অমৃতা প্রীতমের গল্প: জংলিফুল





অনুবাদ: নাহার তৃণা

ঙ্গুরি হলো আমার প্রতিবেশীর প্রতিবেশীর প্রতিবেশী, তার বহুদিনের পুরনো বয়স্ক ভৃত্যের নতুন বউ। প্রথমদিকে সব বউ-ই নতুন। তবে আঙ্গুরির নতুনত্বে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। যেহেতু আঙ্গুরির স্বামী প্রাভাতির এটি দ্বিতীয় বিয়ে, কাজেই তাকে কোনো ভাবেই নতুন বলা চলে না। কেননা ইতোমধ্যেই সে একবার দাম্পত্য জীবনের স্বাদ গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে আঙ্গুরির এটি প্রথম বিয়ে, তাই তাকে এখনও অনায়াসে নতুনত্বের হকদার বলা চলে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে একত্রে সংসার পাততে আঙ্গুরিকে প্রায় পাঁচবছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। সেই হিসাবটাও আঙ্গুরির নতুন বউ হওয়ার সপক্ষে যায়। এখনও বছর গড়ায়নি আঙ্গুরি স্বামীর সংসারে পা রেখেছে, সেদিক থেকেও সে নতুন বউ তো বটেই।

প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে প্রাভাতি তার প্রথমা স্ত্রীর শেষকৃত্য করতে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। সে সময় আঙ্গুরির বাবা সেখানে উপস্হিত ছিলেন। তিনি প্রাভাতিকে সান্ত্বনা দিয়ে তার ঘাড়ের গামছা নিংড়ে শুকিয়ে দেবার সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন। সত্যি বলতে, স্ত্রী বিচ্ছেদের শোকে কোনো পুরুষ এতটাই কাঁদে না যে তার দেড়গজ দৈর্ঘ্যের গামছা (পার্না) চোখের পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে উঠবে। আদতে শেষকৃত্যের সময় শোকের প্রতীক হিসেবে গামছাটি পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরকম পরিস্হিতিতে যদি কন্যাদায়গ্রস্হ পিতা স্ত্রীহারা পুরুষের কাঁধে ঝুলন্ত গামছা নিংড়ে সান্ত্বনা জানান, ধরে নেওয়া হয় তিনি শোকগ্রস্তকে বলতে চাইছেন: “ আমি আমার মেয়েটিকে তোমার মৃতা স্ত্রীর জায়গায় সমার্পণ করতে প্রস্তুত। এতটা কান্নাকাটি বা ভেঙে পড়ার কিছু নেই। শান্ত হও, আমি তোমার গামছা নিংড়ে দিয়েছি।” প্রাভাতির যে অঞ্চলের বাসিন্দা এটি সেখানকার প্রচলিত গ্রামীণ এক রীতি। যার মাধ্যমে পুরনোর ভাসান আর নতুনের আবাহন করা হয়।

এভাবেই প্রাভাতির সাথে আঙ্গুরির বিয়ে হয়। কিন্তু স্ত্রীর দায়িত্ব পালনের জন্য আঙ্গুরির বয়স খুব কম হওয়ায়, এবং পক্ষাঘাতে মা শয্যাশায়ী থাকায়, মেয়েকে তখন তখনই জামাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর ভেতর এক এক করে পাঁচ বছর বয়ে যায়, স্বামী প্রাভাতির হাতে আঙ্গুরিকে তুলে দেবার সময় হয়। বিয়ে করা বউকে নিজের কাছে রাখার ব্যাপারে প্রাভাতিও ব্যাকুল। কিন্তু ওর মালিক বাড়তি আরেকটা মুখের আহার জোটাতে একেবারেই রাজী ছিলেন না। প্রাভাতি মালিককে সাফ সাফ জানিয়ে দেয় এবার হয় সে তার বউকে নিয়ে শহরে ফিরবে নয় নিজেই গ্রামে গিয়ে থাকবে। সেই সঙ্গে আরো জানায়, সে নিজেই তার বউয়ের ভরণপোষণের দায়দায়িত্ব বহন করবে। মালিকের আর তাতে আপত্তি জানানোর উপায় ছিল না। তাছাড়া এতদিনের বিশ্বস্ত কাজের লোক কেউই বা হারাতে চায়। কাজেই আঙ্গুরি গ্রাম ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে শহরে এলো।

প্রথম প্রথম সবার সামনে আঙ্গুরি ইয়া লম্বা ঘোমটা পরে হাজির হতো, এমনকি মহল্লার মহিলাদের সামনেও। কিন্তু অল্প দিনের ভেতর ঘোমটার ঘের কমে কপালের উপর উঠতে সময় লাগলো না। অন্যদের চোখ আর কানের জন্য আঙ্গুরির উপস্হিতি ছিল আনন্দের। যখন সে হাঁটতো পায়ের নূপুরজোড়ার শত ঝুনঝুনি রিনিঝিনি শব্দে বেজে উঠতো; আর হাসিতে বেজে উঠতো হাজার ঘুঙুরের ঝঙ্কার। খুব অল্প সময়ের ভেতর আঙ্গুরি আর তার নূপুরের নিক্কণ বিখ্যাত হয়ে ‌উঠলো। দিনের বেশির ভাগ সময় আঙ্গুরি নিজের ঘরে কাটাতো, যখন সে ঘর থেকে বের হতো, ওর দুপায়ের নূপুর ঝঙ্কার তুলে হেসে উঠতো। জানান দিতো তার উপস্হিতি।

“ওটা কি পরেছো আঙ্গুরি?”

“পায়ের নূপুর। সুন্দর না?”

“পায়ের আঙুলে কি ওগুলো?”

“ আমার বিচছিয়া, পায়ের আঙুলের আঙটি।”

“হাতে বাঁধা ওটা?”

“তাবিজ বাঁধা বাজুবন্ধ”

“কপালে যেটা পরেছো তার নাম?”

“এটাকে আমরা আলিব্যান্ড বলি।”

“আজ কোমরে কিছু পরোনি কেন গো মেয়ে?”

“আর বলো না! আমার ট্যাগধি(কোমরের বিছাটা এত ভারী, পরে থাকতে কষ্ট হয়। কাল পরবো দেখে নিও।”

“আজ গলাতেও কিছু পরিনি। চেনটা ছিঁড়ে গেছে, আগামীকাল বাজারে গিয়ে সারিয়ে আনবো। নাকের জন্য একটা নাকফুলও কিনবো। আমার নাকের একটা নথ আছে। বেশ বড়সড়। শাশুড়ি মা সেটা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। নিজের রূপার গহনা নিয়ে আঙ্গুরির মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা গর্ব আছে। মহল্লার মহিলাদের আনন্দ নিয়ে সে একে একে সেসব দেখায়।

এক সময় প্রকৃতিতে ঋতুর পালাবদলে আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে ওঠে। নিজের ছোট্ট ঘরটায় আঙ্গুরির কেমন হাঁসফাঁস লাগে। দমচাপা অস্বস্তি থেকে বাঁচতে সে প্রায় তার ঘরের ঠিক বাইরে এসে বসতো। বাড়ির সামনে লম্বা একটা নিমগাছ আর পুরনো একটা কুয়া ছিল। মহল্লার কেউই সেই কুয়া ব্যবহার করতো না। তবে রাস্তা মেরামতের কাজে নিযুক্ত শ্রমিকেরা মাঝেমধ্যে সেই কুয়া থেকে পানি তুলে ব্যবহার করতো। কুয়ার আশপাশটায় শ্রমিকেরা পানি ফেলে একসা করে রাখায় জায়গাটা স্যাঁতসেঁতে থাকতো। ঠাণ্ডা একটা ভাব জেগে থাকতো ওখানটায়। প্রায় সেখানে বিশ্রামের ছুতোয় এসে বসতো আঙ্গুরি।

“কি পড়ছেন বিবিজি?”

আমাকে গাছেরনিচে বসে পড়তে দেখে আঙ্গুরি একদিন জানতে চাইলো।

“তুমি এটা পড়তে চাও আঙ্গুরি?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করি।

“আমি পড়তে জানিনা!”

“শিখে নিচ্ছো না কেন?”

“না”

“কেন নয়?”

“মেয়ে মানুষের পড়াশোনা করা পাপ।”

“পুরুষেরা পড়লে পাপ হবে না?”

“না, তারা পড়লে পাপ হবে না।”

“কে বলেছে এসব তোমাকে?”

“আমি জানি।”

“তাহলে আমিও পাপ করছি পড়াশোনা করে, ঠিক না?”

“ না, না, শহরের মেয়েরা পড়লে পাপ হয় না। কিন্তু গ্রামের মেয়েরা পড়াশোনা করলে পাপ হয়।”

ওর কথা শুনে আমি সশব্দে হেসে উঠি, আমার হাসিতে আঙ্গুরিও যোগ দেয়। আঙ্গুরি যা শুনেছে এবং যা ওকে শেখানো হয়েছে, অন্ধের মতো তা বিশ্বাসও করেছে- কিন্তু সেসব নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখেনি। আমিও আর ওকে কিছু বলতে যাই না। সে যদি তার ধ্যানধারণা-বিশ্বাস নিয়ে খুশি থাকে তো থাকুক না। আমি তাতে বাগড়া দেবার কে?

হাসিমাখা উচ্ছ্বল আঙ্গুরি দেখতে শুনতেও ভালো। ওর গায়ের রং কালো বটে, কিন্তু শরীরিক গঠন ভারি মনোরম। শরীরের যেখানে যতটুকু মাংসের দরকার সঠিকভাবে তা আছে। যেন একদম ঠিকঠাক ময়ান দেওয়া ময়দার গোলা। প্রবাদ আছে, নারী হলো একতাল ময়দার মতো। কিছু নারী কোনো রকমে ময়ান দেওয়া ময়দার তালের মতো ঢিলে ঢালা। তাতে সুগোল রুটি বানানো বেশ কঠিন। কেউবা আবার এতবেশি নরম ময়দার তাল, যার গোল্লা পাকানোই দুরূহ। সংখ্যায় খুব নগন্য কিছু নারী আছে যারা একদম ঠিকঠাক ময়ানে ময়দার তাল। যে কেউ তা দিয়ে শুধু সুগোল রুটি কেন চাইলে দিব্যি পুরিও গড়ে নিতে পারবে। আঙ্গুরির সুডৌল মুখ, পুরুষ্ট স্তনযুগল, যথাযথ গড়নের বাহু আর নিখুঁত টানটান মাংসে সাজানো শরীর দেখে আমি একধরনের বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতাম। প্রাভাতিও স্বাভাবিকভাবে আমার ভাবনায় আসতো। ছোটোখাটো জরাগ্রস্ত একটা মানুষ সে। আঙ্গুরির মতো সুচারু ময়ান দেওয়া ময়দার তাল উপভোগের যোগ্য লোক প্রাভাতি নয় মোটেও। দুজনকে নিয়ে মজাদার একটা ভাবনা মাথায় উদয় হতো। আঙ্গুরিকে মনে হতো উত্তমভাবে ময়ান দেওয়া ময়দার তাল আর প্রাভাতি হচ্ছে তাতে জড়িয়ে রাখা ভিজে গামছা। প্রাভাতি ওকে কেবল জড়িয়েই রাখে, ওর সঙ্গ উপভোগের সামর্থ্য তার নেই। এভাবে মাংস আর ময়দার তালের সাথে ওদের তুলনা করতে গিয়ে নিজের ভেতর প্রচণ্ড এক হাসির দমক অনুভব করতাম। কেন হাসছি সেটা আঙ্গুরি বুঝে ফেলার আগেই নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম।

প্রসঙ্গ ঘোরাতে আঙ্গুরির গ্রামের বাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইতাম। মুখে চোখে উপচে পড়া খুশি নিয়ে ওর মা-বাবা, ভাইবোন, দিগন্ত জোড়া সবুজ মাঠের আলাপে মশগুল হয়ে উঠতো আঙ্গুরি। প্রায় এমনসব আলাপ হতো আমাদের। একদিন জানতে চাইলাম -

“তোমাদের গ্রামে বিয়েশাদি হয় কীভাবে আঙ্গুরি?”

“খুব ছোটো বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। এই ধরো বড়জোর পাঁচ বছর, ওই বয়সে একটা মেয়ে একজন পুরুষের পায়ে অর্ঘ হিসাবে ফুল দেয়- ওই লোক মেয়েটার স্বামী হিসাবে গণ্য হয়।”

“অত্তটুকুন মেয়ে পূজার জানবেটা কী?”

“মেয়ের হয়ে বাপই ডালি ভরতি ফুল আর কিছু টাকা রাখে হবু স্বামীর পায়ের কাছে।”

“তার মানে বাপটাই লোকটার পায়ে ফুলের অর্ঘ দিয়ে পূজা করে। এখানে মেয়েটা কোত্থেকে আসে?”

“মেয়ের হয়ে বাপই করে।”

“কিন্তু মেয়েটা তো স্বামী নামের লোকটাকে আগে কখনও দেখেওনি”

“ভাবী স্বামীকে দেখার নিয়ম নেই।”

“একটা মেয়ে যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে তাকে চোখের দেখাটাও দেখতে পায় না?”

“না।”

“হবু স্বামীকে কোনো মেয়ে বিয়ের আগে কখনও দেখে না?”

“না, দেখে না।”

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে, দীর্ঘ একটা শ্বাস বাতাসে মিশিয়ে আঙ্গুরি বলে ওঠে-

“যে মেয়েরা প্রেমে পড়ে তারা তাদের হবু স্বামীকে দেখে।”

“তোমাদের গ্রামের মেয়েরা প্রেমে পড়ে?”

“ সংখ্যায় খুব কম।”

“গ্রামের মেয়েদের জন্য প্রেমে পড়া তো পাপের সামিল, ঠিক না?” - প্রশ্নটা করেই মেয়েদের পড়াশোনা বিষয়ে ওর মন্তব্য মনে পড়ে যায়।

“ প্রেমে পড়া পাপ, গুরুতর পাপ।”

“কেন পাপ করে তারা?”

:”কেন করে জানো? একটা লোক যখন কোনো মেয়েকে কিছু একটা খাইয়ে দেয় তখন সেই মেয়েটা তার প্রেমে পড়ে।”

“কি খাওয়ায় মেয়েটাকে?”

“একধরনের জংলিফুল। ওটা মিষ্টি বা পানের ভেতর লুকিয়ে একরকম জোর করেই মেয়েটাকে খাওয়ানো হয়। তারপর মেয়েটা ছেলেটাকে পাগলের মতো পছন্দ করতে শুরু করে। শুধুমাত্র ওই ছেলেটিকেই সে কামনা করতে শুরু করে, পৃথিবীর আর কাউকেই তার মনে ধরে না।”

“সত্যি নাকি!”

“হ্যাঁ সত্যি। আমি এটা খুব ভালো করেই জানি। এমন ঘটনা আমার নিজের চোখে দেখা।”

“কী দেখেছিলে তুমি?”

“আমার এক বান্ধবী ছিল। আমার চেয়ে বয়সে সে খানিকটা বড় ছিল।”

“তারপর?”

“তারপর আর কী, জংলিফুল খেয়ে সে তার হুশজ্ঞান হারিয়ে বসলো। একদিন ছেলেটার হাত ধরে শহরে পালিয়ে গেল।”

“তুমি কীভাবে জানলে তোমার বান্ধবীকে জংলিফুল খাওয়ানো হয়েছিল?”

“সে জেনেছি একভাবে। লোকটা বরফির ভেতর জংলিফুল পুরে দিয়েছিল। যেকারণে মেয়েটা তার মা-বাবাকে ছেড়ে শহরে চলে যায়। জংলিফুলটা না খেলে ওরকম ঘটনা ঘটতোই না। মেয়েটাকে বাগে পাওয়ার জন্য লোকটা অনেককিছু নিয়ে আসতো। শহর থেকে শাড়ি, কাচের চুড়ি, পুঁতির মালা…।”

“ কিন্তু ওগুলো তো উপহার। তুমি কীভাবে জানো যে লোকটা মেয়েটাকে জংলিফুল খাওয়ায়?”

“যদি সে মেয়েটাকে জংলিফুল নাই খাওয়াবে তবে কেন তার প্রেমে পড়বে মেয়েটা?”

“প্রেমে পড়তে কারণ লাগে না। যে কেউ বিনাকারণে কারো প্রেমে পড়ে যেতে পারে।”

“না, ওভাবে কখনও ঘটে না ব্যাপারটা। একজন খামোখাই ওভাবে প্রেমে পড়তে পারে না-- ওসব ঘটনা বাবা-মায়ের জন্য কষ্টের কারণ হয়।”

“তুমি কি কখনো জংলিফুলটা দেখেছো?”

“না, ওটা আমি কখনও দেখিনি। বহুদূর থেকে আনতে হয় সেই ফুল। তারপর সেটা মিষ্টি বা পানের ভেতর লুকিয়ে খাওয়ানো হয়। যখন আমি খুব ছোটো ছিলাম, তখনই মা পইপই করে আমাকে বারণ করে দিয়েছিল, কখনও যেন অপরিচিত কোনো লোকের কাছ থেকে পান বা মিষ্টি না নেই।”

“খুবই বুদ্ধিমতীর মতো কাজ করেছো কোনো বুড়োর দেওয়া মিষ্টি বা পান তুমি খাওনি। তোমার বান্ধবীটা কেন সেটা খেতে গেল?”

“নিজেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আঙ্গুরি কথাগুলো বলছিল বটে, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল বান্ধবীর প্রতি তার হৃদয় সহানুভূতিতে ভরে উঠেছে।

বিষণ্ন বদনে সে বলে উঠলো-- “ মেয়েটা একেবারে ক্ষ্যাপাটে হয়ে উঠেছিল, বেচারি। ঠিক মতো চুল আঁচড়াতো না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে গান গাইতে শুরু করতো।”

“কি গান গাইতো তোমার বান্ধবী?”

“সে আমি জানিনা। যারা জংলিফুল খায় তারা গানে মশগুল হয়ে থাকে আর অযথা প্রচুর কান্নাকাটি করে।

কথোপকথন স্পর্শকাতর বিষয়ে পৌঁছানোয় আমি আঙ্গুরিকে আর কোনো প্রশ্ন না করে চুপ করে থাকি।

এরমধ্যে অতিদ্রুত ঘটনার পরিবর্তন ঘটে যায়। একদিন আঙ্গুরি নিঃশব্দে নিমগাছের নিচে আমার পাশটায় এসে বসলো। আগে বিশ গজ দূর থেকেই আঙ্গুরির আগমন বার্তা ঘোষণা করতো তার পায়ের ছমছম শব্দে বেজে যাওয়া নূপুর। কিন্তু সেদিন সেসবের বালাই ছিল না। ওকে পাশে এসে বসতে দেখে বই থেকে মাথা তুলে জানতে চাইলাম, “কী ব্যাপার আঙ্গুরি?”

“কীভাবে নিজের নাম লিখতে হয় আমাকে শেখাবে বিবিজি?”

“কেন লেখা শিখতে চাও আঙ্গুরি? চিঠি লিখবে বুঝি? কাকে লিখবে?”

কোনো উত্তর দিলো না আঙ্গুরি, শূন্যচোখে তাকিয়ে রইল। কী এক গভীর ভাবনায় ডুবে গেল তারপর।

দুপুর হয়ে গেছে ততক্ষণে। ক্লান্তবোধ করায় বিশ্রাম নেবার জন্য আঙ্গুরিকে নিমগাছ তলায় রেখে আমি বাড়ি ফিরে আসি। সন্ধ্যায় যখন আবার বাইরে বের হলাম, দেখি আঙ্গুরি তখনও সেই একই জায়গায় ঠায় বসে আছে। কেমন জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিল সে। সন্ধ্যার ঠাণ্ডা বাতাস তার শরীরে বিঁধে মৃদু কাঁপুনি জাগাচ্ছিল সম্ভবত। আমি তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আঙ্গুরি গুনগুন করে কোনো গান গাইছিল, কান্নার মতো করুণ শোনাচ্ছিল সে সুর।

“মেরি মুড্রি ম্যায় লাগো নাগিনভা

হো বাইরি ক্যায়সে কাটুন জীবনভা”

(অভিশপ্ত পাথরে জড়িয়ে গেছে আমার আংটি, কীভাবে কাটবে আমার ভরন্ত জীবন?)

আমার পায়ের শব্দ আঙ্গুরির কানে গিয়েছিল। ঘুরে তাকিয়ে আমাকে দেখেই গান গাওয়া থামিয়ে দিলো।

“ তুমি তো বেশ গাইতে পারো আঙ্গুরি।”

বুঝতে কষ্ট হলো না, আঙ্গুরি প্রাণপণ চেষ্টায় চোখের পানি আটকিয়ে মুখে ঈষৎ হাসির আভাস ফোটানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।

“আমি মোটেও গাইতি পারিনা।”

“ কিন্তু গাইছিলে তো…”

“ও কিছু না বিবিজি…”

“ গানটা তোমার বান্ধবী গাইতো বুঝি?”

“হ্যাঁ, আমি তার মুখেই গানটা শুনেছিলাম।”

“ এখন তবে আমাকে শোনাও গানটা”

“ওহ, এটা আসলে ঋতুর গণনা। বছরের চার মাস শীত, গ্রীষ্মকালে বরাদ্দ চারমাস, বাকি চারমাস অঝর বর্ষা।” গানের কথাগুলো সে আবৃত্তির ঢঙে গড়গড় করে বলে গেল।

“উহু, ওভাবে নয়, গেয়ে শোনাচ্ছো না কেন বাপু?”

আঙ্গুরি ঋতুর নামগুলো এমন ভাবে গুণচ্ছিল যেন বারো মাসের হিসাব দেওয়াটা তার জন্য বাধ্যতামূলক।

“চার মাহিনে রাজা ঠান্ডি হোভাত হ্যায়

থর থর কামপে কারেজভা

চার মাহিনে রাজা বরখা হোভাত হ্যায়

থর থর কামপে বাদরভা। ”

“আঙ্গুরি!”

ডাক শুনে আঙ্গুরি শূন্য দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকালো। ওর কাঁধে হাত রাখলাম। খুব ইচ্ছে হলো ওর কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানতে চাই, “মেয়ে তুমি সেই জংলি ফুলের স্বাদ পেয়েছো, তাই না?” কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টো কথা জিজ্ঞেস করে বসলাম- “ আজ রান্না করেছো আঙ্গুরি? খাওয়া-দাওয়া করেছো তুমি?”

“খাবার?” অদ্ভুতভাবে জিজ্ঞেস করলো আঙ্গুরি। তার কাঁধ ছুঁয়ে থাকায় ওর শরীরের কাঁপুনি স্পষ্ট টের পেলাম। খানিক আগেই যে গানটি সে গাইছিল- বৃষ্টির কাঁপুনি, গ্রীষ্মের দমকা বাতাসের কাঁপুনি আর শীতকালের হৃদয় কাঁপানোর অনুরণনে বুঝিবা আঙ্গুরির শরীরের এই কাঁপন।

আমি জানতাম, প্রাভাতি মালিকের বাড়িতে খাওয়ার পাট চুকালেও আঙ্গুরি নিজেই ঘরে রান্না করে খেতো।

আবারও জিজ্ঞেস করলাম, “আজ রান্নাবান্না কিছু করেছো?”

“না, এখনও করিনি।”

“সকালে চুলা জ্বলেনি? চা খেতে তুমি ভালোবাসো, খেয়েছো সকালের চা?”

“চা? ওহ, ঘরে আজ দুধ ছিল না।”

“কেন নেই আজ দুধ? দুধ ফুরিয়েছে, কেনোনি কেন?”

“আমি দুধ কিনি না বিবিজি।”

“রোজ তুমি চা খাও না?”

“হ্যাঁ, খাই।”

“ আজ কী এমন হলো, চা খেলে না?”

“রামতারা আছে না? ওই তো রোজ দুধ নিয়ে আসে…”

রামতারা আমাদের এই মহল্লার চৌকিদার। আমরা সবাই মিলে ওর বেতন দিয়ে থাকি। সারারাত বেচারা হেঁটে হেঁটে এলাকায় পাহারা দেয়। আমার মনে পড়লো, আঙ্গুরি এখানে আসবার আগে, রামতারা মহল্লার কোনো না কোনো বাড়িতে গিয়ে এককাপ চায়ের জন্য ধর্না দিতো। তারপর সে তার খাটিয়াটা কুয়ার পাশে পেতে তাতে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটাতো। আঙ্গুরি এখানে আসবার পর থেকে রামতারা প্রতিদিন দুধওয়ালার কাছ থেকে সামান্য দুধ কেনা শুরু করলো। সেই দুধে আঙ্গুরির চুলায় চা তৈরি হতো। চুলার পাশ ঘিরে রামতারা, প্রাভাতি আর আঙ্গুরি মিলে বসে সুরুৎ সুরুৎ করে চায়ে চুমুক দিতো, গাল-গপ্পো করতো।

আরো মনে পড়লো, গত তিনদিন ধরে রামতারাকে মহল্লায় দেখা যায়নি। কারণ ছুটি নিয়ে সে গ্রামের বাড়ি গেছে। ঠোঁটে একটুকরো বেদনাক্রান্ত হাসি ছড়িয়ে জানতে চাইলাম, “আঙ্গুরি! গত তিনদিন তুমি চা-ই খাওনি!”

উত্তরে সে কিছুই বললো না। মাথাটা মৃদু নাড়লো কেবল।

“তুমি খাওয়া-দাওয়াও কিছু করোনি বোধ হয়?” এবারও আঙ্গুরি জবাব দিলো না। আপাত যা বুঝলাম, খেলেও হয়তো নামকাওয়াস্তে খেয়েছে।

রামতারার কথা মনে পড়লো- দেখতে শুনতে ভালো, স্বভাবে নরম, কথা বলার সময় ঠোঁটের কোণে লাজুক একটুকরো হাসি লেপ্টে থাকে। কথাবার্তাও বেশ সুন্দর গুছিয়ে বলতে জানে।

“আঙ্গুরি?”

“বলো বিবিজি।”

“তুমি সেই জংলিফুলের স্বাদ নিয়েছো- তাই না?”

আঙ্গুরির দুচোখ ছাপানো অশ্রু, ওর দুগাল, ঠোঁট সে ধারায় ভিজে গেল। এমনকি সে যখন কথা বলে উঠলো শব্দগুলোও বুঝি কান্নায় ভিজে জবজবে হয়ে উচ্চারিত হলো-

“কসম খেয়ে বলছি, ওর হাত থেকে আমি কক্ষনো মিষ্টি নেইনি। পানও না। শুধু চা..তাহলে কি চায়ে ওই জিনিস মেশানো ছিল...?”

আঙ্গুরি আর কিছু বলতে পারলো না। কান্নার দমকে ওর কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল।

-----------------------
মূলগল্প: দ্য ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার, লেখক: অমৃতা প্রীতম, পাঞ্চাবি ভাষা থেকে ইংরেজি অনুবাদ: নিরুপমা দত্ত ও রাজ গিল্।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ