দেবতোষ দাশের গল্প: চামরমনি চালের ভাত ও বোয়ালের ঝাল


জ আর টোকেন লাগবে না। টাকাপয়সাও। আজ কেবল রিপোর্ট। এই রিপোর্টটাই তৈরি করে দেবে জীবনের পরবর্তী গতিপথ। যা-বলার বলবেন ডাক্তারবাবু। এগারোটায় তাঁর সঙ্গে মোলাকাত। একটু আগে আগেই চলে এসেছি। একা। আগেরদিনও মতোই। বাড়িতে এখনও কিছুই বলিনি। যা-বলার আজ ফিরে বলব। সবটাই নির্ভর করছে রিপোর্টের ওপর। দেখা যাক। অপেক্ষার করিডোরে, মস্ত বসার জায়গায় বসে পড়লাম এক চেয়ারে। গোটা হাসপাতালই বাতানুকূল। এই পচা ভাদ্রে বেশ ভালো লাগছে।

বসে বসে পুরনো রোগী, নতুন রোগীদের দেখছি। টোকেন ব্যাপারটা অনেকেই বুঝতে পারছে না। সাহায্য করছে একটি মেয়ে। আগেরদিনও এই মেয়েটিই সাহায্য করেছিল আমায়। বোতাম টিপতেই ফরফর করে বেরিয়ে এল কাগজ। সি টোকেন। চব্বিশ নম্বর। হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে কখন ডাক পড়বে রেজিস্ট্রেশনের। মাইকে মৃদু স্বরে টোকেন নাম্বার ধরে ঘোষণা হচ্ছে। ডিসপ্লে বোর্ডেও দৃশ্যমান। পরপর অপেক্ষারত রোগী এগিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট কাউন্টারের দিকে। সকলেই নতুন রোগী নয়, বরং পুরনোই বেশি। দরকার অনুযায়ী টোকেন। সি, ডি, ই ইত্যাদি। টোকেন অনুসারী কাউন্টার।

বিশাল হল। সার সার বসার জায়গা। একদিকে টানা কাউন্টার। প্রচুর রোগী। কর্মীও পর্যাপ্ত। প্রশস্ত পরিসর ও ব্যবস্থাপনা কিছুতেই ভিড় তৈরি করতে দিচ্ছে না। কাউন্টার থেকেই মসৃণভাবে ভাগ হয়ে চলে যাচ্ছে রোগীর দল বিভিন্ন বিভাগের দিকে। সেদিনও এমনই একটা চেয়ারে গিয়ে বসেছিলাম। বেশিক্ষণ বসতে হল না। ডাক এল। আজকাল বড় বড় হাসপাতাল বা ব্যাঙ্কে টোকেন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু। এর ফলে লম্বা লাইন বা অপেক্ষাকে কিঞ্চিৎ আয়ত্তে আনা যায়।

আজ আর আমার ডাকের ব্যাপার নেই। এগারোটা বাজলেই লম্বা করিডোর পেরিয়ে ঢুকে যাব ডাক্তার মণ্ডলের চেম্বারে। রৌণক মণ্ডল। অঙ্কোলজিস্ট। আগে এইমসে ছিলেন। প্রথমদিন ঘরে ঢুকতেই হাঁটতে বললেন। হাঁটলাম। কতটা খোঁড়াচ্ছি বা আদৌ খোঁড়াচ্ছি কিনা সম্ভবত যাচাই করলেন। যদিও আমি মোটেই খোঁড়াচ্ছি না। ওঁর ঘরে ঢোকার আগে জুনিয়র ডাক্তার সব জেনে নিয়েছেন। ফাইল পাঠিয়ে দিয়েছেন ওঁকে। সব অনলাইনে। সামনে ডেক্সটপের মনিটরে চোখ রেখেই উনি কথা বলছেন। তারপর বললেন বেডে শুয়ে পড়তে। প্যান্টটা খুলতে হল। বাঁদিকের থাইয়ে গজিয়ে ওঠা মাংসপিণ্ডটা হাত দিয়ে পরীক্ষা করলেন। সুপারফিসিয়াল মাস। বাংলায় যাকে আব বলে।

"এফএনএসি করতে হবে। নিডল বায়োপ্সি। আজই করে নিন। তিনদিন লাগবে রিপোর্ট পেতে। মিট মি আফটার থ্রি ডেজ।”

সেই এফএনএসি রিপোর্ট আজ পাব। নিজেকে স্থিতধী রাখতে চাইছি। চাইলেই কি আর সব পারা যায়! চঞ্চল হচ্ছে মন। কখন এগারোটা বাজবে। এবার বেশ ঠাণ্ডা লাগছে। এসিটা এরা এত হাই রাখে কেন?

পৌনে এগারোটা। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম ডাক্তার মণ্ডলের চেম্বারের দিকে। পরপর বেশ কয়েকটা ঘর। সম্ভবত অন্যান্য বিভাগের ডাক্তারবাবুরা বসেন। করিডোর ধরে ধীরে এগোচ্ছি, তখনই দেখতে পেলাম হুইল চেয়ারে বসা মানুষটিকে। মুখে মাস্ক। এঁকে আমি চিনি। মাস্ক সত্ত্বেও আমার কোনও ভুল হয়নি। তিনিও হাঁ করে চেয়ে আছেন আমার দিকে। উমাদা। একি চেহারা হয়েছে উমাদার! কোটরে ঢুকে গেছে চোখ। মাথায় চুল নেই। সম্ভবত কেমোর ফল। এগিয়ে গেলাম উমাদার দিকে।

উমাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এদিকে এসো, সবাই এক কামরায় ওঠার চেষ্টা করলে মুশকিল! আমি বুঝলাম উমাদা চাইছেন আমি ওঁর সঙ্গে ট্রেনে চাপি। সাতটা দশ নাগাদ বর্ধমানে ঢুকল ব্ল্যাক ডায়মণ্ড। উমাদার পেছন পেছন উঠে পড়লাম একটা কামরায়। বেজায় ভিড়। শুক্রবারে সকলেরই বাড়ি ফেরার তাড়া। ভেতরে না-ঢুকে দরজার কাছেই দাঁড়ালাম। সদ্য আলাপ হয়েছে উমাদার সঙ্গে। পুরুলিয়া পোস্টিং পেতেই আমারও সপ্তাহান্তের সফর হয়ে গেল নির্দিষ্ট। শুক্রবার দুপুর-দুপুর অফিস থেকে বেরিয়ে পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে বর্ধমানের দিকে যাত্রা।

উমাদা গত দু'বছর ধরে আছেন সাতুড়ি ব্লকে। গড়ধ্রুবেশ্বর নাকি রামকানালি, কোনও একটা স্টেশন থেকে ওঠেন। আট থেকে দশ জনের দল আমাদের। হইহই করতে করতে চলে আসি বর্ধমানে। বেশিরভাগই আমরা সমবয়সী নবীন-চাকুরের দল। দু-একজন অপেক্ষাকৃত বয়স্কও আছেন। তার মধ্যে একজন উমাদা। উমাপ্রসাদ সরকার। থাকেন নিজের মনেই। খুব বেশি কথা বলেন এমন নয়, কিন্তু ওঁর উপস্থিতি উদ্দীপক। সুদর্শন। উজ্জ্বল মুখমণ্ডল। যখন হাসেন যেন সূর্যোদয়। ট্রেনে যা খাবার-দাবার ওঠে মোটের ওপর আমরা প্রায় সবই খাই। উমাদাও। খেতে ভালবাসেন।

ভেস্টিবিউল ভেদ করে উদয় হওয়া এক হকারকে শরীর বাঁকিয়ে যেতে দিলেন, তারপর স্মিত বললেন,

“পাখিদের ঘরে ফেরা দেখেছো? নিশ্চয়ই দেখেছো। সন্ধেবেলা কেমন দল বেঁধে উড়ে যায় ঘরের দিকে। কেউ ঘরে ফিরছে দেখলেই আমার ভালো লাগে। সন্ধ্যায় মানুষও যখন কাজ সেরে ঘরে ফেরে, ভারি ভালো লাগে দেখতে। ঈষৎ উদভ্রান্ত, যেকোনও মূল্যে ট্রেন বা বাস তাকে পাকড়াতে হবে, পৌঁছোতে হবে দ্রুত ঘরে। ফেরার পথে এত তাড়া কেন তার বলতো?”

“আপনজনের কাছে পৌঁছাবে।” আমি উমাদার চোখের দিকে তাকিয়েই বলি।

“সে এই বাইরেটাকে মোটেই নিরাপদ মনে করে না, যতক্ষণ না নিজের ঘরে ঢুকতে পারছে, ততক্ষণ সে মোটেই নিরাপদ নয়। একটা সেন্স অফ ইনসিকিউরিটি কাজ করে। ঘর মানে ইট-পাথরের বাড়িটাই কেবল নয়, কাছের লোকগুলোও ঘর। সবটা মিলিয়েই ঘর। এইখানে সে স্বস্তি বোধ করে। বাড়িতে তার যদি নিজস্ব কোনও ঘর থাকে, তাহলে সেই ঘরে ঢুকে সে আরও বেশি বেশি স্বস্তি বোধ করে। এই স্বস্তিটুকু পেতে, নিরাপত্তা আয়ত্ত করতে সে এতটাই মরিয়া, অ্যাক্সিডেন্ট পর্যন্ত ঘটে যায়! তুমি জানো, সকালে কাজে যাওয়ার সময় যত দুর্ঘটনা ঘটে, তার থেকে অনেক বেশি ঘটে বাড়ি ফেরার সময়!”

ট্রেনের গর্জন, ভিড়ের গুঞ্জন, হকারের কোলাহল ছাপিয়ে উমাদা বলে যান। খুবই সংলগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছি বলে আমার কানে ঢোকে কথাগুলো, নতুবা সে উচ্চারণ যেন আত্মমগ্ন। স্বগত কথন। বুঝতে পারি, পছন্দের বিষয় ও মনোযোগী শ্রোতা পেলে উনি কথার পিঠে কথা সাজান। আমি উমাদার থেকে চোখ সরিয়ে ভিড়ের দিকে তাকাই। প্রত্যেকের মুখে প্রশান্তি। ঘরে ফেরার সুখ।

“বিয়ে করেছো?”

“না।”

“বেশি দেরি কোরো না। আমার লেট ম্যারেজ। বাচ্চা হল আরও পরে। বছর বারো আর চাকরি আছে। ছেলে পড়ে টুতে।”

“বৌদি চাকরি করেন?”

“হ্যাঁ, স্কুলে পড়ায়। পাঁচদিন একা একা থাকি। আজ ঘরে ঢুকতে এগারোটা বাজবে। ছেলেটা জেগে থাকবে।”

উমাদার হুইল চেয়ারের পাশে এক সুপুরুষ। নিশ্চয়ই ছেলে। বিশ-বাইশ বছর পর, সেদিনের সেই টু-এ পড়া শিশু আজ যুবক। পাশে এক মহিলাও। নিশ্চয়ই বৌদি। ওদের কথা শুনেছি। আগে দেখিনি কখনও। উমাদা তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি এগোলাম।

“উমাদা, চিনতে পারছেন?”

বৌদি আর ছেলে কিছুটা অবাক চোখেই আমার দিকে চেয়ে। মাথা নাড়লেন উমাদা। উজ্জ্বল মুখটা আর নেই। কিন্তু হাসিটা আছে। মুখে মাস্ক, ফলত সূর্যোদয় অপ্রকাশিত। অন্তরালহেতু রুদ্ধ। তবে চোখ দেখে বুঝলাম হাসছেন।

হাসতে হাসতে আমরা দ্রুত ব্ল্যাক থেকে নেমে দৌড়লাম। ব্যাণ্ডেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে-থাকা ব্যাণ্ডেল-নৈহাটি মুহূর্তে ছেড়ে দিল। যেন আমাদের অপেক্ষাতেই ছিল। ফাঁকা ট্রেনে হুড়মুড়িয়ে আমাদের দলের কয়েকজন উঠল, যারা শিয়ালদা যাবে। বাকিরা হাওড়া, থেকে গেল ব্ল্যাকে। বাদাম খেতে খেতে উমাদা জানালার ধারে চলমান অন্ধকারের দিকে ভাসিয়ে দিয়েছেন চোখ। পাশে আমি। যেখানে কথা শেষ হয়েছে ব্ল্যাক ডায়মণ্ডের কামরায়, আমি জানি, উমাদা সেখান থেকেই শুরু করবেন।

“রান্না করার একটা আনন্দ আছে বুঝলে, আমি টের পাই। প্রতি রবিবার রাতে বউ প্যাকেটে থরে থরে সাজিয়ে দেয়। চামরমনি চাল। মুসুরির ডাল। সোনামুগ।”

“আপনি বাড়ি থেকে চাল-ডাল নিয়ে আসেন?” আমি অবাক।

“সাতুড়িতে আমি চামরমনি পামু কই ব্রাদার!”

“চামরমনি চাল আপনার ফেভারিট?”

“রবীন্দ্রনাথেরও প্রিয় ছিল। ভালো চাল আমার একটা অবসেশন। যখন দিনাজপুরে পোস্টেড ছিলাম, কালিয়াগঞ্জে, আহা সে কী চাল! তুলাই, নাম শুনেছো?”

আমার উত্তরের তোয়াক্কা না-করেই উমাদা বলে চলেন, “তুলাইপাঞ্জি না-খেলে জীবন বৃথা! এই সুবাস আমি কোনও চালে পাইনি। অথচ গোবিন্দভোগের ভাত আমি খেতে পারি না। খিচুড়ি পারি। বাসমতী সেদ্ধচাল হলে কিছুটা খেতে পারি। আসলে সুগন্ধী চাল দিয়ে ভাত খাওয়া সোজা নয়। মুখ মেরে দেয়। কিন্তু তুলাইপাঞ্জি দিয়ে আমি দু-থালা ভাত সাপটে দিতে পারি নিমেষে। মোহিনীগঞ্জের তুলাই পেলে আমি বয়ে বয়ে বাড়িতেও নিয়ে আসতাম প্রতি মাসে। আসলে কী বলত, চালটা ভালো হলেই খাওয়ার ঝামেলা অর্দ্ধেক খতম। ডাল-আলুসেদ্ধ বা আলুভাজা দিয়েই, একটু কাগজি টিপে, ভাত খেয়ে ফেলা যায়। আচ্ছা, রান্না করতে জানো? কর?”

“না, আমাদের মেসে তো রান্নার মাসি আছে।”

“আরে নিজে রান্না করার আনন্দ জানো তুমি? যদিও রান্না খুব কম লোকেই জানে! ঠিকঠাক ভাত করতে পারে ক'জন?”

ভাতের গন্ধ নাকে আসে আমার। এদিকে প্রশস্ত করিডোর জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে নীরব শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিটি প্রশ্বাস ক্রমাগত শীতল। মৃত্যুপ্রবণ। এসি মেশিনের অতিসক্রিয়তার কারণে কেবল এই করিডোর নয়, গোটা হাসপাতালটাই যেন এক বিশাল মর্গ। সেই হিমার্ত মর্গের মধ্যেই, কী আশ্চর্য, ভাতের গন্ধ ধেয়ে এল আমার নাকে। চামরমনি চালের ধোঁয়াওঠা ভাত। হুইলচেয়ারে উপবিষ্ট সামনের ওই মানুষটার জন্যই সামান্য এই উষ্ণ আয়োজন স্মৃতির। আমি তার বুকে মুখ ঘষি। স্মৃতির দোপাট্টা ওড়ে হাওয়ায়। তার বুকে প্রাচীন পরিমল, যেভাবে চন্দন ঘষে সুবাস। একেই আমি ভাতের গন্ধ ঠাহরেছি।

“হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়, সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়। তেমন ভাত রান্নাও সহজ নয়।” অন্তরাল হটিয়ে হা-হা হাসিতে ভরে উঠলেন উমাদা। আমিও।

“আপনি কবিতা পড়েন উমাদা?”

“যে রান্না করে সে তো নিজেই কবি!” আবার উমাদার হাসিতে সূর্যের সাতরঙ।

“ভাত রান্না সহজ নয় কেন?”

“ভাতটাকে অনাবশ্যক ফুটিয়ে টেস্টটাই নষ্ট করে দেয়!”

“ভাত তো ফোটাতেই হবে দাদা!”

“সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমার কাজ হল চাল ভালো করে ধোয়া। তারপর সেই ভেজা চাল ফেলে রেখে দাঁত-ফাত মেজে একটু চা খাই। তারপর যা চাল তার তিনগুন জল দিয়ে চাপিয়ে দিই গ্যাসে। ঝরঝরে ভাত যদি খেতে চাও, জল দিতে হবে বেশি করে। ভাত উথলে উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস অফ করে দেবে। কিন্তু হাঁড়ি বা সসপ্যানের ঢাকনা খুলবে না। ওটা ভেতরেই মজবে। ভালো চাল হলে তো কথাই নেই।”

“তারপর ডাল?”

“সকালে ডাল করি না। মাছের ঝোল আর ভাত।”

“বাজারে যান?”

“একটা ছেলেকে বলা আছে, ভালো জ্যান্ত মাছ পেলে আমায় দিয়ে যায়। বাঁধের জ্যান্ত মাছ পাইলাম গ দাদা, তুমহার ল্যেগে লিয়ে আসলাম গ। তারপর একদম কেটে-কুটে দেয়। বড় মাছ হলে ওকেও দিয়ে দিই কয়েক টুকরো। ভাত ততক্ষণে মজে গেছে। মাড় গেলে করে ফেলি মাছের ঝোল। তবে মাছরান্নার আমার নিজস্ব পদ্ধতি আছে।”

“সেটা কেমন?”

“জ্যান্ত মাছ, ধরো রুই, আমি পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করি না। কাঁচালঙ্কা আর জিরে বাটার ঝোল। নামাবার আগে ঝোলে দিয়ে দিই আমার নিজস্ব এক মিক্সচার।”

“নিজস্ব রেসিপি?” আমি মজা পাই।

“গ্রাইণ্ডারে পিষে নেবে কালো জিরে আর গোবিন্দভোগ চাল। তারপর চারভাগের একভাগ কালো জিরে গুঁড়ো আর বাকি তিনভাগ সেই চালের গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি হবে এক মিশ্রণ। মাছের ঝোল নামাবার আগে আন্দাজ মতো দিয়ে দাও ঝোলে, তারপর দ্যাখো টেস্ট কাকে বলে! আমার চার-পাঁচ পিস মাছের ঝোল, আমি এক চা চামচ দিই।”

“সাতুড়িতে আপনার গ্রাইণ্ডারও আছে?”

“আরে না ভায়া, তোমার বৌদি প্রতি রবিবার ছোট্ট এক প্লাস্টিকের কৌটোয় দিয়ে দেয়।”

নাকে স্পষ্ট টের পাই টাটকা রুইয়ের সেই ঝোলের সুবাস। শিউলিফুলের মতো ঝরঝরে ভাত ঘিরে ব্যঞ্জন সাজাচ্ছেন উমাদা। হাঁ করে চেয়ে থাকি ওঁর দিকে। কেন মাস্ক পরে আছেন উনি? এই আয়োজনে কেন এই অন্তরাল? হাসেন উমাদা। নৈহাটি থেকে উল্টোডাঙা নামার আগে পর্যন্ত বলে ফেলেছেন নানাবিধ রন্ধনপ্রণালী। কেবল রন্ধনকলা নয়, কীভাবে খেতে হবে সেই গলাধঃকরণ প্রক্রিয়াও বলে যান সমান তালে। মায়াডোরে বাঁধা থাকে সেই উচ্চারণ।

কলকলিয়ে কত-কী বলে যান উমাদা। আমি সেই উচ্চারণে কাজল পরাই।

মৌরলা মাছের পাতুরিতে কলাপাতা-বাঁধনের কারিকুরি। আঁচের নিয়ন্ত্রিত তারতম্য। কড়াইতে আস্ত ফুলকপি বসিয়ে রসিয়ে রোস্ট। বাঁধাকপির পাতা সেদ্ধ করে সর্ষে-পোস্ত দিয়ে সামান্য তেলে একটু সাঁতলে গরম গরম ভাতের সঙ্গে মাখলে তবেই না হরগৌরীর মিলন! কাঁচা পোস্ত বাটা খেয়েছ ভায়া? পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে বাটতে হবে কিন্তু, না-হলে পোস্তর বুনো গন্ধটা যাবে না! সামান্য নুন দেবে, তারপর গরম ভাতের সঙ্গে মাখবে, অমৃত কী জিনিস জানি না, তবে পোস্তবাটা জানি। এ ব্যাটারা পোস্ত খায় খুব, বলে পোস্তু। বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় পোস্ত খাওয়ার খুব রেওয়াজ। একবার এক হোটেলে আলুপোস্ত নিয়েছি, ওমা ঝোল গড়গড়িয়ে নেমে যায় কলাপাতা বেয়ে। তার ওপর আবার সাদা ফ্যাটফ্যাটে। এরা পোস্তয় হলুদ দেয় না। এদেশের প্রায় কেউই দেয় না। আমরা দিই। আমাদের দেশে দিত। সব বাঙালরাই দেয়। সামান্য হলুদ না-দিলে আলুপোস্তর টেস্ট খোলতাই হয় না।

“কোথায় দেশ ছিল আপনার?”

“সেনবাগ। চৌমুহনীর কাছে। গান্ধী গেছিলেন।”

“মনে আছে কিছু?”

“পঞ্চাশের রায়টের পর বাবার হাত ধরে চলে এলাম। চলে আসতে বাধ্য হলাম আরকি! সে বীভৎস রায়ট! ঠিক রায়ট বলা চলে না, একতরফা! জেনোসাইড! তখন আমার তিন-চার বছর বয়স। ঝাপসা স্মৃতি। বাবা ভেবেছিলেন সব শান্ত হলে আবার ফিরতে পারবেন। পারেননি। নিজের ঘরে ফিরতে পারেননি। জুনিয়র হাই ইশকুলে পড়াতেন। ছাত্রদের কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন। পারেননি।”

অর্গলমুক্ত উমাদার স্বর ট্রেনের আওয়াজ আর বাইরের অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যায়। উমাদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসেন। সেই বিভাসে কোনও অন্তরাল নেই।

মাস্ক সরিয়ে দেন উমাদা। এখানে এসি’র তাপমাত্রা অতিরিক্ত নীচে নামিয়ে রাখার দরুণ পুরনো রোগীদের প্রায় সকলের গায়েই শীতবস্ত্র। উমাদার গায়ে চাদর। আমার হাতদুটো ধরেন। পাশের চেয়ারে বসতে বলেন। বসি। পাশে বসার পরও বাঁ হাত দিয়ে আমার ডানহাতের পাঞ্জাটা ধরে আছেন। কম্পন টের পাই। নীরবতা। কথা বলতে হয় না। হাতের কম্পনেই আমি উমাদার স্বর শুনতে পাই।

উমাদা বলছেন, “আমার বাবা ফেলে আসা ঘরে ফিরতে পারেননি। বাবার নীরব হাহাকার দেখেছি। তাই আমার ঘরে ফেরার আনন্দ দেখলেই বুকটা ভরে ওঠে জানো?”

উমাদার হাত ছেড়ে ট্রেনভর্তি ঘরে-ফেরা মানুষের দলে ঢুকে যাই। গুটিগুটি এগোই।

ছেলের কাছে যাই। পরিচয় দিই। আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে ছেলেটি বলে, “এসোফেগাসে। খাদ্যনালী। বাবা সলিড কিছু খেতেই পারছে না লাস্ট থ্রি মান্থস। দুর্বল। দুটো কেমো নেওয়ার পর শরীর এত খারাপ হল, আর কেমোও নিতে পারছে না। স্টেজ থ্রি। ডাক্তারের কাছে চেকআপে নিয়ে আসি ফোর্টনাইটলি।”

“বয়স কত হল উমাদার?”

“সেভেন্টি ওয়ান।”

বৌদি ছেলেকে ইশারা করছেন আমায় উমাদার কাছে আসতে। উমাদা আমায় ডাকছেন। আবার গিয়ে বসি ওঁর পাশে। হাতে হাত রাখি আবার।

“তোমার কোথায়?”

উমাদার প্রশ্নে আমি চুপ। ঠাণ্ডা যেন জাঁকিয়ে ধরে ফেলে আমায়। হাত ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করি। পারি না। শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছেন আমার পাঞ্জা। হাতের ওপর হাত রাখা সহজ নয়। “তোমার কোথায়?” এই দুটো শব্দসহ প্রশ্নে আমি স্থবির। উমাদা প্রত্যুত্তরের তোয়াক্কা কোনোদিনই করতেন না।

“চল পাশাপাশি শুয়ে থাকব দুই বেডে। গল্প করব আর অপেক্ষা করব তার আগমনের। তবে রান্নার গল্প আর করব না। আমি আর খেতে পারি না যে!”

কাঁপুনি বাড়ে আমার। মাথা শূন্য। এই মানুষটি তো উমাদা নন, উমাদার ধ্বংসস্তূপ। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার নাম ঘোষণা হয় রিসেপশনে। কিন্তু উমাদার মুঠি ছাড়িয়ে আমি যেতে পারি না। ছেলে এসে ছাড়িয়ে দেয় হাত।

“বাবা, হাত ছাড়ো, কাকুর নাম ডাকছে!”

আমি এগিয়ে যাই ডক্টর মণ্ডলের চেম্বারের দিকে। বস্তুত, উমাদার হাত ছাড়িয়ে আমি পালাতেই চাইছিলাম।

চেম্বারে ঢুকতেই উমাদা বললেন, “আরে ভায়া এসো এসো, বাসায় চলো, তোমায় দুর্দান্ত এক জিনিস খাওয়াব! ক্ষেতে এখন অঘ্রান-শেষের কাঁচা টম্যাটো। আজ কাঁচা টম্যাটো দিয়ে মৃগেলের ঝাল করেছি। চল বাসায়। ইস্‌ গতকাল এলে না, বোয়াল করেছিলাম! কী সস্তায় যে পেলাম মাছটা, ভাবা যায় না! কেন বলতো? এদিককার লোকেরা বোয়াল খায় না। বোয়াল নাকি মানুষ খায়! নদীতে ভেসে বেড়ায় যে শবদেহ, তা নাকি খুবলে খায় বোয়াল! ভালোই তো, খাবি না, খাবি না, আমরা খাব! জানো, আমার বাবা খুব বোয়াল ভালবাসতেন। শুকনো লঙ্কা বেটে মাখো মাখো করে রান্না করতেন মা। তবে সন্তুষ্ট কখনোই হতেন না বাবা। দেশের বোয়ালের মতো স্বাদ নাই এদেশের বোয়ালের!”

গরম ভাতে বোয়ালে ঝাল মাখতেই আবার সেই সুবাস। এই শীতলপুরিতে উষ্ণতার আয়োজন উমাদার।

আমি হাত বাড়িয়ে খামটা নিই। তার আগে রিপোর্ট দেখে ডাক্তার রৌণক মণ্ডল কেটে কেটে কিছু বলেছেন। গভীর অভিনিবেশে নিরীক্ষণ করেছেন পরীক্ষার ফল। ওঁর চেম্বার আরও ঠাণ্ডা। অকাল শীতে আমি ঠকঠক করে কাঁপছি। ডাক্তার মনিটর থেকে মুখ তুলে, সোজা আমার চোখের দিকে তাকালেন। পেশাদার কণ্ঠে, স্বরের সামান্য উঁচু-নীচু না-করে, কয়েকটি কথা বললেন। প্রথম বাক্যটি শুনেই আমার মাথা বেবাক ফাঁকা। আর কোনও কথা শোনার মতো অবস্থায় রইলাম না।

চেম্বার থেকে বেরিয়ে আমি আবার উমাদার মুখোমুখি। উমাদার মুখে সেই হাসি। অনির্বচনীয়। চাদর সরিয়ে হাত বাড়ালেন। আমি হাত ধরে আবার পাশে বসলাম। কেন জানি না ব্যাপক কান্না পেল আমার। নিজেকে সামলে উমাদার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। বিয়ের পর উমাদার রেসিপিগুলোর প্রয়োগ করেছিলাম আমরা দ্যাবা-দেবী দু'জনে মিলে। আনাড়ি হাত হলেও, তৃপ্তি ছিল। কপালে-মাথায় হাত বোলাবার সময় উমাদার গায়ে উত্তাপ টের পেলাম। ছেলে বলছিল, বাবার মাঝে মাঝে জ্বর আসে।

ছেলে আরও বলছিল, বাবা সাইকিক হয়ে গেছে! সামনে কেউ খেলেই চিৎকার করে। বাবার সামনে আমরা খেতে পারি না। লুকিয়ে খাই। কী খারাপ লাগে জানেন কাকু!

“ডাক্তার কী বলল? এবার কি কেমো শুরু হবে? এত সুন্দর চুল তোমার, সব ঝরে যাবে। একদম ন্যাড়া।” হাসেন উমাদা। আমিও।

“গোটা দেশেই তো এখন কেমো চলছে, সব নষ্ট হয়ে গেছে, স-ব! কোনটা ফেলবে আর কোনটা রাখবে! হ্যাঁগো, খেতে অসুবিধে হয় না তোমার? খেতে পার? পাটপাতার বড়া, একটু কাসুন্দ আর চামরমনি চালের ভাত, গরম গরম, আমার খুব খেতে ইচ্ছে করছে গো! আমায় খাওয়াবে!”

“খাওয়াব উমাদা, খাওয়াব, আপনি আবার খেতে পারবেন!”

খাওয়ার কথায় উমাদা হাসছেন। শিশুর মতো হাসছেন। অতিকষ্টে কান্না চাপছেন বৌদি। হাসছেন উমাদা। সূর্যোদয়ের হাসি। হাসছি আমিও। হাসতে হাসতে শীতল হাত ছাড়িয়ে আমি দূরে ক্রমশ। এই শীতলতা থেকে দূরে চলে যেতে হবে আরও। অনেক দূর। স্পর্শের বাইরে। ডাক্তার মণ্ডলের পেশাদার কন্ঠ, উমাদার কম্পিত হাত আর এই শীতল করিডোর ছেড়ে পালাতে হবে আমায়।

“বাবার কাছে চাঁদপুর ঘাটের বিখ্যাত ইলিশের কথা শুনেছি বহুবার। নোনাজলের ইলিশ লালচে, চাঁদপুরের নদীর ইলিশ পুরা রূপার মতো, চকচইক্যা। বাবা এই দেশের ইলিশ দেখে নাক শিঁটকাতেন। আচ্ছা তুমি আজ থাকবে তো? কাল তোমাকে কাঁচকলা দিয়ে মাগুরের ঝোল খাওয়াব। কিছু মাগুর কিনেছি আজ। হাঁড়িতে ঢেকে রেখেছি। এখানে মাগুরও খুব সস্তা। নাও ধর, ব্যাগ ধর।”

উমাদার কঠোর পাঞ্জা আমায় ধরে রাখতে পারে না। হাত ছাড়িয়ে আমি ক্রমাগত অপস্রিয়মান।

ডাক্তার মণ্ডল আমায় দৌড়তে দেখে চিৎকার করছেন, নো এভিডেন্স অফ ম্যালিগন্যান্সি ফাউণ্ড। ইটজ আ বিনাইন গ্রোথ। তবে অপারেট করে নেবেন। শুনেই আমি আরও জোরে দৌড়তে শুরু করি।

তীরবেগে দৌড়লেও শেষ হয় না হাসপাতালের করিডোর, এত বিস্তৃত সে বন্দোবস্ত।

উল্টোডাঙায় নামেন উমাদা। ট্রেন ছাড়ে। জানালা দিয়ে তাকাই। কিন্তু বহু মানুষের ভিড়ে উমাদাকে হারিয়ে ফেলি। আলো-অন্ধকার ভেদ করে, নিশির ডাক উপেক্ষা করে ট্রেনটা ছুটে চলে শিয়ালদার দিকে।

কাচের বিশাল ফটক ঠেলে বাইরে বেরিয়ে লম্বা শ্বাস নিই। তারপর আবার দৌড়তে শুরু করি। ঘরে ফিরতে হবে আমায়। আমি জানি আমায় উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে দেখে খুশি হবেন উমাদা। হাসবেন উমাদা। সে হাসিতে সাতরঙের রামধনু।

আমি ফিরছি উমাদা। ঘরে ফিরছি। ওঁর বাবা ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন। পারেননি। ঘরে ফেরার আনন্দ দেখলেই তাই বুকটা ভরে ওঠে উমাদার।

***
লেখক পরিচিতি: দেবতোষ দাশ জন্ম ১৯৭২-এ। কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রথম গল্প প্রকাশ ১৯৯৫ সালে ‘অপর’ পত্রিকায়। প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা সাত: জলের প্রতিভা, হলুদ কোকাবুরা, বিন্দুবিসর্গ, সন্ধ্যাকর নন্দী ও সমকালীন বঙ্গসমাজ, বিয়োগপর্ব, কামসূত্র, টিমোথি ও আখতার গোসাঁই। গল্প সংকলন দু'টি: ধর্ষণের ১৮ দিন পর; একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প। এই গল্পটির প্রথম প্রকাশ দ্য ওয়াল পূজা ম্যাগাজিন ২০১৮য়। পরে ‘একটি কাঁঠাল ও পাকিস্তানের গল্প’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ