গল্পের দুজন মানুষ গাড়িতে করে পাইন বনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে।
বহু দূরের শাল-গজারি বনে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, সে প্রায় তিন যুগ আগের কথা। সময়টা ছিল গ্রীষ্মের গরম হাওয়া আর বেসুমার ধুলা ওড়ানোর দিন। শাল-গজারির বসন্ত উৎসবে ভাটা পড়লেও বাতাসে তখনো ফুলের সুবাস জড়িয়ে ছিল। মৌমাছিরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল ফুলের মধু, সিগ্ধ তাজা ফুল। কিন্তু ফুলের রং ক্রমে হলুদ থেকে ফিকা বাদামি হয়ে বীজে রূপান্তরিত হচ্ছিল। সেই বীজ নিয়ে শুকনো পাপড়ির বাতাসে উড়াল আর লালমাটির টিলা থেকে টিলায় ছড়িয়ে পড়া, শ্যামলা রংয়ের দেশি মেয়েটি, যার নাম সাদিকা রহমান, সে ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ সাঁটিয়ে দেখছিল। অচিরেই সেই মনমাতানো দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। তখনো তার বিদেশি বন্ধুটি এসে পৌঁছায়নি। তার অস্তিত্বই অজানা ছিল সাদিকা রহমানের কাছে। সাদিকা তখন বনের ধারের টিন শেডের এনজিও অফিসের দুবেডের কামরায় ডেরা গেড়ে আছে। সে খাট্টা পায়খানায় যায়। আর টিউবওয়েলের পানিতে নাওয়া-খাওয়া করে। জনপদ থেকে ঔদাসিন্যের কারণে চরম বিচ্ছিন্ন, শুধু বনের সাথেই তার সংযোগ। যদিও এর আড়ালে কিছু ছায়ারূপী কায়া ছোবল মারার জন্য তৈরি হচ্ছিল। একদিন কাজ থেকে ফিরে ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জে দিয়ে সাদিকা যখন রুমে ঢোকে, তখন দেখে যে, কোনো আগাম সঙ্কেত না জানিয়েই তার রুমের দুসরা বেডে ঢাকা ডায়িংয়ের বেডকাভার মুড়ে সাদা তুলতুলে বিড়ালের মতো বিড়া পাকিয়ে একটি বিদেশি মেয়ে ঘুমাচ্ছে।
এ্যাগনেস সেই বিদেশি মেয়েটির নাম। সে এসেছে জার্মানির ডোনার এজেন্সি থেকে ফিল্ডের কাজ তদারকি করতে। কিন্তু এনজিওগুলি কতোটা মিথ্যাবাদী, হঠকারী, সেদিকে নজর না দিয়ে রোদ-তাতানো টিনের ছাদের তলায় বেঘোরে ঘুমায় সে। বৃষ্টি শুরু হলে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙে। মহানন্দে দুর্বোধ্য ভাষায় গুন গুন করে গ্রিলের বারান্দার খোপে খোপে উঁকি দেয়, ভিজা পিছলা মেঝেতে পা টিপে টিপে হাঁটে। টানা বৃষ্টিতে কাজ বন্ধ বলে সাদিকা তখন প্রহরে প্রহরে নিদ্রা যাচ্ছিল। টিমের ছেলেরা তাস পিটাচ্ছিল পাশের অফিসঘরে।
পাইনবনের পিচের রাস্তায় গাড়িটা বেপরোয়া পাঁক খায়। টলটলে পানির সরোবরে নামার জায়গা খোঁজে এ্যাগনেস। নলখাগড়ার ঝোপ-ঝাড়ের ফাঁক-ফোকরে গাছের গুঁড়ি বা তক্তার সিঁড়ির ঘাটগুলি বেলা না চড়তেই বেদখল হয়ে গেছে। গরমে ত্রাহি ত্রাহি। ট্রেনে-বাসে-কারে সওয়ার হয়ে শহর থেকে ছুটে আসছে মানুষ। বার্লিন শহরের উপকণ্ঠে সবুজ বনানীঘেরা প্রাকৃতিক লেকের ছড়াছড়ি। পড়ন্ত বেলায় ভিড় পাতলা হওয়ার আশায় দূরবর্তী একটি লেকের কাছাকাছি গাড়ি পার্ক করে এ্যাগনেস। ওরা গাড়ি থেকে নেমে বনের ভেতর ঢোকে। বন থেকে উপবন। উপবনের পেটে রূপকথার গল্পের মতো পেল্লায় প্রাসাদ, হিটলারের প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার গ্যোবেল্সের পোড়ো বাগানবাড়ি। ঢুকতে টিকেট লাগে না। গেটকিপারও গরহাজির। আঙিনায় পা দিয়ে সাদিকা অবাক বিগ লাই থিওরির উদগাতা তাহলে যুদ্ধ নিয়ে গাণ্ডেপিণ্ডে ডুবে থাকেন নাই! বার্লিনের অদূরে রংমহল সাজিয়ে বসেছিলেন! জুয়াখেলায় ফতুর এক ব্যারনের কাছ থেকে জমিটা খরিদ করে বার্লিন মিউনিসিপালিটি জন্মদিনে উপহার দেয় গ্যোবেল্সকে। গ্যোবেল্স এস্টেটের মাঝখানে তৈরি করেন (নিজের টাকায় নয়) ৩০টি শয়ন কক্ষ, ৪০টি স্টাডি রুম ও ১টি সিনেমাহলসমেত বিশাল প্রমোদখানা। স্ত্রী ও ৬ সন্তানের চোখে ধুলা দিয়ে কিংবা তাদের নাগপাশ ছিঁড়ে তিনি ছুটে আসতেন এখানে। প্রেক্ষাগৃহে বসে প্রোপাগান্ডা ফিল্ম দেখে দেখে প্রচারের ছাড়পত্র দিতেন। প্রেমিকারা আসতেন। নায়িকারা আসতেন। দরকারে রাজনৈতিক সভাও বসতো। সরোবর-সংলগ্ন এই আলিশানমহলে নাৎসি কোর্ট-জেস্টার কতদিন মৌজে কাটিয়েছিলেন কে জানে। প্রেমিকার ঘটনা বাড়াবাড়ি মনে হলে হিটলার মুলতবি ঘোষণা করেন। রংমহলে শিফট হন গ্যোবেল্সের স্ত্রী-সন্তান। সন্তানদের গাঁয়ের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। প্রোপাগান্ডা ফিল্মে দেখা যায় তারা চাষীদের এক্কাগাড়িতে করে স্কুলে যাতায়াত করত। ‘আর এই লেকের পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করত,’ আঙুলে পানি ছিটিয়ে বলে এ্যাগনেস। তারপর দু হাতে পানি কেটে লম্বা সাঁতার দেয় সে। পরবর্তী সাঁতারের মওসুম আসার আগেই গ্যোবেল্সের সন্তানেরা শহরে ফিরে যায়। বার্লিন পতন তখন অত্যাসন্ন। গ্যোবেল্স-দম্পত্তি আত্মহত্যা করার আগে সায়ানাইট ক্যাপসুল বা মরফিন ইনজেকশন দিয়ে মৃত্যুর কোলে পাঠিয়ে দেন নিজের ৬ সন্তানকে।
সাদিকা তখনো ডাঙায়। সে বিকিনি পরবে না বলে গোঁ ধরেছে। কিছু দিন আগেও ইউরোপে বিকিনি ভিন্ন অন্য পোশাকে সাঁতরানোর কথা ভাবা যেতো না। হালে বুরকিনি এসে বিকিনির একাধিপত্য নষ্ট করে দিয়েছে। সে টাইটস আর টি-শার্টে শরীর ঢুকিয়ে হ্রদের ঠাণ্ডা পানিতে ঝাঁপ দেয়। নরম কাদার ভুরভুরি ওঠে দু পায়ের তলদেশে। সাদিকা যখন ডুবসাঁতারে আড়াআড়ি লেক পাড়ি দেওয়ার পাঁয়তারা করছে, তখন পেছনের নলখাগড়ার ঝাড়ে সূর্যরশ্মি জলতরঙ্গের সুরত ধরে হেসে-খেলে বেড়াচ্ছে। এ্যাগনেস লেকের অপর পাড়ের কাছাকাছি, পানিতে নতজানু গাছের ডালপালা পাকড়ে বানরের মতো ঝুলে আছে সে।
ঠাণ্ডায় পায়ে ক্র্যাম্প ধরার উপক্রম হলে সাদিকা রহমান লেকের অপর পারের ঝুলন্ত প্লাটফর্মে উঠে বসে। তার গা বেয়ে দরদরিয়ে পানি ঝরছে। পোশাক বদলাতে হলে ফের সাঁতরে ওপারে যেতে হবে, যেখানে রঙিন শতরঞ্জি পেতে এ্যাগনেস প্রায় দিগম্বর অবস্থায় রোদ পোহাচ্ছে। ভেজা কাপড়ের যাতনা ভুলতে সাদিকা মনটাকে অন্যত্র সরাতে আপ্রাণ কোশিশ করে। ‘বড়শি বাওয়ার কি দারুণ জায়গা!’ সশব্দে জিভে টাক্কা মেরে বলে সে। ‘পাতা ঝরার শব্দ-বিনা পুরাই নিঝুম।’ কথাটা মনে মনে বলে ছোটবেলার জনাকীর্ণ পুকুরে বড়শি বাওয়া ইয়াদ করে। চড়া রোদে শরীরে উম উম ভাব এলে ফুর্তিতে মৌমাছির মতো গান গায় গুনগুনিয়ে। তারপর পেছন ফিরেই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। কখন থেকে এক হাড় জিরজিরে মহিলা পানিতে বড়শি ফেলে ফাতনার দিকে অপলক চেয়ে আছে! গাছের ছায়া-পড়া ঘন সবুজ জলতরঙ্গে ঝরে পড়ছে তার সকরুণ মিনতি ‘জলে ঢেউ দিও না, সখী/ আমি কালরূপ নিরখি।’ কি আশ্চর্য্য, নিঃশব্দ জায়গাটার এমন জাদুও আছে! পানি থেকে ঝুলন্ত পা জোড়া প্লাটফর্মে টেনে তুলতে তুলতে ভাবে সাদিকা রহমান। নিবিড় শূন্যতায় ছোটবেলার গান-কবিতা, বড়শিতে মাছ ধরা, পুরোনো সিনেমার দৃশ্যসহ স্মৃতির কাফেলা ভিড় জমাচ্ছে তার বিগত কদিনের ফাঁকা করোটিতে।
।।২।।
পাইন বনের মধ্যে যে গাড়ি-চলা পথ, এটি সেই সময়েরই মতো। শুধু ট্যাংকের বহর নেই। আর মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে যুদ্ধবিমানও নেই। লেক থেকে ফেরার সময় এ্যাগনেসের পাশের সিটে বসে ভাবে সাদিকা রহমান। তার চোখে ভাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়াছবি, যার বেশিরভাগই তখনকার সোভিয়েতের দ্য ফল অফ বার্লিন, দ্য ব্যাটল ফর বার্লিন, অন দ্য রোড টু বার্লিন ইত্যাদি। এ্যাগনস কি এ মুভিগুলি দেখেছে? নিজেকে তো শাল-গজারি বনে বামপন্থী পরিচয় দিয়েছিল সে।
বৃষ্টি থামলে পর সাদিকার সঙ্গে শালবনের শুটিংয়ে যায় এ্যাগনেস। বনের লতাপাতায় তখনো টলমলে বৃষ্টির ফোঁটা। কিছু জায়গায় লাল কাদামাটি, পানি-ভরা খানা-খন্দ। ক্যামেরা আর আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিসহ তাদের সাবধানে চলাফেরা করতে হচ্ছিল। এ্যাগনাস কেমন উদাস উদাস। নতুন দেশ, নতুন বনানী হঠাৎ হঠাৎ তার কৌতূহল উসকে দিলেও যেন দমকা হাওয়ায় বারবার নিভে যায়। বনে তখন ঝিরি ঝিরি বাতাস বইছে। সাদিকা টিম নিয়ে শুটিংয়ে ব্যস্ত। তখন আর আকাশ থেকে উল্কাপাতের মতো শাল-গজারি ফুলের শুকনো পাপড়ি পক্ষপুটে বীজ নিয়ে উড়ে উড়ে ভূতলে পড়ছে না। সেই সময়টা যদিও আনন্দময় আর ঝঞ্ঝাটহীন ছিল, কিন্তু যে কাজে আসা বৃষ্টির পর সাদিকার ক্যামেরা ঘুরে যায় উজাড় করা বন, কাটা গাছের গুঁড়ি, ক্যাঁচকেঁচিয়ে চলা কাঠবোঝাই গরুগাড়ির দিকে। আর তখনই বাঁধে লোকাল এলিটের সঙ্গে গÐগোল। তার আগে টিমের এক ছোকরার কাছে জীবনের প্রথম বাংলা বাক্য ‘মনের ভিতর বনের বাতাস বয়’ হেফজ করে নিয়েছে এ্যাগনেস। আর লালমরিচে কষা মুরগির মাংস, মাছের গড়গড়া নাকের পানি চোখের পানি একাকার করে অল্প-অল্প খেতে শিখেছে। বছর না গড়াতেই সেসব খাবারের পুরাদস্তুর সমঝদার বনে যায় সে। বলে ওর মায়ের ইন্ডিয়ান খাবার খুব পছন্দ। বিশেষত পাঞ্জাবি। ‘কিন্তু আমার পছন্দ বাংলা,’ টিম মেম্বারদের খুশি করতেই সম্ভবত শেষ বাক্যটি বাংলায় বলে সে। যেন মাসুম বাচ্চার মুখে আধো মিঠা বোল ফুটেছে, তুমুল করতালি আর ঠা ঠা হাসিতে স্বাগত জানায় সবাই। এই ফাঁকে ‘তোমার মা কোথায় পাঞ্জাবি খাবার খেতে শিখলেন,’ একজনের এই নাছোড় প্রশ্নটি বিন্দুমাত্র রেশ না রেখেই হট্টগোলে হারিয়ে যায়।
তিন যুগ আগের সেই খাবারের স্বাদ-ঘ্রাণ সাদিকার হাত ধরে যেন ফিরে এসেছে। এ্যাগনেস গ্রোসারি শপ ঘুরে ঘুরে গরম মশলা, আনাজ, বাসমতি চাল, ফ্রোজেন মাংস ইত্যাদি কিনে আনে। লেকে, বনবাদাড়ে ঘুরপাক খেয়ে ক্লান্ত হয়ে বেলাবেলি রাঁধতে বসে দুজন। মশলাদার খাবার পাকানোয় অপটুতার দোহাই পেড়ে সাদিকার রান্নায় জোগালি দেয় এ্যাগনেস। ঝোলে-ঝালে দু-তিন পদ রান্না হয় রোজ। বাসী খাবারও ফেলা হয় না। নিজেরা ওভেনে গরম করে দুবেলা টেবিল সাজায়। ওপরতলার অ্যানিমেল-লাভার দম্পত্তি, কখনো বেকার যুবক বা শিল্পী পড়শিকে দুহাতে বিলায়। লাঞ্চে-ডিনারেও দু-চারজনের পাত পড়ে। একদিন এক বলকান ইহুদি পরিবার আসে লাঞ্চে। তাদের কিশোরী মেয়েটি সেদ্ধ কাঁচালঙ্কায় কামড় বসিয়ে হা করে থাকে। মেয়েটির মা টিস্যুতে লালা মুছে কুলাতে না পেরে বেসিনে তার মাথা চেপে ধরে পানির কল ছেড়ে দেন। ঝালে তার নিজেরও চান্দি গরম হয়ে গেছে। মেয়েটির বাবা দূরদর্শী, শুরু থেকেই অপরিচিত ডিশে সন্দিহান ছিলেন। টেবিলে বসা অব্দি সাদা ওয়াইন সহযোগে মিষ্টি কুমড়ার ঘ্যাঁট খাচ্ছিলেন। এসব দেখে-শুনে রাঁধুনি আর হোস্টের দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। ডেজার্টে তা পুষিয়ে দিতে ফ্রিজে তোলা সব মিষ্টিখাবার তারা ঝেটিয়ে নামিয়ে আনে।
বেলা পড়লে মুখে ঝা ঝা ঝাল নিয়ে সবাই যায় রোজা লুক্সেমবুর্গ মেমোরিয়াল দেখতে। বার্লিনের লান্ডভ্যার খালের ধারে রোজার নাম লেখা সাদাসিধে একটি স্মৃতিফলক। ১৫ জানুয়ারি ১৯১৯, ডানপন্থী মিলিশিয়া বাহিনী তাঁর মাথায় গুলি করে সেই খালে ফেলে দেয়। মে মাসের আগে ডেডবডি উদ্ধার হয়নি। বলকান পরিবারটি স্মৃতিফলকের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে। ছবিটা ফরমায়েসি। দেশে ফিরে কম্যুনিস্ট যুগের মুরুব্বিদের দেখাতে হবে। বা এমন সব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের, হালে ধর্মে যাদের মতি ফিরেছে এবং রোজা লুক্সেমবুর্গ এখন যাদের কাছে শুধুই একজন ভিকটিম ইহুদি।
গ্রীষ্মের লম্বা দিন। এর পরের গন্তব্য ক্লারা জেটকিন মিউজিয়াম। এ্যাগনেস যথারীতি গাড়ি চালাচ্ছে। সাদিকা তার পাশের সিটে। গাড়িটা বনের পথে নেমেই তুমুল বেগে ছুটতে থাকে। ততোধিক জোরে লম্বা লম্বা পা ফেলে উল্টো দিকে দৌড়ায় পাইন ও বার্চের সারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবি রিওয়াইন্ড-ফরোয়ার্ড করলে কামানগুলি যেমন শুঙ্গ উচিয়ে শাঁই করে শহরে ঢোকে বা বেরিয়ে যায়, তেমন একটি বিভ্রান্তকর দৃশ্য।
ক্লারা জেটকিন মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে গেছে। গেটে পেল্লায় তালা। মিউজিয়ামের কোর্টইয়ার্ডে ক্লারা-রোজার স্ট্যাচু এমন ভঙ্গিতে দাঁড় করানো যেন তারা পুলিশের চোখে ধুলা দিয়ে বৃক্ষের আড়ালে পার্টির গোপন দলিল চালাচালি করছেন। পড়ন্ত বেলার তেরছা সোনালী রোদে ঝলমল করছে দুটি পাষাণ-প্রতিমা। কিশোরী মেয়েটির বাবা ক্যামেরা হাতে বাড়ির দেয়ালের বাইরে বারকয় পাঁক খান। স্ট্যাচুর সামনে পোজ দিয়ে ছবি তোলা অসম্ভব বিধায় শেষমেশ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে শরীর বেঁকে-চুরে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ক্লিক করেন তিনি। কিন্তু তাতে তার মন ভরে না। পরদিন সকাল সকাল আসতে হবে নিজেরা শল্লা করে জানান এ্যাগনেসকে। এ্যাগনেস ফের লাঞ্চের দাওয়াত করলে গোটা পরিবার সভয়ে আঁতকে ওঠে। সজারুর কাঁটার মতো শরীরের লোমকুপ নিমেষে দাঁড়িয়ে যায়।
ঝালটা বুঝি নিজের জিহ্বায় লেগেছে, রাতে এক থালা পটেটো ম্যাশড নিয়ে এ্যাগনেস ডিনারে বসে। সাদিকা প্রমাদ গোনে নিজের ঘরের বাইরে অভিন্ন যে গার্হস্থ্য জীবন, তাতে কি যবনিকা পড়ল? বাকি কদিন এ খাবারই চালিয়ে যেতে হবে? এ্যাগনেস হয়তো হাজব্যান্ডকে মিস করছে, যে রোজকার ডিনারে কন্টিনেন্টাল খাবার পাকাতো। এক রান্না করা ছাড়া আর সব কাজেই পটু এ্যাগনেস। তাই হয়তো গত কদিন ব্যাপক আয়োজন করে সাদিকাকে পটিয়ে-পাটিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি মশলাদার খাবার বানিয়ে বেলায় বেলায় নিজেরা খেয়েছে, লোকদের বিলিয়েছে।
যত দোষ নন্দ ঘোষ। সাদিকা আচমকা আঙুল তোলে এ্যাগনেসের স্বামীর দিকে। প্লেটের পিরামিডাকৃতির আলুর ঢেলা চামচের গুঁতোয় ভাঙতে ভাঙতে বলে, ‘আমি এখানে আসলাম আর উনি ভেগে গেলেন! ব্যাপার কি এ্যাগনেস?’ এ্যাগনেস প্রায় অদৃশ্য একটা হাসি দিয়ে আলু খেতে থাকে, মুখে বলে না কিছু। যেন স্বামী লোকটা যে কোটের বোতাম-ঘরে গোলাপ হয়ে ফুটে রয়েছে এই যথেষ্ট। সত্যি বলতে এখন পার্টনার, প্রেমিক, প্রেম, সম্পর্ক-বিচ্ছেদ এসব ব্যাপারে একদম খামোশ ওরা। যেন এ শব্দগুলি তাদের অভিধান থেকে মুছে গেছে। অথচ একদিন দুজনের আলাপ-সালাপ এসব বিষয় ছাড়া জমতোই না। দুনিয়া গোল্লায় যাক। তুমি আছো আমি আছি দুজন নর-নারী। এরকম জোড়-বাঁধাই যথেষ্ট বা জোড় ভেঙে যাওয়াটাই ছিল বুকে শেল পড়ার শামিল।
।।৩।।
শালবনের টিনসেডের ডেরায়, সাদিকা অপরিচয়ের আড়ালে রাত জেগে তার জটিল সম্পর্কের জট ছাড়াতো। তাতে খানিকটা উপকারই হয়েছিল। কাটিম থেকে সুতো ছাড়তে ছাড়তে সম্পর্কের সারশূন্যতা একসময় কংকালের মতো বেরিয়ে পড়ে। এ্যাগনেস দেশান্তরী হয়েছিল প্রেমে নিদারুণ ছ্যাঁক খেয়ে। একসঙ্গে ফিল্ড ভিজিট করতে করতে তাদের মুখের অর্গল খুলে যায়। একই রুম শেয়ার করত দুজন। রাতে টর্চ জ্বেলে একজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত, আরেকজন যখন বদনি হাতে চষাখেতে লম্বা-ভুতুড়ে ছায়া ফেলে স্যানেটারি ল্যাট্রিনে যেত।
বছর দুই পর এ্যাগনেসের চলে যাওয়াটা আ-বোজা অন্ধকার গর্তের মতো শূন্যতা তৈরি করে। বেশ সময় লাগে তা ভরাট হতে। চিঠির আদান-প্রদান চলে কিছু দিন। লেখায় নতুন কিছু আর থাকছিল না। অতীতের দৈনন্দিনতার ফলোআপ শুধু। সেটিও কখন থেমে যায়, সাদিকা মনে করতে পারে না। বহু বছর পর ফেসবুকে এ্যাগনেসের ওই বয়সের প্রোফাইল ছবি ভেসে উঠতে সঙ্গে সঙ্গে মেসেঞ্জারে লিখে সে। তৎক্ষণাৎ জবাব চলে আসে। তারপর ‘এখন আমি’ বলে যে গুচ্ছের ছবি আসে ইমেইলে, সেসব দেখে চমকে ওঠে সাদিকা। এখন আমিও কি যৌবন খোয়ানো হতশ্রী মহিলা একজন! সবচেয়ে ধাক্কা লাগে যখন দেখে সময়ে পরিবর্তিত হতে হতে ওরা আলাদা মানুষ হয়ে গেছে। এ্যাগনেসের মধ্যে এমন কিছুই অবশিষ্ট নেই, যা ওর পূর্ব-পরিচিত। সেই শুভ্র-গোলাপী মুখমÐল ঘিরে পিঠ ছাপানো ঘন রেশম কালো চুল, তা ছবিতে ধূসর বা সাদার কাছাকাছি। ‘তোমার কালো চুলের রহস্য কী’ তখন জানতে চাইলে এ্যাগনেস এড়িয়ে যেত। কখনো ইঙ্গিত করত সাদিকার চোখের দিকে। সে যে বিড়ালাক্ষী, জানে সে। অন্ধকারে তার চোখ জ্বলতে দেখলে বাসর রাতে বর পালাবে শুনে শুনে বড় হয়েছে। তাই আর কথা বাড়াত না। এখন সেই চোখও প্রভাহীন, অচঞ্চল।
‘একটা বয়সে মেয়েরা মায়ের মতো হয়ে যায়। যেমন আমি হইছি।’ প্লেট থেকে চামচের আগায় খাবার তুলে চাটতে চাটতে বলে এ্যাগনেস। তারা তখন উঠানের গাছতলায় পরিপাটি সাজানো খাবারটেবিলে। মোম জ্বেলে ডিনার সার্ভ করা হয়েছে। ইঙ্গ-বঙ্গ ডিনার। সূর্য তখনো আলো আর উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
‘তা চেহারায় না চিন্তায়?’ সাদিকা জানতে চায়।
‘চিন্তায়। মা যেমন যুদ্ধ নিয়ে অবসেসড ছিলেন, এখন আমার অবস্থাও ঠিক তাই।’
তা হবে হয়তো। এখানে আসার পরদিনই এ্যাগনেস ওকে জাখজেনহাউজেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প দেখাতে চাইলে সাদিকা আপত্তি জানায়। তখন এ্যাগনেস বলে, ‘তুমি বার্লিন আসছো, হিটলার, হলোকাস্ট নিয়ে ভাববে না তা হবে না।’
এয়ারটাইট ঘরে বিষাক্ত কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস ছেড়ে হিটলারের ইহুদি নিধন! এসব জায়গা দান্তের এনফার্নো বা হাবিয়া দোজগ বৈকি। সাদিকার বিবমিষা জাগে। মুখে বলে সে কি হিটলারপক্ষের লোক না স্কিনহেড নিও-নাৎসি যে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প-ট্যাম্প দেখিয়ে ওর মাথাটা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিতে হবে!
তবে কেন যেন সেই সময়টা সাদিকাকে চোরাস্রোতের মতো অলক্ষে টানে। ওর ভাবনায় ছুটে ছুটে আসে যুদ্ধের কিছু পুরোনো ছবির দৃশ্য। গত কদিন পাইনগাছগুলিও বিগত সেই যুদ্ধের কথা ফিসফিসিয়ে শুনিয়ে যাচ্ছিল।
এ্যাগনেস প্লেট-বাটি নিয়ে টেবিল থেকে উঠে গেলে সাদিকা চেয়ারে বসে গাছের পাতা ঝরা দেখে। সন্ধ্যার গাঢ় নীল আকাশপথে পাখিদের ঘরে ফেরা দেখে। অন্ধকারের সঙ্গে এক ঝাঁক মশাও ওকে ছেঁকে ধরেছে। এ মশা কামড়ালে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া হয় না বলে ও বিশেষ পাত্তা দেয় না। এ্যাগনেস মশার কয়েল নিয়ে ফিরে আসে। ও কি এখন ওর মায়ের সঙ্গে যুদ্ধের দোস্তির সম্পর্কের কথা বলবে? সাদিকা নিজের চেয়ারে নড়ে-চড়ে বসে। কিন্তু এ্যাগনেস প্রথম টেবিলক্লথ তোলে, তারপর চেয়ারের কাভারও খুলতে শুরু করে। অনেক দিন ধোয়া হয় না। এখন এসব ওয়াশিং মেশিনে ঢালবে সে। ভেজা ঘাসের লনে সাদিকা খালি পায়ে হাঁটে খানিক। কানে আসে সান্ধ্য ট্রেন চলে যাওয়ার ঝমঝম আওয়াজ। রেললাইনের পাশ ধরে দেয়াল তোলা সত্তে¡ও লোকালয়ে শব্দ আসে। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সাদিকার মনে হয় পাইন বনের ভেতর দিয়ে সৈন্যবোঝাই ট্রেনটা সর্পিল গতিতে এগিয়ে আসছে।
।।৪।।
এ্যাগনেসের বাড়িটা সত্যিকারে আট কুঠুরি নয় দরজার। যে প্রকোষ্ঠে সাদিকার থাকার ব্যবস্থা, সেটা ঘরের চাল-সংলগ্ন চিলেকোঠা। রুমে সোজা হয়ে দাঁড়ালে ছাদের টালিতে মাথা ঠোকে। একমাত্র জানালাটাও ওখানে। এর কাচের শাটার সরিয়ে দিতে আস্ত একটা গোল চাঁদ হুড়মুড়িয়ে ঢোকে প্রকোষ্ঠে। সে বিছানায় শুয়ে নাক বরাবর চাঁদের দিকে অপলক তাকায়। চোখে ঘুম নেই, নাকি চাঁদের সঙ্গের মিতালিতে ঘুম পালিয়ে গেছে? হামা দিয়ে চাঁদটা পশ্চিমে সরে যেতে সাদিকা বিছানা থেকে নেমে আসে। কাঠের মেঝেতে পা টিপে টিপে পাশের রুমে যায়, যা করোনাকালে এ্যাগনেসের অফিস ছিল। অফিসরুমের কোণায় তার ল্যাপটপখানা এখনো ব্যাগ-বন্দী পড়ে আছে। গত পাঁচ দিনে ব্যাগের জিপারও খোলা হয়নি। সাদিকা তালুসমান ডিজিটাল ক্যামেরা থেকে গত পাঁচ দিনের সঞ্চয় কাঁড়ি কাঁড়ি ছবি ল্যাপটপে চালান করে। বেশিরভাগ ফটোই নৈসর্গিক সরোবর, জঙ্গল, কাদা, নলখাগড়ার... এ নিয়ে অবশ্য আপসোস করার কিছু নেই। সে দেশে থাকতেই প্ল্যান করেছে এবার টিপিকাল ট্যুরিস্টের মতো নানা জিনিসে ঠোকর দিয়ে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে ছুটবে না। প্রথম দর্শনে দারুণ বৈচিত্রময় আর মোহনীয় মনে হলেও এসব আসলে বিভ্রম বা ছলনা। সে বরং সুস্থির আর শান্তিময় সময় কাটাবে বিদেশে। এ্যাগনেসের বাড়ি গ্যাঁট হয়ে বসে স্মৃতির জাবর কাটবে। বা আগের মতো দুজনে ব্যক্তিগত সমস্যা শেয়ার করবে।
এমনটা হলে কী বলত তখন? মাঝরাতে ল্যাপটপের ভূতুড়ে আলো ছড়ানো কামরায় বসে ভাবে সাদিকা রহমান। তার পার্টনারের নন-কিউরেবল ডিজিজ? এ্যাগনেসের স্বামীর ঘন ঘন আগের তরফের মেয়ের কাছে ছুটে যাওয়া? যেখানে নাতিনাতনির বেবিসিটার হয়ে অশেষ আনন্দলাভ করেন তিনি? এসব নিয়ে জমাটি আড্ডা হয় না। দু-চার কথায়ই ফুরিয়ে যায়। ‘নটে গাছটি মুড়োলো’ তো গল্প খতম। তারপর হা-হুতাশ। এমন দেউলিয়াত্ব যখন ছিল না, মাঝখানের রঙিন দিনগুলিতে তাদের তো দেখাই হলো না। দেখা হওয়ার চেষ্টাও অবশ্য করেনি কেউ। এবার কী মনে করে সাদিকা হুট করে চলে এলো এখানে?
হুট করে কোথায়? মাঝরাতে নিজের সঙ্গে বাহাসে মাতে সাদিকা রহমান। ভিসার জন্য কত রকমের বায়নাক্কা, ঝকমারি! হোস্টের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ইমেল চালাচালি। হোস্ট? সে এক জোড়া লাগা সেতুর কাহিনি। এ্যাগনেসের সঙ্গে চাকরিজীবনের শুরুতে সাক্ষাৎ, পরিচয়। মাঝখানের বিরতিকাল এত দীর্ঘ যে, তাদের অবসর গ্রহণেরও সময় চলে এসেছে। ফেসবুকে ছবির আদান-প্রদান না হলে একে অপরের চেহারাই চিনতো না। বাঁচা গেছে তা হয়নি! লাগেজ ঠেলে বিমানবন্দরের বাইরে এসে এ্যাগনেসকে তার আগের মতোই পরিচিত আর আন্তরিক লেগেছে।
কিন্তু তাদের আলাপের বিষয় সম্পূর্ণই পাল্টে গেছে। আগের সেই ব্যক্তিগত সুখদুখ হটিয়ে দখল নিয়েছে দুনিয়াজুড়ে চলমান যুদ্ধ, যুদ্ধবন্দী, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি। হঠাৎ হঠাৎ সাদিকার মনে প্রশ্ন জাগে তাদের এমনটা হচ্ছে যৌবনের মায়াবী বিষয়-আশয় লোপাট হয়ে গেছে বলে?
সাদিকা কম্পিউটার বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। নিচু ছাদের নিচে শরীর বেঁকিয়ে প্রকোষ্ঠে ঢুকতে ঢুকতে তার চিন্তার বাঁকও ঘুরে যায়। বালিশে মাথা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে ট্যুরিস্টরা যেখানে যায়, কাল সে খোদ বার্লিন শহরের হৎপিণ্ডে ঢুকবে প্রামাণিক কিছু স্প্যাপশট নিতে। রাস্তার পাশ থেকে কিছু স্যুভেনিরও কিনবে। ভাগ্য ভালো থাকলে পেয়ে যেতে পারে পোর্সেলিনের টি-পট বা ফুলদানি, যা পুরোনো ও ব্যবহৃত বলে দামে সস্তা। ‘চলো চলো টুরিস্টের পথে, পায়ের তলায় সরষে বেঁধে।’ নিজেকে তাড়া দেয় সে।
পরদিন এ্যাগনেসের প্ল্যানমাফিক তাদের সঙ্গে বিশ্বযুদ্ধটাও পাইন বন থেকে শহুরমুখী হয়। টিকিট কেটে ওয়ার মিউজিয়ামে ঢোকে। স্মৃতিস্তম্ভের কংক্রিটের স্ল্যাবের গোলকধাঁধায় বারবার পথ হারায়। টিয়ারগার্টেনের স্মৃতিফলকের পর্দায় চোখ লাগিয়ে সমকামী যুগলের চুমাচুমি দেখে। পাঁচ লক্ষ নিহত সিন্টি ও রোমার স্মরণে তৈরি সরোবর ও পার্কে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জিপসিসঙ্গীত শোনে। বিশ্বযুদ্ধ তাদের সঙ্গী হয়ে পুরোটা সময় প্রাক্তন বার্লিন ওয়ালের চকচকে পাথরকুচির ভিত বরাবর চলাচল করে। কখনো এ পাশে আসে, কখনো যায় ওপাশে, যেন অদৃশ্য প্রহরীর চোখ বাঁচিয়ে না-থাকা-পাঁচিল ডিঙাচ্ছে দুজনে। তারপর ট্রেনে চেপে বাসায় ফেরে যখন, তখন লেকে সাঁতরাতে যাওয়ার সময় বিগত। রেললাইনের ধারের পাইন বনে আঁধার নামছে। বাড়ির দরজায়, আঙিনায় একাশিয়া গাছের দীঘল ছায়া। বাসার সামনের রাস্তায় ঘনায়মান আঁধারে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে এক নয়া অতিথি, যার কোঁচড়-ভর্তি বিশ্বযুদ্ধের শেষপর্বের এপিসোড যুদ্ধবন্দী। এ্যাগনেস কি ওকে যুদ্ধবন্দীর কাহিনি শোনাতে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে? নাকি গোটা ব্যাপারটাই কাকতাল? অথবা এমন হতে পারে যে, মানুষ যা জানবে বলে ঠিক করে, সেসব কিছুই নানা ছল-ছুতোয় তার কাছে প্রকাশ পায়। শেষেরটাই মনে হয় সত্যি।
সাদিকা তখনো অন্ধকারে। খুব ক্লান্ত থাকায় হাতের ব্যাগ মেঝেতে নামিয়ে লম্বা হয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে। তার চোখে ভাসে সাপের মতো মোচড়াতে মোচড়াতে পাইন বনে ঢুকছে সৈনা বোঝাই অনিঃশেষ ট্রেন। তা টাসকি খেয়ে দেখছে ঘোড়া জুতে জমিতে লাঙ্গল চালানো এক চাষাভুষা মানুষ। দৃশ্যটা কোন মুভির? রাশান কুঁড়েঘরের পাশ দিয়ে জার্মান ট্যাংকের বহর যাচ্ছে। অন্যত্র দেখা যাচ্ছে শীত তাড়াতে জার্মান সৈন্যরা ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করছে, বরফের ওপর লাফাচ্ছে এমন এক ওয়ারফ্রন্টে, যেখান থেকে মস্কোর গির্জার পেয়াজাকৃতির বর্ণিল চূড়া দেখা যায়। ডিসেম্বরের ৫ তারিখ মাইনাস ২৫ ডিগ্রি। ফ্রোজেন ফিট, নাক-কাল-গলা... মস্কোর উপকণ্ঠে, তাদের তখন নেপোলিয়নের পর্যুদস্ত বাহিনীর কথা মনে পড়ে। এগুলোই-বা কোন ছবির সংলাপ বা দৃশ্য? এভাবে সাদিকা যখন নাম ভুলে যাওয়া সিনেমার দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে ছুটছে, তখন তার কয়েক গজ দূরে ডিনার টেবিল সাজাচ্ছে এ্যাগনেস। এ্যাগনেসকে সাহায্য করছে জেনিফার ওরফে জেনি, যার দাদু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওয়ার প্রিজনার ছিলেন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায়।
।।৫।।
জেনিফারের দাদু নাৎসিবাহিনীর রসদ সাপ্লাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পুবে আছে মাইলের পর মাইল উর্বর ভূমি... এমন লোভনীয় টোপ তাকে টেনে নিয়ে যায় তখনকার সোভিয়েত রাশিয়ায়। মৃত্যু সাইবেরিয়ার কারাগারে।
খ্রিসমাসে সোভিয়েত জয় করে ফিরবেন বলে দিদাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল দাদু। কথাটা বলতে গিয়ে খাবার মুখে হেসে ফেলল জেনি। শ্রোতারাও হাসল। পুরোটাই হাস্যকর। ফুয়েরারের সিঁথিপাটি, বাটারফ্লাই গোঁফ, ডান হাত সামনে বাড়িয়ে স্কন্ধাবধি তোলা হাইল স্যালুট। এসব নিয়ে সবাই রগড় করলো কিছুক্ষণ। তারপর দাদুর কথায় ফিরে গেল জেনিফার। তখন পুবের উর্বর ভূমির জমিদার হওয়ার স্বপ্ন বোধ হয় আর ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে রকেট লাঞ্চার কাতিউশা বারবার স্ট্যালিনগ্রাদ থেকে তাদের পিঠটানের পথ আটকে দিচ্ছিল। বলশেভিকরা গোঁয়ারের মতো যুদ্ধ করছিল। রাতদিনের ফারাক নেই। দাদুদের মনে তখন একটাই চিন্তা, কখন রাশিয়া গোলাগুলি থামাবে আর তারা ঘুমাতে পারবেন। শেষ চিঠিতে লেখা ছিল গ্যারিসনের ঘোড়া সব খাওয়া হয়ে গেছে। শেষমেশ একটা বিড়াল ধরে খেয়েছেন। তারপর বেখবর। ১৯৫৫ নাগাদ সোভিয়েত থেকে ঝেড়ে মুছে কয়েদিরা ফিরে আসে। যারা বেঁচেছিল আরকি। কিন্তু সর্বশেষ ব্যাচে জাঁহাবাজ পাইলট এরিশ বুবি হার্টমানও যখন ফেরে, তখনো দাদু বেখবর। তার মানে আশা নেই। কিন্তু তখন কিছু করার ছিল না। জেনিফারের মা ও দিদাকে অপেক্ষা করতে হয় গøাসনস্ত, পেরেস্ত্রইকা পর্যন্ত। সব গোপন নথি প্রকাশ্য হওয়ার পর জেনির দাদুর নাম পাওয়া যায় সাইবেরিয়ার ক্যাম্পের মৃতদের তালিকায়।
জেনি দ্রুত কথা বলে। আর কথার মাঝখানে হাসে। কথাটা হাসির হোক চাই না-হোক।
জেনিফারের দাদুরা ধরা পড়ার পর সোভিয়েত কিচেনে কাঠ চোলাই করতেন। তার জন্য প্রতিদিনের খাবার ছিল পাতলা স্যুপ ১ লিটার, ৩০০ গ্রাম ব্রেড, কাঠচোলাইয়ের দিন ডিনারে থাকত এক মগ গরম চা। এসবই জীবিত বন্দীদের কাছে শোনা জেনিফারের মায়ের মুখের জবান। কখনো কখনো তিনি কল্পনা করতেন বরফ কেটে রেললাইন পাতছে তার বাবা। ইট ওয়াজ বাইটিং কোল্ড। নীলচে-সাদা বরফের সমুদ্রের ওপর দিয়ে একটা কালো ট্রেন বাঁক নিচ্ছে। তিমিমাছের মতো ট্রেনের মাথা দিয়ে উড়ছে সাদা সাদা ধোঁয়া, ছুটন্ত ধোঁয়ার মেঘ। তারপর দেখতেন এক সারি ক্রস বুকসমান বরফে ডুবে আছে।
কবরের জন্য কতটুকু মাটি লাগে? প্রশ্ন জেনির দিদার। তার স্বামী পালানোর পেছনের দরজাটা খোলা না রেখেই, তিন-সিটের মোটরবাইকে চড়ে এগিয়ে গেছেন, রাশিয়ার ভিতরে আরও ভিতরে। যে কোনো মূল্যে লিভিং স্পেস ক্যাপচার করতে হবে। ব্যারন বা জমিদার হওয়ার বাসনা নিয়ে যুদ্ধে গিয়ে এখন সাইবেরিয়ায় বরফ ভাঙতে হচ্ছে। দাদু বেখবর যখন, প্রায়ই দুঃখ করে বলতেন তিনি।
বাবার তালাশে বেরিয়ে জেনিফারের মা মস্কোর দিনামা স্টেডিয়াম দেখে এসেছেন, যা ওয়ার প্রিজনারদের আধপেটা অবস্থায় তৈরি। ওখানে কি তার বাবার প্রাণান্তকর শ্রমের ছাপ আছে রাস্তার দুপাশের বরফের নকশা-কাটা গাছপালা দেখতে দেখতে ভাবছিলেন তিনি। নাকি বরফ কেটে রেলরোড বানাতেন সাইবেরিয়ায়? তখন ছিল সংশয়ের যুগ। বাতাস উড়া খবরে ভরপুর। তারা সত্যের তালাশ করে শেষ সন্দেহটা দূর করতে চায়। প্রথমত জানতে চায় তাদের হারানো আত্মীয়টি বেঁচে আছে না মরে গেছে। দ্বিতীয়ত কীভাবে মারা গেল, মারা যাবার আগে কী খেতো, কী করত। এসব নিয়ে ছিল রাজ্যের জল্পনা কল্পনা।
সোভিয়েতের মৃতের সংখ্যা ছিল জার্মানির তিন গুণ। তাদের ১০ মিলিয়ন মানুষ যুদ্ধে মারা যায়। ৩ মিলিয়ন মানুষ বন্দী করে নিয়ে আসে জার্মানিতে। নাৎসিরা রাশিয়ান বন্দীদের নিয়ে কী করেছে? স্রেফ খতম। নিদেন জিম্মি করাও জরুরত মনে করে নাই। কেননা হিটলারের শুদ্ধি অভিযানে এই হীন প্রাণিদের দুনিয়ায় বাঁচার হক ছিল না। যুদ্ধের পর জার্মান বন্দীরা ক্ষতিপূরণ করছিল সেসব সোভিয়েত মানুষের, যারা নাৎসিদের হাতে নিহত হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো রাখঢাক ছিল না। সোভিয়েতের যেসব শহর, কলকারখানা জার্মানরা ধ্বংস করেছে, তার পুর্ননির্মাণে যুদ্ধবন্দীদের তখন দরকার ছিল। দরকার ছিল বন্দীদের বাঁচিয়ে রাখা। যারা জোয়ান বা কর্মক্ষম ছিল আর কি। বলে জেনিফারের এক গাল হাসি। হাসিটা ধরে রেখেই সে বলে জোয়ান মরদ হওয়া সত্তে¡ও তার দাদু অক্কা পেল।
জেনিফার এমন টোনে কথা বলে, সাদিকার মনে সংশয় জাগে ও কি সিরিয়াস, না ঠাট্টা করছে? যেন নাৎসি লোকটা ওর না, অন্য কারো দাদু ছিল। পরে একসঙ্গে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ভিজিটে গিয়েও দেখেছে নাৎসি হলোকাস্টকরনেঅলারা যেন জেনিফারদের অচেনা, বহিরাগত, যেন ভিন্নগ্রহ থেকে এসেছিল ওরা। এভাবে গা থেকে ধুলার মতো ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। আর ধুলাটা গিয়ে পড়েছে দুর্ভাগা ফিলিস্তিনিদের ঘাড়ে। কী মর্মান্তিক!
বিপরীতমুখী ঘটনা ও চিন্তার স্রোতে সাদিকা যখন টালমাটাল, তখন সেই খাবার টেবিলেই জেনিফার ইন্ডিয়ান লিজিয়নের কথা তোলে। আচমকা ঠিক নয়, যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে কথা বলতে বলতে ঘোরগ্রস্ত দশায় সে জড়ানো গলায় বলে, ‘হ্যাঁ, ইন্ডিয়ান লিজিয়ন। মি. বোসের ফ্লপ প্রজেক্ট। ওরা ফুয়েরারের নামে শপথ নিয়েছিল ইন্ডিয়ার স্বাধীনতার লড়াই করবে বোসের নেতৃত্বে। হা-হা-হা।’
কথাটা বলে জেনিফার হেসে দিলেও এ্যাগনেস এবার হাসে না। ওর বাসার ভাড়াটে অ্যানিমেল-লাভার দুজনের মুখ চুণ। ভাবছিল হয়তো নতুন করে আরেকটা অপ্রিয় বিষয়ের অবতারণা হতে যাচ্ছে। অথবা পোল্যান্ড থেকে ভারতা নদী দিয়ে যে ঝাঁকে ঝাঁকে মরা মাছ ভেসে আসছে, এ জরুরি তথ্যটি যে সন্ধ্যা থেকে বলতে চেয়েও পুরোপুরি বলতে পারেনি এ মাতাল মেয়েটির জন্য, তাই হয়তো মন খারাপ দুজনের। জেনির কথায় সাদিকা প্রমাদ গোনে। ইন্ডিয়ান লিজিয়নের মতো একটা জটিল বিষয়, কে রাতদুপুরে তাদের বোঝাতে যাবে? ভাগ্য ভালো, ঘন ঘন হাই তুলে স্বয়ং হোস্ট টেবিলম্যাট গোটাতে থাকলে সবাই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে।
।।৬।।
ডিনারের পর মাঝরাত অব্দি পালাক্রমে আইসক্রিম ও কফি গিলে সাদিকার রাতের ঘুম হারাম প্রায়। শুতে যাবার আগে সে শাওয়ার নিতে নিতে আশা করেছিল গায়ের সাবানজলের সঙ্গে ওর আমর্ম ঝাঁকানো আজ রাতের বাতচিতও মাথা থেকে গড়িয়ে নেমে যাবে। বাকি রাতটা আরামে ঘুমাবে সে। কিন্তু তা হয়নি। বাসার ভাড়াটে দুজন বিদায় হতে, এতদিন পর ছালা থেকে বিড়াল বের করল এ্যাগনেস! ইন্ডিয়ান লিজিয়ন নিয়ে জেনির আস্ফালনই মনে হয় ওকে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে। অথবা এমন একটি মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় ছিল হয়তো সে। জেনিকে তো চেনে এ্যাগনেস। দু পেগ পেটে গেলেই নাৎসি নানাকে নিয়ে মুখে তুবড়ি ছোটে। সাদিকার মনে পড়ে সে কোন যুগে ‘এপিক জার্নি’ নামে মি. বোসের সাবমেরিনে ইউরোপ থেকে এশিয়া পাড়ি দেওয়ার আধাখেঁচড়া একটা ফিল্ম বানিয়েছিল, আর সেটা ইমেইলে জানার পর তাকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করেছিল এ্যাগনেস। আর সেদিন থেকে ওর শেংগেন ভিসার তোড়জোর শুরু হয়ে যায়। হালে যুদ্ধের সূত্রে নানা কিসিমের মানুষের সঙ্গে এ্যাগনেসের সম্পর্ক যে প্রগাঢ় হচ্ছে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জেনি। জেনির সঙ্গে ওর পরিচয় বেশ আগে, বø্যাক ফরেস্টে হাইকিংয়ে গিয়ে। কিন্তু হৃদ্যতা বাড়ে, যখন এ্যাগনেস জানতে পারে, যুদ্ধের কারণে ওর পরিবার এখনো সাফার করছে। আর বলকান সেই পরিবারটি তো এখনো যুদ্ধের মধ্যেই আছে।
বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে সাদিকা ভাবে সে কি ল্যাপটপ নিয়ে বসবে? মাথায় ওর ইন্ডিয়ান লিজিয়ন। ইন্টারনেট সার্চিংয়ে কিছু অজানা তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। জেনিফার ঘুমাচ্ছে ওর উল্টো দিকের টালির চাল-সংলগ্ন আরেকটি প্রকোষ্ঠে। তাদের মাঝখানে এ্যাগনেসের করোনাকালীন সেই অফিসরুম। সাদিকা বিছানা ছেড়ে কাঠের মেঝেতে পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে। জেনির দরজাটা বিঘৎখানেক খোলা। ও কম পাওয়ারের বালব জ্বেলে ল্যাপটপ খুলে বসে এ্যাগনেসের অফিসরুমে। কানটা জেনির রুমের দিকে। বন্ধ দরজার ওপাশের জেনিফারের শ্বাস-প্রশ্বাসে কান পেতে সাদিকা রহমান মাছির মতো কতিপয় যুদ্ধবন্দীর গুনগুনানি শোনে। উত্তর আফ্রিকার রণাঙ্গনে পাকড়াও করে ড্রেজডেনের আনাব্যার্গ ক্যাম্পে তোলা ইন্ডিয়ান যুদ্ধবন্দী তথা ইন্ডিয়ান লিজিয়ন তারা। আজ রাতেই জানা গেছে তাদের একজন ছিলেন এ্যাগনেসের নানা পাঞ্জাবের অধিবাসী ভুবন সিং। তাদের একটি ঝাপসা ছবি সাদিকার চোখের পাতায় ভেসে ওঠে, যা বীর ভজনার আড়ালে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। তখন মি. বোসের এপিক জার্নি সাবমেরিনে চড়ে জার্মানি থেকে উত্তর সুমাত্রার উপকূলবর্তী সাবাং দ্বীপ, এটুকুই ছিল ওর মনোযোগের কেন্দ্রস্থল। এখন অকুপেশনাল হ্যাজার্ড ভাবলেও সেসময় প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি বানিয়ে ও খুশিই ছিল। ওর সিনেমা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল নেতার অমরত্বের বলয়ের পশ্চাদপটের ফোকাশহীন ম্যাদামারা মানুষগুলো।
কোথা থেকে কোথায় চলে আসে ওরা! নিজের নাতিশীতোষ্ণ দেশ ছেড়ে প্রথম মরুঅঞ্চল, তারপর এ শীতের রাজ্যে। জানে ভাগ্যবিড়ম্বিত, বিশাল যুদ্ধের কাছে নেহাত পোকামাকড়, তাদের নির্বিচারে সেই যজ্ঞে উৎসর্গ করা হবে। পোড়খাওয়া সৈন্য সব। হয়তো ভরপেট খাওয়ার কথা ভাবছিল। তাছাড়া কে না যুদ্ধবন্দীর হাড়ভাঙা পরিশ্রম থেকে রেহাই পেতে চায়!
একটা সাদাকালো ছবির দিকে তাকিয়ে সাদিকা আনাব্যার্গের বৃক্ষের নিচের জমায়েতটা কল্পনা করে। ওরা গ্যালারির মতো ধাপে ধাপে অর্ধবৃত্তাকারে বসেছে। কালো লম্বা পোশাকের ধর্মগুরু বা ত্রাণকর্তার মতো মি. বোসের আবির্ভাব। তিনি দুই'শ বছরের পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে কথা বলেন, বাগ্মীতা দিয়ে জয় করতে চান যুদ্ধ-বিক্ষত তনমনের একেকটা সৈন্যকে। ওরা মি. বোসের কারিশমায় মোহিত হয়ে বা নিরূপায় অবস্থায় বা আরেকটু ভালো থাকবে বলে অথবা স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে ব্রিটিশদের ছেড়ে জার্মান পক্ষভুক্ত হয়, তারপর ঝাড়ে বংশে নিকাশ হয়ে যায়। কাহিনিটা এটুকুই। কিন্তু কী বিশাল আর মর্মান্তিক! তুমি যদি দেশপ্রেম, আত্মত্যাগের ভারী কম্বলটা তাদের শরীর থেকে সরিয়ে সাদা চোখে সেদিকে তাকাও। অবশ্য বেঁচে যাওয়া কজন বীরের মর্যাদা পেয়েছিল। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সরকার জাহাজে করে দেশে পাঠায় তাদের। আটক করে দিল্লির রেডফোর্টে। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে ওরা কয়েদে ঢোকে আর বেরোয় দেশপ্রেমিক বীরের বেশে। একটা সাদাকালো ছবিতে অগণিত মানুষের গুঁড়ি গুঁড়ি কালো মাথা। কয়েকজনের গলায় মালা দিচ্ছে মানুষ। এ ছবির কথা গতরাতে বলেছিল এ্যাগনেস, যা ছিল ওর মা মার্গারেটের ধ্যান-জ্ঞান। এই দেশপ্রেমিকদের একজন তার বাবা ভাবতেন তিনি, যাদের গলায় ফুলের মালা পরানো হচ্ছে। এ্যাগনেসের নানি নির্বিকার। একে কম বয়সের ভুল মেনে, মেয়ের জন্মের এক বছর পর স্বজাতি এক যুবককে শাদি করেন তিনি।
।।৭।।
এ্যাগনেসের নানি ছিলেন ডাচ। হল্যান্ডের সাগর-তীরের ছোট্ট এক শহরে তার জন্ম। তিনি যখন কিশোরী ও যুবতীর মাঝামাঝি, তখন উজ্জ্বল চোখ, ঝকঝকে দাঁত আর মাথায় চূড়া করে খোঁপা করার মতো সবুজ পাগড়ি বাঁধা ভারতীয় বাহিনীর এক শিখ সৈনিকের প্রেমে পড়েন। ওরা নাৎসিদের আটলান্টিক দেয়াল পাহারা দিতে একটি জার্মান রেজিমেন্টের সঙ্গে এসেছিল। থাকত বনের ভেতরের মেকশিফট ক্যাম্পে। অবসরে বাস্কেট টুর্নামেন্ট যোগ দিতো জার্মান ফৌজের সঙ্গে। প্রতিবারই জিততো আর ফুর্তি করতে শহরে আসত। এ্যাগনেসের নানির বয়সি মেয়েরা দলে দলে তাদের প্রেমে পড়ে। কিন্তু গর্ভবতী হন একা তিনি। খবরটা ভুবন সিংজীকে জানানোর আগেই গোটা ইন্ডিয়ান লিজিয়ন দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে বদলি হয়ে যায়। প্রবল তুষারপাতই নাকি এ বদলির কারণ। এ্যাগনেসের নানির তা বিশ্বাস হয়নি। তিনি বরফের ওপর দিয়ে পা টেনে টেনে যান সাগর পাড়ে। এসে দাঁড়ান এমন জায়গায়, যার সামনেই নিষিদ্ধ জোন সমুদ্র সৈকত, এক পা বাড়ালেই মেশিনগানের গুলি। অগত্যা পাতাশূন্য পপলার সারির নিচে দাঁড়িয়ে তিনি বরফ-ঢাকা পিলবক্স দেখেন, যার কংক্রিটের ঘেরাটোপে বসে তার সবুজ পাগড়িধারী প্রেমিক সাগরের দিকে কামান তাক করে পাহারা দিতেন। ঠাণ্ডা বাতাসে গা কাঁপে নানির। শরীর অবশ হয়ে আসে। সব শেষে তিনি তাকান সমুদ্রের দিকে। তাকিয়েই থাকেন। যেখানে বছরখানেক পর মিত্রপক্ষের জাহাজগুলি জড়ো হয়েছিল, আর কামান থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ করছিল। তাদের নাকি প্রাণপণ বাধা দিচ্ছিল ইন্ডিয়ান লিজিয়নের কিছু সাহসী সৈনিক কথাটা তখন শুনেছিলেন এ্যাগনেসের নানি। তখন আর প্রেমিকের টানে সাগরতীরে ছুটে যাওয়ার সুযোগ নেই। খুব কঠিন সময়। মাথার ওপর বম্বিং হচ্ছে। সাগরের দিক থেকে আসছে কামানের গোলাবৃষ্টি। ছোট্ট মার্গারেটকে বুকে জড়িয়ে শহর থেকে পালান তিনি।
এখানেই প্রেমিকার পালা শেষ, যাত্রা শুরু কন্যা মার্গারেটের। ঘটনাচক্রে তিনি বিয়ে করেন এক জার্মানকে। সাদিকা তা জানে। এ্যাগনেসের মা যে হাফ ডাচ হাফ ভারতীয়, তা জানত না সে। তা বলে মার্গারেট আধা ভারতীয় পরিচয় নিয়ে গরিমাবোধ করতেন, এমন কিন্তু নয় গতরাতে টেবিলে টোকা দিতে দিতে বলেছিল এ্যাগনেস। তিনি শুধু তার বাবাকে ভালোবাসতেন, সে বাবা বলে। আর দুষতেন মি. বোসকে। কারণ তিনি ডুবোজাহাজে চেপে ইউরোপ থেকে ডুব না দিলে তার মুক্তিফৌজ এতিম হতো না। আর এভাবে বখেও যেতো না। হল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে বদলি হয়ে তাদের যেন পাখা গজায়। আসলে পাখা মুড়িয়ে কেটে দেন ফুয়েরার। দ্য ইন্ডিয়ান লিজিয়ন ইজ অ্যা জোক প্রবাদসম এ উক্তিটি করে তিনি তাদের ভেজিয়ে দেন নাৎসি পার্টির কুখ্যাত ওয়াফেন-এসএস বাহিনীতে। ওয়াফেন-এসএস-এর বিশেষ কীর্তি মধ্য-ফ্রান্সের ভূতড়ে শহর ওগাদ্যুঁ সুগ লান । নারী-পুরুষ-শিশু সবাইকে মেরে ফেললে শহরটা বিরান হয়ে যায়। এখনো বিরানই আছে। মার্গারেট বাবার কুকীর্তির চিহ্ন খুঁজতে ওগাদ্যুঁ সুগ লানে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফুলের মাল্য গলায় দেশপ্রেমিক বাবার তালাশে মুৃঘল-দিল্লির রেডফোর্ট যান নি। হয়তো অচেনা আর দূরের শহর বলে। অথবা মার্গারেট হয়তো বাবার চিহ্ন বলতে সম্ভাব্য মৃত্যুস্থল খুঁজছিলেন ফরাসী প্রতিরোধবাহিনীর ফায়ারিং স্কোয়াডের নথিপত্রে। পেয়েও ছিলেন ট্রাক থেকে নামিয়ে সামার ট্রায়ালের মাধ্যমে শহরের কেন্দ্রস্থলে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করার ঘটনাটি। নথিতে কারো নাম ছিল না। মার্গারেটের যাত্রা তাই অব্যাহত থাকে। যুদ্ধের শেষ দিকে জার্মানদের সঙ্গে অবশিষ্ট লিজিয়নরাও রিট্রিট করছিল। আর মওকা পেলে পালাচ্ছিল। ধরা পড়লে সাজা ছিল স্রেফ গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া। মার্গারেট লিজিয়নের পশ্বাদপসরণের লাইন ধরে অনুসন্ধান চালান। বাকিদের শেষযাত্রাপথ অনুসরণ করে ব্ল্যাক ফরেস্ট অতিক্রম করে পৌঁছে যান সুইটজারল্যান্ড।
নানির প্রেম কাহিনি যেমন-তেমন, অচেনা-অজানা বাপকে নিয়ে মায়ের বাড়াবাড়িতে ছোটবেলায় খুব বিরক্ত ছিল এ্যাগনেস। মায়ের মৃত্যুর পর মাতাল অবস্থায় এ থেকে মজা লোটে। সরু একটা সোনার রিং বের করে আনে মাঝ রাত্রিরে। যা নানি দেন মাকে, আর মৃত্যুশয্যায় মা দিয়ে যান এ্যাগনেসকে। এ যেন জাদুর আংটি, যার সঙ্গে হস্তান্তরিত হয় সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটির প্রতি ভালোবাসা আর তাঁকে খুঁজে বের করার অমোচনীয় দায়।
।।৮।।
আজ সকালটা অন্যদিনের চেয়ে ভিন্নভাবে শুরু হয়েছে।
দিনের শুরুতে এ্যাগনেস একটু খেঁকুড়ে থাকে। নিদারুণ তিক্ততা নিয়ে ওর রোজকার সকাল শুরু হয় যেন। দায়সারাভাবে শুভসকালের বার্তা দিয়ে লেজকাটা শিয়ালের মতো এঘর-ওঘর ছুটতে থাকে। আজ সে অন্যরকম ঝরঝরে নিরুদ্বেগ। নাশতার টেবিলে জেনিফার হাই তুলতে থাকলে ওকে আরেক কাপ টার্কিশ কফি বানিয়ে দেয়। টিফিনবক্স গোছায় যতœসহকারে। ব্যাগে সানস ক্রিম, সানগ্লাস, সুইমিং স্যুট নেয়। সাদিকার লাল টিশার্ট, শর্টস চুপচাপ ব্যাগে ভরে। অন্য দিনের মতো বিকিনি ব্যাগে নেওয়ার জন্য কুঁই কুঁই করে না মোটে। জেনিফারের সাঁতারে অনীহা দেখেও বিরক্ত হয় না। শুধু দ্রুত হাতের সিগারেট শেষ করে ওকে দাঁত ব্রাশ করে আসতে বলে। এ্যাগনেস গাড়িতে স্টার্ট দেয় গুনগুনিয়ে একটি প্রেমের গান গাইতে গাইতে।
তাদের গাড়ি যখন গ্যোবেল্সের স্টেটের দিকে না গিয়ে সোজা চলতে থাকে, সাদিকা তখন বোঝে যে আজকের দিনটা সাদামাটা হবে। রোমাঞ্চকর কিছুই ঘটবে না আজ। তা না ঘটুক। রোজ যুদ্ধের স্মৃতির রোমন্থনে বেড়ানোটা ঘেঁটে যাচ্ছে, রক্ত জল করা সাধের শেংগেন ভিসার কি অপমান! সম্মানহানি!
এ্যাগনেস লেকের পানিতে গা ভাসিয়ে চোখ বুজে আছে। শান্ত-সমাহিত। তারপর হাঁসের মতো গা ঝাড়া দিয়ে কী প্ল্যান জানাবে, কেউ জানে না। তা যা-ই প্ল্যান করুক, সাদিকাকে ‘এপিক জার্নি’ ছবিটা রিভাইজ করতে না বললেই হলো। ইন্ডিয়ান লিজিয়নের প্রতি ওর যথেষ্ট সিমপ্যাথি আছে। কিন্তু পুরোনো লজঝরে একটা সিনেমায় তাদের ঢুকিয়ে নতুন করে মেরে ফেলতে চায় না সে। কিন্তু আজ এ্যাগনেস কিছু বলে না। চোখ বুজে কলাগাছের মতো পানিতে ভেসে থাকে। আর মৃদু মৃদু জলতরঙ্গে দোল খায় সে।
জেনিফার সাঁতার-ফাতার, শরীর চর্চায় নেই। ও গাড়ি থেকে নেমে জঙ্গলের দিকে চলে গেছে মওশুম শুরুর মাশরুমের তালাশে।
পানিটা ঠাণ্ডা লাগায় সাঁতারে ইতি টানে সাদিকা। সে কাপড় ছাড়ার পর পর, যেন হিংস্র জলজ প্রাণি তাড়া করেছে তিরবেগে সাঁতরে পানি থেকে উঠে আসে এ্যাগনেস। ভিজা কাপড়ে পেশ করে তার পরবর্তী সফরের প্ল্যান রেডফোর্ট, ওল্ডদিল্লি। ঝুড়ির তলায় কয়েকটা কাদামাখা মাশরুম নিয়ে জঙ্গল থেকে ফিরে আসে জেনিফার। সে এ্যাগনেসের প্রস্তাবে মাথা নাড়ে। কেউ স্পন্সর করলে সে দিল্লি যেতে পারে। কারণ তার আয় রুজি নেই, পুরাদস্তুর বেকার তো সে।
----------
লেখক পরিচিতি: শাহীন আখতার, কথাসাহিত্যিক শাহীনের জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬২। বেড়ে ওঠা চান্দিনা, কুমিল্লায়। অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর ছয়টি উপন্যাস, ও সাতটি গল্পগ্রন্থ। তিনি গুরুত্বপূর্ণ দুটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেছেন। সেগুলো হলো: সতী ও স্বতন্তরা: বাংলা সাহিত্যে নারী এবং জানানা মহফিল বাঙালি মুসলমান লেখিকাদের নির্বাচিত রচনা। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ এ পর্যন্ত তিনি নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০২০ সালে এশিয়ান লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড। শাহীনের গল্প ও উপন্যাস ইংরেজি, কোরিয়ান ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
...


0 মন্তব্যসমূহ