মায়ের কবরের পাশে কবর, ছেলের ইমামতিতে জানাজা, কুলপাতা সেদ্ধ জল দিয়ে গোসল, সেসব তো হলই না উল্টে শেষ যাত্রায় কবরের সাড়ে তিন হাত মাটিটুকুও পেলাম না! কত সখ ছিল, ছেলে ভাইপোদের কাঁধে করে যখন আমার লাশ যাবে খাটিয়ায় তখন গাঁয়ের মানুষ দোয়া পড়বে। টাকা বিলি করা হবে গরিব-মিশকিনদের। এই তিন কুড়ি ন বছর দু মাস সতের দিন বয়সে কম তো রুজগার করিনি? আবাদপানি ব্যবসাপাতি ছেলের ভিন খাটা আর আমার শেষ বয়সের চাকরির উপার্জন। গোলা ভরা ধান, কুঠি ভরা ডাল, সম্বচ্ছরের ঘরের ঘানির তেল, বাড়ির গাইয়ের দুধ, ধামা ধামা খৈ-মুড়ি ভুঁইয়ের সবজি, জমির পেঁয়াজ-রসুনে ঘর-উঠোন ভরে থাকে। কেনা বলতে গেলে নুন আর ফোড়নের মশলা। সবাই বলে, ফেরেসতুল্লা বিশ্বাসের বাড়ির ধাপিতে সুখ শতর পেড়ে থাকে। কথাটায় আমার বুকের সিনা ফুলে উঠত। জুবেদাকে বলতাম, ‘আল্লাহ আমাদেরকে খুবই বরকত দিয়েছেন গো।‘ জুবেদা তখন মুখে এক খিলি পান গুঁজে ঠোঁটে হাসি লাগিয়ে বলত, ‘আমাকে এ বাড়ির বউ করে এনেছিলে বলেই তো সেসব সম্ভব হয়েছে?’ জুবেদা পান মুখে খিলখিল করে হাসত।
সে হাসিতে মুখ থেকে পানের কিছু পিক কোলের আঁচলে পড়ত। তখন আমি জুবেদার মধ্যে বেহেশতের হুরীকে দেখতে পেতাম। এত সুখ এত বৈভব সেসব তো ওরই জন্য? কত খিদমত করেছে আমার। সে খিদমতের ঋণ এক ইহকালে শেষ হবে না। সে কথা বললে, জুবেদা বলত, সে শোধ আর করতে হবে না, পরকালে মাথার ঘোমটাটা তোমার জন্যেই যেন দিতে পারি তাহলেই হবে। সে জুবেদাও শেষ যাত্রায় আমাকে চোখের দেখা দেখতে পেল না! রোগ কি আর দুনিয়ায় ছিল না? আগুনে পুড়িয়ে জলে ডুবিয়ে কিম্বা কলিজায় ঘা দিয়ে অথবা পেট ফাটিয়ে মারত পারত আল্লাহ। তাও তো শেষ যাত্রায় আপনজনের ছোঁয়া পেতাম? বড় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিত ছালেমুদ্দি মোয়াজ্জিন, বিশ্বাস পাড়ার ফেরেসতুল্লা বিশ্বাস, জমির বিশ্বাসের বড় ছেলে, শফিক বিশ্বাসের আব্বা ইন্তেকাল করেছেন। সে ঘোষণা বড়ঘাট্টা বিল টপকে শিষতলার মাঠ পেরিয়ে ছোট ভৈরবের তীরবর্তী শ্রীহরিপুর আব্দুলপুর রমনা গ্রামে পৌঁছে যেত। মাঠের ফসল বিলের জল নদীর মানুষ সে মৃত্যুর খবর শুনে চোখে জল ফেলত। দুখ কাঁদত সে খবর বয়ে নিয়ে যাওয়া হাওয়া। আর আজ, দুনিয়াদারির দু আনা তিন আনা পাপ মরার খবর নয়, আস্ত আমার মরা দেহ বয়ে নিয়ে যাওয়াচ্ছে নদীকে! এই জনমে যারা কবর পেল তারা সবাই কি আমার চেয়ে কম পাপ করেছিল? কত খুনি কাফের মোনাফেক সুদখোর কবর পেল আর আমার জন্যে সাড়ে তিন হাত মাটি বরাদ্দ করে রাখলে না খোদা! আমার ভেতর ডুকরে উঠছে। নদীর মশমশে কালো জল দু পাড়ের নৈশব্দ ভেঙে তিরতির করে বয়ে চলেছে। তাতে খড়কুটোর মতো ভেসে চলেছি আমি। গান্ধী কোভিড হসপিটালের চারশ তিন নম্বর বেডের কোভিড রুগি ফেরেসতুল্লা বিশ্বাস, সাড়ে তের ঘণ্টা আগে যার নাদুসনুদুস মেদওয়ালা শরীরের হাওয়া না পাওয়া ফুসফুসে ঢুকে আল্লাহর জান কবজের ফেরেশতা আজরাইল দাঁত নখ ফুটিয়ে রুহুটা বের করে নিয়ে গেছে। শুধু হাওয়াই তো চেয়েছিলাম? আল্লাহর দুনিয়ার হাওয়া। যে হাওয়া মাগনায় দেয় গাছ। আজ শেষ নিশ্বাস ফেলার সময় ঠাহর করলাম, এ হাওয়া জানেরও বাপ। হাওয়া ফুড়ুৎ তো রুহুও ফুড়ুৎ।
সব ঘাট ফাঁকা। নদী পাড়ের ঘাস-পাতা বনবাদাড়ে ঝুপ মেরে আছে নৈশব্দ। শুধু মাঝেমধ্যে হুড়মুড় করে পাড় ধ্বসার শব্দ নদীর বুক কামড়ে উঠছে। সাগর আর কতদূর? গায়ে একটু বল থাকলে উঠে দাঁড়াতাম। চোখ মেলে দেখতাম, পুত পবিত্র নদীতে আমার সহযাত্রী কত। গঙ্গা কীভাবে শববাহী নদী হয়ে উঠেছে। মুখের ওপরে জ্যৈষ্ঠের চ্যাটচেটে রোদ পড়তেই চোখদুটো খুললাম। তখনও চোখের কোণা দিয়ে ঝরছে গলা মাংস। মাথার খুলিটাকে জলের স্রোতে তল ঠেলা মারতেই ঘাড়টা উঁচু হয়ে উঠল। নদীর নীল-কালো জলে আলতো করে ঢেউ উঠল। নদী নাচল। আমি বেঁচে উঠেছি বলে নদী আনন্দে নাচল! এত লাশের ভার এত দুর্গন্ধ তার যে আর সহ্য হচ্ছে না। কতদিন মানুষ তার বুকে নেমে পুজো দেয়নি। পুজো দেওয়া তো দূরের কথা সামান্য জল ছুঁয়েই দেখেনি। মানুষের ছোঁয়া না পেলে নদী কি আর নদী থাকে? ডোবা নালা হয়ে যায়। না থাকে লাবণ্য না থাকে দেমাগ। মানুষ লাফাবে, সাঁতার কাটবে, ছোঁয়া-ছুয়ি খেলবে, জাল ফেলে ধরবে মাছ, নৌকোর পাল তুলে দেবে পাড়ি, ঘাট পারানি খেয়া ছাড়ার হাঁক হাঁকবে, মাঝি গায়বে গান আর খাল কেটে চাষি জল নিয়ে যাবে তার খেতিতে, তবেই না আমার বয়ে যাওয়ার সার্থকতা? তবেই না আমি জননী মা। বলবে নদী।
যে হাওয়ার জন্যে আমার এই হতচ্ছাড়া ইন্তেকাল(মরণ) সেই হাওয়াতেই ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে এল একটা দাঁড় কাক। কুচকুচে কালো গা। মিশমিশে ঠোঁট। নখওয়ালা ছাই রঙের পা দুটো যেই আমার ফুলে ঢোল হওয়া পেটে বসল অমনি ‘ধাই’ করে ছুটে এল একটা ঢিল। একেবারে গুলির বেগে। কাকটার করাতের মতো ঠোঁটটার পাশ ঘেঁষে স্যাত করে ছুটে জলে পড়ল। নদীর যেখানে ঢিলটা পড়ল সেখানকার জল ছ্যাঁত করে কিছুটা ছিটিয়ে গেল এদিক ওদিক। আর একটু এদিক ওদিক হলেই কাকটাও আমার মতো লাশ হয়ে যেত। কাকটা বিপদের আঁচ পেয়ে তৎক্ষণাৎ উড়ে পালাল। পাড়ে দাঁড়িয়ে যে লোকটা ঢিলটা ছুঁড়ল, তার মুখের কাঁচা খিস্তিটাও হাওয়ায় ভেসে এল, “বাহিঞ্চত কাক, মড়া খেয়ি মড়ার প্যাটের লাড়িভুঁড়ি খেয়ি মুখে ভাইরাসটা লাগি গাঁ-গঞ্জে ছড়াবি? তোর ছড়ানে বার কচ্ছি। ঢিল মেরি মেরিই ফেলব।“ কাকটা উড়ে পালানোয় মনটা আমার একটু খারাপই হয়ে গেল। ভেবেছিলাম, কাকটার কাছ থেকে বাড়ির কিছু খবর টবর পাব। আমার মরা আজ তিনদিন হতে চলল। বাড়িতে নিশ্চয় অরন্ধন পালন হচ্ছে। নিশ্চয় শোকে হাঁড়ি চড়েনি আখায়। কেঁদে কেঁদে জুবেদা নিশ্চয় শুকনো কাঠ হয়ে গেছে। বাড়িতে দেওয়া হয়েছে মিলাদ। মওলবি সাহেব ছলছল চোখে মোনাজাত করেছেন, আমার সমস্ত গোনাহকে(পাপ) যেন মাফ করেন আল্লাহ। আমি যেন বেহেশতবাসি হই। সেসব কিছুই শোনা হল না। মাটির কাছেও কান ঘেঁষতে পারছি নে। স্রোতগুলো ঘূর্ণি খেয়ে মাঝ নদীতেই আটকে আছে। চুল যেমন জট পাকায় স্রোতগুলোও তেমন জট পাকাচ্ছে। কিন্তু পাড়ে উছাল মারছে না। হঠাৎ সামনে একটা চরা ভেসে উঠল! ভেতরটা থক করে উঠল আমার। ওই তো মাটি। হোক না সে মাটি বালি-নুড়ির। মাটি তো। চরাটাকে মাঝখানে রেখে নদীটা দুদিকে ফালি হয়ে ভাগ হয়ে কিছুটা বয়ে গিয়ে আবার মিশেছে একসাথে। জায়গাটার নাম সাঁটুই। একটা ঘোলা স্রোত উল্টি মেরে আমার পায়ের দামরায় ধাক্কা দিল। গায়ের সাদা কাফনটার গিঁট খুলে তার ভেতরে পুবালি হাওয়া আর ঘূর্ণির জল ঢুকে খলবল করে দিয়েছে। কোমর পর্যন্ত নগ্ন হয়ে ভাসছি আমি। তার ওপর আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে দাঁতখিলে রোদ। সে রোদ স্রোতস্বিনী নদীর ঝিলঝিলে জলে খিলখিল করছে। চরাটায় ঠেকব না ঠেকব না করতে করতে ডান দিকের প্রসস্থ ভাগ দিয়ে যেই ঢুকেছি অমনি একটা লাল রঙের কুকুর দাঁত দিয়ে খ্যাঁক করে আমার বাম পাটাকে ধরল। এক কামড়েই টের পেলাম তার হাড় চাবানো ধারালো দাঁতের ক্ষমতার। কুকুরটা চরার দিকে আমাকে টানতে লাগল। তার সেই টানা হ্যাচড়ায় আমার ডান দিকের পচা কানটা খুলে গেল। পিঠের কিছু মাংস হাড়ের কাঠামো থেকে গলে গেল। উড়ে পালানোর আগে আমার বাম চোখটা খুবলে নেওয়ার জন্যে কাকটা তার ঠোঁট দিয়ে একটা ঠোকা দিয়েছিল। কিন্তু সে ঠোকায় চোখটা ওঠেনি। এখন চরার বালি আর নুড়িতে আঘাত পেয়ে দরদর করে পচা রক্ত বের হচ্ছে। ঘুৎ করে গায়ের সব বল দিয়ে কুকুরটা যেই আমার ঠ্যাং ধরে টান মারল অমনি আচমকা ‘ক্যাউ ম্যাউ’ করে উঠল কুকুরটা। আমার ঠ্যাংটা ছেড়ে দিয়ে বাপ বাপ করে মারল ছুট। হিজল গাছটার কাছে গিয়ে পিঠ কুঁকড়ে ‘ঘেউ’ ‘ঘেউ’ করতে লাগল। মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিল দুষ্টু লোকটা! লোকটা তখন একটা বড় লগি দিয়ে আমার চরে আটকে যাওয়া মরা দেহটাকে ঠেলছে যাতে করে আমি আবারও পুত পবিত্র নদীতে ভেসে যাই। আর বিড়বিড় করে কুকুরটাকে কাঁচা খিস্তি দিচ্ছে, “শালোর কুকুর, লদীতে ভাসা মড়া মুখে করি লিয়ি গিয়ি বাড়ির আন্টায় কান্টায় ছিটাতোস! তা থেকি সব্বনেশি ভাইরাসটা গুটা গাঁয়ে ছড়ি যাতোস! গাঁয়ে মড়ক লেগি যাতোস! ভাগ্যিস ঠিক সুমায়ে আমার চোখে পড়িছিল।“ তারপর আমার নড়বড়ে থলবলে মরা দেহটা চরার আলে-খিলের আটকা ছেড়ে যেই স্রোতে ভাসতে শুরু করেছে অমনি ছলাৎ করে একটা শব্দ নদী কামড়ে উঠল। “এই লগিও লিরাপদ লয়, মড়া ছুঁয়িছে” বলে বাঁশের লগিটাকে গায়ে বলদের বল দিয়ে নদীতে ‘ধাই’ করে ছুড়ে ফেলে দিল লোকটা। আমি চরাটা পেরিয়ে যখন আবারও মূল নদীতে পৌঁছলাম তখনও দূর থেকে মিহি করে কুকুরটার গোঙানির ‘ক্যাউ’ ‘ক্যাউ’ শব্দ ভেসে আসছিল। দিনের সূর্য তখন দুনিয়ার খেদমত শেষ করে পশ্চিমের রাঙা কোলে ডুব মারছে। নদীর পাড় জুড়ে তখন ধূধূ শূন্যতা। গা গড়া দিয়ে নামছে অন্ধকার। সে গোধূলি অন্ধকার ফুঁড়ে দূরের মিনার থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। শঙ্খর আওয়াজ। এসবই সেই হাওয়ার কেরামতি। যে হাওয়ার অভাবে আমার ইহকাল পরকাল হয়ে গেছে।
নদীর বুকের নৈশব্দ আর সে নৈশব্দের ভেতরের অন্ধকারে আমার ভেতর হুহু করে উঠল। ভেতরের পাড় ভাঙছে কান্নার স্রোতে। সে স্রোত উছাল মেরে পড়ছে চোখে। আর সহ্য হচ্ছে না। হে খোদা আমাকে তুলে নাও। কবর দেওনি, হাশর দাও। আমার এক ছটাক মাংসও যেন দুনিয়ায় পড়ে না থাকে। আমি দুনিয়াকে কলুষিত করতে চাই না। ঝুপ করে নদীর বুকে রাত নেমে এল। সে রাতের ঘ্রাণ লাগল আমার নাকে। সাপ পচা, শামুক পচা ব্যাঙ পচা কুকুর-গোরু পচা আর মানুষ পচার বিটকেল দুর্গন্ধ সে অন্ধকারকে বিষিয়ে তুলছে। আমার এসব দুর্গন্ধ নাকে লাগছে না। শুকে শুকে সয়ে গেছে। আমি বুক ভরে নিচ্ছি পাড় থেকে সুড়সুড় করে নেমে আসা বুনো জুঁই বেলি আর রজনীগন্ধার সুবাস। পাড়ে ধনুকের মতো কাত হয়ে থাকা কদম ফুলের সুঘ্রাণ। মাটির সোঁদা গন্ধ। আর ভিজছি আকাশের ফালি চাঁদের আলোয়। জুবেদা তুমি কি দেখতে পাচ্ছ এই চাঁদটাকে। মোনাজাত শেষ হলে উঠোনে নামো। গা ডুবিয়ে জ্যোৎস্না মাখো। আমিও যে এই জ্যোৎস্নাই মাখছি। আমার কবর হলে, শফিক আজ কবর জিয়ারতে যেত। বাপের নাজাতের জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া মাঙত। আমি এমন গুনাহগার এই দুনিয়ায় আমার কোনওদিন কবর জিয়ারত হবে না! হে খোদা, দুনিয়ায় এমন মরণ যেন আর কারও না হয়। বাড়ির কালো গোরুটার মতো অন্ধকার কালো ঘুটঘুটে হয়ে এলে শুনতে পেলাম নদীর সঙ্গে পাড়ের ঠুকমুক। নদী ফিসফিস করে পাড়ের মাটিকে দুষাচ্ছে, “তুই কেন আমাকে কবর বানিয়ে দিলি? আমার তো মাংস পোড়া ছাই বয়ে নিয়ে যাওয়া কাজ। হাড়-গোড় আর কাঁচা-পচা মাংস তো বওয়ার কথা নয়? সেসব তো তোর কাজ। মানুষের দেহ পচিয়ে গলিয়ে আবার মাটি করে দেওয়া তোর দায়।“ আর ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছে নদী। এই প্রথম নদীকে কাঁদতে দেখলাম। ডুকরে উঠতে দেখলাম। আসলে খোদার দুনিয়ায় কেউই কবর হতে চায় না। সে বদনাম যে এখন পুত পবিত্র এ নদীর? জমিনের মুখ ভার। কষ্ট তো তারও হচ্ছে। সেইই তো খোদাকে মাটি দান করেছে মানুষ গড়ার জন্যে। মানুষ তো মাটিই। খোদার হাতে সানা এক দলা মাটি। সন্তানকে কোলে ফিরিয়ে নিতে না পেরে জমিনেরও যে কষ্টে বুক ভেঙে যাচ্ছে।
কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ বুজল। আলো নিভে অন্ধকার নামল। তারপর সে অন্ধকার একসময় ফিকে হল। ফিকে অন্ধকার ঝুঝকিতে বদলালো। ঝুঝকির স্পর্শে একসময় ঘুম শেষ হল সূর্যের। তারপর আড়মোড়া ভেঙে পুবাকাশে উঁকি মারল নতুন বিহেনের সূর্য। জুবেদার গায়ের রঙের মতো কুসুম মিস্টি আলোতে রাঙিয়ে উঠল দিগন্ত। সে পয়লা রোদ যখন বটগাছটার ঝুরির ফাঁক গলে নদীর বুকে চুম্বন করল তখন জামরুলতলার ঘাটে চোখে পড়ল একজন লিকলিকে শরীরের বামুন ঠাকুরকে। বামুন লোকটা কি সূর্য প্রনামে এসেছেন? বামুন লোকটাকে দেখে মনে খুশি এল। যাক অনেকদিন পর কোন মানুষকে নদীর জল ছুঁতে দেখব। উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। বামুন লোকটা গঙ্গার প্রথম সিঁড়িতে নামলেন। পুবালি হাওয়ায় তার পরনের ধুতিটা ফিনফিন করে উড়ছে। কপালের তিলকের দাগগুলোর ওপর হ্লুদ-কুসুম আলো পড়ে ধবধব করছে। আনন্দটা আরও ঝিলিক মেরে উঠল আমার। বামুন লোকটা পুব দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। আমি ভাবলাম, এবার পরের সিঁড়িতে নামবেন, তারপর তারপরের সিঁড়িতে নামবেন, তারপর কুঁজো হয়ে বসবেন। নদী থেকে হাত দিয়ে জল তুলবেন। মন্ত্র উচ্চারণ করে সে জল নদীতে অঞ্জলি দেবেন। এটা তিনবার করবেন। কিন্তু নাহ, তিনি আর সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলেন না। কাঁধের ঝোলার ভেতর থেকে একটা ছোট্ট বোতল বের করলেন। সে বোতল থেকে কিছুটা জল হাতে নিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে নদীতে ছুড়ে দিলেন। এটাই তিনবার করলেন। তারপর সূর্যকে নমস্কার করে তড়িঘড়ি কেটে পড়লেন। আমার আশা ভঙ্গ হল। বামুন ঠাকুর নদীর জল স্পর্শ করলেন না! আমি বটগাছটার ছায়া পেরিয়ে দক্ষিণের মাঠের দিকে তিরতির করে চললাম। দুদিকে লকলক করছে গাছাপাট। গাবগাছটা যেখানে নদীর গা ছুঁয়ে ঝুঁকে আছে সেখানে দেখতে পেলাম একজন চাষিকে। কোদাল হাতে নাবালে নামছে। তার দুবলা-পাতলা শ্যামা শরীরটা পুবালি হাওয়ায় হিলহিল করছে। লোকটা নিশ্চয় খালের বাঁধটা কেটে দিয়ে তার জমিতে জল ঢোকাবে। সে জল দিয়ে বাতাল করবে জমি। সেটাই তো সে এতদিন করে এসেছে। কিন্তু আজ উল্টো ঘটল। লোকটা কোদাল দিয়ে মাটি কেটে বাঁধটাকে আরও উঁচু করতে লাগল। এমন করে পোক্ত করতে লাগল যাতে গলগল করে তো দূরের কথা চুইয়েও যাতে বিন্দুমাত্র নদীর জল তার জমিতে না ঢোকে। সে গুজবে শুনেছে, নদীর জলে মড়া ভাসছে। ও জল দূষিত হয়ে গেছে। ও জলে ছড়িয়ে গেছে সব্বনেশে করোনা ভাইরাস! কানে আসছে আরও নানান কথা। মানুষ নদীর জল পান করা বন্ধ করে দিয়েছে। স্নানও করছে না। গবাদি পশুদেরও ছুঁতে দিচ্ছে না। নদীর জল যেন হাজার জনমের শত্রু। যন্ত্রণায় রগ-রক্ত কটকট করে উঠল আমার। চোখ বুজে থাকলাম। রাত পেরিয়ে দিন এল। দিন পেরিয়ে এল রাত। আলো এল আলো গেল। নদীর বুক ঢেকে ফিসফিসিয়ে গেল অন্ধকার। সে অন্ধকারে রাজত্ব করল নৈশব্দ। ঘাট পারানি ফেরি হাঁকল না। ঘাটে নামল না মেয়ে-বউ। পাড়ে বাঁধা জেলে নৌকোগুলো দোম নিল গা ডুবিয়ে। শহুরে ব্রিজটার পিলারে ধাক্কা লেগে আমার ডান হাতের কব্জিটা ছেড়ে গেল। একটা শুশুক আমাকে কিছুক্ষণ শুঁকল তারপর জলের গভীরে ডুবে গেল। আমার শরীরকে তার খাদ্য বানাল না। দূর থেকে মাঝেমধ্যে টিপটিপ করে ভেসে আসতে লাগল কুপির আলো। ফেরিঘাটের জমা ঘরে দেখলাম একটা বিদ্যুতের আলো এতিমের মতো টিপটিপ করছে। আকাশে ভাসমান তারাগুলো ফ্যাল ফ্যাল করে আমার শেষ স্নান দেখছে।
ব্রিজটা পেরোতেই হঠাৎ আমার গায়ে একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কা লাগল! সে ঢেউ বাড়তেই থাকল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশের ঈশান কোণে মহিষের মতো কালো মেঘ উঠল। সেসব দেখে আমার ভেতরটা খুশিতে নেচে উঠল। এবার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। সে বৃষ্টি হবে মুষলধারে। সে বৃষ্টিতে চরাচর অন্ধকার হয়ে যাবে। নদীতে বাড়বে জল। আর সে জলে উছলে পড়বে ঢেউ। সে ঢেউ আমাকে সাগরের দিকে টেনে নিয়ে যাবে দ্রুত। নদী হাফ ছেড়ে বাঁচবে। লাশের ভার থেকে মুক্ত হবে। আর আমিও পৌঁছে যাব আসমানে। নদীর পাড়ের আচোটটায় দিঘড়ি দেওয়া সাদা দুধেল গাভিটা শিঙের গুঁতো দিয়ে খুঁটিটা উপড়ে বাড়ির দিকে যখন ছুট দিল তখনই আকাশ ঝেপে নামল বৃষ্টি। সে বৃষ্টিতে আমার পচে যাওয়া দেহের মাংস গলে যেতে লাগল। সে গলা মাংস ‘কপ’ ‘কপ’ করে খেতে লাগল মৃগেল চিংড়ি মাছ। সে আর কতটুকু? কিছুটা গালের কিছুটা চোখের কিছুটা জঙ্ঘার। তবুও নদী তো ভার মুক্ত হতে থাকল কিছুটা? আমি বুক ভরে পেট ভরে বৃষ্টি খেলাম। আমার ঢোল হয়ে ওঠা পেট আরও ফুলে কুঠি হল। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন ফাটে কখন ফাটে। নাহ অত সহজে ফাটল না। আমি জানতাম না, আমার হাই প্রেশার হাই সুগারের শরীরটা ভেতরে এত শক্ত। ভেতরের কলকব্জার এত ক্ষমতা। আসলে হবেই না বা কেন, এই তিন কুড়ি ন বছর দু মাস সতের দিনের শরীরে সেরকম বড় কোন অপারেশন নেই। কাটা-ছেড়া বলতে গেলে ডান চোখের ছানি অপারেশন। আর ভাঙা বলতে গেলে, বা হাতের কব্জি। মোটর বাইক থেকে পড়ে হাড়ে মোচড় লেগেছিল। এক্স-রে তে তাও সেরকম বড় কোন চির পাওয়া যায়নি। চায়ে চিনি আর মাটির নীচের আলু কচু খেতাম না যা, তাছাড়া মোটা মাংস মিহি মাংস ডিম মাছ সবই খেতাম। গায়ের সে বল যে এখনও হাড়-গোশতে গিঁটে-জড়ে কামড়ে লেগে আছে তা এখন টের পাচ্ছি।
ফাড়িটা যেখানে নদীর সাথে এসে মিশেছে সেখানে একটা কুমির দেখে আনন্দে ধেই করে উঠলাম! জীবনে এই প্রথম আমি কুমির দেখে আনন্দ করলাম। খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠলাম। এর আগে যখনই কুমিরের কথা শুনেছি, গল্প শুনেছি, টিভি-মোবাইলে দেখেছি ছবি, ভয় পেয়েছি। সে ভয়ে পিলে চমকে উঠেছে। কুমিরের ভয়ে তো কোনদিন সুন্দরবনই বেড়াতে যাইনি। কুমিরের মস্ত বড় হালুম, করাতের মতো দাঁত, গায়ে গণ্ডারের শক্তি আর লেজের জান নেওয়া ঝাপটা আমাকে ভয়ে কুঁকড়ে রাখত। সেই ভয়াল ভয়ঙ্কর কুমির দেখে আমি আনন্দিত হয়ে উঠলাম! এবার আমার শেষ স্নান সম্পূর্ণ হবে। ধন্যবাদ জানালাম আসমানের খোদাকে। দুনিয়ার পঞ্চভূতকে বললাম, প্রস্তুত হও, আমি তোমাদের দেহে বিলিন হতে আসছি। খুশি আমার বাগ মানছে না। মনে মনে দারুন ভাবে চাইছি, একটা বড় ঢেউ আমার গায়ে আছড়ে পড়ুক। আমাকে ঠেলে নিয়ে যাক সম্মুখে। আর আমি দ্রুত পৌঁছে যাই কুমিরটার ক্ষুধার্ত মুখের কাছে। হঠাৎ নদীতে ভাটা শুরু হল। আনন্দটা খুশিতে দ্বিগুণ হয়ে উঠল। আমি স্রোতের টানে দ্রুত সাগরের দিকে ছুটতে লাগলাম। কুমিরটাও আমার দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। কুমিরটা নিশ্চয় আমার মাংসের গন্ধ পেয়েছে? আমি যেই তার ফালি মুখের করাত দাঁতের কাছে এলাম অমনি কুমিরটা খপ করে আমার ডান পা’টা কামড়ে ধরল। আহঃ কী শান্তি। আমি পরকাল দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম, আমার পূর্ব পুরুষরা আমাকে কাছে পেয়ে বলছেন, “তুই ফিরে এলি ফেরেস? ভালো করলি। দুনিয়াটা বড্ড বিষিয়ে গেছে রে।“ ইহকালও দেখতে পেলাম, আমার মরার চল্লিশ দিন হয়ে গেছে। বাড়িতে ‘খতম’ পালন হচ্ছে। মসজিদে মুসল্লিরা আর বাড়ির অন্দরমহলে মেয়েরা কোরান তেলওয়াত করছে। ফকির-মিশকিন খাওয়ানো হচ্ছে। ছেলে বাপের পরলৌকিক ক্রিয়া সেরে কাঁধ থেকে ‘দায়’এর বোঝা নামাচ্ছে। জুবেদা হাতের চুড়ি ভেঙে পরনে সাদা কাপড় পরে নিয়েছে। কুমিরটা এবার আমার ঘাড়ে কামড় বসাল। মনে হল ঘাড়ে ধারালো দা’এর কোপ পড়ল। এবার আমি হাশরের ময়দানে কিয়ামতের বিচার দেখতে পেলাম। সেখানে আমি জমিন-আসমান এবং এই সারা জাহান ও সমস্ত মাখলুকাতের মালিক আল্লাহকে প্রশ্ন করছি, “হে আল্লাহ, হে রহমানের রহিম, দুনিয়ায় আমি কী এমন গুনাহ করেছিলাম যে আমার কবরের জন্যে সাড়ে তিন হাত মাটি রাখলে না?”
-------------
লেখক পরিচিতি: সৌরভ হোসেন। ঔপন্যাসিক গল্পকার। তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ , জমিনের আরশ, কমরেড ও অন্যান্য গল্প, ছাবেদ মিস্তিরির খুতবা, ইত্যাদি। তিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করছেন।

0 মন্তব্যসমূহ