বান্টি ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত আমাদের সাথেই পড়ত। ওর বয়স যখন পাঁচ, ওর বাবা ওকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য এলেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বান্টির স্কুলের মাইনে মকুব করে দিলেন আর ওকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে দিলেন না।
সেভেন আর এইটের মেয়েরা একই ঘরে ক্লাস করত, কিন্তু টিফিনের সময় ক্লাস এইটের মেয়েরা ক্লাস সেভেনের মেয়েদের ধারেকাছে ঘেঁষতে দিত না। সব সময় আলাদা হয়ে নিজেদের মধ্যেই জটলা বলত। আমরা ক্লাস সেভেনের মেয়েরা যখনই ওদের কাছাকাছি যেতাম ওরা আমাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। ক্লাস এইটের মেয়েদের ওপর আমাদের খুব রাগ হত, ভাবতাম আমরা যখন ক্লাস এইটে উঠব, ক্লাস সেভেনের মেয়েদের সঙ্গে কখনোই এমন ব্যবহার করব না।
তারপর আমরাও ক্লাস এইটে উঠলাম। গরমের ছুটির পরে যখন স্কুল খুলল, আমাদেরও সেই একই কাজ করতে হল – যেটা আমরা কখনোই করব না বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। এই তেরো আর চৌদ্দ বছর বয়সটা ঠিক কেমন হয় জানি না! হয়ত এটা হল শৈশব থেকে কৈশোরে পা দেবার সন্ধিক্ষণ। এই সময় মেয়েরা একটা পা শৈশবে রেখে অন্য পা’টা কৈশোরে বাড়িয়ে দেয়।
সেবার গরমের ছুটির সময় পাড়ারই একটা ছেলের কাছে বান্টি পড়া বুঝে নিচ্ছিল। প্রতিদিন টিফিনের সময় বান্টি লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের কাছে ছেলেটার গল্প করত। ক্লাস সেভেনের মেয়েদের, আমরা ক্লাস এইটের মেয়েরা, এখন আর টিফিনের সময় আমাদের ধারেকাছে ঘেঁষতে দিতাম না।
যেদিন বান্টি ওই ছেলেটার কথা বলত না, আমাদের স্কুলের টিফিনের ছুটির সময় মনে হত যেন টিফিনের ছুটিটাই হয়নি।
“আমার তো শুধু ওর সঙ্গে হাসতে আর কথা বলতে ভাল লাগে, এছাড়া ওর সঙ্গে আমার আর কী থাকতে পারে! মাঝে মাঝে এই কথা বলে বান্টি আমাদের এড়িয়ে যেতে লাগল। যতই আমাদের এড়িয়ে যাক না কেন, বান্টির হাবভাব দেখে মনে হত ওর সেই হাসা আর কথা বলা ভাল লাগাটা কণ্ঠ পেরিয়ে ওর হৃদয়েও একটা জায়গা দখল করে ফেলেছে। ফলে প্রায়ই ও আমতা আমতা করতে থাকত আর মুখে কোনো কথাই সরত না।
পাগলিটা একদিন একটা পেন্সিল নিয়ে অঙ্কের খাতার অন্তত কুড়িটা জায়গায় ওই ছেলেটার নাম লিখে ফেলল – ‘রাজু ... রাজু ... রাজু ...’। আমাদের মাস্টারনি ওর খাতাটা দেখে ফেললেন। ক্লাসে তো ওকে কিছু বললেন না, তবে টিফিনের সময় ওকে নিজের কামরায় ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। মনে হল বান্টির কপালে দুঃখ আছে। কিন্তু আমরা তো বান্টির বন্ধু। আমাদের সবারই মন খারাপ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পরে বান্টি যখন বেরিয়ে এল তখন কেঁদে কেঁদে ওর চোখ লাল হয়ে গেছে। খাতায় যেখানে যেখানে রাজুর নাম ছিল, মাস্টারনি রাবার দিয়ে সেগুলো সব মুছে দিয়েছেন।
তারপর ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষা যখন একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল, আমরা মেয়েরাও নিজের নিজের মত আলাদা হয়ে গেলাম। আমাদের স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্তই পড়া যেত। অনেক মেয়েই অন্যান্য স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল। বান্টি গেল সেলাইয়ের স্কুলে।
দু’বছর বাদে আমি বান্টির বিয়ের কার্ড পেলাম। অন্য মেয়েরাও নিশ্চয়ই পেয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি বিয়ের কার্ডে ছেলেটার নামটা দেখলাম, লেখা ছিল – ‘কর্মচন্দ’। কার্ডে ‘রাজু’র জায়গায় যদিও ‘কর্মচন্দ’ লেখা ছিল, তবুও ওটা বিয়েরই কার্ড, সন্দেহ নেই, আর যে কোনো বিয়েতেই অভিনন্দন জানাতে হয়। আমিও বান্টিকে অভিনন্দন জানাতে ওর বিয়েতে গেলাম।
বান্টির হাতে মেহেন্দি, বান্টির বাহুতে অলঙ্কার। আমি বান্টিকে অভিনন্দন জানালাম।
বান্টির সঙ্গে ওই হাসি আর কথা বলা প্রেমের ব্যাপারে কোনো কথা তুলতে চাইনি, কিন্তু একটু পরে ও-ই আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গেল, তারপর বলল –
“আমার একটা জিনিস যত্ন করে রাখতে পারবি?”
“কী জিনিস?”
“একটা রুমাল।”
এই রুমাল কার সেটা জিগ্যেস করার দরকারই বোধ করলাম না। রুমালটা রাজুরই হবে।
“এ আর এমন কী ব্যাপার? রুমালটা তুই নিজের জিনিসের সঙ্গেই তো রেখে দিতে পারিস!”
“কিন্তু ওটার এক কোণে ওর নাম লেখা আছে যে।”
“কার নাম, কে আর জানবে?”
যদি শুধু ‘রাজ’ লেখা থাকত – কেউ দেখলে বা জিগ্যেস করলে বলে দিতাম আমার বান্ধবীর নাম, কিন্তু ‘রাজু’ লেখা আছে যে। রাজু যে মেয়েদের নাম হয় না।”
“কী দিয়ে লেখা?”
“একদিন ও পেন্সিল দিয়ে লিখে দিয়েছিল। আমি ছুঁচ সুতো দিয়ে ওটার ওপর এম্ব্রয়ডারি করে নিয়েছি!”
“তো সুতো তুলে ফেল!”
“তুলে ফেলব? এই কথাটা তো আমার মাথায় আসেনি!” বান্টি লম্বা করে শ্বাস নিল। বলতে লাগল, “তোর মনে আছে, একদিন আমাদের মাস্টারনি রাবার দিয়ে আমার খাতা থেকে ওর সব নামই মুছে দিয়েছিলেন? আর আজ আমি সেভাবেই ওর নাম তুলে ফেলছি।”
মনটা ভারি হয়ে গেল। আমারই সামনে বান্টি ট্রাঙ্ক খুলে সুখস্মৃতির সেই রেশমের রুমালটা বের করে ছুঁচ দিয়ে এম্ব্রয়ডারি করা রাজুর নামটা তুলে ফেলতে লাগল। বান্টিই ওর নামটা এম্ব্রয়ডারি করেছিল। বান্টিরই খাতা থেকে মাস্টারনি রাজুর নাম মুছে দিয়েছিলেন। বিয়ের কার্ডে সমাজ রাজুর নাম লিখতে দেয়নি আর আজ বান্টিই ওর মেহেন্দি লাগানো হাত দিয়ে রুমাল থেকে ওর নাম তুলে দিচ্ছে।
“যাকগে, ছাড় ওসব কথা। তুই তো নিজেই বলতি যে ওটা কেবল ‘হাসি আর কথা বলা প্রেম’...”
“ভাবিনি কোনোদিন, কিন্তু ওই হাসি আর কথা বলতে ভাল লাগার প্রেমই ভেতর পর্যন্ত গেঁথে গেছে। সব আমার রক্তে মিশে আছে।“ বান্টির চোখ ছলছল করে উঠল।
“শুনেছি তোর শ্বশুরবাড়ি নাকি খুব বড়লোক। অনেক পুণ্য করেছিলি নিশ্চয়ই? ওর নামও ত কর্মচন্দ ...” কায়দা করে কথাটা ঘোরালাম।
“নাম থাকলেই কি আর কর্মফল পাওয়া যায়?” বান্টি শুধু এটুকুই বলল।
“মাঝে মাঝে চিঠি লিখবি তো, না রাজরানী হয়ে আমাদের সবাইকে ভুলেই যাবি?”
“ভোলাটা কি এতই সহজ রে!” বান্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তখনও বোধহয় বান্ধবীদের কথা নয়, শুধু রাজুর কথাই ওর মনে পড়ছিল।
“রাজুকে তুই ভুলতে পারিস চাই না পারিস, চিঠি তো আর লিখতে পারবি না! মাঝে মাঝে আমাকেই চিঠি লিখিস, ইচ্ছে হলে রাজুর কথাও লিখিস!”
“ঠিক আছে মাঝে মাঝে মনের বোঝা হালকা করে নেব, কিন্তু একটা কথা।
“কী কথা?”
“তুই কিন্তু ওকে নিয়ে আমাকে কিছু লিখিস না। এরা লোক কেমন তা তো আর জানি না! একেবারে অজ পাড়াগাঁয়েই থাকে। শুনেছি, চিঠিও ওখানে সপ্তাহে দু’বারই যায়। ঠিকানায় জেলা, তহসিল, ডাকঘর, গাঁয়ের নাম, জানি না আরও কত কী লিখতে হয়। হয়ত চিঠিটা আগেই পড়ে নিয়ে তারপর আমাকে দেবে।”
বান্টি শ্বশুরবাড়ি চলে যাবার পর পনেরো বছর কেটে গেছে। প্রথম পাঁচ বছরে আমাকে কিছু চিঠি লিখেছিল। খুব বেশি নয়, তবে প্রতিটা চিঠিই ও মনের ভার লাঘব করতেই লিখেছে। আমি প্রতিবার বান্টির চিঠির জবার দিতাম, তবে ওর অনুরোধ মত কেবল মামুলি খোঁজখবর নেওয়া চিঠিই ওর কাছে যেত। ওর হৃদয়ঘটিত ব্যাপার নিয়ে একটা কথাও থাকত না।
তারপর বছর দশেক ওর কোনো খবর পাইনি, বান্টি আমাকে চিঠি লেখেনি। আন্দাজ করেছিলাম, ও নিজের পরিবারের মধ্যেই ডুবে গিয়েছে। আমিও ওকে কোনো চিঠি লিখিনি। যদি ওর সুপ্ত কোনো বেদনার স্মৃতি উস্কে দিই।
তবে আজ হঠাৎ বান্টির চিঠি পেলাম। জানি না এটা কেমন ধরণের চিঠি! এই চিঠিটা কেবল ওর নিজের মনের কথাই নয় যেন সমগ্র নারীজাতির মনের কথা ফুটে উঠেছে।
মনটা ভারি হয়ে গেল। চিঠির জবাব দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলাম, কারণ লিখলে বেশ দীর্ঘ একটা চিঠি লিখে ফেলতাম, নিজের মনকেও হালকা করতে পারতাম।
ওর পুরনো সব চিঠিগুলো বের করে ফেললাম (মাঝের একটা দুটো চিঠি পেলাম না) আর আজকের চিঠিটাও সামনেই খোলা রইল। একবার সমস্ত চিঠি পড়ে ফেললাম। একজন নারীর মনের কথা ...।
……..!
গ্রামটা যেন কেমনতর! আজ যা করলাম, কালকেও সেই একই কাজ করব! আজ সপ্তাহের কোন বার সেটা খেয়ালই থাকে না! শুধু যখন ডাকপিয়ন চিঠি বিলি করতে আসে, বুঝতে পারি আজ মঙ্গলবার কিংবা শনিবার। সারা সপ্তাহে এখানে দু’বারই মাত্র ডাকপিয়ন আসে, ঠিক যেমন শহরে তেল-তামা ভিখিরি সপ্তাহে দু’বার আসে।
ডাকপিয়ন এলে মনে হয় যেন বলছে, ‘আজ মঙ্গলবার, যার যত তেল আর তামা আছে দান করে দাও’। কিন্তু জানি না এরা তেল তামা কীভাবে দান করে যারা বন্ধুদের আর ভালবাসার লোকদের কাছ থেকে চিঠি পায়। আমি কার চিঠির অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকব?
আমার চিঠির জবাবে দুটো কথা লিখিস, কেমন। চিঠিতে এসব কথা কিছু লিখিস না যেন। শুধু এটুকুই যে তুই আমার চিঠিটা পেয়েছিস। আমি এটার জন্যই ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকব।
তোর
বান্টি
…..!
বিয়ের সময় আমার শ্বশুরমশাইকে দেখেছিলি, ওই যাঁর ধবধবে সাদা দাড়ি ছিল! আমার শাশুড়িকে দেখলে তুই অবাক হয়ে যেতিস। শাশুড়ি তো দূরের কথা, আজকাল ওঁকে কারোর পুত্রবধু বলেও মনে হয় না, একেবারে কাজের মেয়ের মতই দেখায়। বয়সে আমার থেকে তিন কী চার বছরের বড়ই হবেন, কিন্তু শারীরিক দিক থেকে খুবই নরমসরম, ছিপছিপে, চঞ্চল এক হরিণীর মত। হতে পারেন উনি আমার সৎ শাশুড়ি, কিন্তু শাশুড়িই তো। শাশুড়ি না হলে ওঁকে আমার সহেলি বানিয়ে নিতাম।
আজ ছিল মঙ্গলবার। ডাকপিয়নের আসার দিন। মনে হল তোর চিঠি আসতে পারে। আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকপিয়নের অপেক্ষা করতে লাগলাম। শাশুড়িও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন।
ডাকপিয়ন এল। এসে আমাকে একটা চিঠি দিল। আমি শাশুড়ির মুখের দিকে তাকালাম। খুবই বিষণ্ণ লাগল ওঁকে। মনে হল, আজ নিশ্চয়ই কারোর কাছ থেকে ওঁর একটা চিঠি আসার ছিল, কিন্তু আসেনি।
“ভাবী, কোনো চিঠি আসার ছিল তোমার?” ওঁকে বিষণ্ণ দেখে জানতে চাইলাম।
“আমার আবার কার কাছ থেকে চিঠি আসবে?” প্রথমে তো উনি এটাই বললেন, কিন্তু তারপর বলতে লাগলেন, “একটা চিঠি তো আসার কথা ছিল, কিন্তু এল না।”
“কার চিঠি?” আমি আবার জিগ্যেস করলাম।
“ভগবানের চিঠি! আর কার কাছ থকেই বা আমার চিঠি আসতে পারে?” মনে হচ্ছিল উনি কেঁদে ফেলবেন, কিন্তু কাঁদলেন না। কিংবা কাঁদলেন হয়ত, কিন্তু কারোর চোখে ধরা না পড়ার মত কান্না। বুঝলি তো আমরা মেয়েরা কেমনতর কান্না কাঁদতে পারি! মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে আমি জোরে জোরে কেঁদে উঠি আর উনিও জোরে জোরে কেঁদে উঠুন।
তোর
বান্টি
……….!
বিশ্বাস কর, যেদিন থেকে এসেছি, এই সংসারকে কখনোই নিজের সংসার বলে মনে হয়নি। আমি যেন একজন মেহমান। তবে এবার এই সংসারে বাঁধা পড়ে গেলাম। একরত্তি একটা রাজু আমার কোলে এসে আমাকে বেঁধে ফেলেছে। বাড়ির সবাই ওকে দীপক নামে ডাকে।
সন্ধের সময় বেশ ঠাণ্ডা পড়ে যায়। আমি এই লাল রঙের রেশমি রুমালটা ওর মাথায় বেঁধে দিই। লাল রুমালে ওকে আরও মিষ্টি লাগে। ওকে কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।
তোর
বান্টি
……….!
তিন বছর হয়ে গেল আমার রাজুর । মনের কথাটা বলি তোকে? মাঝে মাঝে যখন আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, দেখতে দেখতে ওর মুখটা বড় হয়ে যায়। ওর শরীরটাও বেড়ে ওঠে। ঠিক যেন আমার রাজু পঁচিশ বছরের হয়ে গেছে, আর আমি কুড়ি বছরের। আমি একটা পাগলি, তাই না রে?
আমার রাজু খুব দুষ্টু। এখুনি আমার সঙ্গে খেলছিল। এখন সোজা রান্নাঘরে পৌঁছে গেছে। গরম উনুনে এক গ্লাস জল ঢেলে দিয়েছে। উনুনটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বেচারি শাশুড়ির পুরো দিন চলে যাবে নতুন করে উনুন বানাতে।
আচ্ছা, তোকে একটা কথা বলি। আমার শাশুড়ি যে উনুন গড়েন দেখে মনে হয় ঠিক যেন একটা প্রতিমা খোদাই করছেন। এমন সুন্দর উনুন তুই কখনো দেখিসইনি। উনুন গড়ায় ওঁর খুব শখ। কিছুদিন পরে পরেই, উনুনটা ভেঙ্গে ফেলে আবার নতুন করে গড়েন। যেদিন উনি রান্নাঘরের উনুনটা গড়েন, সেদিন বাইরের উনুনে আমি রুটি সেঁকে নিই। এমনিতে রান্নাবান্নার কাজটা, যথাসম্ভব, উনিই নিজের হাতে সামলান। পনেরো কুড়ি দিন পরে পরে রান্নাঘরের উনুনটা ভেঙ্গে ফেলে নতুন করে গড়েন, সেদিন রান্নাবান্নার কাজে আর হাত লাগান না। উনুন গড়ার ব্যাপারে ওঁর খুব উৎসাহ। প্রতিবার জলে মাটি ভিজিয়ে নিয়ে উনি বসে যান, রান্নাঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। কাদামাটি মাখতে মাখতে গলা ছেড়ে গান গাইতে থাকেন।
এমনিতে আমি ওঁকে গান গাইতে শুনিনি। গানের কথা নাহয় বাদই দিলাম, মন খুলে কথা বলতেও শুনিনি; কিন্তু উনুন গড়ার সময় এমনভাবে গান ধরেন মনে হয় যেন কেউ চরকা কাটার তালে তালে আনমনে গান ধরেছেন। ভগবানই জানেন কী ধরণের ভাবনা ওঁর মনে ঘোরাফেরা করে! ওঁর মা-বাবাও তো ওঁর যৌবনটা কেড়ে নিয়েছেন! হিরের টুকরো একটা মেয়েকে দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে রুপোর দামে বিক্রি করে দিয়েছেন।
সব শেষে দুটো কথা, জলদি চিঠি দিবি।
তোর
বান্টি
.……..!
আমার শাশুড়ি যে গানটা গেয়ে থাকেন তুই সেটার ব্যাপারে জিগ্যেস করেছিলি। পুরো গানটা তো উনি কখনোই গাননি। যখনই উনি গানের একটা কলি ধরেন তখন ঘন্টার পর ঘন্টা সেটাই গেয়ে চলেন।
আজও উনি পুরনো উনুন ভেঙ্গে ফেলে নতুন উনুন গড়তে আরম্ভ করেছেন। রান্নাঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ওঁর গলা শোনা যাচ্ছেঃ
‘আয় রে চন্দা, হাত সেঁকে নে।
বিরহের জ্বালা আমাকে আগুনে
পুড়িয়ে দে।’
আর আমি তোকে চিঠি লিখতে বসে পড়লাম। বাড়ির সামনের উঠোনে বসে আছি। উনি আর কোনো গানের কোনো কলি ধরলেই তোকে জানাব।
দিন পড়ে এল। ওই কলিটাই সারাদিন ধরে উনি গেয়ে চললেন। কতক্ষণ ধরে তো কোনো আওয়াজই শোনা যাচ্ছিল না, থেমে থেমে আওয়াজ আসছিলঃ
‘যদি চাকরি করতে যাচ্ছ তো আমাকে পকেটে পুরে নাও।
রাত নেমে এলে বের করে আমাকে বুকে চেপে ধোরো।’
আরে হ্যাঁ, ওঁর একটা গান আমার মনে পড়েছে। ওই গানটা আজ অবশ্য উনি গাননি, কিন্তু আগে গাইতেনঃ
‘না আপনি খুশির খবর পাঠিয়েছেন
না আপনি চিঠি লিখেছেন!
খুশির খবরটা কার হাত দিয়ে পাঠাই,
কার হাত দিয়ে চিঠি পাঠাই?
লিখবার জন্য কাগজই নেই,
কলমের জন্যও নেই ‘কাহী’
দিলের একটা টুকরো দিয়ে কাগজ বানিয়ে নিলাম
আর আঙ্গুল দিয়ে কাহী১
চোখের কাজল দিয়ে কালি বানালাম
চোখের জলে ভিজিয়ে নিলাম
ছায়া ঢলে যাবার পর চিঠি লিখতে বসেছি
চোখের জলে ভেসে যাচ্ছি।’
রান্নাঘরের দরজা এখনও বন্ধ। বন্ধ দরজা পেরিয়ে আমার মন ওঁর মনের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এসব গানের কোনটাতেই বা ওঁর মনের কথাটা ফুটে ওঠেনি?
তোর
বান্টি
………!
একটা কথা তোকে লিখতে ভুলেই গেছিলাম। কিছুদিন ধরেই না আমার শাশুড়ির হালকা হালকা জ্বর হচ্ছিল। বারে বারে বলা সত্ত্বেও উনি একমুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নিতেন না।
“ভাবী, এভাবে চললে তো ডাকপিয়ন সত্যি সত্যিই একদিন ভগবানের চিঠি নিয়ে চলে আসবে! তুমি নিজেই নিজের সঙ্গে দুশমনী করছ” – একদিন ওঁকে বলেই ফেললাম। জানিস উনি কী বলতে লাগলেন? “তোর মুখ মিঠা করে দেব, সত্যিই যদি ডাকপিয়ন ওঁর চিঠি নিয়ে আসে!” সত্যি বলছি রে, ওঁর কষ্ট দেখে এখন নিজের কষ্টটা নিতান্তই মামুলি মনে হয়।
কতগুলো বছর কেটে গেল! ইচ্ছে করেই তোকে কোনো চিঠি লিখিনি। তবে তোর নতুন শহরের ঠিকানা আমি যোগাড় করে নিয়েছি। জানিস, যখনই তোকে চিঠি লেখার কথা ভাবি, মনে হয় তোকে চিঠি লিখলে কে জানে কোন স্মৃতি এসে আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরবে! তাহলে তো বেশ কিছুদিন নিজেকে সামলাতেই পারব না। হাত থেকে জিনিস পড়ে যেতে থাকবে, সবজি পুড়ে যাবে। এখন সংসারটা আমাকেই সামলাতে হয় কিনা।
এই এতগুলো বছর ধরে আমার শাশুড়ি দড়ির মত পাক খেয়ে গেছেন। চারপাইতে শুয়েও উনি এসবের মধ্যেই হারিয়ে ফেলতেন নিজেকে। গায়ের রঙ একেবারে পেঁজা তুলোর মত সাদা হয়ে গেছিল।
তোর মনে আছে কিনা জানি না, একবার তোকে লিখেছিলাম, আমার শাশুড়ি যখন উনুন গড়তেন মনে হত যেন প্রতিমা খোদাই করছেন। মাঝে মাঝেই পুরনো উনুন ভেঙ্গে ফেলে নতুন উনুন গড়ার ইচ্ছেটা কিন্তু এত অসুস্থতার মধ্যেও চলে যায়নি। আমি ওঁকে বেশি বারণ করতাম না। যেদিন উনি কাদামাটি মাখতে বসতেন, জানি না কোথা থেকে এত জীবনীশক্তি পেয়ে যেতেন!
এই দিন পনেরো আগের কথা, ওঁর রক্তবমি হল। তখন আমি ওঁর বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, উনি নিজেও ছেড়ে দিয়েছিলেন। দিনের বেলা আমার দেওর ডাক্তার ডাকতে গেল (আমার শ্বশুরমশাইয়ের ইতিমধ্যেই স্বর্গবাস হয়ে গেছে), শাশুড়ি আমাকে নিজের কাছে ডাকলেন, বললেনঃ
“আমার একটা কথা রাখবি?”
“তোমার মনে যা আছে, বলে দাও ভাবী!” আমার বুক দুরদু্র করছিল। আমি ওঁর চারপাইতে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগলাম।
“পাগলি মেয়ে! কাঁদছিস কেন? প্রতিটা পল অপেক্ষা ্করে আছি কখন এই প্রাণপাখি শেকল কেটে বেরোবে, কবে আমার আত্মা মুক্তি পাবে!”
“ ভাবী, এসব কী বলছ তুমি!”
“পাগল হয়ে গেলে নাকি? দম বন্ধ হয়ে আসছে...!”
“জানি রে, তাই তো বলছি। এই শেষ বার, বাস্, একবারটি! নইলে ওই পচা ডাক্তারটা এখুনি এসে পড়বে!”
“ভাবী, তুমি দুনিয়ার সব মায়া ত্যাগ করে ফেলেছ। দুনিয়া তোমাকে কখনোই মায়ায় বাঁধতে পারেনি। না তোমার টাকাকড়ির ব্যাপারে কোনও মোহ আছে, না তুমি তোমার জীবনের পরোয়া কর, তবুও তোমার উনুন নিয়ে এত মায়া কেন?”
“উনুনের নিচে আমি একটা জিনিস লুকিয়ে রেখেছি,” – মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শাশুড়ি হাসলেন, তারপর বলতে লাগলেন, “আবার ভেবে নিস না যে উনুনের নিচে আমি কোনো মোহরের হাড়ি লুকিয়ে রেখেছি।”
“ভাবী, তোমার মন আমার কাছে লুকোনো নেই। যে সংসার তোমার মন ভরিয়ে দিয়েছে, সেই সংসারে তুমি মোহর কেন লুকিয়ে রাখবে? তাছাড়া আমারও মোহর নিয়ে কোনো মোহ নেই!”
“আমি সেটা জানি রে, তাই তো তোকে ...”
“তোমার মনে যা আছে নিঃসঙ্কোচে বলতে পার, ভাবী! আমি তোমার পুত্রবধু, তোমার মেয়ে, আর তোমার সহেলিও তো হই।”
ভাবীর চোখে জল, তবু মুখে বলতে লাগলেন, “তোকে কখনো কখনো বলতাম না আয় তোর জন্য একটু শস্যদানা ভেজে দিই, আমি তো খুব ভাল একজন ভাটিয়ারিন।”
“হ্যাঁ, ভাবী, মনে আছে। তবে আমিও ভাবতাম তুমি মজা করছ। তুমি ভাটিয়ারিন হতে যাবে কেন?”
“না রে, বান্টি, আমি সত্যিই একজন ভাটিয়ারের ভাটিয়ারিন। তুই যখন উনুনটা ভাঙ্গবি, নিচের ইটটাও উপড়ে ফেলিস। কাঁচা মাটি দিয়েই লেপা আছে।”
“নিচে কী আছে?”
“একটা ছাঁকনি – আমার ভাটিয়ারিন হওয়ার নিশানি আর তার সাথে একটা আংটি – ওটাও সেটারই নিশানি।”
তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে ভাবী বললেন যে ওঁর গাঁয়ের একটা ছেলের সঙ্গে ওঁর ভালবাসা ছিল। মোতি ছিল ওর নাম। মা-বাবার নকল মোতিই বেশি পছন্দ হল। ওঁরা মেয়েকে কানাকড়ির দামে বেচে দিলেন। বিয়ের কিছু মাস পরে মোতি মনের দুঃখে ওঁর শশুরবাড়ির গ্রামে এসে ভাটিয়ারের কাজ করতে আরম্ভ করল।
আমার শাশুড়ি (ওঁর নাম ছিল রুপো) শস্যদানা ভাজতে গেলেন তখন মোতির ভাট্টা দেখে সেখানেই ভাজতে লেগে যান।
মোতি যে কাজটা করেছিল, তাতে কী লাভ হয়েছিল ওর? আর রুপিরই বা কী লাভ হল? রুপী একদিন ওর পায়ের ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমার মাথার দিব্বি থাকল, তুমি নিজের এই অবস্থা কোরো না। শস্যদানা ভাজলে তার থেকে আর অঙ্কুর বেরোয় না।” সেদিনই রুপী ওর ভাট্টা ভেঙ্গে দেয়। কড়াইটা তুলে আনতে পারেনি, তাই ছাঁকনিটা নিয়ে এল আর কড়া আদেশ দিয়ে এল যেন ও নিজের গাঁয়ে ফিরে যায়।
মোতি ওর দিব্বি কাটতে পারেনি আর ওর আদেশও অমান্য করতে পারেনি। স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওর আংটি রুপোকে দিয়ে দিল আর তার পরের দিন কোথায় যে চলে গেল কে জানে। ভাটিয়ার তো ও কিছুদিনের জন্য হয়েছিল, কিন্তু রুপি সারা জীবনের জন্য ভাটিয়ারিনই থেকে গেল। সেই ছাঁকনি আর আংটি উনি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন। আংটিতে মোতির নাম লেখা আছে। কোথায় লুকোনো যায়! দুটো জিনিসই উনি মাটির নিচে পুঁতে দিলেন। আর ওপরে নতুন উনুন গড়ে নিলেন।
সারাদিন উনুনের পাশে বসে রুটি সেঁকতেন যাতে মনের কথা বলে যেতে পারেন। কখনো কখনো মন খুবই খারাপ হয়ে যেত। উনি তখন উনুনটা ভেঙ্গে ফেলতেন, নিশানিগুলো বুকে চেপে ধরতেন, আর কাঁদতেন আর গান গাইতেন। তারপর আবার নিশানিগুলো মাটির আশ্রয়ে ফিরিয়ে দিতেন, আর নতুন উনুন বানিয়ে সেটা দেখাশোনার করবার জন্য বসে থাকতেন।
ভাবীর এই গল্পটা বলা শেষ হতেই ওঁর শেষ নিঃশ্বাস পড়ল। আরও একবার রক্তবমি হল, ওঁর প্রাণপাখি খাঁচা ভেঙে আকাশে উড়ে গেল।
যত বছর ভাবীর প্রাণপাখি খাঁচায় বন্দী ছিল, মোতির আংটি কখনো আঙ্গুলে পরেননি। যখন ওঁর আত্মার মুক্তি হল, আমি উনুনের নিচে খুঁড়ে আংটিটা বের করে ওঁর আঙ্গুলে পরিয়ে দিলাম।
ওঁকে স্নান করিয়ে দেওয়াটা আমাকেই করতে হল, ওঁর দেহে কাফন বিছিয়ে দেওয়ার কাজটাও আমিই করলাম। ওঁর হাতে পরে থাকা আংটিতে কেউ মোতির নামটা পড়ে ফেলবে এটা নিয়ে আমার মনে কোনো ভয় ছিল না। তাছাড়া পরের দিন যখন সবাই ওঁর অস্থি নিয়ে আসবে তখন তো ওই আংটি থেকে মোতির নাম মুছেই যাবে।
ছাঁকনিটা এখনো আমি উনুনের নিচেই রেখে দিলাম। সামনের মাসে আমার মা হরিদ্বার যাচ্ছেন, চারদিনের জন্য আমিও ওঁর সঙ্গেই যাব, আমার স্বামীকে এই ব্যাপারে রাজি করিয়ে ফেলেছি। ওখানে ভাবীর অস্থি বিসর্জন দিয়ে দেব। এরপরের ব্যাপারটা তো তুই বুঝেই গেছিস। কীভাবে ট্রাঙ্কে ছাঁকনি রেখে নিয়ে যাব, আর ওঁর অস্থি ছাঁকনিতে রেখে বিসর্জন দেব।
ও আমার সখী! আমার মনের প্রাণের সখী রে! আজ যদি তোকে না লিখি তো আর কাকে লিখি বল? আমিও আজ আমার স্মৃতির ভাণ্ডার তিল তিল করে উজাড় করে দেখেছি, সুখের অনুভূতি মাখানো একটা রুমাল ওখানে যত্ন করে রাখা আছে। আর কোনো বান্টিই হোক, কী কোনো রুপোই হোক, মনের গহীনে কোনো রুমাল বা কোনো আংটি যদি তাকে লুকিয়ে না রাখতে হত!
আমাদের মত অভাগিনীরা, যারা কাউকে না কাউকে ভালবাসে ফেলেছি, জন্মের মত ভাটিয়ারিন হয়ে গেছি। বিরহের আগুনে আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস শস্যদানার মত ভাজতে থাকি আর স্মৃতির ছাঁকনিতে বছরের পর বছর ধরে বালি ছেঁকে যাই।”
তোর
বান্টি – এক ভাটিয়ারিন
(হিন্দী থেকে বাংলা ভাষান্তরঃ উৎপল দাশগুপ্ত)
টীকাঃ
১ কাহী – খাগড়া, যা দিয়ে আগেকার দিনে কলম বানানো হত।
লেখিকা পরিচিতিঃ অমৃতা প্রীতম (৩১ অগাস্ট ১৯১৯ – ৩১ অক্টোবর ২০০৫) – একজন কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার। পঞ্জাবী পরিবারে জন্ম। ১৯৩৬ সালে প্রীতম সিং-এর সঙ্গে অমৃতা কৌরের বিবাহ হয়, এবং নিজের নতুন নামকরণ করেন অমৃতা প্রীতম। ভারতীয় সাহিত্যের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন অমৃতা প্রীতম।
তিনি অজ্জ আখাঁ ওয়ারিস শাহ নূ নামক একটি বিষাদধর্মী কবিতা রচনা করেন, যেখানে ভারতের বিভক্তির সময়কার বিপর্যয়ের প্রতি তার ক্ষোভ ও রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ঔপন্যাসিক হিসেবে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হল পিঞ্জর নামক একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যেখানে তিনি পারো নামক একটি স্মরণীয় চরিত্র সৃষ্টি করেন, যাকে তিনি নারীদের বিরুদ্ধে অত্যাচার, মানবতা লঙ্ঘন এবং অস্তিত্ববাদের প্রতি সমর্পণের বিরুদ্ধে একটি মূর্ত প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলেন। ২০০৩ সালে এই উপন্যাস থেকে পিঞ্জর নামক একটি হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
মূলত, মাতৃভাষা পঞ্জাবীতেই ওঁর সাহিত্যচর্চা। কিন্তু ওঁর লেখা ভারতের বিভিন্ন ভাষায় এবং ইংরেজিতেও অনুবাদ হয়েছে। ভারত এবং পাকিস্তান দুটি দেশেই ওঁর রচনা সমানভাবে সমাদৃত।


0 মন্তব্যসমূহ