগ্ধবতীর বুক মোচড় দেয়।

মায়ের কাঁধের উপর দিয়ে পিলু দেখছে বিজুকে। আটকানো যাচ্ছে না। বলছে, ‘পার্পল লিপস্টিক। আই লাইক।’ বলছে, ‘যেমন খুশি সাজো।’

বিজু হাসে। পিলু হাসে। বিদুৎ রেখায় দাঁত বের করে হাসে মা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

9 মন্তব্যসমূহ

  1. দুর্দান্ত লাগলো গল্পটা। শ্রেষ্ঠ সময়ের স্বপ্নময় চক্রবর্তীর গল্পের মতো।

    উত্তরমুছুন
  2. ভীষণ ভালো গল্প আমি তো লেখার কথা ভাবতেই পারতাম না

    উত্তরমুছুন
  3. ইসসস।
    মরমে পশিল গো 👌👌

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভালো লাগল। সুন্দর ভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছো লেখাটা

    উত্তরমুছুন
  5. যন্ত্রণাবিদ্ধ আনন্দের মরমী প্রকাশ নাড়া দিয়ে গেল মনে।

    উত্তরমুছুন