জয়শ্রী সরকারের গল্প: ঈশ্বরকে বল দুখী ডাকছে




ছাই রাখবেন ছাই। ভালো ছাই। এই ছাই রাখবেন, ছাইইই...’ গলির বিষণ্নতা কাটিয়ে দিয়ে দুখী চলে যায়।

নিমতিতা একটি রাত কাটালাম। কোন কুলক্ষণে যে সংবাদ শুনতে বসেছিলাম। মেরিনড্রাইভে পুলিশের গুলিতে এক বড়বাবু মারা গেছেন। যেমন নবীন, তেমনি হ্যান্ডসাম। সরষে ফুল স্বপ্নে বিভোর হয়ে ছুটছিল। বড় চাকুরী ছেড়ে কিসব ফিল্মটিল্ম বানাচ্ছিল। ফেনিল সমুদ্র আর পাহাড়কে সাক্ষী রেখে একটি গুলি ওর বুক চিরে চলে গেছে। ঘটনার পর সঙ্গীরা আটক।

ওদিকে মগড়া নদীর বাঁক পেরিয়ে উচিতপুরের মিনি হাওরে সতেরজন নৌকাডুবিতে গেছে তলিয়ে। কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের নৌকা ভ্রমণে নিয়ে গিয়েছিল শিক্ষকেরা। ডুবুরীরা শবেদের তুলে পাড়ে জমা রাখছে। সে দৃশ্য চোখে দেখা যায়না! মদনবাসী এত মৃত্যু একসাথে আগে দেখেনি, এই নিয়ে হাহাকার করছিল। কারো কারো চোখ বেয়ে নামছিল জলের ধারা।

এদিকে অর্ন্তজাল জানান দিচ্ছে মন্দিরের পাথরে কোরবানির হাড্ডিগুড্ডি ছড়ানো ঘিরে হিন্দুরা ‍ফুঁসছে। বাবরী মসজিদের স্থানে রাম মন্দিরের পূজা নিয়ে মুসলিমরা ফুঁসছে। এসবের কিছু কেবল জানছে না যারা কাজ হারিয়ে ক্ষুধায় ধুঁকছে। বন্যায় ভেসে গেছে যাদের ভিটে।

দেশের একাংশ ডুবে গেছে। পানাফুলের মতো ভাসছে মানুষ। কেউ কেউ কলার ভেলায় পোষা হাঁস মুরগি, ছাগল, কুকুরের সাথে সন্তানকে চরিয়ে নিজে বুক জল ভেঙে ঠাঁই খুঁজে মরছে। ত্রাণ নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন দাতারা। ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রির্পোটাররা সংবাদ পড়ছে। বুড়ো মানুষটা তিনদিন ধরে ভাত খাই নাই বলে ঝরঝর করে কাঁদছিল। এরমধ্যেই কিছু গোবরগণেশ সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে একপ্যাকেট খিচুড়ি ধরে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। কেউ কেউ অতিবীরের বেশে সেলফি নিয়ে ব্যস্ত।

এ বাড়ি যিনি দেখভাল করেন আকবর চাচা, তার নাতির নাম টুনি। ও প্রায় পথে এরতার সাথে ঝগড়া করে কিসব বকে। গাঁয়ে থাকতে ছোটবেলায় আমিও সেসব খিস্তি আওরেছি। নাগরিক হতে গিয়ে যদিও সেসব ভুলে যেতে হয়েছে। তবে সুযোগে মনে মনে আমিও টুনির মতোই পারি। এতে একটা আরাম আসে। এসব মনে করে ইচ্ছে করছে বালতি ভরে সেসব খিস্তি ঢেলে দেই। নেহাতেই মনন ঘরে। সে নিপাট ভদ্রলোক, মহানাগরিক। তার সামনে খিস্তি করলে আমার মান থাকেনা। তাই ইচ্ছেকে আপাতত ঝাঁপিঢাকা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

চায়ের মগটা ডাকছে। একটু চা বানিয়েই এসে বসি।

এই চাপাতাটা সিলেটের চা বাগান থেকে আনা। মনোয়ার ভাই গতবার এনে দিয়েছিলেন। সরাসরি বাগান থেকে চা পাতা নিয়ে রোদে শুকানো। গরম জলে পড়তেই কেমন সুগন্ধি ছড়াচ্ছে। অনেকদিন ধরে আদা লং গোলমরিচ, দারুচিনির চা খেতে খেতে মুখটা গরমশল্লার আখড়া হয়ে গেছে।

সকালের নরম বাতাস জানালায় দোল খাচ্ছে। কোন একটি ফ্ল্যাট থেকে গান ভেসে আসছে।

বিস্তীর্ণ দুপাড়ে

অসংখ্য মানুষের, হাহাকার শুনে

নিঃশব্দ নিরবে

ও গঙ্গা তুমি, ও গঙ্গা বইছো কেন…

সেই কবে ভূপেন হাজারিকা গেয়েছেন অথচ আজো কত প্রাসঙ্গিক। আবছা গানের সুর যেন গলির চিলতে আকাশটার বুকে চেপে বসেছে। আজকাল নিশ্বাস আটকে যায়। একঘরে জীবন বিষের মতো লাগে। খোলাআকাশের নিচে দাঁড়িয়ে হাওয়া মাখিনা কতদিন! কত দিন নদীর কাছে গিয়ে ছলমল শব্দ শুনিনা! ফুটপাতে চা খাইনা। টিএসসি যাইনা। ছবিরহাট, চারুকলা কোথাও যাইনা। যখন তখন রিকশার হুড ফেলে হৈ হৈ করিনা। আপনজনদের সাথে দেখা হলে মুখ দেখিনা। জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা নিতে পারিনা!

দিনের শেষে মেঘদলের সাথে বেদনারা উড়ে উড়ে এসে চোখের পাতায় জমা হয়। এক আকাশ বিষণ্নতা নিয়ে ঘুমুতে যাই একটি শিউলি কুড়ানো ভোরের আশায়। শিশিরে ভেজা শিউলি আজলাভরে কোনদিন কুড়িয়ে আনতে পারবো কি না তাও জানিনা। ভয় অন্য কিছু নয়। ভয় ঐ আজন্ম শ্বাসকষ্টের। হাসপাতালে নাকি বেড খালি নেই। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছেনা। ফোন নম্বরটি পেলে ঈশ্বরকে জিজ্ঞাসা করতাম, এত আলোয় যে উৎসবে জ্বলে। সেই অর্থে অক্সিজেন কেনার সুমতি হয়না তোমার!

আজকাল মনে হয়, একটা নির্জন দ্বীপে যেন কেউ বনবাসে ছেড়ে গেছে। এ বনবাস আর শেষ হওয়ার নয়।

একচিলতে নীরবতার জন্যে কতইনা আইঢাই করেছে মন। অথচ নিচে সাইসাই ছুটে চলা রাস্তাটি কেমন নিথর। কোথায় গেল সব! ঐ ল্যাম্পপোস্টটাও কেমন খাঁ খাঁ চোখে তাকিয়ে আছে। যেন অপেক্ষা করছে, কোন একটি দাঁড়কাক এসে তাঁর বিষণ্নতা কাটিয়ে দিয়ে যাবে।

জ্ঞানবিহীন নিরক্ষরের

খাদ্যবিহিন নাগরিকের

নেতৃত্ববিহীনতায় মৌন কেন

সহস্র বরষার, উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে লক্ষজনের সবল সংগ্রামী

আর অগ্রগামী করে তোলো না কেন?

গান আর এই চা যেন সকালের বিষাদ মুছে দিতে চাইছে। বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে খোকন ঘুমুচ্ছে। ঐতো ওর মুখেও স্বর্গীয় আলোর আভা। ঐটুকু দেখে তো সুখে থাকার কথা তবু কেমন খাঁখাঁ করে মন। চারদিক কি সুনসান। কেউ কোথাও নেই যেন। মৃত্যুপুরীর মতো মনমরা।

অথচ কিছুদিন আগেও মৃত্যুকে কত সুন্দর ভাবতাম। সাদা বকের মতো ধবধবে, পাহারের মতো শান্ত স্থির। রেগে গেলে লক্ষ কোটিবার মননকে বলেছি মরলে হাড়েহাড়ে টের পাবে তুমি। ভাবটা এমন যেন মৃত্যু খুব সহজ। একধরনের রোমান্টিসিজম থেকে বারবার মরতে চাওয়ারই যেন সাধ জাগতো। হতে পারে জীবনানন্দের সেই কবিতার আছর। ‘হয়তো বা হাঁস হব। কিশোরীর ঘুঙুর রহিবে লাল পায়, সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে, আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে।’ কাব্যঘোরে মৃত্যুর পর ফিরে আসাটা সত্যি বলেই মন মনে নিয়েছিল। অথচ মৃত্যু কি বিষাদের। রূঢ়। মহাপ্রলয়ের মতো। মৃত্যুভয়েই মরে যাচ্ছি আজ।

মানুষগুলোও সব কোথা থেকে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে কানাগলির কয়েকটা ফ্ল্যাটে টু লেট ঝুলে গেছে। এই বিল্ডিং থেকেই তো বাবুনিরাও চলে গেল। কদিনে এমন আপন হয়ে গিয়েছিল। মহামারীর শুরুর দিকেই একদিনের নোটিশে বাবুনির বাবার চাকুরি নাই। দুই তিনমাস কাজের চেষ্টা করেছেন। মিলেনি। সাতবছরের সংসার গুটিয়ে ট্রাকে তোলে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল। বাবুনিটা কেবল হাত উড়িয়ে বেড়ু যাই, বেড়ু যাই বলে তালি বাজাচ্ছিল। ভিতরটা গুড়িয়ে যায়। কয়েকমাসে নাকি পঞ্চাশ হাজারের মতো মানুষ নিঃস্ব হয়ে দেশের বাড়ি ফিরে গেছে।

আচ্ছা,এমনতো হতে পারতো যা কিছু ঘটেছে পুরোটাই দুঃস্বপ্ন অথবা কোন সিনেমার শুটিং!

২৯ জির দোতলার বারান্দাটা আমার জানালা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। সেদিনের মায়ের কোলে চরা বাচ্চা মেয়েটা আজ বেলকনিতে হাঁটছে! তারমানে কতদিন আটকে আছি যে এর মধ্যে বাচ্চাগুলো বড় হয়ে গেল! পাড়ার বাঁদর বাচ্চাগুলো না জানি কত বড় হয়ে গেছে। ওরা বিকেলে আর পথে নামেনা। দেখিও না! শুধু ওদের কথাবার্তা, কান্নার আওয়াজ পাই প্রায় বিকেলেই। বেশি ছোটরা রেলিং-এ দাঁড়িয়ে কাঁদে, চিৎকার করে অন্য ফ্ল্যাটের বন্ধুকে ডাকে। সেদিন পাশের বিল্ডিংয়ের ব্যালকনি থেকে ভেসে আসছিল, মা প্লিজ একবার বাইরে যাব। সে কি কান্না!

অথচ ওদের হৈহৈ’য়ে খোকনের ঘুম ভেঙে যাবে বলে কতদিন অন্যদিকে খেলতে যেতে বলেছি। আজকাল বিকেলগুলো কেমন ছমছমিয়ে নেমে আসে। ঈশ্বরকে কত বলি অন্তত বাচ্চাগুলোরে খেলতে দাও। ওরা যত খুশি চিৎকার করুক। খোকনের ঘুম ভেঙে যাক। তবু ওরা পথে নামুক। এই জানালা জীবন থেকে মুক্তি দাও এবার!

ঈশ্বরমশাই ভাতঘুম থেকে উঠতেই পারছেন না তাই কোন কথাই তিনি শুনতেও পাননা!

জলপাই রঙের মগ থেকে চায়ের ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উড়ে যায়।

সূর্যমুখী সকাল ঝলমল করছে ইটরঙা বাড়িটির ছাদে। মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে একটি চন্দ্রমল্লিকা ফুল। এই ফুলটা কাল ফোটিনি। এমনটি কয়েকমাসে একদিনও হয়নি তাই গতকাল মনে কু ডাকছিল। আজ ঠিকই রং ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে সুদিন আসবে।

এই ভেন্ডি করলা লাউ পেঁপে বেগুন আলু টমাটো। রাখবেন? তাজা সবজি। এই ভেন্ডি করলা . . .

একজন ভ্যানওয়ালা গলিতে ঢুকছে। কিছু সবজি কেনা চাই। ফ্রিজের মাছ প্রায় শেষ। কিন্তু আলু পটলের সংসার নিয়ে এখন ভাবতে ইচ্ছে করছে না। অনেকদিন পর এমন একটা সকাল দেখছি। ওরা না আসাতেই বোধহয় এখনো জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি। ওরা এলে নীরবতা কাটলেও বিষাদ বাড়ে। বুভুক্ষার স্বরলিপি ছড়িয়ে গলিতে এঁটে বসে থাকে। আমাকে নিয়ে মনন যা ভাবছে তাতে ওদেরও কি দায় কম!

প্রতিদিন সকাল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত বিষাদ ছড়িয়ে পাগল করে দেয়। খুঁচরো থাকলে দেই। না থাকলে কখনো সখনো চালের সাথে এটা, ওটা। না পারলে, না শোনার ভান করে মটকা মেরে পড়ে থাকি। এই সতের কোটি মানুষের দেশে যেখানে রাষ্ট্র দায়িত্ব নিতে পারেনা। সেখানে আমি এক ছা পোষা মানুষ কতবার দেব!

আমার উপর আল্টিমেটাম আছে, এইসব বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনছি। ওরা কি অসহায় হয়ে যে ডাকছে সেইটা ঘরে বোঝাতেই পারছিনা। বিপদে না পড়লে, সেদিনও যেখানে ভিখারী পাঁচটাকার নিচে পেলেই প্রত্যাখান করতো আজ দুইটাকা দিলেও দিব্বি লুফে নেয়! ঐটুকুর জন্যেই দিনরাত বিলাপ করেই যাচ্ছে। শক্তিটুকুন নেই তবুও জানপ্রাণ চাইছে।

এই শিং, বোয়াল, রুই, মলা, পাবদা মাছ। মাছ মাছ। পাঁচমিশালি মাছ. . .

ভ্যানের সাথে একঝাঁক শালিখ উড়ে যায়। আসলেই আজকের সকালটা অন্যদিনের মতো নয়। ভিখারীরা এখনো আসেনি। তিনপথের মাথায় কয়টা কুকুর ছাড়া কেউ নেই! আহারে দিন! দুখীটাও এমনিতে ছাই রাখবেন বলে বলে কান ঝালাপালা করে দেয়। আজকাল ও যে কই থাকে কে জানে! আজ যাও এলো, একবার ডেকেই চলে গেল।

নিস্তব্ধ নগরীতে এখন ঐ কুকুরগুলোই আত্মীয়। এক ফালি রুটি ওদের দিয়ে আসার এখনই সময়।

কুকুর খাবারের গন্ধেই উঠে বসেছে। খুশিতে লেজও নাড়ছে। একঝাঁক শালিক কোত্থেকে উড়ে এলো। ঝলমল আকাশে খুশিতে আটখানা যেন। ক্রিং ক্রিং বাজিয়ে কেউ একটা আসছে। ভ্যানে তো কিছুই নেই। কি সুখী সুখী ভাব। এমন সুখী মানুষও আছে এই অতিমারীর মৃত্যুক্ষণে! আবার বিড়িও ফুঁকছে। আকিজ বিড়ি। দশরথ দাদুর দোকানে এই বিড়ি আমি ছোটবেলায় দেখেছি। এমা! জীবনানন্দ যে! সে কীভাবে এখানে! ভুল দেখছি।

চোখের চশমাটাতো ঠিকঠাক আছে। ভুল তো দেখছিনা। তিনিইতো। ময়লা ছেঁড়া একটা পাঞ্জাবি, উস্কোখুস্কো চুল, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। বইয়ের মলাটে শত সহস্রবার আমি তাঁকে দেখেছি। এত পড়েছি, এতবার দেখেছি, ভুল হতেই পারেনা!

মনের কথা সব পড়েই ফেললেন কিনা। মুচকি হাসছেন। ‘কি ভাব? যাচ্ছি সমুদ্রে। খুব তো সবাই মিলে এতদিন জ্বালিয়েছ ওদের। কোনঠাসা হতে হতে এবার বিপ্লবী হয়ে গেল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে ছাড়লোতো। সমুদ্রে নীল ডলফিন খেলা করছে। সোনাঝরা পাতায় ছেয়ে গেছে নাকি চারদিক। লাল কাঁকড়ারা খেলা করছে। কাছিম ডিম রেখে যাচ্ছে পাড়ে। আকাশে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। ঝাঁকবেঁধে সোনালী চিলেরা ফিরছে। পেখম ছড়িয়ে ময়ূর নাচছে। বাঘ সিংহ একসাথে রোদ পোহাচ্ছে। যাচ্ছি তাই দেখতে।’

কিছু বলতেই পারলামনা, চলে যাচ্ছেন। ক্রিং ক্রিং বাজিয়ে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে চলে যাচ্ছেন। পাখিরা সব পাখা ঝাপটে ঝাপটে উড়ে যাচ্ছেনা। তার সাথে দেখা হলো একথা তো কেউ বিশ্বাস করবেনা। মনন তো নাইই! গতকাল রাতে বলে দিয়েছে একজন সাইক্রেটিস্ট দেখাতে হবে। এমন হচ্ছে। পৃথিবীতে এখন অনেক কিছুই হচ্ছে। এমন করে চললে সংসার করা কঠিন। আশেপাশে কেউ থাকলে তাকে সাক্ষী মানতে পারতাম। কুকুরগুলো ছাড়া তো কেউ নেই!

মাথাটা আবার ঝিমঝিম করছে।

একটা সাক্ষী পেলেই বলা যেত মৃত্যুর পর মানুষ ফিরে আসে। কবি এসেছেন।

ঐতো ঐতো দুখীটা আসছে। একটা থালা হাতে বিলাপ করতে করতে আসছে। কিন্তু ওর মাথায় ছাইয়ের বোঝাটা কই গেল। দুখীর চোখদুটো কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। চুলগুলো পিঙ্গল রঙের। শূন্য দৃষ্টি আকাশ ছুঁইয়ে মাঝেসাঝেই থমকে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বাড়িগুলোর করিডোরে।

জানপ্রাণ দিয়ে ডাকছে দুখী। এই বিলাপই আমার মাথাটাকে এলোমেলো করে দেয়। আমি জানি কেউ কেউ এখন জানালার পর্দা টেনে দিচ্ছে। কেউ বারান্দায় থাকলে সরে গেছে। কারো বুকটা হুহু করছে। কেউ আবার আমার মতোই মটকা মেরে পড়ে আছে। কেউ ঘরে খুচরো পয়সা খুঁজছে।

‘এই ধর.. . ’

কেউ একজন রেলিং থেকে একটা কয়েন ছুঁড়ে দিয়েছে। পয়সাটা গড়িয়ে আমার দিকেই আসছে। তার সাথে গড়িয়ে আসছে দুখী।

পায়ের কাছ থেকে পয়সাটা খুঁটে নিয়ে ও আমার দিকে তাকায়। অ্যালুমিনিয়ামের তোবড়ান থালাটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

খালাম্মা দুইদিন ধইরা ভাত খাইনা। কেউ ছাই কিনেনা। কয়টা পয়সা দেননা, ভাইয়ের জন্য দুধ কিনমো।
------------


লেখক পরিচিতি: জয়শ্রী সরকার। জন্ম ১৯৮৪ সালের ২৫শে জুন। নেত্রকোনায়। ছােটবেলা থেকেই তিনি উদীচী পরিবারের একজন। তিনি নৃত্য, নাটক, গণসংগীত ও উপস্থাপনা করে থাকেন। বর্তমানে জেলা উদীচীর আবৃত্তি ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবং হায়দার শেলী স্মৃতি সংগীত বিদ্যানিকেতনের নৃত্য বিভাগের প্রশিক্ষক। সমাজকর্মে আনন্দমােহন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করছেন যা এখনও চলমান। ২০০৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় বইপত্র প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ শূন্যতা।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ