হামিদার গলা থেকে একটি আর্তচিৎকার বেরিয়ে আসে। ও চোখ বন্ধ করে ফেলে; শরীর কাঁপতে থাকে যেন এক্ষুণি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। ওর মনে হচ্ছে মেরুদণ্ডের উপর নিচ বেয়ে ঠান্ডাস্রোতের জোর কাঁপুনি দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। হামিদা মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করে আর ছুটে বাড়ি গিয়ে ওর স্বামীকে নিয়ে ওইজায়গায় ফিরে আসে।
রশিদ পাগলির নাড়ি পরীক্ষা করে কিছু একটা বুঝতে চাইছিল। তবে এটার কোন দরকার ছিলনা। কারণ ওর মুখে স্পষ্টত মৃত্যুর ছাপ দেখা যাচ্ছিল। যদিও পাগলির সন্তানটিকে মৃত্যু গ্রাস করতে পারেনি। আদ্যশক্তির প্রাণপ্রাচুর্যে বাচ্চাটির হৃৎস্পন্দন ছিল সতেজ সক্রিয়। বাম হাতের আঙ্গুলগুলো সে পরম আয়েসে চুষে খাচ্ছিল।
হামিদা সঙ্গে আনা একটি পুরনো চাদর দিয়ে পাগলির মৃত দেহটিকে ঢেকে দেয়।
রশিদ অনুচ্চ স্বরে “পরম দয়ালু আল্লাহর নাম” বলে বাচ্চাটির নাড়ি কেটে বেঁধে দেয়। নিজের ওড়না দিয়ে বাচ্চাটিকে ভালো করে জড়িয়েমুড়িয়ে হামিদা ওকে ঘরে নিয়ে আসে।
ভোরের কুজ্ঝটিকা মাখা হাওয়ার মতো খবরটি সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। মহিলারা আটা মাখা বাসন ফেলে, জ্বলন্ত উনুন ছেড়ে দ্রুত হামিদার বাড়িতে চলে আসতে থাকে। এদিকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার জামাকাপড় পরিয়ে বাচ্চাটিকে খাটে শুইয়ে রেখেছে হামিদা। দেখতে তুলোর পশমের মতো নরমআদর এবং সুন্দর লাগছে। গরম দুধে কাপড় ভিজিয়ে তার শেষ কোণটি একটু পর পর বাচ্চাটির মুখে পুরে দিলে সে চুষে চুষে খেয়ে নিচ্ছে। ছোট্ট জাভেদ আপনজনের অধিকার নিয়ে বাচ্চাটিকে ভালো করে দেখছিল।
‘মহান আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন হামিদা !’
‘অশেষ ধনসম্পদ দিয়ে তোমার ঘর পূর্ণ করে দিন পরমদয়ালু আল্লাহ!’
‘তোমার সন্তানরা সুস্থদেহে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুক !’
‘প্রিয় হামিদা তুমি আল্লাহর দৃষ্টিতে অশেষ পূণ্য অর্জন করেছ বোন !’ গ্রামের মহিলারা এভাবে হামিদাকে প্রচুর আশির্ব্বাদ এবং আন্তরিক শুভেচ্ছায় ভরে দিল। তারা সবাই হামিদার এমন দয়ালু কাজের জন্য প্রাণভরে প্রশংসা করে যে যার কাজে বাড়ি ফিরে গেল।
ওদিকে পাগলির লাশটিকে গোর দিয়ে ফেললো গ্রামের কয়েকজন ভক্ত লোক।
সন্ধ্যায় হারিকেনের কাচ পরিষ্কার করে রশিদ আলো জ্বেলে দিলে বাচ্চাটি চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছিল। আলো দেখে বিহবল হয়ে পড়েছে সে। হামিদা গভীর মনোযোগ দিয়ে বাচ্চাটিকে দেখছিল আর নিজের মনে প্রশ্ন করছিল, পশুর চেয়েও অধম লোকটা কি করে পারল পাগলির অই শীর্ণতপ্ত দেহটিকে ভোগ করতে! আচ্ছা পাগলি কি স্বেচ্ছায় এই কাজ করতে রাজী হয়েছিল নাকি ওকে জোর করে ধর্ষণ করা হয়েছিল? ওই বদ্মাশ লোকটা কি বুঝতে পেরেছিল, আশ্রয়হীনা অসহায় পাগলির সাথে করা তার কুকর্মটি কত বড় মাপের অপরাধ? সে কি জানত, ভাগ্যহীনা ওই পাগলির গর্ভে যে বীজ সে রোপন করল তার ভবিষ্যৎ কি হবে? এমনকি হয়ত হতভাগী পাগলি নারীটিও জানত না, সে একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দিতে চলেছে। আহারে, সে কি করে একদম একা এই গর্ভযন্ত্রণাকে সহ্য করেছিল? এই গ্রামের কোন ধাত্রীর মনে কি পাগলির জন্য সামান্য মমতা জেগে উঠেনি? নিশুতি রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে পাগলির প্রসববেদনার যন্ত্রণাক্ত চিৎকার হয়ত হারিয়ে গেছিল নিঃসীম শূন্যতায়। পাগলিকে হয়ত খোলা আকাশের নিচে, ঈশ্বরের পাঠানো জোরালো বাতাসের সাথে মরণপণ যুদ্ধ করতে হয়েছে। ব্যথায় কুঁকড়ে হিম ঠান্ডা শক্ত মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে মেয়েটি হয়ত অনেক কেঁদেছে ! কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম যে বড় অমোঘ, অক্ষয়। তাই তো জন্মদাত্রী মায়ের সমস্ত ব্যথাবেদনাকে উপেক্ষা করে বাচ্চাটির জন্ম হয়ে গেল এই পৃথিবীতে। আর সন্তান জন্ম দেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় ধ্বস্তক্লান্ত সন্তান দায়িনী দুস্থ মাজননী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
হামিদা ঝিমুতে ঝিমুতে খাটে শোয়া শিশুটির পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন দেখে, রশিদ তাকে জোর করে ঘোড়ার পিঠে তুলে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। তারপর কোনো বাগানের একজন মালির কুঁড়েঘরে তিনদিন তিনরাত আটকে রেখে ওকে ছুঁড়ে বের করে দিয়েছে। স্বপ্নের মধ্যে হামিদা আরও দেখে, ও উন্মাদ পাগলিনীবেশে গ্রামের অলিতেগলিতে ছুটে বেড়াচ্ছে। ওর গর্ভে অসীম প্রাণশক্তি নিয়ে দিনে দিনে বেড়ে উঠছে একটি শিশু … শেষপর্যন্ত একরাতে একটি গাছের ছায়াতলে ও একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেয়। বাচ্চাটি দেখতে একদম জাভেদের মতো। বাচ্চাটি ওর স্তনে দাঁতহীন মুখ ডুবিয়ে চুষে চুষে দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু দুধ না পেয়ে সে সজোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠে।
চমকে জেগে ওঠে হামিদা। ওর নতুন বাচ্চাটি সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রাণপণে চিৎকার করছে। বাচ্চাটিকে তুলে বুকের কাছে রেখে মাত্র কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়ে পড়া জাভেদের দিকে ও কিছুটা শঙ্কাভরে তাকায়। তারপর উঠানের জ্বলন্ত উনুনের পাশে বসে থাকা রশিদের দিকে এক পলক দেখে ও নিশ্চিন্ত হয়। না, রশিদ ওকে ছেড়ে যায়নি বা বের করেও দেয়নি। রশিদ খুবই স্নেহপ্রবণ দয়ালু একজন স্বামী। সে হামিদাকে নিজের বাড়িতে অত্যন্ত সম্মানের সাথে সুরক্ষিত রেখেছে। ওকে উপহার দিয়েছে কোঁকড়া চুলের অতি সুদর্শন সন্তান জাভেদকে। আর এখন তো ওর সংসার আরও ভরে উঠেছে। খোদামালিক নিজেই আরেকটি ছেলেসন্তান ওকে উপহার দিয়েছে। হামিদা উঠে ওর নতুন সন্তানটির কপালে আদরের চুমু খায়।
জাভেদ হওয়ার পর দুই বছর ধরে ওর স্তনদুটি দুধে পরিপূর্ণ হয়ে ছিল। খুব বেশিদিন হয়নি জাভেদকে বুকের দুধ ছাড়ানো হয়েছে। হামিদা শুনেছে সাদা জিরে খেলে নারীর স্তন নতুন করে দুধে ভরে ওঠে। ও এক গ্লাস দুধের সাথে একটি খেজুর খেয়ে নেয়। তিন দিন পর হামিদার স্তনজোড়া সত্যিই দুধে ভরে ওঠে। নিজের ছেলের মতো ভালোবেসে সাক্কারের (পাকিস্তানের একটি স্থান) পাগলির ছেলের মুখে হামিদা দুধে পূর্ণ ওর স্তনজোড়া তুলে দেয়।
একটি গোবরের ঘুঁটেতে দেওয়া ক্ষুদ্র আগুনকণা একসাথে স্তুপ করে রাখা অন্যান্য ঘুঁটেগুলোতে যেভাবে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি পাগলির ছেলেটিকে নিয়ে গ্রাম জুড়ে ধীরে ধীরে ফিসফাস শোনা যেতে লাগলঃ “জানিস, অই পাগলিটা আসলে হিন্দু ছিল। মুসলিমরা ওর বাচ্চাকে নিজেদের দখলে নিয়ে গেছে। দেখতে পাচ্ছ, হিন্দুদের নাকের নীচ দিয়ে তারা একটি হিন্দু ছেলেকে কিভাবে ধর্মান্তরিত করে মুসলিম বানিয়ে ফেলছে।’’
হামিদা শঙ্কিত হয়ে ওঠে। একটি বিড়াল যেমন তার সদ্য জন্মানো ছানাটিকে সযত্ন নিরাপদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যায়, হামিদাও সেভাবে ওর কুড়িয়ে পাওয়া ছেলেটিকে বুকে চেপে সামনের উঠান থেকে পেছনের নির্জন ঘরে চলে আসে। এমনকি দেওয়ালের সুরক্ষার মধ্যে আবদ্ধ থেকেও হামিদার কানে আসতে থাকে, বাচ্চাটি এবং তার মৃত পাগলি মা সম্পর্কে গ্রামের ওরা কে কী বলাবলি করছে সেসব কথা।
গ্রামের হিন্দুরা প্রথমে বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার জন্য একটি বৈঠক ডাকে। সেখানে একজন জানতে চায়, “ বেশ, তা আমরা কি করে নিশ্চিত হব যে পাগলি মহিলা হিন্দু ছিল ?’’ আরেক জন এ প্রশ্নের উত্তরে জানায়, “আমি নিজের কানে শুনেছি, ওই পাগলি ছিল লালা-মুসা এলাকার একজন বিশাল ধনী ব্যবসায়ীর মেয়ে। ওর স্বামির দ্বিতীয় স্ত্রী হিংসা করে ওর খাবারে বিশেষ একধরণের বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল, যার ফলে মাথা নষ্ট হয়ে ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।”
একজন আবার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে জানায় যে, “ওর নিজের আত্মীয়রাই আমাকে বলেছিল যে, পাগলির ভালোর জন্য ওরা শিকল দিয়ে ওকে বাড়িতে বেঁধে রাখত। কিন্তু কপালের লিখন কে করে খন্ডন ! ওর ভাগ্যে ছিল এরম ছন্নছাড়া ভবঘুরে হওয়ার নিদান।”
একজন আবার নিজের কথার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য মাটিতে চাপড় মেরে জানায়,“আমি নিজের চোখে দেখেছি, পাগলির বাম হাতে পবিত্র ‘ওঁ’ ট্যাটু খোদাই করা আছে।’’
“বন্ধুরা, দেখো কি সাংঘাতিক বিশ্বাসঘাতকতা! আমরা আমাদের চোখ বড় করে মেলে রেখেছি আর ওরা তাতে ধুলো ছুঁড়ে দিয়েছে।”
“আমাদের প্রত্যেকের লজ্জা পাওয়া উচিত! আমরা ওদেরকে সুযোগ করে দিয়েছি আমাদের হিন্দু ছেলেকে মুসলিম বানাতে। যেন এটাই দুনিয়ার সবচে স্বাভাবিক ঘটনা।”
অবশ্য কেউ কেউ পুরো ঘটনাটি এড়িয়ে গিয়ে জানায়, “আরে ইয়ার, যা আছে থাকুক না। আমরা কী জানি কোন অশুভ আত্মা জড়িয়ে আছে অই বাচ্চাটির সাথে। কে চাইবে একটি জারজ বাচ্চার সাথে নিজেকে জড়াতে!”
“আপনি কি বোকা হয়েছেন নাকি!” কথায় তীব্র ঘৃণা ছড়িয়ে উগ্রস্বভাবের একজন বলে ওঠে, “মূল বিষয়টি হচ্ছে আমাদের এবং তাদের মধ্যেকার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে। আজ যদি আমরা এই বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ না করে চুপ করে থাকি তাহলে ভবিষ্যতে ওরা চাইবে আমরা সবাই যেন মুসলিম হয়ে যাই। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না ওদের আচরণ কত উদ্ধতপূর্ণ বেপরোয়া হয়ে উঠছে !”
মুহূর্তেই আলোচনা কক্ষের পরিবেশ ঘৃণায় শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে গেল। কেউ কেউ ঘৃণায় ফেটে পড়ে,“আমরা অবশ্যই বাচ্চাটিকে ফিরিয়ে আনব। কে থামাবে আমাদের! কার কত সাহস আছে দেখি তো আমাদের হাত বেঁধে রাখে।”
“তাছাড়া এই বাচ্চাটিকে বড় করে তুলতে খুব বেশী বেগ পেতে হবে না। আমরা চাঁদা তুলতে পারি; আর সেই টাকা দিয়ে ওকে দেখাশুনার জন্য জলবাহিকা নারীদের বলে দেব আমরা।”
“একদম ঠিক। আমরা এতখানি নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকতে পারিনা। একটি ছোট শিশুর লালন পালনের সামর্থ্য কি আমাদের নেই !” ফুঁসে ওঠে একজন।
“কে জানে, ছেলেটি হয়ত বোবা কালা হতে পারে; অথবা ওর মায়ের মতো যদি পাগল হয়ে যায় ! এমনও হতে পারে ভবিষ্যতে হয়ত…” সংশয় প্রকাশ করে কেউ।
“আরে ধুর, এটা কেন হবে? ছেলেটি বড় হয়ে মন্দিরের চত্বর ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখবে। ওর দরকার হবে স্রেফ দিনে দুবেলা পেট পুরে খাবার খাওয়া। অবশ্যই এটা আমরা তাকে দিতে পারব।”
সভায় তারা একে অপরের বুদ্ধি ও সাহসের প্রশংসা করে পিঠ চাপড়ায়। যদিও সেখানে অনেক পাল্টাপাল্টি সওয়াল এবং মিথ্যে হামবড়াই ভাব ছিল। “তাছাড়া জলবাহিকা স্ত্রীলোকদের এই বিষয়ে নিজস্ব মতামত থাকতে পারে। আমরা কিছু করার আগে তার কাছ থেকে আরও ভালো কিছু জেনে নিতে পারব আশা করি।”
“আমাদের কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস সে পাবে না। আমরা ওর হাতের মুঠো উপচে রূপাচান্দি দিয়ে দেব। তারপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করব।”
“আমরা মুরগির বাচ্চা বের হওয়ার আগেই গুণতে শুরু করেছি… ছেলেটাকে খানিকটা বড় হতে দাও …নাকি ওরা ছেলেটার খৎনা করিয়ে ফেলবে!”
“কি ব্যাপার তুমি কি এখন পিছিয়ে যেতে চাইছ নাকি? যদি নিজের ধর্মবিশ্বাসের জন্য এটুকু নাই করতে পার, তাহলে যাও সমুদ্রে ডুবে নিজেই মর গে। আচ্ছা, তোমার ক্ষেত থেকে নালা কেটে কেউ যদি তার নিজের ক্ষেতে জল টেনে নেয়, তুমি তখন তার মাথার খুলি ফাটাতে একবারও ভাববে না, কিন্তু হিন্দুর ছেলেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে, তাকে উদ্ধারের কথা হলেই তোমার মুখে এত উদসীন ভাব আসে কেন বল তো ?”
আলোচনার পরিবেশটি আবার ঘৃণার কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল।
এরপর গ্রামের হিন্দুরা দেখা হলে মুখ কালো করে বিরাগ ভাব দেখিয়ে রশিদকে পাশ কাটিয়ে যেতে থাকল। রশিদ তাদের উপেক্ষাকে অবজ্ঞা দেখালেও বাড়িতে এসে ওর স্ত্রীকে অস্থির করে তোলে। বিষয়টির গুরুত্ব নিয়ে হামিদাকে সতর্ক করে বেশ কয়েকবার হালকাভাবে উপদেশ দিয়ে সে বলেছে, গ্রামের হাওয়া ভাল ঠেকছে না, বাচ্চাটিকে নিয়ে যে কোন গুরুতর ঘটনা ঘটে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কি দরকার ওদের এই ঝামেলায় থাকার!
রশিদ যতবার এই কথাগুলো বলত, হামিদার হৃদয় ততোবার ভেঙ্গেচুরে মহাআশঙ্কায় ডুবে যেত। গত ছয়টি মাস নিজের বুকের দুধ খাইয়ে একটি কঙ্কালসার ছোট্ট বাচ্চাকে ও বাঁচিয়ে রেখেছে। এখন সে হৃষ্টপুষ্ট চাঁদমুখের হয়ে উঠেছে। অনেকটা ওর নিজের ছেলে জাভেদের মতো দেখতে লাগে। বাচ্চাটি আজকাল হামিদাকে দেখলেই মা হিসেবে চিনতে পারে। হামিদা বাড়ির যেখানেই থাকুক, শিশুটির চোখ ওকে খুঁজে খুঁজে অনুসরণ করে। আবার রশিদকে দেখলেই হাত বাড়িয়ে দেয়, যেভাবে শিশুরা তাদের বাবাকে দেখে খুশি হয়। আচ্ছা, এই হিন্দুরা কেন প্রথম দিনই বাচ্চাটিকে নেওয়ার কথা ভাবেনি? কেন তারা শিশুটির জন্য ছয়টি মাস ওকে ঘুমহীন রাত জাগতে বাধ্য করল? কেন তারা জিরেফুলের বীজ খেয়ে ওর শিরায় শিরায় বয়ে যাওয়া রক্তকে বুকের দুধে পরিণত হতে দিল ? কেন তারা শিশুটির ময়লা কাপড় ধুতে ধুতে ওর হাতগুলোকে শক্ত এবং কড়া পরতে দিল? কেন? কেন? কেন?
একদিন গ্রামের হিন্দু মুরুব্বিরা রশিদকে ডেকে পাঠাল। হামিদার জিহবা শুকিয়ে গেল। তারা কি রশিদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে? রশিদকে কি তারা অপমান করবে ? ও যে নিজেই ওর স্বামীর মাথার উপর এই বিপদ টেনে এনেছে। হামিদা রশিদকে ধরে খুব অনুরোধ করে, ওকেও ওর সাথে নিয়ে যেতে হবে। হিন্দুসমাজের মুরুব্বিরা যা যা প্রশ্ন করবে সেই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ও নিজে দেবে। এই বাচ্চাটির জন্য ও হিন্দুদের কাছে কাকুতি মিনতি করবে। কিন্তু রশিদ এগুলোর কোনকিছু না করে হিন্দুরা ওকে যে বাড়িতে ডেকেছিল সেখানে একাই চলে গেল।
উঠানে পাতা চৌকিতে একদল হিন্দু ভক্ত রশিদ এবং তার মুসলিম বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছিল। রশিদ একাই এসেছে। এবং যেন কোন ব্যাপার ঘটেনি, খুব স্বাভাবিক ভাবে ওঁদের শরীর স্বাস্থ্য কেমন আছে সে বিষয়ে খোঁজখবর নেয়। যদিও সমস্ত উঠান জুড়ে অস্বস্তিকর এক ধরণের নীরবতা বিরাজ করছিল।
“বেশ, কি করতে চাও তুমি রশিদ? শুনলাম তুমি তোমরা নাকি পরিকল্পনা করেছ বাচ্চাটাকে আমাদের কাছে ফেরত দেবে না ?” পাশের জনের কাছে হুক্কাটি ধরিয়ে দিয়ে একজন খুব গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চায়।
“একটি জীবন দেওয়ার কিম্বা রাখার অধিকার কি আমাদের আছে ! একমাত্র আল্লাহরাব্বুল, যিনি জীবন দান করেন তিনিই এ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।” রশিদ ওর কপাল ছুঁয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল।
“বাহ, বেশ মিষ্টিমধুর বচন শোনাচ্ছ তো ! তা এবার বাস্তবে নেমে এসো। সেটা নিয়েই কথা হোক!” একজন অস্থির রাগে বলে উঠল।
“এই বাচ্চাটির জীবন বাঁচাতে আল্লাহরাব্বুল তার অসীম দয়ার দানে আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। আর যদি ঘন্টা দুয়েক শিশুটি ওভাবে পড়ে থাকত, তবে কোন বনবিড়াল অথবা পাগলাকুকুর এসে ওকে মেরে খেয়ে ফেলত। মহান আল্লাহ ওর জন্য লম্বা আয়ুর হুকুম জারি করেছেন …”
“সত্যি তাই ! ঈশ্বর যদি কারও লম্বা আয়ু দান করেন তবে পৃথিবীর কোন শক্তি তা নষ্ট করে কমাতে পারবে না। তবে তুমি নিশ্চয় জেনেছ যে, বাচ্চাটির মা একজন হিন্দু নারী ছিল। আমরা একজন হিন্দু বাচ্চাকে মুসলিম পরিবারে নিয়ে যাওয়াকে কিছুতেই সহ্য করব না।”
“বন্ধুরা, আমি জানি না সে কে ছিল, হিন্দু নাকি অন্য কেউ। সে তো হিন্দুর ঘরে যেমন খাবার খেয়েছে, তেমনি মুসলিম ঘরের খাবারও খেয়েছে …”
একজন রাগে ফেটে পড়ল, “সে একজন উন্মাদ ছিল। তুমি তো পাগল হওনি তাই না ?”
“আপনারা যদি প্রথম দিনই শিশুটিকে নিয়ে গিয়ে লালন-পালন করতেন তাহলে আমি কিছু বলতাম না। আমরা যখন তাকে নিয়ে এসেছিলাম তখন সে ছিল একমুঠো হাড়। আমার স্ত্রী ছমাস ধরে তাকে অসীম যত্নে লালন পালন করে তার জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে। আর এখন, আপনারা হঠাৎ বাচ্চাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। প্রিয় বন্ধুরা, আল্লাহরাব্বুলের ক্রোধ থেকে সাবধান হও ! এটা তিনিই ঠিক করে দেবেন কে এই সন্তানটিকে লালনপালন করবে, তোমরা না কি আমি ! তোমরা কি মনে কর আমি এর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারব?” রশিদের কণ্ঠে সহমর্মিতার সুর ছিল। কিছু হিন্দুলোক সেই কথার পর রশিদের উপর বিষয়টি ছেড়ে দিতে চাইল।
এরমধ্যে অত্যন্ত শান্তভাবে একজন বলল, “আমরা চাইনা বিষয়টি হাতের বাইরে চলে যাক। শোন ভাই, এই শিশুটি তোমার বা আমাদের কারও সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি এখন পবিত্র ধর্মের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এর সামনে কারও বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়। কেনো তুমি নিজের জীবন বিপন্ন করে তুলছ ? যদি কারও মাথায় তোমার ক্ষতি করার চিন্তা এসে থাকে, তখন কিন্তু বলো না যে আমরা তোমাকে সতর্ক করিনি ! আসলে তোমার জন্য কোনটি ভালো হবে এটা তোমার উপলব্দি করা দরকার। নিজের ইচ্ছায় উদার মনে বাচ্চাটিকে আমাদের দিয়ে দিলে ভালো হয়। আর হ্যাঁ, এতদিন বাচ্চাটির জন্য তোমার যে খরচ হয়েছে, তুমি চাইলে আমরা সেই টাকা তোমাকে শোধ করে দিতে রাজি আছি।”
সমস্বরে এবার সবাই বলে উঠল,“অবশ্যই আমরা দিয়ে দেব। নিশ্চয় দেব।”
“ ওহ্ আল্লাহ, আমাকে দয়া করুন মালিক!’’ দুহাতে ওর দুটি কান চাপা দিয়ে রশিদ ধরা গলায় প্রায় চিৎকার করে উঠল ।
“আমাদের এখানে জলবাহকি মহিলারা আছে। তাদের কেউ কেউ তোমার সাথে তোমার বাড়ি গিয়ে বাচ্চাটিকে নিয়ে আসবে। আমরা ওকে শুদ্ধ করে আবার হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনব।”
রশিদ অনুনয় করে, দুই হাত জড়ো করে অনেকটা প্রার্থনার মতো করে বলে, “বাচ্চাটিকে দয়া করুন। ওর ভালোর জন্য যেখানে আছে সেখানেই থাকতে দিন। আমার স্ত্রী ওকে নিজের গর্ভজাত সন্তানের মতো অতি যত্নে প্রতিপালন করছে। ওর কোন অযত্ন হবে না।”
কিন্তু হিন্দুদের কেউ কেউ জানায়,“দেখ আমরা যা বলার তোমাকে সেটা সরাসরি বলে দিয়েছি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারেও সঠিক পথ বাতলে দিয়েছি তোমাকে। আশা করি তুমি তোমার স্বার্থে জ্ঞানীর মতো আচরণ করবে। হয় তুমি আমাদের সাথে এসো অথবা এরফলে বিপজ্জনক যে পরিণতি হবে তাই মেনে নাও। শোন, আমরা কিন্তু জানি, কেবল বাঁকা আঙুলেই ঘি তোলা যায়।”
বয়স্ক হিন্দু ব্যক্তিরা উঠে দাঁড়ালেন। তারা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন, সমস্ত যুক্তিতর্ক আলোচনা শেষ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে জলবাহকিরা এসে গেছে। তাদের মাথামুখ ওড়না দিয়ে ঢাকা। আর কোন উপায় নাই। সব পথ রুদ্ধ। রশিদ উঠে দাঁড়ালো। ওর সাথে জলবাহকিরা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোক ওর বাড়ির দিকে আসতে থাকলো।
হামিদা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর দৃষ্টিকে সামনের রাস্তার দিকে নিবদ্ধ করে রেখেছিল। রশিদের বিষণ্ন চাউনি আর ওর সাথে আসা লোকগুলোকে দেখে ওর বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল। ওর হৃদয় তোলপাড় করে উঠল। এই দৃশ্যটি ওকে মনে করিয়ে দিলো, যেদিন ওর মায়ের কাছ থেকে ওকে ছিনিয়ে আনা হয়েছিল, ওকে আলাদা করা হয়েছিল ওর বাবার কাছ থেকে আর ভাইবোনদের কাছ থেকে ওকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল সেই দিনটিতে। এখন এই কুড়িয়ে পাওয়া ছেলেটি ওর শরীরের রক্তমাংসের অংশ হয়ে গেছে। হামিদা দৌড়ে ভেতরবাড়িতে এসে বাচ্চাটিকে তুলে শক্ত করে ওর বুকের সাথে আঁকড়ে রাখল।
পথভোলা পথিকের মতো রশিদ ওর বাড়ির উঠানে এসে ঢুকলো। কোনো কথাই ওর বলার ছিল না। হামিদারও ওর কাছে কোনো ব্যাখ্যা চাইবার ছিল না। এদিকে হামিদার কোল থেকে বাচ্চাটিকে ছিনিয়ে নিতে জলবাহিকা মহিলারা দ্বিধা করছিল।
হিন্দুদের তরফ থেকে আসা একজন অত্যন্ত কঠোর সুরে নির্দেশ দেয়, “তাড়াতাড়ি কর। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের অন্য অনেক কাজ করতে হবে।”
জলবাহিকা মহিলারা হামিদার কোল থেকে কুড়িয়ে আনা ছেলেটিকে জোর করে ছিনিয়ে নিল। বাচ্চাটি্র মুঠোর ভেতর হামিদার ওড়নার প্রান্ত ধরা ছিল বলে ওর মাথা থেকে ওড়না খুলে পড়ে। জলবাহিকা মহিলারা জোর করে ওড়নার প্রান্তটি বাচ্চাটির হাত থেকে খুলে ফেলে। আর সেই মুহূর্তে বাচ্চাটি বুঝতে পারে এ যে অচেনা হাতের রুক্ষস্পর্শ। এবার সে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করে।
হামিদা লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। ও শুনতে পেল বাচ্চাটির কান্না কমে আসতে আসতে আরো নিচের রাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে। স্তন থেকে অঝোর ধারায় ঝরে পড়া দুধে ওর জামা ভিজে গেল।
সে রাতে রশিদের ঘরে কোন রান্না হলো না। জাভেদ অনবরত ওর আব্বার কাছে জানতে চাইছিল, “আব্বা ওরা আমার ছোটভাইকে কোথায় নিয়ে গেল? আব্বা আমার ছোটভাই কখন বাড়ি ফিরে আসবে?’’ ছেলের দিকে তাকিয়ে রশিদ ওর মাথা নিচু করে বসে থাকল।
হামিদা প্রথমে কাম্মো, তারপর কুড়িয়ে আনা ছেলেটির কথা ভাবল। আচ্ছা ও কেন বার বার মানুষের ছুঁড়ে ফেলা বাতিল ফুলগুলো তুলে আনে? ওর অন্তরের অন্তঃস্থলে কি এমন দায় আছে যার জন্য শুকিয়ে যাওয়া কুড়িগুলোকে জলের স্নেহধারা দিয়ে তাদেরকে ও পুনরুজ্জীবন দেওয়ার চেষ্টা করে ? অথচ তারা ওর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে গেছে আর ওকে রেখে গেছে নিঃসঙ্গতার গভীরে একদম একাকী করে। শুধু একজন মানুষ—হ্যাঁ শুধু একজন ওর পাশে সবসময়ের জন্য আছে। সে হচ্ছে রশিদ। ওর একান্ত নিজের মানুষ, ওর সন্তানের স্নেহশীল পিতা।
পরের দিন কেটে গেল। এর পরের দিনও পার হয়ে গেল। চার দিনের দিন, গ্রামবাসীরা কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চাটির ভাগ্য নিয়ে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারল না। তারা সবাই বলাবলি করছিল, “অসহায় বাচ্চাটি এক ফোঁটা দুধ খাচ্ছে না। গলার নিচে যাওয়ার আগে প্রতিটি দুধের ফোঁটা সে উগরে দিচ্ছে। আহারে বাচ্চাটি এখন মৃত্যুর কোলে দুলছে।”


0 মন্তব্যসমূহ