আকাশে চাঁদ, তবে পূর্ণিমা নয়, অর্ধেক ভাঙা। ছড়ানো নয়, খাপছাড়া। আনকোরা চিত্রকরের বেখেয়ালির জন্য চাঁদের রং চাঁদের সীমানা ছাড়িয়ে নিচে বেয়ে বেয়ে টুপ করে জানালার ধারে বসা বাচ্চাটার দুধভাতে পড়ে যায়। বাচ্চাটা তা-ই খায়।
দুধের সর আজ এই এত্ত পুরু হয়েছে। আম্মু দুধ জাল দিতে বসিয়ে বাবার রুমে এই যে ঢুকলো, আর বের হবার নামগন্ধ নেই। দরজায় শব্দ হয়। দড়াম। গ্লাস ভাঙে। ঝনঝন। গালি শোনা যায়। কুত্তার বাচ্চা। দড়াম দড়াম আর ঝনঝন শব্দের তীব্রতায় দুধ উপচে চুলায় পড়ে যাওয়ার শব্দ আম্মুর কানে যায় না।
অন্যদিন আম্মু খাইয়ে দেয়, দুধভাতে কলা থাকে। আজ একটাও নাই। আম্মু দুই মিনিটের জন্য এক প্লেট ভাতে অবশিষ্ট দুধ ঢেলে পাতে একটা চামুচ ঢুকিয়ে বাচ্চার মাথায় পাপা দিয়ে বলে, আজকে আমাকে ছাড়াই খাও বাবা প্লিজ?
লক্ষ্ণী বাচ্চার মত মাথা দুলিয়ে অনুরোধ রক্ষা করলেও গলা দিয়ে খাবার নামে না। আম্মু ছাড়া ও খেতে পারে না। আম্মু ছাড়া আর কারো হাতে খায়ও না। রাতে সে দুধভাত ছাড়া আর কিছু খায় না। আদর করে একদিন নানু খাইয়ে দিতে চাইলে দুধভাতে কলা মাখানর সময় নানুর কালো হাত দেখে বাচ্চাটা চেঁচিয়ে ওঠে, সাপ!
-ধুর বেটা, সাপ না। নানুর হাত এডি।
বাচ্চা মানে না। অগত্যা আম্মুকেই খাইয়ে দিতে হয়। আর নানু হিস হিস করে অভিশাপ দেয়, দেইক্কনি, তোমার বউ কুতকুতা কালা হব।
বিস্বাদ, কলাহীন দুধভাতে স্বাদ আনতে চকলেট মেশানোর কথা ভাবে সে। ফ্রিজ থেকে নাটেলার বোয়াম নিয়ে এসে মেশানোর জন্য বসে। চেষ্টা করে বাবার রুম থেকে আসা চিৎকার চেঁচামেচিতে কান না দিতে। কিন্তু তা আর হলো কই? কানের পর্দা ছিদ্র করে ঢুকে একেকটা গালি। এক চামচ চকোলেট বের করে দুধভাতে সে যখন মেশাতে যাবে, ঠিক তখনই বাবার রুমের দরজা থেকে এশট্রে উড়ে এসে দেয়ালে লেগে খান খান হয়ে যায়। সিগারেটের পুটকি (আম্মু এই শব্দটা ব্যবহার করতে না করেছে) আর ছাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সারা রুমে।
একটা সিগারেটের পুটকি ওর দুধভাতে এসে পড়ে।
ইয়াক! সিগারেটের ছাই ওর কাছে হাগুর চেয়েও ঘেন্না লাগে।
ওইদিকে বাবা হুড়মুড় করে দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যেতে উদ্যত হয়। মাঝরাতের নৈঃশব্দতাকে কুচি কুচি করে ভাঙে বাবা আম্মুর আর্তনাদ। আম্মু গিয়ে বাবাকে ধরে, সিনক্রিয়েট না করতে মিনতি করে মাঝরাতে, কিন্তু তীব্র রাগে গর্জে ওঠে মুখে ফেনা তোলা বাবাকে সাধারণ এই আকুতি পোষ মানাতে পারে না। দরজার চাবি চাওয়ার পরেও আম্মু না দিলে হাতের কাছে পাওয়া মেডিকেলের ভারী মোটা বই দিয়ে ধাম ধাম করে মারতে থাকে আম্মুর মাথায়।
আম্মু ধপাস করে বসে পড়ে। বাচ্চাটা চেয়ে থাকে। এই দৃশ্য সে আগেও দেখেছে, তাই তার মধ্যে কোন ভাবান্তর হয় না। তবে স্পাইডারম্ম্যানের মতো জাল ছুড়তে ইচ্ছে করে বাবার হাতের দিকে, কেননা বাবাকে সরাসরি আটকানোর বল কিংবা স্পর্ধা – কোনোটাই তার নেই। যখন সে বড় হবে, বাবার সমান লম্বা হবে, সেইদিন আটকাবে বাবাকে। আলমারি থেকে খাট, আর খাট থেকে আলমারিতে লাফানোর সময় আম্মু এসে বকা দিলে মামাকে সে বলতে শুনেছিল, থাক না। করতে দাও, বড় হলে কি আর এই নির্ঝঞ্জাট নিরুপদ্রব জীবন পাবে? কথাটা মামা বলেছিল মারাত্মক উদাসীনভাবে, আর তাকে জিজ্ঞেস করেছিল মামা, কী রে? বড় হতে চাস? ও মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বলেছিল, কিন্তু কারণ বলেনি। ‘নির্ঝঞ্জাট নিরুপদ্রব’ জীবন ছেড়ে বড় হতে চাওয়ার জন্য এর থেকে বড় কারণ আর কী-ই বা হতে পারে?
কিন্তু জালের কাজ আর ও বড় হবার আগেই অঘটন ঘটে যায়। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ চলে সেকেন্ডর ব্যবধানে, কিন্তু এই দৃশ্যটিই এমন শক্তভাবে গেড়ে বসে তার মস্তিষ্কে, সেই তার ওপর স্মৃতির পলি কোনোভাবেই প্রলেপ ফেলতে পারে না। সুইয়ের মতো গেঁথে থাকে প্রতিটা দৃশ্য, আর তার থলথলে কোমল হৃদয়টাকে গ্রাস করে ফেলে কতগুলো কাঁটা। অন্তর যেন সজারু বনে যায়। কিন্তু সজারুরও তো নরম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে, কাঁটাগুলোর কল্যাণে বাচ্চাটার কোনদিন কোমল অন্তরটাকে দেখানো হয়ে ওঠে না। ভয়ঙ্কর এই রাতের প্রতিটা দৃশ্য নেগেটিভের মত ভেসে ওঠে তার চোখে, যখনই সে শরতের সাদা মেঘের দিকে তাকায়। ভাসে, আম্মুর হাতে চাবি ছিনিয়ে নিতে চায় যখন বাবা, আম্মু আঁচড় মেরে দেয় বাবার চোখে, বাবার চোখ ডিমের মত ফক করে গলে যায়।
- কুত্তার বাচ্চা আমার চোখটা গালায়ে দিছে রে।
ভয়ানক আতঙ্ক আর সন্ত্রস্ত দেখায় তাকে। বাবার হাতের ফাঁক ফোকর দিয়ে হাফ বয়েল্ড ডিমের মত কুসুম বেড়িয়ে আসছে যেন-বা। কেবল হলুদ কুসুমকে প্রতিস্থাপন করে লাল রক্ত, সাথে সাদা চোখ। কেন যেন বাচ্চাটার হুট করে মনে পড়ে, জিটিএতে নির্বিচারে মানুষ খুন করা পাঁচ বছরের বাচ্চার জন্য উপযুক্ত না, এই অজুহাতে প্লেস্টেশন টু এর ক্যাসেট ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিল বাবা।
আম্মু ভয়ানক চিৎকারে কেঁদে ওঠে বাবাকে হেল্প করতে চাইলে বাবা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়, চাবি দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়, আর আম্মুর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। এখন মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়া শুনে আমাদের কল্পনা হয়তো অপমানেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু বাচ্চাটাকে বাক্যটা ব্যাখা করতে বললে সে বলবে ভয়াবহ সেই রাতের কথা যেই রাতে দরজায় বাড়ি লেগে আম্মুর কপালের মাঝ বরাবর ফেটে যায়, আর সিদুরের মত রক্ত এক লাইন বরাবর বেড়িয়ে আসে হুহু করে।
সীমাহীন রাতের প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা বাচ্চাটার মাথায় ভেঙে পড়ে। সাথে তাকে ঘিরে ধরে বিহবলতা আর হতভম্বতার চাদর। কিংকর্তব্যবিমূঢ় এই পরিবেশকে মনে হয় যেন অন্য কোন গ্রহ। শরীরের সমস্ত এটম যেন ছোটাছুটি করে, বেরিয়ে আসতে চায় ফেটে। আম্মু ছাড়া ও খেতে পারে না। ধরণি তাকে টেনে ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে দশগুণ জোরে। পা দুটো, আর বুক এত ভারী লাগে যে ওই জায়গাতেই শুয়ে পড়তে মন চায় তার। আম্মু ছাড়া ও খেতে পারে না। কেতলির মতো শিষ বাজে কানে অনবরত, আর তা ক্রমশ কান ছিদ্র করে মস্তিষ্ক বেয়ে ওঠে। আম্মু ছাড়া ও খেতে পারে না। চোরাবালিতে পা টেনে টেনেই আম্মুকে গিয়ে ধরে সে, কিন্তু আম্মু মাথায় এক হাত চেপে ধরে আশ্বস্ত করে তাকে, ঠিক হয়ে যাব আম্মু, বাবাকে ডেকে আনো যাও। আম্মুর হাত চুয়ে রক্ত পড়ে।
বাচ্চাটা আশ্বস্ত হয় না, আম্মুর কপাল বেয়ে ঝরনার মত রক্ত গড়িয়ে পড়বার হররে কারেন্টের তারে বসে থাকা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট বানরের মত থম মেরে যায়। তবে অগত্যাই বাবাকে ডেকে আনার এক এডভেঞ্চারে বেড়িয়ে পড়ে সে, আর মনে পড়ে বিকেলে ছাদে যাওয়ার জন্য তাকে একদিন বাথরুমে আটকে রাখা হয়েছিল ঘড়ি ধরে বিশ মিনিট (পরেরবার একই ভুল করলে এর দৈর্ঘ্য হবে তিরিশ)। বিশ মিনিটই তার মনে হয়েছিল অনন্তকালের মত, ডিগবাজি খাচ্ছিল অন্ধকারে, শূন্যতায়। ৫ বাই ৬ ফুট বাথরুমের দেয়াল চেপে ধরছিল চারপাশ থেকে, সাথে দেয়ালগুলোর মধ্যে ছিল ড্রিলিং মেশিন। বিকেলে একলা ছাদে যাওয়া নিষেধ যার, বারান্দা দিয়ে উঁকি মেরে সামনের মাঠে ছেলেদের ক্রিকেট খেলতে দেখা যেই বাচ্চার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, সেই একই বাচ্চা এখন মাঝরাতে বেরিয়ে পড়বে বাবাকে খুঁজতে, ফ্ল্যাট থেকে ফ্ল্যাটে, বিল্ডিং থেকে বিল্ডিং-এ, ছাদ থেকে ছাদে। ভাবতেই রোমাঞ্চ লাগে তার। ঐদিকে আম্মুর মাথা দিয়ে গড়্গড় করে রক্ত পড়ার কথা ভেবে ভেতরটা কুঁকড়ে আসে যেন। বাবার চোখের কথা ভেবে নাগরদোলার মত চক্কর দেয় মাথা।
দরজার বাইরের পরিবেশ বাচ্চাটার অপরিচিত। কারেন্ট নাই, আলোহীন। বিল্ডিং এর কাজ এখনো কমপ্লিট হয়নি, বাসায় ওঠার সময় মালিক বলেছে এক মাসের মধ্যে রেলিং লাগিয়ে দিবে। মালিকের ক্যালেন্ডারে গলদ আছে বোধহয়, বাচ্চাদের ক্যালেন্ডারের তো ছয় পাতা উলটে গেল বাসায় ওঠার পর। মাঝরাতে মফস্বলের নিঃশব্দ নিগূঢ় অন্ধকারে বাবা কালো টিশার্ট পরে এক চোখ ধরে কোথায় হারিয়ে গেছে, তা ও আঁচ করতে পারে না। আবার আম্মুর কথা কল্পনা করে ছ্যাৎ করে ওঠে ও, আর বাবাও না যেন এক চোখ দিয়ে কতটুকুই বা দেখতে পাচ্ছে। ওইতো দেখা যায় জোনাক পোকা, ওকে বলে বাবার কাছে নিয়ে যেতে। জোনাকিও ঠাহর করে না, সাথে সাথে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে। কিন্তু সে কীভাবে বুঝবে বাচ্চাটার বিড়ম্বনা, ওর তো আর রেলিং বেয়ে নামতে হয় না। বাচ্চাটা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এক পা এক পা করে নামতে থাকে। হারিকেনের মত নিতম্বে বাতি জ্বালিয়ে তার পথপ্রদর্শন করে একটা জোনাকি।
এক পা করে পা নিচে ফেললে জোনাকির সংখ্যাও বাড়ে। এই যেমন এক পা, জোনাকি একটা, আবার ফেলে পা আরেকটা, কোত্থেকে যেন জোনাকিও উদয় হয় নতুন এক। সব জোনাকি যাচ্ছে কোথায় যেন, তাদের অভিপ্রায় বাচ্চাটার মত তাদের বাবাকেই খোঁজা হয়তো। একটা একটা জোনাকি বেড়ে যখন এক ঝাঁক হয় জোনাকির সংখ্যা, এত আলোকিত করে ভারী কম্বলের মত ঢেকে থাকা অন্ধকারকে যে মনে হয় আগুন লেগেছে সেই চাদরে, তখন সে বাবার কাছে পৌঁছায়। ততক্ষণে সে খাপছাড়া চাঁদের আলোর নিচে এসে পড়ে, জোনাকিদের প্রয়োজন ফুরোয়। ওইতো বাবা শুয়ে আছে সোনালু গাছের নিচে। চাঁদের আলো সোনালু গাছে তার সকল আলো ঢেলে দিচ্ছে যেন, আর সোনালুর হলুদ ফুল ঝরছে একে একে বৃষ্টির মত বাবার চারপাশে। জোনাকি গুলোকে ধন্যবাদ দেয় সে, কিন্তু জোনাকিরা তার পিছু ছাড়ে না। বরং তারা যায় তার আগে আগে, সে বাবার কাছে পৌঁছানর আগেই তারা পৌঁছে যায় বাবার কাছে, আর দলে দলে ঢুকে যায় বাবার খালি অক্ষিকোটরে।
জোনাকিদের উপচে পড়া ভিড়ে বাবা চোখের আড়ালে চলে যায় তার। সোনালু গাছ থেকেও পাতা ঝরে অঝোরে, চোখের সামনে পুরো গাছ খালি হয়ে যায়। আগুনের ফুলকির মতো দৌড়ায় জোনাকিরা, যতক্ষণে তাদের নৃত্য থামে, বাবা আবার কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বাবাকে জোনাকিরা নিয়ে যায় তাদের সাথে করে।
কোথায় নিয়ে যায়?
একবার ঝগড়ার মধ্যেই বাবা ওর জন্য এনেছিল এত্তএত্ত খেলনা, সাথে এনেছিল একটা জাম্বুরা। জাম্বুরা ও আগে দেখেনি। সবুজ এই ফুটবলের ভেতরে কী? কৌতুহলে নিশপিশ করে ওর হাত পা। কেটে দেখার সংকল্প করে, কিন্তু জাম্বুরা কাটতে গিয়ে কোনোভাবে হাত কাটলে যে ওকেও কেটে জাম্বুরার মত কুচিকুচি করে ফেলবে আম্মু, এই জ্ঞানটা ওর আছে। তাই সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছিল আম্মুকে, আম্মু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে বিছানায় শুয়ে। আমাদের বাচ্চার বোধবুদ্ধি ভালো। আর যাই হোক, আম্মু কাঁদার সময় ও জাম্বুরা কেটে দিতে বলবে না। জাম্বুরাটা ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখে ও। আম্মু স্বাভাবিক হলে কেটে দিতে বলবে।
পরদিন রাতে বাচ্চাটা আবিষ্কার করে সে নানুবাড়ির রাস্তায়, ঘুমের মধ্যে গাড়িতে তুলে কখন নিয়ে আসা হয়েছে তাকে, তা সে জানে না। ঘুম থেকে উঠে ওর মনে পড়ে জাম্বুরাটা ফ্রিজে। বাবার আনা জাম্বুরাটা নষ্ট হবে, এই ভেবে জুড়ে দেয় কী কান্না!
আম্মু মাঝরাস্তাতেই গাড়ি ফেরায়।
বাচ্চাটার জাম্বুরার কথা মনে হতে থাকে খুব।
বাচ্চাটার বুক ফেটে কান্না আসে।
কিন্তু আম্মুর কথা ভেবে কান্না আটকে রাখে। আপাতত সব কান্না চেপে রাখে ফুসফুসে। ততক্ষণে কারেন্ট এসছে। এবার আর এক পা এক পা করে না, দৌড়েই ওঠে সে ওপরে, যা হবে দেখা যাবে।
কিন্তু ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখে আম্মু নাই। দরজার পাশে আম্মু বসেছিল যেখানে, সেখানে দুয়েক ফোঁটা রক্ত। রক্তের ছাপ দেখে এই রুমে খুঁজে, ওই রুমে খুঁজে, বারান্দায় খুঁজে, রিডিং রুমে খুঁজে, কিন্তু আম্মুকে সে পায় না কোথাও। বুকশেলফের ফাঁকে খুঁজে, ডাইনিং টেবিলের নিচে খুঁজে, বারান্দায়, স্টোর রুমে খুঁজে। নাই, আম্মু নাই।
অবশেষে খুঁজে বাথরুমে, কিন্তু বাথরুমে ঢুকে না। বাথরুমে ঢুকলে কী দৃশ্য যে অপেক্ষা করছে তার জন্যে, সেটা দেখার সাহস তার নাই। সে শুধু দেখে, বাথরুম থেকে রক্তের সাথে ভেসে ভেসে ওই খেলনা হাসটা আসে, যেটা আম্মু ওকে কিনে দিয়েছিল কোনো এক বিষণ্ন দিনে চুক্তি করে। যখন আম্মুর মুখে সদয় একটা হাসি ছিল, কিন্তু চোখগুলো কাঁদতে কাঁদতে এতই ফোলা ছিল যে, আম্মুর তাকাতে হচ্ছিল খুব কষ্ট করে। চুক্তিটা ছিল এই, বাবা আম্মুর কাছে তো এত টাকা নাই, তাও তোমাকে ওই কিউট হাসগুলো কিনে দিব হ্যাঁ? ওইযে বাচ্চা থাকে যে পিঠে? কিন্তু প্লিজ আমার সাথে নানুবাড়ি চলো এবার? প্লিজ, বাবা?
হাসের পিঠের বাচ্চাগুলা হারিয়ে গেছে সেই কবে, শুধু তার মা আছে। সেই মা বাথরুম থেকে বের হওয়া রক্তে ভেসে ভেসে চলে যায় দুধভাতের কাছে, আর বাচ্চাটা দেখে দুধভাতেও রক্ত পড়ে আছে ফোঁটা কয়েক।
সে-ও চলে যায় দুধভাতের কাছে। বসে পড়ে। আর রক্ত ভালো করে কলা ছাড়া দুধভাতে মিশিয়ে নেয় অগত্যাই। রক্ত মিশে দুধভাতে টকটকে লাল রুপ নেয়, পাতের কোনে একটা সিগারেটের পুটকি পড়ে আছে।
কী আর করা, বাচ্চাটা তা-ই খায়।
----------
লেখক পরিচিতি: স্পন্দন তাহসান লেখক, অনুবাদক, শিক্ষার্থী। পড়াশোনা করছেন মিডিয়া নিয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। 'মৃতরা কি জানে, তারা মৃত?' সহ তার আরো দুটি প্রকাশিত বই রয়েছে।


0 মন্তব্যসমূহ